📄 সময় নষ্ট কোরো না, দৃষ্টি রাখো বর্তমানের প্রতি
নিজের গালে থাপ্পড় মেরে, নিজের জামা ছিঁড়ে কী লাভ, যদি অতীতে কিছু খোয়া গিয়ে থাকে, অথবা কোনদিন মসিবতের পাহাড় নেমে থাকে? সেই ত্রুটিটা কী, যা তোমার অনুভূতি ও ধারণাকে খুব খারাপভাবে আচ্ছন্ন করে রেখেছে, যেই ঘটনা অতীতে ঘটে গেছে, যেটা তোমার দুঃখবেদনা বাড়িয়েছে এবং তোমার অন্তরে দুঃখের আগুন ভরকে যাচ্ছে?
যদি অতীতে ফিরে যাওয়া, যেসব ঘটনা আমরা পছন্দ করি না, সেগুলো বদল করা এবং যেই পন্থায় আমরা জীবনযাপন করতে পছন্দ করি, সেটা অবলম্বন করা সম্ভব হত, তা হলে আমাদের জন্য অতীতে ফিরে যাওয়া আবশ্যক হয়ে পড়ত। আমরা খুব ক্ষিপ্রভাবে অতীতে ফিরে যেতাম এবং যেসব ঘটনায় আমাদের অনুতাপ রয়েছে, সেগুলো মুছে ফেলতাম। তারপর যেসব কাজ সৌভাগ্যের জন্য জরুরী, সেগুলো সংযোজন করে নিতাম। কিন্তু আমরা জানি, কাজটি অসম্ভব বিষয়াদির অন্তর্ভুক্ত। কাজেই আমাদের জন্য মোনাসিব ও উত্তম হচ্ছে এই যে, আমরা কীভাবে জীবনকে সুন্দর করতে পারি, সেদিকে সমস্ত মনোযোগ নিবদ্ধ করা। কেননা, হারানো বিষয়ের ক্ষতিপুরণের এই একটিই পন্থা।
এটাই সেই গুরুত্বপূর্ণ হেকমত, যার দিকে কুরআন মাজীদে উহুদ যুদ্ধের পর আকৃষ্ট করা হয়েছে, যখন লোকজন নিহতদের জন্য অশ্রুপাত করছিল এবং উহুদের ময়দানে পিছপা হওয়ার কারণে অনুতপ্ত ছিল।
তাদেরকে বলে দাও, যদি তোমরা যার যার ঘরেও অবস্থান করতে, তবুও যাদের মৃত্যু লেখা ছিল, তারা নিজেরাই নিহত হওয়ার স্থানে চলে যেত। [০৩:১৫৪]
বিশ্বাস করো, সৌভাগ্য একটি গোলাপের কলির মত, যা এখনও ফোটেনি; তবে তা অবশ্যই ফুটবে।
📄 বিপদাপদ আসলে নেয়ামতের ভান্ডার
উম্মুল আলা থেকে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, আমি একবার অসুস্থ ছিলাম, তখন রসুলুল্লাহ আমার অবস্থা জানতে এসেছিলেন। তিনি বললেন, হে উম্মুল আলা! তোমার জন্য সুসংবাদ রয়েছে। কেননা, যখন মুসলমান অসুস্থ হয়, তখন আল্লাহ সেই অসুস্থতার মাধ্যমে গুনাহখাতা এমনভাবে দূর করেন, যেমন আগুন চাঁদির খাদ দূর করে দেয়।
