📄 ধন্যবাদ, প্রিয় শত্রু
মানুষের আচরণের সবচেয়ে ঘৃণ্য দিক হলো শত্রুতা জিইয়ে রাখা। দুর্ভাগ্যবশত, মানুষে-মানুষে ঝগড়া লাগানোর রেসিপি খুবই সহজ। শুধু দরকার একটু বোকামি আর অপরিণত সিদ্ধান্ত, সেইসাথে মানবমনের অনুভূতিকে একদমই তোয়াক্কা না করা। এই উপাদানগুলো সঠিক পরিমাণে মেশালেই আপনি পেয়ে যাবেন পরস্পরের সাথে ঝগড়া আর গালিগালাজে লিপ্ত কিছু ঘৃণাজীবী মানুষ।
নিজের অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি যে, তর্ক করতে তেড়ে আসা লোকদের সাথে ধৈর্যধারণ ও সৌজন্য প্রদর্শনের অনেক সুফল রয়েছে। এদের উপর কুরআনে বর্ণিত ঔষধ প্রয়োগ করতে হয়—উত্তম কথা দিয়ে জবাব দেওয়া।
ادْفَعْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ فَإِذَا الَّذِي بَيْنَكَ وَبَيْنَهُ عَدَاوَةٌ كَأَنَّهُ وَلِيٌّ حَمِيمٌ ﴿٣٤﴾
"মন্দকে প্রতিহত করো উত্তমের মাধ্যমে। তাহলে দেখবে তোমার সাথে যার শত্রুতা রয়েছে, সে তোমার অন্তরঙ্গ বন্ধু হয়ে যাবে।” (সূরাহ ফুসসিলাত ৪১:৩৪)
কেউ আমাকে ঘৃণা করে বলে আমি তার প্রতি রাগ পুষে রাখতে পারি না। এই মানুষগুলো তো আমার জীবনেরই অংশ। দুনিয়ার জীবনে কোনো সাফল্য পেতে ও কাজের কাজ কিছু করতে হলে এই মানুষগুলোকে সহ্য করার সামর্থ্য থাকা চাই। এটিই প্রজ্ঞাময় আল্লাহর বিধান।
আমি বরং বলি, ধন্যবাদ, হে আমার শত্রুগণ!
আপনারাই আমাকে শিখিয়েছেন বিব্রত না হয়েই কীভাবে সমালোচনা শুনতে হয়, তা যতই আঘাত দিক না কেন। চরমতম অপমান আর নিরুৎসাহমূলক কথা শোনার পরও কী করে নির্দ্বিধায় এগিয়ে যেতে হয়, তাও আপনারাই শিখিয়েছেন।
জীবনের এই অতি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাটি কোনো বই পড়ে শেখা সম্ভব নয়। আল্লাহ আমাকে যেসব অভিজ্ঞতার মুখোমুখি করান, সেগুলো সহ্য করার মাধ্যমেই তা শেখা যায়। প্রথমে অনেক ব্যথা-বেদনা হয়, কিন্তু তা মেনে নেয়া লাগে।
ধন্যবাদ, হে আমার শত্রুগণ!
আপনারা আমাকে আত্মনির্ভরশীল করেছেন। চাটুকারিতা থেকে বাঁচিয়েছেন। প্রশংসা আর সমালোচনার এক ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি আমার সামনে তুলে ধরেছেন। আপনাদের কারণেই আমি চাটুকারদের শিকার হওয়া থেকে বেঁচে গিয়েছি। যারা আমার প্রাপ্যের চেয়ে বেশি প্রশংসা করে আর আমার কোনো দোষই দেখতে পায় না—তাদের হাতে আমাকে পড়তে হয়নি। এই ধরনের মানুষেরা আপনাদের বিপরীত। কারণ, আপনারা আমার মধ্যে শুধু দোষই দেখেন আর আমার ভালো কাজকেও খারাপ মনে করেন।
ধন্যবাদ, হে আমার শত্রুগণ!
আপনারা অনেক মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছেন সত্যের পক্ষে মুখ খুলতে। আপনাদের বিষোদগার দেখেই তারা সত্যকে জানতে তৎপর হয়েছে এবং সত্যটা জানার পর তার প্রতিরক্ষায় নেমেছে।
ধন্যবাদ, হে আমার শত্রুগণ!
আপনাদের কাছে ভালো লাগুক বা না লাগুক, আপনারা আমাকে আরো শক্তিশালী, ভারসাম্যপূর্ণ ও চিন্তাশীল মতামত তৈরিতে সাহায্য করেছেন। কেউ কেউ কঠিন উপসংহারে পৌঁছে গিয়ে বাড়াবাড়ি করে ফেলে। আপনাদের কারণেই আমি নিজের মতামত পুনর্বিবেচনা করে তা সংশোধন ও উন্নয়নে সচেষ্ট হই।
শত্রু ভাইয়েরা আমার, আমি আপনাদের সাথে তর্ক করা পরিহার করেছি দেখে রাগ করবেন না। মানুষ নিজের মতের পক্ষে তর্ক করতে খুব বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়লে তা আর পুনর্বিবেচনার সময় পায় না। সে তখন উত্তেজিত হয়ে প্রতিপক্ষের দাঁতভাঙা জবাব দেওয়ার পেছনে সব চেষ্টা ঢেলে দেয়। কোনো গঠনমূলক চিন্তা করতে পারার মানসিক শক্তি হারিয়ে ফেলে। সবচেয়ে খারাপ ব্যাপার কী জানেন? সে প্রতিপক্ষের মতটি ঠাণ্ডা মাথায় বোঝার চেষ্টা করে না। অথচ সেটাও সঠিক হবার সম্ভাবনা ছিল।
হাতিম আল-আসসাম (রহিমাহুল্লাহ) একবার বলেছেন, “তিনটি গুণ আমাকে বিতর্কের সময় সাহায্য করে।
১) আমার প্রতিপক্ষ সঠিক প্রমাণিত হলে আমার কাছে ভালো লাগে।
২) সে যখন ভুল প্রমাণিয় হয়, তখন তার জন্য আমার দুঃখ লাগে।
৩) আর আমি সবসময়ই আমার জিহ্বাকে নিয়ন্ত্রণে রাখি, যাতে তাকে অপমান করে না বসি।”[২]
ধন্যবাদ, হে আমার শত্রুগণ!
আপনারাই আমার প্রত্যয় দৃঢ় করেছেন, আমাকে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি করেছেন, আমাকে বেড়ে ওঠার সুযোগ দিয়েছেন, আর আমার দক্ষতার পরিচর্যা করেছেন। আমি নিজের প্রতি কঠোরতর হতে শিখেছি, আচরণ সংযত করতে শিখেছি, আত্মোন্নয়নে আগ্রহী হয়েছি। আল্লাহ আমাদের যেই গন্তব্যের দিকে ডাকেন, সেই জান্নাতে যাবার জন্য প্রতিযোগিতা করতে শিখেছি।
وَفِي ذَلِكَ فَلْيَتَنَافَسِ الْمُتَنَافِسُونَ "অতএব, প্রতিযোগীরা এর জন্য প্রতিযোগিতা করুক।” (সূরাহ আল- মুতাফিফীন ৮৩:২৬)
এই প্রতিযোগিতার মহত্ত্ব নির্ভর করে অংশগ্রহণের পদ্ধতি, অগ্রযাত্রার সৌন্দর্য আর লক্ষ্যের বিশুদ্ধতার উপর।
ধন্যবাদ, হে আমার শত্রুগণ!
