📘 পৃথিবী আমার আসল ঠিকানা নয় 📄 মানুষ সৃষ্টির উদ্দেশ্য

📄 মানুষ সৃষ্টির উদ্দেশ্য


প্রিয় ভাই ও বোন!
একটু চিন্তা করুন, আল্লাহ পাক আমাদেরকে একটি উদ্দেশ্য নিয়ে সৃষ্টি করেছেন। আমরা নিজ ইচ্ছায় সৃষ্টি হইনি। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সৃষ্টি করেছেন। মানুষ তার এই সুন্দর আকৃতি নিজের ইচ্ছায় গ্রহণ করতে পারেনি। আল্লাহ পাকও আমাদেরকে কেমন অবয়বে সৃষ্টি করবেন সে বিষয়ে আমাদের পিতা-মাতা থেকে পরামর্শও গ্রহণ করেননি। তিনি আপন ইচ্ছায় আমাকে আপনাকে পৃথিবীর সকলকে সুন্দর আকৃতিতে সৃষ্টি করেছেন। তিনি স্রষ্টা, তিনি তাঁর সৃষ্টিকে কেমন করে সৃষ্টি করবেন, তা একমাত্র আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছাধীন। তিনি আরবীদেরকে আরবী, অনারবদেরকে অনারবী, নারীকে নারীর রূপে পুরুষকে পুরুষরূপে, সৃষ্টি করেছেন। রং-বর্ণ আর চেহারা-অবয়বে এই বৈচিত্র্যের সমাবেশ। কারও নাক উঁচু, কারও নাক নিচু। কেউ সুন্দর, কেউ কালো। কেউ মোটা কেউ পাতলা। এই যে সৃষ্টির মাঝে বৈচিত্র্য, সবই আল্লাহ তায়ালার মহান কুদরতের বহিঃপ্রকাশ। এই জগত আল্লাহর, এই জগতের সব সৃষ্টি মহান আল্লাহর। আর এই সৃষ্টির মাঝে যত বৈচিত্রতা, সব মহান রাব্বুল আলামীনের একক কর্তৃত্বের মাঝেই ফুটে উঠে।

আজকের দুনিয়ায় মানুষের চোখে বিপুল অর্থবিত্তের মালিক হতে পারাই মনে করা হয় জীবনের চরম সফলতা। আর বিত্তহীন মানুষ তাদের চোখে একজন ব্যর্থ। কিন্তু জীবন সম্পর্কে আমাদের এই ব্যাখ্যা মোটেও আল্লাহ প্রদত্ত নয়। এটা মানুষের মনগড়া। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মানুষের জীবনের সফলতার যে চিত্র একে দিয়েছেন, তা হলো পূর্ণাঙ্গ ইসলামী জীবন ধারা। আল্লাহ তায়ালার আদেশ নিষেধ এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একনিষ্ঠ অনুসরণ ও অনুকরণীয় জীবনই হলো কামিয়াবীর পথ। এ জীবনের সাথে আল্লাহ ও আল্লাহর প্রিয় রাসূলের আদর্শের সাথে যত ব্যবধান থাকবে, সে ততই ব্যর্থ বলে বিবেচিত হবে। ব্যর্থ জীবনের পরিণতি সম্পর্কে আল্লাহ পাক পবিত্র কোরআনে বলেছেন, الَمْ يَعْلَمُوا أَنَّهُ মَنْ يُحَادِدِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَأَنَّ لَهُ نَارَ جَهَنَّمَ خَالِدًا فِيهَا ذَلِكَ الْخِزْى الْعَظِيمُ তারা কি একথা জেনে নেয়নি যে, আল্লাহর সাথে এবং আল্লাহর রাসূলের সাথে যে মোকাবেলা করে তার জন্য নির্ধারিত রয়েছে জাহান্নাম, তাতে সব সময় থাকবে। এটিই হলো ব্যর্থতা, মহা অপমান। (সূরা তওবা-৬৩)

অধিকাংশ মানুষ যদিও এই ধারণা পোষণ করে থাকে যে, ধন-সম্পদ ও দারিদ্রতাই মানুষের সম্মান ও লাঞ্চনার মাপকাঠি, কিন্তু, আল্লাহ পাক বলেছেন, আল্লাহ তাঁর রাসূলের অবাধ্য ব্যক্তির দুনিয়াবী সম্মান যতই থাকুক, পরিণামের বিচারে প্রকৃত লাঞ্চিত ব্যক্তি সেই।

একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে নববীতে নামায পড়ছিলেন। সেদিন তিনি বসে বসে নামায পড়ছিলেন। হযরত আবু হুরায়রা (রাযি.) এসে দেখলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বসে বসে নামায পড়ছেন। হযরত আবু হুরায়রা (রাযি.) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমার মাতা-পিতা আপনার জন্য কুরবান হোক। আপনি বসে বসে নামায পড়ছেন? জবাবে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পেটের দিকে ইশারা করে বললেন, ক্ষুধা! ক্ষুধায় এতো কাতর হয়ে পড়েছি যে, এ পা দুটির উপর দাঁড়াতে ভরসা পাচ্ছি না। আমার আপনার দৃষ্টিভঙ্গী ও রুচি অনুযায়ী যে ব্যক্তির নিকট ক্ষুধা নিবারণের জন্য এক টুকরো রুটি নেই, তার চেয়ে গরীব ও দরিদ্র ব্যক্তি আর কেউ নেই। অথচ দেখুন, আল্লাহর নবীর ব্যক্তিত্ব এমন মহান ছিলো যে, তাঁর আঙ্গুলের ইশারায় সুদূর আকাশের চাঁদ পর্যন্ত দ্বিখণ্ডিত হয়ে যেত। যিনি চাইলে উহুদ পাহাড় স্বর্ণে রূপান্তরিত হতো। তিনি ক্ষুধার যন্ত্রণায় কাতর। তিনি ক্ষুধা ও দারিদ্রতাকেই প্রাধান্য দিয়েছেন।

একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক খেজুর বাগানে গিয়ে উপস্থিত হলেন, সঙ্গে হযরত আব্দুল্লাহ বিন ওমরও ছিলেন। গাছের নিচে কিছু খেজুর পড়েছিল। সেগুলো আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুড়িয়ে ঝেড়ে মুছে খেতে লাগলেন। হযরত আব্দুল্লাহ বিন ওমর (রাযি.) কে বললেন, তুমি খাচ্ছো না যে? ইবনে ওমর বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার ক্ষুধা নেই। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমার কিন্তু যথেষ্ট ক্ষুধা রয়েছে, আজ চারদিন হতে চললো, এক লোকমা আহার ও আমার পেটে পড়েনি।

প্রিয় ভাই ও বোন! এই পৃথিবীতে মহান রাব্বুল আলামীনের নিকট তাঁর প্রিয় হাবীবের চেয়ে প্রিয় আর কেউ নেই। বলুন তো, নিজের প্রিয়জনকে কষ্টে ফেলে কেউ কি আনন্দ অনুভব করতে পারে? না, তা কখনও সম্ভব নয়। সেই আল্লাহর প্রিয় হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলছেন, আমি চারদিন যাবত কিছুই খাইনি। কিন্তু আমি যদি চাইতাম, তাহলে গোটা দুনিয়ার সমস্ত খাজানা আমার হাতের মুঠোয় এনে দিতেন। কিন্তু, হে ইবনে ওমর! আমি তা চাইনা। তবে একটা সময় এমন আসবে, যখন মানুষের অবস্থা এমন সচ্ছল হবে যে, কয়েক বছর পর্যন্ত জীবন নির্বাহের মত সম্পদ মানুষের হাতে থাকবে, কিন্তু তার পরেও আরও কিভাবে অর্জন করা যায় সে চিন্তায় ব্যস্ত থাকবে। তাদের একীন ও এখলাস বরবাদ হয়ে যাবে।

হে ভাই, হে বোন! বুঝতে পারছেন তো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি বলতে চেয়েছেন? এখন তো আমাদের অবস্থা এমন হয়েছে যে, একশত বছরের সম্পদ জমা করার চিন্তায় পেরেশান। আর এই পেরেশানী তাকে নিয়ে যাচ্ছে হারাম উপার্জনের দিকে। অথচ এর পরিণাম বড় ভয়াবহ। এ হারাম উপার্জন করতে গিয়ে সে কতজনের হক নষ্ট করছে। কতজনের পেটে লাথি মারছে। হালাল হারাম বাছ বিচার করছে না। এসব থেকে আল্লাহ আমাদের হেফাযত করুন।

