📄 ভূমিকা
আমার কিছু প্রিয় ভাই আছেন, তারা অবশ্য আমাকে অতটা প্রিয় মনে করেন না। কিছু ব্যাপারে আমার সাথে দ্বিমত হওয়ায় তারা আমাকে রীতিমত গালমন্দ করেছেন। কিন্তু এমন পরিস্থিতিতে নিজের রাগ গিলে ফেলে নিজেকে শান্ত রাখতে পারার সেই স্মৃতি মনে পড়লে ভালোই লাগে। যত যা-ই হোক, আমাদের মাঝে মতপার্থক্যের চেয়ে ঐক্যমত্যের সংখ্যাই বরং অনেক বেশি।
ভাবতে ভালোই লাগে যে, আল্লাহ নিজেকে সংবরণ করতে আমাকে সাহায্য করেছেন। মাথা গরম করে অনর্থক ও তুচ্ছ বিতর্কে লিপ্ত হওয়া থেকে রক্ষা করেছেন। না হলে আমি হয়তো সচেতন বা অবচেতনভাবে নিজের নফসকে বিজয়ী করার নিয়তে তর্ক শুরু করতাম-সত্যকে বিজয়ী করার জন্য না।
এরকম পরিস্থিতিতে স্বার্থ ও কুতর্ককে জায়েজ করার জন্য অনেকরকম চটকদার সাইনবোর্ড লাগাতে ইচ্ছে হয়। “সত্য প্রকাশ করা”, “সঠিক বিষয় উন্মোচন” আরো কত কী! নিজেকে এই ঝোঁকের কাছে সঁপে দেওয়া মানে দুর্গম ও প্রাণহীন এক মরুভূমিতে আছড়ে পড়া।
ধর্মীয় চেতনা অন্তরে লালন করে আমাদের উচিত ছিল আদর্শ ও সদাচারী মানুষ হওয়া-যাদের পারস্পরিক লেনদেন হবে ইতিবাচক। দুর্ভাগ্যবশত অনেকে এর ফলে উল্টো সংকীর্ণমনা, খিটমিটে ও বিদ্বেষী হয়ে ওঠে। কখনও তাদের জজবা তাদের উদ্বুদ্ধ করে সারাক্ষণ অন্যের দোষ খুঁজে বেড়াতে। এই ধরণের মানুষদের সকলে এড়িয়ে চলতে পারলেই বাঁচে। কারণ, এদের কাছে গেলেই নানা প্রশ্নবাণে জর্জরিত হয়ে নিজের ধার্মিকতার ইন্টারভিউ দেওয়া লাগবে: “আপনি কোন মতাদর্শে বিশ্বাসী? কোন কর্মপদ্ধতি অনুসরণ করেন? আপনার শাইখ কে? অমুক অমুক বিষয়ে আপনার অবস্থান কী?”
আমার মনে আছে, একবার এক যুবক এসে আমার শিক্ষক সালিহ আল-বুলায়হির সাথে একাকী কথা বলতে চাইল। তিনি উঠে যুবকের সাথে একটু দূরে গিয়ে কথা বলতে লাগলেন। দুজন একসাথে হওয়ামাত্রই যুবকটি আক্রোশে ফেটে পড়ে বলল, “আমি আপনাকে আল্লাহর জন্য ঘৃণা করি!”
আমার শিক্ষক মুচকি হাসি দিয়ে বললেন, “আচ্ছা, আচ্ছা। সেটা কেন?”
যুবক বলল, “কারণ আপনি বলেন যে, চাল দিয়ে ফিতরা দেওয়া আর বিশ রাকা'আত তারাবীহ পড়া জায়েজ।”
এর উত্তরে আমার শিক্ষক বললেন, “আমাদের নবিজি (ﷺ) উপদেশ দিয়েছেন যে, কাউকে আল্লাহর জন্য ভালোবাসলে তাকে তা জানিয়ে দিতে। সুনান আবু দাউদ গ্রন্থে হাদিসটি এসেছে। কিন্তু কাউকে আল্লাহর জন্য ঘৃণা করলে জানিয়ে দিতে হবে, এ মর্মে কোনো হাদিস আছে বলে তো মনে পড়ছে না!”
