📘 প্রিয় শত্রু! তোমাকে ধন্যবাদ > 📄 ভাই ইবনু জিবরিনের চিঠি

📄 ভাই ইবনু জিবরিনের চিঠি


কিছুদিন আগে আমি কয়েকটি বিষয়ের নিয়মিত খোঁজখবর রাখতাম। এগুলো কয়দিন পরপরই মাথাচাড়া দিয়ে উঠত। আমি এগুলোর জবাব দেওয়া থেকে বিরত থাকতাম। কারণ এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ অনেক কাজ আছে। সেসব কাজ বাদ দিয়ে এগুলোর পেছনে অতিরিক্ত সময় ও শ্রম নষ্ট করা অনর্থক মনে হতো। কিন্তু পরে আমি খেয়াল করলাম যে, এতে আমি একাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি না। বিষয়টির সাথে জড়িত ব্যক্তিরা ছাড়াও আরো অনেকের উপর এর প্রভাব পড়ছে। তাই এখন দেখছি এর জবাব দেওয়া জরুরি। কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থে নয়, আমাদের ঈমান ও দ্বীনের স্বার্থেই। আমি বছরের পর বছর ধরে একে যথাসম্ভব এড়িয়ে গেছি। তাৎক্ষনিক জবাব দেওয়া পরিহার করেছি। আসলে আমি এমন একটি সময়ের অপেক্ষায় ছিলাম, যখন জবাব দিলে সেটাকে আত্মপক্ষসমর্থন বলে মনে হবে না। বরং সম্পূর্ণ তাত্ত্বিক আলোচনা বলে পরিগণিত হবে।
সম্মানিত শাইখ আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রহমান আল-জিবরিনের কাছ থেকে একটি চিঠি পেয়ে বুঝলাম যে, সেই সময় চলে এসেছে। আশা করি আল্লাহ এই কথাগুলো থেকে আমাদের সবাইকে উপকৃত করবেন। ইবনু জিবরিন বেশ কিছু প্রশ্ন পেয়েছিলেন এক অতি-জজবাওয়ালা যুবকের কাছ থেকে। সেগুলোই তিনি আমাকে চিঠি আকারে পাঠান। যুবক ভাইটির সব বক্তব্যের সারকথা মূলত দুটি প্রশ্ন। আমি এগুলোরই উত্তর দিতে চাচ্ছি। প্রশ্নকর্তা লিখেছেন:
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
সম্মানিত শাইখ আব্দুল্লাহ আল-জিবরিন অনুগ্রহ করে এই প্রশ্নগুলোর জবাব দিয়ে বাধিত করবেন:
১। জনৈক ফাসিক সঙ্গীতশিল্পীর ব্যাপারে এক ব্যক্তি বলেছে, “সে তাওবাহ না করলে আল্লাহ তাকে কখনোই ক্ষমা করবেন না। কারণ নবিজি (ﷺ) বলেছেন, 'আমার উম্মাতের সকলকে ক্ষমা করা হবে, শুধু নিজের গুনাহর কথা প্রকাশ করে বেড়ানো ব্যক্তিরা ছাড়া।' তার মানে এই লোকের জন্য কোনো অজুহাত নেই, কারণ সে তার কাজের মাধ্যমে মুরতাদ হয়ে গেছে। তাওবাহ না করলে সে চিরস্থায়ী জাহান্নামী। আল্লাহ আমাদের এমন পরিণতি থেকে রক্ষা করুন। সে তো আল্লাহর এই আয়াতই বিশ্বাস করে না: 'জিনার কাছেও যেয়ো না। নিশ্চয় এটি জঘন্য ও ঘৃণ্য আচরণ।' আল্লাহর কসম! যে কেউ এই আয়াত জানে, সে কখনোই এটা হাজার-লক্ষ মানুষের সামনে ফলাও করে বেড়াবে না।” সে যে এই কথাটা বলল, এখন তার ব্যাপারে শরিয়তের হুকুম কী? সে কি খারেজি [৭] নয়, হে শাইখ? আমাদের কি উচিত নয় আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ওয়াস্তে মুসলিম উম্মাহকে এর বিরুদ্ধে সতর্ক করা? আর এমনটা করার সময় কি তার নাম উল্লেখ করা যাবে? উল্লেখ্য, তাকে তার আচরণ ঠিক করতে নসিহত করা হয়েছে। কিন্তু সে কথা শোনে না।
২। হাদিসে বর্ণিত তায়িফা মানসুরা (সাহায্যপ্রাপ্ত দল) ও ফিরকায়ে নাজিয়া (৭৩ দলের মধ্যে একমাত্র জান্নাতি দল) এই দুটিকে এক ব্যক্তি আলাদা মনে করে। আরো দাবি করে যে, শাইখ আব্দুল আযীয বিন বাযেরও একই মত। এই লোকের ব্যাপারে শরিয়তের হুকুম কী? উল্লেখ্য, শাইখ বিন বাযকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি এর বিপরীত কথা বলেছেন।
ওয়াসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
শাইখ আব্দুল্লাহ বিন জিবরিন তাঁর চিঠিতে নিজের এই মন্তব্যগুলো কষ্ট করে যোগ করে দিয়েছেন:
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
আমি এই বিষয়টি সম্মানিত শাইখ সালমান বিন ফাহদ আল-আওদাহর কাছে পাঠানো বিধেয় মনে করছি। এ ব্যাপারে তিনি বিশেষজ্ঞ, তাই তিনিই এর উত্তর দেওয়ার বেশি উপযুক্ত। প্রশ্নকর্তা যদি সত্যিই সত্যসন্ধানী হন, তাহলে নিঃসন্দেহে তিনি শাইখের উত্তরে সন্তুষ্ট হবেন। আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন। ওয়াসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রহমান আল-জিবরিন, ২২/১২/১৪২২
আমি সত্যিই প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে ইচ্ছুক। আমি প্রশ্নকর্তার অনুভূতিতে আঘাত করব না। আল্লাহর অনুগ্রহে এই বিষয়টি কেবল স্পষ্ট করে দিতে চাই, যাতে ভুল বোঝার অবকাশ না থাকে। প্রথম প্রশ্নের বক্তব্যটি আমিই এক গায়কের ব্যাপারে বলেছিলাম আমার এক খুতবায়।
সম্মানিত ভাইটি বলেছেন যে, বক্তাকে (অর্থাৎ, আমাকে) তার আচরণের ব্যাপারে সতর্ক করা হলেও সে কথা শোনেনি। মনে হয় তিনি আমার বক্তব্যকে ভুল বুঝেছেন। তিনি ভেবেছেন যে, আমি সকল গুনাহগার মুসলিমকে কাফির মনে করি। আমি স্বীকার করছি যে, প্রসঙ্গ বাদ দিয়ে আমার বক্তব্যটি শুনলে যে কেউই এমন অর্থই বুঝবে। অথচ এটা কারো অজানা নয় যে, আমি এক তাৎক্ষনিক বক্তব্যে শ্রোতাদের সামনে এই কথাটি বলেছি। এখানে খুঁটিনাটি বা বক্র কোনো অর্থ বের করার দরকার নেই। সাধারণভাবে যা বোঝায়, তাই বুঝতে হবে। ইসলামের আলিমগণ এ ব্যাপারে একমত যে, কারো বক্তব্য থেকে স্পষ্ট ও সাধারণভাবে কোনো অর্থ প্রকাশ পেলে এর বিপরীত কোনো অস্পষ্ট অর্থ খোঁজা যাবে না। 'আল-আওয়াসিম ওয়াল-কাওয়াসিম' গ্রন্থে ইমাম ইবনুল ওয়াযির এই মূলনীতিটি আলোচনা করে বলেছেন যে, এ ব্যাপারে আলিমদের ইজমা আছে।
বক্তার অবস্থা ও তার সর্বজনশ্রুত বক্তব্যগুলো থেকেই স্পষ্ট বোঝা যায় তিনি ওই খুতবায় কী বোঝাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু কারো যদি আরো নিশ্চিত হওয়ার প্রয়োজন হয়, আমি এখন বলছি: "হারামকে হালাল বলে ঘোষণা না করলে কোনো মুসলিম কেবল গুনাহ করার কারণে কাফির হয় না। খারিজি ও তাদের অনুসারী গোষ্ঠীগুলো ছাড়া আর কেউই এর সাথে দ্বিমত করে না। খারিজিরাই কেবল মুসলিমদের হত্যা, তাদের সম্পদ আত্মসাৎ ও সম্মানহানি করার বাহানা খোঁজে।
এই গোষ্ঠীটি ভ্রান্ত এবং তাদের অনুসারীদের স্বরূপ স্পষ্ট। কারো বক্তব্যের মধ্যে জোর করে লুকানো অর্থ বের করে তাকে তাদের দলে ফেলার চেষ্টা করার কোনো দরকার নেই। একজন মুসলিমকে সাধারণভাবে ঈমানদার বলেই বিবেচনা করতে হয়। কাজেই কোনো মুসলিম যদি নিজেকে খারিজিদের থেকে দায়মুক্ত ঘোষণা করে, তাহলে সেটাই বিশ্বাস করতে হবে। আর তার অন্তরের বিষয় আল্লাহর হাতে ছেড়ে দিতে হবে। কথার যেই অর্থ তিনি বোঝাতে চাননি, তা জোর করে তাঁর মুখে তুলে দিয়ে তারপর নিন্দা করার দরকার নেই।
নবিজি (ﷺ) তাবুক যুদ্ধ থেকে ফিরে আসার পর মুনাফিকরা তাঁর কাছে গিয়ে যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করার বিভিন্ন মিথ্যে অজুহাত শোনাতে লাগল। তিনি তাদের ওজর গ্রহণ করে নেন, তাদের জন্য মাগফিরাতের দু'আ করেন, আর তাদের অন্তরের ব্যাপার আল্লাহর হাতে ছেড়ে দেন। মুসলিমদের উচিত দ্বীনি ভাই হিসেবে একত্র থাকা এবং পারস্পরিক আচরণে এই ধরনের সদাচরণ দেখানো। একে অপরের প্রতি সর্বোচ্চ সুধারণা করার জন্য বাহানা খুঁজতে হবে, তাদের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করতে হবে, আর অন্তরের গোপন বিষয় আল্লাহর কাছে ন্যস্ত করে দিতে হবে।
প্রশ্নকর্তা যে অর্থ বুঝেছেন, আমি আসলে সেটি বোঝাইনি। ওই সঙ্গীতশিল্পী ব্যভিচার করতে পছন্দ করে বলেই আমি এমন কথা বলেছি, তা নয়। বরং সে এই ঘৃণ্য কাজটির প্রশংসা করে, ব্যভিচার ও ব্যভিচারীদের গুণগান করে, ব্যভিচার পরিহারকারী ব্যক্তিদের পুরুষত্ব নিয়ে বিদ্রূপ করে। কেবল গুনাহ করার চেয়ে এটা একদমই আলাদা।
