📄 ঈমান সবার আগে
আমি আমার সমালোচকদের কথার জবাব দিই না, এই অভিযোগ করে অনেকে আমার কাছে চিঠি লিখেন। তাদের দাবি, এমনটা করা সবসময় ঠিক নয়। তারা বলেন যে, সমালোচকরা প্রায়ই আমাকে ভুল বুঝেন। আমি যদি একটু সময় নিয়ে বিষয়টা পরিষ্কার করে ব্যাখ্যা করে দিতাম, তাহলেই অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যেত।
নিঃসন্দেহে নিজের সুনাম রক্ষা করা প্রত্যেকের অধিকার, তবে দায়িত্ব নয়। আত্মপক্ষসমর্থনের পেছনে অনেক সময় যায় এবং অন্য অনেক কাজ থেকে মনোযোগ সরে যায়। ইসলাম, মুসলিম ও মানবতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে ঠিকমতো শ্রম ও সময় দেওয়া যায় না।
এতে করে নিন্দুকের মনের আগুনও নেভে না, সমস্যাও সমাধান হয় না। বরং আগুনে আরো ইন্ধন জোগায়। নিন্দুকেরা অবশ্যই পাল্টা জবাব দিয়ে আপনার বক্তব্যের দুর্বল দিকগুলো তুলে ধরার চেষ্টা করবে। আত্মপক্ষ সমর্থনের মাধ্যমে তো আপনি স্বীকার করে নিলেন যে, দুটো পক্ষ এখানে বিরোধে লিপ্ত আছে। তার চেয়ে ভালো হয় একটি মাত্র পক্ষকেই আক্রমণে ব্যস্ত থাকতে দিয়ে নিজে এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যস্ত হয়ে যাওয়া। দিন শেষে যা সঠিক, তা তো সঠিকই।
পৃথিবীতে কমপক্ষে চার বিলিয়ন মানুষ এখনও তাদের রব্বকে ঠিকমতো চেনে না। তাদের অনেকেই আবার তাঁর অস্তিত্ব পর্যন্ত অস্বীকার করে। আমাদের কি উচিত না এই মানুষগুলোকে সঠিক ব্যাপারগুলো বোঝাতে ব্যস্ত থাকা?
এছাড়াও আছে এক বিলিয়নের চেয়ে বেশি মুসলিম। তাদের মাঝে অজ্ঞতা ব্যাপক। চারদিকে বিদআতের ছড়াছড়ি। কোনো কোনো মুসলিম কবর-মাজার আর পীর-আউলিয়ার পূজা করে। অনেকে ব্যভিচার-অশ্লীলতা আর সুদের কারবারে জড়িত। অনেক জায়গায় মুসলিমরা জালিম শাসক আর নাস্তিক সরকারের অত্যাচারে পিষ্ট হচ্ছে। তাদের হত্যা করা হচ্ছে, নারীরা হচ্ছে লাঞ্ছিতা। ইসলাম থেকে দূরে সরে গিয়ে মুসলিমরা ভ্রান্তি ও পাপে নিমজ্জিত এক জীবন যাপন করছে।
আল্লাহর মনোনীত এই উম্মাহর ব্যাপারে আমি নিরাশ হচ্ছি না। সকল সীমাবদ্ধতা সাথে নিয়েই মুসলিমরা আমাদের অন্তরে আছে, আমরা তাদের ইসলামি পরিচয়কে স্বীকৃতি দেই। যারা অজ্ঞতাবশত শির্কে লিপ্ত হয়েছে, আমরা তাদের অন্তরে ইসলামের অস্তিত্ব স্বীকার করি এবং তাদের অজ্ঞতাকেই শুধু দোষারোপ করি। আল্লাহর দয়া সবকিছুকে বেষ্টন করে রাখে। আমরা দু'আ করি আমাদের গুনাহের কারণে আমরা যেন তাঁর রহমত থেকে বঞ্চিত না হই। কোনো মুসলিমেরই এমন পরিণতি আমরা চাই না।
আমরা আশা করি আমরা আমাদের সমালোচকদের মাধ্যমে উপকৃত হবো। তাদের কারণে আমরা আমাদের ভুলত্রুটিগুলোর দিকে নজর দিতে পারি। নবিজি (ﷺ) বলেছেন,
كُلُّ بَنِي آدَمَ خَطَّاءٌ وَخَيْرُ الْخَطَّائِينَ التَّوَّابُونَ
"আদমের সকল সন্তানই গুনাহগার, উত্তম গুনাহগার হলো সে, যে তাওবাহ করে।" [১১]
সমালোচক যদি আমাদের শুভাকাঙ্ক্ষী হয়, আমরা বলি, “আল্লাহ সেই ব্যক্তিকে রহম করুন, যে আমাদের ভুল ধরিয়ে দেয়।” আর নিন্দুক যদি কেবল আমাদের ঘৃণাই করে, তাহলে আমরা কবির সাথে গলা মিলিয়ে বলি,
আমার শত্রুরা তো আমার জন্য রহমত। হে প্রতিপালক! তাদের দূরে রেখো না। তারা আমার ভুল ধরে সংশোধনের আশায়। প্রতিযোগিতায় করে উন্নয়নের আশা।
কিছু মানুষ সমালোচনার জবাব দিতে গিয়ে নিজের ভুলের উপর আরো বেশি গেঁড়ে বসেন। এটি তাঁদের আত্মবিশ্বাসের অভাব। আবার অনেকে সমালোচনা থেকে নিজেকে বাঁচানোর জন্য সঠিকটা বাদ দিয়ে ভুল কথা বলেন। এটা কেবল দুর্বলতাই নয়, সুস্থ মানসিকতার অভাবও বটে।