তিনি ছোটখাটো বিষয়ে তর্কে লিপ্ত হওয়া থেকে সুন্দরভাবে সরে আসলেন। এসব তর্ক-বিতর্কে তাদের উভয়ের অন্তর কঠিন হয়ে যাওয়া ছাড়া কোনো লাভই হতো না।
তর্ক পরিহার করতে পারা একটি অসাধারণ গুণ। এর একটি ফজিলত হলো এতে সময় বাঁচে। এছাড়াও এতে আমাদের অন্তর নিষ্কলুষ থাকে আর অন্যদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় থাকে।
আমি আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ যে, অন্যেরা আমার সাথে দ্বিমত করতে গিয়ে অসদাচরণ করলেও আমার অন্তর পরিষ্কার রাখতে কষ্ট হয় না। এমনটা করার একটি উপায় হলো তাদের আচরণ ভুলে যাওয়া। নিজেকে বলুন, “কিছু মানুষ অন্যদের সাথে কথা বলার পদ্ধতি শেখেইনি।”
একসময় আমি আরো ভালো একটি উপায় শিখলাম—তাদের জন্য দু'আ করা। দু'আ কবুলের সময়গুলোতে তাদের জন্য মাগফিরাত ও রহমতের দু'আ করুন। দু'আ করুন তারা যেন এই দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে পারে। দেখবেন হৃদয়ের ভার কমে গেছে।
জ্ঞানী-মূর্খ, পুণ্যবান-পাপী নির্বিশেষে সকল মুসলিমের জন্য দু'আ করা অত্যন্ত ভালো আমল। সত্যি বলতে আমি পুরো মানবজাতিকেই আমার দু'আয় অন্তর্ভুক্ত করি। দু'আ করি যেন আল্লাহ তাদের সবচেয়ে কল্যাণময় পরিণতি দেন, জালিমদের হাত থেকে তাদের রক্ষা করেন, তাদের উপর নিজের অনুগ্রহ বর্ষণ করেন, এবং রহমত-মাগফিরাত-হিদায়াত দান করেন।
এমনটা হতেই পারে যে, অন্যের অসদাচরণ পেয়ে আমিও হঠাৎ করে সব সদাচরণের শিক্ষা ভুলে গেলাম। নীতি-আদর্শের কথা মনে ওঠার আগেই প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে পাল্টা জবাব দিতে লাগলাম। এই অভিজ্ঞতাগুলোর মাধ্যমে আল্লাহ আমাদের বিনয় শিক্ষা দেন। স্মরণ করিয়ে দেন যে, জীবনের এই পাঠশালায় আমরা এখনও আনাড়ি শিক্ষার্থী। আমরা সুযোগ পাই আল্লাহর কাছে এই বলে প্রত্যাবর্তন করার,
قَالُوا سُبْحَانَكَ لَا عِلْمَ لَنَا إِلَّا مَا عَلَّمْتَنَاءِ إِنَّكَ أَنتَ الْعَلِيمُ الْحَكِيمُ ﴿٣٢﴾
"আপনি পবিত্র, মহান! আপনি আমাদের যা শিক্ষা দিয়েছেন, তা ছাড়া আমাদের আর কোনোই জ্ঞান নেই। নিশ্চয়ই আপনিই সর্বজ্ঞ ও প্রজ্ঞাময়।” (সূরাহ আল-বাকারাহ ২:৩২)
رَبَّنَا ظَلَمْنَا أَنفُسَنَا وَإِن لَّمْ تَغْفِرْ لَنَا وَتَرْحَمْنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ ﴿٢٣﴾
“হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা নিজেদের উপর জুলুম করেছি। আপনি যদি আমাদের ক্ষমা না করেন ও আমাদের প্রতি দয়া না করেন, তাহলে আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব।” (সূরাহ আল-আ'রাফ ৭:২৩)
হোঁচট খেলেই বরং আরো সচেতন হতে হয়। নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারালে ভবিষ্যতে আরো সাবধান থাকতে হবে নিজের ভাবগাম্ভীর্য রক্ষায়। আয়ত্ত করতে হবে ধৈর্যধারণ করা, ক্ষমা প্রদর্শন ও উপেক্ষা করার শিল্প।
আল্লাহর কাছে তাওবাহ করতে হবে। দু'আ করতে হবে তিনি যেন আমাদের অন্তর পরিশুদ্ধ করে দেন, আমাদের ভেতরকে বাহিরের চেয়েও সুন্দর করে দেন। জ্ঞান, বিশ্বাস ও সৎকর্মে যারা আমাদের চেয়ে অগ্রবর্তী, তাঁদের সাথে কথা বলার সময় বিনয়ী হতে যেন আল্লাহ আমাদের সাহায্য করেন। কখনোই যেন কারো প্রতি উদ্ধত-অহংকারী আচরণ না করি, তার যতই ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকুক না কেন। নবিজি (ﷺ) বলেছেন,
كُلُّ بَنِي آدَمَ خَطَّاءٌ وَخَيْرُ الْخَطَّائِينَ التَّوَّابُونَ
"আদম (আলাইহিসসালাম) এর সকল সন্তানই গুনাহগার। উত্তম গুনাহগার সে, যে তাওবাহ করে।" [১]
যাদের আমরা বাহ্যিকভাবে ভুল করতে দেখি, তাদের হয়তো এমন অনেক গুণ আছে যার কথা কেবল আল্লাহই জানেন। আলিম, দাঈ বা ধর্মীয় নেতা হবার স্বপ্নে বিভোর অনেক মানুষের চেয়ে তারা হয়তো এসব গুণাবলিতে যোজন যোজন অগ্রসর। আল্লাহ আমাদের জানাচ্ছেন নূহ আলাইহিসসালাম-এর উক্তি,
