📄 প্রতিপক্ষ সঠিক হলে সন্তুষ্ট থাকুন
ইন্টারনেটে আজকাল আরবি ভাষায় নতুন ধরণের অনেক লেখা দেখা যায়। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ও সেগুলোর সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে প্রশংসনীয় ও সাহসী লেখালেখি হচ্ছে। এ এক নবযুগের সূচনা। নীরবতার যুগ শেষ হয়ে গেছে। এসেছে অংশগ্রহণ, স্পষ্টবাদিতা ও মুক্ত আলোচনার জামানা।
এই পরিবর্তনকে স্বাগত জানানোর অনেক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি কারণ হলো সমাজের সদস্য হিসেবে প্রত্যেকের নিজের সঠিক ভূমিকা ও দায়িত্ব পালনের ভিত্তি তৈরি হওয়া। এর ফলে সামাজিক স্থিতিশীলতা ও দৃঢ়তা বৃদ্ধি পাবে। অবিচার, বঞ্চনা আর অধিকারহীনতার স্বাভাবিক ফলাফল হলো মনের অস্থিতিশীল দশা।
স্বাধীনতা ও মধ্যমপন্থার আলো-বাতাসেই গড়ে ওঠে পরিমিতিবোধসম্পন্ন ও বুদ্ধিমান জনবল। এ কারণেই নবিজি (ﷺ) সবসময় বিনয়ী থাকতেন এবং মানুষকে বকাঝকা ও জোরাজুরি করা থেকে বিরত থাকতেন। দাসের গায়েও কখনও তিনি হাত তোলেননি, একটি বারের জন্যও না। স্ত্রীর গায়ে হাত তোলা তো দূরের কথা। শরিয়তের শাস্তিবিধান ও যুদ্ধের ময়দান ছাড়া কখনও তিনি কাউকে আঘাত করেননি।
নবিজি (ﷺ) গনিমতের মাল বণ্টন করার সময় একবার এক লোক খেঁকিয়ে উঠল, "সুবিচার করুন, মুহাম্মাদ!” তিনি (ﷺ) জবাবে কেবল বললেন, "হায় রে! আমিই যদি সুবিচার না করি তো কে করবে?”
আরেকবার এক লোক বলল, "আল্লাহর কসম! আজকের মাল বণ্টন না ইনসাফের হয়েছে, না আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য।” নবিজি (ﷺ) তা শুনে বললেন, “আল্লাহ তাআলা মূসাকে রহম করুন। তাঁকে এরচেয়েও বেশি যন্ত্রণা সইতে হয়েছে, অথচ তিনি ধৈর্য ধরে ছিলেন।”
রাসূল (ﷺ)-এর প্রতি আল্লাহর নাযিলকৃত এই আয়াতগুলো দেখুন:
يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ اتَّقِ اللَّهَ وَلَا تُطِعِ الْكَافِرِينَ وَالْمُنَافِقِينَ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلِيمًا حَكِيمًا ﴿۱﴾
“হে নবি! আল্লাহকে ভয় করুন। কাফির ও মুনাফিকদের মান্য করবেন না। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞানী, সর্বজ্ঞ।” (সূরাহ আল-আহযাব ৩৩:১)
وَتَخْشَى النَّاسَ وَاللَّهُ أَحَقُّ أَن تَخْشَاهُ
“আপনি কি মানুষকে ভয় করেন? অথচ আল্লাহই এর অধিক হকদার।” (সূরাহ আল-আহযাব ৩৩:৩৭)
وَلَا تَكُن لِلْخَائِنِينَ خَصِيمًا ﴿١٠٥﴾
“খিয়ানতকারীদের পক্ষে ওকালতি করবেন না।” (সূরাহ আন-নিসা ৪:১০৫)
أَلَمْ يَجِدْكَ يَتِيمًا فَآوَى ﴿٦﴾ وَوَجَدَكَ ضَالَّا فَهَدَىٰ ﴿۷﴾ وَوَجَدَكَ عَائِلًا فَأَغْنَى ﴿٨﴾
"তিনি কি আপনাকে অনাথ হিসেবে পাননি? পরে তিনি আশ্রয় প্রদান করেছেন। আর তিনি আপনাকে পেয়েছেন পথ সম্পর্কে অনবহিত। অতঃপর আপনাকে তিনি পথ দেখিয়েছেন। আর তিনি আপনাকে পেয়েছেন অভাবগ্রস্ত। অতঃপর প্রাচুর্য দিয়েছেন।” (সূরাহ আদ-দুহা ৯৩:৬-৮)
مَا كَانَ لِنَبِي أَن يَكُونَ لَهُ أَسْرَى حَتَّى يُثْخِنَ فِي الْأَرْضِ تُرِيدُونَ عَرَضَ الدُّنْيَا وَاللَّهُ يُرِيدُ الْآخِرَةَ
"ভূমিতে পূর্ণরূপে কর্তৃত্ব স্থাপনের আগ পর্যন্ত নবির কাছে (জীবিত) যুদ্ধবন্দী থাকা শোভনীয় নয়। তোমরা তো এই দুনিয়ার স্বার্থ চাও। অথচ আল্লাহ তোমাদের জন্য চান আখিরাত।” (সূরাহ আল-আনফাল ৮:৬৭)
হোমরা-চোমরা লোকদের ইসলামের দিকে আহ্বান করার সময় এক অন্ধ ব্যক্তির প্রতি অনিচ্ছাকৃত বিরক্তি চেহারায় প্রকাশ করে ফেলায় নবিজি (ﷺ)- এর উদ্দেশ্যে আল্লাহ বলেন,
عَبَسَ وَتَوَلَّىٰ ﴿١﴾ أَن جَاءَهُ الْأَعْمَىٰ ﴿۲﴾