📘 পৃথিবী আমার আসল ঠিকানা নয় 📄 হালাল হারাম চেনো

📄 হালাল হারাম চেনো


প্রিয় ভাই ও বোন!
মানুষের জীবনের সুখ-দুঃখ ভাল-মন্দকে আল্লাহ তায়ালা বান্দার আমলের উপর নির্ভরশীল করে রেখেছেন। আল্লাহ তায়ালার এ ফয়সালা গোটা দুনিয়ার সম্মিলিত শক্তির পক্ষেও পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। মানুষের আমল যখন মন্দ হয়ে যায়, আল্লাহ তায়ালা বান্দার দুনিয়া ও আখেরাত উভয় জগতই বিপর্যস্ত করে রাখেন। ধন-সম্পদ কোন দিনই কাউকে আল্লাহ পাকের নিকট সম্মানিত করতে পারেনি। অথচ সম্পদের ধোঁকায় পড়ে আমরা যা খুশি তাই করছি। আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি অসন্তুষ্টির দিকে খেয়াল করিনা। কি করলে আল্লাহ তায়ালার আযাব গজবের সম্মুখীন হতে হয়। কোন কাজ করলে রহমতের দুয়ার খুলে যায়। এ সম্পর্কে আমাদের কোন ধারণাই নেই। ফলে গোটা উম্মাহ আজ চরম বিপর্যয়কর এক অবস্থার মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলেছে। আজ গোটা দুনিয়া আল্লাহ তায়ালার অপছন্দনীয় কর্মকাণ্ডে ভরে গেছে। সমাজের সর্বত্র অশ্লীলতা ও বেহায়াপনার সয়লাব। জুলুমের ব্যাপকতা বৃদ্ধি পেয়েছে। সুদ ঘুষের বাজার রমরমা। মিথ্যার দাপটে সত্য চাপা পড়ে যাচ্ছে। আল্লাহ তায়ালার অবাধ্যরা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে সর্বত্র। সত্যবাদীরা কোণঠাসা। সর্বত্র অস্থিরতা ও হাহাকার।

এ অবস্থার জন্য আমরাই দায়ী। আমরা দ্বীন থেকে দূরে সরে গেছি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আদর্শ ছেড়ে দিয়েছি। ইহুদী খৃষ্টান এবং হিন্দুদের কালচার আমরা রপ্ত করেছি। ফলাফল এই হলো যে, আমরা কাফেরদের দ্বারা সর্বত্র নির্যাতিত হচ্ছি।

হযরত মুসা আলাইহিস সালাম জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহ! তোমার অসন্তুষ্টির আলামত কি? আল্লাহ তায়ালা বললেন, আমার অসন্তুষ্টির আলামত হলো, তাদের জমিনে ফসল ফলবে। ফসল পেকে যাবে। এ অবস্থায় আমি বৃষ্টি দেব। ঝড়, শিলা দিব। মুহূর্তের মধ্যে সব পাকা ফসল ধ্বংস হয়ে যাবে। আর যখন ফসল বৃষ্টির প্রয়োজন অনুভব করবে, তখন আমি বৃষ্টি বন্ধ করে দেব।

মুসা আলাইহিস সালাম জিজ্ঞেস করলেন, আর কি?

আল্লাহ তায়ালা বললেন, আর তাদের রাষ্ট্র ক্ষমতা অজ্ঞ ও অযোগ্য লোকদের হাতে তুলে দেব। আর ধন-দৌলত তুলে দেব কৃপণদের হাতে। এ সম্পদ না তারা নিজেদের জন্য ব্যয় করবে, না তারা গরিবদের দান করবে। রাষ্ট্র ক্ষমতা এমন নাদান ও নির্বোধ লোকদের হাতে তুলে দেব। যারা দেশটাকে অত্যাচারে ভরে দেবে। যদিও তারা সঠিক করতে চায়, তাও ভুল হয়ে যাবে।

হযরত মুসা আলাইহিস সালাম জিজ্ঞেস করলেন, তোমার সন্তুষ্টির আলামত কি?

