📄 এ পথ, ও পথ
জীবনে প্রডাক্টিভ কিছু পেতে চাইলে সে পথে অগ্রসর হওয়ার পদ্ধতি জানতে হয়। চলার পথের বাধা-বিপত্তি সম্পর্কে ধারণা রাখতে হয়। অনেক মানুষ এমন আছে যে, গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ শুরু করে ঠিকই, কিন্তু পরে আর চালিয়ে যেতে পারে না। কোনো না কোনো সমস্যা এসে তাদের শুরুর উদ্যম নষ্ট করে দেয়। কেউ সমালোচনা নিতে পারে না। কেউ পরিবার বা পেশা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। কেউ এমনিই মনোযোগ হারিয়ে ফেলে। একটা বিষয়ে বেশিদিন আগ্রহ ধরে রাখতে পারে না।
অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায় যে, পরিশ্রমী মানুষেরা দুটি পথের যেকোনো একটি বেছে নেয়। এই সিদ্ধান্তের উপরই তাদের সাফল্য নির্ভর করে। একটি পথে উত্তরোত্তর সাফল্য, আরেকটায় শুধুই হতাশা।
১। সূর্যের পানে চলো
এটা সাফল্যের রাজপথ। উদ্যোগ, অগ্রীম ভাবনা, ও মনোযোগের পথ। এই পথে থাকার অর্থ ঘন ঘন পেছনে না তাকানো। এর অর্থ অন্যেরা কী বলল বা করল, সে ব্যাপারে মাথা না ঘামানো। ভুল আপনার হতেই পারে, কিন্তু সে ভুল আপনাকে থামিয়ে দেবে না। বরং চেষ্টা-পরিশ্রম বাড়িয়ে দিয়ে আপনি সেই ভুল সংশোধন করে নেবেন। আলোচনা-বিতর্ককে আপনি এতটাও বাড়তে দেবেন না, যার ফলে কাজে ব্যাঘাত ঘটতে পারে।
একজন সালাফের ব্যাপারে বর্ণনা এসেছে যে, এক অলস লোক একবার তাঁর সাথে কথা বলার উদ্দেশ্যে তাঁর কাজ থামিয়ে দিতে চাইল। তিনি সেই অকর্মাকে বললেন, “সূর্যের পানে চলো।”[৩৬]
এখান থেকেই আমি এ অংশের শিরোনামটি নিয়েছি। প্রোডাক্টিভ কাজে যথাসম্ভব বেশি সময় বিনিযোগ করতে হবে। এর অর্থ এই না যে, আপনি গঠনমূলক সমালোচনাকে আমলেই নেবেন না। কেউই ভুলের ঊর্ধ্বে না। আপনার ভুল সংশোধনের উদ্দেশ্যে সমালোচনা করার অধিকার অন্যদের আছে। সেইসাথে প্রত্যেকের প্রত্যেকটা কথার জবাব দেওয়ারও আবার কোনো দরকার নেই। কাজের কাজ করতে গেলে ঐক্যমত্যে সম্মতির দরকার হয় না। আপনার কথা আপনি বলুন, অন্যদেরকে তাদের কথা বলতে দিন। সময়ই বলে দেবে কার কথা বেশি সঠিক ছিল। সময়ের আবর্তনে অনেক পরামর্শ আর তর্ক একেবারেই নিষ্ফল বলে প্রমাণিত হয়। কিছু বিষয় নির্দিষ্ট কিছু পরিস্থিতিতে কার্যকর হলেও বাকি সব পরিস্থিতিতে অকার্যকর হয়ে পড়ে।
সূর্যের পানে চলার অর্থ চলার পথে সামনের দিকে মনোযোগ ধরে রাখা। সাফল্য আরো কতটা বাড়ানো যায়, নতুন নতুন কোন সুযোগ কাজে লাগানো যায়, সে চিন্তায় মগ্ন থাকা। এর অর্থ একই জিনিস বারবার আলোচনা করার প্রবণতা কমানো, কাজটা ঠিক হবে কি হবে না এ নিয়ে ইতস্তত ভাব কমিয়ে আনা। একটা জিনিস ঠিক না বেঠিক, তা নিশ্চিতভাবে জানতে পারার জন্য একটু সময় দরকার হয়।
২। চক্রাকারে ঘুরে বেড়ানো
এটি দ্বিতীয় পথ। চিন্তাবিদ, কর্মী, লেখক যে কেউই এ পথে থাকুক না কেন, সে একই কাজ বারবার করতে থাকে। সে সব আপত্তির জবাব দেয়, সারাক্ষণ নিজের পক্ষে সাফাই গায়। এই পথের পথিকরা অন্যদের প্রতি অতিরিক্ত মনোযোগ দেয়। শুধু তা-ই না, তাদের বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগও করে নেয়। কাউকে নিষ্ঠাহীন, কাউকে হিংসুক, কাউকে নিষ্ঠাবান শ্রেণিতে রাখে। এই পথিকরা যেহেতু চারপাশের মানুষগুলোর সাথে চিরকাল বুদ্ধিবৃত্তিক আর মৌখিক যুদ্ধে লিপ্ত থাকে, সেহেতু তাদের শত্রু-মিত্র চিহ্নিত করে নিতে হয়।
কিন্তু ব্যক্তির দৃষ্টিভঙ্গি, হৃদয় আর জীবন চলার পথে এই ক্লান্তিকর বিতর্কের নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এই মানুষগুলো একটি কাজের পেছনেই এত সময় ব্যয় করে ফেলে যে, তা আর কখনো শেষই হয় না। বিতর্ক করা আর সাফাই গাওয়ার পেছনে অনেক সময়-শ্রম চলে যায়। ছোট পরিসরের মধ্যম গুরুত্বের একটি প্রকল্পই চিরকাল চলতে থাকে। এমনকি সত্যিকারের গুরুত্বপূর্ণ কাজেও দরকারের চেয়ে বেশি সময় দেওয়া ঠিক না। তর্ক আর সাফাইয়ের পেছনে খরচ হওয়া সময় একেবারেই অনর্থক।
এই ফাঁদে পড়াটা দুর্ভাগ্য। স্বেচ্ছায়, অতি আবেগে, প্রতিযোগিতার উত্তেজনায় এ সমস্যা হয়। কিন্তু এতসব পরিশ্রমে সত্যিকারের কোনো ফলাফল আসে না।
আমাদের শক্তি আর সময় একেবারেই সীমিত। (সাধারণত জীবনের প্রডাক্টিভ সময় হলো ২০ থেকে ৫০ বছর বয়স)। একবার এটি উপলব্ধি করতে পারলেই আমরা আর এদিক-সেদিকে মনোযোগ দেবার আগ্রহ পাব না। তখন খাদ থেকে উঠে এসে দ্রুত গঠনমূলক কাজে লেগে যাব। নিন্দুকদের বেশি পাত্তা দিতে হবে না, তাদের নিয়ে অভিযোগও করা যাবে না। তাদের ব্যাপার আল্লাহর হাতে ছেড়ে দিন।
وَمَا رَبُّكَ بِظَلَّامٍ لِلْعَبِيدِ
“নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর বান্দাদের উপর কখনও জুলুম করেন না।” (সূরাহ ফুসসিলাত ৪১:৪৬)
