📄 কথা সত্য, মতলব খারাপ
একটি কনফারেন্সের সভাপতিত্ব করছিলেন এক নারী। সেই কনফারেন্সে অংশগ্রহণকারী এক পুরুষ তাঁর উপর ক্ষেপে গেলেন। বিশেষত নিয়ম-কানুন মানার প্রতি তাঁর দৃঢ়তা দেখে। যেমন বক্তাদের সময় নির্দিষ্ট করা, আসনবিন্যাস, আলোচনার কঠিন জায়গাগুলোর সংক্ষেপে উপসংহার টানা, আর আরবি ভাষায় দক্ষতার “ভান” করা।
সেই পুরুষ বক্তার যখন কথা বলার পালা এলো, তিনি বলে উঠলেন, “যে জাতি নারীকে নেতৃত্বের স্থানে বসায়, তারা সফল হবে না।”
এই হাদিসের বিস্তারিত ব্যাখ্যা ও এ থেকে প্রাপ্ত বিধিবিধান আলোচনা করা এখানে আমাদের উদ্দেশ্য নয়। আমাদের আলোচ্য হলো এই লোক কীভাবে নবি (ﷺ)-এর একটি কথাকে অপ্রাসঙ্গিকভাবে উদ্ধৃত করে নিজের মনের ঝাল মেটাল। নবিজি (ﷺ)-এর কথা ব্যবহার করে সস্তা ফায়দা নেওয়া কি ঠিক?
আরেকবার টাকা-পয়সা সংক্রান্ত ব্যাপারে এক লোকের সাথে তার প্রতিবেশী আত্মীয়ের মনোমালিন্য হলো। তাঁরা একটা ব্যবসায়িক কারবার শুরু করে লস খেয়েছেন। অনেক আশা-ভরসা ছিল এটা নিয়ে। কিন্তু কিছুই হলো না। উল্টো ঝগড়া লেগে গেল তাদের মাঝে।
কিছুদিন পর একটি পারিবারিক অনুষ্ঠান তাদের আবার কাছে নিয়ে এল। সালাতের সময় হলে ওই দুইজনের একজন এগিয়ে এসে ইমামতি করলেন। অবাক হওয়ার কিছু নেই। ইসলামি পড়াশোনায় তিনি জামিয়া (বিশ্ববিদ্যালয়) থেকে সনদপ্রাপ্ত।
কিন্তু তিনি সালাতে কী তিলাওয়াত করলেন, জানেন? প্রথম রাক'আতে,
وَلَا تَحْسَبَنَّ اللَّهَ غَافِلًا عَمَّا يَعمَلُ الظَّالِمُونَ ، إِنَّمَا يُؤَخِّرُهُمْ لِيَوْمٍ تَشْخَصُ فِيهِ الْأَبْصَارُ ﴿٤٢﴾
"অপরাধীরা যা করে, সে ব্যাপারে আল্লাহকে উদাসীন ভেবো না। তিনি তো তাদের সাময়িক অবকাশ দিচ্ছেন সেই দিনের আগ পর্যন্ত, যেদিন চোখগুলো বিস্ফারিত হয়ে যাবে।” (সূরাহ ইবরাহিম ১৪:৪২)
দ্বিতীয় রাক'আতে, أَلَمْ تَرَ كَيْفَ فَعَلَ رَبُّكَ بِأَصْحَابِ الْفِيلِ ١
"তুমি কি দেখোনি আল্লাহ হাতিওয়ালাদের সাথে কী আচরণ করেছেন?” (সূরাহ আল-ফীল ১০৫:১)
তিনি কীসের প্রতি ইঙ্গিত করছেন, তা সবাই স্পষ্ট বুঝল। সেসময় আদালতে ওই দুই আত্মীয়ের মাঝে মামলা চলছিল। এমনই এক সময় একজন আরেকজনের দিকে একদম অপ্রাসঙ্গিকভাবে কুরআনের আয়াত ছুঁড়ে মারল।
আল্লাহর কালামকে এভাবে ব্যবহারের অনুমতি তিনি আমাদের দেননি। এগুলো নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে, নির্দিষ্ট প্রসঙ্গে নাযিল হয়েছে। আমাদের ব্যক্তিগত ঝগড়াঝাঁটিতে ব্যবহৃত হবার জন্য নয়। অপমান করে প্রতিপক্ষকে ক্ষেপিয়ে তোলার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হবার জন্যে নয়। কুরআন তো বরং মুমিনদের জন্য প্রশান্তি ও আরোগ্য হবার কথা।
এখানেই শেষ নয়। সালাত শেষে মানুষ তখনও উঠে যায়নি। তিনি এই সুযোগে বলতে লাগলেন যে, কীভাবে কিছু মানুষ সালাত আদায় করেও কেবল আল্লাহর কাছ থেকে আরো দূরে সরে যায়। বিশেষত যারা অন্যের টাকা অবৈধভাবে আত্মসাৎ করে...ইত্যাদি...ইত্যাদি... (উল্লেখ্য, এই হাদিসটি সহিহ বলে প্রমাণিত নয়)।
এটি দ্বীনি জ্ঞানের খিয়ানত। আল্লাহ আমাদের যে আয়াত ও হাদিসগুলো শেখার সৌভাগ্য দিয়েছেন, সেগুলো ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার করাটা দুঃখজনক। পরিস্থিতি আরো খারাপ হয় যখন দ্বীনের ব্যাপারে কম জ্ঞানসম্পন্ন মানুষেরা রাগের মাথায় সেই আয়াত বা হাদিসকেই অস্বীকার করে বসে।