একজন মানুষের মুখের কথা তার মনের ভাবের ছায়ামাত্র। অর্থ যদি পরিষ্কার বোঝা যায়, তাহলে শব্দচয়নে সামান্য বা মারাত্মক ভুল করলেও তা ক্ষমার যোগ্য।
আল্লাহর রাসূল (ﷺ) এক লোকের কথা বলেছেন, যে খুশির চোটে ভুলে বলে ফেলেছিল, “হে আল্লাহ! আপনি আমার বান্দা আর আমি আপনার প্রতিপালক!” শব্দচয়নে ভুল করলেও সে গুনাহগার হয়নি।
কারো কোনো বক্তব্য প্রসঙ্গ বাদ দিয়ে বা অতিরিক্ত ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে প্রচার করা যাবে না। বিশেষত বক্তৃতা বা লেখার উদ্দেশ্য যদি থাকে নসিহত করা ও জনগণের কল্যাণসাধন, তাহলে শ্রোতা বা পাঠকের উচিত নয় বক্তা বা লেখকের টুটি চেপে ধরার উদ্দেশ্যে লুকানো অর্থ খুঁজতে শুরু করা।
খারিজিদের দুটো প্রধান দোষ ছিল। দুটোই একই রকমের মারাত্মক এবং এদের একটি অপরটিকে শক্তিশালী করে। প্রথমত, ঈমানের বিষয়গুলোতে কঠোরতা, যেটাকে তারা ইসলামি শরিয়তের পবিত্রতার প্রতি ভক্তি ভেবে ভুল করত। পাপাচারী ব্যক্তিকে কাফির ভেবে তারা অবিচার করত। দ্বিতীয় দোষটি প্রথমটি থেকেই উদ্ভূত। তারা অপর মুসলিম ভাইয়ের প্রতি আক্রমণাত্মক ও সহিংস আচরণ করত। এমনকি তাদের জীবন, সম্পদ ও সম্মান হরণ করা নিজেদের জন্য হালাল করে নিয়েছিল।
আল্লাহর কাছে শোকর যে, মুসলিমদের বিরাট অংশটি খারিজিদের চরমপন্থাকে প্রত্যাখ্যান করে। তারা পাপাচারী মুসলিমকে কাফির বলে না। চরমপন্থা অবলম্বনকারী মানুষের সংখ্যা একেবারেই নগণ্য। আল্লাহ আমাদেরকে এই মানুষদের ক্ষতি থেকে রক্ষা করুন।
দুর্ভাগ্যবশত, কিছু মানুষ বাঁকা অর্থ বের করার মাধ্যমে অপর মুসলিম ভাইয়ের জীবন ও সম্পদের প্রতি জুলুম করে। এটা বিপজ্জনক স্বভাব। আমি এদের ব্যাপারে প্রচুর লেখালেখি করেছি এবং মানুষকে তাদের ব্যাপারে সাবধান করেছি।
আর কিছু লোক এমন আছেন, যারা সঠিক বুঝ-জ্ঞানের অধিকারী এবং খারিজিদের চিন্তাধারাকে চরমভাবে প্রত্যাখ্যানকারী। কিন্তু দুঃখজনক ব্যাপার হলো, খারিজিদের একটি গুণ তাঁরা রপ্ত করে নিয়েছেন। তাঁদের সাথে মতপার্থক্যকারীদের প্রতি তাঁদের আচরণ কঠোর এবং তাদের ভুল খুঁজে বের করতে তাঁরা বেশ তৎপর। কী সহজেই না তাঁরা অপরকে বিদআতি, ভ্রান্ত, মুরজিয়া [৮] বা খারিজি বলে ফেলেন! প্রায়ই এসব কথা তাঁরা বলেন স্বল্প বুঝ ও অগভীর জ্ঞানের কারণে। বিশেষ কারো সাথে মিত্রতা ও অপর কারো সাথে শত্রুতার কারণেই তারা এসব সিদ্ধান্তে পৌঁছান। যুবকদের মধ্যে যাদের এই অভ্যাস আছে, তারা এসব ব্যাপারে তুমুল বিতর্ক করতে করতেই জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময়টা ব্যয় করে ফেলে। অথচ এটা ইলম বৃদ্ধি করা ও চরিত্র উন্নয়নের সময়।
মানুষের ভুল সংশোধন করে তাদের সামনে সত্য উন্মোচিত করা হলো জ্ঞানী ও যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিবর্গের কাজ। এদের এ ব্যাপারে জ্ঞানও আছে, সঠিকভাবে কাজটি করার মতো প্রজ্ঞাও আছে। আল্লাহ বলেন,
آتَيْنَاهُ رَحْمَةً مِّنْ عِندِنَا وَعَلَّمْنَاهُ مِن لَّدُنَّا عِلْمًا ﴿٦٥﴾
"তার প্রতি আমি অনুগ্রহ করেছি এবং তাকে দিয়েছি আমার পক্ষ থেকে বিশেষ জ্ঞান।” (সূরাহ আল-কাহফ ১৮:৬৫)
জ্ঞানী লোকেরা বুঝতে পারেন যে, দরকারি হলেও অনেক কাজের ফলাফল আসলে শূন্য। বিশেষত এমন একটা সময়ে, যখন মুসলিমদের আসল শত্রু হলো তাদের ভূমি ও সম্পদের উপর নেমে আসা শক্তিশালী দখলদার শত্রুবাহিনী।
সবচেয়ে খারাপ ব্যাপার হলো অপরের কাছে ইসলামের বার্তা পৌঁছে দিতে আমাদের ব্যর্থতা। আমরা যখন নিজেদের মাঝে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে নিষ্ফল ঝগড়াঝাটিতে লিপ্ত, তখনও পৃথিবীতে অনেকে অমুসলিম রয়ে গেছে। এদের মাঝে অনেকের কাছেই এখনও কেউ ইসলামের সঠিক বার্তা নিয়ে যায়নি।
এই দুটি বিষয়ই আমাদের সব চেষ্টা-আগ্রহের মূল কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত। আমাদের একে অপরকে আক্রমণ করা বাদ দিয়ে নিজেদের মাঝে নমনীয় ও ক্ষমাশীল হতে হবে এবং সর্বোচ্চ সুধারণা রাখতে হবে। কঠোরতা পরিহার করতে হবে। আর যারা বিশেষ কোনো ইসলামি কর্মীর মর্যাদা রক্ষায় নিয়োজিত থাকার দাবি করেন, তাদের বলব, আপনারা ভালো কাজ করেছেন। তবে এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ইসলাম ও ঈমানের প্রতিরক্ষার্থে কাজ করা এবং মুসলিমদের দুরবস্থা দূর করতে সচেষ্ট হওয়া। অমুসলিমদের ইসলামের দিকে আহ্বান করা, দ্বীনের খেদমতে গঠনমূলক কিছু করা এবং বৃহৎ অর্থে, মানবজাতির কল্যাণার্থে পৃথিবীর উন্নয়নে ভূমিকা রাখা।
আমার ব্যাপারে কুধারণা রেখেও যদি কেউ বিশুদ্ধ তাওহীদ অন্তরে নিয়ে মারা যায়, তাতে কোনো সমস্যা নেই। বরং সমস্যা হবে যদি সে আল্লাহ, তাঁর দ্বীন, শরিয়ত, কিতাব ও নবি-রাসূলগণের ব্যাপারে অজ্ঞ অবস্থায় মারা যায়। ইসলামের জন্য আমরা যেসব কাজ করি, তা বিভিন্ন কারণে খুবই সীমিত। তাহলে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ও উপকারী কাজগুলোতে আগে মনোযোগ দেওয়াটাই কি উচিত নয়?
আমাদের জজবাতি প্রশ্নকর্তা ভাই দ্বিতীয় যে বিষয়টি তুলে ধরেছেন, তা হলো আমি ফিরকায়ে নাজিয়া ও তায়িফা মানসুরাকে আলাদা মনে করি। তিনি আরো বলেছেন যে, আমি বিন বাযকে আমার সাথে এ ব্যাপারে একমত বলে দাবি করলেও তাঁর মত আসলে ভিন্ন।
এই বিষয়ে ইজতিহাদ ও গবেষণা করতে কোনো দোষ নেই, কারণ এই বিষয়টিতে অনুধাবনের অনেক কিছু আছে। তবুও এটা বড় কোনো ব্যাপার নয়। বিভিন্ন আলিম বিভিন্ন হাদিসের অর্থের মাঝে তুলনা করে একাধিক সিদ্ধান্তে এসেছেন, এটাই মূল কথা। যেমন- আত-তাহাওয়ি, ইবনু কুতাইবাহ, ইবনু হাজার, ইবনু তাইমিয়াহ, ইমাম নববি প্রমুখ। মুফাসসিরগণ যেমন বিভিন্ন আয়াতের অর্থের মাঝে তুলনা করেন, এখানেও ব্যাপারটা একই রকম। এসকল কাজে অনেকসময় সিদ্ধান্তহীনতা বা অনিচ্ছাকৃত ভুল সিদ্ধান্ত তৈরি হয়। মুসলিমরা এতে কখনো দোষী হয় না। কারণ নবিজি (ﷺ) বলেই দিয়েছেন ইজতিহাদকারী আলিম সঠিক সিদ্ধান্তের কারণে দুই নেকি ও ভুল সিদ্ধান্তের কারণে এক নেকি লাভ করবেন।
আমরা যা নিয়ে কথা বলছি, এর চেয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলিমগণ আলোচনা করেছেন। যেমন ধরুন ইসলাম ও ঈমানের অর্থ। কেউ বলেছেন দুটো একদমই সমার্থক, কেউ বলেছেন একদমই আলাদা, কেউ আবার বলেছেন আংশিক আলাদা। প্রতিটি মতের পক্ষেই প্রখ্যাত সব আলিম রয়েছেন। তাঁদের কেউই সমালোচনার পাত্র হয়ে যাননি, কারণ এগুলো খুবই তাত্ত্বিক আলোচনা। ইবনু তাইমিয়াহ (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর 'কিতাবুল ঈমান' গ্রন্থে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করেছেন।
'রাসাইলুল গুরাবা' বইয়ে আমি যে মত দিয়েছি, তা মূল পাঠের ব্যাখ্যা হিসেবে এসেছে। আমি এ ব্যাপারে আমার মতকে সঠিক বলে মনে করি, তবে তা ভুল হওয়ার সম্ভাবনাও স্বীকার করি। একইভাবে, আমি এ ব্যাপারে প্রশ্নকর্তা ভাইয়ের মতকে ভুল মনে করি, তবে তা সঠিক হওয়ার সম্ভাবনাও স্বীকার করি। এ ব্যাপারে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেই। যেহেতু এ ব্যাপারে ইজমা নেই, তাই আলোচনার দুয়ার খোলাই আছে।
