📄 অবধারিত মৃত্যু
প্রিয় ভাই ও বোন! নিশ্চয়ই মানুষ মরণশীল। মৃত্যু আসবেই। সবাইকে মৃত্যুর স্বাদ পেতেই হবে। মৃত্যুর দোলনায় দুলছে সব মানুষ আর জিন। মৃত্যু থেকে বাঁচার কোন সুযোগ নেই। যদিও সে থাকে মজবুত অট্টালিকায়। মানুষ বড় আশা নিয়ে বাঁচে। অসুখ হয়েছে? হাসপাতালে ছুটে যায় ডাক্তারের কাছে। বড় আশা নিয়ে যায় ভাবে ডাক্তার বুঝি তাকে সারিয়ে তুলবে। কিন্তু যখন পাশের বেডে আরেক রোগী ধুকতে ধুকতে মারা যায় তখন সে আশা হারিয়ে ফেলে। আবার কতজন চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে যায়। একই ডাক্তারে সুস্থ হচ্ছে কত রোগী। আবার মারাও যাচ্ছে কতজন। আশ্চর্য সে অবস্থা! অথচ এখানে ডাক্তারের কোন কৃতিত্ব নেই। জীবন মৃত্যুর মালিক মহান রব্বুল আলামীন। ডাক্তার শুধু চেষ্টা চালিয়ে যায়। বাচা মরা আল্লাহর হাতে।
মৃত্যু প্রতিক্ষণ প্রতি মুহূর্ত আমাদের জন্য অপেক্ষায়। ওৎ পেতে থাকে। প্রতিক্ষণ প্রতি মুহূর্তে। মৃত্যুর অমোঘ বিধান এড়াবে কে? কি দিয়ে? টাকা-রুপি, পাউন্ড। রিয়াল, ডলার? কোন কিছুই বাঁচাতে পারে না মৃত্যু থেকে।
হযরত উমর ইবনে আব্দুল আজিজ (রহ.), যাকে দ্বিতীয় উমর বলা হয়। তিনি এক জানাযায় শরিক ছিলেন। তিনি বিষণ্ণ। তিনি কবরস্থানের এক নির্জনে একা বসেছিলেন। গভীর চিন্তা মগ্ন। একজন এসে বলল—হে প্রিয় খলিফা! এই জানাযা ছেড়ে আপনি এ কবরগুলোর সামনে বসে বসে কি ভাবছেন? খলিফা উত্তর দিলেন—আমি কবরের কথা শুনছি। লোকটি চমকে উঠল। কবরের কথা শুনছেন? তিনি বললেন—হে, আমি কবরের কথা শুনছি। কবর আমাকে বলছে—হে ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ! হে মুসলমানদের খলিফা! আপনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন না যে আমার কাছে যারা আসে তাদের সাথে আমি কি আচরণ করি? আমি বললাম—বলো! কবর বলল—আমি তাদের কাফনের কাপড় পচন ধরাই। তাদের শরীর ছিঁড়ে ফেলি। টুকরো টুকরো করে ফেলি। রক্ত চুষে ফেলি, গোশত খেয়ে ফেলি। আর তাদের দেহের জোড়াগুলো খুলে ফেলি। কাঁদ থেকে আলাদা করে ফেলি হাত। শরীর থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করে ফেলি। পা গুলো কোমর থেকে। হাটু উরু থেকে আলাদা করে ফেলি।
চুপ করলেন হযরত ওমর বিন আব্দুল আজিজ। গভীর বিষাদের ছায়া পড়ল তাঁর চেহারায়। ভিজে উঠল তাঁর চোখ দুটো। অনেকক্ষণ কাঁদলেন তিনি। তারপর কান্না ভেজা স্বরে বললেন—দুনিয়া দু'দিনের। আর এর ছলনা অনেক বেশি। আজ এখানে যে পেয়েছে খুব সম্মান। সম্মান পেয়ে ভুলে গেছে আল্লাহকে। পরকালে তার হবে অনেক অপমান। আজ এখানে যে ধনী পরকালে সেখানে হিসেবে আটকে যাবে। এখানের যৌবন খুব জলদি