এর উদ্দেশ্য এই নয় যে, অসুখ গুনাহখাতা দূর দেয় বলে আমরা রোগব্যধির জীবানু দেহে পালতে থাকব এবং ওষুধ ও চিকিৎসা ছেড়ে দিব। বরং বান্দার জন্য ওয়াজিব হচ্ছে ওষুধ খাওয়া এবং সুস্থতার জন্য দোআ করা। রোগব্যধির কারণে সবর করা এবং এর দুঃখকষ্টের উপর আল্লাহ তাআলার কাছে প্রতিদানের আশা করা স্বতন্ত্র কথা। এটাই সেই শিক্ষা, যা এই মুমিন ও নেককার নারী আমাদেরকে দিয়েছেন।
এমনইভাবে যেকোন প্রিয়জন, স্বামী বা সন্তান কারও মৃত্যুর ঘটনায়ও সবর করে বরদাশত করা একজন মুমিন নারীর জন্য বাঞ্ছনীয়। হাদীসে যেমন বলা হয়েছে, আল্লাহ সেই মুমিন বান্দার জন্য জান্নাতের চেয়ে কম প্রতিদানে সন্তুষ্ট হন না, যে জমীনের উপর নিজের কোন প্রিয়জনের বিচ্ছেদের কারণে সবর করে এবং আল্লাহর কাছে বদলা পাওয়ার আশা করে।
যদি কোন স্ত্রীলোক তাঁর স্বামীকে হারিয়ে ফেলে, তা হলে এর মতলব হচ্ছে আল্লাহ তাঁর বান্দাকে নিজের কাছে ফিরিয়ে নিয়েছেন। আর তিনি কাওকে ফিরিয়ে নেওয়ার সবচেয়ে বড় হকদার। যদি নারী বলতে থাকে, 'হায় আমার স্বামী!' অথবা 'হায় আমার ছেলে!' তা হলে খালেক ও মালেক আল্লাহ বলেন, 'এ তো আমার বান্দা, এবং আমি অন্যদের চেয়ে তার উপর বেশি হক রাখি।'
স্বামী ধারহিসেবে দেওয়া হয়ে থাকে; ছেলেও ধারহিসেবে দেওয়া হয়ে থাকে। একইভাবে ভাই আর বাপও ধারহিসেবে দেওয়া হয়ে থাকে এবং স্ত্রীও ধারহিসেবে দেওয়া হয়ে থাকে।
কারও উপর অপবাদ আরোপ থেকে সেভাবেই আত্মরক্ষা করো, যেভাবে মহামারী থেকে আত্মরক্ষা করা হয়।
📄 দয়া করো, দয়া পাবে
একটি হাদীসে সন্তানের প্রতি মায়ের কেমন মহব্বত থাকে, সেটার স্বচ্ছ ছবি আঁকা হয়েছে। একজন মায়ের অন্তরে আল্লাহ যে মহব্বত, ভালোবাসা, মমতা ও মেহেরবানী সৃষ্টি করেছেন এবং সন্তান প্রতিপালনের সময় যে মহব্বত, মমতা ও মেহেরবানী মায়েরা প্রকাশ করেন, এ হচ্ছে তার একটি উপমা।
বান্দার উপর আল্লাহ -এর যে রহমত ও মেহেরবানী হয়ে থাকে, রসুলুল্লাহ তার একটি তাসবীর পেশ করেছেন। আমীরুল মুমিনীন উমর ইবনে খাত্তাব বর্ণনা করেন যে, কয়েদীহিসেবে গ্রেফতার করে কয়েক জন মহিলাকে নবী -এর সামনে উপস্থিত করা হয়। তাদের মধ্য থেকে এক মহিলা অস্থির হয়ে কী যেন খুঁজছিল। ইতোমধ্যে সে একটি শিশু পেয়ে গেল এবং সে তাকে বুকে চেপে ধরে বুকের দুধ পান করাতে লাগল। তখন রসুলুল্লাহ বললেন, তোমরা কী মনে কর, এই মহিলা তার শিশুকে আগুনে ফেলতে পারে?