এ ব্যাপারে যারা আমার কথা উদ্ধৃত করে, তারা এমনভাবে দেখায় যেন আমি ফিরকায়ে নাজিয়া আর তায়িফা মানসুরাকে একেবারেই আলাদা দুটি দল মনে করি। আসলে ব্যাপারটা এমন নয়। আমার মতে ফিরকায়ে নাজিয়া হলো তায়িফা মানসুরার তুলনায় আরো বিস্তৃত একটি ব্যাপার। তায়িফা মানসুরা হলো ফিরকায়ে নাজিয়ার অংশ। দুনিয়ায় আসমানী সাহায্য না পেয়েও অনেক মুসলিম নাজাত পায়। সাহাবিদের মধ্যে যারা পরস্পরের সাথে মতভেদ ও লড়াই করেছেন, তাঁদের সকলেই নাজাতপ্রাপ্ত। কিন্তু সকলেই দ্বন্দ্বের সময় ঐশী সাহায্য পাননি। আগ্রহীদের আমি বলব এ ব্যাপারে ইবনু তাইমিয়াহর লেখা পড়তে। (আল-ফাতাওয়া, ৪/৪৪৩-৪৫০ এবং ৪/৪৬৭-৪৭০)
আমার মতের পক্ষে কুরআন থেকে সমর্থন রয়েছে। আল্লাহ বলেন, وَمَا كَانَ الْمُؤْمِنُونَ لِيَنفِرُوا كَافَّةً ، فَلَوْلَا نَفَرَ مِن كُلِّ فِرْقَةٍ مِّنْهُمْ طَائِفَةٌ لِّيَتَفَقَّهُوا فِي الدِّينِ وَلِيُنذِرُوا قَوْمَهُمْ إِذَا رَجَعُوا إِلَيْهِمْ لَعَلَّهُمْ يَحْذَرُونَ ﴿۱۲২
“মুমিনদের সকলের একত্রে অভিযানে বেরিয়ে পড়া সমীচীন নয়। তাদের প্রতিটি দলের (ফিরকা) একটি অংশ (তায়িফা) যেন পৃথক হয়, যাতে করে তারা দ্বীন সম্পর্কে জ্ঞানের অনুশীলন করতে পারে এবং ফিরে আসার পর তাদের সম্প্রদায়কে সতর্ক করতে পারে যাতে তারা (অসদাচরণ) থেকে বিরত হয়।” (সূরাহ আত-তাওবাহ ৯:১২২)
এই আয়াতে দেখা যাচ্ছে তায়িফার চেয়ে ফিরকা বেশি বিস্তৃত। আরবি ভাষায় তায়িফা বলতে ফিরকার চেয়ে ছোট দল বোঝানো হয়। এমনকি একজন ব্যক্তি নিয়েও তায়িফা গঠিত হতে পারে, যেমনটা এই আয়াতের ব্যাপারে কিছু মুফাসসির বলেছেন,
وَلْيَشْهَدْ عَذَابَهُمَا طَائِفَةٌ مِّنَ الْمُؤْمِنِينَ ﴿٢﴾
“আর মুমিনদের একটি দল (তায়িফা) যেন তাদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করে।” (সূরাহ আন-নূর ২৪:২)
আমার মতের পক্ষে আরো দলীল আছে। এই শব্দদুটোর অর্থই কেবল আলাদা নয়, এদের বিশেষণও আলাদা। একটির বিশেষণ 'নাজাতপ্রাপ্ত', আরেকটির বিশেষণ 'সাহায্যপ্রাপ্ত'। ভাষার সাধারণ নিয়ম হলো গাঠনিক এই পার্থক্য অর্থের পার্থক্য নির্দেশ করে। আর আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন।
যা-ই হোক, আমি কখনোই বলিনি ফিরকায়ে নাজিয়া আর তায়িফা মানসুরা সম্পূর্ণ আলাদা দুটি দল। আমি কেবল বলেছি যে, তায়িফা মানসুরা হলো ফিরকায়ে নাজিয়ার অংশ। কিছু মানুষ কিছু ভুল করলেও এবং ঐশী সাহায্য না পেলেও পরকালে নাজাত পাবেন। আর কিছু মানুষ উভয়টিই পাবেন।
অন্যান্য লেখায় আমি এই বিষয়ে গভীরতর আলোচনা করেছি বলে এখানে আর কথা বাড়ানোর প্রয়োজন দেখছি না। যারা বলেন দুটি শব্দবন্ধই একই অর্থ প্রকাশ করে, তাঁদেরও শক্ত দলীল রয়েছে।
সিলসিলাহ আল-আহাদিস আস-সহিহাহ [৯] গ্রন্থে শাইখ নাসিরুদ্দিন আলবানি লিখেন,
আর আমাদের এক দ্বীনি ভাই বলে থাকেন এই দুটি দলের মাঝে পার্থক্য রয়েছে। এটি তাঁর মত এবং আমি একে সত্য থেকে বেশি দূরবর্তী মনে করি না। আগেই বলা হয়েছে যে, মুহাদ্দিসগণের মতে তায়িফা মানসুরা হলো হাদিসের আলিমগণ। অথচ ফিরকায়ে নাজিয়ার বেশিরভাগই আলিম নন, হাদিসের আলিম তো ননই।
নবিজি (ﷺ)-এর সাহাবাগণ হলেন ফিরকায়ে নাজিয়ার শ্রেষ্ঠ প্রতিনিধি। এ কারণেই তো আমাদের আদেশ করা হয়েছে তাঁদের সুন্নাহ অনুসরণ করতে। অথচ তাঁদের বেশিরভাগই আলিম ছিলেন না। তাঁরা তাঁদের মধ্যকার অল্পসংখ্যক আলিমের অনুসরণ করতেন।
কাজেই এ কথা পরিষ্কার যে, তায়িফার চেয়ে ফিরকা আরো বিস্তৃত। একইসাথে, এ নিয়ে বিতর্ক করার মাঝে আমি কোনো কল্যাণ দেখি না। আমাদের বরং নিজেদের মধ্যকার ঐক্য রক্ষা ও ইসলামের জন্য কাজ চালিয়ে যাওয়া বেশি জরুরি।
আমি স্বীকার করি যে, 'মানসুরা' এবং 'নাজিয়া' শব্দদ্বয় কিছুটা হলেও সমার্থক। কারণ নাজাত পাওয়ার কারণগুলো একত্রিত হলেই সাহায্য পাওয়া সম্ভব। একইভাবে, ঐশী সাহায্য তাঁরাই পান, যারা নাজাতের পথে থাকেন। কাজেই, দুটি শব্দের কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য আছে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, এগুলো হুবহু একই। হুবহু একই হওয়ার সম্ভাবনা আছে, যেমনটা কিছু চিন্তাবিদ মনে করে থাকেন। আবার একটার চেয়ে আরেকটা সাধারণ হওয়ার সম্ভাবনাও আছে, যে মতটিকে আমি অগ্রাধিকার দিই। মোট কথা, একটি শব্দ অপরটি থেকে বেশি বিস্তৃত হলেও দুটির মাঝে সাধারণ সমার্থকতার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
প্রশ্নকর্তার মতটি যদি আমরা গ্রহণ করেও নিই, অর্থাৎ 'মানসুরা' ও 'নাজিয়া'র অর্থ হুবহু একই ধরে নিই তবুও আমার মনে হয় গভীরতার দিক দিয়ে দুটির মাঝে কিছুটা হলেও পার্থক্য থাকবে। আহলুস সুন্নাহর অনেক আলিমের মতে, অর্থ একই হলেও দুটি শব্দের অর্থের গভীরতার মাত্রা আলাদা হতে পারে। কোন প্রসঙ্গে ব্যবহৃত হয়েছে, তার ভিত্তিতে শব্দগুলোর অর্থ বিভিন্ন মাত্রা ধারণ করতে পারে। আলিমগণ একমত যে, প্রসঙ্গ সহ ও প্রসঙ্গ ছাড়া বিবেচনা করলে একই কথার ভিন্ন অর্থ হতে পারে।
মুমিনদের মাঝে তাকওয়া ও আমলে যে পার্থক্য আছে, তা তো অনস্বীকার্য। জান্নাতের অনেক স্তর আছে। দুনিয়ায় অর্জন করা সাওয়াবের ভিত্তিতে একেক মুমিন একেক স্তরে থাকবে। নবিগণের আলাদা স্তর, সিদ্দিকগণের আলাদা, শহীদগণের আলাদা, সলিহ (সৎকর্মশীল) লোকদের আলাদা। এর বাইরেও অন্যান্য স্তরের মুমিন জান্নাতে থাকবে। কেউ বিনা বিচারে জান্নাতে যাবে। কেউ জাহান্নামে কিছু সময় কাটিয়ে তারপর জান্নাতে ঢোকার অনুমতি পাবে। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেন,
إِنَّ فِي الْجَنَّةِ مِائَةَ دَرَجَةٍ أَعَدَّهَا اللَّهُ لِلْمُجَاهِدِينَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ، مَا بَيْنَ الدَّرَجَتَيْنِ كَمَا بَيْنَ السَّمَاءِ وَالأَرْضِ، فَإِذَا سَأَلْتُمُ اللَّهَ فَاسْأَلُوهُ الْفِرْدَوْسَ، فَإِنَّهُ أَوْسَطُ الْجَنَّةِ وَأَعْلَى الْجَنَّةِ، أَرَاهُ فَوْقَهُ عَرْشُ الرَّحْمَنِ، وَمِنْهُ تَفَجَّرُ أَنْهَارُ الْجَنَّةِ
“আল্লাহর রাস্তায় যারা জিহাদ করে, তাদের জন্য আল্লাহ জান্নাতে একশটি স্তর সজ্জিত করেছেন। একেকটির মধ্যকার দূরত্ব আসমান ও জমিনের মধ্যকার দূরত্বের মতো। কাজেই জান্নাতের জন্য দু'আ করার সময় আল- ফিরদাউসের জন্য দু'আ করবে। কারণ এটি জান্নাতের উচ্চতম ও কেন্দ্রীয় স্থান। এর উপর দয়াময় আল্লাহর আরশ এবং এ থেকে জান্নাতের নদীসমূহ প্রভাবিত হয়।” [১০]
জান্নাতের স্তরবিন্যাস নির্ণয় করতে আলিমগণ বিভিন্ন পদ্ধতি অনুসরণ করেছেন। শিষ্টাচার ও সচ্চরিত্র নিয়ে গবেষণাকারী আলিমগণ এ কাজে রত হয়েছেন। স্তর নির্ধারণের গুণাবলি ও সেগুলোর খুঁটিনাটি বিভিন্নজন বিভিন্নভাবে গ্রহণ করেছেন বলে তাঁদের মাঝে মতপার্থক্য হয়েছে।
ইসলামি শরিয়তের একটি গুরুত্বপূর্ণ মূল প্রতিপাদ্য হলো ন্যায়। প্রতিটি বস্তুকে তার যথাযথ স্থানে রেখে এবং প্রত্যেককে তার প্রাপ্য অধিকার দিয়ে এই ন্যায় অর্জিত হয়। মানুষের ঈমান ও আমলের স্তর বিভিন্ন। কেউ যেই স্তরে পৌঁছায়, তার উপরের স্তরে যাবার জন্য তার পরিশ্রম করা উচিত। আল্লাহ বলেন,
وَالَّذِينَ جَاهَدُوا فِينَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا ، وَإِنَّ اللَّهَ لَمَعَ الْمُحْسِنِينَ ﴿٦٩﴾
"আর যারা আমার পথে চেষ্টা-সাধনা করে, আমি অবশ্যই তাদের আমার দিকে পথ দেখাব। নিশ্চয়ই আল্লাহর সৎকর্মশীলদের সাথে আছেন।” (সূরাহ আল-আনকাবূত ২৯:৬৯)
শেষ কথা হলো, আমাদের উচিত উপকারী জ্ঞান অর্জনে ব্যস্ত হওয়া ও এই ইলমের মর্যাদা বোঝা। একে অপরের সাথে তর্ক করে নিজেদের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত হওয়ার জন্য এই জ্ঞান ব্যবহার করা উচিত নয়।

