📘 প্রিয় শত্রু! তোমাকে ধন্যবাদ > 📄 সমালোচনা ও আত্মনিয়ন্ত্রণ

📄 সমালোচনা ও আত্মনিয়ন্ত্রণ


সমালোচনায় যাতে অন্যের প্রতি অবিচার না হয়, তা ঠিক রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হলো আত্মসংযম। আবেগ আর দেমাগ যেন আপনার বিবেকের নিয়ন্ত্রক না হয়ে বসে।
অন্যের সাথে তর্কে বা খণ্ডনযুদ্ধে লিপ্ত থাকা থেকে নিজেকে বিরত রাখতে পারলে, ঠাণ্ডা মাথায় যেকোনো বিষয়ে দায়িত্বশীল লেখালেখি বা বক্তৃতা করা যায়। কিন্তু যখন সমালোচনার প্রসঙ্গ আসে, তখন অপর পক্ষের প্রতি আমাদের মনোভাব একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
মাথায় রাখতে হবে যে, কিছু কিছু পদ্ধতি সমালোচনার সঠিক তরিকা নয়। যেমন অপর পক্ষের ভুলের ফর্দ তুলে ধরা। এটা ব্যক্তি আক্রমণ ছাড়া কিছুই নয়। এছাড়াও কোনো বিষয়ে তাঁর মত স্পষ্ট জানা থাকলে শব্দচয়ন, কথার কথা বা বলার ভুল থেকে ভিন্ন অর্থ বের করে সমালোচনার বিষয় বানানো যাবে না। শুধু দোষ খুঁজে বেড়ানো অনুচিত। এটাও ব্যক্তি আক্রমণ।
একজন মুসলিম কখনোই অন্যকে অপদস্থ করার উদ্দেশ্যে দোষ খুঁজে বেড়ায় না। একবার উসমান রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর কাছে অভিযোগ এল যে, একদল লোক রাস্তায় জড়ো হয়ে মদপান আর হৈ-হুল্লোড় করছে। তিনি এর বিহিত করতে বেরিয়ে পড়লেন। ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখলেন তারা ততক্ষণে চলে গেছে। তিনি আল্লাহর প্রশংসা করলেন এবং তাদের খোঁজাখুঁজি না করে ফিরে এলেন।
মুসলিমদের পরবর্তী একজন শাসক মুয়াবিয়াহ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেন, "আল্লাহর রাসূল (ﷺ) আমাকে আদেশ করেছেন কখনোই মুসলিমদের গোপন দোষ খুঁজে খুঁজে বের করে উন্মোচন না করতে। কারণ এটা করার মাধ্যমে আমি তাদেরকে খারাপ বানিয়ে ফেলব।” [২৯]
নবিজি (*)-এর এই উপদেশ দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট করে দেয়:
১। মানুষের জীবন ও কাজকর্মের উপর গোয়েন্দাগিরি করে দোষ প্রকাশ করে দেওয়া যদি সমাজের নিয়ম হয়ে যায়, তাহলে মানুষ খুব খারাপভাবে একে অপরকে গালমন্দ করতে থাকবে। কেউ কেউ সত্য কথা বলবে তো বটে, তবে অনেকেই অজ্ঞতাবশত কথা বলবে। কেউ ন্যায়ানুগ আচরণ করবে আবার কেউ অন্যায় করে বসবে।
২। মানুষের দোষ প্রকাশ করে দিলে তারা আরো খারাপ হয়ে উঠবে। প্রত্যেকেই ভুল করে। কিন্তু এগুলোকে প্রকাশ করে দিলে মানুষ ভেবে বসবে ওটাই তার স্বভাব। তখন হয়তো সত্যিই সে সেটাকে স্বভাবে পরিণত করে ফেলবে। এই খারাপ দিকগুলোই তখন আড্ডা আর হাসি-তামাশার স্বাভাবিক বিষয় হয়ে যাবে।
সমালোচনার ক্ষেত্রে নবিজি (ﷺ)-এর এই উপদেশটি মনে রাখা উচিত। যেই ভুল নিয়ে কথা হচ্ছে, ততটুকুতেই সীমাবদ্ধ থাকতে হবে। বৈধ মতপার্থক্যকে ভুল বলে দাবি করা থেকেও বিরত থাকতে হবে। বরং ওই মতটির ভালো ও খারাপ দিকগুলো তুলে ধরতে হবে।
এখান থেকে সমালোচনার আরেকটি মূলনীতি প্রসঙ্গক্রমে চলে আসে। যেই মতের সমালোচনা করতে চাই, সেটিকে সঠিকভাবে ও সঠিক প্রসঙ্গসহকারে উপস্থাপন করতে হবে। প্রসঙ্গ ছাড়া উপস্থাপন করলে সেটি এমনিই ভুল মনে হবে। পারিপার্শ্বিকতা সহ দেখলে যেটাকে খুবই যৌক্তিক কথা মনে হতো, প্রসঙ্গ বাদ দিয়ে দিলে সেটাকেই মারাত্মক ভুল মনে হবে। সঠিক বক্তব্য আর শক্ত যুক্তির মধ্য থেকে একটি ভুল শব্দচয়ন বেছে নিয়ে সেটাকেই আলোচ্য বিষয় বানিয়ে ফেলা যাবে না।