বার্ধক্যে গ্রাস করে। মৃত্যু এসে হানা দেয় যখন তখন। আচমকা কেড়ে নেয় প্রাণ। এই ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার ধোঁকায় পড়ো না। দেখো এখানকার রাজা বাদশাদের। কোথায় তারা আজ? তারা বড় বড় শহর তৈরি করেছিল। বড় বড় অট্টালিকা তৈরি করেছিলো। ফুলে ফলে সুশোভিত বাগান আবাদ করেছিল। তাদের তৈরি চোখ ঝলসানো ইমারতগুলো আজ এভাবেই পড়ে আছে। কে বাস করে আজ সেখানে? এর নির্মাতারা আজ কোথায়? সব ছেড়ে আজ তারা চলে গেছে। পড়ে আছে নির্জন কবরে। সেখানে একাকী তারা। গাঢ়ো আঁধার তাদের ঘিরে আছে। আলো নেই বাতাস নেই। স্ত্রী পুত্র পরিজন নেই। আনন্দ নেই। কবরে পড়ে আছে একাকী। আমল ছাড়া কোন সাথী নেই।
📄 এখন তারা পোকার খাদ্য
মহান রাব্বুল আলামীন তাঁর অসীম দয়া ও করুণায় এই সব মানুষগুলোকে দান করেছিলেন সুন্দর চেহারা। সুঠাম দেহ। দিয়েছিলেন মেধার প্রখরতা। দিয়েছিলেন সম্পদ রাজত্ব প্রভাব প্রতিপত্তি। তারা ভাবতেও পারেনি এসব তাদের কাছে থাকবে না। সব কেড়ে নেয়া হবে। শয়তানের ধোঁকায় পড়ে তারা জড়িয়ে পড়েছিল নাফরমানীতে। মহান মালিকের দেওয়া নেয়ামতকে তারা খরচ করেছিল অন্যায় কাজে। তারা কামাই করতো হারাম পন্থায়। খরচও করত হারাম পথে। এখন দেখো কি করুণ অবস্থা ওদের। কবরের মাটি তাদের দেহকে পঁচিয়ে ফেলেছে। হাড় থেকে গোশতগুলো আলাদা হয়ে গেছে। বিষাক্ত পোকা-মাকড় খাচ্ছে তাদের গোশত হাড়ের মজ্জা। তাদের শক্তিশালী সুন্দর সুঠামদেহের ক্ষমতা শেষ। ঘুমাতো নরম কোমল বিছানায়। চার পাশে থাকত সেবক সেবিকা। ঘুমের সময় তারা হাত পা টিপে দিতো। এরা ছিল ধনী। ধন-সম্পদ এদের পরকাল বিমুখ করে রাখতো। আর আজ? বড়ই করুন অবস্থা এদের। তাদের প্রশ্ন করো কেমন আছে তারা অন্ধকার কবরে? কি করে পড়ে আছে চাকর বাকরদের সাথে একই কবরস্থানে?
জিজ্ঞেস করো ধনীরা! কি কাজে এসেছে তোমাদের সম্পদ? গরীবকে জিজ্ঞেস করো সে সম্পদ না পেয়ে কি ঠকেছিল? এখানে কবরে তো সবাই একই অবস্থায় পড়ে আছে। বিছানা নেই বালিশ নেই আলো নেই সঙ্গী নেই। একাকী নির্জনে পড়ে আছে সবাই। আমল ছাড়া কোন সাথী নেই।
প্রিয় ভাই ও বোন! কবরের পাশে দাঁড়িয়ে বলছিলেন খলিফা উমর বিন আব্দুল আজিজ। বলছিলেন—দেখো এদের অবস্থা! এরা কেউ কেউ কালকেও ছিলো দুনিয়াতে। সুস্থ ঠোঁট জিভ ব্যবহার করে কত কথাই না বলত! রঙিন এ দুনিয়াকে দেখত চোখ দুটি দিয়ে। দেখত লাল নীল সবুজ সাদা কালো। কতো রঙীন দুনিয়ার রূপ দেখতো। কত তৃপ্তি ছিল। দেখত হারাম বস্তুও। কারও চোখ জোড়া ছিল হরিণীর মত সুন্দর। কত নারীর চোখের দৃষ্টিতে আলোড়ন উঠতো পুরুষের হৃদয়ে। সেই চোখ দুটোর আজ কি করুণ দশা। বেরিয়ে পড়েছে