আল্লাহ তায়ালা বললেন, ফসল যখন বৃষ্টি চায়, আমি তখন বৃষ্টি দেই। এক বর্ণনায় আছে, এক ব্যক্তি পথ চলছিল, হঠাৎ সে শুনতে পেল, মেঘের মধ্যে থেকে আওয়াজ আসছে, যাও অমুকের বাগানে পানি দাও। লোকটি মেঘের পিছু নিল, মেঘ একটি পাহাড়ের উপর বৃষ্টি বর্ষণ করল। পাহাড় থেকে গড়িয়ে পানিগুলো একটি নালায় এসে পড়ল। সম্মুখে একটি নীচু জমিন ছিল, সেখানে গিয়ে পড়ল। সেখানে একজন লোক দাঁড়িয়ে ছিল, সে কোদাল দিয়ে নালা করে পানি তার বাগানে নিয়ে নিল। লোকটি জিজ্ঞেস করল, ভাই, তুমি কি করছ? তোমার নাম কি? লোকটি তার নাম বলল। যে ব্যক্তি মেঘের মধ্যে আওয়াজ শুনেছিল, সে বলল, আমি মেঘের মধ্যে আওয়াজ শোনলাম যে, অমুকের বাগানে পানি সেচ দাও। বাগানওয়ালা লোকটি বলল, যদি ঘটনাটা এভাবে না ঘটত তাহলে আমি তোমাকে কখনও রহস্যটা বলতাম না। ব্যাপার হলো, আল্লাহ পাক আমাকে বাগান দান করেছেন। এখানে যে ফসল উৎপন্ন হয়, তা আমি তিন ভাগে ভাগ করি। এক ভাগ গরিব মিসকিনদের দান করি। এক ভাগ নিজে ভোগ করি। আর এক ভাগ পুনরায় এ বাগানের পেছনে ব্যয় করি।

এ ঘটনা দ্বারা আমরা বুঝতে পারলাম যে, ফসলের এক তৃতীয়াংশ পরবর্তী ফসলের পেছনে ব্যয় করা দরকার। তবেই ফসলের হক আদায় হবে। তো আল্লাহ পাক বললেন, বান্দা যখন আমাকে সন্তুষ্ট করে, তখন আমিও বান্দার প্রতি সন্তুষ্ট থাকি। বান্দার দুনিয়াবী কল্যাণ আমি সম্পাদন করে দেই। বৃষ্টির যখন প্রয়োজন হয় তখন বৃষ্টি দেই। যখন বৃষ্টি ফসলের জন্য ক্ষতিকর হয় তখন বৃষ্টি আটকে রাখি। আর বান্দা যখন আমাকে খুশি করে, আমি খুশি হই। শাসন ক্ষমতা জ্ঞানী লোকদের হাতে তুলে দেই। বিচক্ষণ, জনদরদী লোকদের হাতে তুলে দেই। আর ধন-সম্পদ দানশীল ও উদার লোকদের দান করি। তারা গরিবদের দান করে। তারা যাকাত দিয়ে দরিদ্রদের অর্থ কষ্ট লাঘব করে। এসব হলো আমার সন্তুষ্টির আলামত। এ ঘটনাটি হাদীসে বর্ণিত হয়েছে।

📘 পৃথিবী আমার আসল ঠিকানা নয় 📄 আমাদের উদাসীনতা

📄 আমাদের উদাসীনতা


প্রিয় ভাই ও বোন!
আমরা যদি হাদীসের এ ঘটনাকে সামনে রেখে চিন্তা করি, তবে বর্তমান প্রেক্ষাপট আমাদের অবস্থান পরিষ্কার করে দেবে। চিন্তা করুন, আল্লাহ পাক আমাদের প্রতি কি পরিমাণ অসন্তুষ্ট হয়ে আছেন? আমার কথা শুনে আপনারা হয়তো ভাবছেন, হুজুর কি বলছে? আল্লাহ আমাদের প্রতি অসন্তুষ্ট, তা হুজুর জানলো কিভাবে?