দ্বীনি বিষয়ের বিতর্কে এটা আরো গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষত অপর পক্ষও যদি আপনার মতোই সত্যানুসন্ধানী হয়। ইবনু তাইমিয়া রহিমাহুল্লাহ লিখেছেন:
"নবিজি (ﷺ)-এর কথার উদ্দিষ্ট অর্থ বের করার জন্য কেউ কোনো ব্যাখ্যা উপস্থাপন করলে তাকে কুফরের অপবাদ দেওয়া যাবে না। তিনি কিয়াসে ভুল করলে তাকে গুনাহগারও বলা যাবে না। ব্যবহারিক দ্বীনি জ্ঞানের বিভিন্ন বিষয় আলোচনার ক্ষেত্রে এই সুপরিচিত মূলনীতি অধিকাংশ ব্যক্তিই অনুসরণ করে থাকেন। আকিদাহর বিষয়ে ভুল করা অসংখ্য মানুষকে কাফির বলে ঘোষণা করা হয়। নবিজি (ﷺ) সাহাবা ও তাঁদের অনুসারীদের মাঝে এই স্বভাব কখনোই দেখা যায়নি। সৎকর্মশীল পূর্বসূরি আলিমগণও এ কাজ করেননি। বরং প্রথম জামানার বিদআতিরা নিজেরাই এই কাজ করত।” [৩০]
ইসলামের বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাস বা অতীতের আলিমগণের লেখা বইপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করলে এমন কোনো বই পাবেন না, যেখানে একজন আলিম আরেকজন আলেমের ভুলের ফর্দ লিখে রেখেছেন। এমন তো না যে, কোনো আলিম কখনও ভুল করেননি এবং সেটা সংশোধনের উদ্দেশ্যে অন্যান্য আলিম বই লেখেননি বা বিতর্ক করেননি। দেখার বিষয় হলো তাঁদের সংশোধনের মধ্যমপন্থী পদ্ধতিটা। তাঁরা এমনভাবে একজন আরেকজনকে উপস্থাপন করতেন না, যা দেখে মনে হয় অপর ব্যক্তি তার ভুলত্রুটির জন্যই বিখ্যাত।
ফকিহ ইবনু হাযম আয-যাহিরির লেখাগুলোর কথাই ধরুন। অসাধারণ বুদ্ধিমান একজন আলিম, অনেকগুলো কাজে তাঁর মেধার দৃষ্টান্ত দেখা যায়। ইমাম আয-যাহাবির লেখা জীবনীভিত্তিক অভিধান 'সিয়ারু আ'লামিন নুবালা' গ্রন্থে এর কতগুলো দৃষ্টান্ত আলাদাভাবে তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু একইসাথে ইবনু হাযম এমন অদ্ভুত অদ্ভুত কিছু ভুল করেছেন, যা দেখে মনে হয় এমন একজন মানুষ এইসব ভুল কীভাবে করলেন! ইবনু হাযমের বুদ্ধিবৃত্তিক অর্জন নিয়ে কোনো বই সংকলন করা হলে তা হবে একজন কিংবদন্তী ইসলামি চিন্তাবিদের বর্ণনা। আবার শুধু ইবনু হাযমের ভুলগুলো সংকলন করেই একটি বই লিখা হলে মনে হবে যে, আক্ষরিক অর্থের বাইরে কিছু বোঝার মতো মেধা তাঁর ছিলই না।
আবু হামিদ আল-গাযালি সহ অন্যান্য আরো অনেক প্রখ্যাত আলিমের ব্যাপারেই একই কথা খাটে। এ কারণেই নবিজি (ﷺ) বলেছেন,
أَقِيلُوا ذَوِي الْهَيْئَاتِ عَثَرَاتِهِمْ إِلَّا الْحُدُودَ
"যাদের অনেক প্রশংসনীয় ব্যাপার আছে, তাদের ছোটখাটো ভুলগুলো উপেক্ষা করো, হদ্দের [৩১] অপরাধ ব্যতীত।” [৩২]
সমালোচনায় সততা বড় জরুরি। নিজের পছন্দ ও পক্ষপাতিত্ব বাদ দিয়ে ন্যায়বিচার ও সততার ইসলামি শিক্ষাগুলো মেনে চলতে হবে। কখনোই যেন সত্য বিকৃত করে কারো সাথে অবিচার না করি। মানী লোককে তার প্রাপ্য সম্মান দিতে হয়। বর্তমান সমাজে সংস্কারকর্মের অনেক দরকার আছে বটে। কিন্তু তা করতে হবে সততা ও দয়া সহকারে। শুধু ভুল ধরার জন্যই ভুল ধরা বা সেগুলোকে অযথা বড় করে দেখানো যাবে না। তবে কেউ আমাদের দ্বীনের অকাট্য বিষয়গুলোর বিপরীত কিছু বললে সে ব্যাপারে অবশ্যই যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে।
অনেকসময় মানুষ কিছু শেখা বা উপকৃত হওয়া ছাড়াই কোনো আলিম বা দাঈর লেখা বই পড়ে শেষ করে ফেলে। কিন্তু যখন ভুল ধরা বা খণ্ডন করার উদ্দেশ্যে পড়ে, তখন প্রতিটা শব্দ-বাক্য খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে খেয়াল করে।
মানুষকে সংশোধন করতে হলে নম্রভাবে করুন। নবিজি (ﷺ) বলেন,