সমালোচকদের থেকে আমরা যেভাবে উপকৃত হই, তার একটি হলো সমালোচনার প্রতি অভ্যস্ত হওয়া। আমরা অপমান ও কটু কথা সহ্য করতে শিখি, অভিযোগ আসলে কীভাবে সঠিক আচরণ করতে হয় সেটা শিখি। এটা আমাদের নিজেদের জন্যই ভালো। কারণ জীবনে একসময় না একসময় এগুলো আসতই। সারাক্ষণ প্রশংসা শুনতে অভ্যস্ত ব্যক্তি হঠাৎ সমালোচনার মুখোমুখি হলে সহ্য করতে পারবে না, তা যতই গঠনমূলক হোক না কেন। অতিরিক্ত প্রশংসা মানুষকে আত্মতুষ্ট ও অহংকারী করে তোলে।
আমরা চাই সারা বিশ্বের মুসলিমরা যেন তাদের দ্বীন ছাড়া অন্য কোনোকিছুর প্রতি রক্ষণাত্মক না হয়। শুধু হকের পক্ষেই ব্যস্ত থাকতে হবে। নিজের ব্যাপারে বা প্রিয়জনের ব্যাপারে মিথ্যে অপবাদ ছড়াতে দেখলে আত্মসংবরণ করতে হবে, এমনকি মানুষ যদি সেসব অপবাদ বিশ্বাস করতে শুরু করে তবুও। এটা খুবই ছোট বিষয়। অমুক-তমুকের আলোচনা কখনোই তর্ক-বিতর্কের বিষয় হওয়া উচিত নয়। এসব জিনিস থেকে দূরে থাকাই শ্রেয়।
আমরা আরো চাই মুসলিমরা উপকারী কাজে মগ্ন থাকুক। ইসলাম শেখা, শেখানো ও মানুষকে এর দিকে আহ্বান করা; মানবতার সেবা; সংস্কারসাধন—এসবেই আমাদের মননিবেশ করা উচিত। আমাদের উচিত সাধারণভাবে সকল মুসলিমের সাথে মিত্রতা পোষণ করা এবং স্থান নির্বিশেষে ভালো কাজে সবাইকে সহযোগিতা করা। আমাদের অবশ্যই মিডিয়া, অর্থনৈতিক ও সামাজিক শক্তি বৃদ্ধি করতে হবে। আমাদের সামর্থ্য, দক্ষতা ও সৃষ্টিশীলতা বাড়াতে হবে।
তুচ্ছ বিবাদ-দ্বন্দ্ব যেন আমাদের সামান্যতম মনোযোগও না পায়। এগুলো আমাদের মনকে চাঙাও করে না, চিন্তার উন্নয়নও করে না। এগুলোর কোনো গঠনমূলক প্রভাবই নেই। মুসলিমদের মাঝে এগুলোর মাধ্যমে না ভালোবাসা তৈরি হয়, না কোনো ইতিবাচক সংস্কার হয়।
কেউ যদি ফিরআউন ও তার দোসরবাহিনী, আবু জাহেল, আবু লাহাবদের মতো কাট্টা কাফিরদের গালমন্দ করার পেছনেও সারাটি সময় ব্যয় করে, তাহলে সেও অধিক গুরুত্বপূর্ণ কাজে অবহেলা করল। যেমন- আল্লাহর যিকির করা। ওইসব লোকের ব্যাপারে আপনি কিছুই জানেন না, এমন অবস্থাতেই আপনি মারা গেলেন, তারাপরও আপনার পক্ষে জান্নাতের উচ্চতম স্তরে পৌঁছানো সম্ভব। এ কারণেই রাসূল (ﷺ) বলেছেন, “মৃতদের অভিসম্পাত কোরো না এবং জীবিতদের কষ্টের কারণ হয়ো না।”[১২] আরেক বর্ণনায় আছে, তিনি (ﷺ) বলেন, “...কারণ তারা তাদের প্রতিফল পেয়ে গেছে।”[১৩]
আইশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, নবি (ﷺ) এই হাদিসটি এই উম্মাহর ফিরআউন আবু জাহল সম্পর্কে বলেছেন।
যারা অন্যের দোষ খুঁজে খুঁজে তাকে আক্রমণ করায় ব্যস্ত থাকে, তাদের অন্তর ব্যাধিগ্রস্থ। আগুন যখন পোড়ানোর কিছু পায় না, তখন নিজেকেই পোড়ায়।
অপরকে শুধু ভুলত্রুটির সংকীর্ণ পরিসরে বিচার করা বড় অন্যায়। প্রতিটি ব্যক্তিই বহুমাত্রিক ও জটিল এক সত্তা। প্রত্যেকের মাঝেই এমন কিছু গুণ থাকে, যা ঠিকমতো পরিচর্যা করলে অপরের বহু কল্যাণ সাধন করতে পারে। সংস্কারকদের উচিত মানুষের মাঝে সুপ্ত সেই গুণাবলিকে জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করা। যথাযথ ও পরিমিত প্রশংসার মাধ্যমেই কেবল তা সম্ভব।
বিভিন্ন ব্যক্তি, গোত্র ও এলাকার ব্যাপারে নবি (ﷺ) যেভাবে প্রশংসা করেছেন, তাতেই এর উদাহরণ পাওয়া যায়। সমাজে কেউ যে সম্মান-মর্যাদার অধিকারী, সেটিকে তিনি আঘাত না করার চেষ্টা করতেন। এ কারণেই মক্কা বিজয়ের দিন তিনি বলেছেন,
مَنْ دَخَلَ دَارَ أَبِي سُفْيَانَ فَهُوَ آمِنٌ
“যে কেউ আবু সুফিয়ানের (এলাকার প্রধান) ঘরে প্রবেশ করবে, সে নিরাপদ।”[১৪]
নবিজি (ﷺ) আরো বলেন,
إِنَّ اللَّهَ جَمِيلٌ يُحِبُّ الْجَمَالَ الْكِبْرُ بَطَرُ الْحَقِّ وَغَمْطُ النَّاسِ
"অহংকার হলো সত্য প্রত্যাখ্যান করা আর অপরকে তুচ্ছ করা।"[১৫]
নবিজি (ﷺ) এমনই এক নিখাদ ভদ্র মানুষ ছিলেন, যিনি নিজেকে অন্য কারো উপরে প্রাধান্য দিতেন না। তাই তিনি বলেছেন,