“সে ভ্রু কুঞ্চিত করল এবং মুখ ফিরিয়ে নিল, যখন অন্ধ ব্যক্তিটি তার কাছে এলো।” (সূরাহ আবাসা ৮০:১-২)
এই আয়াতগুলোতে নবিজি (ﷺ) এর প্রতি যথেষ্ট সমালোচনা করা হয়েছে। আয়াতগুলো এমন এক সময় নাজিল হয়েছে, যখন নবিজি (ﷺ)-কে মুনাফিক, শত্রুভাবাপন্ন কাফির ও দুর্বল ঈমানদারদের উপর কাজ করতে হচ্ছিল। তারপরও মানুষকে এই আয়াতগুলো তাঁর তিলাওয়াত করে শোনাতে হয়েছে। কারণ এগুলো তো কুরআনেরই অংশ! এমনকি উম্মাতকে বলতে হয়েছে এই আয়াতগুল আত্মস্থ করতে এবং সালাতে পাঠ করতে।
নবিজি (ﷺ)-কে দুই রকম অবস্থা থেকে একটি বেছে নেবার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। হয় রাজা-নবি, নয়তো বান্দা-রাসূল। তিনি বান্দা-রাসূল হওয়াকেই বেছে নেন। তিনি বাদশাহর ভাব ধরে থাকতেন না, স্বৈরশাসকের মতো নিজের উপস্থিতি জানান দিতেন না। এক বেদুইন একবার তাঁকে দেখে অস্বস্তিতে কাঁপতে লাগল। নবি (ﷺ) বললেন, “শান্ত হও। আমি তো কেবল এক নারীর সন্তান, যার আহার্য ছিল শুকনো মাংস।”
নবি (ﷺ)-এর একজন শক্তিশালী ও প্রতাপশালী সাহাবি ছিলেন উমর ইবনুল রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু। তাঁর খিলাফত আমলে উবাই বিন কা'ব রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু তাঁর সাথে একটি ইলমি বিষয়ে মতভেদ করেন। উবাই বলেন, “খাত্তাবের ছেলে! নবিজির সাহাবিগণের কষ্টের কারণ হয়ো না।”
উমর একটুও চটে না গিয়ে বললেন, “ওহ! আমি তাহলে নবিজি (ﷺ)-এর দেওয়া এই তথ্যটি শুনতে পাইনি। আসলে এই ব্যবসা আর হাট-বাজার আমাকে ব্যস্ত করে ফেলেছিল।”
আচরণের এই নম্রতা-ভদ্রতাগুলো আমাদের মাঝে ফিরিয়ে আনতে হবে। আজকের চ্যালেঞ্জিং পৃথিবীতে এর প্রয়োজনীয়তা আরো বেশি।
বর্তমান যুগে একাধিক মত ও পথকে গ্রহণ করার মানসিকতা গড়ে তোলার নানবিধ প্রয়োজনীয়তা আছে। এর মধ্যে অনেকগুলোই ঠিক ইসলামি নিয়মকানুনের সাথে সম্পর্কিত না। যেমন আধুনিক পৃথিবী, মিডিয়া, অর্থনীতি ও রাজনীতি আগের চেয়ে অনেক বেশি উন্মুক্ত। পৃথিবীর শক্তিশালী সব জাতি মিলেও এই গণমুক্তির উত্থান রুখতে পারেনি, সেখানে আপনি-আমি কোন ছার? এ থেকে অনেকের মনে হতে পারে যে, এই পরমতসহিষ্ণুতাও আমাদের উপর চাপিয়ে দেওয়া একটা জিনিস। বিষয়টাকে আসলে এভাবে দেখা ঠিক নয়। এটি বরং বিরাট এক সুযোগ। স্বীকার করছি যে, মানুষ যেটাতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে সেটা ছেড়ে দেওয়া কঠিন। এর ফলে এমন অনেক বিতর্ক-বিভেদ দেখা দিতে পারে, যার ভয়াবহতা নিয়ে অনেক ইসলামি কর্মীই চিন্তিত। এ কারণেই ইসলামি কর্মীরা অনেক অসুবিধা সত্ত্বেও মতের পার্থক্যকে স্বাগত জানান। এর মাধ্যমেই নবি (ﷺ) ও সাহাবা আজমাইনের সময়কার মতো পরিবেশ সৃষ্টি করা সম্ভব। ওই সময়টায় ইসলামি কর্মকাণ্ড ইতিহাসের ভারে ন্যুব্জ হয়ে ছিল না। এভাবেই আদর্শিক ও সামাজিক সংকীর্ণতা কমিয়ে এনে স্বাধীনতার ইসলামি পরিমিতিবোধ অনুসরণ করা সম্ভব।
ইলেকট্রনিক মিডিয়ার মাধ্যমে আজ আমরা যেই স্বাধীনতা লাভ করেছি, অনেকেই তার সদ্ব্যবহার করতে জানে না। আমাদের নিকট অতীত ছিল নতুন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে নতুন নতুন জিনিস শেখার যুগ। ইন্টারনেটভিত্তিক স্বাধীনতা অপব্যবহারকারীদের কুৎসিত ভাষা ও আচরণের ব্যাপারে দুশ্চিন্তা কমানোর জন্য আমাদের এভাবেই পরিস্থিতিকে বোঝা উচিত। অসংখ্য মানুষ কী বলছে, তা না বুঝেই নিজের মত প্রচারে ব্যস্ত। এর অনুষঙ্গ হিসেবে থাকে আলোচনায় অপর পক্ষের অধিকারের প্রতি অসম্মান আর (সত্যিকার বা কাল্পনিক) মতপার্থক্যের প্রতি অসহিষ্ণুতা।