আপনারা আমাকে ধৈর্য ও ক্ষমাশীলতা শিখিয়েছেন। কঠোর আচরণের জবাবে দয়া দেখাতে শিখিয়েছেন। এসব গুণ শুধু নেক আমলের বিনিময়ে অর্জন করা যায় না। বরং ধৈর্য, আত্মসংযম, সহনশীলতা, মহানুভবতা ও ক্ষমাপ্রদর্শনের মাধ্যমে অর্জন করতে হয়।
শত্রু ভাইয়েরা, বুঝতে পারছি আমার এই কথাগুলো আপনাদের রাগ আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে। কিন্তু সেটা আমার উদ্দেশ্য নয়। আমি মন থেকেই বলছি, আপনারাই আমার সত্যিকারের বন্ধু। মতপার্থক্য সত্ত্বেও আপনারাও আমার মতোই মানুষ, তার উপর আমার মুসলিম ভাই। যেসব বিষয়ে আমরা একমত, সেগুলোর তুলনায় মতপার্থক্যপূর্ণ বিষয়ের সংখ্যা নগণ্য।
আমি আপনাদের প্রতি বিদ্বেষবশত শত্রু বলে সম্বোধন করছি না। বরং আপনারা আমার শত্রু পরিচয়ে পরিচিত হতে চান বলেই এই সম্বোধন করছি। আমি তো আপনাদের বন্ধুই মনে করি, তা আপনি আমার প্রতি সন্তুষ্টই হোন বা অসন্তুষ্ট।
হে আমার শত্রুগণ, আপনাদের জানাই ধন্যবাদ এবং সালাম।
টিকাঃ
[২] আবু নুয়াইম, আল-হুলইয়াহ: ৮/৮২, তারিখে বাগদাদ: ৮/২৪২
📄 “বাহাসে নামেন না কেন?”
অনেকেই আমাকে জিজ্ঞেস করেছেন যে, আমি বিরোধীদের জবাব দিই না কেন। তারা যেখানে ভুল করছেন, সেগুলো প্রমাণসহ তুলে ধরে খণ্ডন কেন করছি না? আমি কি তাদের অবজ্ঞা করছি? তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করছি?
মোটেই না! কিছু ক্ষেত্রে নিজের মতের পক্ষে বাহাসে না নামাটাই উত্তম সিদ্ধান্ত। এর বেশ কিছু কারণ রয়েছে:
১। কয়েকটি কাজে একসাথে ব্যস্ত থাকলে বারবার কাজ থামিয়ে মানুষের কথা শোনা কষ্টকর। প্রথমত, তাদের সব আপত্তিগুলো ভালোভাবে জানতে হয়। এরপর প্রত্যেকটি ধরে ধরে উত্তর দিতে হয়। যদি অন্যান্য কাজ ও প্রকল্পে ব্যস্ত থাকেন, তাহলে মানুষের সাথে বিতর্ক করার চেয়ে অনেক দরকারি কাজ আপনার হাতে আছে।
২। মতবিরোধকারীদের জবাব দেওয়ার ক্ষেত্রে কখনোই তাড়াহুড়া করা উচিত নয়। তাড়াহুড়া করতে গেলে আপনি অতিআবেগী হয়ে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে চাইবেন। অথচ বিষয়টি তার গুরুত্ব অনুপাতে সময় ও মনোযোগ পাওয়ার দাবি রাখে।
এছাড়াও সমস্যাটিকে দূর থেকে ভালোভাবে দেখার জন্য আপনাকে সময় নিতে হবে। তাহলে আপনি মানুষের আপত্তিগুলোকে নিরপেক্ষভাবে দেখতে পারবেন। মানুষের কথার প্রতি যেনতেনভাবে একটা প্রতিক্রিয়া দেখালেই তো হলো না। এভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাতে গিয়ে মুখ ফসকে আপনিও হয়তো অসত্য কিছু বলে বসবেন।
সমালোচকদের তাড়াহুড়া করে জবাব দিতে গেলে আপনি তাদের বক্তব্যের মধ্যকার সত্যটি দেখতে পাবেন না। তাদের কথাই যে সঠিক, তা না। কিন্তু তাদের মূল বক্তব্য যদি ভুলও হয়, সেখানেও তো কিছু যৌক্তিক সমালোচনা থাকতে পারে যা আপনি আগে খেয়াল করেননি। বিশেষত প্রতিপক্ষ কঠোর ভাষা ব্যবহার ও ব্যক্তিগত আক্রমণ করলে সেই যৌক্তিক অংশগুলো আলাদা করতে পারা আরো কঠিন হয়ে যায়।
যেহেতু “জ্ঞানই মুমিনের গন্তব্য", সেহেতু সত্য থেকে আপনি উপকৃতই হবেন। সেই সত্য যার কাছ থেকেই আসুক, যেখান থেকেই আসুক। নবি সুলাইমান আলাইহিসসালামকে সামান্য এক হুদহুদ পাখি বলেছিল, أَحَطْتُ بِمَا لَمْ تُحِطْ بِهِ وَجِئْتُكَ مِن سَبَإٍ بِنَبَإٍ يَقِينٍ ﴿٢٢﴾
"আমি এমন বিষয় জেনেছি, যা আপনি জানেন না। আর আমি আপনার কাছে এসেছি সাবা থেকে সুনিশ্চিত সংবাদ নিয়ে।” (সূরাহ আন-নামল ২৭:২২)
৩। সব ব্যাপারেই ইজমা প্রতিষ্ঠিত হতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। সবার সবকিছুতে একমত হওয়া জরুরি নয়। আলাহ তাআলা কুরআনে বলেন, وَلَا يَزَالُونَ مُخْتَلِفِينَ ﴿۱۱۸﴾ إِلَّا مَن رَّحِمَ رَبُّكَ
“তারা মতপার্থক্য করা থামাবে না; তারা ব্যতিক্রম, যাদের উপর আল্লাহ তাঁর অনুগ্রহ বর্ষিত করেছেন।” (সূরাহ হৃদ ১১:১১৮-১১৯)
আমাদের এই পার্থিব জীবনের অপরিহার্য অংশ হলো মতপার্থক্য। এমনকি দুজন নবি দাউদ আলাইহিসসালাম ও সুলাইমান আলাইহিসসালাম নিজেদের মাঝে মতভেদ করেছেন। রাসূল (ﷺ) এর নিকটতম দুই সাহাবি আবু বকর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু ও উমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর মাঝেও মতভেদ হয়েছে। হয়েছে ইসলামের প্রখ্যাত আলিমগণের মাঝেও।
কোনো ব্যাপার চিরতরে অমীমাংসিত থেকে যাওয়া দোষের কিছু নয়। আপনার অধিকার আছে একটি মত পোষণের, আরেকজনের অধিকার আছে আরেকটি মত পোষণের। প্রতিটি মতভেদ নিয়েই সুদীর্ঘ বাহাস আয়োজন করার কি কোনো দরকার আছে, যেখানে এক পক্ষকে শেষমেশ ভুল স্বীকার করতেই হবে? এ তো কেবল সময়ের অপচয়!