وَلَا أَقُولُ لِلَّذِينَ تَزْدَرِي أَعْيُنُكُمْ لَن يُؤْتِيَهُمُ اللَّهُ خَيْرًا اللَّهُ أَعْلَمُ بِمَا فِي أَنفُسِهِمْ إِنِّي إِذًا لَمِنَ الظَّالِمِينَ ﴿٣١﴾
"... তোমাদের চোখে যারা হীন, তাদের ব্যাপারে আমি বলছি না যে, আল্লাহ তাদের কখনও কোনো কল্যাণ দান করবেন না। বরং তাদের অন্তরে যা আছে, সে সম্পর্কে আল্লাহই ভালো জানেন। (যদি এমনটা বলি,) তাহলে নিশ্চয়ই আমি জালিমদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব।” (সূরাহ হুদ ১১:৩১)
এই বইয়ের অধ্যায়গুলো আসলে কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন সময়ে লেখা আমার কিছু প্রবন্ধ। তবে এগুলো পরস্পর নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। প্রতিটিরই আলোচ্য বিষয় হলো মতানৈক্য ও দ্বন্দ্ব এবং এসব ক্ষেত্রে আমাদের করণীয়। এ সংক্রান্ত আলোচনার যেসব দিক আমার বিগত প্রবন্ধগুলোতে ছুটে গিয়েছিল, সেগুলোর উপর আমি নতুন করে লিখেছি।
ই-মেইল, ফেইসবুক, ও অন্যান্য মাধ্যমে আমি এই বইটির পাঠকদের প্রতিক্রিয়া জানতে আগ্রহী। বইয়ের শুরুর দিকের পৃষ্ঠাগুলোতে যোগাযোগের ঠিকানা পাবেন। আপনাদের পরামর্শ, সমালোচনা, সংশোধনকে আমি স্বাগত জানাই। এর দ্বারা আমার জ্ঞান সমৃদ্ধ হবে ও বইটির পরবর্তী সংস্করণগুলো পরিমার্জিত হবে। বইটি পড়ার জন্য যারাই নিজ নিজ মূল্যবান সময় থেকে কিছু সময় ব্যয় করেছেন, তাদের সকলের প্রতি আমি ধন্যবাদ জানাই। বিশেষ করে তাদের প্রতি, যারা আমাকে তাদের মন্তব্য লিখে পাঠাতে আরেকটু কষ্ট করবেন।
-ড. সালমান আল আওদাহ
টিকাঃ
[১] সুনান তিরমিযি: ২৪৯৯, ইবনু মাজাহ: ৪২৫১
📄 ধন্যবাদ, প্রিয় শত্রু
মানুষের আচরণের সবচেয়ে ঘৃণ্য দিক হলো শত্রুতা জিইয়ে রাখা। দুর্ভাগ্যবশত, মানুষে-মানুষে ঝগড়া লাগানোর রেসিপি খুবই সহজ। শুধু দরকার একটু বোকামি আর অপরিণত সিদ্ধান্ত, সেইসাথে মানবমনের অনুভূতিকে একদমই তোয়াক্কা না করা। এই উপাদানগুলো সঠিক পরিমাণে মেশালেই আপনি পেয়ে যাবেন পরস্পরের সাথে ঝগড়া আর গালিগালাজে লিপ্ত কিছু ঘৃণাজীবী মানুষ।
নিজের অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি যে, তর্ক করতে তেড়ে আসা লোকদের সাথে ধৈর্যধারণ ও সৌজন্য প্রদর্শনের অনেক সুফল রয়েছে। এদের উপর কুরআনে বর্ণিত ঔষধ প্রয়োগ করতে হয়—উত্তম কথা দিয়ে জবাব দেওয়া।
ادْفَعْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ فَإِذَا الَّذِي بَيْنَكَ وَبَيْنَهُ عَدَاوَةٌ كَأَنَّهُ وَلِيٌّ حَمِيمٌ ﴿٣٤﴾
"মন্দকে প্রতিহত করো উত্তমের মাধ্যমে। তাহলে দেখবে তোমার সাথে যার শত্রুতা রয়েছে, সে তোমার অন্তরঙ্গ বন্ধু হয়ে যাবে।” (সূরাহ ফুসসিলাত ৪১:৩৪)
কেউ আমাকে ঘৃণা করে বলে আমি তার প্রতি রাগ পুষে রাখতে পারি না। এই মানুষগুলো তো আমার জীবনেরই অংশ। দুনিয়ার জীবনে কোনো সাফল্য পেতে ও কাজের কাজ কিছু করতে হলে এই মানুষগুলোকে সহ্য করার সামর্থ্য থাকা চাই। এটিই প্রজ্ঞাময় আল্লাহর বিধান।
আমি বরং বলি, ধন্যবাদ, হে আমার শত্রুগণ!
আপনারাই আমাকে শিখিয়েছেন বিব্রত না হয়েই কীভাবে সমালোচনা শুনতে হয়, তা যতই আঘাত দিক না কেন। চরমতম অপমান আর নিরুৎসাহমূলক কথা শোনার পরও কী করে নির্দ্বিধায় এগিয়ে যেতে হয়, তাও আপনারাই শিখিয়েছেন।
জীবনের এই অতি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাটি কোনো বই পড়ে শেখা সম্ভব নয়। আল্লাহ আমাকে যেসব অভিজ্ঞতার মুখোমুখি করান, সেগুলো সহ্য করার মাধ্যমেই তা শেখা যায়। প্রথমে অনেক ব্যথা-বেদনা হয়, কিন্তু তা মেনে নেয়া লাগে।
ধন্যবাদ, হে আমার শত্রুগণ!