মণি। গলে পচে খসে গেছে পাতা আর পাপড়ি। আজ কোথায় সেই লম্বা পাপড়ি? তরবারির মতো ভ্রু? বাদামী সবুজ মনি? কোথায় আজ তাদের চোখ ঝলসানো রূপ যৌবন? নরম কোমল বিলাস প্রিয় দেহ? যা সামান্য কষ্ট সহ্য করার ক্ষমতা ছিল না। কবরের কীট আর পোকা কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে তাদের অহংকারী দেহ। খসে গেছে শরীরের চামড়া। মাটি খেয়ে ফেলেছে অঙ্গ প্রত্যঙ্গ। কবরের তাপ দেহের হাড়গুলো গলিয়ে দিয়েছে। গলে পচে খসে গেছে সে মূল্যবান শরীর যা দুনিয়াতে চলত দম্ভভরে। হাটতো মাথা উঁচু করে।
হযরত উমর বিন আব্দুল আজিজ বলছেন আর কাঁদছেন। খলিফা অনেক আবেগতাড়িত হয়ে পড়েছিলেন। তিনি বলছেন—আহ! আজ কি পরিণতি হচ্ছে তোমাদের? আজ কোথায় তোমাদের আরাম আয়েশের উপকরণ? কোথায় আজ তোমাদের সেই চাকর বাকর? তুমি তাদের ইশারা করতে তারা তড়িৎ ছুটে আসতো। তোমার ভয়ে সব করত। তোমার ভয়ে আল্লাহর নাফরমানী করত। এখন কোথায় তারা? সেই সব বিশাল অট্টালিকা? সাজানো গোছানো বাগানবাড়ি? আরাম আয়েশের বিলাস ভবন?
মৃত্যু তো এমনই এক বাস্তবতা যা কেড়ে নেয় সব কিছু। ভেঙ্গে চুরমার করে দেয় সব স্বপ্ন-সাধ। তোমার কামাই করা সম্পদ তোমার থাকে না। তোমার স্ত্রী সন্তানরা তোমাকে ভুলে গেছে। তোমার কামাই করা সম্পদে তারা আজ বিলাসিতায় মজে আছে। তোমার কথা ভাববার এত সময় কোথায় তাদের? তোমার একাকীত্ব তোমার অসহায়ত্বের কোন খবর তাদের কানে পৌঁছে না। তোমাকে তারা ভুলে গেছে। তোমার স্ত্রী ভুলে গেছে তোমাকে। তোমার ছেলে মেয়ে ভুলে গেছে তোমাকে। তোমার বন্ধু-বান্ধব সবাই ভুলে গেছে তোমাকে। কেউ মনে রাখেনি তোমায়। তোমাকে আর কারও প্রয়োজন নেই। তুমি একা। একেবারে একা। তোমার সুন্দরী স্ত্রী বিয়ে করেছে এখন তোমার কথা মনেও নেই। তোমার স্বামী বিয়ে করেছে। এটাই তো জগতের নিয়ম। ধোঁকা শুধু ধোঁকা দুনিয়া ধোঁকার ঘর। প্রতারণার বাজার। কিন্তু তুমি বুঝনি।
এমন অনেক কথা বললেন মহান খলিফা উমর বিন আব্দুল আজিজ (রহঃ)। তারপর বললেন দুটি কথা—হে আহাম্মক! দুনিয়ার মিথ্যা ধোঁকায় পড়ে জীবন পার করো না। জীবন কিন্তু সংক্ষিপ্ত। আর মৃত্যু তো তোমার ঘাড়ের রগের চেয়েও নিকটে। তাই পুঁজি সংগ্রহ করে কবরের জন্য প্রস্তুত হও।
📄 মৃত্যুর প্রস্তুতি
প্রিয় ভাই ও বোন! আমরা কি মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি নিয়েছি? আমরা কি আল্লাহ তায়ালার রাজি ও খুশি অর্জন করতে পেরেছি? কবরের জীবনে নেক আমলের পুঁজি ছাড়া আর কিছুই কাজে আসবে না। কবর আমার পরকালের প্রথম ঘাটি। দুনিয়ার যিন্দেগীতে যা কিছু নেক আমল পুঁজি হিসেবে নেয়া যায় তাই পরকালে আমার মুক্তির জন্য সহজ হবে। এমন অনেককেই দেখেছি যে আগামীতে ভালো হয়ে যাওয়ার অপেক্ষায় ছিল কিন্তু মৃত্যু তাকে সেই সুযোগ দেয়নি। হঠাৎ মৃত্যু তাকে পাকড়াও করেছে।