هَوَنْ عَلَيْكَ فَإِنِّي لَسْتُ بِمَلِكَ إِنَّمَا أَنَا ابْنُ امْرَأَةٍ تَأْكُلُ الْقَدِيدَ ৩৯ "শান্ত হও। আমি কোনো রাজা-বাদশাহ নই। আমি তো এক নারীর সন্তান, যে শুকনো মাংস আহার করত।” [১৬]
নবিজি (ﷺ) নির্দ্বিধায় সত্য গ্রহণ করে নিতেন, তা যার কাছ থেকেই আসুক না কেন। যেমন কবরের আজাবের ব্যাপারে এক ইয়াহুদির কথাকে তিনি সাথেসাথেই সত্যায়ন করেন।[১৭]
আজকের মুসলিম যুবকদের সত্যিই নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি ও চিন্তাপদ্ধতি সংশোধন করা উচিত। ভুল চিন্তা থেকে ভুল উপসংহার আসে। তাই বিশেষ কোনো ব্যাপারে ভুল সংশোধন করার চেয়ে এই ধরণের ভুলগুলোর সংশোধন বেশি জরুরি। একটি কারখানার নির্মাণ ও উপাদান সরবরাহেই যদি ভুল হয়, তাহলে উৎপাদনের হার ও মানও খারাপ হবে। সমগ্র কারখানারই সংশোধন দরকার। যখন যেই অংশ সামনে আসে, তখন সেটির মেরামত করতে যাওয়া নিতান্তই বোকামি।
আমার সমালোচকগণ এই প্রবন্ধের একটি বিষয়ে আপত্তি তুলতে পারেন বলে মনে হচ্ছে। তাই আমি এখনই তা স্পষ্ট করে দিচ্ছি। মনে হতে পারে আমি কোনো মানী লোকের মান রক্ষা করার পুরো ধারণাটাই অস্বীকার করছি। না, এমন নয়। আমি মোটেও তা বলতে চাইছি না। আমি বলছি দ্বন্দ্ব-সংঘাত পরিহার করতে, সময় অপচয় না করতে, সংশয় সৃষ্টি না করতে, আমাদের আসল শত্রুদের হাসাহাসি করার সুযোগ না দিতে। কাণ্ডজ্ঞানহীন কাজকর্ম পরিহার করে অধিক উপকারী কাজে ব্যস্ত থাকা উচিত। এমনিতে কারো মান-সম্মান রক্ষার্থে কথা বলতে মুসলিমদের উপর কোন বিধিনিষেধ নেই।
আমি আলোচনা যথাসম্ভব সংক্ষিপ্ত রাখার চেষ্টা করেছি এবং অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা পরিহার করেছি। আশা করি আমি আমাদের চিন্তাপদ্ধতির সংশোধনে কিছুটা হলেও ভূমিকা রাখতে পেরেছি। আমাদের চিন্তাজগতের 'কারখানা'র মেরামতে কাজ করতে পেরেছি।
টিকাঃ
[১১] সুনান তিরমিযি: ২৪৯৯, ইবনু মাজাহ: ৪২৫১
[১২] সুনান তিরমিযি: ১৯৮২, মুসনাদ আহমাদ: ১৮১২০
[১৩] সহিহ আল বুখারি: ১৩৯৩
[১৪] সহিহ মুসলিম: ১৭৮০
[১৫] সহিহ মুসলিম: ৯১
[১৬] ইবনু মাজাহ: ৩৩১২
[১৭] সহিহ আল বুখারি: ১৩৭২, সহিহ মুসলিম: ৫৮৬
📄 প্রতিপক্ষ সঠিক হলে সন্তুষ্ট থাকুন
ইন্টারনেটে আজকাল আরবি ভাষায় নতুন ধরণের অনেক লেখা দেখা যায়। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ও সেগুলোর সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে প্রশংসনীয় ও সাহসী লেখালেখি হচ্ছে। এ এক নবযুগের সূচনা। নীরবতার যুগ শেষ হয়ে গেছে। এসেছে অংশগ্রহণ, স্পষ্টবাদিতা ও মুক্ত আলোচনার জামানা।
এই পরিবর্তনকে স্বাগত জানানোর অনেক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি কারণ হলো সমাজের সদস্য হিসেবে প্রত্যেকের নিজের সঠিক ভূমিকা ও দায়িত্ব পালনের ভিত্তি তৈরি হওয়া। এর ফলে সামাজিক স্থিতিশীলতা ও দৃঢ়তা বৃদ্ধি পাবে। অবিচার, বঞ্চনা আর অধিকারহীনতার স্বাভাবিক ফলাফল হলো মনের অস্থিতিশীল দশা।
স্বাধীনতা ও মধ্যমপন্থার আলো-বাতাসেই গড়ে ওঠে পরিমিতিবোধসম্পন্ন ও বুদ্ধিমান জনবল। এ কারণেই নবিজি (ﷺ) সবসময় বিনয়ী থাকতেন এবং মানুষকে বকাঝকা ও জোরাজুরি করা থেকে বিরত থাকতেন। দাসের গায়েও কখনও তিনি হাত তোলেননি, একটি বারের জন্যও না। স্ত্রীর গায়ে হাত তোলা তো দূরের কথা। শরিয়তের শাস্তিবিধান ও যুদ্ধের ময়দান ছাড়া কখনও তিনি কাউকে আঘাত করেননি।
নবিজি (ﷺ) গনিমতের মাল বণ্টন করার সময় একবার এক লোক খেঁকিয়ে উঠল, "সুবিচার করুন, মুহাম্মাদ!” তিনি (ﷺ) জবাবে কেবল বললেন, "হায় রে! আমিই যদি সুবিচার না করি তো কে করবে?”