মুশরিকদের ব্যাপারে আল্লাহ আমাদের বলেন,
وَلَا تَسُبُّوا الَّذِينَ يَدْعُونَ مِن دُونِ اللَّهِ فَيَسُبُّوا اللَّهَ عَدْوًا بِغَيْرِ عِلْمٍ
“আল্লাহর পাশাপাশি তারা যেসবের উপাসনা করে, সেগুলোকে গালমন্দ কোরো না। তাহলে তারাও অজ্ঞতাবশত আল্লাহকে গালমন্দ করবে।” (সূরাহ আল-আন'আম ৬:১০৮)
নিজেদের অন্তর পরিশুদ্ধ রাখতে হলে সবসময় স্মরণে রাখতে হবে যে, আল্লাহর বাণী পৌঁছে দেওয়া একটি আমানত। মানুষের কাছে আল্লাহ, তাঁর দ্বীন ও তাঁর নবি (ﷺ)-কে প্রিয় করে তুলতে হবে। তার মানে ব্যক্তিগত ঝগড়ায় এই আমানত ব্যবহার করে নিজের পয়েন্ট বাড়ানো যাবে না। ধর্মীয় সত্যকে এই পর্যায়ে নামিয়ে আনা মহা অন্যায়।
আল্লাহ বলেন,
وَلاَ تَعْجَلْ بِالْقُرْآنِ مِن قَبْلِ أَن يُقْضَى إِلَيْكَ وَحْيُهُ وَقُل رَّبِّ زِدْنِي عِلْمًا ﴿١١٤﴾
"তোমার প্রতি ওহী সম্পূর্ণ হওয়ার আগে তুমি কুরআনের ব্যাপারে তা আত্মস্থ করার ব্যাপারে তাড়াহুড়া কোরো না। বরং বলো, 'হে আমার প্রতিপালক! আমার জ্ঞান বৃদ্ধি করে দিন।” (সূরাহ তা-হা ২০:১১৪)
📄 দ্বীনের চালে স্বার্থ হাসিল
আমি একবার এমনি কথাচ্ছলে একটা ধারণার কথা বললাম। এমনি মাথায় আসা একটি চিন্তা, এ নিয়ে আমি মোটেও নিশ্চিত ছিলাম না। আমার এক সম্মানিত বন্ধু এ কথা শুনে প্রস্তাব দিলেন কুরআন-সুন্নাহ থেকে আমার এই মতের পক্ষে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় কি না, খুঁজে দেখতে। তাহলে মানুষ সহজে মেনে নেবে। কুরআন ও সহিহ হাদিস থেকে স্পষ্ট দলীল থাকলে তা তো নিঃসন্দেহে মুমিনের জন্য যথেষ্ট। আল্লাহ বলেন,
وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَن يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ وَمَن يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا مُّبِينًا ﴿٣٦﴾
“আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কোনো ব্যাপারে সিদ্ধান্ত প্রদান করলে কোনো মুমিন পুরুষ বা নারীর জন্য সমীচীন নয় সে ব্যাপারে ভিন্ন সিদ্ধান্ত সন্ধান করা।” (সূরাহ আল-আহযাব ৩৩:৩৬)
কুরআনের কোনো আয়াত বা কোনো হাদিসের অর্থ স্পষ্টভাবে বোঝার পর মুমিনের সামনে কেবল একটিই পথ খোলা থাকে-সে অনুযায়ী কাজ করা। অন্যান্য যুক্তি দিয়ে মতকে আরো শক্তিশালী করা যায় বটে, তবে মুমিনের কাছে কুরআন-হাদিস একেবারে শিরোধার্য। এর বেশি আর কিছুর দরকারই নেই।
আর আয়াত বা হাদিসের অর্থ যদি পুরোপুরি স্পষ্ট না হয়, তাহলে মুমিনের দায়িত্ব সেটির প্রতি ঈমান আনা। নির্দিষ্ট কোনো ব্যাখ্যাকেই সঠিক বলে গোঁয়ার্তুমি না করা। প্রখ্যাত ফকিহ ইমাম আশ-শাফিঈ রহিমাহুল্লাহ এই পদ্ধতি অনুসরণ করতেন। তিনি বলতেন, “আমি আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখি। তিনি যা কিছু যে অর্থ বোঝাতে নাযিল করেছেন, সে অর্থের প্রতিই ঈমান রাখি। একইভাবে আমি আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর প্রতি ঈমান রাখি। আর তিনি যা কিছু যে অর্থ বোঝানোর উদ্দেশ্যে বলেছেন, সে অর্থের প্রতি ঈমান রাখি।”