কখনো কখনো মতভেদ সত্যি সত্যিই থাকে এবং সেগুলো হওয়ারই কথা। তাই এসব মতপার্থক্য দেখে আঁতকে উঠার কিছু নেই। কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায় প্রতিপক্ষকে বিদ্রূপকারীর মতটিই আসলে ভুল। অথচ সে অজ্ঞতাবশত সত্যকে প্রত্যাখ্যান করে প্রতিপক্ষকে দোষ দিয়ে চলেছে। আবার কিছু ক্ষেত্রে সত্যিকার কোনো মতপার্থক্য থাকেই না। শব্দের ব্যবহারের ভিন্নতা নিয়েই নিষ্ফল বিতর্ক চলতে থাকে।
তাই আলোচনার ক্ষেত্রে আমাদের আচরণ উন্নত করা এখন দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে। মতভেদের ক্ষেত্রে কীরূপ ব্যবহার করা হবে, তার নৈতিক মানদণ্ড উঁচু করার সময় এসেছে। এই আচরণবিধির সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে কুরআন ও সুন্নাহতে।
কারো কারো ধারণা আমরা এতই নতুন ধরনের সময়ে বাস করছি যে, পূর্ববর্তী সৎকর্মশীল প্রজন্মগুলোর কাউকে অনুসরণ করার কোনো মানেই নেই। এটা একেবারেই ভুল চিন্তা। নবিজি (ﷺ) কখনো দুর্বল, কখনো শক্তিশালী অবস্থানে থেকেছেন। তেমনি মুসলিম উম্মাহও কোনোকালে ক্ষুদ্রসংখ্যক আবার কোনোকালে বিপুল সংখ্যক ছিল। নবিজি (ﷺ) বন্ধুভাবাপন্ন মানুষদের উপরও যেমন কাজ করেছেন, শত্রুভাবাপন্ন মানুষদের উপরও কাজ করেছেন। ইয়াহুদী, খ্রিষ্টান, মূর্তিপূজারি সব ধরনের মানুষের সাথেই তাঁর কাজ করতে হয়েছে। মদিনার মুনাফিকদেরও সামলাতে হয়েছে। দুর্বল ঈমানের মুসলিমদের সামলাতে হয়েছে। পরবর্তী যুগগুলোর মতো সে যুগেও মুসলিমদের মাঝে মতপার্থক্য হয়েছে।
আমাদের ঈমানের সাধারণ মূলনীতিগুলোর উপর বেশি জোর দিতে হবে, ব্যক্তিগত মতের বিষয়গুলোতে নয়। কোনোকিছুকে সালফে সালিহীনের অনুসৃত পদ্ধতি বলে দাবি করলে একদম নিশ্চিত হয়ে নিতে হবে যে, সাধারণভাবে এটিই তাঁদের পদ্ধতি। দুই-একজনের বিচ্ছিন্ন মত নয়। সেগুলোও তাঁদের ব্যক্তিগত মত, যা আমরা গণহারে মেনে নিতে বাধ্য নই। আমরা তিনটি জিনিস গ্রহণ করতে বাধ্য:
১। কুরআন ২। সুন্নাহ ৩। সুনিশ্চ
📄 কটাক্ষ করা: একটি আধুনিক কালচার
অনেকের স্বভাবটাই রূঢ় আর কর্কশ। তাদের বিশ্রী বিশ্রী কথাগুলোতে কোনো শক্তিশালী যুক্তি বা প্রমাণ থাকে না, থাকে শুধু অপমান আর কটাক্ষ। নবিজি (ﷺ) বলেন,
ا يَكُونُ اللَّعَانُونَ شُفَعَاءَ وَلَا شُهَدَاءَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ “অভিসম্পাতকারীরা কিয়ামতের দিন সুপারিশকারী হতে পারবে না।”[১৮] তিনি (ﷺ) আরো বলেন,
لَيْسَ الْمُؤْمِنُ بِالطَّعَانِ وَلَا اللَّعَانِ وَلَا الْفَاحِشِ وَلَا الْبَدِيءِ “মুমিন কখনও গালমন্দকারী বা অভিসম্পাতকারী হতে পারে না। সে নীচ বা অশ্লীল স্বভাবের হয় না।”[১৯] নবি (ﷺ)-কে যারা ভালোবাসে এবং হাশরের ময়দানে তাঁর সাথে থাকতে চায়, তাদের এই কথাগুলো মেনে চলা উচিত। অর্থাৎ, ভালো কথা ছাড়া একটা শব্দও যেন আমাদের মুখ থেকে বের না হয়। নবিজি (ﷺ)-এর আদেশ,
وَمَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلْيَقُلْ خَيْرًا أَوْ لِيَصْمُتْ "...আল্লাহ ও আখিরাতের প্রতি যে ঈমান রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে অথবা চুপ থাকে।”[২০]
আল্লাহ সে ব্যক্তির উপর রহম করুন, যে ভালো কথা বলে পুণ্য অর্জন করে অথবা চুপ থেকে নিজেকে নিরাপদ রাখে।
মানুষে মানুষে মতভেদ খারাপ কিছু নয়। বিশেষত এই ফিতনার জামানায়। তবে মতভেদ করার সঠিক পদ্ধতি হলো স্পষ্ট যুক্তি ও শান্ত কথাবার্তা। আমাদের কথা যেন আমাদের অন্তরের পরিশুদ্ধি, মানসিক শক্তি আর চরিত্রের সৌন্দর্যের প্রমাণ বহন করে।
