📄 চলতি চিন্তাধারা
আমাদের মসজিদে মুয়াজ্জিন সাহেব একবার ইমামতি করলেন। তো তিনি ভুলে পঞ্চম রাক'আতের জন্য দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন। কিছুক্ষণ এভাবেই পার হয়ে গেল। তারপর একজন মুসল্লি যথেষ্ট সাহস সঞ্চয় করে বললেন, “সুবহানআল্লাহ!” তার দেখাদেখি বাকি মুসল্লিরাও এ কথা বলতে শুরু করলেন। ইমাম তখন ভুল হয়েছে টের পেয়ে সাহু সিজদাহ দিয়ে সালাত শেষ করলেন।
আমি ভাবনায় পড়ে গেলাম। একজন লোক সুবহানআল্লাহ বলার আগ পর্যন্ত বাকিরা চুপ করে ছিলেন কেন? আসলে ইমাম ভুল করেছেন কি না, এ ব্যাপারে তারা শতভাগ নিশ্চিত ছিলেন না। ওই এক ব্যক্তির “সুবহানআল্লাহ” শুনে বাকিরা নিশ্চিত হয়েছেন এবং তার সাথে যোগ দিয়েছেন। এভাবে একজনের কথা বাকিদের সাক্ষ্যের মাধ্যমে সত্যায়িত হলো। অন্যরা না বললে ইমাম হয়তো একজনের “সুবহানআল্লাহ” বলাকে উপেক্ষা করে সাহু সিজদাহ না দিয়ে পাঁচ রাক'আতই পড়ে ফেলতেন।
এ ধরনের ভুল শুধু সালাতেই না, বিচার-আচার বা মতামতের ক্ষেত্রেও হতে পারে। ধরুন সমাজে কোনোভাবে একটি ভুল ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। অনেকের মনেই এটার ব্যাপারে সন্দেহ হচ্ছে, কিন্তু ভয়ে কেউ কিছু বলছে না। অনেক বছর পরে কেউ একজন সাহস করে স্পষ্ট দলীল ও যুক্তি দিয়ে ওই ভুল ধারণার বিপক্ষে কথা বলল। এতদিন চুপ করে থাকা মানুষগুলোও সাথে সাথে এসে যোগ দিল। বলল, “বিশ্বাস করুন, আমাদের মনেও অনেকদিন যাবত এই কথাগুলো ঘুরপাক খাচ্ছিল। কিন্তু অন্যদের বিরোধিতার ভয়ে মুখ ফুটে কিছু বলতে পারিনি। আজ আপনার প্রতিবাদ দেখে নিশ্চিত হলাম যে, আমরা ঠিকই ভাবছিলাম।”
আবার কারো কোনো মতামত কালের আবর্তনে হারিয়ে যেতে পারে। সেটির পক্ষে বিশ্বাসযোগ্য যুক্তি-প্রমাণ না পাওয়ায় কেউ হয়তো সেটার কথা তোলেও না। অথবা সত্যি বলতে তারা জানেই না যে, এর পক্ষে যুক্তি-প্রমাণ থাকতে পারে। এ কারণেই কিছু মতামত বা ধারণা কিছুদিন প্রচারিত হওয়ার পর স্তিমিত হতে হতে একসময় হারিয়ে যায়।
আদর্শের যারা প্রচার করেন তাঁরা নতুন ও কল্যাণকর ধারণাগুলোর স্থায়িত্বের সম্ভাবনা বাড়াতে দুটি কাজ করতে পারেন:
১। কেবল পরিচিত জিনিসেই সন্তুষ্ট হয়ে যাওয়া এবং অপরিচিত জিনিসকে ঘৃণা করার প্রবণতা দূর করতে হবে। এটি অন্যতম একটি নেতৃত্বগুণ। পরিচিতি কখনোই বুদ্ধির জগতে গ্রহণ বা বর্জনের একমাত্র মানদণ্ড হতে পারে না। পরিচিত ও আরামদায়ক জিনিস আঁকড়ে ধরে থাকা যেমন খারাপ, নতুন কিছু একটা পেলেই তা গিলে নেয়াও একইরকম খারাপ। উভয়ক্ষেত্রেই 'পরিচিত'কে খুব বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। চিন্তাজগতের উপর এর প্রভাবের ব্যাপারে সচেতন থাকতে হবে এবং তা যথাসম্ভব কমিয়ে আনতে হবে।
২। নতুন ধারণা উপস্থাপন করার এবং এর মাধ্যমে প্রগতিশীল ও দৃশ্যমান পরিবর্তন নিয়ে আসার সাহস থাকতে হবে। আদর্শপ্রচারকরা প্রায়ই এত দ্রুত পরিবর্তন আশা করেন, যা একেবারেই অবাস্তব। এছাড়া যথেষ্ট বিশ্বাসযোগ্য করে উপস্থাপন করতে না পারলে অচিরেই তা হারিয়ে যাবে। আদর্শের নেতারাই যদি সেটির প্রতি যথেষ্ট বিশ্বাসী না হন এবং সেটিকে কাজে অনূদিত করতে না জানেন, তাহলে পরিবর্তন আসবে কী করে? আদর্শ তো তখন চায়ের কাপেই ডুবে মারা যাবে।
রাসূল (ﷺ)-কে আল্লাহ বলেন,
وَإِن كَانَ كَبُرَ عَلَيْكَ إِعْرَاضُهُمْ فَإِنِ اسْتَطَعْتَ أَن تَبْتَغِيَ نَفَقًا فِي الْأَرْضِ أَوْ سُلَّمًا فِي السَّمَاءِ فَتَأْتِيَهُم بِآيَةٍ : وَلَوْ شَاءَ اللَّهُ لَجَمَعَهُمْ عَلَى الْهُدَى، فَلَا تَكُونَنَّ مِنَ الْجَاهِلِينَ ﴿٣٥﴾ إِنَّمَا يَسْتَجِيبُ الَّذِينَ يَسْمَعُونَ وَالْمَوْتَى يَبْعَثُهُمُ اللَّهُ ثُمَّ إِلَيْهِ يُرْجَعُونَ ﴿٣٦﴾
"তাদের প্রত্যাখ্যান যদি আপনাকে ব্যথিত করে, তাহলে জেনে রাখুন। আপনি জমিনের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে বা আসমানে আরোহণ করে একটি নিদর্শন নিয়ে এলেও তারা প্রত্যাখ্যানই করত। আল্লাহ চাইলে তাদের সকলকে সুপথে একত্রিত করতেন। অতএব, অজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত হবেন না। যারা (সত্যিকার অর্থেই) শ্রবণ করে, নিশ্চিত থাকুন, তারা গ্রহণ করবে। আর মৃতদের আল্লাহ পুনরুত্থিত করবেন। তারপর তারা তাঁর দিকেই প্রত্যাবর্তিত হবে।” (সূরাহ আল-আন'আম ৬:৩৬-৩৬)