সাধারণত যা হয়, কিছু ব্যাপারে আপনার বক্তব্য ঠিক আর কিছু ব্যাপারে আপনার প্রতিপক্ষের বক্তব্য ঠিক। মানুষ একটা বিষয়কে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে। সময় নিয়ে ঠাণ্ডা মাথায় বিবেচনা করলে একসময় সম্পূর্ণ চিত্রটি নজরে আসে।
৪। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এমনটা ঘটে যে, আপনি আপনার সমালোচকের কথার জবাব দিলেন, এরপর সমালোচক আবার আপনার বক্তব্যের খণ্ডন নিয়ে হাজির হয়। হতে পারে আপনার সমালোচকের হাতে এই বিষয়ের জন্য আপনার চেয়ে বেশি সময় আছে। এখন আপনি কি আপনার মূল্যবান সময় ও শ্রম ব্যয় করে বিতর্ক চালিয়ে যাবেন, না মাঝপথে এমনভাবে থেমে যাবেন যে-দেখে মনে হয় আপনি হার মেনে নিয়েছেন? প্রথমবারেই এই জবাব-পাল্টা জবাব পরিহার করলে আর এই ঝামেলায় পড়া লাগত না।
৫। এ ব্যাপারে আমরা সবাই একমত যে, নিজের ভুল বুঝতে পারার পর প্রথম সুযোগেই তা স্বীকার করে নিয়ে সত্যের ঘোষণা দেওয়া উচিত। ভুল স্বীকার করলে সুবিবেচক লোকদের কাছে আপনার মর্যাদা বাড়বে বৈ কমবে না। তারা আপনাকে এর জন্য আরো বেশি সম্মান করবেন।
এ কারণেই আমার সমালোচক ও নিন্দুকদের ততটাই সম্মান করি, যতটা করি আমার সমমনাদের। এমনকি যারা কর্কশ ভাষায় সমালোচনা করে, তাদের ব্যাপারেও আমার অবস্থান এটাই। আমি বুঝতে পারছি যে, তারা সত্যের সন্ধানেই এত তৎপর হয়েছেন। আর তাদের সমালোচনার ফলে আমার জ্ঞানও সমৃদ্ধ হয়। তাদের আচরণ যদি ভালো না-ও হয়, তারা আমার কৃতজ্ঞতা লাভের দাবিদার। তাদের মুখ আর কলমের ধার যত বেশিই হোক, শেষমেশ তাদের পর্যবেক্ষণ থেকে আমিই লাভবান হই। কাজেই আমার সত্যিই উপকৃত হওয়ার ইচ্ছে থাকলে কর্কশভাষী সমালোচকদের প্রতিও আমায় ধৈর্যশীল হতে হবে।
কিছু বিষয়ে অনেকগুলো মত থাকে, যেগুলোর প্রতিটির স্বপক্ষেই প্রমাণ ও যুক্তি আছে। ইসলামি শরিয়তের অনেক বিষয়ই এরকম। এগুলো আলোচনা করার মতো মানুষ যতদিন থাকবে, ততদিন এ নিয়ে মতভেদ থাকবে। এগুলো আসলে সুস্থ ধারার মতপার্থক্য এবং মানুষের তো মতভেদ করার অধিকার থাকা উচিত। কিন্তু এই মতভেদগুলোকে যেন তারা নিজেদের মধ্যে মনোমালিন্য ও প্রতিহিংসা তৈরির মাধ্যম না হতে দেন।
আমাদের উচিত নবিজি (ﷺ)-এর এই দু'আ নিয়ে চিন্তাভাবনা করা।
اللَّهُمَّ رَبَّ جِبْرَائِيلَ وَمِيكَائِيلَ وَإِسْرَافِيلَ فَاطِرَ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ عَالِمَ الْغَيْبِ وَالشَّهَادَةِ أَنْتَ تَحْكُمُ بَيْنَ عِبَادِكَ فِيمَا كَانُوا فِيهِ يَخْتَلِفُونَ اهْدِنِي لِمَا اخْتُلِفَ فِيهِ مِنَ الْحَقِّ بِإِذْنِكَ إِنَّكَ تَهْدِي مَنْ تَشَاءُ إِلَى صِرَاطٍ مُسْتَقِيمٍ
“হে জিবরাইলের রব, মিকাইলের রব, ইসরাফিলের রব! হে আসমান ও জমিনের স্রষ্টা! হে দৃশ্য ও অদৃশ্যের জ্ঞানী! আপনার বান্দারা যা নিয়ে মতভেদ করে, আপনি তাদের মধ্যে সে ব্যাপারে ফায়সালা করে দেবেন। সত্য ও ন্যায়ের যেসব বিষয়ে মতানৈক্য পোষণ করা হয়েছে সে বিষয়ে আপনি আমাকে পথ দেখান। আপনি যাকে ইচ্ছে করেন, তাকেই সরল পথে দেখান।” [৩]
টিকাঃ
[৩] সহিহ মুসলিম: ৭৭0
📄 ধন্যবাদ, হে আবু বকর ও উমর!
মানুষ যতটা সৎ ও নিরপেক্ষ থাকবে, কর্কশ ও অবিবেচনাপ্রসূত কথা বলা থেকে বিরত থাকবে—অন্যের আক্রমণের শিকার হওয়া থেকে সে ততটা নিরাপদ থাকবে বলেই আপাতদৃষ্টে মনে হয়। কারণ তখন তো তার সাথে মতভেদ হওয়ার সম্ভাবনাই অনেকখানি কমে আসে।
আমার মনে হয় একটি সীমিত পরিসরে এ কথাটা খুবই প্রযোজ্য। আমাদের সালাফদের কেউ কেউ বলেছেন, "যার অন্তর পরিশুদ্ধ, সে তত উদারভাবে কথা বলতে জানে।"
রাসূল (ﷺ) বলেছেন, “মানুষের সাথে একজন মুমিন মানিয়ে চলে। এমন মানুষের মাঝে কোনো কল্যাণ নেই, যে নিজেও মানুষের সাথে মানিয়ে চলার চেষ্টা করে না আর অন্যদেরও তার সাথে মানিয়ে চলতে দেয় না।” [৪]
কিন্তু তারপরও এটাও সত্যি যে, একজন মানুষ বিখ্যাত বা সফল হয়ে গেলে অবশ্যই আগের চেয়ে বেশি শত্রুতার সম্মুখীন হবে। কারণ তখন তার ব্যাপারে মাথা ঘামানো লোকের সংখ্যা বেড়ে যাবে। কেউ তার সমমনা, কেউ বিপরীত মতাদর্শী। কেউ থাকবে সন্দেহপোষণকারী আর অভিযোগকারী। খ্যাতি যত বাড়বে, পরিচিতির এই বৃত্তের পরিধিও ততই বাড়বে। নবি-রাসূল আলাইহিমুসসালাম সহ বৈশ্বিক নেতৃবৃন্দ বা ঐতিহাসিক ব্যক্তিবর্গের ক্ষেত্রে এই বৃত্তের ভেতর গোটা পৃথিবীই চলে আসতে পারে।
ইসলামের সবচেয়ে বিখ্যাত ব্যক্তিদের মধ্যে দুজনের কথাই ধরুন। আবু বকর এবং উমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমা। তাঁদের চেয়ে বেশি ইখলাস ও দৃঢ় ঈমানের দৃষ্টান্ত খুঁজেই পাবেন না। আবু বকর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর ব্যাপারে বলা হয়েছে, “আবু বকর সাওম বা সালাতের সংখ্যা দিয়ে তোমাদের চেয়ে অগ্রসর নন, বরং অন্তরের গহীনের একটি বিষয়ের (একাগ্রতা, ইখলাস) কারণে তিনি তোমাদের চেয়ে অগ্রসর।” [৫]
রাসূল (ﷺ) একবার স্বপ্নে দেখলেন উমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর পরনের কাপড় দৈর্ঘ্যের কারণে মাটিতে ছেঁচড়াচ্ছে। আরেকবার দেখলেন তিনি নিজে একটি পাত্র থেকে দুধ খাওয়ার পর বাকি দুধটুকু উমর পান করছেন। নবিজি (ﷺ) এর অর্থ বলেছেন যে, উমরের মাঝে ইলম ও ঈমানের গুণাবলি রয়েছে। [৬]
রাসূল (ﷺ)-এর জীবদ্দশায় তাঁর নিকটতম দুজন মানুষ ছিলেন আবু বকর ও উমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমা। নবিজির কবরের পাশেই কবরস্থ হওয়ার সৌভাগ্যও আল্লাহ তাঁদের দিয়েছেন। নিঃসন্দেহে সব সাহাবির মধ্য থেকে এ দুজনই ছিলেন অন্তরঙ্গতম বন্ধু। তাঁদের মহান শিক্ষক ও প্রশিক্ষকের সাথে তাঁদের ঘনিষ্ঠতা এক অনস্বীকার্য ঐতিহাসিক বাস্তবতা।
তাঁদের জীবনী পড়তে গেলে আমরা অবাক হয়ে দেখি তাঁরা কত নিঃস্বার্থভাবে নিজেদের সম্পদ, জ্ঞান, প্রভাবশালিতা ও শক্তি দিয়ে পরোপকার করেছেন। বাহ্যিক কোনো প্রতিদান ছাড়াই তাঁরা অন্যের উপকার করে গেছেন। শুধু তা-ই না, তাঁদের সাথে অসদাচরণকারীদের ক্ষমা করতেও তাঁরা কার্পণ্য করতেন না।
এই সবকিছুর পরও তাঁরা শত্রুতা থেকে রেহাই পাননি। তাঁদের প্রতি বিষোদগারকারীদের কথাগুলো এতই জঘন্য যে, শুনে হতবাক হয়ে যেতে হয়। আসলে আখিরাতে এই দুজনের জন্য আল্লাহ যে মহান প্রতিদান রেখেছেন, তার তুলনায় দুনিয়ার এতসব শত্রুতা তুচ্ছ হয়ে যায়। আমরা যারা এসব পার্থিব পরীক্ষার সম্মুখীন হইনি, তারা ধৈর্যশীলদের আখিরাতের প্রতিদান দেখতে পেলে ভাবতাম, "ইশ! আমরাও যদি এসব পরীক্ষায় আপতিত হতাম!”
