📄 বেশিরভাগ সমস্যার কারণ মামুলী
অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হচ্ছে এই যে, সাধারণত মামুলী কথাবার্তা হাজারও ব্যক্তিকে ক্রোধান্বিত করে এবং তারা জ্ঞানবুদ্ধি হারিয়ে ফেলে। ঘর ধ্বংস হয়; বন্ধুত্ব শেষ হয়ে যায়; লোকজন হয়ে পড়ে দিশেহারা। তারপর সারা জীবন আফসোস করে হাত ডলতে থাকে। প্রসিদ্ধ মনোবিজ্ঞানী ডেলকার্নেগী সামান্য বিষয় যে ভয়ানক পরিণতির পটভূমি হয়, সেকথার খুব চমৎকার ব্যাখ্যা দিয়েছেন এভাবে-
ছোট ছোট বিষয় দাম্পত্যজীবনে পারস্পরিক ঝগড়াবিবাদের কারণ হয়ে থাকে। স্বামী-স্ত্রী বিবেক-বুদ্ধি থেকে সরে পড়ে। দুনিয়াতে যত লোকের হার্ট এটাক হয়, তাদের অর্ধেকের বেশির কারণ একেবারেই মামুলী বিষয়।
শিকাগো'র এক বিচারক মিস্টার জোসেফ সাবাসের বক্তব্য থেকেও একথার সমর্থন পাওয়া যায়। তিনি প্রায় চল্লিশ হাজার তালাকের ঘটনা জরিপ করার পর বলেছেন, দাম্পত্য জীবনের বেশিরভাগ ব্যর্থতার কারণ তোমরা দেখবে একেবারেই সাধারণ।
নিউইয়র্কের সরকারী আইন উপদেষ্টা, মিস্টার ফ্রাঙ্ক হোগেন বলেন, ক্রিমিনাল কোর্টে যেসব মামলা আসে, সেগুলোর অর্ধেকের বেশি এমন, যেগুলোর কারণ খুবই মামুলী। যেমন, খান্দানের লোকজনের মধ্যে সংঘটিত বিতর্ক; বা অপমানজনক কোন আচরণ; অথবা কষ্টদায়ক কোন বক্তব্য; কিংবা অসৌজন্যমূলক কোন ব্যবহার। এমন ছোট ছোট বিষয় খুন ও ভয়ানক অপরাধের পটভূমি তৈরী করে।
আবেগের বিচারে পোক্তা ও মজবুত দেলদেমাগের অধিকারী লোক খুব কম। অন্যথায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে যখন আমাদের ইজ্জত-আব্রুর উপর সরাসরি হামলা হয়, তখন আমরা নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ি। আর দুনিয়াতে যেসব সমস্যা দেখা দেয়, সেগুলোর অর্ধেকের কারণ এগুলোই।
সবচেয়ে বড় নেয়ামত হচ্ছে নেক আমলের এহতেমাম, যা অন্তরকে আনন্দে উদ্বেলিত করে।
📄 যবানের সতর্ক ব্যবহার
ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন, একদিন খালেদ ইবনে ইয়াজীদ ইবনে মুআবিয়া, আবদুল্লাহ ইবনে যোবায়েরকে গালমন্দ করতে লাগলেন। আবদুল্লাহ ইবনে যোবায়ের বনু উমাইয়া'র রাজত্বের খুব বিরোধী ছিলেন। খালেদ ইবনে ইয়াজীদ আবদুল্লাহকে বখীল সাব্যস্ত করলেন। খালেদের স্ত্রী ছিলেন রামলা বিনতে যোবায়ের, আবদুল্লাহর আপন বোন। তিনি কাছেই অবস্থান করছিলেন। খালেদ রামলাকে বললেন, তুমি কিছু বলবে না? তুমি কি আমার কথার সাথে একমত, না কি তুমি আমার কথার জওয়াব দিতে চাইছ না? রামলা বললেন, এই দুইয়ের কোনটিই নয়। আমরা নারীদেরকে পুরুষদের কথাবার্তার মধ্যে হস্তক্ষেপ করার জন্য সৃষ্টি করা হয়নি। আমরা তো ফুলের মত, যার স্নিগ্ধতা থেকে মানুষ পরিতৃপ্ত হয় এবং যার সুগন্ধি থেকে বিলাসিতা অনুভব করে। আপনারা পুরুষদের পারস্পরিক আলোচনায় আমাদের নাক গলানোর কী প্রয়োজন?