নবি মুহাম্মাদ (ﷺ) আসলেই এক সফল আদর্শপ্রচারকের উদাহরণ। আল্লাহর ইচ্ছায় তিনি মানুষের অন্তর খুলে দিয়েছেন, তাদের অজ্ঞতা দূর করেছেন, এবং ভুল ধারণা সংশোধন করেছেন। প্রচারিত শিক্ষাকে তিনি এক বাস্তবসম্মত জীবনব্যবস্থা হিসেবে তুলে ধরেছেন।
📄 যাহা বলিব, ন্যায় বলিব
ইসলাম আমাদের শেখায় কীভাবে অন্যের ব্যাপারে কথা বলতে হয়। নৈতিক ও ন্যায়পরায়ণ আচরণে কথা বলতে হবে। নিজের ব্যাপারে বা নিকটজনের ব্যাপারে কিছু বলতে হলেও ন্যায়ের সাথে বলতে হবে।
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُونُوا قَوَّامِينَ بِالْقِسْطِ شُهَدَاءَ لِلَّهِ وَلَوْ عَلَى أَنفُسِكُمْ أَوِ الْوَالِدَيْنِ وَالْأَقْرَبِينَ ، إِن يَكُنْ غَنِيًّا أَوْ فَقِيرًا فَاللَّهُ أَوْلَى بِهِمَا
“হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকো। আল্লাহর ওয়াস্তে ন্যায়সঙ্গত সাক্ষ্য প্রদান করো, যদিও তা তোমাদের নিজেদের বা পিতামাতা বা আত্মীয়ের বিরুদ্ধে হয়। তারা ধনী হোক বা দরিদ্র, আল্লাহই তাদের উত্তম রক্ষাকারী।” (সূরাহ আন-নিসা ৪:১৩৫)
এমনকি যাদের সাথে বিরোধ বা ঘৃণার সম্পর্ক বিদ্যমান, তাদের সাথেও মুসলিমদের ন্যায়সঙ্গত কথা বলতে হবে। আল্লাহ বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُونُوا قَوَّامِينَ لِلَّهِ شُهَدَاءَ بِالْقِسْطِ وَلَا يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَآنُ قَوْمٍ عَلَى أَلَّا تَعْدِلُوا
"হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে ন্যায় সাক্ষ্যদানের ব্যাপারে অবিচল থাকবে এবং কোনো সম্প্রদায়ের শত্রুতার কারণে কখনো ন্যায়বিচার পরিত্যাগ কোরো না।” (সূরাহ আল-মায়িদাহ ৫:৮)
এমনকি মুসলিমদের দেশছাড়া করা মুশরিক মক্কাবাসীদের সাথেও আল্লাহ ন্যায়বিচারের হুকুম দিয়েছেন। তিনি বলেন,
وَلَا يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَآنُ قَوْمٍ أَن صَدُّوكُمْ عَنِ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ أَن تَعْتَدُوا، وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَى وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ
“যে সম্প্রদায় তোমাদের পবিত্র মসজিদে যেতে বাধা দিয়েছিল, তাদের প্রতি শত্রুতাবশত তোমরা যেন সীমালঙ্ঘন না করে ফেলো। সৎকাজ ও আল্লাহভীতিতে পরস্পরকে সহযোগিতা করো। আর পাপাচার ও সীমালঙ্ঘনে পরস্পরকে সহযোগিতা কোরো না। আল্লাহকে ভয় করো। তিনি কঠোর শাস্তিদাতা।” (সূরাহ আল-মায়িদাহ ৫:২)
মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত সম্প্রদায়ের সাথেও ন্যায়ানুগ আচরণ করতে হবে। আল্লাহ মুসলিমদের সীমালঙ্ঘন করতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেন:
وَقَاتِلُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ الَّذِينَ يُقَاتِلُونَكُمْ وَلَا تَعْتَدُوا إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْمُعْتَدِينَ (১৯০)
“যারা তোমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে, তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করো; কিন্তু সীমালঙ্ঘন কোরো না। নিশ্চয় আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদের পছন্দ করেন না।” (সূরাহ আল-বাকারাহ ২:১৯০)
নিঃসন্দেহে আল্লাহ সর্বাবস্থায় ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা ফরজ করেছেন। অন্যের ব্যাপারে কথা বলাও এর অন্তর্ভুক্ত। নিজের ব্যাপারে হোক বা পরের ব্যাপারে, মুসলিমের ব্যাপারে হোক বা কাফিরের ব্যাপারে, বড় বিষয়ে হোক বা ছোট বিষয়ে, সবসময় ন্যায়সঙ্গত কথা বলতে হবে।