মুসলিম বিশ্ব যে অসংখ্য সমস্যায় জর্জরিত, তা তো দেখতেই পাচ্ছেন। এ যেন ঝড়ের কবলে দোদুল্যমান এক জাহাজ, যার যাত্রীরা ডুবে যাবার ভয়ে ভীত। কী দয়ালু, কী শান্ত, কী অস্থিরচিত্ত—সকলের কণ্ঠস্বর একসাথে মিশে গেছে। আর একটি কণ্ঠস্বর আছে, যেটি নিজেকে ছাড়া ডানে-বামে সকলকে গালমন্দ আর অপমান করতে থাকে। নিজেকে সে গালি দেবেই বা কেন? এ তো নিজেকে ভাবে যুগের ত্রাতা, যে মূর্খ-দুর্বল-দুনিয়ালোভীদের স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে সবকিছু ঠিক করে ফেলবে। বাস্তবতা আসলে বিপরীত। সবচেয়ে খারাপ লোক তো সে-ই, যে শুধু নিজের মধ্যে সব কল্যাণ আর অপরের মধ্যে সব অকল্যাণ দেখে। আমাদের ভাই ও বোনেরা আমাদেরই অংশ। নিজেকে যতটা সম্মান করি, তাঁদেরও ততটুকুই সম্মান দিতে হবে।
আল্লাহ বলেন, وَلَوْلَا إِذْ سَمِعْتُمُوهُ ظَنَّ الْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنَاتُ بِأَنفُسِهِمْ خَيْرًا وَقَالُوا هَذَا إِفْكٌ مُّبِينٌ ﴿١٢﴾
“মুমিন নারী-পুরুষরা যখন তা শুনতে পেল, তখন তারা নিজেদের লোকদের ব্যাপারে সুধারণা কেন করল না?” (সূরাহ আন-নূর ২৪:১২)
আল্লাহ আরো বলেন, وَلَا تَلْمِزُوا أَنفُسَكُمْ وَلَا تَنَابَزُوا بِالْأَلْقَابِ بِئْسَ الِاسْمُ الْفُسُوقُ بَعْدَ الْإِيمَانِ ۚ وَمَن لَّمْ يَتُبْ فَأُولَئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ ﴿١١﴾
"পরস্পরের নিন্দা কোরো না, একে অপরকে খারাপ নামে ডেকো না। ঈমান আনার পর খারাপ কথা বলা কতই না মন্দ! যারা তাওবাহ করে না, তারাই যালিম।” (সূরাহ আল-হুজুরাত ৪৯:১১)
ইন্টারনেট আজ আমাদের দিয়েছে অন্যকে অপমান করার এক অত্যাধুনিক পদ্ধতি—ডিজিটাল অপমান! আজকাল মানুষ তাদের কুৎসা-অপমানগুলো বিনা পয়সায়, বিনা দায়বদ্ধতায়, যাচ্ছেতাই শব্দে, নিজের নাম সহ প্রকাশ করতে পারে।
এসব কাজ যারা করছে, তারা নিজেদের পাপ ফলাও করে দেখিয়ে বেড়াচ্ছে। নবিজি (ﷺ) বলেছেন,
كُلُّ أُمَّتِي مُعَافَاةٌ إِلَّا الْمُجَاهِرِينَ
“আমার সমগ্র উম্মাহকে ক্ষমা করা হবে, শুধু নিজেদের পাপ প্রকাশ করে বেড়ানো ব্যক্তিদের ছাড়া।”[২১]
পরিচয় গোপন রেখে ছদ্মনামে আত্মপ্রকাশ করার সুযোগও করে দিয়েছে ইন্টারনেট। দুর্ভাগ্যবশত যৌক্তিক ও ভারসাম্যপূর্ণ কথাগুলো খুব একটা শ্রোতা টানে না। উল্টোদিকে ডিজিটাল গালিবাজেরা তার সমর্থক ও সমালোচকদের মনোযোগ পেয়ে খুশিতে বাকবাকুম করে। এর কাছে এমনও মনে হতে পারে যে, সে নতুন করে ইতিহাস রচনা করছে!
মোবাইল ফোন হলো এই কাজের আরেক কাজী। এসএমএসের মাধ্যমে জঘন্যতম কথাবার্তাও মুহূর্তেই ছড়িয়ে যায়। এসব কাজ করে অনেকে নিজেকে আবার খুব সাহসী ভাবে। চোর যেমন খুব সাহসিকতার সাথে সিঁধ কাটে, ওরকম সাহসী আরকি। সর্বনাশ হওয়াকে কিছু মানুষ কীভাবে যে এত ভালোবাসে!
নবি (ﷺ) বলেছেন,
"আমার আর আমাদের উম্মাতের উপমা হলো আগুন জ্বালানো এক ব্যক্তির মতো। আগুনে চারপাশ আলোকিত হলে পোকামাকড় এসে আগুনে পড়তে থাকে। সেই ব্যক্তি তাদের দূরে রাখার চেষ্টা করেও সংখ্যাগরিষ্ঠের কারণে পেরে ওঠে না। একইভাবে আমিও তোমাদের কাপড় টেনে ধরে আগুন থেকে দূরে সরাচ্ছি। কিন্তু তোমরা আগুনের দিকে হুমড়ি খেয়ে পড়ছ।” (সহিহ আল-বুখারি এবং সহিহ মুসলিম)
ইলেকট্রনিক মিডিয়ার অপব্যবহার খুবই গর্হিত একটি কাজ। এসব কাজ যারা করে, তারা মূল্যবোধহীন। নীচ লালসা, অন্ধ আক্রোশ আর অযথা বিদ্বেষ তাদের চালিকাশক্তি। যারা মনে করে এ কাজ করে তারা হক আর ঈমানের প্রতিরক্ষা করছে, তারা আরো বড় ধোঁকায় পড়ে আছে।
প্রযুক্তির এই যুগে আজ মানুষ টাকা খরচ করে অপমানিত হচ্ছে। কিছুদিন আগে একটি বিদেশী নম্বর থেকে আমার এক বন্ধুর কাছে এসএমএস আসে, যেন জরুরি ভিত্তিতে সে কল করে। কল করে সে এক ঘণ্টা যাবত ওপাশ থেকে শুধু গালাগাল শুনল। আমি এ ঘটনা শুনে হাসতে হাসতে বললাম, "পয়সা খরচা করে অপমানিত হলে তাহলে!”