সত্যিকারের সমালোচনা কখনো একটি ভালো পরিকল্পনাকে ধ্বংস করে দেয় না। বরং একে শক্তিশালী করে, এর সঠিকতা নিশ্চিত করে, এতে পরিপক্কতা আনে। এ ধরনের সমালোচনার উদ্দেশ্য থাকে ধারণাটির দুর্বল দিকগুলো মেরামত করা। কোনো পরিকল্পনার কার্যকারিতা অস্পষ্ট হলে গঠনমূলক সমালোচনার মাধ্যমে এর শক্তি ও দুর্বলতাগুলো সামনে আসে।
এই দ্বিতীয় পথে আসার একটি প্রধান কারণ হলো অহংকার। নিজেকে সঠিক প্রমাণ করাই লাগবে, এরকম মনোভাবের কারণে মানুষ গুরুত্বপূর্ণ ও প্রডাক্টিভ কাজ ফেলে বিতর্ক আর সাফাইয়ে আত্মনিয়োগ করে।
এই গেল দুটি পথের আলোচনা। একইসাথে দুটি পথ অনুসরণ করার আশা করাটা বোকামি। আপনার একটিই পাকস্থলি। অস্বাস্থ্যকর খাবার আর পানীয় গ্রহণ করতে থাকলে স্বাস্থ্যকর খাবারের জন্য আর জায়গা থাকবে? তেমনি সারাটা সময় যদি অন্যদের কথা নিয়ে পড়ে থাকেন, তাদের আপত্তিগুলো নিয়ে গবেষণা করেন, পাল্টা জবাব লিখতে থাকেন, তাহলে আর কিছু করার সময় পাবেন? অপ্রয়োজনীয় কাজে জীবনের মূল্যবান সময়গুলো চলে যেতে থাকবে।
মনে রাখবেন, অন্যের আপত্তি খণ্ডন করাটা খুব অল্প ক্ষেত্রেই সঠিক কাজ হিসেবে গণ্য হয়। কারণ এর মাধ্যমে তো আপনার কোনো উন্নতি হচ্ছে না। এখন যে জায়গায় আছেন, সেটাকেই রক্ষা করে চলেছেন। ফলে আপনার চিন্তাচেতনার উন্নতি-উৎকর্ষ খুব একটা আর হয় না। বরং একটু সময় নিয়ে আবেগকে থিতিয়ে আসতে দিন। নিরপেক্ষতার সাথে এবং উপকৃত হওয়ার মানসে সব দিক বিবেচনা করার মতো শান্ত পরিস্থিতি আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করুন। তার আগ পর্যন্ত যে কাজ করছিলেন, তা চালিয়ে যান।
لَيْسَ عَلَى الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ جُنَاحٌ فِيمَا طَعِمُوا إِذَا مَا اتَّقُوا وَّآمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ ثُمَّ اتَّقَوا وَّآمَنُوا ثُمَّ اتَّقَوا وَأَحْسَنُوا وَاللَّهُ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ ٩٣
"যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছে ও সৎকর্ম করেছে; তারা ভবিষ্যতের জন্য সংযত হলে, বিশ্বাস স্থাপন করলে ও সৎকর্ম করলে পূর্বে যা ভক্ষণ করেছে, তার জন্য দোষী হবে না। অতএব, সংযত থাকো, বিশ্বাস স্থাপন করো এবং সৎকর্ম করতে থাকো। আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।” (সূরাহ আল-মায়িদাহ ৫:৯৩)
টিকাঃ
[৩৬] ঘটনাটি আমির বিন কায়সের নামে প্রচলিত। দেখুন: ইবনুল জাওযি, আত-তাবসিরাহ ২/৩১৫
📄 অস্থির মানসিকতা
জীবনে সমস্যা থাকেই। বর্তমান মুসলিম বিশ্বের অধিবাসীদের জন্য এ কথা আরো বেশি সত্য। এই লেখাটি লেখার সময় বিশ্বে চলমান ত্রিশটি যুদ্ধের মধ্যে আটাশটিই সংঘটিত হচ্ছে মুসলিম বিশ্বে। বিশ্বের নানা প্রান্তের মানুষ নানারকম সমস্যায় জর্জরিত, এটি অস্বীকার করার উপায় নেই। পার্থক্য হলো অন্যান্য জায়গার সমস্যাগুলো শক্তিমত্তা আর প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ফল, যেখানে আমাদের মুসলিম বিশ্বের সমস্যাগুলো দুর্বলতা আর প্রযুক্তিগত পশ্চাৎপদতার ফল।
এই তিক্ত সত্য আমাদের মাঝে এক মানসিক অস্থিরতার জন্ম দেয়। এতে আমাদের চিন্তাপদ্ধতি আর চারপাশকে বোঝার ক্ষমতা প্রভাবিত হয়। সেইসাথে ঘরের ও বাইরের মানুষদের সাথে আমাদের সম্পর্কেও প্রভাব পড়ে।
সমস্যা ও সংকটগুলোকে প্রসঙ্গের বাইরে নিয়ে অযথা বড় করে দেখাটা আরো বড় একটি সমস্যা, মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা। এ অবস্থায় জীবনে ঘটে যাওয়া অন্যান্য ইতিবাচক জিনিসগুলো উপেক্ষা করা হয়। বিদ্যমান সুযোগগুলো তো চোখ এড়িয়ে যাবেই, সংকটকে সুযোগে পরিণত করার বুদ্ধিও মাথায় আসবে না।
সংকীর্ণ দৃষ্টি নিয়ে সমস্যার দিকে তাকাতে গিয়ে বৃহত্তর চিত্রটির ব্যাপারে আমরা অজ্ঞ থেকে যাই। ফলে সংকটকে যথাযথভাবে মোকাবেলা করতে পারি না। এই ভারসাম্যহীন দৃষ্টীভঙ্গিই অস্থির মানসিকতার জন্ম দেয়। এ এক মারাত্মক রোগ। কোনো সমস্যা বা সংকটের সত্যিকার স্বরূপ বুঝতে পারা এক জিনিস। আর ওই সমস্যাকেই কিয়ামত ভেবে সেটার পেছনেই জীবন ধ্বংস করে ফেলা আরেক জিনিস।
সময়ের আবর্তনে একসময় বোঝা যায় সমস্যাটির স্থায়িত্ব আসলে কতটুকু। সমস্যার ভেতর দিয়ে যাবার সময় মানুষ সেটাকে কত বড় ভেবেছিল আর বাস্তবেই সেটা কতটা বড়, এ দুটির মাঝে অবশ্যই পার্থক্য আছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মানুষ সেটাকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে দেখে। আর মনোযোগকামী মিডিয়া কীভাবে সেটা উপস্থাপন করে, তা তো বলাই বাহুল্য।