ইবনু তাইমিয়াহ রহিমাহুল্লাহ লিখেছেন, “ন্যায়বিচার সকলের উপর ফরজ। সবার উপর, সর্বাবস্থায়, সকল স্থানে, সকল সময়ে তা প্রযোজ্য। অবিচার সকলের উপর হারাম। কারো উপর, কোনো অবস্থায়, কোনো স্থানে, কোনো কালে অবিচার করা যাবে না।"
কথাবার্তায় ন্যায়ানুগ হওয়ার প্রধানতম একটি মূলনীতি হলো ঢালাও মন্তব্য পরিহার করা। ঢালাও মন্তব্যের ফলে ভেতরকার অনেক ব্যতিক্রম ও মতপার্থক্যকে উপেক্ষা করা হয়। ব্যক্তিগত দায়দায়িত্বের উপর ইসলাম যে পরিমাণ গুরুত্ব দেয়, তার দাবি হলো প্রত্যেকে নিজ নিজ মত, কথা ও কাজের ব্যাপারে নিজেই সরাসরি দায়ী। একই বর্ণের বা একই সম্প্রদায়ের অন্য কারো কথা বা কাজের জন্য সে নিজে দায়ী হবে না। আল্লাহর কাছেও দায়ী হবে না, মানুষের কাছেও না।
আল্লাহ বলেন,
وَكُلَّ إِنسَانٍ أَلْزَمْنَاهُ طَائِرَهُ فِي عُنُقِهِ وَنُخْرِجُ لَهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ كِتَابًا يَلْقَاهُ مَنشُورًا ﴿١٣﴾
“আর আমি প্রত্যেকের আমলনামা তার তার ঘাড়ে সংযুক্ত করে দিয়েছি। আর কিয়ামতের দিন আমি তার জন্য বের করে আনব উন্মুক্ত এক কিতাব।” (সূরাহ আল-ইসরা ১৭:১৩)
كُلُّ امْرِئٍ بِمَا كَسَبَ رَهِينٌ
“প্রত্যকে নিজ নিজ কৃতকর্মের জন্য দায়ী।” (সূরাহ আত-তূর ৫২:২১)
আল্লাহ আমাদের হুকুম করেছেন সবার সাথে সদাচরণ করতে, কারণ তা ন্যায়বিচার বাস্তবায়নের অধিক নি কটবর্তী।
وَقُولُوا لِلنَّاسِ حُسْنًا
“আর মানুষকে উত্তম কথা বলো।” (সূরাহ আল-বাকারাহ ২:৮৩)
অন্যদের সত্যের দিকে আহ্বান জানানোর সময়ও দয়ালু আচরণ করতে হবে:
ادْعُ إِلَى سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ وَجَادِهُم بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ إِنَّ رَبَّكَ هُوَ أَعْلَمُ بِمَن ضَلَّ عَن سَبِيلِهِ وَهُوَ أَعْلَمُ بِالْمُهْتَدِينَ ﴿١٢٥﴾
“তুমি মানুষকে তোমার প্রতিপালকের পথে আহ্বান করো হিকমাত ও সদুপদেশ দ্বারা এবং তাদের সাথে বিতর্ক করো সর্বোত্তম পন্থায়। তোমার প্রতিপালক ভালো করেই জানেন কে তাঁর পথ ছেড়ে বিপথগামী এবং কে সুপথে আছে।” (সূরাহ আন-নাহল ১৬:১২৫)
মুসলিমদের চিন্তাচেতনায় এর এক ইতিবাচক প্রভাব পড়ার কথা, যার ফলে তারা সর্বদা ন্যায় ও সাম্যের ভিত্তিতে আচরণ করবে। মুসলিম অপরের প্রতি দয়ালু হবে। রাসূল প্রেরণের অন্যতম একটি উদ্দেশ্য হলো সকলের প্রতি দয়া। আল্লাহ বলেন,
وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِلْعَالَمِينَ ﴿١٠٧﴾
“আমি তো আপনাকে সমগ্র জগতের জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেছি।” (সূরাহ আল-আম্বিয়া ২১:১০৭)
দয়া এক মহৎ গুণ। এটি আল্লাহর রাসূলগণের এবং তাঁদের সত্যিকার অনুসারীদের বৈশিষ্ট্য। সুন্নাহর প্রকৃত অনুসারীদের আচরণ সবসময় দয়াপূর্ণ হয়। আল্লাহর নূর ও হিদায়াতের সাথে নৈকট্য যত বাড়বে, সিরাতুল মুস্তাকীমে দৃঢ়তা যত বেশি হবে, ততই মুসলিমের আচরণ দয়ায় ভরপুর হবে।
প্রতিদিন আমরা আল্লাহর কাছে এই বলে দু'আ করি,
الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ ﴿٢﴾ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ ﴿٣﴾ مَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ ﴿٤﴾
“পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু। বিচারদিবসের অধিপতি। আমরা শুধুই আপনার দাসত্ব করি এবং আপনারই কাছে সাহায্যপ্রার্থনা করি। আমাদের সরলপথে চালিত করুন।” (সূরাহ আল-ফাতিহা ১:২-৪)
মানুষকে কথা দিয়ে আক্রমণ করা বা অপবাদ দেওয়া কখনোই উচিত নয়। কারো ব্যাপারে মন্দ ধারণা করা ন্যায়বিচারের প্রধানতম একটি অন্তরায়।
আল্লাহ বলেন,
إِن يَتَّبِعُونَ إِلَّا الظَّنَّ وَمَا تَهْوَى الْأَنفُسُ وَلَقَدْ جَاءَهُم مِّن رَّبِّهِمُ الْهُدَى
"তারা কেবল অনুমানের অনুসরণ করে। সত্যের বিপরীতে ধারণা-অনুমান কোনো কাজে আসে না।” (সূরাহ আন-নাজম ৫৩:২৩)