إِنَّ الرِّفْقَ لَا يَكُونُ فِي شَيْءٍ إِلَّا زَانَهُ وَلَا يُنْزَعُ مِنْ شَيْءٍ إِلَّا شَانَهُ
“নম্রতা যাতেই প্রবেশ করে, সেটিকেই সুন্দর করে তোলে। আর এর অনুপস্থিতিতে তা হয়ে ওঠে কদর্য।”[৩৩]
নবি (ﷺ) আরো বলেন,
يَا عَائِشَةُ إِنَّ اللَّهَ رَفِيقٌ يُحِبُّ الرِّفْقَ وَيُعْطِي عَلَى الرِّفْقِ مَا لَا يُعْطِي عَلَى الْعُنْفِ وَمَا لَا يُعْطِي عَلَى مَا سِوَاهُ
"আইশা, আল্লাহ দয়ালু এবং তিনি দয়াশীলতা পছন্দ করেন। দয়াপ্রদর্শনকারীকে তিনি যা দেন, সীমালঙ্ঘনকারীকে তা দেন না। আমাদের দয়ার কারণে তিনি আমাদের এমন সব জিনিস দেন, যা অন্য কোনো কিছুর জন্য দেন না।” [৩৪]
আল্লাহ কুরআনে আমাদের উপদেশ দেন,
ادْعُ إِلَى سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ وَجَادِهُم بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ
“তুমি মানুষকে তোমার প্রতিপালকের পথে আহ্বান করো হিকমত ও সদুপদেশ দ্বারা এবং তাদের সাথে বিতর্ক করো সর্বোত্তম পন্থায়।” (সূরাহ আন-নাহল ১৬:১২৫)

টিকাঃ
[২৯] সুনান আবু দাউদ: ৪৮৮৮
[৩০] মিনহাজুস সুন্নাহ আন-নববিয়্যাহ: ৫/২৩৯০২৪০
[৩১] হুদুদ অর্থাৎ চোরের হাতকাটা, রজমের শাস্তি ইত্যাদি
[৩২] সুনান আবু দাউদ: ৪৩৭৫, সুনান আন-নাসাঈ আল-কুবরা: ৭২৯৪।
[৩৩] সহিহ মুসলিম: ২৫৯৪
[৩৪] সহিহ আল বুখারি:৬৯৭২, সহিহ মুসলিম: ২১৬৫

📘 প্রিয় শত্রু! তোমাকে ধন্যবাদ > 📄 নিরপেক্ষতা

📄 নিরপেক্ষতা


নিরপেক্ষতা হলো সঠিক মূল্যবোধের একটি অংশ। ভারসাম্যের আকাঙ্ক্ষা, ভিন্নতা মেনে নেবার মানসিকতা, বাস্তবসম্মত চিন্তাচেতনা, আর সবটুকু না জেনে পক্ষে নেয়ার অনীহা থেকেই নিরপেক্ষতার জন্ম। আমাদের সালাফরা বিশেষ এক বাচনভঙ্গিতে নিরপেক্ষতা প্রকাশ করতেন। তাঁরা বলতেন, "আমার জানা নেই।”
এমনকি তাঁদের কেউ কেউ এমনও বলেছেন, "জ্ঞানের অর্ধেক হলো 'আমার জানা নেই' বলতে পারা।” অথবা “যে 'আমার জানা নেই' বলা ছেড়ে দিয়েছে, সে জ্ঞানকে বিপদে ফেলে দিয়েছে।”
এই কথাটা অন্যভাবেও বলা যায়- “আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন।” এভাবে বললে পুরো ব্যাপারটা মীমাংসার ভার সত্যিকারের সর্বজ্ঞ সত্তার হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়ে গেল।
ইসলামি ধর্মতত্ত্ব ও শরিয়ত শাস্ত্রের আলিমগণ এটি বোঝাতে একটি শব্দ ব্যবহার করেন-তাওয়াক্কুফ (রায় স্থগিত)। অনেকসময় এমন হয় যে, কোনো বিষয়ে একাধিক মত বিধ্যমান এবং প্রত্যেক মতের পক্ষেই পর্যাপ্ত প্রমাণ রয়েছে। সেক্ষেত্রে একদম সঠিকটা বের করে আনার ব্যাপারে অপারগতা বা সতর্কতাবশত আলিমগণ তাওয়াক্কুফ করেন। এটা কোনো চূড়ান্ত রায় নয়, বরং আরো প্রমাণ পাওয়ার আগ পর্যন্ত একটি সাময়িক অবস্থান।
উমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু একবার মিম্বরে দাঁড়িয়ে বক্তব্য দেওয়ার সময় বলেন যে, "ওয়া ফাকিহাতাও ওয়া আব্বা” আয়াতে (সূরা আবাসা ৮০:৩১) 'আব্ব' শব্দটির অর্থ কী, এ ব্যাপারে তিনি সুনিশ্চিত নন। একই ঘটনা আবু বকর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর ব্যাপারেও বর্ণিত হয়েছে। সত্যি বলতে প্রত্যেক যুগের প্রত্যেক আলিমই কোনো না কোনো ব্যাপারে চূড়ান্ত রায় দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।
একবার এক ব্যক্তি রাসূল (ﷺ) এর কাছে এসে বলল, “হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় স্থান কোনটা?”