ইরাক সংকটসহ আরো অন্যান্য বৈশ্বিক সমস্যা যেন বৃহত্তর সমস্যার কথা আমাদের ভুলিয়ে না দেয়। আর তা হলো পশ্চাৎপদতা, দুর্বলতা ও অপদস্থতার সমস্যা।
অস্থির মানসিকতা প্রকাশ পায় একগুঁয়েমি, গোঁড়ামি ও অসহিষ্ণুতার মাধ্যমে। আমরা সমালোচনা গ্রহণ করতে, সংশোধিত হতে ও ভুল স্বীকার করতে অপারগ হয়ে যাই। অন্যান্য দৃষ্টিভঙ্গির সাথে আমরা শত্রুতা লাগিয়ে দিই আর ভালো কাজে পরস্পর সহযোগিতা করতে ভুলে যাই। অস্থির মানসিকতা পর্যালোচনামূলক চিন্তাধারার জন্য ক্ষতিকর। সঠিকভাবে কারণ ও ফলাফল বোঝার ক্ষমতা তখন থাকে না। সমস্যার পেছনের মূল অনুঘটকগুলো খুঁজে বের করতে আলস্য বোধ হয়।
অস্থির মনমানসের কাছে ধূসর বলে কিছু নেই, সবই সাদা নয়তো কালো। “হয় আপনি আমাদের পক্ষে, নয়তো আমাদের বিরুদ্ধে।” সমঝোতা ও আংশিক সমাধানকে গ্রহণযোগ্য মনে করা হয় না। এ থেকে জন্ম নেয় গোঁয়ার্তুমি, আর অসম্ভব হয়ে পড়ে ইতিবাচক সংস্কার। ব্যক্তিগত বুঝকে বানানো হয় ধ্রুব সত্য। এই মানসিকতার দুটি লক্ষণ হলো-অভিযোগপ্রবণতা আর তুচ্ছ বিষয়ে অতি আগ্রহ। মানুষ যৌক্তিক চিন্তাভাবনা করে সমস্যার গোড়ায় না পৌঁছে যাকে-তাকে বলির পাঁঠা বানিয়ে ফেলে।
এই মানসিকতা যে সমাজে ছড়িয়ে পড়ে, সেখানে সারাক্ষণই নাগরিক অসন্তোষ, মতবিরোধ আর ব্যাপক অবিচার ছড়িয়ে পড়ে। মানুষ একজন আরেকজনের শ্রম পণ্ড করে দেয়। ফলে যোগফল বেশিদূর এগোয় না। ব্যর্থতা ছড়িয়ে পড়ে মহামারির মতো। অর্থনীতি, পরিবার, ব্যবসা, লোকপ্রশাসন, বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি, মানসিক স্বাস্থ্য সবকিছুই আক্রান্ত হয়।
অস্থির মানসিকতার রোগীদের মূল সমস্যা হলো নিজেদের ভুল বুঝতে না পারায় সংস্কারের কোনো ইচ্ছে পোষণ না করা। তাদের অজ্ঞতা বড় জটিল। কোনটা সঠিক, তা তা জানে না; তারা যে জানে না, সেটাও তারা জানে না।
কুরআন আমাদের শিক্ষা দেয় নিজেদের জ্ঞানের ব্যাপারে বিনয়ী হতে এবং সবসময় হিদায়াত কামনা করতে। আমরা প্রতি ওয়াক্তে সূরাহ আল-ফাতিহায় পড়ি, “আমাদের সরল পথ প্রদর্শন করুন।” (সূরাহ আল-ফাতিহা ১:৫)
আমরা নিজেদের জ্ঞান নিয়ে নিশ্চিন্ত থাকতে অস্বীকৃতি জানাই। নিজের বুঝ নিয়ে সন্তুষ্ট হয়ে গেলেই স্থবিরতা সৃষ্টি হয়, বুদ্ধিবৃত্তিক অগ্রগতি থমকে দাঁড়ায়। আল্লাহ আমাদের এ থেকে রক্ষা করুন।
📄 অন্তরের শান্তি
অন্তরের শান্তিই সকল শান্তির উৎস। অন্তর যার প্রশান্ত, সে অন্যদের সাথেও শান্তিতে থাকে। মুসলিমরা প্রত্যেক সালাতের তাশাহহুদে বলে, “শান্তি বর্ষিত হোক আমাদের উপর এবং আল্লাহর সৎ বান্দাদের উপর।” আল্লাহ বলেন,
فَإِذَا دَخَلْتُم بُيُوتًا فَسَلِّمُوا عَلَى أَنفُسِكُمْ تَحِيَّةً
“ঘরে প্রবেশের সময় নিজেদেরকে সালাম প্রদান করবে।” (সূরাহ আন-নূর ২৪:৬১)
এখানে ‘নিজেদের’ বলতে একদল মানুষকে বোঝানো হয়েছে। আসলেই আত্মার অন্তস্থল থেকেই শান্তি তথা সালাম বিকিরিত হয়।
নিজের সাথে নিজের সম্পর্ক স্বচ্ছ থাকলে, লক্ষ্য-উদ্দেশ্য অটুট থাকলে এবং অন্তরের অবস্থার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলে তবেই অন্তরের শান্তি অর্জিত হয়। প্রতিপালকের সম্পর্কে জ্ঞানের পরই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞান হলো আপন আত্মার ব্যাপারে ও এর পরিশুদ্ধির ব্যাপারে জ্ঞান।
আপনার সামর্থ্য ও মেধার প্রতি যত্নশীল হোন, দুর্বলতা ও শক্তির ব্যাপারে হোন সচেতন। আপনি কি ধীরস্থির না তাড়াহুড়াপ্রবণ, চঞ্চল না শান্ত, আপনি কি নাছোড় স্বভাবের না এর বিপরীত? নিজের ব্যাপারে সত্যটা না জানলে আপনি বুঝতে পারবেন না শক্তি-সামর্থ্য কোন পথে ব্যবহার করলে সর্বোচ্চ উপকার পাবেন।
এর মানে এই না যে, অস্তিত্বের প্রকৃতি বা মানবাত্মার রহস্য নিয়ে গভীর গবেষণায় ডুব দিতে হবে। ওহীর মাধ্যমে যা জানানো হয়েছে, এর বাইরে এ সম্পর্কিত জ্ঞান আমাদের আয়ত্তের বাইরে। আল্লাহ বলেন,
وَيَسْأَلُونَكَ عَنِ الرُّوحِ قُلِ الرُّوحُ مِنْ أَمْرِ رَبِّي وَمَا أُوتِيتُم مِّنَ الْعِلْمِ إِلَّا قَلِيلًا
“তারা তোমাকে রূহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বলো, 'আত্মা আমার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে হুকুম, যার ব্যাপারে তোমাদের সামান্যই জ্ঞান দেওয়া হয়েছে।” (সূরাহ আল-ইসরা ১৭:৮৫)
তবে আপনার ব্যক্তিত্বের বিভিন্ন দিক, সুপ্ত মেধা, ও সত্যিকারের স্বভাব আবিষ্কার করা কিন্তু অসম্ভব নয়। তারপর এই জ্ঞান ব্যবহার করে আপনি ভালো কিছু অর্জন করতে এবং মন্দ পরিহার করতে পারবেন।
