📄 বিপদ মোকাবেলায় সালাত
ইসলামের প্রথম যুগের নারীসমাজ জানতেন যে, সালাত হচ্ছে বান্দা ও তার রবের মধ্যে একটি সেতু এবং তারাই সফল হয়েছেন, যারা সালাতের মধ্যে খাশিয়ত অবলম্বন করতেন। 'নিশ্চয় ঈমানদাররা সফল হয়েছে, যারা তাদের সালাতে খুশু অবলম্বন করে থাকে।' [২৩:১-২] তাঁরা রাত জেগে আশা ও ভীতি নিয়ে এবাদত করতেন। এই সত্যও তারা বার বার উপলব্ধি করেছেন যে, আখেরাতের জন্য সবচেয়ে উত্তম পাথেয় হচ্ছে সালাত এবং আল্লাহ-র পথে দাওয়াতের জন্য সালাতের চেয়ে উত্তম কোন মাধ্যম নেই। সালাত মুসল্লীদের অন্তরে বিপদাপদ, বালা-মসিবত মোকাবেলা করার জন্য শক্তি ও দৃঢ়তা সৃষ্টি করে। রাত জাগরণ করে সালাত আল্লাহ-র নৈকট্য হাসিলের সর্বোত্তম উপায়। আল্লাহ যেমন প্রথম দাঈ নবী-কে সম্বোধন করে বলেছেন-
আর রাতে তাহাজ্জুদ পড়ো। এটা তোমার জন্য নফল। হয়তো আল্লাহ তোমাকে প্রশংসিত মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করবেন। [১৭:৭৯]
আল্লাহ তাআলা রাত জেগে এবাদতকারীদের প্রশংসা করতে গিয়ে বলেছেন, তারা রাতে কমই শয়ন করে। [৫১:১৭]
আনাস থেকে বর্ণিত আছে, নবী মসজিদে প্রবেশ করলেন। দেখলেন দুটি খাম্বার মাঝে রশি বাঁধা। জিজ্ঞেস করলেন, এই রশি কার? লোকজন বলল, এটা যায়নাবের। যখন তিনি (সালাত পড়তে পড়তে) ক্লান্ত হয়ে যান, তখন এর সাথে ঠেস দেন। নবীজী বললেন, এটা খুলে ফেলো। তোমাদের মধ্য থেকে যেকেউ যেন ততক্ষণই (রাত জেগে) সালাত পড়ে, যতক্ষণ সে স্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করে। ক্লান্ত হয়ে গেলে যেন বসে যায়।
মুমিন নারীগণ আল্লাহ -র সন্তুষ্টির জন্য নিজেদের উপর তাহাজ্জুদের ভার চাপাতেন; কিন্তু নবী তাদের আদেশ করেছেন সাধ্যের অধিক বোঝা যেন তারা নিজেদের উপর না চাপায়। কেননা, উত্তম হচ্ছে সেটা, যেটা কম হলেও নিয়মিত হয়। আমরা জানি, আমাদের যুগের স্ত্রীরা দিনরাত কাজে লিপ্ত থাকে; কিন্তু মধ্যরাতে দুই রাকাত সালাত পড়ে শয়তানকে শায়েস্তা করার সৌভাগ্য তাদের হয় না। সমস্ত কাজে মধ্যম পন্থা উত্তম। নবীজী বলেছেন, তারা ধ্বংস হোক, যারা বাড়াবাড়ি করে। একথা তিনি তিনবার বলেছেন।
আল্লাহ -র উপর ভরসা করো যদি তুমি সত্যাশ্রয়ী হয়ে থাক; আর আগামী কালকে খুশি ও আনন্দের সাথে গ্রহণ করো, যদি তুমি তওবাকারিণী হয়ে থাক।
📄 একজন সফল নারীর উপদেশমালা
বর্তমান যুগের এক মা মুচকি হাসি আর কান্নার মিশেল পরিবেশ তৈরি করে তার মেয়েকে কিছু উপদেশ দিয়েছিলেন। সেগুলো নিম্নরূপ-
সোনামণি! এখন তুমি নতুন জীবনের চৌকাঠের উপর দাঁড়িয়ে আছ, যেখানে মা-বাবার জন্য কোন জায়গা নেই; ভাইবোনের জন্য সেখানে কোন স্থান নেই। এই নতুন জীবনে তুমি তোমার স্বামীর জীবনসঙ্গী, যিনি এটা বরদাস্ত করবেন না যে, তোমার অন্তরে তার যে ভালোবাসা আছে, তার মধ্যে আর কেউ শরীক থাক, চাই সে তোমার রক্তসম্পর্কের আত্মীয় হোক না কেন।