বর্তমানে অবস্থাটা এমনই হয়ে গেছে যে, মাওলানারা যদি কোরআন হাদীস থেকেও কিছু বলেন, তাহলেও কিছু মানুষ বিশ্বাস করতে চায়না। মনে করে হুজুর বুঝি নিজের বানানো কথা বলছেন। সে মানুষগুলো ধর্মীয় কথাগুলো নিজেদের মত না হলে অসন্তুষ্ট হয়। কোরআন ও হাদীস অনুসারে জীবন গঠন করতে তারা কেন যে অপ্রস্তুত? আমার ভাবতে অবাক লাগে, এ মানুষগুলো নিজেরা তো কোরআন পড়েই না, বা পড়তে জানে না। আবার কোরআনের কথা শুনতে বা মানতেও চায় না। আল্লাহ আমাদের সবাইকে ক্ষমা করুন। বুঝার, মানার তৌফিক দান করুন।

একবার কি ভেবেছি; হঠাৎ জ্বলোচ্ছ্বাস হয়ে সমুদ্রের পানি আমাদেরকে ভাসিয়ে নিচ্ছে কেন? আমরা যখন বৃষ্টির জন্য হাহাকার করি, তখন বৃষ্টি হয় না কেন? বৃষ্টি যখন আমাদের ফল ফসলের জন্য ক্ষতিকর হয়, তখন মুষলধারে বৃষ্টি আমাদের মাঠঘাট তলিয়ে দেয় কেন? সমুদ্রের পানি কি এতই স্বাধীন যে, যখন যেদিক খুশি ছুটতে পারে? বাতাসের কি এত ক্ষমতা যে, সে প্রলয়ংকরী রূপ ধারণ করে সব তচনছ করে দেয়? এসব নিয়ন্ত্রণ করার মতো কি কেউ নেই? অবশ্যই আছেন। এই পানির রব আল্লাহ। আল্লাহ তায়ালার হাতে সব কিছুর নিয়ন্ত্রণ। বাতাসেরও তিনি নিয়ন্ত্রক। মেঘের ও তিনি নিয়ন্ত্রক। তিনি তাঁর ইচ্ছামত বৃষ্টি বর্ষণ করেন। তিনি আপন ইচ্ছায় পানিকে প্রবাহিত করেন। এই বৃষ্টি, এই বাতাস কোন কোন সময় আমাদের বদ আমলের কারণে আযাব হিসেবে এসে পড়ে। এটা আমাদের বদ আমলের শাস্তি। মহান রাব্বুল আলামীন রাগান্বিত হলে আমাদের উপর দুনিয়াবী এ আযাব বর্ষণ করেন।

তাহলে আমাদের সামনে সিদ্ধান্ত কি? সিদ্ধান্ত হলো আল্লাহ তায়ালাকে সন্তুষ্ট করা। এ ছাড়া দুনিয়াও আখেরাতে আমাদের কোন সমস্যারই সমাধান হবে না। এটাই সত্য, এটাই বাস্তব। মনে করুন বৃষ্টির গজব, ঝড় তুফানের গজব সহ আরও অসংখ্য গজব সয়ে গেলেন। অবাধ্যতাই করে গেলেন। শিক্ষা নিলেন না। কিন্তু মৃত্যুকে তো এড়ানো যাবে না। নাকি যাবে? যাবে না। মৃত্যু থেকে বাঁচতে কেউ পারেনি। এ দুনিয়া কি একদিন হাতছাড়া হবে না? কেয়ামত কায়েম হবে না? হিসেবের পাল্লা কি স্থাপিত হবে না? জান্নাত জাহান্নাম আমার ভাগ্যের চূড়ান্ত ফয়সালা কি হবে না? আল্লাহ তায়ালা কি শেষ বিচারের দিন আমাকে জিজ্ঞেস করবেন না? দুনিয়াতে কি কি কাজ করে এসেছো? কি জবাব দিবেন তখন? আল্লাহকে সঙ্গে নেয়া ছাড়াও যদি অঢেল ধন সম্পদও যদি পেয়ে যান, তারপরও কি সমস্যার সমাধান হয়ে গেলো? না, এটা সমাধান নয়। আমার ভাই ও বোনেরা! আমার ইচ্ছা-অনিচ্ছা ঠিক করার ব্যাপারে আমরা আল্লাহ তায়ালার দয়ার মোহতাজ। তিনি কারও মোহতাজ নন। আমরা প্রতিটা ক্ষেত্রে পদে পদে আল্লাহ তায়ালার মুহতাজ। পবিত্র কুরআনে বলা হচ্ছে, يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّاسُ أَنتُمُ ٱلْفُقَرَآءُ إِلَى ٱللَّهِ ۖ وَٱللَّهُ هُوَ ٱلْগَنِىُّ হে মানবজাতি! তোমরা সবাই ফকীর ও মুহতাজ, আল্লাহই শুধু অমুখাপেক্ষী। তিনি কারও মোহতাজ নন। (সূরা ফাতির, ১৫)