শ্রেষ্ঠতম মানব রাসূল (ﷺ) ও তাঁর নিকটতম সহচর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমদের চরিত্র হননের বৃথা চেষ্টা করে যারা বই লিখে ও প্রচার করে, তাদের দেখে আমাদের একটি বিষয় শেখার আছে। আল্লাহ যাদের অনুগ্রহ করেন, যাদের উপর সবচেয়ে বেশি দয়া করেন, তাঁদের মৃত্যুর পরও তাঁদের প্রতি মিথ্যে অপবাদ আরোপ করা জারি থাকে। এভাবেই আল্লাহ তাঁদের আমলনামা ভারি করতে থাকেন এবং পাপমোচন করে দেন। যদিও আমরা কখনোই আবু বকর ও উমরের পর্যায়ে যেতে পারব না, তবুও যারা সৎভাবে জীবনযাপন করতে ইচ্ছুক, তাদের জন্য এর মাঝে শিক্ষা রয়েছে। জীবন চলার এই বিশাল শিক্ষাটি দেবার জন্য আমাদের উচিত এই দুজনের প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তাঁদের শ্রেষ্ঠতম পুরস্কারে পুরস্কৃত করুন।
সবচেয়ে নিষ্পাপ ও সুখ্যাত ব্যক্তিবর্গও অপবাদের শিকার হন কেন? নিশ্চয় এর পেছনে কোনো উদ্দেশ্য আছে, মতভেদের কোনো বিষয় আছে। মানুষ যখন নিজের মতের ব্যাপারে অন্ধ ও উগ্র হয়ে ওঠে, তারা তখন মানুষকে প্রান্তিকভাবে বিচার করতে থাকে। এই অন্ধরা পৃথিবীকে দুই ভাগে ভাগ করে দেখে। এক অংশ তাদের সমমনা, যারা মানবরূপী ফেরেশতা এবং কোনো ভুল করতে পারে না। আরেক অংশ তাদের সাথে মতভেদকারী, গুণবিহীন মানবরূপী শয়তান। তৃতীয় কোনো পথ নেই। কুসংস্কারাচ্ছন্ন অজ্ঞ লোকেরা পৃথিবীকে এভাবেই দেখে।
এ কারণেই বলা হয় কষ্ট-ক্লেশের মাধ্যমেই ঈমানের আসল পরীক্ষা হয়। এখানেই সত্যিকারের মহানুভবতা, প্রজ্ঞা, উদারতা ও সদাচরণ প্রকাশ পায়। আর সকলেরই যখন মানসিকতা একই রকম হয়, সেক্ষেত্রে আন্তরিক ও ভদ্র হতে কোনো সমস্যা নেই। আবু বকর আর উমর আমাদের দেখিয়েছেন কীভাবে অসদাচারণকারীদের ঊর্ধ্বে থাকতে হয়। তাঁরা আমাদের শিখিয়েছেন কী করে গালমন্দকারীদের উপেক্ষা করে শ্রেষ্ঠ মানুষদের অন্তর্ভুক্ত হতে হয়, অন্যের ছিদ্রান্বেষণ বাদ দিয়ে কীভাবে নিজের ত্রুটি-বিচ্যুতি সংশোধনে মনোযোগী হতে হয়।
টিকাঃ
[৪] মুসনাদ আহমাদ: ৯১৯৮, মুস্তাদরাক আল-হাকিম: ১/২৩
[৫] আহমাদ বিন হাম্বল, ফাযায়িলুস সাহাবাহ: ১১৮, আবু দাউদ, আয-যুহদ: ৩৭
[৬] সহিহ আল-বুখারি: ৮১, ৩৬৯১, সহিহ মুসলিম: ২৩৯০, ২৩৯১
📄 ভাই ইবনু জিবরিনের চিঠি
কিছুদিন আগে আমি কয়েকটি বিষয়ের নিয়মিত খোঁজখবর রাখতাম। এগুলো কয়দিন পরপরই মাথাচাড়া দিয়ে উঠত। আমি এগুলোর জবাব দেওয়া থেকে বিরত থাকতাম। কারণ এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ অনেক কাজ আছে। সেসব কাজ বাদ দিয়ে এগুলোর পেছনে অতিরিক্ত সময় ও শ্রম নষ্ট করা অনর্থক মনে হতো। কিন্তু পরে আমি খেয়াল করলাম যে, এতে আমি একাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি না। বিষয়টির সাথে জড়িত ব্যক্তিরা ছাড়াও আরো অনেকের উপর এর প্রভাব পড়ছে। তাই এখন দেখছি এর জবাব দেওয়া জরুরি। কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থে নয়, আমাদের ঈমান ও দ্বীনের স্বার্থেই। আমি বছরের পর বছর ধরে একে যথাসম্ভব এড়িয়ে গেছি। তাৎক্ষনিক জবাব দেওয়া পরিহার করেছি। আসলে আমি এমন একটি সময়ের অপেক্ষায় ছিলাম, যখন জবাব দিলে সেটাকে আত্মপক্ষসমর্থন বলে মনে হবে না। বরং সম্পূর্ণ তাত্ত্বিক আলোচনা বলে পরিগণিত হবে।
সম্মানিত শাইখ আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রহমান আল-জিবরিনের কাছ থেকে একটি চিঠি পেয়ে বুঝলাম যে, সেই সময় চলে এসেছে। আশা করি আল্লাহ এই কথাগুলো থেকে আমাদের সবাইকে উপকৃত করবেন। ইবনু জিবরিন বেশ কিছু প্রশ্ন পেয়েছিলেন এক অতি-জজবাওয়ালা যুবকের কাছ থেকে। সেগুলোই তিনি আমাকে চিঠি আকারে পাঠান। যুবক ভাইটির সব বক্তব্যের সারকথা মূলত দুটি প্রশ্ন। আমি এগুলোরই উত্তর দিতে চাচ্ছি। প্রশ্নকর্তা লিখেছেন:
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
সম্মানিত শাইখ আব্দুল্লাহ আল-জিবরিন অনুগ্রহ করে এই প্রশ্নগুলোর জবাব দিয়ে বাধিত করবেন:
১। জনৈক ফাসিক সঙ্গীতশিল্পীর ব্যাপারে এক ব্যক্তি বলেছে, “সে তাওবাহ না করলে আল্লাহ তাকে কখনোই ক্ষমা করবেন না। কারণ নবিজি (ﷺ) বলেছেন, 'আমার উম্মাতের সকলকে ক্ষমা করা হবে, শুধু নিজের গুনাহর কথা প্রকাশ করে বেড়ানো ব্যক্তিরা ছাড়া।' তার মানে এই লোকের জন্য কোনো অজুহাত নেই, কারণ সে তার কাজের মাধ্যমে মুরতাদ হয়ে গেছে। তাওবাহ না করলে সে চিরস্থায়ী জাহান্নামী। আল্লাহ আমাদের এমন পরিণতি থেকে রক্ষা করুন। সে তো আল্লাহর এই আয়াতই বিশ্বাস করে না: 'জিনার কাছেও যেয়ো না। নিশ্চয় এটি জঘন্য ও ঘৃণ্য আচরণ।' আল্লাহর কসম! যে কেউ এই আয়াত জানে, সে কখনোই এটা হাজার-লক্ষ মানুষের সামনে ফলাও করে বেড়াবে না।” সে যে এই কথাটা বলল, এখন তার ব্যাপারে শরিয়তের হুকুম কী? সে কি খারেজি [৭] নয়, হে শাইখ? আমাদের কি উচিত নয় আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ওয়াস্তে মুসলিম উম্মাহকে এর বিরুদ্ধে সতর্ক করা? আর এমনটা করার সময় কি তার নাম উল্লেখ করা যাবে? উল্লেখ্য, তাকে তার আচরণ ঠিক করতে নসিহত করা হয়েছে। কিন্তু সে কথা শোনে না।
