📄 নামাযের একাগ্রতা
আমি তখন কলেজে পড়তাম। তখন দেখতাম কলেজের এক ছাত্র কলেজে দাওয়াত দিতো ছাত্রদের মাঝে। তার নাম ছিল নাইম বাঙালী। আমাকে তখনও তার দাওয়াতে আকৃষ্ট করেনি। কিন্তু তার একটি আমল আমাকে বদলে দিয়েছে। একদিন তাকে আমি নামায পড়তে দেখলাম। নামাযে তার মনোযোগ, তার একাগ্রতা আমাকে আকৃষ্ট করল। তার নামাযের বাহিরটা ছিল শানদার আর ভেতরটা ছিল জানদার। নাইম ভায়ের নামায আমার অন্তরে এমনভাবে ক্রিয়া করল যে আমার অন্তর সাক্ষ্য দিল যে সে যে দাওয়াত দিচ্ছে সে দাওয়াতে আমাদের যা বলেছিল সবই সঠিক। তার দাওয়াত কবুল করে আল্লাহর পথের পথিক হওয়া আবশ্যক। অবশ্যই সে পথে শান্তি ও নাজাতের উপায় নিহিত।
আরেকদিন আমরা ক'জন বন্ধু হোটেলের চেয়ারে বসে খোশগল্প করছিলাম। হোটেলটি দো'তলা ছিল। নাইম ভাই সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়েছিলেন। তার পা দুটি ভেঙ্গে গিয়েছিল। আমি দেখলাম নাইম ভাই পা টেনে টেনে একটি একটি করে সিঁড়ি ভেঙ্গে নিচে নামছেন। তিনি নামাযের জন্য মসজিদে আসছিলেন। আমি বিস্মিত হলাম। ভেতর থেকে আক্ষেপ বেরিয়ে এলো—আহ্! পঙ্গু হওয়া সত্ত্বেও ছেলেটি নামাযের জন্য কত কষ্ট করে দোতলা থেকে নিচে নামছে। কত কষ্ট স্বীকার করছে। আর আমরা সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়া সত্ত্বেও মসজিদে যাচ্ছি না!
আমি জেনারেল হামিদকে দেখেছি, তিনি বলতেন—হে আল্লাহ! তোমার প্রিয় বান্দারা যেভাবে নামায পড়েছিলেন আমিও তেমন নামায পড়ব। তেমন নামায পড়ার চেষ্টা করব। কিন্তু নামায পড়ার পর বলতেন—আফসোস আমি তেমন ভাবে নামায পড়তে পারলাম না!
📄 আমার এক ক্লাস মেটের ঘটনা
আমার এক ক্লাস মেট ছিল, সরকারী কলেজে এক সাথে লেখাপড়া করতাম। জবরদস্ত মানুষ ছিল, সুঠাম সুপুরুষ। মরি থেকে ইসলামাবাদ পায়ে হেটে চলে আসত। পঁয়তাল্লিশ কিলোমিটার পথ। পিতা ব্রিগেডিয়ার। মা ও উচ্চ বংশের শিক্ষিত মেয়ে ছিল। তার নাম ছিল মোস্তফা। একটা সময় খারাপ ছেলেদের সাথে মিশে সে মদ ও নারীতে আসক্ত হয়ে পড়ে। সমাজের অপরাধীদের সাথে তার বন্ধুত্ব গড়ে উঠে।
একবার আমরা জামাতসহ ইসলামাবাদ গেলাম। এক ব্যক্তি আমাকে বলল—আপনার এক বন্ধু আছে এখানকার পরিবেশ সে নোংড়া করে রেখেছে। তার কারণে সমাজে নানা রকমের অপকর্ম হচ্ছে। সে এগুলোর সাথে জড়িত। আমি আপনার সাথে তাকে সাক্ষাত করিয়ে দেব। সাক্ষাতের সময় ঠিক হলো। কিন্তু বৃষ্টির কারণে আমাদের ব্যস্ততা বেড়ে যাওয়ায় তার সাথে সাক্ষাত হয়নি।