আরেকবার এক লোক বলল, "আল্লাহর কসম! আজকের মাল বণ্টন না ইনসাফের হয়েছে, না আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য।” নবিজি (ﷺ) তা শুনে বললেন, “আল্লাহ তাআলা মূসাকে রহম করুন। তাঁকে এরচেয়েও বেশি যন্ত্রণা সইতে হয়েছে, অথচ তিনি ধৈর্য ধরে ছিলেন।”
রাসূল (ﷺ)-এর প্রতি আল্লাহর নাযিলকৃত এই আয়াতগুলো দেখুন:
يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ اتَّقِ اللَّهَ وَلَا تُطِعِ الْكَافِرِينَ وَالْمُنَافِقِينَ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلِيمًا حَكِيمًا ﴿۱﴾
“হে নবি! আল্লাহকে ভয় করুন। কাফির ও মুনাফিকদের মান্য করবেন না। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞানী, সর্বজ্ঞ।” (সূরাহ আল-আহযাব ৩৩:১)
وَتَخْشَى النَّاسَ وَاللَّهُ أَحَقُّ أَن تَخْشَاهُ
“আপনি কি মানুষকে ভয় করেন? অথচ আল্লাহই এর অধিক হকদার।” (সূরাহ আল-আহযাব ৩৩:৩৭)
وَلَا تَكُن لِلْخَائِنِينَ خَصِيمًا ﴿١٠٥﴾
“খিয়ানতকারীদের পক্ষে ওকালতি করবেন না।” (সূরাহ আন-নিসা ৪:১০৫)
أَلَمْ يَجِدْكَ يَتِيمًا فَآوَى ﴿٦﴾ وَوَجَدَكَ ضَالَّا فَهَدَىٰ ﴿۷﴾ وَوَجَدَكَ عَائِلًا فَأَغْنَى ﴿٨﴾
"তিনি কি আপনাকে অনাথ হিসেবে পাননি? পরে তিনি আশ্রয় প্রদান করেছেন। আর তিনি আপনাকে পেয়েছেন পথ সম্পর্কে অনবহিত। অতঃপর আপনাকে তিনি পথ দেখিয়েছেন। আর তিনি আপনাকে পেয়েছেন অভাবগ্রস্ত। অতঃপর প্রাচুর্য দিয়েছেন।” (সূরাহ আদ-দুহা ৯৩:৬-৮)
مَا كَانَ لِنَبِي أَن يَكُونَ لَهُ أَسْرَى حَتَّى يُثْخِنَ فِي الْأَرْضِ تُرِيدُونَ عَرَضَ الدُّنْيَا وَاللَّهُ يُرِيدُ الْآخِرَةَ
"ভূমিতে পূর্ণরূপে কর্তৃত্ব স্থাপনের আগ পর্যন্ত নবির কাছে (জীবিত) যুদ্ধবন্দী থাকা শোভনীয় নয়। তোমরা তো এই দুনিয়ার স্বার্থ চাও। অথচ আল্লাহ তোমাদের জন্য চান আখিরাত।” (সূরাহ আল-আনফাল ৮:৬৭)
হোমরা-চোমরা লোকদের ইসলামের দিকে আহ্বান করার সময় এক অন্ধ ব্যক্তির প্রতি অনিচ্ছাকৃত বিরক্তি চেহারায় প্রকাশ করে ফেলায় নবিজি (ﷺ)- এর উদ্দেশ্যে আল্লাহ বলেন,
عَبَسَ وَتَوَلَّىٰ ﴿١﴾ أَن جَاءَهُ الْأَعْمَىٰ ﴿۲﴾
“সে ভ্রু কুঞ্চিত করল এবং মুখ ফিরিয়ে নিল, যখন অন্ধ ব্যক্তিটি তার কাছে এলো।” (সূরাহ আবাসা ৮০:১-২)
এই আয়াতগুলোতে নবিজি (ﷺ) এর প্রতি যথেষ্ট সমালোচনা করা হয়েছে। আয়াতগুলো এমন এক সময় নাজিল হয়েছে, যখন নবিজি (ﷺ)-কে মুনাফিক, শত্রুভাবাপন্ন কাফির ও দুর্বল ঈমানদারদের উপর কাজ করতে হচ্ছিল। তারপরও মানুষকে এই আয়াতগুলো তাঁর তিলাওয়াত করে শোনাতে হয়েছে। কারণ এগুলো তো কুরআনেরই অংশ! এমনকি উম্মাতকে বলতে হয়েছে এই আয়াতগুল আত্মস্থ করতে এবং সালাতে পাঠ করতে।
নবিজি (ﷺ)-কে দুই রকম অবস্থা থেকে একটি বেছে নেবার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। হয় রাজা-নবি, নয়তো বান্দা-রাসূল। তিনি বান্দা-রাসূল হওয়াকেই বেছে নেন। তিনি বাদশাহর ভাব ধরে থাকতেন না, স্বৈরশাসকের মতো নিজের উপস্থিতি জানান দিতেন না। এক বেদুইন একবার তাঁকে দেখে অস্বস্তিতে কাঁপতে লাগল। নবি (ﷺ) বললেন, “শান্ত হও। আমি তো কেবল এক নারীর সন্তান, যার আহার্য ছিল শুকনো মাংস।”
নবি (ﷺ)-এর একজন শক্তিশালী ও প্রতাপশালী সাহাবি ছিলেন উমর ইবনুল রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু। তাঁর খিলাফত আমলে উবাই বিন কা'ব রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু তাঁর সাথে একটি ইলমি বিষয়ে মতভেদ করেন। উবাই বলেন, “খাত্তাবের ছেলে! নবিজির সাহাবিগণের কষ্টের কারণ হয়ো না।”
উমর একটুও চটে না গিয়ে বললেন, “ওহ! আমি তাহলে নবিজি (ﷺ)-এর দেওয়া এই তথ্যটি শুনতে পাইনি। আসলে এই ব্যবসা আর হাট-বাজার আমাকে ব্যস্ত করে ফেলেছিল।”
আচরণের এই নম্রতা-ভদ্রতাগুলো আমাদের মাঝে ফিরিয়ে আনতে হবে। আজকের চ্যালেঞ্জিং পৃথিবীতে এর প্রয়োজনীয়তা আরো বেশি।