বন্ধুরা! দুনিয়ার দুঃখ ও ক্ষণস্থায়ী। এর সুখও ক্ষণস্থায়ী। আপনার আশপাশ দৃষ্টি মেলে দেখুন দেখবেন সব শ্রেণীর মানুষ কোন না কোন পেরেশানীতে ডুবে আছে। কেউ সংসার নিয়ে পেরেশানীতে। কেউ ব্যবসা নিয়ে পেরেশানীতে। কেউ অসুস্থতা নিয়ে পেরেশানিতে। নানা রকমের হতাশা পেরেশানীতে মানুষ বিপর্যস্ত। কিন্তু এমনটি কেন? এর কারণ হলো আজ আমাদের জীবনে পরকালের ভাবনা নেই। যে কারণে বিপদ-আপদ মুষলধারে বৃষ্টির মতো পড়ছে। আজ আমরা বলি নানান রকমের ঝামেলায় পড়ে আমরা পরকালের কথা ভুলে গিয়েছিলাম। কিন্তু ভাই; যেদিন চোখ দুটি বন্ধ হবে তখন আমাদের চোখের সামনে থেকে পর্দা সরে যাবে। বুঝবো আমরা কেমন জীবন কাটিয়েছি? মনে রেখো মৃত্যুর সময় শয়তান বাবা-মা অথবা বন্ধুর আকৃতিতে সামনে এসে মানুষকে ধোঁকা দেয়। মানুষকে মৃত্যুর সময় ঈমানহারা করার চক্রান্ত করে। এ বিপদ থেকে আল্লাহ তায়ালার রহমত ছাড়া কেউ বাঁচতে পারবে না।
হযরত কাব আহবার (রাযি.) বলতেন—যে ব্যক্তি মৃত্যুকে চিনে ফেলেছে তার জন্য দুনিয়ার যিন্দেগী সহজ হয়ে গেল। আর কুফুরীর উপর যার মৃত্যু হয়েছে তারা বড় ধরণের ক্ষতি এবং ধ্বংসের সম্মুখীন হয়েছে। কবীরা গুনাহ করে যারা মৃত্যু বরণ করেছে তারাও বিরাট ক্ষতি ও ধ্বংসের সম্মুখীন হয়েছে।
প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতভর আল্লাহ তায়ালার দরবারে কেঁদেছেন অনুনয় বিনয় করেছেন বলেছেন—হে আল্লাহ! আমার উম্মতকে তুমি জাহান্নামের কঠিন আযাব থেকে রক্ষা করো। উম্মতের জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ভালবাসা ছিল অনেক গভীর। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অবস্থাতো এমন ছিল যে তিনি ক্ষুধার যন্ত্রণায় পেটে পাথর বেঁধেছেন। ক্ষুধার কষ্ট সহ্য করেছেন। এমন একটা সময় ছিল যখন তিনি সবার কাছে বিশ্বাসী ও সত্যবাদী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। হযরত খাদিজা (রাযি.) এর মত সম্ভ্রান্ত নারী ছিলেন তাঁর স্ত্রী। সম্পদ ছিল ক্ষমতা ছিল। কিন্তু উম্মতের জন্য সব ত্যাগ করেছেন। পেটে পাথর বেঁধেছেন। তালি দেয়া জামা পড়েছেন। চারদিন পর্যন্ত ঘরে খাওয়ার মতো কিছু ছিল না। দুইমাস পর্যন্ত ঘরে চুলা জ্বলেনি। তবুও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মতের জন্য কেঁদেছেন। আর আমরা আজ কি করছি? আমরা আজ তাঁর আদর্শকে জবাই করছি। আমরা কেমন অকৃতজ্ঞ যে এমন নবীর আদর্শ ছেড়ে ইহুদী নাসারাদের আদর্শ গ্রহণ করছি?