কেবলই সন্দেহের ভিত্তিতে কিছু করা ঠিক নয়। আল্লাহ এই সমস্যার কথা তুলে ধরে বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اجْتَنِبُوا كَثِيرًا مِّنَ الظَّنِّ إِنَّ بَعْضَ الظَّنِّ إِثْمٌ وَلَا تَحَسَّسُوا وَلَا يَغْتَب بَّعْضُكُم بَعْضًا أَيُحِبُّ أَحَدُكُمْ أَن يَأْكُلَ لَحْمَ أَخِيهِ مَيْتًا فَكَرِهْتُمُوهُ ، وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ تَوَّابٌ رَّحِيمٌ ﴿۱۲﴾
“হে বিশ্বাসীগণ! অত্যধিক ধারণা করা ত্যাগ করো। নিশ্চয় কিছু কিছু ধারণা পাপ। পরস্পরের পেছনে গোয়েন্দাগিরি কোরো না। আর একে অপরের গীবাত কোরো না। তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের মাংস খেতে পছন্দ করবে? বরং তোমরা তা প্রচণ্ড ঘৃণা করে থাকো। আল্লাহকে ভয় করো। আল্লাহ অতিশয় তাওবাহ কবুলকারী, পরম দয়ালু।” (সূরাহ আল-হুজুরাত ৪৯:১২)
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে একে অপরের ব্যাপারে অন্যায় কথাগুলো তৈরি হয় অহেতুক সন্দেহ থেকে। এসব অভিযোগ তারা প্রমাণ করতে পারবে না।
ভিন্নমতাবলম্বীদের সাথেও ন্যায়বিচার করা আবশ্যক। ইবনু তাইমিয়াহ রহিমাহুল্লাহ বলেন, “বিদআতি ও পাপাচারীকে দয়া ও নম্রতার সাথে সংশোধন করতে হবে, রাগ বা প্রতিহিংসার ঝোঁকে নয়।” [২২]
ইসলামের সার্বিক নৈতিক শিক্ষার দাবি হলো ন্যায়পরায়ণ ও দয়ালু আচরণ। এই শিক্ষাগুলো কুরআন-হাদিসের স্পষ্ট দলীল থেকে প্রমাণিত। এমনকি শত্রুর সাথে আচরণের সাধারণ মূলনীতিও ভদ্রতা। এর ফলে শত্রুতা হ্রাস পায় এবং সম্প্রীতি ও সমাধানের দ্বার উন্মোচিত হয়। আল্লাহ বলেন,
وَلَا تَسْتَوِي الْحَسَنَةُ وَلَا السَّيِّئَةُ ادْفَعْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ فَإِذَا الَّذِي بَيْنَكَ وَبَيْنَهُ عَدَاوَةٌ كَأَنَّهُ وَلِيٌّ حَمِيمٌ ﴿٣٤﴾ وَمَا يُلَقَّاهَا إِلَّا الَّذِينَ صَبَرُوا وَمَا يُلَقَّاهَا إِلَّا ذُو حَظٍّ عَظِيمٍ ﴿٣٥﴾ "ভালো ও মন্দ সমান নয়। মন্দকে প্রতিহত করো উত্তম দিয়ে। তাহলে দেখবে তোমার সাথে যার শত্রুতা রয়েছে, সে তোমার অন্তরঙ্গ বন্ধু হয়ে যাবে। ধৈর্যশীল ও আত্মসংযমী ছাড়া আর কেউই এই কল্যাণের অধিকারী হতে পারে না। আর তারাই মহাভাগ্যবান।” (সূরাহ ফুসসিলাত ৪১:৩৪- ৩৫)
গালমন্দ, অপমান ও দোষত্রুটি বড় করে দেখানোর মাধ্যমে শত্রুতা লাগানো কঠিনতম অবিচার। আর সত্যের চাদর দিয়ে নিজের অবিচার ঢাকতে চাওয়া তো আরো বড় অন্যায়। কুরআনের বাণী, ইসলামের শিক্ষা আর আলিমদের উক্তিকে নিজের ঘৃণা উদগীরণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা কতই না হীন আচরণ! মতভেদকে ছুতো বানিয়ে জুলুম উস্কে দেওয়ার ব্যাপারে মুসলিমদের সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ বলেন,
كَانَ النَّاسُ أُمَّةً وَاحِدَةً فَبَعَثَ اللَّهُ النَّبِيِّينَ مُبَشِّرِينَ وَمُنذِرِينَ وَأَنزَلَ مَعَهُمُ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ لِيَحْكُمَ بَيْنَ النَّاسِ فِيمَا اخْتَلَفُوا فِيهِ ، وَمَا اخْتَلَفَ فِيهِ إِلَّا الَّذِينَ أُوتُوهُ مِن
টিকাঃ
[২২] মিনহাজুস সুন্নাহ ৫/২৩৯
📄 সমালোচনা ও সৌজন্য
সমালোচনা ও সংলাপের একটি গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি নিয়ে এখানে আলোচনা করতে চাই। মানবজাতির মৌলিক গঠন একইরকম। প্রত্যেকেই তার আবেগ, ঝোঁক, চিন্তা ও স্বার্থ দিয়ে প্রভাবিত। প্রত্যেকেরই কিছু না কিছু গুণ ও দোষ আছে। সংলাপ হোক বা সংঘাত, একাধিক মানুষের মাঝে মিথষ্ক্রিয়া হলেই এই বিষয়গুলো সামনে চলে আসে।
সমালোচনার অনেকগুলো মূলনীতি নিয়ে আলাপ করা যায়। তবে সবগুলোর সারকথা দুটি—সৌজন্য ও জ্ঞান। জ্ঞানের কথা আগে উল্লেখ করলেই মনে হয় বেশি ভালো দেখাত। জ্ঞানই যদি না থাকল তো বিতর্কের মূল্য আর রইল কোথায়? আমাদের অধিকাংশের নজর এড়িয়ে গেলেও এখানে মূল প্রভাবক আসলে সৌজন্য। সমালোচনা ও সংলাপ—উভয় ক্ষেত্রে সৌজন্যের অবস্থান ভালো করে বোঝা দরকার।
সমালোচনা বা সংলাপ যদি সৌজন্যের সীমা ছাড়িয়ে যায়, তাহলে অন্যায় ও সংঘাতের দুয়ার খুলে যায়। সত্য, ঈমান আর ন্যায়ের প্রতিরক্ষার নাম করে মানুষ তখন অনৈতিক আচরণে লিপ্ত হয়ে পড়ে। পূর্ববর্তী আসমানী কিতাবধারীদের অনেকেই ঠিক এখানটায় এসে ভুল করেছে। এজন্যই আল্লাহ কুরআনে আমাদের বলেন,