আমাদের ইচ্ছা আল্লাহ ব্যতিত পূর্ণ হয় না। কিন্তু আল্লাহ যা ইচ্ছা করেন, তা তিনি কারো ইচ্ছা ছাড়াই করেন। আল্লাহও ইচ্ছা করেন, আমরাও ইচ্ছা করি, কিন্তু ঘটে তাই, যা আল্লাহ চান। আমাদের ইচ্ছা আল্লাহ ব্যতিত পূরণ হয় না এমতাবস্থায় আমাদের করণীয় কি? وَإِنَّ سَلَّمْتَنِي فِيمَا أُرِيدُ كَنَيْتُكَ فِيمَا تُرِيدُ এমতাবস্থায় তুমি যদি আমার ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পণ কর, তাহলে তোমার ইচ্ছার বাস্তবায়নে আমিই তোমাদের জন্য যথেষ্ট হয়ে যাব। তুমি আমার হয়ে যাও, আমি তোমার সব করে দেব। তোমরা অর্থের, সম্পদের, বিত্ত বৈভবের গোলাম হয়ো না। তোমরা বাড়ি গাড়ির গোলাম হয়ো না। টাকা-পয়সার গোলাম হয়ে গেলাম। আর আমরা মরে গেলাম। যেসব লোক এসবের সামনে মাথা ঝুকিয়ে দিল, সে ধ্বংস হয়ে গেল। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, হে আমার বান্দারা! এগুলোকে তোমরা খোদা বানিও না। তোমরা এসবের গোলাম হয়ো না। তোমরা একমাত্র আমার কাজ করো, তাহলে আমি তোমাদের জন্য যথেষ্ট হয়ে যাব।

আল্লাহ তায়ালা বলছেন, مَنْ عَمِلَ صَالِحًا مِنْ ذَكَرٍ أَوْ أُنْثَى وَهُوَ مُؤْمِنٌ যে কোন নারী ও পুরুষ সৎ কাজ করবে, এমন অবস্থায় যে, তার ঈমান আছে। তাহলে কি হবে? তাহলে, আল্লাহ তায়ালা তাকে দুনিয়াতে সুখের জীবন দান করবেন। এর অর্থ এই নয় যে, কেউ নেক আমল করলে অনেক টাকা এসে পড়বে। এর অর্থ হলো, আল্লাহ তায়ালা দুনিয়াতে প্রশান্তির জীবন দান করবেন। এমন ব্যক্তির অন্তরকে আল্লাহ তায়ালা রাজা বানিয়ে দিবেন। তার জন্য নির্ধারিত দুনিয়া এসে তার পায়ে পড়বে। মাথায় উঠবে না। আখেরাত যার লক্ষ্য হয়, দুনিয়ায় তার শান্তির অভাব হয় না। পারমাণবিক শক্তি দ্বারা সমস্যার সমাধান হয় না। সমস্যার সমাধান হয় এখলাস দ্বারা। সমস্যার সমাধান হয় তওবা দ্বারা। সমস্যার সমাধান হয় নেক আমল দ্বারা। নফসের গোলামীতে কোন স্বাদ নেই। আছে পেরেশানী। অর্থ বিত্তের গোলামী সুখের জীবন নয়। আল্লাহ আমাদের কবুল করুন, আমীন।