তারপরও কুরআন-সুন্নাহর ব্যাপারে আমাদের পদ্ধতি আর আমাদের সালাফদের পদ্ধতির মাঝে ব্যাপক ফারাক রয়েছে। তাঁরা এগুলোর প্রতি অন্তরের অন্তস্থল থেকে শ্রদ্ধা পোষণ করতেন। নিজেদের বুঝকে তাঁরা নির্ভুল মনে করতেন না। তাই আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বাণীর ব্যাখ্যায় নিজেদের মত চাপিয়ে দিতেন না। ফলে বৈধ মতপার্থক্যপূর্ণ ব্যাপারে কুরআন-হাদিসের স্থান ছিল কারো ব্যক্তিগত মতের ঊর্ধ্বে।
এ ধরনের ব্যাপারে রায় দিতে গিয়ে তাঁরা প্রায়ই বলে দিতেন যে, এটা তাঁর বুঝ অনুযায়ী মত। এর বেশি কিছু নয়। সমালোচক বা প্রতিপক্ষের সাথে বাহাস করার সময় আপন মতের পক্ষে কুরআন ও হাদিসের দলীল তো অবশ্যই ব্যবহার করতেন। তবে ঈমান ও সচেতনতার কারণে পবিত্র কালাম ও নিজেদের মতের মাঝে সুস্পষ্ট পার্থক্যরেখা বজায় রাখতেন।
আলি ইবনু আবি তালিব রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর মতকে কেউ কুরআনের মতো নির্ভুল বলে মনে করলে তিনি তাদের কঠোরভাবে তিরস্কার করতেন। কোনটি তাঁর নিজের মত, তা তিনি সতর্কতার সাথে স্পষ্ট করে দিতেন। তাঁর কাছ থেকে শোনা একটি মতের ব্যাপারে কায়স বিন উব্বাদ তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, “এটা কি আল্লাহর রাসূল (ﷺ) আপনাকে বলেছেন, না আপনার নিজের মত?” আলি নির্দ্বিধায় বললেন, “এ ধরনের কোনোকিছুই আমি আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর মুখে শুনিনি। এটা কেবলই আমার মত।”
মুসলিম উম্মাহর এক টালমাটাল ও সংকটময় সময়ে আলি রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু খিলাফতের দায়িত্ব নেন। নিজের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করতে তাঁরই সবচেয়ে বেশি কুরআন-হাদিসের সমর্থন দরকার ছিল। চাইলেই এমনটা করা তাঁর কাছে কোনো ব্যাপারই ছিল না। তিনি কুরআনের একজন মুফাসসির এবং রাসূল (ﷺ)-এর ঘনিষ্ঠতম সহচরদের একজন। তার উপর শাসকের আনুগত্যের ব্যাপারে কুরআন-হাদিসে অজস্র দলীল আছে। প্রতিপক্ষের সাথে মুনাফিকের বৈশিষ্ট্যের মিল দেখাতে চাইলেও সহজেই তা দেখাতে পারতেন।
কিন্তু আলির চারিত্রিক দৃঢ়তা ও নবিজি (ﷺ)-এর প্রতি তাঁর আনুগত্য তাঁকে এমনটা করতে বাধা দেয়। ইসলামের শাশ্বত বাণী ঠিকভাবে পৌঁছে দেওয়া মুসলিম হিসেবে তাঁর দায়িত্ব। সর্বোপরি, তিনি ছিলেন তাঁর প্রতিপালকের প্রতি নিষ্ঠাবান। এ কারণেই তিনি স্পষ্টভাবে বলে নিতেন কোনটি তাঁর নিজস্ব মত। পবিত্র কালাম থেকে নিজের মতের পক্ষে দলীল টেনে বের করা থেকে নিজেকে তিনি বিরত রাখতেন।
ঈমানের একদম মৌলিক বিষয়ে কথা বলতে গেলে আমাদের বক্তব্যের পক্ষে কুরআন-সুন্নাহ থেকে বিপুল পরিমাণ স্পষ্ট ও মতভেদহীন দলীল আনা যাবে। কিন্তু শরিয়তের অন্যান্য বেশিরভাগ বিষয়ে যেখানে একাধিক মত আছে, সেখানে এই কথা খাটে না। এখানে একাধিক মতের পক্ষে হয় ভিন্ন ভিন্ন দলীলের সমর্থন পাওয়া যায়, নয়তো একই দলীলের ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যার সমর্থন পাওয়া যায়। কোনো একটি বিধান পরে আরেকটি বিধানের মাধ্যমে রহিত হয়ে গেছে কি না, তাও অনেক ক্ষেত্রে অস্পষ্ট থাকে। সাধারণ অনেক বিধান বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয় না। একটি হাদিসের বিশুদ্ধতার মান নিয়েও বহুবিধ মত থাকে।