বর্তমান যুগে একাধিক মত ও পথকে গ্রহণ করার মানসিকতা গড়ে তোলার নানবিধ প্রয়োজনীয়তা আছে। এর মধ্যে অনেকগুলোই ঠিক ইসলামি নিয়মকানুনের সাথে সম্পর্কিত না। যেমন আধুনিক পৃথিবী, মিডিয়া, অর্থনীতি ও রাজনীতি আগের চেয়ে অনেক বেশি উন্মুক্ত। পৃথিবীর শক্তিশালী সব জাতি মিলেও এই গণমুক্তির উত্থান রুখতে পারেনি, সেখানে আপনি-আমি কোন ছার? এ থেকে অনেকের মনে হতে পারে যে, এই পরমতসহিষ্ণুতাও আমাদের উপর চাপিয়ে দেওয়া একটা জিনিস। বিষয়টাকে আসলে এভাবে দেখা ঠিক নয়। এটি বরং বিরাট এক সুযোগ। স্বীকার করছি যে, মানুষ যেটাতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে সেটা ছেড়ে দেওয়া কঠিন। এর ফলে এমন অনেক বিতর্ক-বিভেদ দেখা দিতে পারে, যার ভয়াবহতা নিয়ে অনেক ইসলামি কর্মীই চিন্তিত। এ কারণেই ইসলামি কর্মীরা অনেক অসুবিধা সত্ত্বেও মতের পার্থক্যকে স্বাগত জানান। এর মাধ্যমেই নবি (ﷺ) ও সাহাবা আজমাইনের সময়কার মতো পরিবেশ সৃষ্টি করা সম্ভব। ওই সময়টায় ইসলামি কর্মকাণ্ড ইতিহাসের ভারে ন্যুব্জ হয়ে ছিল না। এভাবেই আদর্শিক ও সামাজিক সংকীর্ণতা কমিয়ে এনে স্বাধীনতার ইসলামি পরিমিতিবোধ অনুসরণ করা সম্ভব।
ইলেকট্রনিক মিডিয়ার মাধ্যমে আজ আমরা যেই স্বাধীনতা লাভ করেছি, অনেকেই তার সদ্ব্যবহার করতে জানে না। আমাদের নিকট অতীত ছিল নতুন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে নতুন নতুন জিনিস শেখার যুগ। ইন্টারনেটভিত্তিক স্বাধীনতা অপব্যবহারকারীদের কুৎসিত ভাষা ও আচরণের ব্যাপারে দুশ্চিন্তা কমানোর জন্য আমাদের এভাবেই পরিস্থিতিকে বোঝা উচিত। অসংখ্য মানুষ কী বলছে, তা না বুঝেই নিজের মত প্রচারে ব্যস্ত। এর অনুষঙ্গ হিসেবে থাকে আলোচনায় অপর পক্ষের অধিকারের প্রতি অসম্মান আর (সত্যিকার বা কাল্পনিক) মতপার্থক্যের প্রতি অসহিষ্ণুতা।
কখনো কখনো মতভেদ সত্যি সত্যিই থাকে এবং সেগুলো হওয়ারই কথা। তাই এসব মতপার্থক্য দেখে আঁতকে উঠার কিছু নেই। কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায় প্রতিপক্ষকে বিদ্রূপকারীর মতটিই আসলে ভুল। অথচ সে অজ্ঞতাবশত সত্যকে প্রত্যাখ্যান করে প্রতিপক্ষকে দোষ দিয়ে চলেছে। আবার কিছু ক্ষেত্রে সত্যিকার কোনো মতপার্থক্য থাকেই না। শব্দের ব্যবহারের ভিন্নতা নিয়েই নিষ্ফল বিতর্ক চলতে থাকে।
তাই আলোচনার ক্ষেত্রে আমাদের আচরণ উন্নত করা এখন দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে। মতভেদের ক্ষেত্রে কীরূপ ব্যবহার করা হবে, তার নৈতিক মানদণ্ড উঁচু করার সময় এসেছে। এই আচরণবিধির সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে কুরআন ও সুন্নাহতে।
কারো কারো ধারণা আমরা এতই নতুন ধরনের সময়ে বাস করছি যে, পূর্ববর্তী সৎকর্মশীল প্রজন্মগুলোর কাউকে অনুসরণ করার কোনো মানেই নেই। এটা একেবারেই ভুল চিন্তা। নবিজি (ﷺ) কখনো দুর্বল, কখনো শক্তিশালী অবস্থানে থেকেছেন। তেমনি মুসলিম উম্মাহও কোনোকালে ক্ষুদ্রসংখ্যক আবার কোনোকালে বিপুল সংখ্যক ছিল। নবিজি (ﷺ) বন্ধুভাবাপন্ন মানুষদের উপরও যেমন কাজ করেছেন, শত্রুভাবাপন্ন মানুষদের উপরও কাজ করেছেন। ইয়াহুদী, খ্রিষ্টান, মূর্তিপূজারি সব ধরনের মানুষের সাথেই তাঁর কাজ করতে হয়েছে। মদিনার মুনাফিকদেরও সামলাতে হয়েছে। দুর্বল ঈমানের মুসলিমদের সামলাতে হয়েছে। পরবর্তী যুগগুলোর মতো সে যুগেও মুসলিমদের মাঝে মতপার্থক্য হয়েছে।
আমাদের ঈমানের সাধারণ মূলনীতিগুলোর উপর বেশি জোর দিতে হবে, ব্যক্তিগত মতের বিষয়গুলোতে নয়। কোনোকিছুকে সালফে সালিহীনের অনুসৃত পদ্ধতি বলে দাবি করলে একদম নিশ্চিত হয়ে নিতে হবে যে, সাধারণভাবে এটিই তাঁদের পদ্ধতি। দুই-একজনের বিচ্ছিন্ন মত নয়। সেগুলোও তাঁদের ব্যক্তিগত মত, যা আমরা গণহারে মেনে নিতে বাধ্য নই। আমরা তিনটি জিনিস গ্রহণ করতে বাধ্য:
১। কুরআন ২। সুন্নাহ ৩। সুনিশ্চ
📄 কটাক্ষ করা: একটি আধুনিক কালচার
অনেকের স্বভাবটাই রূঢ় আর কর্কশ। তাদের বিশ্রী বিশ্রী কথাগুলোতে কোনো শক্তিশালী যুক্তি বা প্রমাণ থাকে না, থাকে শুধু অপমান আর কটাক্ষ। নবিজি (ﷺ) বলেন,
ا يَكُونُ اللَّعَانُونَ شُفَعَاءَ وَلَا شُهَدَاءَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ “অভিসম্পাতকারীরা কিয়ামতের দিন সুপারিশকারী হতে পারবে না।”[১৮] তিনি (ﷺ) আরো বলেন,
لَيْسَ الْمُؤْمِنُ بِالطَّعَانِ وَلَا اللَّعَانِ وَلَا الْفَاحِشِ وَلَا الْبَدِيءِ “মুমিন কখনও গালমন্দকারী বা অভিসম্পাতকারী হতে পারে না। সে নীচ বা অশ্লীল স্বভাবের হয় না।”[১৯] নবি (ﷺ)-কে যারা ভালোবাসে এবং হাশরের ময়দানে তাঁর সাথে থাকতে চায়, তাদের এই কথাগুলো মেনে চলা উচিত। অর্থাৎ, ভালো কথা ছাড়া একটা শব্দও যেন আমাদের মুখ থেকে বের না হয়। নবিজি (ﷺ)-এর আদেশ,
وَمَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلْيَقُلْ خَيْرًا أَوْ لِيَصْمُتْ "...আল্লাহ ও আখিরাতের প্রতি যে ঈমান রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে অথবা চুপ থাকে।”[২০]