একজন আদর্শ গৃহিণী এবং মায়াবতী মা হিসেবে নতুন জীবনের সূচনা করো। জীবনসঙ্গীকে বোঝাও যে, তুমিই তার সবকিছু। মনে রেখো, যেকোন পুরুষ হচ্ছে বয়স্ক শিশু, যাকে মায়াভরা কথাবার্তা উৎফুল্ল করে। তাকে এটা বুঝতে দিয়ো না যে, তিনি বিয়ে করে তোমাকে তোমার খান্দান থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছেন। কেননা, তিনিও এই ধরণের কথাবার্তা চিন্তা করতে পারেন। তার কারণ, তিনি তোমার কারণে পিতৃপুরুষের ঘর ও খান্দান থেকে দূরত্ব অবলম্বন করেছেন। তবে তার ও তোমার মধ্যে একটিই পার্থক্য। তা হল তুমি নারী, আর তিনি পুরুষ। একটি মেয়ে যে ঘরে জন্ম নেয় এবং যেখানে তার প্রতিপালন ও শিক্ষাদীক্ষার বন্দোবস্ত হয়, সেটাকে অনেক দিন পর্যন্ত মনে রাখে। এই ঘর সে নিজের ইচ্ছায় ছেড়ে দিয়েছে। সন্দেহ নেই যে, সে একটি নতুন জীবনের সূচনা করেছে এবং একজন পুরুষের সাথে জীবনযাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেই পুরুষ হচ্ছে তার স্বামী এবং হবু ছেলেমেয়ের বাবা। এখন এটাই একটি নতুন দুনিয়া। প্রিয় মেয়ে! এখন তোমার বর্তমানও তিনি; ভবিষ্যৎও তিনি। এটাই তোমার ঘর আর খান্দান, যেটা তুমি ও তোমার স্বামী মিলে গড়ে তুলেছ। সোনামণি! আমি তোমার কাছে চাই না যে, তুমি মাবাপ, ভাইবোন ভুলে যাও। কেননা, তারা তোমাকে কখনও ভুলতে পারবেন না। প্রিয় মেয়ে! একজন মা কীভাবে তার কলজের টুকরাকে ভুলে যেতে পারে? কিন্তু আমি তোমার কাছে চাই যে, তুমি নিজের স্বামীকে ভালোবাসো এবং তার বন্ধুত্বের পরশে নিজের জীবনকে আনন্দদায়ক ও কামিয়াব করো।
আসিয়া থেকে সবর, খাদিজা থেকে ওয়াফা, আয়েশা থেকে সততা এবং ফাতেমা থেকে দৃঢ়তা শিক্ষা করো।
📄 স্রষ্টার মহব্বত যেখানে, সৃষ্টির মহব্বত সেখানে
মিনদের জন্য আল্লাহ -এর সত্তাই হচ্ছে যাবতীয় মহব্বত, আনন্দের কেন্দ্রবিন্দু। যারা আল্লাহ -এর এবাদত করে, যারা তাঁকে মহব্বত করে, প্রকৃতপক্ষে তারাই জীবনকে ভালোবাসে; তারাই নিজেদের অস্তিত্বের উপর সন্তুষ্ট থাকে এবং দিনরাত থেকে স্বাদ নিতে থাকে। তাদের রূহ থাকে আলোকিত এবং তাদের দিল থাকে শান্ত। তাদেরকে হৃদয়ের প্রশ্বস্ততার দৌলত দান করা হয় এবং তাদের দিলেই আল্লাহ -এর মহব্বতের নকশা অংকিত হয়। তাদের রূহ আল্লাহ -এর গুণে গুণান্বিত হয়। তাদের দৃষ্টিতে থাকে আসমায়ে হুসনা'র নুর। তারা আসমায়ে হুসনা'র যিকির করে এবং সেগুলোর বৈশিষ্ট্য নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে। তাদের অন্তরে এসব নাম উপস্থিত থাকে। রহমান, রহীম হামীদ, হালীম, লাতীফ, মুহসিন, ওয়াদূদ, আযীম...। এগুলো তাদের মহব্বত বাড়াতে থাকে। আযীম বৃদ্ধি করে আকর্ষণ; আলীম বৃদ্ধি করে নৈকট্য।
আল্লাহ -এর নৈকট্যের অনুভূতি বান্দার দিলের মধ্যে আল্লাহর মহব্বতের জযবা প্রবিষ্ট করে এবং তাঁর অনুগ্রহ, মনোযোগ, মেহেরবানী, আনন্দ ও স্বস্তির অনুভব জীবিত রাখে।