রাসূল (ﷺ) বললেন, “জিবরিলকে জিজ্ঞেস না করে বলতে পারব না।”
জিবরিল আলাইহিসসালাম রাসূল (ﷺ) কাছে এসে জানিয়ে দিলেন, “আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় স্থান মসজিদ আর সবচেয়ে অপ্রিয় স্থান বাজার।”[৩৫]
আজকালকার অনেক মানুষের স্বভাব এর একদম বিপরীত। জানুক বা না জানুক, প্রতিটা ব্যাপারে তাদের হুটহাট কিছু একটা বলাই লাগবে। এদের কথার যে কোনো মূল্য নেই, তা তারা নিজেরাও জানে। আরেকজনের প্রতি রাগের কারণেই কখনও কখনও এরা একেবারে বিপরীত একটা মত প্রদান করে। এক্ষেত্রে বিষয়টির সঠিক বুঝ অর্জন করে তবেই মুখ খোলাকে এরা পূর্বশর্ত বলে মনেই করে না। তারা একটা জিনিসের ভুল অর্থ বের করে নিয়ে সমালোচনা শুরু করে। কারণ ওই বিষয়ের ও তার প্রমাণগুলোর ব্যাপারে সূক্ষ্ম ও সঠিক বুঝ তাদের নেই।
মিডিয়ার কারণে সাধারণ মানুষ আরো বেশি দুঃসাহসী হয়ে উঠেছে। নীরবতা মানেই তাদের কাছে দুর্বলতা ও আত্মসম্মানহীনতা। যেকোনো বিষয়ে একটা না একটা মত দেওয়ার জন্য প্রচুর সামাজিক চাপ থাকে। হোক তা ধর্ম, রাজনীতি, অর্থনীতি, বা যেকোনো কিছু।
এমন পরিবেশে কেউ গতকাল কী মত দিয়েছে আর আজকে কী মত দিল, তা মনে রাখার সময় কারো নেই। এত হৈ-হুল্লোড়ের মাঝে কারো কথার অধারাবাহিকতা ধরাও পড়ে না। তার উপর কোনো বিষয় যতক্ষণ বিখ্যাত থাকে, ততক্ষণ মানুষকে বিভক্ত করে রাখে। প্রত্যেকেই হয় এই দল নাহয় ওই দলের সাথে। হয় আপনি 'পক্ষে', নয়তো 'বিপক্ষে'। মাঝামাঝি কিছু যেন থাকতে নেই। এরপর একে অপরকে খণ্ডন করার পেছনে মানুষ বিপুল পরিমাণ সময়, শ্রম ও সম্পদ নষ্ট করে। এই খণ্ডনযুদ্ধের পেছনে জ্ঞানের রসদ আবার খুব একটা থাকে না।
ইশ্য আসে, ইশ্য যায়। কোনো একটা বিষয়ে কথা শুরু হয়। প্রথমে দেখে মনে হবে এত মাথা ঘামানোর কিছু নেই। একটু পর দেখা যায় চারিদিকে সেটা নিয়েই কথা হচ্ছে। মানুষ সেটা নিয়ে এত ব্যস্ত হয়ে পড়ে যেন পৃথিবীতে আলোচনার ওই একটি বিষয়ই আছে। এটার ভিত্তিতে মানুষ শত্রু-মিত্র তৈরি করে নেয়। তারপর হঠাৎ একদিন সেটা নিয়ে আর কোনো কথা নেই। এসেছে নতুন ইশ্য, তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান। তাহলে আগের ইশ্যর পেছনে যে এতদিন তারা এত শ্রম, সময় আর আবেগ বিনিয়োগ করেছে, সেখান থেকে কী লাভ হলো?