আল্লাহ সে ব্যক্তির উপর রহম করুন, যে ভালো কথা বলে পুণ্য অর্জন করে অথবা চুপ থেকে নিজেকে নিরাপদ রাখে।
মানুষে মানুষে মতভেদ খারাপ কিছু নয়। বিশেষত এই ফিতনার জামানায়। তবে মতভেদ করার সঠিক পদ্ধতি হলো স্পষ্ট যুক্তি ও শান্ত কথাবার্তা। আমাদের কথা যেন আমাদের অন্তরের পরিশুদ্ধি, মানসিক শক্তি আর চরিত্রের সৌন্দর্যের প্রমাণ বহন করে।
মুসলিম বিশ্ব যে অসংখ্য সমস্যায় জর্জরিত, তা তো দেখতেই পাচ্ছেন। এ যেন ঝড়ের কবলে দোদুল্যমান এক জাহাজ, যার যাত্রীরা ডুবে যাবার ভয়ে ভীত। কী দয়ালু, কী শান্ত, কী অস্থিরচিত্ত—সকলের কণ্ঠস্বর একসাথে মিশে গেছে। আর একটি কণ্ঠস্বর আছে, যেটি নিজেকে ছাড়া ডানে-বামে সকলকে গালমন্দ আর অপমান করতে থাকে। নিজেকে সে গালি দেবেই বা কেন? এ তো নিজেকে ভাবে যুগের ত্রাতা, যে মূর্খ-দুর্বল-দুনিয়ালোভীদের স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে সবকিছু ঠিক করে ফেলবে। বাস্তবতা আসলে বিপরীত। সবচেয়ে খারাপ লোক তো সে-ই, যে শুধু নিজের মধ্যে সব কল্যাণ আর অপরের মধ্যে সব অকল্যাণ দেখে। আমাদের ভাই ও বোনেরা আমাদেরই অংশ। নিজেকে যতটা সম্মান করি, তাঁদেরও ততটুকুই সম্মান দিতে হবে।
আল্লাহ বলেন, وَلَوْلَا إِذْ سَمِعْتُمُوهُ ظَنَّ الْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنَاتُ بِأَنفُسِهِمْ خَيْرًا وَقَالُوا هَذَا إِفْكٌ مُّبِينٌ ﴿١٢﴾
“মুমিন নারী-পুরুষরা যখন তা শুনতে পেল, তখন তারা নিজেদের লোকদের ব্যাপারে সুধারণা কেন করল না?” (সূরাহ আন-নূর ২৪:১২)
আল্লাহ আরো বলেন, وَلَا تَلْمِزُوا أَنفُسَكُمْ وَلَا تَنَابَزُوا بِالْأَلْقَابِ بِئْسَ الِاسْمُ الْفُسُوقُ بَعْدَ الْإِيمَانِ ۚ وَمَن لَّمْ يَتُبْ فَأُولَئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ ﴿١١﴾
"পরস্পরের নিন্দা কোরো না, একে অপরকে খারাপ নামে ডেকো না। ঈমান আনার পর খারাপ কথা বলা কতই না মন্দ! যারা তাওবাহ করে না, তারাই যালিম।” (সূরাহ আল-হুজুরাত ৪৯:১১)
ইন্টারনেট আজ আমাদের দিয়েছে অন্যকে অপমান করার এক অত্যাধুনিক পদ্ধতি—ডিজিটাল অপমান! আজকাল মানুষ তাদের কুৎসা-অপমানগুলো বিনা পয়সায়, বিনা দায়বদ্ধতায়, যাচ্ছেতাই শব্দে, নিজের নাম সহ প্রকাশ করতে পারে।
এসব কাজ যারা করছে, তারা নিজেদের পাপ ফলাও করে দেখিয়ে বেড়াচ্ছে। নবিজি (ﷺ) বলেছেন,
كُلُّ أُمَّتِي مُعَافَاةٌ إِلَّا الْمُجَاهِرِينَ
“আমার সমগ্র উম্মাহকে ক্ষমা করা হবে, শুধু নিজেদের পাপ প্রকাশ করে বেড়ানো ব্যক্তিদের ছাড়া।”[২১]
পরিচয় গোপন রেখে ছদ্মনামে আত্মপ্রকাশ করার সুযোগও করে দিয়েছে ইন্টারনেট। দুর্ভাগ্যবশত যৌক্তিক ও ভারসাম্যপূর্ণ কথাগুলো খুব একটা শ্রোতা টানে না। উল্টোদিকে ডিজিটাল গালিবাজেরা তার সমর্থক ও সমালোচকদের মনোযোগ পেয়ে খুশিতে বাকবাকুম করে। এর কাছে এমনও মনে হতে পারে যে, সে নতুন করে ইতিহাস রচনা করছে!
মোবাইল ফোন হলো এই কাজের আরেক কাজী। এসএমএসের মাধ্যমে জঘন্যতম কথাবার্তাও মুহূর্তেই ছড়িয়ে যায়। এসব কাজ করে অনেকে নিজেকে আবার খুব সাহসী ভাবে। চোর যেমন খুব সাহসিকতার সাথে সিঁধ কাটে, ওরকম সাহসী আরকি। সর্বনাশ হওয়াকে কিছু মানুষ কীভাবে যে এত ভালোবাসে!
নবি (ﷺ) বলেছেন,
"আমার আর আমাদের উম্মাতের উপমা হলো আগুন জ্বালানো এক ব্যক্তির মতো। আগুনে চারপাশ আলোকিত হলে পোকামাকড় এসে আগুনে পড়তে থাকে। সেই ব্যক্তি তাদের দূরে রাখার চেষ্টা করেও সংখ্যাগরিষ্ঠের কারণে পেরে ওঠে না। একইভাবে আমিও তোমাদের কাপড় টেনে ধরে আগুন থেকে দূরে সরাচ্ছি। কিন্তু তোমরা আগুনের দিকে হুমড়ি খেয়ে পড়ছ।” (সহিহ আল-বুখারি এবং সহিহ মুসলিম)
ইলেকট্রনিক মিডিয়ার অপব্যবহার খুবই গর্হিত একটি কাজ। এসব কাজ যারা করে, তারা মূল্যবোধহীন। নীচ লালসা, অন্ধ আক্রোশ আর অযথা বিদ্বেষ তাদের চালিকাশক্তি। যারা মনে করে এ কাজ করে তারা হক আর ঈমানের প্রতিরক্ষা করছে, তারা আরো বড় ধোঁকায় পড়ে আছে।
প্রযুক্তির এই যুগে আজ মানুষ টাকা খরচ করে অপমানিত হচ্ছে। কিছুদিন আগে একটি বিদেশী নম্বর থেকে আমার এক বন্ধুর কাছে এসএমএস আসে, যেন জরুরি ভিত্তিতে সে কল করে। কল করে সে এক ঘণ্টা যাবত ওপাশ থেকে শুধু গালাগাল শুনল। আমি এ ঘটনা শুনে হাসতে হাসতে বললাম, "পয়সা খরচা করে অপমানিত হলে তাহলে!”