২। হাদিসে বর্ণিত তায়িফা মানসুরা (সাহায্যপ্রাপ্ত দল) ও ফিরকায়ে নাজিয়া (৭৩ দলের মধ্যে একমাত্র জান্নাতি দল) এই দুটিকে এক ব্যক্তি আলাদা মনে করে। আরো দাবি করে যে, শাইখ আব্দুল আযীয বিন বাযেরও একই মত। এই লোকের ব্যাপারে শরিয়তের হুকুম কী? উল্লেখ্য, শাইখ বিন বাযকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি এর বিপরীত কথা বলেছেন।
ওয়াসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
শাইখ আব্দুল্লাহ বিন জিবরিন তাঁর চিঠিতে নিজের এই মন্তব্যগুলো কষ্ট করে যোগ করে দিয়েছেন:
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
আমি এই বিষয়টি সম্মানিত শাইখ সালমান বিন ফাহদ আল-আওদাহর কাছে পাঠানো বিধেয় মনে করছি। এ ব্যাপারে তিনি বিশেষজ্ঞ, তাই তিনিই এর উত্তর দেওয়ার বেশি উপযুক্ত। প্রশ্নকর্তা যদি সত্যিই সত্যসন্ধানী হন, তাহলে নিঃসন্দেহে তিনি শাইখের উত্তরে সন্তুষ্ট হবেন। আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন। ওয়াসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রহমান আল-জিবরিন, ২২/১২/১৪২২
আমি সত্যিই প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে ইচ্ছুক। আমি প্রশ্নকর্তার অনুভূতিতে আঘাত করব না। আল্লাহর অনুগ্রহে এই বিষয়টি কেবল স্পষ্ট করে দিতে চাই, যাতে ভুল বোঝার অবকাশ না থাকে। প্রথম প্রশ্নের বক্তব্যটি আমিই এক গায়কের ব্যাপারে বলেছিলাম আমার এক খুতবায়।
সম্মানিত ভাইটি বলেছেন যে, বক্তাকে (অর্থাৎ, আমাকে) তার আচরণের ব্যাপারে সতর্ক করা হলেও সে কথা শোনেনি। মনে হয় তিনি আমার বক্তব্যকে ভুল বুঝেছেন। তিনি ভেবেছেন যে, আমি সকল গুনাহগার মুসলিমকে কাফির মনে করি। আমি স্বীকার করছি যে, প্রসঙ্গ বাদ দিয়ে আমার বক্তব্যটি শুনলে যে কেউই এমন অর্থই বুঝবে। অথচ এটা কারো অজানা নয় যে, আমি এক তাৎক্ষনিক বক্তব্যে শ্রোতাদের সামনে এই কথাটি বলেছি। এখানে খুঁটিনাটি বা বক্র কোনো অর্থ বের করার দরকার নেই। সাধারণভাবে যা বোঝায়, তাই বুঝতে হবে। ইসলামের আলিমগণ এ ব্যাপারে একমত যে, কারো বক্তব্য থেকে স্পষ্ট ও সাধারণভাবে কোনো অর্থ প্রকাশ পেলে এর বিপরীত কোনো অস্পষ্ট অর্থ খোঁজা যাবে না। 'আল-আওয়াসিম ওয়াল-কাওয়াসিম' গ্রন্থে ইমাম ইবনুল ওয়াযির এই মূলনীতিটি আলোচনা করে বলেছেন যে, এ ব্যাপারে আলিমদের ইজমা আছে।
বক্তার অবস্থা ও তার সর্বজনশ্রুত বক্তব্যগুলো থেকেই স্পষ্ট বোঝা যায় তিনি ওই খুতবায় কী বোঝাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু কারো যদি আরো নিশ্চিত হওয়ার প্রয়োজন হয়, আমি এখন বলছি: "হারামকে হালাল বলে ঘোষণা না করলে কোনো মুসলিম কেবল গুনাহ করার কারণে কাফির হয় না। খারিজি ও তাদের অনুসারী গোষ্ঠীগুলো ছাড়া আর কেউই এর সাথে দ্বিমত করে না। খারিজিরাই কেবল মুসলিমদের হত্যা, তাদের সম্পদ আত্মসাৎ ও সম্মানহানি করার বাহানা খোঁজে।
এই গোষ্ঠীটি ভ্রান্ত এবং তাদের অনুসারীদের স্বরূপ স্পষ্ট। কারো বক্তব্যের মধ্যে জোর করে লুকানো অর্থ বের করে তাকে তাদের দলে ফেলার চেষ্টা করার কোনো দরকার নেই। একজন মুসলিমকে সাধারণভাবে ঈমানদার বলেই বিবেচনা করতে হয়। কাজেই কোনো মুসলিম যদি নিজেকে খারিজিদের থেকে দায়মুক্ত ঘোষণা করে, তাহলে সেটাই বিশ্বাস করতে হবে। আর তার অন্তরের বিষয় আল্লাহর হাতে ছেড়ে দিতে হবে। কথার যেই অর্থ তিনি বোঝাতে চাননি, তা জোর করে তাঁর মুখে তুলে দিয়ে তারপর নিন্দা করার দরকার নেই।
নবিজি (ﷺ) তাবুক যুদ্ধ থেকে ফিরে আসার পর মুনাফিকরা তাঁর কাছে গিয়ে যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করার বিভিন্ন মিথ্যে অজুহাত শোনাতে লাগল। তিনি তাদের ওজর গ্রহণ করে নেন, তাদের জন্য মাগফিরাতের দু'আ করেন, আর তাদের অন্তরের ব্যাপার আল্লাহর হাতে ছেড়ে দেন। মুসলিমদের উচিত দ্বীনি ভাই হিসেবে একত্র থাকা এবং পারস্পরিক আচরণে এই ধরনের সদাচরণ দেখানো। একে অপরের প্রতি সর্বোচ্চ সুধারণা করার জন্য বাহানা খুঁজতে হবে, তাদের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করতে হবে, আর অন্তরের গোপন বিষয় আল্লাহর কাছে ন্যস্ত করে দিতে হবে।
প্রশ্নকর্তা যে অর্থ বুঝেছেন, আমি আসলে সেটি বোঝাইনি। ওই সঙ্গীতশিল্পী ব্যভিচার করতে পছন্দ করে বলেই আমি এমন কথা বলেছি, তা নয়। বরং সে এই ঘৃণ্য কাজটির প্রশংসা করে, ব্যভিচার ও ব্যভিচারীদের গুণগান করে, ব্যভিচার পরিহারকারী ব্যক্তিদের পুরুষত্ব নিয়ে বিদ্রূপ করে। কেবল গুনাহ করার চেয়ে এটা একদমই আলাদা।
একজন মানুষের মুখের কথা তার মনের ভাবের ছায়ামাত্র। অর্থ যদি পরিষ্কার বোঝা যায়, তাহলে শব্দচয়নে সামান্য বা মারাত্মক ভুল করলেও তা ক্ষমার যোগ্য।