أَنْ أَقِيمُوا الدِّينَ وَلَا تَتَفَرَّقُوا فِيهِ
“তোমরা দ্বীন প্রতিষ্ঠিত করো এবং তাতে বিভক্তি সৃষ্টি কোরো না।” (সূরাহ আশ-শূরা ৪২:১৩)
মানুষের মাঝে বিভক্তি না এনে যারা সত্য তুলে ধরতে পারে না, তারা আসলে ইসলামকে ভালো করে বুঝেই উঠেনি। একই কথা তাদের ব্যাপারেও প্রযোজ্য, যারা মিথ্যে না বলে মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারে না।
দ্বীনের জরুরি বিষয়গুলো সুরক্ষার আবশ্যকতা নিয়ে অনেককেই কথা বলতে শুনি। তাদের কথা ঠিকই আছে। তবে সৌজন্য ও সুন্দর আচরণ এই জরুরি বিষয়গুলোরই অন্তর্ভুক্ত। পুরো আলোচনাই শুরু হওয়া উচিত সৌজন্য সুরক্ষার গুরুত্ব নিয়ে। মুসলিম উম্মাহর মাঝে আজ জ্ঞানের অভাব মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়েছে, সন্দেহ নেই। তবে একই সমস্যা ঘটেছে সামাজিক আচরণ, স্বভাবজাত সৌজন্য ও সদাচারের ক্ষেত্রেও। দ্বীনের দাঈ আর সমাজসংস্কারকদের প্রাথমিক আলোচ্য হওয়া উচিত এই মৌলিক নৈতিক মূল্যবোধগুলোর ব্যাপারে মানুষের অজ্ঞতা। সত্যি বলতে সঠিক মূল্যবোধ আর সৌজন্যের ফলাফল হলো সুষ্ঠু জ্ঞান ও প্রজ্ঞা, উল্টোটা নয়।
সামাজিক অবক্ষয়ের লক্ষণ হলো স্বাভাবিক সৌজন্য ও নৈতিক আচরণের ব্যাপারে অসচেতনতা। যে গুণের কারণে আল্লাহ আমাদেরকে বাকি সৃষ্টিজগতের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন, সেটিই আজ দূষিত হয়ে গেল। ফলে মানুষ হয়ে গেল নিকৃষ্টের চেয়েও নিকৃষ্ট। ইতিহাসজুড়ে সভ্যতার উত্থান-পতন এই বাস্তবতারই সাক্ষ্য দেয়। এই নৈতিক মূল্যবোধগুলো সংস্কৃতিভেদে পরিবর্তনশীল কোনো প্রথা নয়, বরং একইসাথে চিরন্তন মানবিয় দৃষ্টিভঙ্গি এবং আসমানী হুকুম। এজন্যই নবি করীম (ﷺ) বলেন, “আমাকে সুন্দর আচরণের পূর্ণতা প্রদান করতেই পাঠানো হয়েছে।”[২৩] সকলের মাঝে সুপ্ত সর্বজনীন মানবিয় গুণাবলি জাগিয়ে তুলতেই তিনি প্রেরিত হয়েছেন। আমরা মুসলিমরা একে ঐশী আদেশ হিসেবে দেখে থাকি। তবে সেইসাথে এটি সমগ্র মানবজাতির ফিতরাত বা স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যও বটে। অন্যান্য সংস্কৃতিতে হয়তো এই মূল্যবোধগুলোকে সেক্যুলার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয়, তবে এগুলোর অস্তিত্ব অনস্বীকার্য।
যা-ই হোক, এই মূল্যবোধগুলোর ব্যাপারে কুরআনে ঐশী হুকুম আসার অর্থ সেগুলোর বিশুদ্ধতা নিশ্চিত করা। কারণ মানুষের পরিবর্তনশীল দৃষ্টিভঙ্গিতে কখনো কখনো ভালো হয়ে যায় খারাপ, খারাপ হয়ে যায় ভালো। এজন্যই আইশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা রাসূল (ﷺ)-এর বর্ণনায় বলেছেন,
فَإِنَّ خُلُقَ نَبِيِّ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم كَانَ الْقُرْآنَ "আল্লাহর রাসূলের চরিত্র ছিল কুরআন।” [২৪]
সমালোচনার প্রসঙ্গে ফেরত যাই। বলছিলাম এর জন্য প্রথম ও প্রধান মূলনীতি সৌজন্য ও সদাচরণ। বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির পুনঃযাচাই, সংশোধন, বস্তুনিষ্ঠ সমালোচনা ও খণ্ডন আমাদের সামাজিক জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রতিটি যুগের মুসলিম আলিমগণ এই কাজ কখনো না কখনো করেছেন। মুসলিমরা বুদ্ধিবৃত্তির যত শাখায় হাত দিয়েছে, প্রতিটিতেই খণ্ডন, সমালোচনা ও পুনঃযাচাই সংক্রান্ত বই রয়েছে। কিছু বইয়ের বিষয়বস্তু নির্দিষ্ট কোনো ভ্রান্ত ধারণার অপনোদন। ইমাম বুখারি এবং আহমাদ বিন হাম্বলের মতো প্রখ্যাত আলিমদেরও এ ধরনের কাজ রয়েছে।
সমালোচনার ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গির সারসংক্ষেপ হিসেবে মালিকি মাজহাবের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম মালিক বিন আনাস বলেন, “কবরে শায়িত ব্যক্তি (রহ.) ছাড়া আর কারো মতামতই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়।” কবরে শায়িত ব্যক্তি মানে এখানে মুহাম্মাদ (সা.)। আল্লাহর পক্ষ থেকে সরাসরি ওহী লাভকারী রাসূল (সা.) ছাড়া বাকি সবার মতেরই সমালোচনা হওয়া সম্ভব।