ফিকহশাস্ত্রবিদদের কাজের সারনির্যাস এগুলোই। তাঁরা এরকম বিভিন্ন শর্ত গবেষণা করে নিজেদের রায় দেন। তাই আমরা দেখি সালাফদের মধ্যকার ফকিহগণ কোনো বিধান আলোচনা করতে গিয়ে ভদ্রতা বজায় রাখতেন। নিজের মতকে যতটা সাবধানতার সাথে পর্যবেক্ষণ করতেন, ভিন্ন মতাবলম্বীর মতকেও ততটাই সতর্কতার সাথে পর্যবেক্ষণ করতেন। প্রতিপক্ষের মতে ভুল পেলে তাঁদের জন্য অজুহাত দাঁড় করাতেন এবং ধরে নিতেন যে, মত ভুল হলেও তাঁদের নিয়ত বিশুদ্ধ ছিল। তিরস্কার করা বা নিজের মত চাপিয়ে দেওয়া থেকে তাঁরা বিরত থাকতেন। শরিয়তের প্রাজ্ঞ আলিম আশ-শিরাজি যথার্থই বলেন, “একজন ফকিহর জ্ঞান যত বেশি হবে, নিজের মতের ব্যাপারে তাঁর সতর্কতা তত বৃদ্ধি পাবে।”
শরিয়তের কোনো বিষয় বা বর্তমানের কোনো ইশ্য আলোচনার সময় আমাদের তড়িৎ উপসংহারে আসা যাবে না। আলোচনা ও নিরপেক্ষ সংলাপের দরজা খোলা রাখতে হবে। কেবলই বিরোধী মতকে খামোশ করিয়ে দেবার কুমতলব নিয়ে কুরআন-সুন্নাহ চষে দলীল বের করা যাবে না।
বেশিরভাগ সময় দেখা যায় যে, নিজের মতের পক্ষে বেশি কঠোর লোকদের বুঝ সবচেয়ে অগভীর হয়। হুটহাট তাঁরা দাবি করে বসেন যে, এই ব্যাপারে ইজমা আছে বা কুরআন থেকে স্পষ্ট দলীল আছে। ভিন্নমতাবলম্বীদের তারাই সবার আগে জাহান্নামি বানিয়ে দেন। তাদের মনে হতে পারে যে, এসব করে তারা পাক কালামের সম্মান করছেন। আমরা দু'আ করি এমনটিই যেন হয় আর আল্লাহ যেন তাদের নিয়ত কবুল করে নেন। একইসাথে তাদের আসল উদ্দেশ্য ও এর কুফলের দিকেও তাদের মনোযোগ ফেরানো জরুরি, যার ব্যাপারে তারা নিজেরাও হয়তো সচেতন নন। কুরআন-সুন্নাহর প্রতি সত্যিকার ভক্তির লক্ষণ হলো সতর্কতা, নম্রতা ও পরমতসহিষ্ণুতা।
📄 চলতি চিন্তাধারা
আমাদের মসজিদে মুয়াজ্জিন সাহেব একবার ইমামতি করলেন। তো তিনি ভুলে পঞ্চম রাক'আতের জন্য দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন। কিছুক্ষণ এভাবেই পার হয়ে গেল। তারপর একজন মুসল্লি যথেষ্ট সাহস সঞ্চয় করে বললেন, “সুবহানআল্লাহ!” তার দেখাদেখি বাকি মুসল্লিরাও এ কথা বলতে শুরু করলেন। ইমাম তখন ভুল হয়েছে টের পেয়ে সাহু সিজদাহ দিয়ে সালাত শেষ করলেন।
আমি ভাবনায় পড়ে গেলাম। একজন লোক সুবহানআল্লাহ বলার আগ পর্যন্ত বাকিরা চুপ করে ছিলেন কেন? আসলে ইমাম ভুল করেছেন কি না, এ ব্যাপারে তারা শতভাগ নিশ্চিত ছিলেন না। ওই এক ব্যক্তির “সুবহানআল্লাহ” শুনে বাকিরা নিশ্চিত হয়েছেন এবং তার সাথে যোগ দিয়েছেন। এভাবে একজনের কথা বাকিদের সাক্ষ্যের মাধ্যমে সত্যায়িত হলো। অন্যরা না বললে ইমাম হয়তো একজনের “সুবহানআল্লাহ” বলাকে উপেক্ষা করে সাহু সিজদাহ না দিয়ে পাঁচ রাক'আতই পড়ে ফেলতেন।
এ ধরনের ভুল শুধু সালাতেই না, বিচার-আচার বা মতামতের ক্ষেত্রেও হতে পারে। ধরুন সমাজে কোনোভাবে একটি ভুল ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। অনেকের মনেই এটার ব্যাপারে সন্দেহ হচ্ছে, কিন্তু ভয়ে কেউ কিছু বলছে না। অনেক বছর পরে কেউ একজন সাহস করে স্পষ্ট দলীল ও যুক্তি দিয়ে ওই ভুল ধারণার বিপক্ষে কথা বলল। এতদিন চুপ করে থাকা মানুষগুলোও সাথে সাথে এসে যোগ দিল। বলল, “বিশ্বাস করুন, আমাদের মনেও অনেকদিন যাবত এই কথাগুলো ঘুরপাক খাচ্ছিল। কিন্তু অন্যদের বিরোধিতার ভয়ে মুখ ফুটে কিছু বলতে পারিনি। আজ আপনার প্রতিবাদ দেখে নিশ্চিত হলাম যে, আমরা ঠিকই ভাবছিলাম।”