আল্লাহর রাসূল (ﷺ) এক লোকের কথা বলেছেন, যে খুশির চোটে ভুলে বলে ফেলেছিল, “হে আল্লাহ! আপনি আমার বান্দা আর আমি আপনার প্রতিপালক!” শব্দচয়নে ভুল করলেও সে গুনাহগার হয়নি।
কারো কোনো বক্তব্য প্রসঙ্গ বাদ দিয়ে বা অতিরিক্ত ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে প্রচার করা যাবে না। বিশেষত বক্তৃতা বা লেখার উদ্দেশ্য যদি থাকে নসিহত করা ও জনগণের কল্যাণসাধন, তাহলে শ্রোতা বা পাঠকের উচিত নয় বক্তা বা লেখকের টুটি চেপে ধরার উদ্দেশ্যে লুকানো অর্থ খুঁজতে শুরু করা।
খারিজিদের দুটো প্রধান দোষ ছিল। দুটোই একই রকমের মারাত্মক এবং এদের একটি অপরটিকে শক্তিশালী করে। প্রথমত, ঈমানের বিষয়গুলোতে কঠোরতা, যেটাকে তারা ইসলামি শরিয়তের পবিত্রতার প্রতি ভক্তি ভেবে ভুল করত। পাপাচারী ব্যক্তিকে কাফির ভেবে তারা অবিচার করত। দ্বিতীয় দোষটি প্রথমটি থেকেই উদ্ভূত। তারা অপর মুসলিম ভাইয়ের প্রতি আক্রমণাত্মক ও সহিংস আচরণ করত। এমনকি তাদের জীবন, সম্পদ ও সম্মান হরণ করা নিজেদের জন্য হালাল করে নিয়েছিল।
আল্লাহর কাছে শোকর যে, মুসলিমদের বিরাট অংশটি খারিজিদের চরমপন্থাকে প্রত্যাখ্যান করে। তারা পাপাচারী মুসলিমকে কাফির বলে না। চরমপন্থা অবলম্বনকারী মানুষের সংখ্যা একেবারেই নগণ্য। আল্লাহ আমাদেরকে এই মানুষদের ক্ষতি থেকে রক্ষা করুন।
দুর্ভাগ্যবশত, কিছু মানুষ বাঁকা অর্থ বের করার মাধ্যমে অপর মুসলিম ভাইয়ের জীবন ও সম্পদের প্রতি জুলুম করে। এটা বিপজ্জনক স্বভাব। আমি এদের ব্যাপারে প্রচুর লেখালেখি করেছি এবং মানুষকে তাদের ব্যাপারে সাবধান করেছি।
আর কিছু লোক এমন আছেন, যারা সঠিক বুঝ-জ্ঞানের অধিকারী এবং খারিজিদের চিন্তাধারাকে চরমভাবে প্রত্যাখ্যানকারী। কিন্তু দুঃখজনক ব্যাপার হলো, খারিজিদের একটি গুণ তাঁরা রপ্ত করে নিয়েছেন। তাঁদের সাথে মতপার্থক্যকারীদের প্রতি তাঁদের আচরণ কঠোর এবং তাদের ভুল খুঁজে বের করতে তাঁরা বেশ তৎপর। কী সহজেই না তাঁরা অপরকে বিদআতি, ভ্রান্ত, মুরজিয়া [৮] বা খারিজি বলে ফেলেন! প্রায়ই এসব কথা তাঁরা বলেন স্বল্প বুঝ ও অগভীর জ্ঞানের কারণে। বিশেষ কারো সাথে মিত্রতা ও অপর কারো সাথে শত্রুতার কারণেই তারা এসব সিদ্ধান্তে পৌঁছান। যুবকদের মধ্যে যাদের এই অভ্যাস আছে, তারা এসব ব্যাপারে তুমুল বিতর্ক করতে করতেই জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময়টা ব্যয় করে ফেলে। অথচ এটা ইলম বৃদ্ধি করা ও চরিত্র উন্নয়নের সময়।
মানুষের ভুল সংশোধন করে তাদের সামনে সত্য উন্মোচিত করা হলো জ্ঞানী ও যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিবর্গের কাজ। এদের এ ব্যাপারে জ্ঞানও আছে, সঠিকভাবে কাজটি করার মতো প্রজ্ঞাও আছে। আল্লাহ বলেন,
آتَيْنَاهُ رَحْمَةً مِّنْ عِندِنَا وَعَلَّمْنَاهُ مِن لَّدُنَّا عِلْمًا ﴿٦٥﴾
"তার প্রতি আমি অনুগ্রহ করেছি এবং তাকে দিয়েছি আমার পক্ষ থেকে বিশেষ জ্ঞান।” (সূরাহ আল-কাহফ ১৮:৬৫)
জ্ঞানী লোকেরা বুঝতে পারেন যে, দরকারি হলেও অনেক কাজের ফলাফল আসলে শূন্য। বিশেষত এমন একটা সময়ে, যখন মুসলিমদের আসল শত্রু হলো তাদের ভূমি ও সম্পদের উপর নেমে আসা শক্তিশালী দখলদার শত্রুবাহিনী।
সবচেয়ে খারাপ ব্যাপার হলো অপরের কাছে ইসলামের বার্তা পৌঁছে দিতে আমাদের ব্যর্থতা। আমরা যখন নিজেদের মাঝে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে নিষ্ফল ঝগড়াঝাটিতে লিপ্ত, তখনও পৃথিবীতে অনেকে অমুসলিম রয়ে গেছে। এদের মাঝে অনেকের কাছেই এখনও কেউ ইসলামের সঠিক বার্তা নিয়ে যায়নি।
এই দুটি বিষয়ই আমাদের সব চেষ্টা-আগ্রহের মূল কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত। আমাদের একে অপরকে আক্রমণ করা বাদ দিয়ে নিজেদের মাঝে নমনীয় ও ক্ষমাশীল হতে হবে এবং সর্বোচ্চ সুধারণা রাখতে হবে। কঠোরতা পরিহার করতে হবে। আর যারা বিশেষ কোনো ইসলামি কর্মীর মর্যাদা রক্ষায় নিয়োজিত থাকার দাবি করেন, তাদের বলব, আপনারা ভালো কাজ করেছেন। তবে এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ইসলাম ও ঈমানের প্রতিরক্ষার্থে কাজ করা এবং মুসলিমদের দুরবস্থা দূর করতে সচেষ্ট হওয়া। অমুসলিমদের ইসলামের দিকে আহ্বান করা, দ্বীনের খেদমতে গঠনমূলক কিছু করা এবং বৃহৎ অর্থে, মানবজাতির কল্যাণার্থে পৃথিবীর উন্নয়নে ভূমিকা রাখা।
আমার ব্যাপারে কুধারণা রেখেও যদি কেউ বিশুদ্ধ তাওহীদ অন্তরে নিয়ে মারা যায়, তাতে কোনো সমস্যা নেই। বরং সমস্যা হবে যদি সে আল্লাহ, তাঁর দ্বীন, শরিয়ত, কিতাব ও নবি-রাসূলগণের ব্যাপারে অজ্ঞ অবস্থায় মারা যায়। ইসলামের জন্য আমরা যেসব কাজ করি, তা বিভিন্ন কারণে খুবই সীমিত। তাহলে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ও উপকারী কাজগুলোতে আগে মনোযোগ দেওয়াটাই কি উচিত নয়?