আপনারা আমাকে আত্মনির্ভরশীল করেছেন। চাটুকারিতা থেকে বাঁচিয়েছেন। প্রশংসা আর সমালোচনার এক ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি আমার সামনে তুলে ধরেছেন। আপনাদের কারণেই আমি চাটুকারদের শিকার হওয়া থেকে বেঁচে গিয়েছি। যারা আমার প্রাপ্যের চেয়ে বেশি প্রশংসা করে আর আমার কোনো দোষই দেখতে পায় না—তাদের হাতে আমাকে পড়তে হয়নি। এই ধরনের মানুষেরা আপনাদের বিপরীত। কারণ, আপনারা আমার মধ্যে শুধু দোষই দেখেন আর আমার ভালো কাজকেও খারাপ মনে করেন।
ধন্যবাদ, হে আমার শত্রুগণ!
আপনারা অনেক মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছেন সত্যের পক্ষে মুখ খুলতে। আপনাদের বিষোদগার দেখেই তারা সত্যকে জানতে তৎপর হয়েছে এবং সত্যটা জানার পর তার প্রতিরক্ষায় নেমেছে।
ধন্যবাদ, হে আমার শত্রুগণ!
আপনাদের কাছে ভালো লাগুক বা না লাগুক, আপনারা আমাকে আরো শক্তিশালী, ভারসাম্যপূর্ণ ও চিন্তাশীল মতামত তৈরিতে সাহায্য করেছেন। কেউ কেউ কঠিন উপসংহারে পৌঁছে গিয়ে বাড়াবাড়ি করে ফেলে। আপনাদের কারণেই আমি নিজের মতামত পুনর্বিবেচনা করে তা সংশোধন ও উন্নয়নে সচেষ্ট হই।
শত্রু ভাইয়েরা আমার, আমি আপনাদের সাথে তর্ক করা পরিহার করেছি দেখে রাগ করবেন না। মানুষ নিজের মতের পক্ষে তর্ক করতে খুব বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়লে তা আর পুনর্বিবেচনার সময় পায় না। সে তখন উত্তেজিত হয়ে প্রতিপক্ষের দাঁতভাঙা জবাব দেওয়ার পেছনে সব চেষ্টা ঢেলে দেয়। কোনো গঠনমূলক চিন্তা করতে পারার মানসিক শক্তি হারিয়ে ফেলে। সবচেয়ে খারাপ ব্যাপার কী জানেন? সে প্রতিপক্ষের মতটি ঠাণ্ডা মাথায় বোঝার চেষ্টা করে না। অথচ সেটাও সঠিক হবার সম্ভাবনা ছিল।
হাতিম আল-আসসাম (রহিমাহুল্লাহ) একবার বলেছেন, “তিনটি গুণ আমাকে বিতর্কের সময় সাহায্য করে।
১) আমার প্রতিপক্ষ সঠিক প্রমাণিত হলে আমার কাছে ভালো লাগে।
২) সে যখন ভুল প্রমাণিয় হয়, তখন তার জন্য আমার দুঃখ লাগে।
৩) আর আমি সবসময়ই আমার জিহ্বাকে নিয়ন্ত্রণে রাখি, যাতে তাকে অপমান করে না বসি।”[২]
ধন্যবাদ, হে আমার শত্রুগণ!
আপনারাই আমার প্রত্যয় দৃঢ় করেছেন, আমাকে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি করেছেন, আমাকে বেড়ে ওঠার সুযোগ দিয়েছেন, আর আমার দক্ষতার পরিচর্যা করেছেন। আমি নিজের প্রতি কঠোরতর হতে শিখেছি, আচরণ সংযত করতে শিখেছি, আত্মোন্নয়নে আগ্রহী হয়েছি। আল্লাহ আমাদের যেই গন্তব্যের দিকে ডাকেন, সেই জান্নাতে যাবার জন্য প্রতিযোগিতা করতে শিখেছি।
وَفِي ذَلِكَ فَلْيَتَنَافَسِ الْمُتَنَافِسُونَ "অতএব, প্রতিযোগীরা এর জন্য প্রতিযোগিতা করুক।” (সূরাহ আল- মুতাফিফীন ৮৩:২৬)
এই প্রতিযোগিতার মহত্ত্ব নির্ভর করে অংশগ্রহণের পদ্ধতি, অগ্রযাত্রার সৌন্দর্য আর লক্ষ্যের বিশুদ্ধতার উপর।
ধন্যবাদ, হে আমার শত্রুগণ!