আমরা বললাম, না; কক্ষণও নয়।
নবীজী বললেন, এই মহিলা নিজের সন্তানের উপর যে পরিমাণ মেহেরবান, আল্লাহ তাঁর বান্দাদের উপর তার চেয়েও বেশি মেহেরবান।
এ হল একজন কয়েদী নারীর কথা, যে বন্দী হয়ে এসেছিল। পূর্বে সে পারিবারিক বিষয়াদিতে ইচ্ছাধীন ছিল। খান্দানের পুরুষদের হেফাজতে আযাদ ছিল। স্বামীর ঘরে তার নেতৃত্ব চলত। কিন্তু গ্রেফতার হওয়ার কারণে এখন ছিল একজন বাঁদী ও পরাধীনা। সে এমন পরিস্থিতির শিকার হয়েছিল, যখন মানুষ আশপাশে কী হয়, সবকিছু ভুলে যায়। মহিলা কঠিন মানসিক যাতনায় লিপ্ত ছিল; কিন্তু এমন অবস্থায়ও সে নিজের বাচ্চা, কলজের টুকরা ও নয়নমণির দেখাশোনার কথা ভুলতে পারেনি। সে তাকে সর্বত্র খুঁজতে থাকে। একসময় সে তাকে পেয়ে যায় এবং আবেগাচ্ছন্ন হয়ে জড়িয়ে ধরে দুধ পান করাতে শুরু করে। নিজের কলজের টুকরা কোন প্রকারে কষ্টে নিপতিত হোক, তা সে বরদাশত করতে পারেনি। হোক না সেই কষ্ট খুব সামান্য। কষ্ট ছোট বড় কি না, সেই প্রসঙ্গ তার কাছে নেই। জীবন বাজি রেখে সন্তানকে হেফাজত করবে, এটাই হচ্ছে তার মূল কথা।
ভদ্রতা বহির্ভূত ভাষা বক্তার জন্য অনেক সময় বিপদের কারণ হয়, ঠিক ও রকম, যে রকম যখমের কারণে হয়ে থাকে।
📄 দুনিয়া সুন্দর, তবে হতাশদের জন্য নয়
যদি শীতের মৌসুম তোমার ঘরের দরজা বন্ধ করে দিয়ে থাকে এবং বিস্তীর্ণ বরফের সারি সবদিক থেকে তোমার রাস্তা বন্ধ করে দিয়ে থাকে, তা হলে অসুবিধা কী? আগামী বসন্তের দিকে লক্ষ করো এবং তাজা বাতাসে শ্বাস নেওয়ার জন্য জানালা খুলে দাও। দূর দিগন্তের দিকে দৃষ্টিপাত করো এবং উড়ন্ত পাখির ঝাঁকের দিকে নজর করো, যারা আবার তাদের গান জুড়ে দিয়েছে। তুমি দেখতে পাবে, গাছগাছালির ফাঁকফোকর দিয়ে সূর্য তার লাল কিরণ ছড়িয়ে দিয়েছে এবং তোমাকে নতুন জীবনের বার্তা শুনিয়ে যাচ্ছে। রূহ ও হৃদয়কে দিয়ে যাচ্ছে অনন্য সজীবতা। তাতে রয়েছে নতুন স্বপ্নের খুবসুরত তাবীর।
দৃষ্টিনন্দন গাছের সারি দেখার জন্য মরুভূমিতে ঘুরে বেড়িয়ো না। কেননা, সেখানে তুমি বিরানভূমি আর অসহায়ত্ব ছাড়া আর কিছুই পাবে না। চোখের সামনে বিদ্যমান অসংখ্য গাছগাছালির দিকে তাকাও, যেগুলো তোমাকে ছায়া এবং মিষ্টি ও মজাদার ফল দান করে। যেগুলোর ডালে ডালে রংবেরঙের পাখি অপূর্ব সুরে গান গেয়ে মন মাতিয়ে রাখে।
পেছনের দিনগুলোর হিসাব কোরো না যে, তখন কতটুকু লোকসান হয়েছে। কেননা, যখন জীবনের পাতা খসে পড়ে, তখন সেগুলো ফিরে আনা যায় না। তবে প্রত্যেক বসন্তে নতুন মুকুল ও নতুন পাতা বের হয়। দেখো, সেই পাতাগুলোর দিকে, যেগুলো তোমার ও আসমানের মধ্যে বিদ্যমান। সেই শুষ্ক পাতাগুলোর কথা ভুলে যাও, যেগুলো জমীনে পড়ে মাটির অংশ হয়ে গেছে।
যেহেতু গতকালটা হারিয়ে গেছে এবং তোমার সামনে রয়েছে আজকের দিনটা, সেহেতু এই দিনটি অতিবাহিত হওয়ার আগে এর পাতাগুলো সমবেত করো এবং আগামী কালের দিকে পেশ করো। যে গতকালটি অতিবাহিত হয়ে গেছে, তার জন্য মাতম কোরো না এবং আজকের দিনটি আফসোস করে নষ্ট কোরো না। সামনের আগামী কালটা অনেক সুন্দর। তাতে উদীয়মান আলোকময় সূর্যের সোনালী কিরণের অপেক্ষায় থাকো।
বিষাক্ত কথায় সৃষ্ট যখমের তীব্রতা অনুমান করা মুশকিল।