ইসলামি শরিয়ত মানুষের স্বভাব-প্রকৃতি বিবেচনায় নিয়েই হুকুম-আহকাম দেয়। নবি-রাসূলগণের ক্ষেত্রেও এ কথা সত্য। তাঁরাও নিজেদের স্বভাব-প্রকৃতি অনুযায়ী কাজ করেছেন। তাঁরাও তো মানুষ, এর বেশিও নন, কমও নন। নবিজি (ﷺ) বলেছেন,
ইবরাহিম আলাইহিসসালাম এর তুলনায় আমাদের মনে অধিক সন্দেহ জাগতে পারে। তিনি বলেছিলেন, “হে আমার প্রতিপালক! কীভাবে আপনি মৃতকে জীবিত করেন, আমাকে দেখান।” আল্লাহ বললেন, “তবে কি তুমি বিশ্বাস করোনি?” তিনি উত্তরে বললেন, "কেন করব না? তবে তা কেবল আমার চিত্ত প্রশান্তির জন্য।” (২: ২৬০)। আল্লাহ তাআলা লূত আলাইহিসসালাম এর উপর রহমত বর্ষণ করুন, তিনি কোনো শক্তিশালী জনগোষ্ঠীর আশ্রয় গ্রহণের ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। ইউসুফ আলাইহিসসালাম এর দীর্ঘ কারাবরণের মতো আমাকেও যদি কারাগারে অবস্থান করতে হতো, তবে আমি রাজদূতের আহ্বানে সাড়া দিয়ে বসতাম। (সহিহ আল-বুখারি এবং সহিহ মুসলিম)
ইবরাহিম আলাইহিসসালাম জ্ঞান অন্বেষণ করেছিলেন এবং বস্তুর সত্যিকার প্রকৃতি জানতে চেয়েছিলেন। এটার কারণ ছিল তাঁর স্বাভাবিক মানবিয় কৌতূহল মেটানো। মুহাম্মাদ (ﷺ) ইউসুফ আলাইহিসসালামের ব্যাপারে বলেছেন যে, তাঁর সমপরিমাণ কারাগারে থাকতে হলে "আমি রাজদূতের আহ্বানে সাড়া দিয়ে বসতাম।” তিনি এখানে আমাদের স্বাভাবিক মানবপ্রকৃতির কথা বলেছেন। স্বভাবতই আমরা মুক্তির প্রতি লালায়িত। বন্দীত্বকে আমরা ঘৃণা করি, বিশেষত যদি তা এত লম্বা সময় ধরে আমাদের শক্তি-সামর্থ্যকে বাধা দিয়ে রাখে।
মূসা আলাইহিসসালাম নিজের ব্যাপারে জানতেন এবং নিঃসংকোচে ও অকপটে নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করতেন। তিনি নিজের স্বাভাবিক ভয়ের কথা উল্লেখ করে বলেছেন, "আমি যখন তোমাকে (ফিরআউনকে) ভয় পেতাম, তখন তোমার কাছ থেকে পালিয়েছিলাম।” আরো বলেছেন, "হে প্রতিপালক! আমি ভয় করি সে আমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়বে অথবা আমাদের অত্যাচার করবে।” দেখা যাচ্ছে মূসা আলাইহিসসালাম নিজের ব্যাপারে জানতেন এবং সেভাবেই নিজেকে গ্রহণ করে নিয়েছেন। স্বাভাবিকভাবে যতটুকু সামর্থ্যে কুলায়, ততটুকু ভার নিয়েই তিনি লক্ষ্য-উদ্দেশ্য সাজাতেন।
আমরা মুখে যেসব মূলনীতি ও মূল্যবোধের কথা বলি, অন্তরও তার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। এই মূল্যবোধের মাধ্যমেই আমরা আমাদের প্রতিপালকের সাথে সম্পর্কিত হই আর এর ভিত্তিতেই নিজেদের কথা ও কাজকে সাজাই। এই সত্য ও শাশ্বত মূল্যবোধগুলোই আমাদের আচরণের ভিত্তি হওয়া উচিত। নইলে সারাক্ষণই অমুককে খুশি করা, তমুককে অখুশি না করা নিয়ে মাথা ঘামাতে হবে। আমাদের জীবন হয়ে উঠবে ভান আর চাটুকারিতাময়। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য আর স্বাধীনতা হারানোর ভয়ে সারাক্ষণ চারপাশের মানুষদের কাছে আত্মসমর্পণ করে থাকতে হবে।
অন্তরের প্রশান্তির একটি দিক হলো ভেতরের সত্ত্বার সাথে বাইরের আচরণের মিল। আমাদের কাজকর্ম যেন হয় আমাদের কথার প্রতিফলন। আল্লাহ বলেন,
كَبُرَ مَقْتًا عِندَ اللَّهِ أَن تَقُولُوا مَا لَا تَفْعَلُونَ ﴿۳﴾
"তোমরা যা করো না, তা বলা আল্লাহর কাছে গুরুতর অপরাধ।” (সূরাহ আস-সফ ৬১:৩)
তার মানে আমাদের কর্মপদ্ধতি হতে হবে সৎ ও সঠিক। রাসূল (ﷺ) এই জিনিসটি ভালোমতো ব্যাখ্যা করে দিয়েছেন। সুফিয়ান বিন আব্দুল্লাহ আস-সাকাফি রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু জিজ্ঞেস করলেন,
يَا رَسُولَ اللَّهِ قُلْ لِي فِي الإِسْلامِ قَوْلاً لَا أَسْأَلُ عَنْهُ أَحَدًا بَعْدَكَ
“হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে ইসলাম সম্পর্কে বলুন, যাতে এ ব্যাপারে আর কাউকে জিজ্ঞেস না করা লাগে।”
রাসূল (ﷺ) বললেন,
قُلْ آمَنْتُ بِاللَّهِ فَاسْتَقِمْ
“বলো, 'আমি ইসলামে বিশ্বাস করি।' তারপর এতে অবিচল থাকো।”[৩৭]
ইবাদাত যেভাবে করি, মানুষের সাথে আচরণও সে অনুযায়ী হওয়া চাই। ইবাদাত আমাদের জাগতিক কাজকর্মের দিকনির্দেশক হবে। আমাদের ন্যায়পরায়ণ হতে ও অপরের অধিকারকে সম্মান করতে উৎসাহ যোগাবে। মাসজিদে এক চেহারা আর বাইরের দুনিয়ায় আরেক চেহারা দেখালে চলবে না।
বকধার্মিক লোকদের কারণে অনেক বিপর্যয় আসে। আমাদের ঈমান এত মজবুত ও গভীর করতে হবে, যেন তা জীবনের সকল পরীক্ষা ও বিপদে খুঁটি হয়ে দাঁড়ায়। বাসায়, কর্মস্থলে, নিজের ভেতর অনেকরকম সমস্যা ও হতাশা আসে। এগুলো সহ্য করে বিজয়ী হতে হলে আল্লাহর প্রতি ঈমান দৃঢ় হতে হবে। এই ঈমানের সঙ্গী হবে অন্তরের অন্তস্থল থেকে আসা নিষ্ঠা, যা আমাদের বাহ্যিক ইবাদাতে মূর্ত হয়ে উঠবে।