বুদ্ধিবৃত্তিক পর্যায়ে প্রমাণ, যথার্থ যুক্তি ও স্পষ্ট পদ্ধতিভিত্তিক সমালোচনা খুবই প্রশংসনীয় ব্যাপার। আবোলতাবোল পদ্ধতির বদলে এরকম সমালোচনা সমাজে প্রভূত কল্যাণ বয়ে আনে। সকলেই এটি স্বীকার করে। তবে এই সিদ্ধান্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুসিদ্ধান্ত আছে। তা হলো আমাদের প্রত্যেকের মতামতই সমালোচনার অধীন। যে কারো মতকে অন্য কেউ সমালোচনা করতে পারে। কেউই সবসময় সঠিক নয়।
আমাদের দ্বীনে কিছু মৌলিক ও বিশ্বজনীন সত্য আছে, যেগুলোকে আমরা কখনই প্রশ্ন করব না। যেমন- ঈমানের মৌলিক বিষয়গুলো এবং মুসলিমদের ঐক্যমত্যের বিষয়গুলো। তবে সতর্ক থাকতে হবে যে, কিছু মানুষ নিজেদের মতকে সমালোচনার ঊর্ধ্বে রাখার জন্য সেগুলোকে ঈমানের মৌলিক বিষয়ের সমপর্যায়ের হিসেবে তুলে ধরে।
ইসলামের মহান আলিমদের কর্মপদ্ধতি এমন ছিল না। তাঁরা অন্যদের মতের সমালোচনা যেমন করতেন, নিজেদের মতও পুনঃযাচাই করতেন। সমালোচনাকে তাঁরা সাদরে গ্রহণ করতেন। যেমন- ইমাম মালিকের সমালোচনা করেছিলেন তাঁর সহকর্মী ফকিহ লাইস বিন সা'দ এবং মুহাম্মাদ আশ-শাইবানি। এই দুজনই ফিকহি পদ্ধতির উপর সমালোচনামূলক লেখালেখি করেছেন। ইমাম আবু হানিফার অনেক ফাতওয়ার সমালোচনা করেছেন ইমাম আশ-শাফিঈ। কিন্তু তাঁরা সকলেই একে অপরের প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান বজায় রাখতেন। তাঁরা সম্মান ও ভদ্রতা সহকারে নিজেদের মত তুলে ধরতেন, পাণ্ডিত্যের মান কঠোরভাবে বজায় রাখতেন।
আমাদের উচিত তাঁদের অনুসরণ করা এবং মেনে নেয়া যে, আমাদের কথা বা লেখা অপরের সমালোচনার অধীন। মুখে নিজেকে সমালোচনা গ্রহণে প্রস্তুত বলে দাবি করা তো সহজ। কিন্তু সত্যিকার অর্থেই অন্তরে সেই প্রস্তুতি তৈরি করা কঠিন।
আজকের যুগে মুসলিমরা সহজেই বিভিন্ন আধুনিক মাধ্যম ব্যবহার করে আলিম, দাঈ ও সমাজসংস্কারকদের মত জানতে পারেন। এই সব তথ্য সঠিকভাবে প্রক্রিয়াজাত করার জন্য প্রয়োজনীয় পর্যালোচনামূলক চিন্তার দক্ষতা গড়ে তোলা উচিত। মতভেদ যখন যথারীতি চলেই আসে, তখন কেবল উক্তি আর মতামত উদ্ধৃত করতে পারাই যথেষ্ট নয়। চারিদিকে এত মতভেদ কেন, এ নিয়ে অনেকেই আজকাল মাতম করেন। সর্বজনগ্রাহ্য একটি ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি তুলে আনার দাবি করেন। এটি আরেকটি গভীর সমস্যার ইঙ্গিত দেয়। মানুষ ভাবতে শুরু করেছে যে, সমাজে বিভিন্ন মত থাকলে ইসলামি সৌহার্দ্য বজায় রাখা অসম্ভব। তারা মনে করছে সব মতভেদ দূর করতে পারলেই কেবল ভ্রাতৃত্ব, ন্যায়বিচার ও সামাজিক স্থিতিশীলতা অর্জিত হবে।
ইসলামের বেশিরভাগ মতভেদগুলো ইজতিহাদি পর্যায়ের, অর্থাৎ মানবিয় সিদ্ধান্তভিত্তিক। প্রথম কথা হলো এটা কোনো সমস্যাই নয়। বরং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই মতভেদগুলো সমাজকে সমৃদ্ধ করে এবং প্রয়োজনীয় সহজতা আনয়ন করে। পরিবেশ, সংস্কৃতি, এমনকি ব্যক্তির অবস্থাভেদে বিভিন্নরকম সমাধানের পথ খুলে দেয়। আজকের যুগের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আমাদের এরকম প্রশস্ত দৃষ্টিভঙ্গি দরকার, যার মাধ্যমে আমরা ইসলামের মৌলিকত্ব রক্ষা করেই বিভিন্ন পরিস্থিতির জন্য বিভিন্নরকম সমাধান বের করতে পারব।
আমরা যদি মুসলিমদের মাঝে ঐক্যের চেতনা সত্যিই রক্ষা করতে চাই, তাহলে অন্যের মতের প্রতি সম্মান এবং নিজের মতের সমালোচনার প্রতি উদার মানসিকতা গড়ে তোলা উচিত। এই সংস্কৃতি আমাদের নিজেদেরও লালন করতে হবে, সন্তানদেরও শিক্ষা দিতে হবে। রাসূল (ﷺ) বলেন, “প্রত্যেক আদমসন্তানই ভুল করে।” [২৫]
মুসলিম হিসেবে আমাদের বুঝতে হবে যে, দ্বীন আমাদের কারো কথামতো চলবে না এবং আমরা কেউই ভুলের ঊর্ধ্বে নই। মহান সাহাবি এবং ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেন,
আমি একটি বিষয় নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। এমন সময় আমার স্ত্রী এসে বললেন, "আপনি এমন এমন করলেই তো হয়..."