টিকাঃ
[৭] এরা একটি ভ্রান্ত গোষ্ঠী, যারা মনে করে কোনো মুসলিম কবিরা গুনাহ করলেই কাফির হয়ে যায়।
[৮] আরেকটি ভ্রান্ত দল, যারা খারিজিদের একদম বিপরীত মত পোষণ করতো। তাদের মতে, একজন মানুষ যত ভালো বা খারাপ আমলই করুক, ঈমানের উপর এর কোনো প্রভাবই পড়ে না।
[৯] আল-আলবানি, সিলসিলাহ আল-আহাদিস আস-সহীহাহ, ১/৯৩২
[১০] সহিহ বুখারি: ২৭৯০

📘 প্রিয় শত্রু! তোমাকে ধন্যবাদ > 📄 ঈমান সবার আগে

📄 ঈমান সবার আগে


আমি আমার সমালোচকদের কথার জবাব দিই না, এই অভিযোগ করে অনেকে আমার কাছে চিঠি লিখেন। তাদের দাবি, এমনটা করা সবসময় ঠিক নয়। তারা বলেন যে, সমালোচকরা প্রায়ই আমাকে ভুল বুঝেন। আমি যদি একটু সময় নিয়ে বিষয়টা পরিষ্কার করে ব্যাখ্যা করে দিতাম, তাহলেই অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যেত।
নিঃসন্দেহে নিজের সুনাম রক্ষা করা প্রত্যেকের অধিকার, তবে দায়িত্ব নয়। আত্মপক্ষসমর্থনের পেছনে অনেক সময় যায় এবং অন্য অনেক কাজ থেকে মনোযোগ সরে যায়। ইসলাম, মুসলিম ও মানবতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে ঠিকমতো শ্রম ও সময় দেওয়া যায় না।
এতে করে নিন্দুকের মনের আগুনও নেভে না, সমস্যাও সমাধান হয় না। বরং আগুনে আরো ইন্ধন জোগায়। নিন্দুকেরা অবশ্যই পাল্টা জবাব দিয়ে আপনার বক্তব্যের দুর্বল দিকগুলো তুলে ধরার চেষ্টা করবে। আত্মপক্ষ সমর্থনের মাধ্যমে তো আপনি স্বীকার করে নিলেন যে, দুটো পক্ষ এখানে বিরোধে লিপ্ত আছে। তার চেয়ে ভালো হয় একটি মাত্র পক্ষকেই আক্রমণে ব্যস্ত থাকতে দিয়ে নিজে এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যস্ত হয়ে যাওয়া। দিন শেষে যা সঠিক, তা তো সঠিকই।
পৃথিবীতে কমপক্ষে চার বিলিয়ন মানুষ এখনও তাদের রব্বকে ঠিকমতো চেনে না। তাদের অনেকেই আবার তাঁর অস্তিত্ব পর্যন্ত অস্বীকার করে। আমাদের কি উচিত না এই মানুষগুলোকে সঠিক ব্যাপারগুলো বোঝাতে ব্যস্ত থাকা?
এছাড়াও আছে এক বিলিয়নের চেয়ে বেশি মুসলিম। তাদের মাঝে অজ্ঞতা ব্যাপক। চারদিকে বিদআতের ছড়াছড়ি। কোনো কোনো মুসলিম কবর-মাজার আর পীর-আউলিয়ার পূজা করে। অনেকে ব্যভিচার-অশ্লীলতা আর সুদের কারবারে জড়িত। অনেক জায়গায় মুসলিমরা জালিম শাসক আর নাস্তিক সরকারের অত্যাচারে পিষ্ট হচ্ছে। তাদের হত্যা করা হচ্ছে, নারীরা হচ্ছে লাঞ্ছিতা। ইসলাম থেকে দূরে সরে গিয়ে মুসলিমরা ভ্রান্তি ও পাপে নিমজ্জিত এক জীবন যাপন করছে।
আল্লাহর মনোনীত এই উম্মাহর ব্যাপারে আমি নিরাশ হচ্ছি না। সকল সীমাবদ্ধতা সাথে নিয়েই মুসলিমরা আমাদের অন্তরে আছে, আমরা তাদের ইসলামি পরিচয়কে স্বীকৃতি দেই। যারা অজ্ঞতাবশত শির্কে লিপ্ত হয়েছে, আমরা তাদের অন্তরে ইসলামের অস্তিত্ব স্বীকার করি এবং তাদের অজ্ঞতাকেই শুধু দোষারোপ করি। আল্লাহর দয়া সবকিছুকে বেষ্টন করে রাখে। আমরা দু'আ করি আমাদের গুনাহের কারণে আমরা যেন তাঁর রহমত থেকে বঞ্চিত না হই। কোনো মুসলিমেরই এমন পরিণতি আমরা চাই না।
আমরা আশা করি আমরা আমাদের সমালোচকদের মাধ্যমে উপকৃত হবো। তাদের কারণে আমরা আমাদের ভুলত্রুটিগুলোর দিকে নজর দিতে পারি। নবিজি (ﷺ) বলেছেন,
كُلُّ بَنِي آدَمَ خَطَّاءٌ وَخَيْرُ الْخَطَّائِينَ التَّوَّابُونَ
"আদমের সকল সন্তানই গুনাহগার, উত্তম গুনাহগার হলো সে, যে তাওবাহ করে।" [১১]
সমালোচক যদি আমাদের শুভাকাঙ্ক্ষী হয়, আমরা বলি, “আল্লাহ সেই ব্যক্তিকে রহম করুন, যে আমাদের ভুল ধরিয়ে দেয়।” আর নিন্দুক যদি কেবল আমাদের ঘৃণাই করে, তাহলে আমরা কবির সাথে গলা মিলিয়ে বলি,
আমার শত্রুরা তো আমার জন্য রহমত। হে প্রতিপালক! তাদের দূরে রেখো না। তারা আমার ভুল ধরে সংশোধনের আশায়। প্রতিযোগিতায় করে উন্নয়নের আশা।
কিছু মানুষ সমালোচনার জবাব দিতে গিয়ে নিজের ভুলের উপর আরো বেশি গেঁড়ে বসেন। এটি তাঁদের আত্মবিশ্বাসের অভাব। আবার অনেকে সমালোচনা থেকে নিজেকে বাঁচানোর জন্য সঠিকটা বাদ দিয়ে ভুল কথা বলেন। এটা কেবল দুর্বলতাই নয়, সুস্থ মানসিকতার অভাবও বটে।
সমালোচকদের থেকে আমরা যেভাবে উপকৃত হই, তার একটি হলো সমালোচনার প্রতি অভ্যস্ত হওয়া। আমরা অপমান ও কটু কথা সহ্য করতে শিখি, অভিযোগ আসলে কীভাবে সঠিক আচরণ করতে হয় সেটা শিখি। এটা আমাদের নিজেদের জন্যই ভালো। কারণ জীবনে একসময় না একসময় এগুলো আসতই। সারাক্ষণ প্রশংসা শুনতে অভ্যস্ত ব্যক্তি হঠাৎ সমালোচনার মুখোমুখি হলে সহ্য করতে পারবে না, তা যতই গঠনমূলক হোক না কেন। অতিরিক্ত প্রশংসা মানুষকে আত্মতুষ্ট ও অহংকারী করে তোলে।
আমরা চাই সারা বিশ্বের মুসলিমরা যেন তাদের দ্বীন ছাড়া অন্য কোনোকিছুর প্রতি রক্ষণাত্মক না হয়। শুধু হকের পক্ষেই ব্যস্ত থাকতে হবে। নিজের ব্যাপারে বা প্রিয়জনের ব্যাপারে মিথ্যে অপবাদ ছড়াতে দেখলে আত্মসংবরণ করতে হবে, এমনকি মানুষ যদি সেসব অপবাদ বিশ্বাস করতে শুরু করে তবুও। এটা খুবই ছোট বিষয়। অমুক-তমুকের আলোচনা কখনোই তর্ক-বিতর্কের বিষয় হওয়া উচিত নয়। এসব জিনিস থেকে দূরে থাকাই শ্রেয়।