অন্তরের শান্তির জন্য দরকার আশা-আকাঙ্ক্ষাকে নিজের সামর্থ্যের সীমায় বেঁধে রাখা। রাসূল (ﷺ) বলেন, “হে বিশ্বাসীরা! নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী কাজ করো। তোমরা ক্লান্ত হলেও আল্লাহ ক্লান্ত হন না। অল্প অল্প করে হলেও নিয়মিত যে আমল করা হয়, সেটিই আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয়।” (সহিহ আল-বুখারি)
এই উপদেশ সব জায়গায় খাটে। যেমন বস্তুগত সুখের পেছনে ছুটতে গিয়ে টাকার লোভের কারণে মানুষ ধ্বংস হয়ে যায়।
আমরা যা প্রচার করি, তার সাথে আমাদের সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। আপনি যে দিকে আহ্বান করবেন, গোটা পৃথিবীর সবাই এর প্রতি ইতিবাচক সাড়া দেবে না। এমনটা হয় না, এমনটা আশা করাও ঠিক না। এমনকি আল্লাহর মনোনীত রাসূলগণকেও সবাই মেনে চলেনি। আপনি যেটার জন্যই কাজ করেন না কেন, কেউ না কেউ ঠিক এটার বিপরীত কাজ করছে।
অন্তরের শান্তির জন্য প্রয়োজন নিজের অনন্য স্বভাবের সাথে সামঞ্জস্য। যেটা যার স্বভাবের সাথে যায় না, সে সেটা গ্রহণ করতে পারবে না। রাসূল (ﷺ)-এর সামনে খাবার হিসেবে এক জাতের কাঁটাওয়ালা লেজের সরীসৃপ পেশ করা হয়েছিল। তিনি তা খেলেন না। খালিদ বিন ওয়ালিদ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বিষয়টা লক্ষ করে জিজ্ঞেস করলেন, এই প্রাণীটা খাওয়া হারাম কি না। রাসূল (ﷺ) বললেন, “না। আমার এলাকায় ওটা খায় না বলে আমার রুচি হয় না।” তিনি খাননি, কারণ তাঁর পছন্দ না। প্রশ্নটা হালাল-হারামের না, ব্যক্তিগত রুচির।
সাহাবা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমের ক্ষেত্রেও একই কথা। প্রত্যেকের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ছিল। উমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর চেয়ে আবু বকর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু আলাদা। বদরের যুদ্ধবন্দীদের ব্যাপারে সিদ্ধান্তের কথাই ধরুন। ওহী নাজিল হওয়ার আগ পর্যন্ত যতক্ষণ বিভিন্ন মত দেওয়ার সুযোগ ছিল, ততক্ষণ প্রত্যেক সাহাবির মতের মধ্যে নিজ নিজ ব্যক্তিত্ব ফুটে উঠেছে। আবু বকর শান্তশিষ্ট ও সহনশীল মানুষ। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) নিজেও এ কথার স্বীকৃতি দিয়েছেন। উমর ছিলেন শক্তিমান আর দৃঢ় স্বভাবের, এটাও রাসূল (*) আমলে নিয়েছেন।
আমাদেরও নিজ নিজ বৈশিষ্ট্য বুঝে নিয়ে তার সাথে মানিয়ে নিতে হবে। ব্যক্তিগত গুণাবলি আর মেজাজকে অস্বীকারের মাধ্যমে জোর করে ভান ধরে থাকা যায় না।
উমর বিন আব্দুল আযীয বলেছেন, “সবচেয়ে মনোরম জিনিস হলো, যখন কারো ব্যক্তিগত পছন্দ ইসলামের শিক্ষার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।”
আমাদের আল্লাহর নির্ধারিত তাকদীরের প্রতি সন্তুষ্ট থাকতে হবে। এই সন্তুষ্ট থাকার অর্থ তাকদীরের কারণেই তাকদীরের ক্ষতি এড়ানোর পন্থা অবলম্বনের চেষ্টা করা। প্লেগ আক্রান্ত এক এলাকায় প্রবেশ করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে উমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু যথার্থই বলেছেন, "আমরা আল্লাহর নির্ধারিত তাকদীর থেকে পলায়ন করে আল্লাহর নির্ধারিত তাকদীরের দিকেই যাই।”
তাকদীরকে মুমিন পূর্ণরূপে মেনে নেয়। যা বিলম্বিত করা হয়েছে, তা নিয়ে তাড়াহুড়া করতে নেই। যা দ্রুত নিয়ে আসা হচ্ছে, তা স্থগিত করতে নেই। মুমূর্ষু রোগী, কুৎসিত চেহারাধারী, দুর্বল চিত্তের অধিকারী, অবিবাহিত-অবিবাহিতা, ইয়াতীম সহ যেকোনো ধরনের দুর্দশা ভোগকারী ব্যক্তির উচিত প্রথমে আল্লাহর এই তাকদীরের ব্যাপারে সন্তুষ্ট হতে শেখা। তারপর নিজের বাসনা পূরণে বাস্তবসম্মত ও বৈধ উপায়-উপকরণ অবলম্বন করা এবং সাধ্যের বাইরের আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করা।
ন্যায়পরায়ণ ও পক্ষপাতহীন হওয়াটাও অন্তরের শান্তি অর্জনের শর্ত। এর জন্য স্বার্থপরতা, অসার কামনা, ও লোভ-লালসা ত্যাগ করতে হবে। মহান সাহাবি আম্মার রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলতেন, “কেউ যদি তিনটি জিনিস অর্জন করে, তাহলে ঈমানের স্বাদ বুঝতে পারবে। নিজের প্রতি ন্যায়বিচার করা, সকলকে সালাম দেওয়া, অভাবের সময়েও দান করা।” (সহিহ আল-বুখারি)
মতভেদ হলে নিজেকে অন্যের জায়গায় বসিয়ে কল্পনা করলে কেমন হয়, যাতে পুরো বিষয়টাকে একবার তার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়? অন্তত এতটুকু তো মেনে নেয়া যাবে যে, তারা নিজেদের জন্য ওটাই চায়। আমি নিশ্চিত যে, নিজের প্রতি সত্যিই সৎ থাকা লোক খুবই অল্প। এদের প্রতি আল্লাহ মহা অনুগ্রহ করেছেন। রাসূল (ﷺ) বলেছেন, “ভাইয়ের চোখে ধূলা দেখতে পাও অথচ নিজের চোখে ময়লা দেখতে পাও না!”