আবার কারো কোনো মতামত কালের আবর্তনে হারিয়ে যেতে পারে। সেটির পক্ষে বিশ্বাসযোগ্য যুক্তি-প্রমাণ না পাওয়ায় কেউ হয়তো সেটার কথা তোলেও না। অথবা সত্যি বলতে তারা জানেই না যে, এর পক্ষে যুক্তি-প্রমাণ থাকতে পারে। এ কারণেই কিছু মতামত বা ধারণা কিছুদিন প্রচারিত হওয়ার পর স্তিমিত হতে হতে একসময় হারিয়ে যায়।
আদর্শের যারা প্রচার করেন তাঁরা নতুন ও কল্যাণকর ধারণাগুলোর স্থায়িত্বের সম্ভাবনা বাড়াতে দুটি কাজ করতে পারেন:
১। কেবল পরিচিত জিনিসেই সন্তুষ্ট হয়ে যাওয়া এবং অপরিচিত জিনিসকে ঘৃণা করার প্রবণতা দূর করতে হবে। এটি অন্যতম একটি নেতৃত্বগুণ। পরিচিতি কখনোই বুদ্ধির জগতে গ্রহণ বা বর্জনের একমাত্র মানদণ্ড হতে পারে না। পরিচিত ও আরামদায়ক জিনিস আঁকড়ে ধরে থাকা যেমন খারাপ, নতুন কিছু একটা পেলেই তা গিলে নেয়াও একইরকম খারাপ। উভয়ক্ষেত্রেই 'পরিচিত'কে খুব বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। চিন্তাজগতের উপর এর প্রভাবের ব্যাপারে সচেতন থাকতে হবে এবং তা যথাসম্ভব কমিয়ে আনতে হবে।
২। নতুন ধারণা উপস্থাপন করার এবং এর মাধ্যমে প্রগতিশীল ও দৃশ্যমান পরিবর্তন নিয়ে আসার সাহস থাকতে হবে। আদর্শপ্রচারকরা প্রায়ই এত দ্রুত পরিবর্তন আশা করেন, যা একেবারেই অবাস্তব। এছাড়া যথেষ্ট বিশ্বাসযোগ্য করে উপস্থাপন করতে না পারলে অচিরেই তা হারিয়ে যাবে। আদর্শের নেতারাই যদি সেটির প্রতি যথেষ্ট বিশ্বাসী না হন এবং সেটিকে কাজে অনূদিত করতে না জানেন, তাহলে পরিবর্তন আসবে কী করে? আদর্শ তো তখন চায়ের কাপেই ডুবে মারা যাবে।
রাসূল (ﷺ)-কে আল্লাহ বলেন,
وَإِن كَانَ كَبُرَ عَلَيْكَ إِعْرَاضُهُمْ فَإِنِ اسْتَطَعْتَ أَن تَبْتَغِيَ نَفَقًا فِي الْأَرْضِ أَوْ سُلَّمًا فِي السَّمَاءِ فَتَأْتِيَهُم بِآيَةٍ : وَلَوْ شَاءَ اللَّهُ لَجَمَعَهُمْ عَلَى الْهُدَى، فَلَا تَكُونَنَّ مِنَ الْجَاهِلِينَ ﴿٣٥﴾ إِنَّمَا يَسْتَجِيبُ الَّذِينَ يَسْمَعُونَ وَالْمَوْتَى يَبْعَثُهُمُ اللَّهُ ثُمَّ إِلَيْهِ يُرْجَعُونَ ﴿٣٦﴾
"তাদের প্রত্যাখ্যান যদি আপনাকে ব্যথিত করে, তাহলে জেনে রাখুন। আপনি জমিনের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে বা আসমানে আরোহণ করে একটি নিদর্শন নিয়ে এলেও তারা প্রত্যাখ্যানই করত। আল্লাহ চাইলে তাদের সকলকে সুপথে একত্রিত করতেন। অতএব, অজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত হবেন না। যারা (সত্যিকার অর্থেই) শ্রবণ করে, নিশ্চিত থাকুন, তারা গ্রহণ করবে। আর মৃতদের আল্লাহ পুনরুত্থিত করবেন। তারপর তারা তাঁর দিকেই প্রত্যাবর্তিত হবে।” (সূরাহ আল-আন'আম ৬:৩৬-৩৬)
নবি মুহাম্মাদ (ﷺ) আসলেই এক সফল আদর্শপ্রচারকের উদাহরণ। আল্লাহর ইচ্ছায় তিনি মানুষের অন্তর খুলে দিয়েছেন, তাদের অজ্ঞতা দূর করেছেন, এবং ভুল ধারণা সংশোধন করেছেন। প্রচারিত শিক্ষাকে তিনি এক বাস্তবসম্মত জীবনব্যবস্থা হিসেবে তুলে ধরেছেন।
📄 যাহা বলিব, ন্যায় বলিব
ইসলাম আমাদের শেখায় কীভাবে অন্যের ব্যাপারে কথা বলতে হয়। নৈতিক ও ন্যায়পরায়ণ আচরণে কথা বলতে হবে। নিজের ব্যাপারে বা নিকটজনের ব্যাপারে কিছু বলতে হলেও ন্যায়ের সাথে বলতে হবে।
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُونُوا قَوَّامِينَ بِالْقِسْطِ شُهَدَاءَ لِلَّهِ وَلَوْ عَلَى أَنفُسِكُمْ أَوِ الْوَالِدَيْنِ وَالْأَقْرَبِينَ ، إِن يَكُنْ غَنِيًّا أَوْ فَقِيرًا فَاللَّهُ أَوْلَى بِهِمَا
“হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকো। আল্লাহর ওয়াস্তে ন্যায়সঙ্গত সাক্ষ্য প্রদান করো, যদিও তা তোমাদের নিজেদের বা পিতামাতা বা আত্মীয়ের বিরুদ্ধে হয়। তারা ধনী হোক বা দরিদ্র, আল্লাহই তাদের উত্তম রক্ষাকারী।” (সূরাহ আন-নিসা ৪:১৩৫)
এমনকি যাদের সাথে বিরোধ বা ঘৃণার সম্পর্ক বিদ্যমান, তাদের সাথেও মুসলিমদের ন্যায়সঙ্গত কথা বলতে হবে। আল্লাহ বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُونُوا قَوَّامِينَ لِلَّهِ شُهَدَاءَ بِالْقِسْطِ وَلَا يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَآنُ قَوْمٍ عَلَى أَلَّا تَعْدِلُوا
"হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে ন্যায় সাক্ষ্যদানের ব্যাপারে অবিচল থাকবে এবং কোনো সম্প্রদায়ের শত্রুতার কারণে কখনো ন্যায়বিচার পরিত্যাগ কোরো না।” (সূরাহ আল-মায়িদাহ ৫:৮)
এমনকি মুসলিমদের দেশছাড়া করা মুশরিক মক্কাবাসীদের সাথেও আল্লাহ ন্যায়বিচারের হুকুম দিয়েছেন। তিনি বলেন,
وَلَا يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَآنُ قَوْمٍ أَن صَدُّوكُمْ عَنِ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ أَن تَعْتَدُوا، وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَى وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ
“যে সম্প্রদায় তোমাদের পবিত্র মসজিদে যেতে বাধা দিয়েছিল, তাদের প্রতি শত্রুতাবশত তোমরা যেন সীমালঙ্ঘন না করে ফেলো। সৎকাজ ও আল্লাহভীতিতে পরস্পরকে সহযোগিতা করো। আর পাপাচার ও সীমালঙ্ঘনে পরস্পরকে সহযোগিতা কোরো না। আল্লাহকে ভয় করো। তিনি কঠোর শাস্তিদাতা।” (সূরাহ আল-মায়িদাহ ৫:২)
মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত সম্প্রদায়ের সাথেও ন্যায়ানুগ আচরণ করতে হবে। আল্লাহ মুসলিমদের সীমালঙ্ঘন করতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেন:
وَقَاتِلُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ الَّذِينَ يُقَاتِلُونَكُمْ وَلَا تَعْتَدُوا إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْمُعْتَدِينَ (১৯০)
“যারা তোমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে, তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করো; কিন্তু সীমালঙ্ঘন কোরো না। নিশ্চয় আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদের পছন্দ করেন না।” (সূরাহ আল-বাকারাহ ২:১৯০)
নিঃসন্দেহে আল্লাহ সর্বাবস্থায় ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা ফরজ করেছেন। অন্যের ব্যাপারে কথা বলাও এর অন্তর্ভুক্ত। নিজের ব্যাপারে হোক বা পরের ব্যাপারে, মুসলিমের ব্যাপারে হোক বা কাফিরের ব্যাপারে, বড় বিষয়ে হোক বা ছোট বিষয়ে, সবসময় ন্যায়সঙ্গত কথা বলতে হবে।
ইবনু তাইমিয়াহ রহিমাহুল্লাহ লিখেছেন, “ন্যায়বিচার সকলের উপর ফরজ। সবার উপর, সর্বাবস্থায়, সকল স্থানে, সকল সময়ে তা প্রযোজ্য। অবিচার সকলের উপর হারাম। কারো উপর, কোনো অবস্থায়, কোনো স্থানে, কোনো কালে অবিচার করা যাবে না।"