আমরা আরো চাই মুসলিমরা উপকারী কাজে মগ্ন থাকুক। ইসলাম শেখা, শেখানো ও মানুষকে এর দিকে আহ্বান করা; মানবতার সেবা; সংস্কারসাধন—এসবেই আমাদের মননিবেশ করা উচিত। আমাদের উচিত সাধারণভাবে সকল মুসলিমের সাথে মিত্রতা পোষণ করা এবং স্থান নির্বিশেষে ভালো কাজে সবাইকে সহযোগিতা করা। আমাদের অবশ্যই মিডিয়া, অর্থনৈতিক ও সামাজিক শক্তি বৃদ্ধি করতে হবে। আমাদের সামর্থ্য, দক্ষতা ও সৃষ্টিশীলতা বাড়াতে হবে।
তুচ্ছ বিবাদ-দ্বন্দ্ব যেন আমাদের সামান্যতম মনোযোগও না পায়। এগুলো আমাদের মনকে চাঙাও করে না, চিন্তার উন্নয়নও করে না। এগুলোর কোনো গঠনমূলক প্রভাবই নেই। মুসলিমদের মাঝে এগুলোর মাধ্যমে না ভালোবাসা তৈরি হয়, না কোনো ইতিবাচক সংস্কার হয়।
কেউ যদি ফিরআউন ও তার দোসরবাহিনী, আবু জাহেল, আবু লাহাবদের মতো কাট্টা কাফিরদের গালমন্দ করার পেছনেও সারাটি সময় ব্যয় করে, তাহলে সেও অধিক গুরুত্বপূর্ণ কাজে অবহেলা করল। যেমন- আল্লাহর যিকির করা। ওইসব লোকের ব্যাপারে আপনি কিছুই জানেন না, এমন অবস্থাতেই আপনি মারা গেলেন, তারাপরও আপনার পক্ষে জান্নাতের উচ্চতম স্তরে পৌঁছানো সম্ভব। এ কারণেই রাসূল (ﷺ) বলেছেন, “মৃতদের অভিসম্পাত কোরো না এবং জীবিতদের কষ্টের কারণ হয়ো না।”[১২] আরেক বর্ণনায় আছে, তিনি (ﷺ) বলেন, “...কারণ তারা তাদের প্রতিফল পেয়ে গেছে।”[১৩]
আইশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, নবি (ﷺ) এই হাদিসটি এই উম্মাহর ফিরআউন আবু জাহল সম্পর্কে বলেছেন।
যারা অন্যের দোষ খুঁজে খুঁজে তাকে আক্রমণ করায় ব্যস্ত থাকে, তাদের অন্তর ব্যাধিগ্রস্থ। আগুন যখন পোড়ানোর কিছু পায় না, তখন নিজেকেই পোড়ায়।
অপরকে শুধু ভুলত্রুটির সংকীর্ণ পরিসরে বিচার করা বড় অন্যায়। প্রতিটি ব্যক্তিই বহুমাত্রিক ও জটিল এক সত্তা। প্রত্যেকের মাঝেই এমন কিছু গুণ থাকে, যা ঠিকমতো পরিচর্যা করলে অপরের বহু কল্যাণ সাধন করতে পারে। সংস্কারকদের উচিত মানুষের মাঝে সুপ্ত সেই গুণাবলিকে জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করা। যথাযথ ও পরিমিত প্রশংসার মাধ্যমেই কেবল তা সম্ভব।
বিভিন্ন ব্যক্তি, গোত্র ও এলাকার ব্যাপারে নবি (ﷺ) যেভাবে প্রশংসা করেছেন, তাতেই এর উদাহরণ পাওয়া যায়। সমাজে কেউ যে সম্মান-মর্যাদার অধিকারী, সেটিকে তিনি আঘাত না করার চেষ্টা করতেন। এ কারণেই মক্কা বিজয়ের দিন তিনি বলেছেন,
مَنْ دَخَلَ دَارَ أَبِي سُفْيَانَ فَهُوَ آمِنٌ
“যে কেউ আবু সুফিয়ানের (এলাকার প্রধান) ঘরে প্রবেশ করবে, সে নিরাপদ।”[১৪]
নবিজি (ﷺ) আরো বলেন,
إِنَّ اللَّهَ جَمِيلٌ يُحِبُّ الْجَمَالَ الْكِبْرُ بَطَرُ الْحَقِّ وَغَمْطُ النَّاسِ
"অহংকার হলো সত্য প্রত্যাখ্যান করা আর অপরকে তুচ্ছ করা।"[১৫]
নবিজি (ﷺ) এমনই এক নিখাদ ভদ্র মানুষ ছিলেন, যিনি নিজেকে অন্য কারো উপরে প্রাধান্য দিতেন না। তাই তিনি বলেছেন,
هَوَنْ عَلَيْكَ فَإِنِّي لَسْتُ بِمَلِكَ إِنَّمَا أَنَا ابْنُ امْرَأَةٍ تَأْكُلُ الْقَدِيدَ ৩৯ "শান্ত হও। আমি কোনো রাজা-বাদশাহ নই। আমি তো এক নারীর সন্তান, যে শুকনো মাংস আহার করত।” [১৬]
নবিজি (ﷺ) নির্দ্বিধায় সত্য গ্রহণ করে নিতেন, তা যার কাছ থেকেই আসুক না কেন। যেমন কবরের আজাবের ব্যাপারে এক ইয়াহুদির কথাকে তিনি সাথেসাথেই সত্যায়ন করেন।[১৭]
আজকের মুসলিম যুবকদের সত্যিই নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি ও চিন্তাপদ্ধতি সংশোধন করা উচিত। ভুল চিন্তা থেকে ভুল উপসংহার আসে। তাই বিশেষ কোনো ব্যাপারে ভুল সংশোধন করার চেয়ে এই ধরণের ভুলগুলোর সংশোধন বেশি জরুরি। একটি কারখানার নির্মাণ ও উপাদান সরবরাহেই যদি ভুল হয়, তাহলে উৎপাদনের হার ও মানও খারাপ হবে। সমগ্র কারখানারই সংশোধন দরকার। যখন যেই অংশ সামনে আসে, তখন সেটির মেরামত করতে যাওয়া নিতান্তই বোকামি।
আমার সমালোচকগণ এই প্রবন্ধের একটি বিষয়ে আপত্তি তুলতে পারেন বলে মনে হচ্ছে। তাই আমি এখনই তা স্পষ্ট করে দিচ্ছি। মনে হতে পারে আমি কোনো মানী লোকের মান রক্ষা করার পুরো ধারণাটাই অস্বীকার করছি। না, এমন নয়। আমি মোটেও তা বলতে চাইছি না। আমি বলছি দ্বন্দ্ব-সংঘাত পরিহার করতে, সময় অপচয় না করতে, সংশয় সৃষ্টি না করতে, আমাদের আসল শত্রুদের হাসাহাসি করার সুযোগ না দিতে। কাণ্ডজ্ঞানহীন কাজকর্ম পরিহার করে অধিক উপকারী কাজে ব্যস্ত থাকা উচিত। এমনিতে কারো মান-সম্মান রক্ষার্থে কথা বলতে মুসলিমদের উপর কোন বিধিনিষেধ নেই।
আমি আলোচনা যথাসম্ভব সংক্ষিপ্ত রাখার চেষ্টা করেছি এবং অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা পরিহার করেছি। আশা করি আমি আমাদের চিন্তাপদ্ধতির সংশোধনে কিছুটা হলেও ভূমিকা রাখতে পেরেছি। আমাদের চিন্তাজগতের 'কারখানা'র মেরামতে কাজ করতে পেরেছি।