প্রিয় ভাই ও বোন! আমরা গাফলতির মধ্যে পড়ে আছি। এখনই আমাদের গাফলতি থেকে বের হতে হবে। সম্মান যখন আল্লাহর গোলামীতে কামিয়াবী যখন আল্লাহর প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মহান আদর্শে তখন আমাদের দায়িত্ব হলো আল্লাহ তায়ালার আনুগত্য করা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পবিত্র আদর্শে জীবন সাজানো। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন—আমার বান্দা! তোমরা আমার আনুগত্য করো। আমার আনুগত্যের মধ্যেই রয়েছে তোমাদের কামিয়াবী। তোমাদের সফলতা। আমার অবাধ্যতা আমার নাফরমানীতে রয়েছে তোমাদের জন্য ধ্বংস। তাই আসুন আল্লাহর আনুগত্য করি।
📄 আল্লাহর আনুগত্যের মর্যাদা
প্রিয় ভাই ও বোন! সকল কল্যাণ অকল্যাণের মূল হচ্ছে মহান রাব্বুল আলামীনের বন্দেগী ও আনুগত্য। এজন্যই আল্লাহ তায়ালা বান্দাকে তাঁর আনুগত্যের প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছেন। সে একই উদ্দেশ্যে তিনি নবী রাসূলগণ প্রেরণ করেছেন। যাতে তাঁরা মানুষকে সব রকমের গুনাহ থেকে মুক্ত করে আল্লাহর পরিচয় ও তাঁর নূরের দিকে নিয়ে যান। আর এতে করে বান্দা দুনিয়ার যিন্দেগীতে আল্লাহ তায়ালার অনুগত বান্দা হয়ে চিরশান্তির জান্নাতের মালিক হতে পারে। এগুলো আল্লাহ তায়ালা মুত্তাকীদের জন্য পুরস্কার হিসেবে রেখেছেন। আল্লাহ তায়ালাতো মানুষকে অহেতুক সৃষ্টি করেন নাই। তিনি অন্যায়কারীকে শাস্তি দিবেন আর সৎকর্মশীলদের উত্তম পুরস্কার দিবেন।
যদিও মহান রাব্বুল আলামীন কারও আনুগত্যের মুখাপেক্ষী নন এবং কারও অবাধ্যতাও আল্লাহর কোন ক্ষতি করতে পারে না। কিংবা আল্লাহর মহত্বে ও বড়ত্বে কোনরূপ আঘাত হানেনা। মানুষ দম্ভ-অহংকারে তাঁর আনুগত্য ছিন্ন করলে তাতে তাঁর কিছু ক্ষতি হয় না। স্বয়ং নূরের ফেরেশতারাই তো দিনরাত অব্যাহতভাবে আল্লাহ তায়ালার তাসবীহ ও গুণগান গাইছেন। তাই যে ভাল করবে তাতে বান্দার নিজের লাভ। আর যে খারাপ করবে তাতে নিজের ক্ষতি। বস্তুত আল্লাহ তায়ালা তো বে-নিয়ায। অমুখাপেক্ষী। আর আমরা সবাই আল্লাহ তায়ালার গোলাম তাঁর মুখাপেক্ষী।
কি বিস্ময়কর ব্যাপার! আমরা যদি একটি গোলাম খরিদ করি তাহলে আমরা চাই যে সে গোলাম যেন সম্পূর্ণ অনুগত থাকে। নিজের সব আদেশ মেনে চলে। খেদমতও দায়িত্ব যথাযথভাবে আঞ্জাম দেয়। মনিবের প্রতি যেন অনুগত থাকে। আবার মনিবও তার সামান্য পদস্খলন সহ্য করে না। অনিয়ম করলে গোলামের উপর রাগান্বিত হয়। কখনও গোলামের ভাতা কিংবা খাবারও বন্ধ করে দেয়। অথবা তাকে বিতাড়িত করে। দুনিয়ার মনিব যখন তার ক্রয়কৃত গোলামের প্রতি এতটা কঠিন, নিজের কাজগুলো পূর্ণাঙ্গভাবে করিয়ে নেয়, অবাধ্য হলে কঠিন পরিণতি ভোগ করতে হয়। তাহলে আমরা আমাদের আসল মুনিবের মহান রবের আনুগত্য করতে দ্বিধা করি