কটাক্ষ করার এই কালচারের মাঝে আমরা যারা নিজেদের সিরাতুল মুস্তাকীমে রাখতে চাই, তাদের এই পরামর্শগুলো মেনে চলতে হবে:
১। এ ধরনের আচরণ ও আচরণকারীদের থেকে আমরা মুখ ফিরিয়ে নেব। কুরআন আমাদের ঠিক এটাই বলে:
خُذِ الْعَفْوَ وَأْمُرْ بِالْعُرْفِ وَأَعْرِضْ عَنِ الْجَاهِلِينَ ﴿۱۹۹﴾
"ক্ষমা করতে থাকো, ভালো কাজের আদেশ করতে থাকো; আর অজ্ঞদের এড়িয়ে চলো।” (সূরাহ আল-আ'রাফ ৭:১৯৯)
وَإِذَا سَمِعُوا اللَّغْوَ أَعْرَضُوا عَنْهُ وَقَالُوا لَنَا أَعْمَالُنَا وَلَكُمْ أَعْمَالُكُمْ سَلَامٌ عَلَيْكُمْ لَا نَبْتَغِي الْجَاهِلِينَ ﴿٥٥﴾
“নিরর্থক কথাবার্তা থেকে তারা মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বলে, 'আমাদের কাজের ফল আমরা পাব, তোমাদের কাজের ফল তোমরা পাবে; তোমাদের প্রতি সালাম; অজ্ঞদের সাথে আমাদের কোনো লেনাদেনা নেই।” (সূরাহ আল-কাসাস ২৮:৫৫)
قَدْ أَفْلَحَ الْمُؤْمِنُونَ ﴿ا﴾ الَّذِينَ هُمْ فِي صَلَاتِهِمْ خَاشِعُونَ ﴿٢﴾ وَالَّذِينَ هُمْ عَنِ اللَّغْوِ مُعْرِضُونَ ﴿۳﴾
“নিশ্চয় মুমিনরা সফল হয়ে গেছে, যারা তাদের সালাতে বিনয়-নম্র এবং অসার কথাবার্তায় নির্লিপ্ত।” (সূরাহ আল-মুমিনূন ২৩:১-৩)
নবিজির একটি বৈশিষ্ট্য ছিল অজ্ঞদের কাজকারবারের জবাবে তিনি আরো ভদ্র আচরণ করতেন।
২। আমরা এরচেয়ে উত্তম কিছু দিয়ে জবাব দিতে পারি। অর্থাৎ, আমরা কটাক্ষকারীদের জন্য আল্লাহর কাছে দু'আ করব ও তাদের জন্য ক্ষমা চাইব। বাজে কথার জবাবে সুন্দর কথা বলব। এই আদেশটির কথাও কুরআনে বেশ কয়েকবার এসেছে:
ادْفَعْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ السَّيِّئَةَ “মন্দকে প্রতিহত করো উত্তম দিয়ে।” (সূরাহ আল-মুমিনূন ২৩:৯৬)
وَقُولُوا لِلنَّاسِ حُسْنًا "আর মানুষের সাথে সদালাপ করবে।” (সূরাহ আল-বাকারাহ ২:৮৩)
أُولَئِكَ يُؤْتَوْنَ أَجْرَهُم مَّرَّتَيْنِ بِمَا صَبَرُوا وَيَدْرَءُونَ بِالْحَسَنَةِ السَّيِّئَةَ وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنفِقُونَ ﴿٥٤﴾ ৪৯ "এরা দ্বিগুণ প্রতিদান পাবে। কারণ তারা অবিচল থেকেছে এবং মন্দকে ভালো দিয়ে প্রতিহত করেছে; আর আমি তাদের যে রিযিক দিয়েছি, তা থেকে খরচ করেছে।” (সূরাহ আল-কাসাস ২৮:৫৪)
৩। আমরা ভাবগাম্ভীর্য বজায় রেখে শান্ত থাকব। জীবনের পথ বড় দীর্ঘ। এখানে একটু শান্তি আর বিশ্রাম দরকার। আল্লাহ বলেন,
هُوَ الَّذِي أَنزَلَ السَّكِينَةَ فِي قُلُوبِ الْمُؤْمِنِينَ “তিনিই মুমিনদের অন্তরে প্রশান্তি স্থাপন করেছেন।” (সূরাহ আল-ফাতহ ৪৮:৪)
নবিজি (ﷺ)-এর ব্যাপারে আল্লাহ বলেন,
ثُمَّ أَنزَلَ اللَّهُ سَكِينَتَهُ عَلَى رَسُولِهِ “তারপর তাঁর প্রতি আল্লাহ নিজের পক্ষ থেকে প্রশান্তি নাযিল করলেন।” (সূরাহ আত-তাওবাহ ৯:২৬)
নবিজি (ﷺ)-কে আল্লাহ বলেন,
وَاصْبِرْ وَمَا صَبْرُكَ إِلَّا بِاللَّهِ ، وَلَا تَحْزَنْ عَلَيْهِمْ وَلَا تَكُ فِي ضَيْقٍ مِمَّا يَمْكُرُونَ ١٢٧ “ধৈর্য ধরো, তোমার ধৈর্য তো কেবল আল্লাহর পক্ষ থেকে। ওদের কার্যকলাপে তুমি দুঃখিত হয়ো না। আর ওদের ষড়যন্ত্রের কারণে অন্তরে কুণ্ঠাবোধ কোরো না।” (সূরাহ আন-নাহল ১৬:১২৭)
টিকাঃ
[১৮] সহিহ মুসলিম: ২৫৯৮
[১৯] সুনান তিরমিযি: ১৯৭৭
[২০] সহিহ আল বুখারি: ৬১৩৬
[২১] সহিহ মুসলিম: ২৯৯০
📄 কথা সত্য, মতলব খারাপ
একটি কনফারেন্সের সভাপতিত্ব করছিলেন এক নারী। সেই কনফারেন্সে অংশগ্রহণকারী এক পুরুষ তাঁর উপর ক্ষেপে গেলেন। বিশেষত নিয়ম-কানুন মানার প্রতি তাঁর দৃঢ়তা দেখে। যেমন বক্তাদের সময় নির্দিষ্ট করা, আসনবিন্যাস, আলোচনার কঠিন জায়গাগুলোর সংক্ষেপে উপসংহার টানা, আর আরবি ভাষায় দক্ষতার “ভান” করা।
সেই পুরুষ বক্তার যখন কথা বলার পালা এলো, তিনি বলে উঠলেন, “যে জাতি নারীকে নেতৃত্বের স্থানে বসায়, তারা সফল হবে না।”
এই হাদিসের বিস্তারিত ব্যাখ্যা ও এ থেকে প্রাপ্ত বিধিবিধান আলোচনা করা এখানে আমাদের উদ্দেশ্য নয়। আমাদের আলোচ্য হলো এই লোক কীভাবে নবি (ﷺ)-এর একটি কথাকে অপ্রাসঙ্গিকভাবে উদ্ধৃত করে নিজের মনের ঝাল মেটাল। নবিজি (ﷺ)-এর কথা ব্যবহার করে সস্তা ফায়দা নেওয়া কি ঠিক?
