📄 সমস্যা ভুলে কাজে লেগে যাও
যখন তুমি সমস্যা সমাধানের জন্য যাকিছু করার করে ফেলেছ, তখন তুমি কোন প্রিয় ব্যস্ততায় লিপ্ত হয়ে যাও। কিতাবের অধ্যয়ন অথবা অন্যকোন কাজে লেগে যাও। মোটকথা, তুমি নিজেকে খুব ব্যস্ত রাখো। কেননা, ব্যস্ততা পেরেশানীর জায়গা দখল করে ফেলবে। 'আল্লাহ কারও দেহে দুটি হৃদয় রাখেননি।' [৩৩:০৪] জেনে রাখা দরকার যে, পেরেশানী হচ্ছে শিশুর রোগের মত। পিতামাতা উপযুক্ত চিকিৎসা দিয়ে দেন, এরপর অবশিষ্ট সময় কোন জরুরী কাজে লিপ্ত থাকেন।
মানুষের জন্য উত্তম এটাই যে, যখন সে বর্তমানের কোন পেরেশানীতে পড়বে, তখন অতীতের বড় কোন পেরেশানীর কথা স্মরণ করবে। যখন চিন্তা করবে যে, অতীতেও এমন পেরেশানী দেখা দিয়েছিল। বিশেষত বড় কোন সমস্যা, যা বর্তমান সমস্যার চেয়ে বড় ও মারাত্মক ছিল। সে সময় আল্লাহ কীভাবে সমস্যার সমাধান করে দিয়েছেন? বিগত সমস্যার কথা মনে করলে ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠবে এবং অন্তরে স্বস্তি অনুভূত হবে। মানুষ যখন এভাবে অতীতের সমস্যার কথা স্মরণ করে, তখন তার কাছে অনুভূত হয় যে, আজকের সমস্যা বিগত দিনের সমস্যার মতই, যা সে আল্লাহ-র ইচ্ছায় সমাধান করে নিয়েছিল। সুতরাং বর্তমান সমস্যাও ইনশা আল্লাহ একইভাবে সমাধান হয়ে যাবে এবং অতিবাহিত হয়ে যাবে।
সমস্যার ইতিবাচক দিক অনুসন্ধান করা বাঞ্ছনীয়। এটা নিশ্চিত বিষয় যে, ইতিবাচক চিন্তার বিপরীতে নেতিবাচক ফিকির অনেক কষ্টদায়ক হয়ে থাকে। আল্লামা ইবনে জাওযী রহমাতুল্লাহি আলাইহ এই প্রসঙ্গে অত্যন্ত হেকমতপূর্ণ মন্তব্য পেশ করেছেন। তিনি বলেন, যেকেউ যখন কোন বিপদে আক্রান্ত হবে, সে এর চেয়েও খারাপ পরিস্থিতির কথা স্মরণ করবে এবং বিপদের উপর প্রাপ্য সওয়াব ও প্রতিদানের কথা চিন্তা করবে। এরপর এটাও লক্ষ করবে যে, দুনিয়াতে তার চেয়েও বড় বিপদে আক্রান্ত লোকজন আছে, যাদের বিপদের মোকাবেলায় তার বিপদ কিছুই না। এসব ভাবার পর তার কাছে মনে হবে, তার বিপদ একেবারেই সামান্য এবং আল্লাহ-র মেহেরবানী যে, তিনি অনেক বড় বিপদ দেননি। এমন ফিকির তাকে পেরেশানীর অনুভূতি থেকে মুক্তি দিবে। মানুষকে যদি এভাবে বিপদ ও পরীক্ষায় না ফেলা হয়, তা হলে সে আরাম-আয়েশ ও স্বস্তির মর্যাদা ও মূল্য উপলব্ধি করবে না।
যে কথা বলিনি, সেটা নিয়ে অনুতপ্ত হওয়ার প্রয়োজন হয়নি। যা বলেছি, তার বেশিরভাগ নিয়ে অনুতপ্ত হতে হয়েছে।
📄 সুখের কিছু সূত্র
উচ্চাশা ও লোভ দুটি মারাত্মক ব্যধি, এগুলোর চিকিৎসা নিম্নরূপ-