তর্কের বিষয় যদি হয় ধর্মীয় কোনো ব্যাপার, তাহলে তো মানুষ কালামে পাক থেকে নিজের মতের পক্ষে দলীল টেনে বের করে। এভাবে তারা নিজেদের পরম নির্ভুলতার ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে যায়। নিজেদের ব্যাখ্যা ও উপলব্ধিকে তারা আল্লাহর অকাট্য বাণী ভেবে বসে।
খেয়াল করলাম পশ্চিমের কিছু কট্টর ডানপন্থী বলে, “হয় আপনি আমাদের পক্ষে, নয়তো আমাদের বিরুদ্ধে।” আর কিছু মুসলিম চরমপন্থীর অবস্থা এরচেয়ে ভয়াবহ। তারা বলে, “হয় আপনি আমাদের পক্ষে, নয়তো আল্লাহর বিরুদ্ধে!”
নিজেকে, অপরকে, আর আমাদের বিশ্বাস করা মূল্যবোধগুলোকে আমরা সম্মান করতে শিখব কবে? প্রিয় জিনিসগুলোকে তুচ্ছ বিতর্কে ব্যবহার করে সেগুলোর মর্যাদাহানি করবেন না। কোনো বিষয়ে আমাদের মত যদি সঠিক হয়ও, তবু সেটাকে হক-বাতিলের চিরন্তন দ্বন্দ্ব হিসেবে উপস্থাপন করার তো দরকার নেই।
আমাদের সালফে সালিহীনরা নিরপেক্ষতার যে নীতি মেনে চলতেন, আমাদের এ আচরণ তা থেকে একেবারেই আলাদা।

টিকাঃ
[৩৫] মুসনাদ আহমাদ: ১৬৭৪৪

📘 প্রিয় শত্রু! তোমাকে ধন্যবাদ > 📄 এ পথ, ও পথ

📄 এ পথ, ও পথ


জীবনে প্রডাক্টিভ কিছু পেতে চাইলে সে পথে অগ্রসর হওয়ার পদ্ধতি জানতে হয়। চলার পথের বাধা-বিপত্তি সম্পর্কে ধারণা রাখতে হয়। অনেক মানুষ এমন আছে যে, গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ শুরু করে ঠিকই, কিন্তু পরে আর চালিয়ে যেতে পারে না। কোনো না কোনো সমস্যা এসে তাদের শুরুর উদ্যম নষ্ট করে দেয়। কেউ সমালোচনা নিতে পারে না। কেউ পরিবার বা পেশা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। কেউ এমনিই মনোযোগ হারিয়ে ফেলে। একটা বিষয়ে বেশিদিন আগ্রহ ধরে রাখতে পারে না।
অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায় যে, পরিশ্রমী মানুষেরা দুটি পথের যেকোনো একটি বেছে নেয়। এই সিদ্ধান্তের উপরই তাদের সাফল্য নির্ভর করে। একটি পথে উত্তরোত্তর সাফল্য, আরেকটায় শুধুই হতাশা।
১। সূর্যের পানে চলো
এটা সাফল্যের রাজপথ। উদ্যোগ, অগ্রীম ভাবনা, ও মনোযোগের পথ। এই পথে থাকার অর্থ ঘন ঘন পেছনে না তাকানো। এর অর্থ অন্যেরা কী বলল বা করল, সে ব্যাপারে মাথা না ঘামানো। ভুল আপনার হতেই পারে, কিন্তু সে ভুল আপনাকে থামিয়ে দেবে না। বরং চেষ্টা-পরিশ্রম বাড়িয়ে দিয়ে আপনি সেই ভুল সংশোধন করে নেবেন। আলোচনা-বিতর্ককে আপনি এতটাও বাড়তে দেবেন না, যার ফলে কাজে ব্যাঘাত ঘটতে পারে।
একজন সালাফের ব্যাপারে বর্ণনা এসেছে যে, এক অলস লোক একবার তাঁর সাথে কথা বলার উদ্দেশ্যে তাঁর কাজ থামিয়ে দিতে চাইল। তিনি সেই অকর্মাকে বললেন, “সূর্যের পানে চলো।”[৩৬]
এখান থেকেই আমি এ অংশের শিরোনামটি নিয়েছি। প্রোডাক্টিভ কাজে যথাসম্ভব বেশি সময় বিনিযোগ করতে হবে। এর অর্থ এই না যে, আপনি গঠনমূলক সমালোচনাকে আমলেই নেবেন না। কেউই ভুলের ঊর্ধ্বে না। আপনার ভুল সংশোধনের উদ্দেশ্যে সমালোচনা করার অধিকার অন্যদের আছে। সেইসাথে প্রত্যেকের প্রত্যেকটা কথার জবাব দেওয়ারও আবার কোনো দরকার নেই। কাজের কাজ করতে গেলে ঐক্যমত্যে সম্মতির দরকার হয় না। আপনার কথা আপনি বলুন, অন্যদেরকে তাদের কথা বলতে দিন। সময়ই বলে দেবে কার কথা বেশি সঠিক ছিল। সময়ের আবর্তনে অনেক পরামর্শ আর তর্ক একেবারেই নিষ্ফল বলে প্রমাণিত হয়। কিছু বিষয় নির্দিষ্ট কিছু পরিস্থিতিতে কার্যকর হলেও বাকি সব পরিস্থিতিতে অকার্যকর হয়ে পড়ে।