অন্তরের প্রশান্তির আরেকটি শর্ত হলো রাসূলগণ গায়েবের ব্যাপারে যে জ্ঞান নিয়ে এসেছেন, তা মেনে নেয়া। সত্যিকার বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ও সঠিক যুক্তির সাথে এগুলোর কোনো বিরোধ নেই। উপকথায় তো সত্য-মিথ্যা নির্বিশেষে সব গালগল্প মিশ্রিত থাকে। আমরা এই মনোভাবে আক্রান্ত না হয়েই গায়েব বা অদৃশ্যের জ্ঞানে বিশ্বাস করি। গায়েবের ব্যাপারগুলো মানবমনের ক্ষমতার ঊর্ধ্বে, আর গালগল্প- কিচ্ছাকাহিনী মানবমনের চেয়ে নিচু স্তরের। আমাদের অবশ্যই যুক্তি প্রয়োগ করতে হবে এবং অন্ধবিশ্বাস ত্যাগ করতে হবে। হৃদয়কে সৃষ্টি করা হয়েছে বুদ্ধিবৃত্তির হাতিয়ার হিসেবে, শুধুই তথ্যের ভাণ্ডার হিসেবে নয়।
প্রখ্যাত কাযি ও ফকিহ ইযযুদ্দিন বিন আব্দুস সালাম এটি ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেন যে, মানবকল্যাণ করার এবং অকল্যাণ প্রতিরোধ করার জ্ঞান ওহী নাজিলের আগ থেকেই যুক্তিগ্রাহ্য। আমি যোগ করছি যে, ওহী নাযিলের পরও এগুলো যুক্তিগ্রাহ্য আছে। এভাবেই আমরা কুরআন-সুন্নাহ বুঝি এবং বিভিন্ন ফাতওয়ার মাঝে তুলনা করি। আমরা উপকার-অপকার বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত দিই। মানবহৃদয়ের সত্যিকার সামর্থ্যকে খাটো করেও দেখি না, অতিরঞ্জিতও করি না। কিছু সীমার বাইরে আমাদের মন আর যেতে পারে না।
আমাদের মন যেসব ওয়াসওয়াসা দ্বারা আক্রান্ত হয়, সেগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেয়াও জরুরি। এগুলো আমাদের ইবাদাত ও জাগতিক কাজকর্মে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। বেশিরভাগ ওয়াসওয়াসাই মনস্তাত্ত্বিক (যেমন, ঠিকমতো ওযু করার পরও পবিত্রতা অর্জন হয়নি বলে মনে হওয়া। – অনুবাদক)। এগুলোর সবচেয়ে ভালো চিকিৎসা হলো জোর করে সেসব সংশয়কে উপেক্ষা করা, সেগুলোকে সময় না দেওয়া। রাসূল (ﷺ) দেখানো তরিকা অনুযায়ী সূরাহ ইখলাস তিলাওয়াত করে আল্লাহর কাছে সাহায্য ও আশ্রয় চাওয়া।
আমাদের সবটুকু আত্মিক শক্তি জড়ো করে এই ওয়াসওয়াসা উপেক্ষা করতে হবে। বিশেষত ওযু-গোসলের ব্যাপারে। আল্লাহ আমাদের এ থেকে মুক্ত হওয়ার পথ দেখিয়ে দেবার আগ পর্যন্ত এসব ওয়াসওয়াসা হলো কিছু জিনিস উপেক্ষা করার অনুমোদন। আমাদের অন্তরের নিষ্ঠার ব্যাপারে আল্লাহ অবগত আছেন। আর আল্লাহ নিষ্ঠাবানদের সাহায্যকারী।
টিকাঃ
[৩৭] সহিহ মুসলিম: ৩৮
📄 সহাবস্থান করতে শেখা
সহাবস্থানের কথা উঠলেই মুসলিম সমাজের কিছু মানুষ খুব সতর্ক হয়ে উঠেন। তারা ভাবেন সহাবস্থান করতে হলে আমাদের ইসলামি শরিয়ত ত্যাগ করতে হবে। অথবা তারা ভাবেন এটা আসলে ইসলামের ভেতর বিজাতীয় ধ্যানধারণা প্রবেশ করানোর ফাঁদ।
সহাবস্থানের ব্যাপারে মুসলিমদের আরেকটি সন্দেহের কারণ হলো তারা একে পশ্চিমে জন্ম নেয়া একটি ধারণা বলে মনে করেন। পশ্চিমারা হয়তো এই জিনিসটার মাধ্যমে ইসলামি সংস্কৃতিকে বিলুপ্ত করে দিতে যায়, যাতে মুসলিম বিশ্ব পশ্চিমের প্রতিচ্ছবি হয়ে যায়।
এই সতর্ক ও সংবেদনশীল মনোভাব অবশ্যই সম্মানের দাবিদার। তবে আসল কথা হলো সহাবস্থানের ধারণাটি একটি ইসলামি শিক্ষা। কুরআন-হাদিস এই ধারণাকে সমর্থন করে।
কিছু মানুষ অসদুদ্দেশ্যে 'সহাবস্থান' শব্দটা ব্যবহার করে বলেই এটাকে ঘৃণা করা উচিত নয়। শাব্দিক পার্থক্য নিয়ে বেশি চিন্তিত হওয়ার দরকার নেই। আমরা দেখব অর্থটা। যৌক্তিকভাবে পর্যবেক্ষণ করে তবেই আমরা একটি বিষয়কে গ্রহণ বা বর্জন করব।
আমাদের মূলনীতি হলো “জ্ঞান মুমিনের সম্পদ। যেখানেই সে তা পাবে, তার অধিকারই এর উপর সবচেয়ে বেশি হবে।” (সুনান আত-তিরমিযি)
ঈমানের ব্যাপারে সমঝোতা করে নিজেদের কিছু বিশ্বাস করা, এর সাথে সাংঘর্ষিক অন্য ধর্মের কিছু বিশ্বাস করাকে যদি সহাবস্থান বলা হয়, তাহলে তা একেবারেই ভুল। এটি সহাবস্থানের নেতিবাচক অর্থ। আল্লাহ বলেন,
أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ
“তাহলে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশ বিশ্বাস করো ও কিছু অংশ অবিশ্বাস করো?” (সূরাহ আল-বাকারাহ ২:৮৫)
উল্টোদিকে সহাবস্থানের খুবই ইতিবাচক আরেকটি অর্থ আছে, যা অতি উচ্চমানের একটি নৈতিক মূল্যবোধ। এর অর্থ হলো পারস্পরিক যোগাযোগ, সংলাপ, এবং শান্তি ও উন্নতির জন্য একসাথে কাজ করতে সম্মত হওয়া। এতে প্রয়োজন ভিন্নতার অস্তিত্ব স্বীকার করে নিয়ে সেগুলোকে সম্মান করা।
ইসলামে সহাবস্থানের অর্থ এটিই। আধুনিক 'সহাবস্থান' শব্দটির চেয়ে অনেক স্পষ্ট ও শ্রেয় ভাষায় কুরআন এর ব্যাপারে কথা বলেছে। যেমন,
يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَاكُم مِّن ذَكَرٍ وَأُنثَى وَجَعَلْنَاكُمْ شُعُوبًا وَقَبَائِلَ لِتَعَارَفُوا
“হে মানবজাতি! আমি তোমাদের এক পুরুষ ও এক নারী হতে সৃষ্টি করেছি, তারপর তোমাদের করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্র, যাতে তোমরা পরস্পরকে জানতে পারো।" (সূরাহ আল-হুজুরাত ৪৯:১৩)
"পরস্পরকে জানা” শুধু নির্দিষ্ট নাম বা গোত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সমগ্র মানবজাতিকে এখানে জ্ঞান, শিক্ষা ও ইতিবাচক মেলামেশা বিনিময় করতে বলা হচ্ছে। এর প্রমাণ আল্লাহর এই বাণী:
وَلَا يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَآنُ قَوْمٍ أَن صَدُّوكُمْ عَنِ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ أَن تَعْتَدُوا، وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَى وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ
"যে সম্প্রদায় তোমাদের পবিত্র মসজিদে যেতে বাধা দিয়েছিল, তাদের প্রতি শত্রুতাবশত তোমরা যেন সীমালঙ্ঘন না করে ফেলো। সৎকাজ ও আল্লাহভীতিতে পরস্পরকে সহযোগিতা করো। আর পাপাচার ও সীমালঙ্ঘনে পরস্পরকে সহযোগিতা কোরো না। আল্লাহকে ভয় করো। তিনি কঠোর শাস্তিদাতা।” (সূরাহ আল-মায়িদাহ ৫:২)
দ্বীনের মৌলিক ব্যাপারে অপর পক্ষ আমাদের সাথে একমত হোক বা না হোক, ইসলাম নির্দেশ দিয়েছে কল্যাণকর ও ভালো কাজে পরস্পরকে সাহায্য করতে। দেখার বিষয় হলো সহযোগিতাতা যেন পাপাচার, অবিচার ও জুলুমের পথে না হয়। পরস্পরকে জানা ও সাহায্য করার ব্যাপারটিতে তাই সমগ্র মানবজাতি অন্তর্ভুক্ত। এই মূল্যবোধগুলো মানবতার কল্যাণ বয়ে আনে। সে অনুযায়ী কাজ করলে মানুষ আমাদের কাছে আসবে, ইসলামের কাছে আসবে।
মানুষ ও তাদের পরিস্থিতি বিভিন্নরকম হয়ে থাকে, এ তো একদম জানা কথা। আল্লাহই চেয়েছেন যে, তা এমন হবে। তিনি বলেন,
وَلَوْ شَاءَ رَبُّكَ لَجَعَلَ النَّاسَ أُمَّةً وَاحِدَةً وَلَا يَزَالُونَ مُخْتَلِفِينَ ﴿۱۱۸﴾ إِلَّا مَن رَّحِمَ رَبُّكَ ، وَلِذَلِكَ خَلَقَهُمْ ৯৯
“এবং যদি তোমার প্রতিপালক ইচ্ছা করতেন, তাহলে তিনি সকল মানুষকে একই মতাবলম্বী করে দিতেন। কিন্তু তোমার প্রতিপালক যার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন, সে ব্যতীত বাকিরা মতভেদ করতেই থাকবে। আর এজন্যই তিনি তাদের সৃষ্টি করেছেন।” (সূরাহ হূদ ১১:১১৮-১১৯)
নানা মুনির নানা মত থাকার অর্থ এই না যে, ভালো আর খারাপ বলে কিছু নেই। মতভেদের অস্তিত্বই বরং ভালো আর মন্দের মাঝে স্পষ্ট পার্থক্যের প্রমাণ। সহাবস্থান করার অর্থ নিজেদের মূল্যবোধ প্রচার বন্ধ করে দেওয়া নয়। একসাথে থেকেই আমরা অপরের সাথে উত্তম পন্থায় বিতর্ক করতে, সৎকাজের আদেশ দিতে ও অসৎ কাজের নিষেধ করতে পারি। এগুলো ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
সহাবস্থান অর্থ পারস্পরিক কল্যাণের জন্য শান্তিপূর্ণভাবে সহযোগিতা করা, সার্বজনীন মূল্যবোধের শক্তিতে প্রতিবেশী হয়ে বাস করা আর মতবিনিময়ের জন্য সংলাপের সুযোগ সৃষ্টি করা।
মুমিনরা পৃথিবীকে উন্নততর করতে চায়। তারা সৎ কাজের আদেশ ও মন্দ কাজের নিষেধকারী জাতি। সত্য তুলে ধরা, মিথ্যেকে খণ্ডন করা, জ্ঞান ছড়িয়ে দেওয়া ও অজ্ঞতা দূর করার জন্য তারা সর্বোত্তম পদ্ধতিতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে।
সবচেয়ে খারাপ স্বভাবগুলোর একটি হলো নিজেকে ধ্রুব সত্যের ঠিকাদার বানিয়ে নেয়া, তা সে যে নাম ব্যবহার করেই করা হোক না কেন। নিজের দৃষ্টিভঙ্গিকে বিতর্কের এতই ঊর্ধ্বে মনে করা যে, অন্য সবাইকে বিচার করা নিজের জন্য জায়েয বানিয়ে ফেলা।
এ ধরনের আচরণ ইসলামি শিক্ষার বিপরীত। ইসলামে বিশ্বাস করুক বা না করুক, শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থান করতে চাওয়া প্রত্যেকের জীবনকে ইসলাম পবিত্র বলে ঘোষণা করে।
ইতিহাসজুড়ে এমনটিই হয়ে এসেছে।
ইসলামের প্রথম শহর, যেখান থেকে ইসলাম দূরদূরান্তে ছড়িয়ে পড়েছে, সেই মদিনার সমাজেই ইসলামি সহাবস্থানের অসাধারণ দৃষ্টান্ত রয়েছে।
ইসলাম যখন প্রথমবারের মতো শক্তিশালী ও স্বাধীন অবস্থায় পৌঁছল, তখনই আল্লাহরই ইচ্ছায় নানা মতের মানুষের সহাবস্থান ঘটল। মদিনায় ভিন্ন ধর্মাবলম্বী ইয়াহুদি ও পৌত্তলিক ছাড়াও বাস করত বিশাল সংখ্যক মুনাফিক ও দুর্বল ঈমানের মুসলিম। ছোট্ট একটি শহরে এরা সবাই পাশাপাশি বাস করত।