আপনারা আমাকে ধৈর্য ও ক্ষমাশীলতা শিখিয়েছেন। কঠোর আচরণের জবাবে দয়া দেখাতে শিখিয়েছেন। এসব গুণ শুধু নেক আমলের বিনিময়ে অর্জন করা যায় না। বরং ধৈর্য, আত্মসংযম, সহনশীলতা, মহানুভবতা ও ক্ষমাপ্রদর্শনের মাধ্যমে অর্জন করতে হয়।
শত্রু ভাইয়েরা, বুঝতে পারছি আমার এই কথাগুলো আপনাদের রাগ আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে। কিন্তু সেটা আমার উদ্দেশ্য নয়। আমি মন থেকেই বলছি, আপনারাই আমার সত্যিকারের বন্ধু। মতপার্থক্য সত্ত্বেও আপনারাও আমার মতোই মানুষ, তার উপর আমার মুসলিম ভাই। যেসব বিষয়ে আমরা একমত, সেগুলোর তুলনায় মতপার্থক্যপূর্ণ বিষয়ের সংখ্যা নগণ্য।
আমি আপনাদের প্রতি বিদ্বেষবশত শত্রু বলে সম্বোধন করছি না। বরং আপনারা আমার শত্রু পরিচয়ে পরিচিত হতে চান বলেই এই সম্বোধন করছি। আমি তো আপনাদের বন্ধুই মনে করি, তা আপনি আমার প্রতি সন্তুষ্টই হোন বা অসন্তুষ্ট।
হে আমার শত্রুগণ, আপনাদের জানাই ধন্যবাদ এবং সালাম।
টিকাঃ
[২] আবু নুয়াইম, আল-হুলইয়াহ: ৮/৮২, তারিখে বাগদাদ: ৮/২৪২
📄 “বাহাসে নামেন না কেন?”
অনেকেই আমাকে জিজ্ঞেস করেছেন যে, আমি বিরোধীদের জবাব দিই না কেন। তারা যেখানে ভুল করছেন, সেগুলো প্রমাণসহ তুলে ধরে খণ্ডন কেন করছি না? আমি কি তাদের অবজ্ঞা করছি? তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করছি?
মোটেই না! কিছু ক্ষেত্রে নিজের মতের পক্ষে বাহাসে না নামাটাই উত্তম সিদ্ধান্ত। এর বেশ কিছু কারণ রয়েছে:
১। কয়েকটি কাজে একসাথে ব্যস্ত থাকলে বারবার কাজ থামিয়ে মানুষের কথা শোনা কষ্টকর। প্রথমত, তাদের সব আপত্তিগুলো ভালোভাবে জানতে হয়। এরপর প্রত্যেকটি ধরে ধরে উত্তর দিতে হয়। যদি অন্যান্য কাজ ও প্রকল্পে ব্যস্ত থাকেন, তাহলে মানুষের সাথে বিতর্ক করার চেয়ে অনেক দরকারি কাজ আপনার হাতে আছে।
২। মতবিরোধকারীদের জবাব দেওয়ার ক্ষেত্রে কখনোই তাড়াহুড়া করা উচিত নয়। তাড়াহুড়া করতে গেলে আপনি অতিআবেগী হয়ে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে চাইবেন। অথচ বিষয়টি তার গুরুত্ব অনুপাতে সময় ও মনোযোগ পাওয়ার দাবি রাখে।
এছাড়াও সমস্যাটিকে দূর থেকে ভালোভাবে দেখার জন্য আপনাকে সময় নিতে হবে। তাহলে আপনি মানুষের আপত্তিগুলোকে নিরপেক্ষভাবে দেখতে পারবেন। মানুষের কথার প্রতি যেনতেনভাবে একটা প্রতিক্রিয়া দেখালেই তো হলো না। এভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাতে গিয়ে মুখ ফসকে আপনিও হয়তো অসত্য কিছু বলে বসবেন।
সমালোচকদের তাড়াহুড়া করে জবাব দিতে গেলে আপনি তাদের বক্তব্যের মধ্যকার সত্যটি দেখতে পাবেন না। তাদের কথাই যে সঠিক, তা না। কিন্তু তাদের মূল বক্তব্য যদি ভুলও হয়, সেখানেও তো কিছু যৌক্তিক সমালোচনা থাকতে পারে যা আপনি আগে খেয়াল করেননি। বিশেষত প্রতিপক্ষ কঠোর ভাষা ব্যবহার ও ব্যক্তিগত আক্রমণ করলে সেই যৌক্তিক অংশগুলো আলাদা করতে পারা আরো কঠিন হয়ে যায়।
যেহেতু “জ্ঞানই মুমিনের গন্তব্য", সেহেতু সত্য থেকে আপনি উপকৃতই হবেন। সেই সত্য যার কাছ থেকেই আসুক, যেখান থেকেই আসুক। নবি সুলাইমান আলাইহিসসালামকে সামান্য এক হুদহুদ পাখি বলেছিল, أَحَطْتُ بِمَا لَمْ تُحِطْ بِهِ وَجِئْتُكَ مِن سَبَإٍ بِنَبَإٍ يَقِينٍ ﴿٢٢﴾
"আমি এমন বিষয় জেনেছি, যা আপনি জানেন না। আর আমি আপনার কাছে এসেছি সাবা থেকে সুনিশ্চিত সংবাদ নিয়ে।” (সূরাহ আন-নামল ২৭:২২)
৩। সব ব্যাপারেই ইজমা প্রতিষ্ঠিত হতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। সবার সবকিছুতে একমত হওয়া জরুরি নয়। আলাহ তাআলা কুরআনে বলেন, وَلَا يَزَالُونَ مُخْتَلِفِينَ ﴿۱۱۸﴾ إِلَّا مَن رَّحِمَ رَبُّكَ
“তারা মতপার্থক্য করা থামাবে না; তারা ব্যতিক্রম, যাদের উপর আল্লাহ তাঁর অনুগ্রহ বর্ষিত করেছেন।” (সূরাহ হৃদ ১১:১১৮-১১৯)
আমাদের এই পার্থিব জীবনের অপরিহার্য অংশ হলো মতপার্থক্য। এমনকি দুজন নবি দাউদ আলাইহিসসালাম ও সুলাইমান আলাইহিসসালাম নিজেদের মাঝে মতভেদ করেছেন। রাসূল (ﷺ) এর নিকটতম দুই সাহাবি আবু বকর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু ও উমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর মাঝেও মতভেদ হয়েছে। হয়েছে ইসলামের প্রখ্যাত আলিমগণের মাঝেও।
কোনো ব্যাপার চিরতরে অমীমাংসিত থেকে যাওয়া দোষের কিছু নয়। আপনার অধিকার আছে একটি মত পোষণের, আরেকজনের অধিকার আছে আরেকটি মত পোষণের। প্রতিটি মতভেদ নিয়েই সুদীর্ঘ বাহাস আয়োজন করার কি কোনো দরকার আছে, যেখানে এক পক্ষকে শেষমেশ ভুল স্বীকার করতেই হবে? এ তো কেবল সময়ের অপচয়!