কথাবার্তায় ন্যায়ানুগ হওয়ার প্রধানতম একটি মূলনীতি হলো ঢালাও মন্তব্য পরিহার করা। ঢালাও মন্তব্যের ফলে ভেতরকার অনেক ব্যতিক্রম ও মতপার্থক্যকে উপেক্ষা করা হয়। ব্যক্তিগত দায়দায়িত্বের উপর ইসলাম যে পরিমাণ গুরুত্ব দেয়, তার দাবি হলো প্রত্যেকে নিজ নিজ মত, কথা ও কাজের ব্যাপারে নিজেই সরাসরি দায়ী। একই বর্ণের বা একই সম্প্রদায়ের অন্য কারো কথা বা কাজের জন্য সে নিজে দায়ী হবে না। আল্লাহর কাছেও দায়ী হবে না, মানুষের কাছেও না।
আল্লাহ বলেন,
وَكُلَّ إِنسَانٍ أَلْزَمْنَاهُ طَائِرَهُ فِي عُنُقِهِ وَنُخْرِجُ لَهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ كِتَابًا يَلْقَاهُ مَنشُورًا ﴿١٣﴾
“আর আমি প্রত্যেকের আমলনামা তার তার ঘাড়ে সংযুক্ত করে দিয়েছি। আর কিয়ামতের দিন আমি তার জন্য বের করে আনব উন্মুক্ত এক কিতাব।” (সূরাহ আল-ইসরা ১৭:১৩)
كُلُّ امْرِئٍ بِمَا كَسَبَ رَهِينٌ
“প্রত্যকে নিজ নিজ কৃতকর্মের জন্য দায়ী।” (সূরাহ আত-তূর ৫২:২১)
আল্লাহ আমাদের হুকুম করেছেন সবার সাথে সদাচরণ করতে, কারণ তা ন্যায়বিচার বাস্তবায়নের অধিক নি কটবর্তী।
وَقُولُوا لِلنَّاسِ حُسْنًا
“আর মানুষকে উত্তম কথা বলো।” (সূরাহ আল-বাকারাহ ২:৮৩)
অন্যদের সত্যের দিকে আহ্বান জানানোর সময়ও দয়ালু আচরণ করতে হবে:
ادْعُ إِلَى سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ وَجَادِهُم بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ إِنَّ رَبَّكَ هُوَ أَعْلَمُ بِمَن ضَلَّ عَن سَبِيلِهِ وَهُوَ أَعْلَمُ بِالْمُهْتَدِينَ ﴿١٢٥﴾
“তুমি মানুষকে তোমার প্রতিপালকের পথে আহ্বান করো হিকমাত ও সদুপদেশ দ্বারা এবং তাদের সাথে বিতর্ক করো সর্বোত্তম পন্থায়। তোমার প্রতিপালক ভালো করেই জানেন কে তাঁর পথ ছেড়ে বিপথগামী এবং কে সুপথে আছে।” (সূরাহ আন-নাহল ১৬:১২৫)
মুসলিমদের চিন্তাচেতনায় এর এক ইতিবাচক প্রভাব পড়ার কথা, যার ফলে তারা সর্বদা ন্যায় ও সাম্যের ভিত্তিতে আচরণ করবে। মুসলিম অপরের প্রতি দয়ালু হবে। রাসূল প্রেরণের অন্যতম একটি উদ্দেশ্য হলো সকলের প্রতি দয়া। আল্লাহ বলেন,
وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِلْعَالَمِينَ ﴿١٠٧﴾
“আমি তো আপনাকে সমগ্র জগতের জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেছি।” (সূরাহ আল-আম্বিয়া ২১:১০৭)
দয়া এক মহৎ গুণ। এটি আল্লাহর রাসূলগণের এবং তাঁদের সত্যিকার অনুসারীদের বৈশিষ্ট্য। সুন্নাহর প্রকৃত অনুসারীদের আচরণ সবসময় দয়াপূর্ণ হয়। আল্লাহর নূর ও হিদায়াতের সাথে নৈকট্য যত বাড়বে, সিরাতুল মুস্তাকীমে দৃঢ়তা যত বেশি হবে, ততই মুসলিমের আচরণ দয়ায় ভরপুর হবে।
প্রতিদিন আমরা আল্লাহর কাছে এই বলে দু'আ করি,
الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ ﴿٢﴾ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ ﴿٣﴾ مَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ ﴿٤﴾
“পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু। বিচারদিবসের অধিপতি। আমরা শুধুই আপনার দাসত্ব করি এবং আপনারই কাছে সাহায্যপ্রার্থনা করি। আমাদের সরলপথে চালিত করুন।” (সূরাহ আল-ফাতিহা ১:২-৪)
মানুষকে কথা দিয়ে আক্রমণ করা বা অপবাদ দেওয়া কখনোই উচিত নয়। কারো ব্যাপারে মন্দ ধারণা করা ন্যায়বিচারের প্রধানতম একটি অন্তরায়।
আল্লাহ বলেন,
إِن يَتَّبِعُونَ إِلَّا الظَّنَّ وَمَا تَهْوَى الْأَنفُسُ وَلَقَدْ جَاءَهُم مِّن رَّبِّهِمُ الْهُدَى