টিকাঃ
[১১] সুনান তিরমিযি: ২৪৯৯, ইবনু মাজাহ: ৪২৫১
[১২] সুনান তিরমিযি: ১৯৮২, মুসনাদ আহমাদ: ১৮১২০
[১৩] সহিহ আল বুখারি: ১৩৯৩
[১৪] সহিহ মুসলিম: ১৭৮০
[১৫] সহিহ মুসলিম: ৯১
[১৬] ইবনু মাজাহ: ৩৩১২
[১৭] সহিহ আল বুখারি: ১৩৭২, সহিহ মুসলিম: ৫৮৬

📘 প্রিয় শত্রু! তোমাকে ধন্যবাদ > 📄 প্রতিপক্ষ সঠিক হলে সন্তুষ্ট থাকুন

📄 প্রতিপক্ষ সঠিক হলে সন্তুষ্ট থাকুন


ইন্টারনেটে আজকাল আরবি ভাষায় নতুন ধরণের অনেক লেখা দেখা যায়। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ও সেগুলোর সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে প্রশংসনীয় ও সাহসী লেখালেখি হচ্ছে। এ এক নবযুগের সূচনা। নীরবতার যুগ শেষ হয়ে গেছে। এসেছে অংশগ্রহণ, স্পষ্টবাদিতা ও মুক্ত আলোচনার জামানা।
এই পরিবর্তনকে স্বাগত জানানোর অনেক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি কারণ হলো সমাজের সদস্য হিসেবে প্রত্যেকের নিজের সঠিক ভূমিকা ও দায়িত্ব পালনের ভিত্তি তৈরি হওয়া। এর ফলে সামাজিক স্থিতিশীলতা ও দৃঢ়তা বৃদ্ধি পাবে। অবিচার, বঞ্চনা আর অধিকারহীনতার স্বাভাবিক ফলাফল হলো মনের অস্থিতিশীল দশা।
স্বাধীনতা ও মধ্যমপন্থার আলো-বাতাসেই গড়ে ওঠে পরিমিতিবোধসম্পন্ন ও বুদ্ধিমান জনবল। এ কারণেই নবিজি (ﷺ) সবসময় বিনয়ী থাকতেন এবং মানুষকে বকাঝকা ও জোরাজুরি করা থেকে বিরত থাকতেন। দাসের গায়েও কখনও তিনি হাত তোলেননি, একটি বারের জন্যও না। স্ত্রীর গায়ে হাত তোলা তো দূরের কথা। শরিয়তের শাস্তিবিধান ও যুদ্ধের ময়দান ছাড়া কখনও তিনি কাউকে আঘাত করেননি।
নবিজি (ﷺ) গনিমতের মাল বণ্টন করার সময় একবার এক লোক খেঁকিয়ে উঠল, "সুবিচার করুন, মুহাম্মাদ!” তিনি (ﷺ) জবাবে কেবল বললেন, "হায় রে! আমিই যদি সুবিচার না করি তো কে করবে?”
আরেকবার এক লোক বলল, "আল্লাহর কসম! আজকের মাল বণ্টন না ইনসাফের হয়েছে, না আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য।” নবিজি (ﷺ) তা শুনে বললেন, “আল্লাহ তাআলা মূসাকে রহম করুন। তাঁকে এরচেয়েও বেশি যন্ত্রণা সইতে হয়েছে, অথচ তিনি ধৈর্য ধরে ছিলেন।”
রাসূল (ﷺ)-এর প্রতি আল্লাহর নাযিলকৃত এই আয়াতগুলো দেখুন:
يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ اتَّقِ اللَّهَ وَلَا تُطِعِ الْكَافِرِينَ وَالْمُنَافِقِينَ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلِيمًا حَكِيمًا ﴿۱﴾
“হে নবি! আল্লাহকে ভয় করুন। কাফির ও মুনাফিকদের মান্য করবেন না। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞানী, সর্বজ্ঞ।” (সূরাহ আল-আহযাব ৩৩:১)
وَتَخْشَى النَّاسَ وَاللَّهُ أَحَقُّ أَن تَخْشَاهُ
“আপনি কি মানুষকে ভয় করেন? অথচ আল্লাহই এর অধিক হকদার।” (সূরাহ আল-আহযাব ৩৩:৩৭)
وَلَا تَكُن لِلْخَائِنِينَ خَصِيمًا ﴿١٠٥﴾
“খিয়ানতকারীদের পক্ষে ওকালতি করবেন না।” (সূরাহ আন-নিসা ৪:১০৫)
أَلَمْ يَجِدْكَ يَتِيمًا فَآوَى ﴿٦﴾ وَوَجَدَكَ ضَالَّا فَهَدَىٰ ﴿۷﴾ وَوَجَدَكَ عَائِلًا فَأَغْنَى ﴿٨﴾
"তিনি কি আপনাকে অনাথ হিসেবে পাননি? পরে তিনি আশ্রয় প্রদান করেছেন। আর তিনি আপনাকে পেয়েছেন পথ সম্পর্কে অনবহিত। অতঃপর আপনাকে তিনি পথ দেখিয়েছেন। আর তিনি আপনাকে পেয়েছেন অভাবগ্রস্ত। অতঃপর প্রাচুর্য দিয়েছেন।” (সূরাহ আদ-দুহা ৯৩:৬-৮)
مَا كَانَ لِنَبِي أَن يَكُونَ لَهُ أَسْرَى حَتَّى يُثْخِنَ فِي الْأَرْضِ تُرِيدُونَ عَرَضَ الدُّنْيَا وَاللَّهُ يُرِيدُ الْآخِرَةَ
"ভূমিতে পূর্ণরূপে কর্তৃত্ব স্থাপনের আগ পর্যন্ত নবির কাছে (জীবিত) যুদ্ধবন্দী থাকা শোভনীয় নয়। তোমরা তো এই দুনিয়ার স্বার্থ চাও। অথচ আল্লাহ তোমাদের জন্য চান আখিরাত।” (সূরাহ আল-আনফাল ৮:৬৭)
হোমরা-চোমরা লোকদের ইসলামের দিকে আহ্বান করার সময় এক অন্ধ ব্যক্তির প্রতি অনিচ্ছাকৃত বিরক্তি চেহারায় প্রকাশ করে ফেলায় নবিজি (ﷺ)- এর উদ্দেশ্যে আল্লাহ বলেন,
عَبَسَ وَتَوَلَّىٰ ﴿١﴾ أَن جَاءَهُ الْأَعْمَىٰ ﴿۲﴾
“সে ভ্রু কুঞ্চিত করল এবং মুখ ফিরিয়ে নিল, যখন অন্ধ ব্যক্তিটি তার কাছে এলো।” (সূরাহ আবাসা ৮০:১-২)
এই আয়াতগুলোতে নবিজি (ﷺ) এর প্রতি যথেষ্ট সমালোচনা করা হয়েছে। আয়াতগুলো এমন এক সময় নাজিল হয়েছে, যখন নবিজি (ﷺ)-কে মুনাফিক, শত্রুভাবাপন্ন কাফির ও দুর্বল ঈমানদারদের উপর কাজ করতে হচ্ছিল। তারপরও মানুষকে এই আয়াতগুলো তাঁর তিলাওয়াত করে শোনাতে হয়েছে। কারণ এগুলো তো কুরআনেরই অংশ! এমনকি উম্মাতকে বলতে হয়েছে এই আয়াতগুল আত্মস্থ করতে এবং সালাতে পাঠ করতে।
নবিজি (ﷺ)-কে দুই রকম অবস্থা থেকে একটি বেছে নেবার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। হয় রাজা-নবি, নয়তো বান্দা-রাসূল। তিনি বান্দা-রাসূল হওয়াকেই বেছে নেন। তিনি বাদশাহর ভাব ধরে থাকতেন না, স্বৈরশাসকের মতো নিজের উপস্থিতি জানান দিতেন না। এক বেদুইন একবার তাঁকে দেখে অস্বস্তিতে কাঁপতে লাগল। নবি (ﷺ) বললেন, “শান্ত হও। আমি তো কেবল এক নারীর সন্তান, যার আহার্য ছিল শুকনো মাংস।”