কটাক্ষ করার এই কালচারের মাঝে আমরা যারা নিজেদের সিরাতুল মুস্তাকীমে রাখতে চাই, তাদের এই পরামর্শগুলো মেনে চলতে হবে:
১। এ ধরনের আচরণ ও আচরণকারীদের থেকে আমরা মুখ ফিরিয়ে নেব। কুরআন আমাদের ঠিক এটাই বলে:
خُذِ الْعَفْوَ وَأْمُرْ بِالْعُرْفِ وَأَعْرِضْ عَنِ الْجَاهِلِينَ ﴿۱۹۹﴾
"ক্ষমা করতে থাকো, ভালো কাজের আদেশ করতে থাকো; আর অজ্ঞদের এড়িয়ে চলো।” (সূরাহ আল-আ'রাফ ৭:১৯৯)
وَإِذَا سَمِعُوا اللَّغْوَ أَعْرَضُوا عَنْهُ وَقَالُوا لَنَا أَعْمَالُنَا وَلَكُمْ أَعْمَالُكُمْ سَلَامٌ عَلَيْكُمْ لَا نَبْتَغِي الْجَاهِلِينَ ﴿٥٥﴾
“নিরর্থক কথাবার্তা থেকে তারা মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বলে, 'আমাদের কাজের ফল আমরা পাব, তোমাদের কাজের ফল তোমরা পাবে; তোমাদের প্রতি সালাম; অজ্ঞদের সাথে আমাদের কোনো লেনাদেনা নেই।” (সূরাহ আল-কাসাস ২৮:৫৫)
قَدْ أَفْلَحَ الْمُؤْمِنُونَ ﴿ا﴾ الَّذِينَ هُمْ فِي صَلَاتِهِمْ خَاشِعُونَ ﴿٢﴾ وَالَّذِينَ هُمْ عَنِ اللَّغْوِ مُعْرِضُونَ ﴿۳﴾
“নিশ্চয় মুমিনরা সফল হয়ে গেছে, যারা তাদের সালাতে বিনয়-নম্র এবং অসার কথাবার্তায় নির্লিপ্ত।” (সূরাহ আল-মুমিনূন ২৩:১-৩)
নবিজির একটি বৈশিষ্ট্য ছিল অজ্ঞদের কাজকারবারের জবাবে তিনি আরো ভদ্র আচরণ করতেন।
২। আমরা এরচেয়ে উত্তম কিছু দিয়ে জবাব দিতে পারি। অর্থাৎ, আমরা কটাক্ষকারীদের জন্য আল্লাহর কাছে দু'আ করব ও তাদের জন্য ক্ষমা চাইব। বাজে কথার জবাবে সুন্দর কথা বলব। এই আদেশটির কথাও কুরআনে বেশ কয়েকবার এসেছে:
ادْفَعْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ السَّيِّئَةَ “মন্দকে প্রতিহত করো উত্তম দিয়ে।” (সূরাহ আল-মুমিনূন ২৩:৯৬)
وَقُولُوا لِلنَّاسِ حُسْنًا "আর মানুষের সাথে সদালাপ করবে।” (সূরাহ আল-বাকারাহ ২:৮৩)
أُولَئِكَ يُؤْتَوْنَ أَجْرَهُم مَّرَّتَيْنِ بِمَا صَبَرُوا وَيَدْرَءُونَ بِالْحَسَنَةِ السَّيِّئَةَ وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنفِقُونَ ﴿٥٤﴾ ৪৯ "এরা দ্বিগুণ প্রতিদান পাবে। কারণ তারা অবিচল থেকেছে এবং মন্দকে ভালো দিয়ে প্রতিহত করেছে; আর আমি তাদের যে রিযিক দিয়েছি, তা থেকে খরচ করেছে।” (সূরাহ আল-কাসাস ২৮:৫৪)
৩। আমরা ভাবগাম্ভীর্য বজায় রেখে শান্ত থাকব। জীবনের পথ বড় দীর্ঘ। এখানে একটু শান্তি আর বিশ্রাম দরকার। আল্লাহ বলেন,
هُوَ الَّذِي أَنزَلَ السَّكِينَةَ فِي قُلُوبِ الْمُؤْمِنِينَ “তিনিই মুমিনদের অন্তরে প্রশান্তি স্থাপন করেছেন।” (সূরাহ আল-ফাতহ ৪৮:৪)
নবিজি (ﷺ)-এর ব্যাপারে আল্লাহ বলেন,
ثُمَّ أَنزَلَ اللَّهُ سَكِينَتَهُ عَلَى رَسُولِهِ “তারপর তাঁর প্রতি আল্লাহ নিজের পক্ষ থেকে প্রশান্তি নাযিল করলেন।” (সূরাহ আত-তাওবাহ ৯:২৬)
নবিজি (ﷺ)-কে আল্লাহ বলেন,
وَاصْبِرْ وَمَا صَبْرُكَ إِلَّا بِاللَّهِ ، وَلَا تَحْزَنْ عَلَيْهِمْ وَلَا تَكُ فِي ضَيْقٍ مِمَّا يَمْكُرُونَ ١٢٧ “ধৈর্য ধরো, তোমার ধৈর্য তো কেবল আল্লাহর পক্ষ থেকে। ওদের কার্যকলাপে তুমি দুঃখিত হয়ো না। আর ওদের ষড়যন্ত্রের কারণে অন্তরে কুণ্ঠাবোধ কোরো না।” (সূরাহ আন-নাহল ১৬:১২৭)
টিকাঃ
[১৮] সহিহ মুসলিম: ২৫৯৮
[১৯] সুনান তিরমিযি: ১৯৭৭
[২০] সহিহ আল বুখারি: ৬১৩৬
[২১] সহিহ মুসলিম: ২৯৯০
📄 কথা সত্য, মতলব খারাপ
একটি কনফারেন্সের সভাপতিত্ব করছিলেন এক নারী। সেই কনফারেন্সে অংশগ্রহণকারী এক পুরুষ তাঁর উপর ক্ষেপে গেলেন। বিশেষত নিয়ম-কানুন মানার প্রতি তাঁর দৃঢ়তা দেখে। যেমন বক্তাদের সময় নির্দিষ্ট করা, আসনবিন্যাস, আলোচনার কঠিন জায়গাগুলোর সংক্ষেপে উপসংহার টানা, আর আরবি ভাষায় দক্ষতার “ভান” করা।
সেই পুরুষ বক্তার যখন কথা বলার পালা এলো, তিনি বলে উঠলেন, “যে জাতি নারীকে নেতৃত্বের স্থানে বসায়, তারা সফল হবে না।”
এই হাদিসের বিস্তারিত ব্যাখ্যা ও এ থেকে প্রাপ্ত বিধিবিধান আলোচনা করা এখানে আমাদের উদ্দেশ্য নয়। আমাদের আলোচ্য হলো এই লোক কীভাবে নবি (ﷺ)-এর একটি কথাকে অপ্রাসঙ্গিকভাবে উদ্ধৃত করে নিজের মনের ঝাল মেটাল। নবিজি (ﷺ)-এর কথা ব্যবহার করে সস্তা ফায়দা নেওয়া কি ঠিক?