আমি তাঁকে বললাম, “তোমার এত মাথাব্যথা কিসের? আমার ভাবনা আমাকে ভাবতে দাও।”
তিনি জবাব দিলেন, “বা রে! আপনার মেয়ে রাসূল (ﷺ)-এর সাথে দ্বিমত করতে পারে, আর আমি আপনার সাথে দ্বিমত করতে পারব না?” [২৬]
রাসূল (ﷺ) আসলেই সমালোচনার প্রতি খোলামন ছিলেন। দুনিয়াবি বিষয়ে নবিজির মতের ব্যাপারে সাহাবিগণ প্রায়ই ভিন্নমত দিতেন। তবে দ্বীনের ব্যাপারে তিনি যা বলতেন, তা অবশ্যই প্রশ্নাতীত ওয়াহী। এ ব্যাপারেই আল্লাহ বলেন,
وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَن يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ وَمَن يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا مُّبِينًا ﴿٣٦﴾
"আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কোনো ব্যাপারে সিদ্ধান্ত প্রদান করলে কোনো মুমিন পুরুষ বা নারীর জন্য সমীচীন নয় সে ব্যাপারে ভিন্ন সিদ্ধান্ত সন্ধান করা।" (সূরাহ আল-আহযাব ৩৩:৩৬)
তবে তাঁর ব্যক্তিগত মত ও ইচ্ছার কথা একেবারেই আলাদা। এসব ব্যাপারে তিনি শিশুদের ভিন্নমতও শুনতেন। যেমন- আনাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু তাঁর বাল্যকালের একটি ঘটনা বলেন,
একবার আল্লাহর রাসূল (ﷺ) আমাকে কোনো একটা কাজে কোথাও যেতে বললেন। আমি বললাম, “যাব না।” মদিনার এক ছেলেকে আমি কথা দিয়েছিলাম যে, ওইদিন তার সাথে খেলতে যাব। আমি ওখানেই চলে গেলাম। অনেকক্ষণ পর। তখনও আমি দুটো ছেলের সাথে খেলাধুলা করছিলাম। নবি (ﷺ) এসে বললেন, “উনাইস (ছোট্ট আনাস)! এবার আমার ওই কাজটা করে দাও।” [২৭]
ইসলাম আমাদের কাছে এমনই নম্র ও সৌজন্যমূলক আচরণ চায়।
টিকাঃ
[২৩] মুসনাদ আহমাদ: ৮৫৯৫
[২৪] সহিহ মুসলিম: ৭৪৬
[২৫] সুনান তিরমিযি: ২৪৯৯, ইবনু মাজাহ: ৪২৫১
[২৬] সহিহ আল বুখারি: ৪৯১৩, সহিহ মুসলিম: ১৪৭৯
[২৭] সহিহ মুসলিম: ২৩১০, আবু দাউদ: ৪৭৭৩
📄 সমালোচনা ও আত্মজিজ্ঞাসা
অন্য কেউ সমালোচনা করার আগে নিজেই নিজের মতকে পর্যালোচনা ও পুনর্মূল্যায়ন করা সততা ও চারিত্রিক সৌন্দর্যের লক্ষণ।
অন্যের মতের সমালোচনা করতে, এমনকি খণ্ডন করে বই লিখতে অনেকেই সদা তৎপর। কিন্তু একই কাজ তাদের ব্যাপারে অন্যেরা করলে তাঁরা আবার রক্ষণাত্মক হয়ে ওঠেন। বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে সজ্জিত বর্তমান পৃথিবীতে এ ধরনের আবরণ সদিচ্ছার অভাবকেই ইঙ্গিত করে।
আমাদের সালাফগণ প্রায়ই নিজেদের মত প্রত্যাহার করতেন। উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু একবার উত্তরাধিকার সংক্রান্ত এক মামলায় এক ধরনের রায় দিলেন। পরে একই ধরনের আরেক মামলায় ভিন্নরকম রায় দিলেন। লোকে এ নিয়ে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, “আগে আমি বিষয়টাকে ওভাবে দেখতাম। এখন এভাবে দেখি।” [২৮]
ইতিহাসে অসংখ্যবার প্রখ্যাত ফকিহ ও মুহাদ্দিসগণ কোনো না কোনো ফাতওয়া বা হাদিসের ব্যাখ্যার ব্যাপারে নিজেদের মত পরিবর্তন করেছেন। মহান অনেক নেতা তাঁদের সমসাময়িক গুরুত্বপূর্ণ অনেক বিষয়ে নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করেছেন। তাহলে আজকে আমাদের আত্মসমালোচনা করতে সমস্যা কোথায়? অন্যের সমালোচনায় আজকে আমরা এত করিৎকর্মা কেন? ঈমানের প্রতিরক্ষার স্বার্থে অপরের সংশোধন যদি এতই জরুরি হয়ে থাকে, নিজের সংশোধন তো এর চেয়েও জরুরি হবার কথা।
নিজেদের দিকে তাকালে দেখতে পাব নির্দিষ্ট কিছু মতের দিকে ঝোঁক আমাদের নিরপেক্ষ বিচারক্ষমতাকে প্রভাবিত করছে। যেমন- পরিবর্তনের প্রতি অনীহা, যেমন আছে তেমনই থাকার প্রবণতা। যুগের ট্রেন্ড, বেড়ে ওঠার পরিবেশ, নির্দিষ্ট কারো সাথে ঘনিষ্ঠতা সবকিছুই আমাদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে। এসব প্রভাব আমাদের অজান্তেও পড়তে পারে। আমরা কোন জিনিসগুলো পর্যালোচনা ও যাচাই করে নেব আর কোনগুলো বিনাবাক্যব্যয়ে মেনে নেব, তাও এ বিষয়গুলো দিয়ে নির্ধারিত হয়। শুধুমাত্র বক্তার ভিত্তিতেই সবসময় বক্তব্যের সত্য বা মিথ্যা নির্ধারিত হয় না। কোনো কোনো বিষয়ের আবার বিভিন্ন মাত্রার সুবিধা-অসুবিধা থাকে, একেকজন একেক বিষয়ে পারদর্শী হয়। আমরা বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে এগুলো বুঝতে পারি, তারপরও আমাদের মনের ঝোঁক আমাদের চিন্তাকে প্রভাবিত করতে পারে।