এমনকি আল্লাহর ইচ্ছায় রাসূল (ﷺ)-এর মৃত্যুর পর তাঁর ঢাল একজন ইয়াহুদির কাছে বন্ধক ছিল। এ থেকেই বোঝা যায় যে, একসাথে বসবাসের এই মূলনীতি চিরন্তন এবং আমাদের দ্বীনের প্রতিষ্ঠিত ধারণা। এই বিধান রহিত হয়ে যাওয়ার প্রমাণ কেউ দেখাতে পারবে না।
মানবতার বিকাশ ও সভ্য জীবনযাপনের জন্য যে পদ্ধতিতে পৃথিবীর মানুষেরা পারস্পরিক সহযোগিতা ও জ্ঞান বিনিময় করে, সেটাই সহাবস্থান। যেসব অভিজ্ঞতা আমাদের আরো ভালোভাবে বাঁচতে শেখাবে, সেগুলোর জ্ঞান আমরা বিনিময় করি। যেসব মূল্যবোধ আমরা সার্বজনীনভাবে স্বীকার করি, সেগুলোর বিকাশের একটি পথ হলো সহাবস্থান। এই পরিবেশেই আমরা অপরকে ইসলামের দিকে আহ্বানের সুযোগ লাভ করি। এর অর্থ এই না যে, এক পক্ষই অপর পক্ষকে নিজের দিকে আহ্বান করবে। এর অর্থ পার্থিব ও ধর্মীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে গঠনমূলক আলোচনার সুযোগ সৃষ্টি করা।
সাহাবিগণ যথার্থই উপলব্ধি করেছিলেন যে, তাঁদের দ্বীন তাঁদের চারপাশের মানুষদের দ্বীন থেকে একেবারেই আলাদা। বিশ্বাস, ধর্মগ্রন্থ, ইবাদাতের পদ্ধতি—সবখানে এই পার্থক্য শক্ত শেকড় মেলে আছে। তবুও সেখানে অনেক বিষয়ে পরস্পরের মাঝে মিলও আছে। আর পার্থিব ব্যাপারে মিলের কথা তো বলাই বাহুল্য।
আমরা দেখি আল্লাহর বাণী:
قُلْ يَا أَهْلَ الْكِتَابِ تَعَالَوْا إِلَى كَلِمَةٍ سَوَاءٍ بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمْ أَلَّا نَعْبُدَ إِلَّا اللَّهَ وَلَا نُشْرِكَ بِهِ شَيْئًا وَلَا يَتَّخِذَ بَعْضُنَا بَعْضًا أَرْبَابًا مِّن دُونِ اللَّهِ ، فَإِن تَوَلَّوْا فَقُولُوا اشْهَدُوا بِأَنَّا مُسْلِمُونَ ﴿٦٤﴾
"বলো, 'হে কিতাবীগণ, তোমরা এমন কথার দিকে এসো, যেটি আমাদের মধ্যে ও তোমাদের মধ্যে সমান। আমরা একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কারো ইবাদাত না করি। আর তার সাথে কোনো কিছুকে শরীক না করি এবং আমাদের কেউ আল্লাহ ছাড়া কাউকে রব হিসাবে গ্রহণ না করি।'
তারপর যদি তারা বিমুখ হয়, তবে বলো, 'তোমরা সাক্ষী থাকো যে, নিশ্চয় আমরা মুসলিম।” (সূরাহ আলে ইমরান ৩:৬৪)
পৃথিবীতে যত মানুষ এসেছে বা আসবে, সবার চেয়ে রাসূলগণের ঈমান ছিল বেশি। তারপরও তাঁরা তাঁদের জাতির স্পষ্ট কাফির লোকগুলোর মাঝে বসবাস করেছেন। নূহ আলাইহিসসালাম তাঁর জাতির মাঝে ৯৫০ বছর বাস করেছেন। কুরআন বলে:
قَالَ رَبِّ إِنِّي دَعَوْتُ قَوْمِي لَيْلًا وَنَهَارًا ﴿٥﴾ فَلَمْ يَزِدْهُمْ دُعَائِي إِلَّا فِرَارًا ﴿٦﴾ وَإِنِّي كُلَّمَا دَعَوْتُهُمْ لِتَغْفِرَ لَهُمْ جَعَلُوا أَصَابِعَهُمْ فِي آذَانِهِمْ وَاسْتَغْشَوْا ثِيَابَهُمْ وَأَصَرُّوا وَاسْتَكْبَرُوا اسْتِكْبَارًا ثُمَّ إِنِّي دَعَوْتُهُمْ جِهَارًا ﴿٨﴾ ثُمَّ إِنِّي أَعْلَمْتُ لَهُمْ وَأَسْرَرْتُ لَهُمْ إِسْرَارًا ﴿9﴾ فَقُلْتُ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ إِنَّهُ كَانَ غَفَّارًا ﴿١٠﴾
"সে বলল, 'হে আমার প্রতিপালক! আমি তো আমার কওমকে রাত-দিন আহ্বান করেছি। অতঃপর আমার আহ্বান কেবল তাদের পলায়নই বাড়িয়ে দিয়েছে। আর যখনই আমি তাদেরকে আহবান করেছি যেন আপনি তাদেরকে ক্ষমা করেন, তারা নিজেদের কানে আঙুল ঢুকিয়ে দিয়েছে, নিজেদেরকে পোশাকে আবৃত করেছে, (অবাধ্যতায়) অনড় থেকেছে এবং দম্ভভরে ঔদ্ধত্য প্রকাশ করেছে। তারপর আমি তাদেরকে প্রকাশ্যে আহ্বান করেছি। অতঃপর তাদেরকে আমি প্রকাশ্যে এবং অতি গোপনেও আহ্বান করেছি। আর বলেছি, তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা চাও; নিশ্চয় তিনি পরম ক্ষমাশীল।” (সূরাহ নূহ ৭১:৫-১০)
নূহ আলাইহিসসালাম তাঁর জাতিকে ঈমানের দিকে দাওয়াহ দিয়েছেন, যৌক্তিক ও নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে বিতর্ক করেছেন ও তাদের সুস্থ বিবেকের কাছে আবেদন করেছেন। এ সবই সহাবস্থানের অংশ।
সহাবস্থানের অর্থ নিজের মতের স্বাধীনতা হারিয়ে ফেলা নয়, ধর্মত্যাগ তো নয়ই। আপনার ব্যক্তিগত বিশ্বাস আপনার পরিচয়ের অংশ। কেউ আপনাকে আপনার বিশ্বাস পরিবর্তনে জোর করার অধিকার রাখে না। যা থাকা উচিত নয়, তা হলো মানবতার উপর চেপে বসা দম বন্ধ করা গোঁড়ামি ও অমূলক উত্তেজনা। আমাদের দরকার উন্মুক্ত যোগাযোগসুবিধা, যেখানে আমরা উত্তম পদ্ধতিতে মানুষকে আহ্বান করতে পারব।
সহাবস্থান মানে নিজের মতের পক্ষে গোঁড়ামি ত্যাগ করা এবং অপরকে নিজের মত গ্রহণে বাধ্য না করা। নিজের বিশ্বাস পরিত্যাগ করা বা সবার কথাকে সমানভাবে সঠিক মনে করাও সহাবস্থানের অর্থ নয়।