📘 পৃথিবী আমার আসল ঠিকানা নয় 📄 আল্লাহকে আমাদের প্রয়োজন

📄 আল্লাহকে আমাদের প্রয়োজন


প্রিয় ভাই ও বোন!
এ জগতে সবচেয়ে বেশি মুখাপেক্ষী হলো মানুষ। মানুষের চেয়ে মুখাপেক্ষী আর কোন সৃষ্টি নেই। আর যে মানুষ যত বড় মালদার, সে তত বেশি মুহতাজ। জগতে মানুষ যত বেশি উন্নতি করে, তার মুখাপেক্ষীতা তত বেড়ে যায়। গরীব মানুষ ঝুপড়ি ঘরে ইটের বালিশে ঘুমাতে পারে। আর টাকা ওয়ালাদের পাকা বিল্ডিং, খাট পালংক, ও এয়ার কন্ডিশনার না হলে তাদের চোখে ঘুম আসে না। গরীব মানুষ এক টুকরো রুটি বা এক মুঠো পান্তা ভাতও তৃপ্তি সহকারে খেতে পারে। কিন্তু ধনীরা পোলাও গোশত খেয়েও তৃপ্তির স্বাদ অনুভব করে না।

জগতে এমন কোন মানুষ নেই যে, নিজের সব কাজ নিজে আঞ্জাম দিতে পারে। বিত্তবানরা দাবী করে তারা স্বয়ংসম্পূর্ণ। কিন্তু যখন তারা রোগে আক্রান্ত হয়। তখন ডাক্তারের চেম্বারে ছুটে যায়। বাড়ি-ঘর নির্মাণ করতে হলে মিস্ত্রির শরণাপন্ন হয়। স্বয়ংসম্পূর্ণ তো তাকে বলে, যার কোন প্রয়োজন পূরণে অন্যের দ্বারস্থ হতে হয় না। এ জগতে সবচেয়ে বেশি মুখাপেক্ষী আমি আর আপনি। স্বয়ংসম্পূর্ণ একমাত্র মহান আল্লাহ তায়ালা। এমতাবস্থায় তো আমাদের উচিত ছিল, এই যে, আমরা আমাদের প্রভুর সাথে সম্পর্ক মজবুত করা। কিন্তু তা না করে উল্টো আমরা তাঁর সঙ্গে শত্রুতা করছি। আমরা আল্লাহকে চ্যালেঞ্জ করছি। তাঁর নাফরমানী করছি। বড় বড় গুনাহ করেও আমরা আল্লাহ তায়ালাকে রাগান্বিত করছি।

যখন মুয়াজ্জিন মসজিদের মিনার থেকে ডাকতে থাকে, হাইয় 'আলাছালাহ্, আসো নামায পড়ো। এখন তোমার নামায পড়ার সময়। কিন্তু আমরা ক'জনই বা সে ডাকে সাড়া দেই। অথচ এটা আল্লাহ তায়ালার নির্দেশ। প্রতিদিন পাঁচবার আমরা আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করছি। অথচ আমরা ইহকাল পরকালে আল্লাহ তায়ালার মেহেরবানীর সবচেয়ে বেশি মোহতাজ। বলুনতো, আপনি আপনার চাকরকে, বা কর্মচারীকে কত বেতন দেন? তিন হাজার, চার হাজার, পাঁচ হাজার বা আরও বেশি? সেই চাকরটা আপনার সামনে বসে আছে, আপনি তাকে ডাকলেন, সে আসল না। সে আপনার ডাক শুনেও আপনার কথার গুরুত্ব দিল না। একবার, দুবার, তিনবার, ডাকলেন, সে সাড়া দিল না। আপনার চাকর আপনার ডাকে কোন সাড়া দিল না। আপনি তাকে দ্বিতীয় দিন ডাকলেন। সে সাড়া দিল না। তৃতীয় দিনও এমনই হলো। এমন হৃদয়বান কে আছেন, যে এমন চাকরের চাকুরী বহাল রাখবেন? বলবেন, যাও ভাই, নিজের পথ দেখো। তোমাকে আমার কোন প্রয়োজন নেই। তোমার মত অহংকারী। অবাধ্য চাকরের আমার প্রয়োজন নেই।