সেদিনই এক নামাযের সময় আমি শুকনো স্থান খুঁজে নামায পড়তে গেলাম। নামায শেষে দেখি একটু দূরেই তার মত এক ব্যক্তি বসে আছে। আমি তাকে ভালভাবে দেখলাম কিন্তু পুরোপুরি চিনতে পারিনি। সেও আমাকে দেখছে কিন্তু কিছু বলছে না। আমি এক ব্যক্তিকে তার নিকট পাঠালাম। বললাম ওকে গিয়ে বলবে তোমার নাম কি মোস্তফা? যদি মোস্তফা হয় তাহলে বলবে তারিক জামিল তোমাকে ডাকছে। তার অবস্থা অন্য রকম ছিল। চেহারা সুরত বদলে গিয়েছিল। দুই কানে সোনার দুল, পরনের পোশাকও বিস্ময়কর ধরনের।
লোকটি গিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করল—তোমার নাম কি মোস্তফা? সে বলল—হে, আমার নাম মোস্তফা। লোকটি বলল—তোমাকে তারিক জামিল ডাকছেন। সে এলো আমার কাছে। এসেই বলল—শুনেছি তুমি নাকি তাবলীগ জামাতের বড় নেতা হয়ে গেছো? আমি বললাম—না, আমি কিছুই হইনি। মোস্তফা বলল—আমি তোমার ব্যাপারে অনেক কিছু শুনেছি। এভাবে তার সাথে অনেক কথা হলো। তাকে বুঝাতে শুরু করলাম। একসময় সে এক চিল্লার জন্য রাজি হলো।
এক চিল্লা লাগানোর পর সে সব অপকর্ম ছেড়ে দিল। কিন্তু পরে আবার মদ ধরল। নারী আর জুয়া ছেড়ে দিল। তারপর ১৯৯৬ সালে আবার তার সাথে সাক্ষাত হলো, বললাম—মোস্তফা! নারী ও জুয়াতো ছেড়েছো। মদ ছেড়ে দাও। মোস্তফা বলল—২০০০ সালে তিন চিল্লা দিব। তারপর পাক্কা তওবা করে সব ছেড়ে দেব। নিজেও হজ্জ করব মাকেও হজ্জ করাবো। আমি বললাম—দোস্ত তোমার কাছে এমনকি গ্যারান্টি আছে যে তুমি ২০০০ সাল পর্যন্ত বেঁচে থাকবে? সে বলল মরব না। তার কথাগুলো পাগলের প্রলাপ মনে হলো। ১লা সেপ্টেম্বর ১৯৯৬ তার সাথে আমার এসব কথা হয়েছিল। ৯৮ সালের অক্টোবরে সংবাদ পেলাম সে মারা গেছে। আমার বিস্মিত হওয়ার কোন কারণ ছিল না। মৃত্যু তো এমনই। মৃত্যু আমাদের কত কাছে কিন্তু আমাদের খবর নাই।
তবে মোস্তফা নামায পড়ত। নামায ছাড়ত না। আমি গেলাম তার জানাযায়। তার বাড়িতেও গেলাম। তারা আমাকে ভেতরে নিয়ে বসালো। তার মা কাঁদতে ছিলেন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে বললেন—মোস্তফা তোমাকে অনেক স্মরণ করত। আর বলত আমার একজনই বন্ধু আছে যে আমাকে সত্য পথের সন্ধান দিয়েছে।
আর আমার কথাই ধরুন না। আমি তারিক জামিল, ১৯৯১ সালে তিনদিন তাবলীগে সময় দিলাম। তারপর সেই তিনদিন থেকে চার মাস। এদিকে আমার এলাকায় খবর ছড়িয়ে পড়ল—জমিদার মৌলভী বখশের ছেলেকে একদল মোল্লা অপহরণ করে নিয়ে গেছে। আমার তাবলীগে যাওয়া নাকি অপহরণ ছিল। আমি যখন কলেজ ত্যাগ করে মাদরাসায় ভর্তি হলাম আব্বাজান লাঠি হাতে তেড়ে এলেন। আম্মাজান বললেন—তোকে ত্যাজ্য করব। এ বাড়ি থেকে বের করে দেব। তুই মোল্লা হয়ে আমাদের নাক কান কাটতে চাচ্ছিস! এতদিনে তোর পেছনে আমরা হাজার হাজার টাকা খরচ করেছি। এখন তুই মোল্লা হবি? আমরা কিছুতেই তা মেনে নিতে পারিনা। আজ থেকে ছাব্বিশ বছর আগের কথা এগুলো। আর আজ কোটিপতি বাবার সন্তানরা মাদরাসায় পড়ছে চাটাইয়ের উপর বসে কোরআন হাদীস পড়ছে।