সংকীর্ণমনস্কতা আর দলান্ধতার মৌখিক নিন্দা করা তাই সহজ বটে। কিন্তু অবচেতনভাবেই আমরা সবচেয়ে নিকৃষ্ট দলান্ধতার ভেতর পড়ে যাই। সেটা হলো নিজ মতের প্রতি অন্ধ আনুগত্য। একই কারণে অন্যদের মতকে এত সহজে সমালোচনা করা যায়।
আমাদের মানবিয় পরিবর্তনশীলতার কথা মাথায় রেখেই অন্যের সমালোচনার ব্যাপারে আরো সতর্ক হওয়া উচিত। অন্যের মত পর্যালোচনা না করে ব্যক্তিকে আক্রমণ করার ব্যাপারে আমাদের সাবধান হতে হবে।
অতীতে আমাদের সালাফরা পর্যালোচনামূলক যেসব লেখা লিখেছেন, সেখানে এই মূলনীতির বাস্তব প্রয়োগ আমরা দেখতে পাই। তাঁরা আলাদা বই লিখে অন্য কারো বইয়ের খণ্ডন করতেন। একটি মত উপস্থাপন ও ব্যাখ্যা করে তাঁরা অন্য আরেকটি মতের খণ্ডন করতেন। শুধুই অন্যের ভুলের তালিকা বানানোর অভ্যাস সালাফদের মাঝে আমরা দেখি না। ভিন্নমতাবলম্বীর ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে পড়ে না থেকে তাঁরা মূল বিষয়ে আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখতেন।
সমালোচনার সময় মনে রাখতে হবে যে, আমাদের এই সমালোচনাও সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। তাহলে আমাদের কণ্ঠস্বর ভদ্রস্থ হবে। সমালোচনা একটি ব্যক্তিগত চ্যালেঞ্জ, কারণ আমরা নিজেদের পরিবর্তনশীলতা কখনোই কাটিয়ে উঠতে পারব না। সত্যিকার অর্থে পক্ষপাতমুক্ত হওয়া কখনোই আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। পূর্ণ নিরপেক্ষতা অর্জন একটি অসাধ্য কাজ। মানুষের এই সহজাত অক্ষমতাই আমাদের আরো সাবধান হতে সাহায্য করবে। আল্লাহকে ভয় করতে আর তাঁর দয়া লাভের উপযোগী আচরণ করতে সাহায্য করবে। আল্লাহ ইউসুফ আলাইহিসসালামের উক্তি উদ্ধৃত করেন,
وَمَا أُبَرِئُ نَفْسِي إِنَّ النَّفْسَ لَأَمَّارَةٌ بِالسُّوءِ إِلَّا مَا رَحِمَ رَبِّ
“আমি নিজেকে দোষমুক্ত বলি না। (মানুষের) নফস তো কুমন্ত্রণা দিতেই থাকে। শুধু আল্লাহ যাকে দয়া করেন, সে-ই রক্ষা পায়।” (সূরাহ ইউসুফ ১২:৫৩)
কাজেই আমরা যদি কারো সমালোচনা করতে গিয়ে অবিচার না করতে চাই এবং সততা রক্ষা করতে চাই, তাহলে মানবমনের সহজাত পরিবর্তনশীলতাকে স্বীকার করতে হবে। আমাদের সব কাজই যে কোনো না কোনো চেতনা বা প্রভাবের ফলাফল, তা মাথায় রাখতে হবে। এ এক বিশাল আমানত। আল্লাহ বলেন,
نَّا عَرَضْنَا الْأَمَانَةَ عَلَى السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَالْجِبَالِ فَأَبَيْنَ أَن يَحْمِلْنَهَا وَأَشْفَقْنَ مِنْهَا وَحَمَلَهَا الْإِنسَانُ إِنَّهُ كَانَ ظَلُومًا جَهُولًا ﴿٧٢﴾
"নিশ্চই আমি আসমান, জমিন ও পাহাড়ের কাছে এই আমানত পেশ করেছিলাম। তারা তা বহন করতে অস্বীকার করেছে ও ভয় পেয়েছে। কিন্তু মানুষ সে দায়িত্ব গ্রহণ করল। সে বড়ই অন্যায়কারী, বিরাট অজ্ঞ।” (সূরাহ আল-আহযাব ৩৩:৭২)
মানবিয় সীমাবদ্ধতার কারণে অবিচার করে ফেলার একটা সম্ভাবনা থেকেই যায়। এজন্যই নবি-রাসূলগণ জ্ঞান ও দয়া নিয়ে এসেছেন। তাঁদের জীবন দয়ায় ভরপুর ছিল। এই গুণের কারণেই অবিচার পরিহার করা নিশ্চিত করা যায়।
আল্লাহ কুরআনে খিজির আলাইহিসসালামের ব্যাপারে বলেন,
فَوَجَدَا عَبْدًا مِّنْ عِبَادِنَا آتَيْنَاهُ رَحْمَةً مِّنْ عِندِنَا وَعَلَّمْنَاهُ مِن لَّدُنَّا عِلْمًا ﴿٦٥﴾
"তারপর তারা আমার এক বান্দাকে খুঁজে পেল, যাকে আমি অনুগ্রহ করেছি এবং আমার পক্ষ থেকে বিশেষ জ্ঞান দান করেছি।” (সূরাহ আল- কাহফ ১৮:৬৫)
আল্লাহ তাঁকে জ্ঞান ও দয়া এ দুটি নিয়ামতই দিয়েছেন। এই দুই গুণের সমন্বয়েই আমাদের সমালোচনা হতে পারে সুবিচারমূলক। দয়াবিহীন ধর্মীয় জ্ঞানেও আল্লাহর হিদায়াত থাকে না। তেমনি জ্ঞানহীন দয়াও ইসলামি শিক্ষার পরিপন্থী। নির্দয় আলিম বা দয়ালু মূর্খ, কারো কাছ থেকেই উপকৃত হওয়া সম্ভব নয়। প্রথমজন মানুষকে তাড়িয়ে দেবে, দ্বিতীয়জন তাদের ভুলের মধ্যে নিক্ষেপ করবে।
এজন্যই সালাফগণের মধ্যকার আলিমগণ বলতেন যে, অন্যের সাথে বিতর্কে অবতীর্ণ হওয়ার আগে দুটি গুণ অবশ্যই অর্জন করতে হবে-জ্ঞান ও সততা।
প্রথমটির দাবি হলো কখনোই অজ্ঞতা বা রাগের ভিত্তিতে তর্কে না নামা, দ্বিতীয়টি হলো নিজেকে অন্যের চেয়ে শ্রেষ্ঠ দেখানোর উদ্দেশ্যে তর্ক না করা।
টিকাঃ
[২৮] মুসান্নাফ আব্দুর রাযযাক: ১৯০০৫, মুসান্নাফ ইবনু আবি শাইবাহ: ৩১৭৪৪