বলুন তো আপনার বয়সের কতটা সময় পার করে এসেছেন? ত্রিশ বছর। চল্লিশ, পঞ্চাশ, ষাট, সত্তর, বা আশি বছর? আল্লাহ পাকের নির্দেশ ছিল, দিনে পাঁচ বার নামায পড়ার। মুয়াজ্জিন দিনে পাঁচবার ডাকেন। হাইয়্যা 'আলাছছালাহ্। আসো বান্দা নামায পড়ো। ফজরে ডাকা হয়। যোহরে ডাকা হয়। আসরে ডাকা হয়। মাগরিবে ডাকা হয়। এশায় ডাকা হয়। আল্লাহ বলেন, বান্দা তুমি ত্রিশ বছরে, চল্লিশ বা আশি বছরে একটিবারের জন্যও আমার নির্দেশ মাননি। মুয়াজ্জিন ডেকেছে তোমাকে নামাযের জন্য। তুমি আসনি নামাযে। ফজর কাটিয়েছো আরামের ঘুমে। যোহর, আসর, মাগরিব, এশা পার করেছো তোমার কর্মব্যস্ততায়। নামাযের জন্য সময় হয়নি তোমার। বলুন তো, এ কথার কোন জবাব আছে আমাদের কাছে? যখন জিজ্ঞাসিত হবো এ ব্যাপারে, তখন কি জবাব দেব?

তারপরও মহান মালিক আমাদেরকেও তাঁর নেয়ামতের দ্বারা ভরিয়ে দিচ্ছেন। এরপরও মহান রাব্বুল আলামীন কোন বান্দাকে মাহরুম করছেন না। আমাদের এত অবাধ্যতায়ও তিনি রহমতের দুয়ার বন্ধ করছেন না। এটা যে আমাদের প্রতি আল্লাহ তায়ালার কত বড় মেহেরবানী। আমার অনবরত প্রত্যাখ্যানের পরও তিনি আমাকে রুটি খাওয়াচ্ছেন। আমাকে পানি পান করাচ্ছেন। সুখ নিদ্রা দিচ্ছেন। সুস্থতার নেয়ামত দান করছেন। ভালোবাসার মত মানুষ দিয়েছেন। ছায়া দিচ্ছেন। বিপদে উদ্ধার করছেন। আলো দিচ্ছেন। অসংখ্য নেয়ামত দ্বারা আমাদের ভরিয়ে দিচ্ছেন। কত বড় মেহেরবান আল্লাহ, যে, এত নাফরমানী দেখেও আমাদের সবই দান করছেন। কি হলো আমাদের! দুনিয়ার একটু সুখের জন্য সৃষ্টিকর্তাকেই ভুলে যাই। নাফরমানী করতে ভয় করি না! এত দুঃসাহস আমাদের? এত স্পর্ধা আমাদের? আমাদের এত অহংকার? অথচ যদি আল্লাহ পাক দুনিয়ার ব্যবস্থাপনাকে সামান্যতম হেরফের করে দেন, তাহলে আমাদের জীবন দূর্বিষহ হয়ে উঠে। আমরা পুরোপুরি আল্লাহ তায়ালার দয়া ও অনুকম্পার উপর নির্ভরশীল।

সমস্ত বিশ্ব চরাচর আল্লাহ পাকের আয়ত্বের মধ্যে রয়েছে। আল্লাহ পাকের শক্তি ও কবজার মধ্যে রয়েছে। আমাদের মাথার উপর পাঁচশত মাইল দীর্ঘ বাতাসের আবরণ রয়েছে। মহান রাব্বুল আলামীন যদি এ বাতাসকে ফিরিয়ে নেন, তাহলে মানুষ সহ পৃথিবীর সব প্রাণী এক সেকেন্ডের মধ্যেই দম বন্ধ হয়ে মারা যাবে।

প্রিয় ভাই ও বোন! আমার জীবন যৌবন সবকিছু যদি বিসর্জন দিতে হয়, তবুও আমাদের মাকছাদ হওয়া উচিৎ আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি। আমাদের পথ হওয়া উচিৎ সিরাতে মুস্তাকিমের পথ। যে পথটি চলে গেছে জান্নাতের দিকে। আর এ পথের সন্ধান দিতে যারা অক্লান্ত পরিশ্রম করে মানুষকে দ্বীনের পথে ডাকছেন। তারা হলো, দাওয়াত ও তাবলীগ ওয়ালারা। মাদারিসে কওমিয়া। আমরা চাই, দুনিয়ার নেশায় মত্ত পুরুষ ও নারীরা ভেতর থেকে গুনাহের নেশা দূর করে ফেলুক। তারা আল্লাহর সত্ত্বাকে মাকসাদ বানিয়ে জীবন অতিবাহিত করুক। আল্লাহ আমাদের কবুল করুন, আমীন।

ফন্ট সাইজ
15px
17px