আরেকবার টাকা-পয়সা সংক্রান্ত ব্যাপারে এক লোকের সাথে তার প্রতিবেশী আত্মীয়ের মনোমালিন্য হলো। তাঁরা একটা ব্যবসায়িক কারবার শুরু করে লস খেয়েছেন। অনেক আশা-ভরসা ছিল এটা নিয়ে। কিন্তু কিছুই হলো না। উল্টো ঝগড়া লেগে গেল তাদের মাঝে।
কিছুদিন পর একটি পারিবারিক অনুষ্ঠান তাদের আবার কাছে নিয়ে এল। সালাতের সময় হলে ওই দুইজনের একজন এগিয়ে এসে ইমামতি করলেন। অবাক হওয়ার কিছু নেই। ইসলামি পড়াশোনায় তিনি জামিয়া (বিশ্ববিদ্যালয়) থেকে সনদপ্রাপ্ত।
কিন্তু তিনি সালাতে কী তিলাওয়াত করলেন, জানেন? প্রথম রাক'আতে,
وَلَا تَحْسَبَنَّ اللَّهَ غَافِلًا عَمَّا يَعمَلُ الظَّالِمُونَ ، إِنَّمَا يُؤَخِّرُهُمْ لِيَوْمٍ تَشْخَصُ فِيهِ الْأَبْصَارُ ﴿٤٢﴾
"অপরাধীরা যা করে, সে ব্যাপারে আল্লাহকে উদাসীন ভেবো না। তিনি তো তাদের সাময়িক অবকাশ দিচ্ছেন সেই দিনের আগ পর্যন্ত, যেদিন চোখগুলো বিস্ফারিত হয়ে যাবে।” (সূরাহ ইবরাহিম ১৪:৪২)
দ্বিতীয় রাক'আতে, أَلَمْ تَرَ كَيْفَ فَعَلَ رَبُّكَ بِأَصْحَابِ الْفِيلِ ١
"তুমি কি দেখোনি আল্লাহ হাতিওয়ালাদের সাথে কী আচরণ করেছেন?” (সূরাহ আল-ফীল ১০৫:১)
তিনি কীসের প্রতি ইঙ্গিত করছেন, তা সবাই স্পষ্ট বুঝল। সেসময় আদালতে ওই দুই আত্মীয়ের মাঝে মামলা চলছিল। এমনই এক সময় একজন আরেকজনের দিকে একদম অপ্রাসঙ্গিকভাবে কুরআনের আয়াত ছুঁড়ে মারল।
আল্লাহর কালামকে এভাবে ব্যবহারের অনুমতি তিনি আমাদের দেননি। এগুলো নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে, নির্দিষ্ট প্রসঙ্গে নাযিল হয়েছে। আমাদের ব্যক্তিগত ঝগড়াঝাঁটিতে ব্যবহৃত হবার জন্য নয়। অপমান করে প্রতিপক্ষকে ক্ষেপিয়ে তোলার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হবার জন্যে নয়। কুরআন তো বরং মুমিনদের জন্য প্রশান্তি ও আরোগ্য হবার কথা।
এখানেই শেষ নয়। সালাত শেষে মানুষ তখনও উঠে যায়নি। তিনি এই সুযোগে বলতে লাগলেন যে, কীভাবে কিছু মানুষ সালাত আদায় করেও কেবল আল্লাহর কাছ থেকে আরো দূরে সরে যায়। বিশেষত যারা অন্যের টাকা অবৈধভাবে আত্মসাৎ করে...ইত্যাদি...ইত্যাদি... (উল্লেখ্য, এই হাদিসটি সহিহ বলে প্রমাণিত নয়)।
এটি দ্বীনি জ্ঞানের খিয়ানত। আল্লাহ আমাদের যে আয়াত ও হাদিসগুলো শেখার সৌভাগ্য দিয়েছেন, সেগুলো ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার করাটা দুঃখজনক। পরিস্থিতি আরো খারাপ হয় যখন দ্বীনের ব্যাপারে কম জ্ঞানসম্পন্ন মানুষেরা রাগের মাথায় সেই আয়াত বা হাদিসকেই অস্বীকার করে বসে।
মুশরিকদের ব্যাপারে আল্লাহ আমাদের বলেন,
وَلَا تَسُبُّوا الَّذِينَ يَدْعُونَ مِن دُونِ اللَّهِ فَيَسُبُّوا اللَّهَ عَدْوًا بِغَيْرِ عِلْمٍ
“আল্লাহর পাশাপাশি তারা যেসবের উপাসনা করে, সেগুলোকে গালমন্দ কোরো না। তাহলে তারাও অজ্ঞতাবশত আল্লাহকে গালমন্দ করবে।” (সূরাহ আল-আন'আম ৬:১০৮)
নিজেদের অন্তর পরিশুদ্ধ রাখতে হলে সবসময় স্মরণে রাখতে হবে যে, আল্লাহর বাণী পৌঁছে দেওয়া একটি আমানত। মানুষের কাছে আল্লাহ, তাঁর দ্বীন ও তাঁর নবি (ﷺ)-কে প্রিয় করে তুলতে হবে। তার মানে ব্যক্তিগত ঝগড়ায় এই আমানত ব্যবহার করে নিজের পয়েন্ট বাড়ানো যাবে না। ধর্মীয় সত্যকে এই পর্যায়ে নামিয়ে আনা মহা অন্যায়।
আল্লাহ বলেন,
وَلاَ تَعْجَلْ بِالْقُرْآنِ مِن قَبْلِ أَن يُقْضَى إِلَيْكَ وَحْيُهُ وَقُل رَّبِّ زِدْنِي عِلْمًا ﴿١١٤﴾
"তোমার প্রতি ওহী সম্পূর্ণ হওয়ার আগে তুমি কুরআনের ব্যাপারে তা আত্মস্থ করার ব্যাপারে তাড়াহুড়া কোরো না। বরং বলো, 'হে আমার প্রতিপালক! আমার জ্ঞান বৃদ্ধি করে দিন।” (সূরাহ তা-হা ২০:১১৪)