০১. জীবনযাপনে মধ্যপন্থা ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে ভারসাম্য। কেননা, যার খরচ সীমা ছাড়িয়ে যায়, সে অল্পে সন্তুষ্ট হতে পারে না। সে বাধ্যতামূলকভাবে লোভ-লালসায় লিপ্ত হয়ে যায়। জীবনযাপনে মধ্যপন্থাই হচ্ছে অল্পেতুষ্টির মূল চাবি। বলা হয়ে থাকে, সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা হচ্ছে জীবিকার অর্ধেক।
০২. ভবিষ্যৎচিন্তায় অধিক পেরেশান হওয়া নিষ্প্রয়োজন। আশা-আকাঙ্ক্ষার মহলের উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখো। বিশ্বাস করো যে, যতটুকু রিযিক তোমার ভাগ্যে আছে, সেটুকু তোমার কাছে অবশ্যই পৌঁছবে।
০৩. আল্লাহকে ভয় করো। কেননা, আল্লাহ তাআলা ওয়াদা করেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করবে, তিনি তার জন্য সমস্যা থেকে বের হওয়ার রাস্তা করে দিবেন এবং তিনি এমনভাবে রিযিক দিবেন, যা সে কল্পনাও করেনি। [৬৫:২-৩]
০৪. একথা চিন্তা করো যে, অল্পেতুষ্টির মধ্যে অমুখাপেক্ষিতার সম্মান রয়েছে; আর উচ্চাশা ও লোভের মধ্যে রয়েছে অপমান ও লাঞ্ছনা। এগুলো থেকে সবক হাসিল করো।
০৫. বেশি বেশি নবী-রসুল ও বুযুর্গদের জীবনের প্রতি লক্ষ করো। তাঁদের মত অল্পেতুষ্টি, বিনয় ও সহজ জীবন অবলম্বনের চেষ্টা করো। দেখো, তাঁরা কীভাবে নেক কাজের আগ্রহ লালন করতেন। তাঁদের আদর্শের প্রতি নজর দাও এবং তাদের জীবনকে আলোকবর্তিকা বানাও।
০৬. দুনিয়ার বিচারে যারা তোমার চেয়ে নিম্নস্তরের, তাদের দিকে লক্ষ করো।
বিবেকবান মানুষ হেকমতের কথাবার্তা থেকে ফায়দা নিতে চেষ্টা করে, কখনও নিরাশ হয় না এবং কখনও ভাবনা ও চেষ্টা বাদ দেয় না।
📄 আল্লাহর রশি ধরো, চাই অন্য রশি ছিঁড়ে যাক
ঈমানের সাথে আমলে সালেহ'র প্রতিদান হচ্ছে দুনিয়াতে পরিচ্ছন্ন জীবন। এখানে এই আলোচনা অপ্রাসঙ্গিক যে, এই জীবনে আসবাবপত্র, অঢেল সম্পদ, আরাম-আয়েশ পরিপূর্ণ থাকবে কি না। কেননা, এগুলো ছাড়াও একটি জীবন সুন্দর হতে পারে।
তবে জীবনে মালদৌলতের প্রাচুর্য ছাড়া আরও অনেক জিনিসের প্রয়োজন হয়। সেগুলো যদি না পাওয়া যায়, তা হলে একটি সুন্দর জীবন কল্পনা করা যায় না। সেগুলোর মধ্য থেকে অতীব গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি হচ্ছে এই-
আল্লাহ ﷻ-র সাথে সম্পর্ক, তাঁর উপর নির্ভরশীলতা এবং তাঁর প্রতিপালন ও সন্তুষ্টির উপর স্বস্তি।
সুস্থতা, স্থিরতা, সন্তুষ্টি, বরকত, নিরাপদ ঘর ও আত্মিক স্বস্তি।