আমাদের জজবাতি প্রশ্নকর্তা ভাই দ্বিতীয় যে বিষয়টি তুলে ধরেছেন, তা হলো আমি ফিরকায়ে নাজিয়া ও তায়িফা মানসুরাকে আলাদা মনে করি। তিনি আরো বলেছেন যে, আমি বিন বাযকে আমার সাথে এ ব্যাপারে একমত বলে দাবি করলেও তাঁর মত আসলে ভিন্ন।
এই বিষয়ে ইজতিহাদ ও গবেষণা করতে কোনো দোষ নেই, কারণ এই বিষয়টিতে অনুধাবনের অনেক কিছু আছে। তবুও এটা বড় কোনো ব্যাপার নয়। বিভিন্ন আলিম বিভিন্ন হাদিসের অর্থের মাঝে তুলনা করে একাধিক সিদ্ধান্তে এসেছেন, এটাই মূল কথা। যেমন- আত-তাহাওয়ি, ইবনু কুতাইবাহ, ইবনু হাজার, ইবনু তাইমিয়াহ, ইমাম নববি প্রমুখ। মুফাসসিরগণ যেমন বিভিন্ন আয়াতের অর্থের মাঝে তুলনা করেন, এখানেও ব্যাপারটা একই রকম। এসকল কাজে অনেকসময় সিদ্ধান্তহীনতা বা অনিচ্ছাকৃত ভুল সিদ্ধান্ত তৈরি হয়। মুসলিমরা এতে কখনো দোষী হয় না। কারণ নবিজি (ﷺ) বলেই দিয়েছেন ইজতিহাদকারী আলিম সঠিক সিদ্ধান্তের কারণে দুই নেকি ও ভুল সিদ্ধান্তের কারণে এক নেকি লাভ করবেন।
আমরা যা নিয়ে কথা বলছি, এর চেয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলিমগণ আলোচনা করেছেন। যেমন ধরুন ইসলাম ও ঈমানের অর্থ। কেউ বলেছেন দুটো একদমই সমার্থক, কেউ বলেছেন একদমই আলাদা, কেউ আবার বলেছেন আংশিক আলাদা। প্রতিটি মতের পক্ষেই প্রখ্যাত সব আলিম রয়েছেন। তাঁদের কেউই সমালোচনার পাত্র হয়ে যাননি, কারণ এগুলো খুবই তাত্ত্বিক আলোচনা। ইবনু তাইমিয়াহ (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর 'কিতাবুল ঈমান' গ্রন্থে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করেছেন।
'রাসাইলুল গুরাবা' বইয়ে আমি যে মত দিয়েছি, তা মূল পাঠের ব্যাখ্যা হিসেবে এসেছে। আমি এ ব্যাপারে আমার মতকে সঠিক বলে মনে করি, তবে তা ভুল হওয়ার সম্ভাবনাও স্বীকার করি। একইভাবে, আমি এ ব্যাপারে প্রশ্নকর্তা ভাইয়ের মতকে ভুল মনে করি, তবে তা সঠিক হওয়ার সম্ভাবনাও স্বীকার করি। এ ব্যাপারে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেই। যেহেতু এ ব্যাপারে ইজমা নেই, তাই আলোচনার দুয়ার খোলাই আছে।
এ ব্যাপারে যারা আমার কথা উদ্ধৃত করে, তারা এমনভাবে দেখায় যেন আমি ফিরকায়ে নাজিয়া আর তায়িফা মানসুরাকে একেবারেই আলাদা দুটি দল মনে করি। আসলে ব্যাপারটা এমন নয়। আমার মতে ফিরকায়ে নাজিয়া হলো তায়িফা মানসুরার তুলনায় আরো বিস্তৃত একটি ব্যাপার। তায়িফা মানসুরা হলো ফিরকায়ে নাজিয়ার অংশ। দুনিয়ায় আসমানী সাহায্য না পেয়েও অনেক মুসলিম নাজাত পায়। সাহাবিদের মধ্যে যারা পরস্পরের সাথে মতভেদ ও লড়াই করেছেন, তাঁদের সকলেই নাজাতপ্রাপ্ত। কিন্তু সকলেই দ্বন্দ্বের সময় ঐশী সাহায্য পাননি। আগ্রহীদের আমি বলব এ ব্যাপারে ইবনু তাইমিয়াহর লেখা পড়তে। (আল-ফাতাওয়া, ৪/৪৪৩-৪৫০ এবং ৪/৪৬৭-৪৭০)
আমার মতের পক্ষে কুরআন থেকে সমর্থন রয়েছে। আল্লাহ বলেন, وَمَا كَانَ الْمُؤْمِنُونَ لِيَنفِرُوا كَافَّةً ، فَلَوْلَا نَفَرَ مِن كُلِّ فِرْقَةٍ مِّنْهُمْ طَائِفَةٌ لِّيَتَفَقَّهُوا فِي الدِّينِ وَلِيُنذِرُوا قَوْمَهُمْ إِذَا رَجَعُوا إِلَيْهِمْ لَعَلَّهُمْ يَحْذَرُونَ ﴿۱۲২
“মুমিনদের সকলের একত্রে অভিযানে বেরিয়ে পড়া সমীচীন নয়। তাদের প্রতিটি দলের (ফিরকা) একটি অংশ (তায়িফা) যেন পৃথক হয়, যাতে করে তারা দ্বীন সম্পর্কে জ্ঞানের অনুশীলন করতে পারে এবং ফিরে আসার পর তাদের সম্প্রদায়কে সতর্ক করতে পারে যাতে তারা (অসদাচরণ) থেকে বিরত হয়।” (সূরাহ আত-তাওবাহ ৯:১২২)
এই আয়াতে দেখা যাচ্ছে তায়িফার চেয়ে ফিরকা বেশি বিস্তৃত। আরবি ভাষায় তায়িফা বলতে ফিরকার চেয়ে ছোট দল বোঝানো হয়। এমনকি একজন ব্যক্তি নিয়েও তায়িফা গঠিত হতে পারে, যেমনটা এই আয়াতের ব্যাপারে কিছু মুফাসসির বলেছেন,
وَلْيَشْهَدْ عَذَابَهُمَا طَائِفَةٌ مِّنَ الْمُؤْمِنِينَ ﴿٢﴾
“আর মুমিনদের একটি দল (তায়িফা) যেন তাদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করে।” (সূরাহ আন-নূর ২৪:২)
আমার মতের পক্ষে আরো দলীল আছে। এই শব্দদুটোর অর্থই কেবল আলাদা নয়, এদের বিশেষণও আলাদা। একটির বিশেষণ 'নাজাতপ্রাপ্ত', আরেকটির বিশেষণ 'সাহায্যপ্রাপ্ত'। ভাষার সাধারণ নিয়ম হলো গাঠনিক এই পার্থক্য অর্থের পার্থক্য নির্দেশ করে। আর আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন।
যা-ই হোক, আমি কখনোই বলিনি ফিরকায়ে নাজিয়া আর তায়িফা মানসুরা সম্পূর্ণ আলাদা দুটি দল। আমি কেবল বলেছি যে, তায়িফা মানসুরা হলো ফিরকায়ে নাজিয়ার অংশ। কিছু মানুষ কিছু ভুল করলেও এবং ঐশী সাহায্য না পেলেও পরকালে নাজাত পাবেন। আর কিছু মানুষ উভয়টিই পাবেন।
অন্যান্য লেখায় আমি এই বিষয়ে গভীরতর আলোচনা করেছি বলে এখানে আর কথা বাড়ানোর প্রয়োজন দেখছি না। যারা বলেন দুটি শব্দবন্ধই একই অর্থ প্রকাশ করে, তাঁদেরও শক্ত দলীল রয়েছে।
সিলসিলাহ আল-আহাদিস আস-সহিহাহ [৯] গ্রন্থে শাইখ নাসিরুদ্দিন আলবানি লিখেন,