📄 দ্বীনের চালে স্বার্থ হাসিল
আমি একবার এমনি কথাচ্ছলে একটা ধারণার কথা বললাম। এমনি মাথায় আসা একটি চিন্তা, এ নিয়ে আমি মোটেও নিশ্চিত ছিলাম না। আমার এক সম্মানিত বন্ধু এ কথা শুনে প্রস্তাব দিলেন কুরআন-সুন্নাহ থেকে আমার এই মতের পক্ষে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় কি না, খুঁজে দেখতে। তাহলে মানুষ সহজে মেনে নেবে। কুরআন ও সহিহ হাদিস থেকে স্পষ্ট দলীল থাকলে তা তো নিঃসন্দেহে মুমিনের জন্য যথেষ্ট। আল্লাহ বলেন,
وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَن يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ وَمَن يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا مُّبِينًا ﴿٣٦﴾
“আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কোনো ব্যাপারে সিদ্ধান্ত প্রদান করলে কোনো মুমিন পুরুষ বা নারীর জন্য সমীচীন নয় সে ব্যাপারে ভিন্ন সিদ্ধান্ত সন্ধান করা।” (সূরাহ আল-আহযাব ৩৩:৩৬)
কুরআনের কোনো আয়াত বা কোনো হাদিসের অর্থ স্পষ্টভাবে বোঝার পর মুমিনের সামনে কেবল একটিই পথ খোলা থাকে-সে অনুযায়ী কাজ করা। অন্যান্য যুক্তি দিয়ে মতকে আরো শক্তিশালী করা যায় বটে, তবে মুমিনের কাছে কুরআন-হাদিস একেবারে শিরোধার্য। এর বেশি আর কিছুর দরকারই নেই।
আর আয়াত বা হাদিসের অর্থ যদি পুরোপুরি স্পষ্ট না হয়, তাহলে মুমিনের দায়িত্ব সেটির প্রতি ঈমান আনা। নির্দিষ্ট কোনো ব্যাখ্যাকেই সঠিক বলে গোঁয়ার্তুমি না করা। প্রখ্যাত ফকিহ ইমাম আশ-শাফিঈ রহিমাহুল্লাহ এই পদ্ধতি অনুসরণ করতেন। তিনি বলতেন, “আমি আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখি। তিনি যা কিছু যে অর্থ বোঝাতে নাযিল করেছেন, সে অর্থের প্রতিই ঈমান রাখি। একইভাবে আমি আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর প্রতি ঈমান রাখি। আর তিনি যা কিছু যে অর্থ বোঝানোর উদ্দেশ্যে বলেছেন, সে অর্থের প্রতি ঈমান রাখি।”
তারপরও কুরআন-সুন্নাহর ব্যাপারে আমাদের পদ্ধতি আর আমাদের সালাফদের পদ্ধতির মাঝে ব্যাপক ফারাক রয়েছে। তাঁরা এগুলোর প্রতি অন্তরের অন্তস্থল থেকে শ্রদ্ধা পোষণ করতেন। নিজেদের বুঝকে তাঁরা নির্ভুল মনে করতেন না। তাই আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বাণীর ব্যাখ্যায় নিজেদের মত চাপিয়ে দিতেন না। ফলে বৈধ মতপার্থক্যপূর্ণ ব্যাপারে কুরআন-হাদিসের স্থান ছিল কারো ব্যক্তিগত মতের ঊর্ধ্বে।
এ ধরনের ব্যাপারে রায় দিতে গিয়ে তাঁরা প্রায়ই বলে দিতেন যে, এটা তাঁর বুঝ অনুযায়ী মত। এর বেশি কিছু নয়। সমালোচক বা প্রতিপক্ষের সাথে বাহাস করার সময় আপন মতের পক্ষে কুরআন ও হাদিসের দলীল তো অবশ্যই ব্যবহার করতেন। তবে ঈমান ও সচেতনতার কারণে পবিত্র কালাম ও নিজেদের মতের মাঝে সুস্পষ্ট পার্থক্যরেখা বজায় রাখতেন।
আলি ইবনু আবি তালিব রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর মতকে কেউ কুরআনের মতো নির্ভুল বলে মনে করলে তিনি তাদের কঠোরভাবে তিরস্কার করতেন। কোনটি তাঁর নিজের মত, তা তিনি সতর্কতার সাথে স্পষ্ট করে দিতেন। তাঁর কাছ থেকে শোনা একটি মতের ব্যাপারে কায়স বিন উব্বাদ তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, “এটা কি আল্লাহর রাসূল (ﷺ) আপনাকে বলেছেন, না আপনার নিজের মত?” আলি নির্দ্বিধায় বললেন, “এ ধরনের কোনোকিছুই আমি আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর মুখে শুনিনি। এটা কেবলই আমার মত।”