সাধারণত যা হয়, কিছু ব্যাপারে আপনার বক্তব্য ঠিক আর কিছু ব্যাপারে আপনার প্রতিপক্ষের বক্তব্য ঠিক। মানুষ একটা বিষয়কে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে। সময় নিয়ে ঠাণ্ডা মাথায় বিবেচনা করলে একসময় সম্পূর্ণ চিত্রটি নজরে আসে।
৪। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এমনটা ঘটে যে, আপনি আপনার সমালোচকের কথার জবাব দিলেন, এরপর সমালোচক আবার আপনার বক্তব্যের খণ্ডন নিয়ে হাজির হয়। হতে পারে আপনার সমালোচকের হাতে এই বিষয়ের জন্য আপনার চেয়ে বেশি সময় আছে। এখন আপনি কি আপনার মূল্যবান সময় ও শ্রম ব্যয় করে বিতর্ক চালিয়ে যাবেন, না মাঝপথে এমনভাবে থেমে যাবেন যে-দেখে মনে হয় আপনি হার মেনে নিয়েছেন? প্রথমবারেই এই জবাব-পাল্টা জবাব পরিহার করলে আর এই ঝামেলায় পড়া লাগত না।
৫। এ ব্যাপারে আমরা সবাই একমত যে, নিজের ভুল বুঝতে পারার পর প্রথম সুযোগেই তা স্বীকার করে নিয়ে সত্যের ঘোষণা দেওয়া উচিত। ভুল স্বীকার করলে সুবিবেচক লোকদের কাছে আপনার মর্যাদা বাড়বে বৈ কমবে না। তারা আপনাকে এর জন্য আরো বেশি সম্মান করবেন।
এ কারণেই আমার সমালোচক ও নিন্দুকদের ততটাই সম্মান করি, যতটা করি আমার সমমনাদের। এমনকি যারা কর্কশ ভাষায় সমালোচনা করে, তাদের ব্যাপারেও আমার অবস্থান এটাই। আমি বুঝতে পারছি যে, তারা সত্যের সন্ধানেই এত তৎপর হয়েছেন। আর তাদের সমালোচনার ফলে আমার জ্ঞানও সমৃদ্ধ হয়। তাদের আচরণ যদি ভালো না-ও হয়, তারা আমার কৃতজ্ঞতা লাভের দাবিদার। তাদের মুখ আর কলমের ধার যত বেশিই হোক, শেষমেশ তাদের পর্যবেক্ষণ থেকে আমিই লাভবান হই। কাজেই আমার সত্যিই উপকৃত হওয়ার ইচ্ছে থাকলে কর্কশভাষী সমালোচকদের প্রতিও আমায় ধৈর্যশীল হতে হবে।
কিছু বিষয়ে অনেকগুলো মত থাকে, যেগুলোর প্রতিটির স্বপক্ষেই প্রমাণ ও যুক্তি আছে। ইসলামি শরিয়তের অনেক বিষয়ই এরকম। এগুলো আলোচনা করার মতো মানুষ যতদিন থাকবে, ততদিন এ নিয়ে মতভেদ থাকবে। এগুলো আসলে সুস্থ ধারার মতপার্থক্য এবং মানুষের তো মতভেদ করার অধিকার থাকা উচিত। কিন্তু এই মতভেদগুলোকে যেন তারা নিজেদের মধ্যে মনোমালিন্য ও প্রতিহিংসা তৈরির মাধ্যম না হতে দেন।
আমাদের উচিত নবিজি (ﷺ)-এর এই দু'আ নিয়ে চিন্তাভাবনা করা।
اللَّهُمَّ رَبَّ جِبْرَائِيلَ وَمِيكَائِيلَ وَإِسْرَافِيلَ فَاطِرَ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ عَالِمَ الْغَيْبِ وَالشَّهَادَةِ أَنْتَ تَحْكُمُ بَيْنَ عِبَادِكَ فِيمَا كَانُوا فِيهِ يَخْتَلِفُونَ اهْدِنِي لِمَا اخْتُلِفَ فِيهِ مِنَ الْحَقِّ بِإِذْنِكَ إِنَّكَ تَهْدِي مَنْ تَشَاءُ إِلَى صِرَاطٍ مُسْتَقِيمٍ
“হে জিবরাইলের রব, মিকাইলের রব, ইসরাফিলের রব! হে আসমান ও জমিনের স্রষ্টা! হে দৃশ্য ও অদৃশ্যের জ্ঞানী! আপনার বান্দারা যা নিয়ে মতভেদ করে, আপনি তাদের মধ্যে সে ব্যাপারে ফায়সালা করে দেবেন। সত্য ও ন্যায়ের যেসব বিষয়ে মতানৈক্য পোষণ করা হয়েছে সে বিষয়ে আপনি আমাকে পথ দেখান। আপনি যাকে ইচ্ছে করেন, তাকেই সরল পথে দেখান।” [৩]
টিকাঃ
[৩] সহিহ মুসলিম: ৭৭0
📄 ধন্যবাদ, হে আবু বকর ও উমর!