নেক আমলের কারণে আনন্দ এবং অন্তর ও জীবনের উপর এর যথার্থ আধিপত্য।
সম্পদ শুধু একটি উপকরণ। এ যদি কমও হয়, তা হলেও যথেষ্ট হতে পারে। কেননা, তা হলে দিল এমনসব বিষয়ের মধ্যে নিবদ্ধ থাকবে, যেগুলো মালের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ এবং আল্লাহ্ -র দৃষ্টিতে খালেস ও চিরস্থায়ী।
একথা সর্বজন স্বীকৃত যে, মহান ব্যক্তিবর্গ যার যার মায়ের কাছ থেকে মহত্ত্বের নকশা উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করেন।
📄 ঈমানদারের চেয়ে ভাগ্যবান আর কেউ নেই
আমি অনেক ধনী এবং পদ-পদবীর বিচারে বড় মানুষের জীবনী অধ্যয়ন করেছি, যারা আল্লাহ-র উপর ঈমান রাখত না। আমি দেখেছি, তাদের জীবনের সমাপ্তি ঘটেছে দুর্ভাগ্যের সাথে। তাদের ভবিষ্যৎ অভিশপ্ত এবং দুনিয়াতে তাদের জন্য অপমান ও লাঞ্ছনা ছাড়া আর কিছু ছিল না। এখন তারা কোথায়? এখন তাদের ভাণ্ডার আর সম্পদের স্তূপ কোথায়, যেগুলো তারা সঞ্চয় করত? তাদের প্রাসাদ আর গগণচুম্বি ভবন কোথায়, যেগুলো তারা নির্মাণ করেছিল? সবকিছু খতম হয়ে গেছে। তাদের মধ্য থেকে কেউ কেউ আত্মহত্যা করেছে। কেউ কেউ বন্দী হয়েছিল এবং অনেককে গ্রেফতার করে আদালতে হাযির করা হয়েছিল, যেখানে তাদের অন্যায়ের বিপরীতে শাস্তির আদেশ শোনানো হয়েছে। তারা সমকালীন যামানায় একেবারে হতভাগা সাব্যস্ত হয়েছে। অথচ তারা ভেবেছিল, সম্পদ দিয়েই তারা প্রকৃত মহব্বত, সুস্থতা ও যৌবনসহ সবকিছু হাসিল করে ফেলবে। কিন্তু শেষে তারা এই পরিণতিতে পৌঁছে যে, দৌলতের সাহায্যে প্রকৃত মহব্বত হাসিল করা যায় না; প্রকৃত সুখও হাসিল করা যায় না; প্রকৃত সুস্থতাও হাসিল করা যায় না এবং যৌবনও ফিরিয়ে আনা যায় না। দুনিয়ার সমস্ত সম্পদ দিয়েও একটি হৃদয় খরিদ করা যায় না; অন্তরে মহব্বতও জাগানো যায় না এবং সুখও পয়দা করা যায় না।
আল্লাহ -এর উপর ঈমান আনায়নকারীদের চেয়ে অধিক খোশনসিব আর কেউ নেই। কেননা, ঈমানদারগণ রবের পক্ষ থেকে হেদায়েতের নুর লাভ করে এবং তারা নিজের সঙ্গে হিসাবনিকাশ করে। তারা সেইসব কাজই করে, যেগুলো আল্লাহ করতে হুকুম করেছেন এবং সেইসব কাজ থেকে বিরত থাকে, যেগুলো আল্লাহ হারাম করেছেন। শোনো, কুরআন মাজীদ তাদের ব্যাপারে কী বয়ান করেছে-
যে ব্যক্তি নেক আমল করবে, চাই সে পুরুষ হোক অথবা নারী, শর্ত হচ্ছে সে মুমিন, আমি তাদেরকে পরিচ্ছন্ন জীবনযাপন করাব, এবং (আখেরাতে) তাদেরকে তাদের উত্তম আমল মোতাবেক বিনিময় দান করব। [১৬:৯৭]
সে খোশনসিব নয়, যে খোশনসিব হতে চায় না।