কেন যিনি আমাদের এত নেয়ামত দান করেছেন অথচ আমাদের অবাধ্যতার সীমা নেই। তবুও তিনি আমাদের প্রতি সেই নেয়ামত ও অনুগ্রহসমূহ বন্ধ করেন নাই। এ নেয়ামতগুলো না থাকলে আমাদের ধ্বংসই ছিল অবধারিত। অথচ একটি মাত্র অপরাধের জন্যও তিনি আমাদের শক্তভাবে পাকড়াও করতে পারেন। কিন্তু তিনি তা করেন না। বরং আমাদের অবকাশ দেন যাতে আমরা তওবা করতে পারি। আর বান্দার তওবা আল্লাহ তায়ালা কবুল করেন। প্রকৃত জ্ঞানীতো সেই ব্যক্তি যে আল্লাহ তায়ালার ক্ষমা ও অনুগ্রহের দিকে অগ্রসর হয়। আল্লাহ তায়ালার আনুগত্যকে সব কিছুর উপর প্রাধান্য দেয়। কখনও কোন গুনাহ হয়ে গেলেও তওবা করে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে。
হযরত আবু দারদা (রাযি.) হযরত কাব আহবার (রাযি.) কে বললেন—ভাই! আমাকে কিছু নসিহত শোনান। হযরত কাব আহবার (রাযি.) বললেন—আল্লাহ পাক বলেন নেককারগণ আমাকে দেখার জন্য পাগলপারা। আর আমিও তাদের সঙ্গে মিলনের জন্য তাদের চেয়ে অধিক পাগলপারা। যে আমাকে তালাশ করে সে আমাকে পায়। ইমাম গাজালী (রহ.) লিখেন—নেককার বান্দা তার জীবনের রোখ সম্পূর্ণ ভাবে আল্লাহ তায়ালার দিকে করে দেয় এবং জীবনের বাগডোর সম্পূর্ণ আল্লাহর হাতে তুলে দেয়। কখনও কোন গুনাহ হয়ে গেলেও তৎক্ষণাৎ তওবা করে আপন স্রষ্টার দিকে রুজু করে। আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয় না। সে আল্লাহর সব নেয়ামতের শোকুর ও আনুগত্যের মাধ্যমে তাঁর প্রিয়পাত্র হওয়ার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকে। থেমে যায় না। কারণ তার বুকভরা আশা থাকে হয়ত সেও আল্লাহ তায়ালার প্রিয়দের একজন হিসেবে গণ্য হবে। তার কামনা থাকে এটাই যে সে যেন আল্লাহ তায়ালার প্রিয় হতে পারে। বস্তুত যে আল্লাহর হয়ে যায় আল্লাহও তার হয়ে যান。
হযরত আবু দারদা (রাযি.) কাব আহবার (রাযি.) থেকে নসিহত শুনছিলেন—আল্লাহ বলেছেন নেককার বান্দা আমাকে দেখার জন্য পাগল পারা আমিও তাদের সাথে মিলনের জন্য পাগলপারা। যে আমাকে তালাশ করে আমাকে সে পায়। যে আমি ব্যতিত অন্য কাউকে তালাশ করে সেতো আমাকে পেতে পারেনা।
হযরত দাউদ আলাইহিস সালাম সম্পর্কে বর্ণিত আছে আল্লাহ তায়ালা হযরত দাউদ আলাইহিস সালাম কে বললেন—হে আমার নবী! দুনিয়াবাসীদের এ খবর শুনিয়ে দাও যে আমাকে ভালবাসে আমিও তাকে ভালবাসি। যে আমাকে স্মরণ করে আনন্দ পায় আমিও তাকে স্মরণ করে আনন্দ পাই। যে আমাকে সঙ্গী করে আমিও তাকে সঙ্গী করি। যে আমাকে পছন্দ করে আমিও তাকে পছন্দ করি। যে আমার আনুগত্য করে আমি তার আনুগত্যের বিনিময় দান করি। আমি যদি দেখতে পাই যে এক বান্দা আমাকে প্রাণ দিয়ে ভালবাসে সে ভালবাসা আমি গ্রহণ করি। আমি এত বেশি মুহাব্বত করি যে জগতে আর কেউও তার সমকক্ষ থাকে না। অতঃপর হে আমার বান্দারা! অহংকার ও অহমিকার জাল ছিন্ন করে আমার দেওয়া সম্মান আমার বন্ধুত্ব ও আমার সাথে মোহাব্বতের পথ গ্রহণ করো। আমার সাথে প্রেম করো আমিও তোমাদের সাথে প্রেমের বন্ধনে আবদ্ধ হবো এবং আবদ্ধ করবো।