মুসলিম উম্মাহর এক টালমাটাল ও সংকটময় সময়ে আলি রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু খিলাফতের দায়িত্ব নেন। নিজের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করতে তাঁরই সবচেয়ে বেশি কুরআন-হাদিসের সমর্থন দরকার ছিল। চাইলেই এমনটা করা তাঁর কাছে কোনো ব্যাপারই ছিল না। তিনি কুরআনের একজন মুফাসসির এবং রাসূল (ﷺ)-এর ঘনিষ্ঠতম সহচরদের একজন। তার উপর শাসকের আনুগত্যের ব্যাপারে কুরআন-হাদিসে অজস্র দলীল আছে। প্রতিপক্ষের সাথে মুনাফিকের বৈশিষ্ট্যের মিল দেখাতে চাইলেও সহজেই তা দেখাতে পারতেন।
কিন্তু আলির চারিত্রিক দৃঢ়তা ও নবিজি (ﷺ)-এর প্রতি তাঁর আনুগত্য তাঁকে এমনটা করতে বাধা দেয়। ইসলামের শাশ্বত বাণী ঠিকভাবে পৌঁছে দেওয়া মুসলিম হিসেবে তাঁর দায়িত্ব। সর্বোপরি, তিনি ছিলেন তাঁর প্রতিপালকের প্রতি নিষ্ঠাবান। এ কারণেই তিনি স্পষ্টভাবে বলে নিতেন কোনটি তাঁর নিজস্ব মত। পবিত্র কালাম থেকে নিজের মতের পক্ষে দলীল টেনে বের করা থেকে নিজেকে তিনি বিরত রাখতেন।
ঈমানের একদম মৌলিক বিষয়ে কথা বলতে গেলে আমাদের বক্তব্যের পক্ষে কুরআন-সুন্নাহ থেকে বিপুল পরিমাণ স্পষ্ট ও মতভেদহীন দলীল আনা যাবে। কিন্তু শরিয়তের অন্যান্য বেশিরভাগ বিষয়ে যেখানে একাধিক মত আছে, সেখানে এই কথা খাটে না। এখানে একাধিক মতের পক্ষে হয় ভিন্ন ভিন্ন দলীলের সমর্থন পাওয়া যায়, নয়তো একই দলীলের ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যার সমর্থন পাওয়া যায়। কোনো একটি বিধান পরে আরেকটি বিধানের মাধ্যমে রহিত হয়ে গেছে কি না, তাও অনেক ক্ষেত্রে অস্পষ্ট থাকে। সাধারণ অনেক বিধান বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয় না। একটি হাদিসের বিশুদ্ধতার মান নিয়েও বহুবিধ মত থাকে।
ফিকহশাস্ত্রবিদদের কাজের সারনির্যাস এগুলোই। তাঁরা এরকম বিভিন্ন শর্ত গবেষণা করে নিজেদের রায় দেন। তাই আমরা দেখি সালাফদের মধ্যকার ফকিহগণ কোনো বিধান আলোচনা করতে গিয়ে ভদ্রতা বজায় রাখতেন। নিজের মতকে যতটা সাবধানতার সাথে পর্যবেক্ষণ করতেন, ভিন্ন মতাবলম্বীর মতকেও ততটাই সতর্কতার সাথে পর্যবেক্ষণ করতেন। প্রতিপক্ষের মতে ভুল পেলে তাঁদের জন্য অজুহাত দাঁড় করাতেন এবং ধরে নিতেন যে, মত ভুল হলেও তাঁদের নিয়ত বিশুদ্ধ ছিল। তিরস্কার করা বা নিজের মত চাপিয়ে দেওয়া থেকে তাঁরা বিরত থাকতেন। শরিয়তের প্রাজ্ঞ আলিম আশ-শিরাজি যথার্থই বলেন, “একজন ফকিহর জ্ঞান যত বেশি হবে, নিজের মতের ব্যাপারে তাঁর সতর্কতা তত বৃদ্ধি পাবে।”
শরিয়তের কোনো বিষয় বা বর্তমানের কোনো ইশ্য আলোচনার সময় আমাদের তড়িৎ উপসংহারে আসা যাবে না। আলোচনা ও নিরপেক্ষ সংলাপের দরজা খোলা রাখতে হবে। কেবলই বিরোধী মতকে খামোশ করিয়ে দেবার কুমতলব নিয়ে কুরআন-সুন্নাহ চষে দলীল বের করা যাবে না।
বেশিরভাগ সময় দেখা যায় যে, নিজের মতের পক্ষে বেশি কঠোর লোকদের বুঝ সবচেয়ে অগভীর হয়। হুটহাট তাঁরা দাবি করে বসেন যে, এই ব্যাপারে ইজমা আছে বা কুরআন থেকে স্পষ্ট দলীল আছে। ভিন্নমতাবলম্বীদের তারাই সবার আগে জাহান্নামি বানিয়ে দেন। তাদের মনে হতে পারে যে, এসব করে তারা পাক কালামের সম্মান করছেন। আমরা দু'আ করি এমনটিই যেন হয় আর আল্লাহ যেন তাদের নিয়ত কবুল করে নেন। একইসাথে তাদের আসল উদ্দেশ্য ও এর কুফলের দিকেও তাদের মনোযোগ ফেরানো জরুরি, যার ব্যাপারে তারা নিজেরাও হয়তো সচেতন নন। কুরআন-সুন্নাহর প্রতি সত্যিকার ভক্তির লক্ষণ হলো সতর্কতা, নম্রতা ও পরমতসহিষ্ণুতা।