(হে নবী!) আর যখন তোমাকে আমার বান্দারা আমার সম্পর্কে জিজ্ঞাস করে, তখন তাদেরকে বলে দাও যে, আমি তাদের কাছেই আছি। দোআকারী যখন দোআ করে, তখন আমি সাড়া দিই। [২:১৮৬]
কিন্তু আল্লাহ -এর অন্তরঙ্গতা এমনি এমনি পয়দা হয় না এবং কষ্ট না করলে এই দৌলত হাসিল হয় না। এ হচ্ছে আল্লাহ -এর অনুগত্য, এবাদত ও মহব্বতের ফল। যে ব্যক্তি আল্লাহ -এর আনুগত্য করে, তাঁর নির্দেশাবলি পালন করে; তাঁর নিষেধাজ্ঞা থেকে আঁচল বাঁচায়, তাঁর মহব্বতের বেলায় যথার্থ ও অটল প্রমাণিত হয়, সে হুব্বে এলাহী'র স্বাদ, নৈকট্যের মজা, আনন্দ ও মিষ্টতা অনুভব করে।
আখলাকের সৌন্দর্যই প্রকৃত সৌন্দর্য। ব্যবহারের সৌন্দর্যই অটুট এবং প্রকৃত প্রদর্শনী হচ্ছে প্রজ্ঞার প্রদর্শনী।
📄 আসমা বিনতে আবু বকরের দুই জীবন
আসমা বিনতে আবু বকর —-র উপাধী ছিল যাতুননেতাকাইন। তিনি সবরের এক উপমা কায়েম করেছিলেন। সীমাহীন পেরেশানী ও বঞ্চনার সময় তিনি স্বামীর আনুগত্য ও তার সন্তুষ্টির জন্য নজিরবিহীন কুরবানী দিয়েছিলেন। হাদীস শরীফে তাঁর নিজের ভাষ্য বর্ণিত আছে-
যোবায়ের যখন আমাকে বিয়ে করেন, তখন তাঁর কাছে তাঁর ঘোড়া ছাড়া আর কিছুই ছিল না। সেই ঘোড়াকে আমি খাওয়াতাম এবং তার দেখাশোনা করতাম। খেজুরের আঁটি ভাঙতাম, পানি পান করাতাম এবং আটা গুলতাম। একদিন আমি যোবায়েরের খেত থেকে খেজুরের আঁটি কুড়িয়ে আনছিলাম। আচানক রসুলুল্লাহ ﷺ ও তাঁর কয়েক জন সাথী আমাকে দেখে ফেললেন। রসুলুল্লাহ ﷺ আমাকে ডাক দিলেন এবং আখআখ বলে নিজের উট থামালেন, যাতে আমাকে পিছনে চড়াতে পারেন। আমার খুব শরম লাগল। আমি বললাম, যোবায়ের খুব মর্যাদাবোধসম্পন্ন ব্যক্তি। নবীজী চলে গেলেন। যখন আমি ঘরে পৌঁছলাম, তখন যোবায়েরকে ঘটনা বয়ান করলাম। যোবায়ের বললেন, আল্লাহর কসম! রসুলুল্লাহ ﷺ-র পিছনে চড়ার চেয়ে তোমার মাথায় খেজুরের বীচি কুড়িয়ে আনা আমার কাছে বেশি কষ্টকর।
আসমা বলেন, এরপর [আমার পিতা] আবু বকর একজন খাদেম পাঠালেন। সে ঘোড়া দেখাশোনার কাজ করত। এর ফলে আমি যেন গোলামী থেকে মুক্তি পেলাম।
এমন পরীক্ষার যামানা পার করার পর আল্লাহ আসমা ও তাঁর স্বামীর প্রতি নেয়ামতের বৃষ্টি বর্ষণ করেন। কিন্তু আর্থিক সচ্ছলতা আসার পরও তিনি ভারসাম্য রক্ষা করে চলতেন। তিনি অত্যন্ত দানশীল ছিলেন; পরের দিনের জন্য সঞ্চয় করতেন না। জীবনের শেষে যখন তিনি অসুস্থ হয়ে পড়ে ছিলেন, তখন অপেক্ষা করতে লাগলেন। অবস্থার উন্নতি হলে তিনি সমস্ত গোলাম আযাদ করে দেন। তারপর মেয়েদেরকে এবং খান্দানের লোকজনকে ডেকে বললেন, আল্লাহর রাস্তায় খরচ করো এবং সদকা করো। প্রয়োজনের অতিরিক্ত মাল আসার অপেক্ষা কোরো না।
মুমিনদের জন্য জীবন খুব সুন্দর। জীবনের পর মৃত্যুও মুত্তাকীদের কাছে প্রিয়। এরাই ভাগ্যবান ও খোশনসীব।