নবি (ﷺ)-এর একজন শক্তিশালী ও প্রতাপশালী সাহাবি ছিলেন উমর ইবনুল রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু। তাঁর খিলাফত আমলে উবাই বিন কা'ব রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু তাঁর সাথে একটি ইলমি বিষয়ে মতভেদ করেন। উবাই বলেন, “খাত্তাবের ছেলে! নবিজির সাহাবিগণের কষ্টের কারণ হয়ো না।”
উমর একটুও চটে না গিয়ে বললেন, “ওহ! আমি তাহলে নবিজি (ﷺ)-এর দেওয়া এই তথ্যটি শুনতে পাইনি। আসলে এই ব্যবসা আর হাট-বাজার আমাকে ব্যস্ত করে ফেলেছিল।”
আচরণের এই নম্রতা-ভদ্রতাগুলো আমাদের মাঝে ফিরিয়ে আনতে হবে। আজকের চ্যালেঞ্জিং পৃথিবীতে এর প্রয়োজনীয়তা আরো বেশি।
বর্তমান যুগে একাধিক মত ও পথকে গ্রহণ করার মানসিকতা গড়ে তোলার নানবিধ প্রয়োজনীয়তা আছে। এর মধ্যে অনেকগুলোই ঠিক ইসলামি নিয়মকানুনের সাথে সম্পর্কিত না। যেমন আধুনিক পৃথিবী, মিডিয়া, অর্থনীতি ও রাজনীতি আগের চেয়ে অনেক বেশি উন্মুক্ত। পৃথিবীর শক্তিশালী সব জাতি মিলেও এই গণমুক্তির উত্থান রুখতে পারেনি, সেখানে আপনি-আমি কোন ছার? এ থেকে অনেকের মনে হতে পারে যে, এই পরমতসহিষ্ণুতাও আমাদের উপর চাপিয়ে দেওয়া একটা জিনিস। বিষয়টাকে আসলে এভাবে দেখা ঠিক নয়। এটি বরং বিরাট এক সুযোগ। স্বীকার করছি যে, মানুষ যেটাতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে সেটা ছেড়ে দেওয়া কঠিন। এর ফলে এমন অনেক বিতর্ক-বিভেদ দেখা দিতে পারে, যার ভয়াবহতা নিয়ে অনেক ইসলামি কর্মীই চিন্তিত। এ কারণেই ইসলামি কর্মীরা অনেক অসুবিধা সত্ত্বেও মতের পার্থক্যকে স্বাগত জানান। এর মাধ্যমেই নবি (ﷺ) ও সাহাবা আজমাইনের সময়কার মতো পরিবেশ সৃষ্টি করা সম্ভব। ওই সময়টায় ইসলামি কর্মকাণ্ড ইতিহাসের ভারে ন্যুব্জ হয়ে ছিল না। এভাবেই আদর্শিক ও সামাজিক সংকীর্ণতা কমিয়ে এনে স্বাধীনতার ইসলামি পরিমিতিবোধ অনুসরণ করা সম্ভব।
ইলেকট্রনিক মিডিয়ার মাধ্যমে আজ আমরা যেই স্বাধীনতা লাভ করেছি, অনেকেই তার সদ্ব্যবহার করতে জানে না। আমাদের নিকট অতীত ছিল নতুন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে নতুন নতুন জিনিস শেখার যুগ। ইন্টারনেটভিত্তিক স্বাধীনতা অপব্যবহারকারীদের কুৎসিত ভাষা ও আচরণের ব্যাপারে দুশ্চিন্তা কমানোর জন্য আমাদের এভাবেই পরিস্থিতিকে বোঝা উচিত। অসংখ্য মানুষ কী বলছে, তা না বুঝেই নিজের মত প্রচারে ব্যস্ত। এর অনুষঙ্গ হিসেবে থাকে আলোচনায় অপর পক্ষের অধিকারের প্রতি অসম্মান আর (সত্যিকার বা কাল্পনিক) মতপার্থক্যের প্রতি অসহিষ্ণুতা।
কখনো কখনো মতভেদ সত্যি সত্যিই থাকে এবং সেগুলো হওয়ারই কথা। তাই এসব মতপার্থক্য দেখে আঁতকে উঠার কিছু নেই। কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায় প্রতিপক্ষকে বিদ্রূপকারীর মতটিই আসলে ভুল। অথচ সে অজ্ঞতাবশত সত্যকে প্রত্যাখ্যান করে প্রতিপক্ষকে দোষ দিয়ে চলেছে। আবার কিছু ক্ষেত্রে সত্যিকার কোনো মতপার্থক্য থাকেই না। শব্দের ব্যবহারের ভিন্নতা নিয়েই নিষ্ফল বিতর্ক চলতে থাকে।
তাই আলোচনার ক্ষেত্রে আমাদের আচরণ উন্নত করা এখন দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে। মতভেদের ক্ষেত্রে কীরূপ ব্যবহার করা হবে, তার নৈতিক মানদণ্ড উঁচু করার সময় এসেছে। এই আচরণবিধির সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে কুরআন ও সুন্নাহতে।
কারো কারো ধারণা আমরা এতই নতুন ধরনের সময়ে বাস করছি যে, পূর্ববর্তী সৎকর্মশীল প্রজন্মগুলোর কাউকে অনুসরণ করার কোনো মানেই নেই। এটা একেবারেই ভুল চিন্তা। নবিজি (ﷺ) কখনো দুর্বল, কখনো শক্তিশালী অবস্থানে থেকেছেন। তেমনি মুসলিম উম্মাহও কোনোকালে ক্ষুদ্রসংখ্যক আবার কোনোকালে বিপুল সংখ্যক ছিল। নবিজি (ﷺ) বন্ধুভাবাপন্ন মানুষদের উপরও যেমন কাজ করেছেন, শত্রুভাবাপন্ন মানুষদের উপরও কাজ করেছেন। ইয়াহুদী, খ্রিষ্টান, মূর্তিপূজারি সব ধরনের মানুষের সাথেই তাঁর কাজ করতে হয়েছে। মদিনার মুনাফিকদেরও সামলাতে হয়েছে। দুর্বল ঈমানের মুসলিমদের সামলাতে হয়েছে। পরবর্তী যুগগুলোর মতো সে যুগেও মুসলিমদের মাঝে মতপার্থক্য হয়েছে।
আমাদের ঈমানের সাধারণ মূলনীতিগুলোর উপর বেশি জোর দিতে হবে, ব্যক্তিগত মতের বিষয়গুলোতে নয়। কোনোকিছুকে সালফে সালিহীনের অনুসৃত পদ্ধতি বলে দাবি করলে একদম নিশ্চিত হয়ে নিতে হবে যে, সাধারণভাবে এটিই তাঁদের পদ্ধতি। দুই-একজনের বিচ্ছিন্ন মত নয়। সেগুলোও তাঁদের ব্যক্তিগত মত, যা আমরা গণহারে মেনে নিতে বাধ্য নই। আমরা তিনটি জিনিস গ্রহণ করতে বাধ্য:
১। কুরআন ২। সুন্নাহ ৩। সুনিশ্চ