আরেকবার টাকা-পয়সা সংক্রান্ত ব্যাপারে এক লোকের সাথে তার প্রতিবেশী আত্মীয়ের মনোমালিন্য হলো। তাঁরা একটা ব্যবসায়িক কারবার শুরু করে লস খেয়েছেন। অনেক আশা-ভরসা ছিল এটা নিয়ে। কিন্তু কিছুই হলো না। উল্টো ঝগড়া লেগে গেল তাদের মাঝে।
কিছুদিন পর একটি পারিবারিক অনুষ্ঠান তাদের আবার কাছে নিয়ে এল। সালাতের সময় হলে ওই দুইজনের একজন এগিয়ে এসে ইমামতি করলেন। অবাক হওয়ার কিছু নেই। ইসলামি পড়াশোনায় তিনি জামিয়া (বিশ্ববিদ্যালয়) থেকে সনদপ্রাপ্ত।
কিন্তু তিনি সালাতে কী তিলাওয়াত করলেন, জানেন? প্রথম রাক'আতে,
وَلَا تَحْسَبَنَّ اللَّهَ غَافِلًا عَمَّا يَعمَلُ الظَّالِمُونَ ، إِنَّمَا يُؤَخِّرُهُمْ لِيَوْمٍ تَشْخَصُ فِيهِ الْأَبْصَارُ ﴿٤٢﴾
"অপরাধীরা যা করে, সে ব্যাপারে আল্লাহকে উদাসীন ভেবো না। তিনি তো তাদের সাময়িক অবকাশ দিচ্ছেন সেই দিনের আগ পর্যন্ত, যেদিন চোখগুলো বিস্ফারিত হয়ে যাবে।” (সূরাহ ইবরাহিম ১৪:৪২)
দ্বিতীয় রাক'আতে, أَلَمْ تَرَ كَيْفَ فَعَلَ رَبُّكَ بِأَصْحَابِ الْفِيلِ ١
"তুমি কি দেখোনি আল্লাহ হাতিওয়ালাদের সাথে কী আচরণ করেছেন?” (সূরাহ আল-ফীল ১০৫:১)
তিনি কীসের প্রতি ইঙ্গিত করছেন, তা সবাই স্পষ্ট বুঝল। সেসময় আদালতে ওই দুই আত্মীয়ের মাঝে মামলা চলছিল। এমনই এক সময় একজন আরেকজনের দিকে একদম অপ্রাসঙ্গিকভাবে কুরআনের আয়াত ছুঁড়ে মারল।
আল্লাহর কালামকে এভাবে ব্যবহারের অনুমতি তিনি আমাদের দেননি। এগুলো নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে, নির্দিষ্ট প্রসঙ্গে নাযিল হয়েছে। আমাদের ব্যক্তিগত ঝগড়াঝাঁটিতে ব্যবহৃত হবার জন্য নয়। অপমান করে প্রতিপক্ষকে ক্ষেপিয়ে তোলার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হবার জন্যে নয়। কুরআন তো বরং মুমিনদের জন্য প্রশান্তি ও আরোগ্য হবার কথা।
এখানেই শেষ নয়। সালাত শেষে মানুষ তখনও উঠে যায়নি। তিনি এই সুযোগে বলতে লাগলেন যে, কীভাবে কিছু মানুষ সালাত আদায় করেও কেবল আল্লাহর কাছ থেকে আরো দূরে সরে যায়। বিশেষত যারা অন্যের টাকা অবৈধভাবে আত্মসাৎ করে...ইত্যাদি...ইত্যাদি... (উল্লেখ্য, এই হাদিসটি সহিহ বলে প্রমাণিত নয়)।
এটি দ্বীনি জ্ঞানের খিয়ানত। আল্লাহ আমাদের যে আয়াত ও হাদিসগুলো শেখার সৌভাগ্য দিয়েছেন, সেগুলো ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার করাটা দুঃখজনক। পরিস্থিতি আরো খারাপ হয় যখন দ্বীনের ব্যাপারে কম জ্ঞানসম্পন্ন মানুষেরা রাগের মাথায় সেই আয়াত বা হাদিসকেই অস্বীকার করে বসে।
মুশরিকদের ব্যাপারে আল্লাহ আমাদের বলেন,
وَلَا تَسُبُّوا الَّذِينَ يَدْعُونَ مِن دُونِ اللَّهِ فَيَسُبُّوا اللَّهَ عَدْوًا بِغَيْرِ عِلْمٍ
“আল্লাহর পাশাপাশি তারা যেসবের উপাসনা করে, সেগুলোকে গালমন্দ কোরো না। তাহলে তারাও অজ্ঞতাবশত আল্লাহকে গালমন্দ করবে।” (সূরাহ আল-আন'আম ৬:১০৮)
নিজেদের অন্তর পরিশুদ্ধ রাখতে হলে সবসময় স্মরণে রাখতে হবে যে, আল্লাহর বাণী পৌঁছে দেওয়া একটি আমানত। মানুষের কাছে আল্লাহ, তাঁর দ্বীন ও তাঁর নবি (ﷺ)-কে প্রিয় করে তুলতে হবে। তার মানে ব্যক্তিগত ঝগড়ায় এই আমানত ব্যবহার করে নিজের পয়েন্ট বাড়ানো যাবে না। ধর্মীয় সত্যকে এই পর্যায়ে নামিয়ে আনা মহা অন্যায়।
আল্লাহ বলেন,
وَلاَ تَعْجَلْ بِالْقُرْآنِ مِن قَبْلِ أَن يُقْضَى إِلَيْكَ وَحْيُهُ وَقُل رَّبِّ زِدْنِي عِلْمًا ﴿١١٤﴾
"তোমার প্রতি ওহী সম্পূর্ণ হওয়ার আগে তুমি কুরআনের ব্যাপারে তা আত্মস্থ করার ব্যাপারে তাড়াহুড়া কোরো না। বরং বলো, 'হে আমার প্রতিপালক! আমার জ্ঞান বৃদ্ধি করে দিন।” (সূরাহ তা-হা ২০:১১৪)