এই জওয়াব শুনে খালেদ অনেক খুশি হলেন এবং রামলার কপালে চুমু খেলেন।
স্বামী-স্ত্রীর মাঝে যেসব গোপন কথাবার্তা হয়, সেগুলো প্রকাশ করতে রসুলুল্লাহ ﷺ অত্যন্ত শক্তভাবে নিষেধ করেছেন। ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. আসমা বিনতে ইয়াজীদ থেকে বর্ণনা করেন যে, আসমা রসুলুল্লাহ'র কাছে উপস্থিত ছিলেন এবং তাঁর খেদমতে অনেক নারী-পুরুষ সমবেত ছিল। তখন নবীজী ﷺ বললেন, অনেক সময় একজন পুরুষ নিজের স্ত্রীর সাথে যা করে, তা বর্ণনা করে দেয় এবং অনেক সময় স্ত্রী স্বামীর সাথে যা করে, তা বর্ণনা করে দেয়? সবাই নীরব থাকল; কেউ কিছু বলল না। আমি বললাম, আল্লাহর কসম! হে আল্লাহর রসুল! কখনও স্বামী এমন করে, অথবা স্ত্রী এমন করে। নবীজী ﷺ বললেন, এমনটা কোরো না। এই কাজটি এমন, যেমন কোন শয়তান লোক মহাসড়কে খবীস কোন নারীর সাথে সহবাস করে এবং অন্যসব লোক দেখতে থাকে।
সুরা নিসার ৩৪ নং আয়াতে যে বলা হয়েছে, 'নেককার নারীরা অনুগত হয়ে থাকে এবং পুরুষদের অন্তরালে আল্লাহর হেফাজত ও তত্ত্বাবধানে তাদের হকসমূহ সংরক্ষণ করে।' অনেক মুফাসসির এর ব্যাখ্যায় বলেছেন, এখানে ওইসব নারীর দিকে ইশারা করা হয়েছে, যারা স্বামী-স্ত্রীর গোপন কথা হেফাজত করে।
নিজের সমস্যা নয়; আল্লাহ -র নেয়ামত গণনা করো।
📄 বিপদ মোকাবেলায় সালাত
ইসলামের প্রথম যুগের নারীসমাজ জানতেন যে, সালাত হচ্ছে বান্দা ও তার রবের মধ্যে একটি সেতু এবং তারাই সফল হয়েছেন, যারা সালাতের মধ্যে খাশিয়ত অবলম্বন করতেন। 'নিশ্চয় ঈমানদাররা সফল হয়েছে, যারা তাদের সালাতে খুশু অবলম্বন করে থাকে।' [২৩:১-২] তাঁরা রাত জেগে আশা ও ভীতি নিয়ে এবাদত করতেন। এই সত্যও তারা বার বার উপলব্ধি করেছেন যে, আখেরাতের জন্য সবচেয়ে উত্তম পাথেয় হচ্ছে সালাত এবং আল্লাহ-র পথে দাওয়াতের জন্য সালাতের চেয়ে উত্তম কোন মাধ্যম নেই। সালাত মুসল্লীদের অন্তরে বিপদাপদ, বালা-মসিবত মোকাবেলা করার জন্য শক্তি ও দৃঢ়তা সৃষ্টি করে। রাত জাগরণ করে সালাত আল্লাহ-র নৈকট্য হাসিলের সর্বোত্তম উপায়। আল্লাহ যেমন প্রথম দাঈ নবী-কে সম্বোধন করে বলেছেন-
আর রাতে তাহাজ্জুদ পড়ো। এটা তোমার জন্য নফল। হয়তো আল্লাহ তোমাকে প্রশংসিত মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করবেন। [১৭:৭৯]
আল্লাহ তাআলা রাত জেগে এবাদতকারীদের প্রশংসা করতে গিয়ে বলেছেন, তারা রাতে কমই শয়ন করে। [৫১:১৭]
আনাস থেকে বর্ণিত আছে, নবী মসজিদে প্রবেশ করলেন। দেখলেন দুটি খাম্বার মাঝে রশি বাঁধা। জিজ্ঞেস করলেন, এই রশি কার? লোকজন বলল, এটা যায়নাবের। যখন তিনি (সালাত পড়তে পড়তে) ক্লান্ত হয়ে যান, তখন এর সাথে ঠেস দেন। নবীজী বললেন, এটা খুলে ফেলো। তোমাদের মধ্য থেকে যেকেউ যেন ততক্ষণই (রাত জেগে) সালাত পড়ে, যতক্ষণ সে স্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করে। ক্লান্ত হয়ে গেলে যেন বসে যায়।