"তারা কেবল অনুমানের অনুসরণ করে। সত্যের বিপরীতে ধারণা-অনুমান কোনো কাজে আসে না।” (সূরাহ আন-নাজম ৫৩:২৩)
কেবলই সন্দেহের ভিত্তিতে কিছু করা ঠিক নয়। আল্লাহ এই সমস্যার কথা তুলে ধরে বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اجْتَنِبُوا كَثِيرًا مِّنَ الظَّنِّ إِنَّ بَعْضَ الظَّنِّ إِثْمٌ وَلَا تَحَسَّسُوا وَلَا يَغْتَب بَّعْضُكُم بَعْضًا أَيُحِبُّ أَحَدُكُمْ أَن يَأْكُلَ لَحْمَ أَخِيهِ مَيْتًا فَكَرِهْتُمُوهُ ، وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ تَوَّابٌ رَّحِيمٌ ﴿۱۲﴾
“হে বিশ্বাসীগণ! অত্যধিক ধারণা করা ত্যাগ করো। নিশ্চয় কিছু কিছু ধারণা পাপ। পরস্পরের পেছনে গোয়েন্দাগিরি কোরো না। আর একে অপরের গীবাত কোরো না। তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের মাংস খেতে পছন্দ করবে? বরং তোমরা তা প্রচণ্ড ঘৃণা করে থাকো। আল্লাহকে ভয় করো। আল্লাহ অতিশয় তাওবাহ কবুলকারী, পরম দয়ালু।” (সূরাহ আল-হুজুরাত ৪৯:১২)
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে একে অপরের ব্যাপারে অন্যায় কথাগুলো তৈরি হয় অহেতুক সন্দেহ থেকে। এসব অভিযোগ তারা প্রমাণ করতে পারবে না।
ভিন্নমতাবলম্বীদের সাথেও ন্যায়বিচার করা আবশ্যক। ইবনু তাইমিয়াহ রহিমাহুল্লাহ বলেন, “বিদআতি ও পাপাচারীকে দয়া ও নম্রতার সাথে সংশোধন করতে হবে, রাগ বা প্রতিহিংসার ঝোঁকে নয়।” [২২]
ইসলামের সার্বিক নৈতিক শিক্ষার দাবি হলো ন্যায়পরায়ণ ও দয়ালু আচরণ। এই শিক্ষাগুলো কুরআন-হাদিসের স্পষ্ট দলীল থেকে প্রমাণিত। এমনকি শত্রুর সাথে আচরণের সাধারণ মূলনীতিও ভদ্রতা। এর ফলে শত্রুতা হ্রাস পায় এবং সম্প্রীতি ও সমাধানের দ্বার উন্মোচিত হয়। আল্লাহ বলেন,
وَلَا تَسْتَوِي الْحَسَنَةُ وَلَا السَّيِّئَةُ ادْفَعْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ فَإِذَا الَّذِي بَيْنَكَ وَبَيْنَهُ عَدَاوَةٌ كَأَنَّهُ وَلِيٌّ حَمِيمٌ ﴿٣٤﴾ وَمَا يُلَقَّاهَا إِلَّا الَّذِينَ صَبَرُوا وَمَا يُلَقَّاهَا إِلَّا ذُو حَظٍّ عَظِيمٍ ﴿٣٥﴾ "ভালো ও মন্দ সমান নয়। মন্দকে প্রতিহত করো উত্তম দিয়ে। তাহলে দেখবে তোমার সাথে যার শত্রুতা রয়েছে, সে তোমার অন্তরঙ্গ বন্ধু হয়ে যাবে। ধৈর্যশীল ও আত্মসংযমী ছাড়া আর কেউই এই কল্যাণের অধিকারী হতে পারে না। আর তারাই মহাভাগ্যবান।” (সূরাহ ফুসসিলাত ৪১:৩৪- ৩৫)
গালমন্দ, অপমান ও দোষত্রুটি বড় করে দেখানোর মাধ্যমে শত্রুতা লাগানো কঠিনতম অবিচার। আর সত্যের চাদর দিয়ে নিজের অবিচার ঢাকতে চাওয়া তো আরো বড় অন্যায়। কুরআনের বাণী, ইসলামের শিক্ষা আর আলিমদের উক্তিকে নিজের ঘৃণা উদগীরণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা কতই না হীন আচরণ! মতভেদকে ছুতো বানিয়ে জুলুম উস্কে দেওয়ার ব্যাপারে মুসলিমদের সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ বলেন,
كَانَ النَّاسُ أُمَّةً وَاحِدَةً فَبَعَثَ اللَّهُ النَّبِيِّينَ مُبَشِّرِينَ وَمُنذِرِينَ وَأَنزَلَ مَعَهُمُ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ لِيَحْكُمَ بَيْنَ النَّاسِ فِيمَا اخْتَلَفُوا فِيهِ ، وَمَا اخْتَلَفَ فِيهِ إِلَّا الَّذِينَ أُوتُوهُ مِن
টিকাঃ
[২২] মিনহাজুস সুন্নাহ ৫/২৩৯