আর আমাদের এক দ্বীনি ভাই বলে থাকেন এই দুটি দলের মাঝে পার্থক্য রয়েছে। এটি তাঁর মত এবং আমি একে সত্য থেকে বেশি দূরবর্তী মনে করি না। আগেই বলা হয়েছে যে, মুহাদ্দিসগণের মতে তায়িফা মানসুরা হলো হাদিসের আলিমগণ। অথচ ফিরকায়ে নাজিয়ার বেশিরভাগই আলিম নন, হাদিসের আলিম তো ননই।
নবিজি (ﷺ)-এর সাহাবাগণ হলেন ফিরকায়ে নাজিয়ার শ্রেষ্ঠ প্রতিনিধি। এ কারণেই তো আমাদের আদেশ করা হয়েছে তাঁদের সুন্নাহ অনুসরণ করতে। অথচ তাঁদের বেশিরভাগই আলিম ছিলেন না। তাঁরা তাঁদের মধ্যকার অল্পসংখ্যক আলিমের অনুসরণ করতেন।
কাজেই এ কথা পরিষ্কার যে, তায়িফার চেয়ে ফিরকা আরো বিস্তৃত। একইসাথে, এ নিয়ে বিতর্ক করার মাঝে আমি কোনো কল্যাণ দেখি না। আমাদের বরং নিজেদের মধ্যকার ঐক্য রক্ষা ও ইসলামের জন্য কাজ চালিয়ে যাওয়া বেশি জরুরি।
আমি স্বীকার করি যে, 'মানসুরা' এবং 'নাজিয়া' শব্দদ্বয় কিছুটা হলেও সমার্থক। কারণ নাজাত পাওয়ার কারণগুলো একত্রিত হলেই সাহায্য পাওয়া সম্ভব। একইভাবে, ঐশী সাহায্য তাঁরাই পান, যারা নাজাতের পথে থাকেন। কাজেই, দুটি শব্দের কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য আছে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, এগুলো হুবহু একই। হুবহু একই হওয়ার সম্ভাবনা আছে, যেমনটা কিছু চিন্তাবিদ মনে করে থাকেন। আবার একটার চেয়ে আরেকটা সাধারণ হওয়ার সম্ভাবনাও আছে, যে মতটিকে আমি অগ্রাধিকার দিই। মোট কথা, একটি শব্দ অপরটি থেকে বেশি বিস্তৃত হলেও দুটির মাঝে সাধারণ সমার্থকতার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
প্রশ্নকর্তার মতটি যদি আমরা গ্রহণ করেও নিই, অর্থাৎ 'মানসুরা' ও 'নাজিয়া'র অর্থ হুবহু একই ধরে নিই তবুও আমার মনে হয় গভীরতার দিক দিয়ে দুটির মাঝে কিছুটা হলেও পার্থক্য থাকবে। আহলুস সুন্নাহর অনেক আলিমের মতে, অর্থ একই হলেও দুটি শব্দের অর্থের গভীরতার মাত্রা আলাদা হতে পারে। কোন প্রসঙ্গে ব্যবহৃত হয়েছে, তার ভিত্তিতে শব্দগুলোর অর্থ বিভিন্ন মাত্রা ধারণ করতে পারে। আলিমগণ একমত যে, প্রসঙ্গ সহ ও প্রসঙ্গ ছাড়া বিবেচনা করলে একই কথার ভিন্ন অর্থ হতে পারে।
মুমিনদের মাঝে তাকওয়া ও আমলে যে পার্থক্য আছে, তা তো অনস্বীকার্য। জান্নাতের অনেক স্তর আছে। দুনিয়ায় অর্জন করা সাওয়াবের ভিত্তিতে একেক মুমিন একেক স্তরে থাকবে। নবিগণের আলাদা স্তর, সিদ্দিকগণের আলাদা, শহীদগণের আলাদা, সলিহ (সৎকর্মশীল) লোকদের আলাদা। এর বাইরেও অন্যান্য স্তরের মুমিন জান্নাতে থাকবে। কেউ বিনা বিচারে জান্নাতে যাবে। কেউ জাহান্নামে কিছু সময় কাটিয়ে তারপর জান্নাতে ঢোকার অনুমতি পাবে। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেন,
إِنَّ فِي الْجَنَّةِ مِائَةَ دَرَجَةٍ أَعَدَّهَا اللَّهُ لِلْمُجَاهِدِينَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ، مَا بَيْنَ الدَّرَجَتَيْنِ كَمَا بَيْنَ السَّمَاءِ وَالأَرْضِ، فَإِذَا سَأَلْتُمُ اللَّهَ فَاسْأَلُوهُ الْفِرْدَوْسَ، فَإِنَّهُ أَوْسَطُ الْجَنَّةِ وَأَعْلَى الْجَنَّةِ، أَرَاهُ فَوْقَهُ عَرْشُ الرَّحْمَنِ، وَمِنْهُ تَفَجَّرُ أَنْهَارُ الْجَنَّةِ
“আল্লাহর রাস্তায় যারা জিহাদ করে, তাদের জন্য আল্লাহ জান্নাতে একশটি স্তর সজ্জিত করেছেন। একেকটির মধ্যকার দূরত্ব আসমান ও জমিনের মধ্যকার দূরত্বের মতো। কাজেই জান্নাতের জন্য দু'আ করার সময় আল- ফিরদাউসের জন্য দু'আ করবে। কারণ এটি জান্নাতের উচ্চতম ও কেন্দ্রীয় স্থান। এর উপর দয়াময় আল্লাহর আরশ এবং এ থেকে জান্নাতের নদীসমূহ প্রভাবিত হয়।” [১০]
জান্নাতের স্তরবিন্যাস নির্ণয় করতে আলিমগণ বিভিন্ন পদ্ধতি অনুসরণ করেছেন। শিষ্টাচার ও সচ্চরিত্র নিয়ে গবেষণাকারী আলিমগণ এ কাজে রত হয়েছেন। স্তর নির্ধারণের গুণাবলি ও সেগুলোর খুঁটিনাটি বিভিন্নজন বিভিন্নভাবে গ্রহণ করেছেন বলে তাঁদের মাঝে মতপার্থক্য হয়েছে।
ইসলামি শরিয়তের একটি গুরুত্বপূর্ণ মূল প্রতিপাদ্য হলো ন্যায়। প্রতিটি বস্তুকে তার যথাযথ স্থানে রেখে এবং প্রত্যেককে তার প্রাপ্য অধিকার দিয়ে এই ন্যায় অর্জিত হয়। মানুষের ঈমান ও আমলের স্তর বিভিন্ন। কেউ যেই স্তরে পৌঁছায়, তার উপরের স্তরে যাবার জন্য তার পরিশ্রম করা উচিত। আল্লাহ বলেন,
وَالَّذِينَ جَاهَدُوا فِينَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا ، وَإِنَّ اللَّهَ لَمَعَ الْمُحْسِنِينَ ﴿٦٩﴾
"আর যারা আমার পথে চেষ্টা-সাধনা করে, আমি অবশ্যই তাদের আমার দিকে পথ দেখাব। নিশ্চয়ই আল্লাহর সৎকর্মশীলদের সাথে আছেন।” (সূরাহ আল-আনকাবূত ২৯:৬৯)
শেষ কথা হলো, আমাদের উচিত উপকারী জ্ঞান অর্জনে ব্যস্ত হওয়া ও এই ইলমের মর্যাদা বোঝা। একে অপরের সাথে তর্ক করে নিজেদের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত হওয়ার জন্য এই জ্ঞান ব্যবহার করা উচিত নয়।
টিকাঃ
[৭] এরা একটি ভ্রান্ত গোষ্ঠী, যারা মনে করে কোনো মুসলিম কবিরা গুনাহ করলেই কাফির হয়ে যায়।
[৮] আরেকটি ভ্রান্ত দল, যারা খারিজিদের একদম বিপরীত মত পোষণ করতো। তাদের মতে, একজন মানুষ যত ভালো বা খারাপ আমলই করুক, ঈমানের উপর এর কোনো প্রভাবই পড়ে না।
[৯] আল-আলবানি, সিলসিলাহ আল-আহাদিস আস-সহীহাহ, ১/৯৩২
[১০] সহিহ বুখারি: ২৭৯০