📘 প্রিয় শত্রু! তোমাকে ধন্যবাদ > 📄 কটাক্ষ করা: একটি আধুনিক কালচার

📄 কটাক্ষ করা: একটি আধুনিক কালচার


অনেকের স্বভাবটাই রূঢ় আর কর্কশ। তাদের বিশ্রী বিশ্রী কথাগুলোতে কোনো শক্তিশালী যুক্তি বা প্রমাণ থাকে না, থাকে শুধু অপমান আর কটাক্ষ। নবিজি (ﷺ) বলেন,
ا يَكُونُ اللَّعَانُونَ شُفَعَاءَ وَلَا شُهَدَاءَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ “অভিসম্পাতকারীরা কিয়ামতের দিন সুপারিশকারী হতে পারবে না।”[১৮] তিনি (ﷺ) আরো বলেন,
لَيْسَ الْمُؤْمِنُ بِالطَّعَانِ وَلَا اللَّعَانِ وَلَا الْفَاحِشِ وَلَا الْبَدِيءِ “মুমিন কখনও গালমন্দকারী বা অভিসম্পাতকারী হতে পারে না। সে নীচ বা অশ্লীল স্বভাবের হয় না।”[১৯] নবি (ﷺ)-কে যারা ভালোবাসে এবং হাশরের ময়দানে তাঁর সাথে থাকতে চায়, তাদের এই কথাগুলো মেনে চলা উচিত। অর্থাৎ, ভালো কথা ছাড়া একটা শব্দও যেন আমাদের মুখ থেকে বের না হয়। নবিজি (ﷺ)-এর আদেশ,
وَمَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلْيَقُلْ خَيْرًا أَوْ لِيَصْمُتْ "...আল্লাহ ও আখিরাতের প্রতি যে ঈমান রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে অথবা চুপ থাকে।”[২০]
আল্লাহ সে ব্যক্তির উপর রহম করুন, যে ভালো কথা বলে পুণ্য অর্জন করে অথবা চুপ থেকে নিজেকে নিরাপদ রাখে।
মানুষে মানুষে মতভেদ খারাপ কিছু নয়। বিশেষত এই ফিতনার জামানায়। তবে মতভেদ করার সঠিক পদ্ধতি হলো স্পষ্ট যুক্তি ও শান্ত কথাবার্তা। আমাদের কথা যেন আমাদের অন্তরের পরিশুদ্ধি, মানসিক শক্তি আর চরিত্রের সৌন্দর্যের প্রমাণ বহন করে।
মুসলিম বিশ্ব যে অসংখ্য সমস্যায় জর্জরিত, তা তো দেখতেই পাচ্ছেন। এ যেন ঝড়ের কবলে দোদুল্যমান এক জাহাজ, যার যাত্রীরা ডুবে যাবার ভয়ে ভীত। কী দয়ালু, কী শান্ত, কী অস্থিরচিত্ত—সকলের কণ্ঠস্বর একসাথে মিশে গেছে। আর একটি কণ্ঠস্বর আছে, যেটি নিজেকে ছাড়া ডানে-বামে সকলকে গালমন্দ আর অপমান করতে থাকে। নিজেকে সে গালি দেবেই বা কেন? এ তো নিজেকে ভাবে যুগের ত্রাতা, যে মূর্খ-দুর্বল-দুনিয়ালোভীদের স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে সবকিছু ঠিক করে ফেলবে। বাস্তবতা আসলে বিপরীত। সবচেয়ে খারাপ লোক তো সে-ই, যে শুধু নিজের মধ্যে সব কল্যাণ আর অপরের মধ্যে সব অকল্যাণ দেখে। আমাদের ভাই ও বোনেরা আমাদেরই অংশ। নিজেকে যতটা সম্মান করি, তাঁদেরও ততটুকুই সম্মান দিতে হবে।
আল্লাহ বলেন, وَلَوْلَا إِذْ سَمِعْتُمُوهُ ظَنَّ الْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنَاتُ بِأَنفُسِهِمْ خَيْرًا وَقَالُوا هَذَا إِفْكٌ مُّبِينٌ ﴿١٢﴾
“মুমিন নারী-পুরুষরা যখন তা শুনতে পেল, তখন তারা নিজেদের লোকদের ব্যাপারে সুধারণা কেন করল না?” (সূরাহ আন-নূর ২৪:১২)
আল্লাহ আরো বলেন, وَلَا تَلْمِزُوا أَنفُسَكُمْ وَلَا تَنَابَزُوا بِالْأَلْقَابِ بِئْسَ الِاسْمُ الْفُسُوقُ بَعْدَ الْإِيمَانِ ۚ وَمَن لَّمْ يَتُبْ فَأُولَئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ ﴿١١﴾
"পরস্পরের নিন্দা কোরো না, একে অপরকে খারাপ নামে ডেকো না। ঈমান আনার পর খারাপ কথা বলা কতই না মন্দ! যারা তাওবাহ করে না, তারাই যালিম।” (সূরাহ আল-হুজুরাত ৪৯:১১)
ইন্টারনেট আজ আমাদের দিয়েছে অন্যকে অপমান করার এক অত্যাধুনিক পদ্ধতি—ডিজিটাল অপমান! আজকাল মানুষ তাদের কুৎসা-অপমানগুলো বিনা পয়সায়, বিনা দায়বদ্ধতায়, যাচ্ছেতাই শব্দে, নিজের নাম সহ প্রকাশ করতে পারে।
এসব কাজ যারা করছে, তারা নিজেদের পাপ ফলাও করে দেখিয়ে বেড়াচ্ছে। নবিজি (ﷺ) বলেছেন,
كُلُّ أُمَّتِي مُعَافَاةٌ إِلَّا الْمُجَاهِرِينَ
“আমার সমগ্র উম্মাহকে ক্ষমা করা হবে, শুধু নিজেদের পাপ প্রকাশ করে বেড়ানো ব্যক্তিদের ছাড়া।”[২১]
পরিচয় গোপন রেখে ছদ্মনামে আত্মপ্রকাশ করার সুযোগও করে দিয়েছে ইন্টারনেট। দুর্ভাগ্যবশত যৌক্তিক ও ভারসাম্যপূর্ণ কথাগুলো খুব একটা শ্রোতা টানে না। উল্টোদিকে ডিজিটাল গালিবাজেরা তার সমর্থক ও সমালোচকদের মনোযোগ পেয়ে খুশিতে বাকবাকুম করে। এর কাছে এমনও মনে হতে পারে যে, সে নতুন করে ইতিহাস রচনা করছে!
মোবাইল ফোন হলো এই কাজের আরেক কাজী। এসএমএসের মাধ্যমে জঘন্যতম কথাবার্তাও মুহূর্তেই ছড়িয়ে যায়। এসব কাজ করে অনেকে নিজেকে আবার খুব সাহসী ভাবে। চোর যেমন খুব সাহসিকতার সাথে সিঁধ কাটে, ওরকম সাহসী আরকি। সর্বনাশ হওয়াকে কিছু মানুষ কীভাবে যে এত ভালোবাসে!
নবি (ﷺ) বলেছেন,
"আমার আর আমাদের উম্মাতের উপমা হলো আগুন জ্বালানো এক ব্যক্তির মতো। আগুনে চারপাশ আলোকিত হলে পোকামাকড় এসে আগুনে পড়তে থাকে। সেই ব্যক্তি তাদের দূরে রাখার চেষ্টা করেও সংখ্যাগরিষ্ঠের কারণে পেরে ওঠে না। একইভাবে আমিও তোমাদের কাপড় টেনে ধরে আগুন থেকে দূরে সরাচ্ছি। কিন্তু তোমরা আগুনের দিকে হুমড়ি খেয়ে পড়ছ।” (সহিহ আল-বুখারি এবং সহিহ মুসলিম)
ইলেকট্রনিক মিডিয়ার অপব্যবহার খুবই গর্হিত একটি কাজ। এসব কাজ যারা করে, তারা মূল্যবোধহীন। নীচ লালসা, অন্ধ আক্রোশ আর অযথা বিদ্বেষ তাদের চালিকাশক্তি। যারা মনে করে এ কাজ করে তারা হক আর ঈমানের প্রতিরক্ষা করছে, তারা আরো বড় ধোঁকায় পড়ে আছে।
প্রযুক্তির এই যুগে আজ মানুষ টাকা খরচ করে অপমানিত হচ্ছে। কিছুদিন আগে একটি বিদেশী নম্বর থেকে আমার এক বন্ধুর কাছে এসএমএস আসে, যেন জরুরি ভিত্তিতে সে কল করে। কল করে সে এক ঘণ্টা যাবত ওপাশ থেকে শুধু গালাগাল শুনল। আমি এ ঘটনা শুনে হাসতে হাসতে বললাম, "পয়সা খরচা করে অপমানিত হলে তাহলে!”
কটাক্ষ করার এই কালচারের মাঝে আমরা যারা নিজেদের সিরাতুল মুস্তাকীমে রাখতে চাই, তাদের এই পরামর্শগুলো মেনে চলতে হবে:
১। এ ধরনের আচরণ ও আচরণকারীদের থেকে আমরা মুখ ফিরিয়ে নেব। কুরআন আমাদের ঠিক এটাই বলে:
خُذِ الْعَفْوَ وَأْمُرْ بِالْعُرْفِ وَأَعْرِضْ عَنِ الْجَاهِلِينَ ﴿۱۹۹﴾
"ক্ষমা করতে থাকো, ভালো কাজের আদেশ করতে থাকো; আর অজ্ঞদের এড়িয়ে চলো।” (সূরাহ আল-আ'রাফ ৭:১৯৯)
وَإِذَا سَمِعُوا اللَّغْوَ أَعْرَضُوا عَنْهُ وَقَالُوا لَنَا أَعْمَالُنَا وَلَكُمْ أَعْمَالُكُمْ سَلَامٌ عَلَيْكُمْ لَا نَبْتَغِي الْجَاهِلِينَ ﴿٥٥﴾
“নিরর্থক কথাবার্তা থেকে তারা মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বলে, 'আমাদের কাজের ফল আমরা পাব, তোমাদের কাজের ফল তোমরা পাবে; তোমাদের প্রতি সালাম; অজ্ঞদের সাথে আমাদের কোনো লেনাদেনা নেই।” (সূরাহ আল-কাসাস ২৮:৫৫)
قَدْ أَفْلَحَ الْمُؤْمِنُونَ ﴿ا﴾ الَّذِينَ هُمْ فِي صَلَاتِهِمْ خَاشِعُونَ ﴿٢﴾ وَالَّذِينَ هُمْ عَنِ اللَّغْوِ مُعْرِضُونَ ﴿۳﴾
“নিশ্চয় মুমিনরা সফল হয়ে গেছে, যারা তাদের সালাতে বিনয়-নম্র এবং অসার কথাবার্তায় নির্লিপ্ত।” (সূরাহ আল-মুমিনূন ২৩:১-৩)
নবিজির একটি বৈশিষ্ট্য ছিল অজ্ঞদের কাজকারবারের জবাবে তিনি আরো ভদ্র আচরণ করতেন।
২। আমরা এরচেয়ে উত্তম কিছু দিয়ে জবাব দিতে পারি। অর্থাৎ, আমরা কটাক্ষকারীদের জন্য আল্লাহর কাছে দু'আ করব ও তাদের জন্য ক্ষমা চাইব। বাজে কথার জবাবে সুন্দর কথা বলব। এই আদেশটির কথাও কুরআনে বেশ কয়েকবার এসেছে:
ادْفَعْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ السَّيِّئَةَ “মন্দকে প্রতিহত করো উত্তম দিয়ে।” (সূরাহ আল-মুমিনূন ২৩:৯৬)
وَقُولُوا لِلنَّاسِ حُسْنًا "আর মানুষের সাথে সদালাপ করবে।” (সূরাহ আল-বাকারাহ ২:৮৩)
أُولَئِكَ يُؤْتَوْنَ أَجْرَهُم مَّرَّتَيْنِ بِمَا صَبَرُوا وَيَدْرَءُونَ بِالْحَسَنَةِ السَّيِّئَةَ وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنفِقُونَ ﴿٥٤﴾ ৪৯ "এরা দ্বিগুণ প্রতিদান পাবে। কারণ তারা অবিচল থেকেছে এবং মন্দকে ভালো দিয়ে প্রতিহত করেছে; আর আমি তাদের যে রিযিক দিয়েছি, তা থেকে খরচ করেছে।” (সূরাহ আল-কাসাস ২৮:৫৪)
৩। আমরা ভাবগাম্ভীর্য বজায় রেখে শান্ত থাকব। জীবনের পথ বড় দীর্ঘ। এখানে একটু শান্তি আর বিশ্রাম দরকার। আল্লাহ বলেন,
هُوَ الَّذِي أَنزَلَ السَّكِينَةَ فِي قُلُوبِ الْمُؤْمِنِينَ “তিনিই মুমিনদের অন্তরে প্রশান্তি স্থাপন করেছেন।” (সূরাহ আল-ফাতহ ৪৮:৪)
নবিজি (ﷺ)-এর ব্যাপারে আল্লাহ বলেন,
ثُمَّ أَنزَلَ اللَّهُ سَكِينَتَهُ عَلَى رَسُولِهِ “তারপর তাঁর প্রতি আল্লাহ নিজের পক্ষ থেকে প্রশান্তি নাযিল করলেন।” (সূরাহ আত-তাওবাহ ৯:২৬)
নবিজি (ﷺ)-কে আল্লাহ বলেন,
وَاصْبِرْ وَمَا صَبْرُكَ إِلَّا بِاللَّهِ ، وَلَا تَحْزَنْ عَلَيْهِمْ وَلَا تَكُ فِي ضَيْقٍ مِمَّا يَمْكُرُونَ ١٢٧ “ধৈর্য ধরো, তোমার ধৈর্য তো কেবল আল্লাহর পক্ষ থেকে। ওদের কার্যকলাপে তুমি দুঃখিত হয়ো না। আর ওদের ষড়যন্ত্রের কারণে অন্তরে কুণ্ঠাবোধ কোরো না।” (সূরাহ আন-নাহল ১৬:১২৭)

টিকাঃ
[১৮] সহিহ মুসলিম: ২৫৯৮
[১৯] সুনান তিরমিযি: ১৯৭৭
[২০] সহিহ আল বুখারি: ৬১৩৬
[২১] সহিহ মুসলিম: ২৯৯০

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00