মানুষ যতটা সৎ ও নিরপেক্ষ থাকবে, কর্কশ ও অবিবেচনাপ্রসূত কথা বলা থেকে বিরত থাকবে—অন্যের আক্রমণের শিকার হওয়া থেকে সে ততটা নিরাপদ থাকবে বলেই আপাতদৃষ্টে মনে হয়। কারণ তখন তো তার সাথে মতভেদ হওয়ার সম্ভাবনাই অনেকখানি কমে আসে।
আমার মনে হয় একটি সীমিত পরিসরে এ কথাটা খুবই প্রযোজ্য। আমাদের সালাফদের কেউ কেউ বলেছেন, "যার অন্তর পরিশুদ্ধ, সে তত উদারভাবে কথা বলতে জানে।"
রাসূল (ﷺ) বলেছেন, “মানুষের সাথে একজন মুমিন মানিয়ে চলে। এমন মানুষের মাঝে কোনো কল্যাণ নেই, যে নিজেও মানুষের সাথে মানিয়ে চলার চেষ্টা করে না আর অন্যদেরও তার সাথে মানিয়ে চলতে দেয় না।” [৪]
কিন্তু তারপরও এটাও সত্যি যে, একজন মানুষ বিখ্যাত বা সফল হয়ে গেলে অবশ্যই আগের চেয়ে বেশি শত্রুতার সম্মুখীন হবে। কারণ তখন তার ব্যাপারে মাথা ঘামানো লোকের সংখ্যা বেড়ে যাবে। কেউ তার সমমনা, কেউ বিপরীত মতাদর্শী। কেউ থাকবে সন্দেহপোষণকারী আর অভিযোগকারী। খ্যাতি যত বাড়বে, পরিচিতির এই বৃত্তের পরিধিও ততই বাড়বে। নবি-রাসূল আলাইহিমুসসালাম সহ বৈশ্বিক নেতৃবৃন্দ বা ঐতিহাসিক ব্যক্তিবর্গের ক্ষেত্রে এই বৃত্তের ভেতর গোটা পৃথিবীই চলে আসতে পারে।
ইসলামের সবচেয়ে বিখ্যাত ব্যক্তিদের মধ্যে দুজনের কথাই ধরুন। আবু বকর এবং উমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমা। তাঁদের চেয়ে বেশি ইখলাস ও দৃঢ় ঈমানের দৃষ্টান্ত খুঁজেই পাবেন না। আবু বকর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর ব্যাপারে বলা হয়েছে, “আবু বকর সাওম বা সালাতের সংখ্যা দিয়ে তোমাদের চেয়ে অগ্রসর নন, বরং অন্তরের গহীনের একটি বিষয়ের (একাগ্রতা, ইখলাস) কারণে তিনি তোমাদের চেয়ে অগ্রসর।” [৫]
রাসূল (ﷺ) একবার স্বপ্নে দেখলেন উমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর পরনের কাপড় দৈর্ঘ্যের কারণে মাটিতে ছেঁচড়াচ্ছে। আরেকবার দেখলেন তিনি নিজে একটি পাত্র থেকে দুধ খাওয়ার পর বাকি দুধটুকু উমর পান করছেন। নবিজি (ﷺ) এর অর্থ বলেছেন যে, উমরের মাঝে ইলম ও ঈমানের গুণাবলি রয়েছে। [৬]
রাসূল (ﷺ)-এর জীবদ্দশায় তাঁর নিকটতম দুজন মানুষ ছিলেন আবু বকর ও উমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমা। নবিজির কবরের পাশেই কবরস্থ হওয়ার সৌভাগ্যও আল্লাহ তাঁদের দিয়েছেন। নিঃসন্দেহে সব সাহাবির মধ্য থেকে এ দুজনই ছিলেন অন্তরঙ্গতম বন্ধু। তাঁদের মহান শিক্ষক ও প্রশিক্ষকের সাথে তাঁদের ঘনিষ্ঠতা এক অনস্বীকার্য ঐতিহাসিক বাস্তবতা।
তাঁদের জীবনী পড়তে গেলে আমরা অবাক হয়ে দেখি তাঁরা কত নিঃস্বার্থভাবে নিজেদের সম্পদ, জ্ঞান, প্রভাবশালিতা ও শক্তি দিয়ে পরোপকার করেছেন। বাহ্যিক কোনো প্রতিদান ছাড়াই তাঁরা অন্যের উপকার করে গেছেন। শুধু তা-ই না, তাঁদের সাথে অসদাচরণকারীদের ক্ষমা করতেও তাঁরা কার্পণ্য করতেন না।
এই সবকিছুর পরও তাঁরা শত্রুতা থেকে রেহাই পাননি। তাঁদের প্রতি বিষোদগারকারীদের কথাগুলো এতই জঘন্য যে, শুনে হতবাক হয়ে যেতে হয়। আসলে আখিরাতে এই দুজনের জন্য আল্লাহ যে মহান প্রতিদান রেখেছেন, তার তুলনায় দুনিয়ার এতসব শত্রুতা তুচ্ছ হয়ে যায়। আমরা যারা এসব পার্থিব পরীক্ষার সম্মুখীন হইনি, তারা ধৈর্যশীলদের আখিরাতের প্রতিদান দেখতে পেলে ভাবতাম, "ইশ! আমরাও যদি এসব পরীক্ষায় আপতিত হতাম!”