সূর্যের পানে চলার অর্থ চলার পথে সামনের দিকে মনোযোগ ধরে রাখা। সাফল্য আরো কতটা বাড়ানো যায়, নতুন নতুন কোন সুযোগ কাজে লাগানো যায়, সে চিন্তায় মগ্ন থাকা। এর অর্থ একই জিনিস বারবার আলোচনা করার প্রবণতা কমানো, কাজটা ঠিক হবে কি হবে না এ নিয়ে ইতস্তত ভাব কমিয়ে আনা। একটা জিনিস ঠিক না বেঠিক, তা নিশ্চিতভাবে জানতে পারার জন্য একটু সময় দরকার হয়।
২। চক্রাকারে ঘুরে বেড়ানো
এটি দ্বিতীয় পথ। চিন্তাবিদ, কর্মী, লেখক যে কেউই এ পথে থাকুক না কেন, সে একই কাজ বারবার করতে থাকে। সে সব আপত্তির জবাব দেয়, সারাক্ষণ নিজের পক্ষে সাফাই গায়। এই পথের পথিকরা অন্যদের প্রতি অতিরিক্ত মনোযোগ দেয়। শুধু তা-ই না, তাদের বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগও করে নেয়। কাউকে নিষ্ঠাহীন, কাউকে হিংসুক, কাউকে নিষ্ঠাবান শ্রেণিতে রাখে। এই পথিকরা যেহেতু চারপাশের মানুষগুলোর সাথে চিরকাল বুদ্ধিবৃত্তিক আর মৌখিক যুদ্ধে লিপ্ত থাকে, সেহেতু তাদের শত্রু-মিত্র চিহ্নিত করে নিতে হয়।
কিন্তু ব্যক্তির দৃষ্টিভঙ্গি, হৃদয় আর জীবন চলার পথে এই ক্লান্তিকর বিতর্কের নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এই মানুষগুলো একটি কাজের পেছনেই এত সময় ব্যয় করে ফেলে যে, তা আর কখনো শেষই হয় না। বিতর্ক করা আর সাফাই গাওয়ার পেছনে অনেক সময়-শ্রম চলে যায়। ছোট পরিসরের মধ্যম গুরুত্বের একটি প্রকল্পই চিরকাল চলতে থাকে। এমনকি সত্যিকারের গুরুত্বপূর্ণ কাজেও দরকারের চেয়ে বেশি সময় দেওয়া ঠিক না। তর্ক আর সাফাইয়ের পেছনে খরচ হওয়া সময় একেবারেই অনর্থক।
এই ফাঁদে পড়াটা দুর্ভাগ্য। স্বেচ্ছায়, অতি আবেগে, প্রতিযোগিতার উত্তেজনায় এ সমস্যা হয়। কিন্তু এতসব পরিশ্রমে সত্যিকারের কোনো ফলাফল আসে না।
আমাদের শক্তি আর সময় একেবারেই সীমিত। (সাধারণত জীবনের প্রডাক্টিভ সময় হলো ২০ থেকে ৫০ বছর বয়স)। একবার এটি উপলব্ধি করতে পারলেই আমরা আর এদিক-সেদিকে মনোযোগ দেবার আগ্রহ পাব না। তখন খাদ থেকে উঠে এসে দ্রুত গঠনমূলক কাজে লেগে যাব। নিন্দুকদের বেশি পাত্তা দিতে হবে না, তাদের নিয়ে অভিযোগও করা যাবে না। তাদের ব্যাপার আল্লাহর হাতে ছেড়ে দিন।
وَمَا رَبُّكَ بِظَلَّامٍ لِلْعَبِيدِ
“নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর বান্দাদের উপর কখনও জুলুম করেন না।” (সূরাহ ফুসসিলাত ৪১:৪৬)
সত্যিকারের সমালোচনা কখনো একটি ভালো পরিকল্পনাকে ধ্বংস করে দেয় না। বরং একে শক্তিশালী করে, এর সঠিকতা নিশ্চিত করে, এতে পরিপক্কতা আনে। এ ধরনের সমালোচনার উদ্দেশ্য থাকে ধারণাটির দুর্বল দিকগুলো মেরামত করা। কোনো পরিকল্পনার কার্যকারিতা অস্পষ্ট হলে গঠনমূলক সমালোচনার মাধ্যমে এর শক্তি ও দুর্বলতাগুলো সামনে আসে।
এই দ্বিতীয় পথে আসার একটি প্রধান কারণ হলো অহংকার। নিজেকে সঠিক প্রমাণ করাই লাগবে, এরকম মনোভাবের কারণে মানুষ গুরুত্বপূর্ণ ও প্রডাক্টিভ কাজ ফেলে বিতর্ক আর সাফাইয়ে আত্মনিয়োগ করে।