মুমিন নারীগণ আল্লাহ -র সন্তুষ্টির জন্য নিজেদের উপর তাহাজ্জুদের ভার চাপাতেন; কিন্তু নবী তাদের আদেশ করেছেন সাধ্যের অধিক বোঝা যেন তারা নিজেদের উপর না চাপায়। কেননা, উত্তম হচ্ছে সেটা, যেটা কম হলেও নিয়মিত হয়। আমরা জানি, আমাদের যুগের স্ত্রীরা দিনরাত কাজে লিপ্ত থাকে; কিন্তু মধ্যরাতে দুই রাকাত সালাত পড়ে শয়তানকে শায়েস্তা করার সৌভাগ্য তাদের হয় না। সমস্ত কাজে মধ্যম পন্থা উত্তম। নবীজী বলেছেন, তারা ধ্বংস হোক, যারা বাড়াবাড়ি করে। একথা তিনি তিনবার বলেছেন।
আল্লাহ -র উপর ভরসা করো যদি তুমি সত্যাশ্রয়ী হয়ে থাক; আর আগামী কালকে খুশি ও আনন্দের সাথে গ্রহণ করো, যদি তুমি তওবাকারিণী হয়ে থাক।
📄 একজন সফল নারীর উপদেশমালা
বর্তমান যুগের এক মা মুচকি হাসি আর কান্নার মিশেল পরিবেশ তৈরি করে তার মেয়েকে কিছু উপদেশ দিয়েছিলেন। সেগুলো নিম্নরূপ-
সোনামণি! এখন তুমি নতুন জীবনের চৌকাঠের উপর দাঁড়িয়ে আছ, যেখানে মা-বাবার জন্য কোন জায়গা নেই; ভাইবোনের জন্য সেখানে কোন স্থান নেই। এই নতুন জীবনে তুমি তোমার স্বামীর জীবনসঙ্গী, যিনি এটা বরদাস্ত করবেন না যে, তোমার অন্তরে তার যে ভালোবাসা আছে, তার মধ্যে আর কেউ শরীক থাক, চাই সে তোমার রক্তসম্পর্কের আত্মীয় হোক না কেন।
একজন আদর্শ গৃহিণী এবং মায়াবতী মা হিসেবে নতুন জীবনের সূচনা করো। জীবনসঙ্গীকে বোঝাও যে, তুমিই তার সবকিছু। মনে রেখো, যেকোন পুরুষ হচ্ছে বয়স্ক শিশু, যাকে মায়াভরা কথাবার্তা উৎফুল্ল করে। তাকে এটা বুঝতে দিয়ো না যে, তিনি বিয়ে করে তোমাকে তোমার খান্দান থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছেন। কেননা, তিনিও এই ধরণের কথাবার্তা চিন্তা করতে পারেন। তার কারণ, তিনি তোমার কারণে পিতৃপুরুষের ঘর ও খান্দান থেকে দূরত্ব অবলম্বন করেছেন। তবে তার ও তোমার মধ্যে একটিই পার্থক্য। তা হল তুমি নারী, আর তিনি পুরুষ। একটি মেয়ে যে ঘরে জন্ম নেয় এবং যেখানে তার প্রতিপালন ও শিক্ষাদীক্ষার বন্দোবস্ত হয়, সেটাকে অনেক দিন পর্যন্ত মনে রাখে। এই ঘর সে নিজের ইচ্ছায় ছেড়ে দিয়েছে। সন্দেহ নেই যে, সে একটি নতুন জীবনের সূচনা করেছে এবং একজন পুরুষের সাথে জীবনযাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেই পুরুষ হচ্ছে তার স্বামী এবং হবু ছেলেমেয়ের বাবা। এখন এটাই একটি নতুন দুনিয়া। প্রিয় মেয়ে! এখন তোমার বর্তমানও তিনি; ভবিষ্যৎও তিনি। এটাই তোমার ঘর আর খান্দান, যেটা তুমি ও তোমার স্বামী মিলে গড়ে তুলেছ। সোনামণি! আমি তোমার কাছে চাই না যে, তুমি মাবাপ, ভাইবোন ভুলে যাও। কেননা, তারা তোমাকে কখনও ভুলতে পারবেন না। প্রিয় মেয়ে! একজন মা কীভাবে তার কলজের টুকরাকে ভুলে যেতে পারে? কিন্তু আমি তোমার কাছে চাই যে, তুমি নিজের স্বামীকে ভালোবাসো এবং তার বন্ধুত্বের পরশে নিজের জীবনকে আনন্দদায়ক ও কামিয়াব করো।
আসিয়া থেকে সবর, খাদিজা থেকে ওয়াফা, আয়েশা থেকে সততা এবং ফাতেমা থেকে দৃঢ়তা শিক্ষা করো।