শ্রেষ্ঠতম মানব রাসূল (ﷺ) ও তাঁর নিকটতম সহচর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমদের চরিত্র হননের বৃথা চেষ্টা করে যারা বই লিখে ও প্রচার করে, তাদের দেখে আমাদের একটি বিষয় শেখার আছে। আল্লাহ যাদের অনুগ্রহ করেন, যাদের উপর সবচেয়ে বেশি দয়া করেন, তাঁদের মৃত্যুর পরও তাঁদের প্রতি মিথ্যে অপবাদ আরোপ করা জারি থাকে। এভাবেই আল্লাহ তাঁদের আমলনামা ভারি করতে থাকেন এবং পাপমোচন করে দেন। যদিও আমরা কখনোই আবু বকর ও উমরের পর্যায়ে যেতে পারব না, তবুও যারা সৎভাবে জীবনযাপন করতে ইচ্ছুক, তাদের জন্য এর মাঝে শিক্ষা রয়েছে। জীবন চলার এই বিশাল শিক্ষাটি দেবার জন্য আমাদের উচিত এই দুজনের প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তাঁদের শ্রেষ্ঠতম পুরস্কারে পুরস্কৃত করুন।
সবচেয়ে নিষ্পাপ ও সুখ্যাত ব্যক্তিবর্গও অপবাদের শিকার হন কেন? নিশ্চয় এর পেছনে কোনো উদ্দেশ্য আছে, মতভেদের কোনো বিষয় আছে। মানুষ যখন নিজের মতের ব্যাপারে অন্ধ ও উগ্র হয়ে ওঠে, তারা তখন মানুষকে প্রান্তিকভাবে বিচার করতে থাকে। এই অন্ধরা পৃথিবীকে দুই ভাগে ভাগ করে দেখে। এক অংশ তাদের সমমনা, যারা মানবরূপী ফেরেশতা এবং কোনো ভুল করতে পারে না। আরেক অংশ তাদের সাথে মতভেদকারী, গুণবিহীন মানবরূপী শয়তান। তৃতীয় কোনো পথ নেই। কুসংস্কারাচ্ছন্ন অজ্ঞ লোকেরা পৃথিবীকে এভাবেই দেখে।
এ কারণেই বলা হয় কষ্ট-ক্লেশের মাধ্যমেই ঈমানের আসল পরীক্ষা হয়। এখানেই সত্যিকারের মহানুভবতা, প্রজ্ঞা, উদারতা ও সদাচরণ প্রকাশ পায়। আর সকলেরই যখন মানসিকতা একই রকম হয়, সেক্ষেত্রে আন্তরিক ও ভদ্র হতে কোনো সমস্যা নেই। আবু বকর আর উমর আমাদের দেখিয়েছেন কীভাবে অসদাচারণকারীদের ঊর্ধ্বে থাকতে হয়। তাঁরা আমাদের শিখিয়েছেন কী করে গালমন্দকারীদের উপেক্ষা করে শ্রেষ্ঠ মানুষদের অন্তর্ভুক্ত হতে হয়, অন্যের ছিদ্রান্বেষণ বাদ দিয়ে কীভাবে নিজের ত্রুটি-বিচ্যুতি সংশোধনে মনোযোগী হতে হয়।
টিকাঃ
[৪] মুসনাদ আহমাদ: ৯১৯৮, মুস্তাদরাক আল-হাকিম: ১/২৩
[৫] আহমাদ বিন হাম্বল, ফাযায়িলুস সাহাবাহ: ১১৮, আবু দাউদ, আয-যুহদ: ৩৭
[৬] সহিহ আল-বুখারি: ৮১, ৩৬৯১, সহিহ মুসলিম: ২৩৯০, ২৩৯১