এই গেল দুটি পথের আলোচনা। একইসাথে দুটি পথ অনুসরণ করার আশা করাটা বোকামি। আপনার একটিই পাকস্থলি। অস্বাস্থ্যকর খাবার আর পানীয় গ্রহণ করতে থাকলে স্বাস্থ্যকর খাবারের জন্য আর জায়গা থাকবে? তেমনি সারাটা সময় যদি অন্যদের কথা নিয়ে পড়ে থাকেন, তাদের আপত্তিগুলো নিয়ে গবেষণা করেন, পাল্টা জবাব লিখতে থাকেন, তাহলে আর কিছু করার সময় পাবেন? অপ্রয়োজনীয় কাজে জীবনের মূল্যবান সময়গুলো চলে যেতে থাকবে।
মনে রাখবেন, অন্যের আপত্তি খণ্ডন করাটা খুব অল্প ক্ষেত্রেই সঠিক কাজ হিসেবে গণ্য হয়। কারণ এর মাধ্যমে তো আপনার কোনো উন্নতি হচ্ছে না। এখন যে জায়গায় আছেন, সেটাকেই রক্ষা করে চলেছেন। ফলে আপনার চিন্তাচেতনার উন্নতি-উৎকর্ষ খুব একটা আর হয় না। বরং একটু সময় নিয়ে আবেগকে থিতিয়ে আসতে দিন। নিরপেক্ষতার সাথে এবং উপকৃত হওয়ার মানসে সব দিক বিবেচনা করার মতো শান্ত পরিস্থিতি আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করুন। তার আগ পর্যন্ত যে কাজ করছিলেন, তা চালিয়ে যান।
لَيْسَ عَلَى الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ جُنَاحٌ فِيمَا طَعِمُوا إِذَا مَا اتَّقُوا وَّآمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ ثُمَّ اتَّقَوا وَّآمَنُوا ثُمَّ اتَّقَوا وَأَحْسَنُوا وَاللَّهُ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ ٩٣
"যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছে ও সৎকর্ম করেছে; তারা ভবিষ্যতের জন্য সংযত হলে, বিশ্বাস স্থাপন করলে ও সৎকর্ম করলে পূর্বে যা ভক্ষণ করেছে, তার জন্য দোষী হবে না। অতএব, সংযত থাকো, বিশ্বাস স্থাপন করো এবং সৎকর্ম করতে থাকো। আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।” (সূরাহ আল-মায়িদাহ ৫:৯৩)

টিকাঃ
[৩৬] ঘটনাটি আমির বিন কায়সের নামে প্রচলিত। দেখুন: ইবনুল জাওযি, আত-তাবসিরাহ ২/৩১৫

📘 প্রিয় শত্রু! তোমাকে ধন্যবাদ > 📄 অস্থির মানসিকতা

📄 অস্থির মানসিকতা


জীবনে সমস্যা থাকেই। বর্তমান মুসলিম বিশ্বের অধিবাসীদের জন্য এ কথা আরো বেশি সত্য। এই লেখাটি লেখার সময় বিশ্বে চলমান ত্রিশটি যুদ্ধের মধ্যে আটাশটিই সংঘটিত হচ্ছে মুসলিম বিশ্বে। বিশ্বের নানা প্রান্তের মানুষ নানারকম সমস্যায় জর্জরিত, এটি অস্বীকার করার উপায় নেই। পার্থক্য হলো অন্যান্য জায়গার সমস্যাগুলো শক্তিমত্তা আর প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ফল, যেখানে আমাদের মুসলিম বিশ্বের সমস্যাগুলো দুর্বলতা আর প্রযুক্তিগত পশ্চাৎপদতার ফল।
এই তিক্ত সত্য আমাদের মাঝে এক মানসিক অস্থিরতার জন্ম দেয়। এতে আমাদের চিন্তাপদ্ধতি আর চারপাশকে বোঝার ক্ষমতা প্রভাবিত হয়। সেইসাথে ঘরের ও বাইরের মানুষদের সাথে আমাদের সম্পর্কেও প্রভাব পড়ে।
সমস্যা ও সংকটগুলোকে প্রসঙ্গের বাইরে নিয়ে অযথা বড় করে দেখাটা আরো বড় একটি সমস্যা, মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা। এ অবস্থায় জীবনে ঘটে যাওয়া অন্যান্য ইতিবাচক জিনিসগুলো উপেক্ষা করা হয়। বিদ্যমান সুযোগগুলো তো চোখ এড়িয়ে যাবেই, সংকটকে সুযোগে পরিণত করার বুদ্ধিও মাথায় আসবে না।