এক বুযুর্গ বলেছেন, হাদীসে কুদসিতে আছে আল্লাহ তায়ালা বলেন—যে ব্যক্তির অন্তরে আমার স্মরণ ও আমার যিকিরের প্রতি অধিক আগ্রহ ও আকর্ষণ লক্ষ্য করি তার যিম্মাদার আমি হয়ে যাই। আমি তার যাবতীয় প্রয়োজন পূর্ণ করি। সর্বদা তার তত্ত্বাবধান করি। তার সাথে কথা বলি এবং তাকে ভালবাসি। ইমাম গাজালী (রহ.) বলেন—মৃত্যুর সময় প্রতিটি রূহ প্রচণ্ড পিপাসায় অস্থির হয়ে যায় এবং এ অবস্থায়ই দুনিয়া থেকে বিদায় নেয়। কিন্তু একমাত্র আল্লাহর যিকিরকারী ব্যক্তি তখন পিপাসার্ত হয় না।
এক বুযুর্গের অন্তিম সময়ে তার এক বন্ধু তাকে কালেমা পাঠ করার জন্য তালকীন করে। সে বুযুর্গ তা পাঠ না করে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। বন্ধু আবার তালকীন করতে থাকে সে বুযুর্গ আবারও মুখ অন্যদিকে ফিরিয়ে নেয়। তৃতীয়বার তালকীন করলে তিনি স্পষ্ট অস্বীকার করে বললেন—না। বন্ধু এতে অত্যন্ত মনক্ষুণ্ণ হন। কিছুক্ষণ পর বুযুর্গের জ্ঞান ফিরে আসলে চোখ মেলে তিনি জানতে চান—তোমরা কি আমাকে কিছু পড়তে বলেছিলে? বন্ধু বললেন—হাঁ, আপনাকে কালেমা পড়ার জন্য তিনবার বলা হয়েছিল দুইবার আপনি মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। তৃতীয়বার স্পষ্ট অস্বীকার করেছেন। বুযুর্গ বললেন—প্রকৃত ঘটনা এই যে অভিশপ্ত ইবলিস এক পেয়ালা পানি হাতে আমার শিয়রে দাঁড়িয়ে ছিল। বার বার সে পানির পাত্রটি আমার দিকে বাড়িয়ে দিচ্ছিল। বলছিল পানির প্রয়োজন আছে কি? আমি বললাম হ্যাঁ আমার পানি লাগবে। তখন ইবলিস আমাকে বলল তাহলে তুমি সাক্ষ্য দাও যে ঈসা আলাইহিস সালাম আল্লাহর পুত্র। আমি তখন মুখ ফিরিয়ে নিয়েছি। পুনরায় ইবলিস আমাকে সেই কথাই বলল আমি মুখ ফিরিয়ে নিয়েছি। তৃতীয়বার যখন সে একই কথার পুনরাবৃত্তি করলো তখন আমি স্পষ্ট ভাবে অস্বীকার করে বলেছি—না, কিছুতেই এ সাক্ষী আমি দেব না। তারপর ইবলিস পেয়ালাটি জমিনের উপর সজোরে নিক্ষেপ করে পালিয়ে যায়। তোমাদের তালকীনের সময় আমি আসলে শয়তানের প্রতারণাকে প্রত্যাখ্যান করছিলাম কালেমার তালকীনকে নয়। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নাই। হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর বান্দা ও রাসূল।
তো ভাই ও বোন! শয়তান মানুষের চির শত্রু। তাই শয়তানের প্রবঞ্চনা থেকে বেচে থাকতে হবে। আল্লাহ তায়ালা যেন শয়তানের ধোঁকা থেকে আমাদের পানাহ দেন। আল্লাহ তায়ালার যিকিরও স্মরণ যদি আমাদের অন্তরে জারি থাকে তাহলে শয়তানের ধোঁকা আমাদের ঘায়েল করতে পারবে না। আল্লাহ আমাদেরকে হেফাযত করুন। আমীন।