সংকীর্ণ দৃষ্টি নিয়ে সমস্যার দিকে তাকাতে গিয়ে বৃহত্তর চিত্রটির ব্যাপারে আমরা অজ্ঞ থেকে যাই। ফলে সংকটকে যথাযথভাবে মোকাবেলা করতে পারি না। এই ভারসাম্যহীন দৃষ্টীভঙ্গিই অস্থির মানসিকতার জন্ম দেয়। এ এক মারাত্মক রোগ। কোনো সমস্যা বা সংকটের সত্যিকার স্বরূপ বুঝতে পারা এক জিনিস। আর ওই সমস্যাকেই কিয়ামত ভেবে সেটার পেছনেই জীবন ধ্বংস করে ফেলা আরেক জিনিস।
সময়ের আবর্তনে একসময় বোঝা যায় সমস্যাটির স্থায়িত্ব আসলে কতটুকু। সমস্যার ভেতর দিয়ে যাবার সময় মানুষ সেটাকে কত বড় ভেবেছিল আর বাস্তবেই সেটা কতটা বড়, এ দুটির মাঝে অবশ্যই পার্থক্য আছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মানুষ সেটাকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে দেখে। আর মনোযোগকামী মিডিয়া কীভাবে সেটা উপস্থাপন করে, তা তো বলাই বাহুল্য।
ইরাক সংকটসহ আরো অন্যান্য বৈশ্বিক সমস্যা যেন বৃহত্তর সমস্যার কথা আমাদের ভুলিয়ে না দেয়। আর তা হলো পশ্চাৎপদতা, দুর্বলতা ও অপদস্থতার সমস্যা।
অস্থির মানসিকতা প্রকাশ পায় একগুঁয়েমি, গোঁড়ামি ও অসহিষ্ণুতার মাধ্যমে। আমরা সমালোচনা গ্রহণ করতে, সংশোধিত হতে ও ভুল স্বীকার করতে অপারগ হয়ে যাই। অন্যান্য দৃষ্টিভঙ্গির সাথে আমরা শত্রুতা লাগিয়ে দিই আর ভালো কাজে পরস্পর সহযোগিতা করতে ভুলে যাই। অস্থির মানসিকতা পর্যালোচনামূলক চিন্তাধারার জন্য ক্ষতিকর। সঠিকভাবে কারণ ও ফলাফল বোঝার ক্ষমতা তখন থাকে না। সমস্যার পেছনের মূল অনুঘটকগুলো খুঁজে বের করতে আলস্য বোধ হয়।
অস্থির মনমানসের কাছে ধূসর বলে কিছু নেই, সবই সাদা নয়তো কালো। “হয় আপনি আমাদের পক্ষে, নয়তো আমাদের বিরুদ্ধে।” সমঝোতা ও আংশিক সমাধানকে গ্রহণযোগ্য মনে করা হয় না। এ থেকে জন্ম নেয় গোঁয়ার্তুমি, আর অসম্ভব হয়ে পড়ে ইতিবাচক সংস্কার। ব্যক্তিগত বুঝকে বানানো হয় ধ্রুব সত্য। এই মানসিকতার দুটি লক্ষণ হলো-অভিযোগপ্রবণতা আর তুচ্ছ বিষয়ে অতি আগ্রহ। মানুষ যৌক্তিক চিন্তাভাবনা করে সমস্যার গোড়ায় না পৌঁছে যাকে-তাকে বলির পাঁঠা বানিয়ে ফেলে।
এই মানসিকতা যে সমাজে ছড়িয়ে পড়ে, সেখানে সারাক্ষণই নাগরিক অসন্তোষ, মতবিরোধ আর ব্যাপক অবিচার ছড়িয়ে পড়ে। মানুষ একজন আরেকজনের শ্রম পণ্ড করে দেয়। ফলে যোগফল বেশিদূর এগোয় না। ব্যর্থতা ছড়িয়ে পড়ে মহামারির মতো। অর্থনীতি, পরিবার, ব্যবসা, লোকপ্রশাসন, বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি, মানসিক স্বাস্থ্য সবকিছুই আক্রান্ত হয়।
অস্থির মানসিকতার রোগীদের মূল সমস্যা হলো নিজেদের ভুল বুঝতে না পারায় সংস্কারের কোনো ইচ্ছে পোষণ না করা। তাদের অজ্ঞতা বড় জটিল। কোনটা সঠিক, তা তা জানে না; তারা যে জানে না, সেটাও তারা জানে না।
কুরআন আমাদের শিক্ষা দেয় নিজেদের জ্ঞানের ব্যাপারে বিনয়ী হতে এবং সবসময় হিদায়াত কামনা করতে। আমরা প্রতি ওয়াক্তে সূরাহ আল-ফাতিহায় পড়ি, “আমাদের সরল পথ প্রদর্শন করুন।” (সূরাহ আল-ফাতিহা ১:৫)
আমরা নিজেদের জ্ঞান নিয়ে নিশ্চিন্ত থাকতে অস্বীকৃতি জানাই। নিজের বুঝ নিয়ে সন্তুষ্ট হয়ে গেলেই স্থবিরতা সৃষ্টি হয়, বুদ্ধিবৃত্তিক অগ্রগতি থমকে দাঁড়ায়। আল্লাহ আমাদের এ থেকে রক্ষা করুন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00