তো ভাই ও বোন! দ্বীন বুঝার জন্য কুরবানী দরকার। দ্বীন পালনেও কুরবানী দরকার। দ্বীনের পথে কুরবানীর মানসিকতা থাকলে দ্বীন বুঝা ও মানা সহজ হয়ে যায়। তাই আসুন আমরা দ্বীনের জন্য নিজেদের কুরবান করি। নিয়ত করুন আমরা আল্লাহকে রাজি করব। আল্লাহর রাসূলের আনুগত্য করে জীবন চালাব। মানুষ যখন নিয়্যত করে তখন থেকেই সাওয়াব শুরু হয়ে যায়। একাগ্রতার সাথে পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়ুন। কোরআন তেলাওয়াত করুন। আল্লাহ পাকের যিকির করুন। সন্তানদের দ্বীনী শিক্ষায় শিক্ষিত করুন। ঘরে দ্বীনের পরিবেশ তৈরি করুন।
📄 অবধারিত মৃত্যু
প্রিয় ভাই ও বোন! নিশ্চয়ই মানুষ মরণশীল। মৃত্যু আসবেই। সবাইকে মৃত্যুর স্বাদ পেতেই হবে। মৃত্যুর দোলনায় দুলছে সব মানুষ আর জিন। মৃত্যু থেকে বাঁচার কোন সুযোগ নেই। যদিও সে থাকে মজবুত অট্টালিকায়। মানুষ বড় আশা নিয়ে বাঁচে। অসুখ হয়েছে? হাসপাতালে ছুটে যায় ডাক্তারের কাছে। বড় আশা নিয়ে যায় ভাবে ডাক্তার বুঝি তাকে সারিয়ে তুলবে। কিন্তু যখন পাশের বেডে আরেক রোগী ধুকতে ধুকতে মারা যায় তখন সে আশা হারিয়ে ফেলে। আবার কতজন চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে যায়। একই ডাক্তারে সুস্থ হচ্ছে কত রোগী। আবার মারাও যাচ্ছে কতজন। আশ্চর্য সে অবস্থা! অথচ এখানে ডাক্তারের কোন কৃতিত্ব নেই। জীবন মৃত্যুর মালিক মহান রব্বুল আলামীন। ডাক্তার শুধু চেষ্টা চালিয়ে যায়। বাচা মরা আল্লাহর হাতে।
মৃত্যু প্রতিক্ষণ প্রতি মুহূর্ত আমাদের জন্য অপেক্ষায়। ওৎ পেতে থাকে। প্রতিক্ষণ প্রতি মুহূর্তে। মৃত্যুর অমোঘ বিধান এড়াবে কে? কি দিয়ে? টাকা-রুপি, পাউন্ড। রিয়াল, ডলার? কোন কিছুই বাঁচাতে পারে না মৃত্যু থেকে।
হযরত উমর ইবনে আব্দুল আজিজ (রহ.), যাকে দ্বিতীয় উমর বলা হয়। তিনি এক জানাযায় শরিক ছিলেন। তিনি বিষণ্ণ। তিনি কবরস্থানের এক নির্জনে একা বসেছিলেন। গভীর চিন্তা মগ্ন। একজন এসে বলল—হে প্রিয় খলিফা! এই জানাযা ছেড়ে আপনি এ কবরগুলোর সামনে বসে বসে কি ভাবছেন? খলিফা উত্তর দিলেন—আমি কবরের কথা শুনছি। লোকটি চমকে উঠল। কবরের কথা শুনছেন? তিনি বললেন—হে, আমি কবরের কথা শুনছি। কবর আমাকে বলছে—হে ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ! হে মুসলমানদের খলিফা! আপনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন না যে আমার কাছে যারা আসে তাদের সাথে আমি কি আচরণ করি? আমি বললাম—বলো! কবর বলল—আমি তাদের কাফনের কাপড় পচন ধরাই। তাদের শরীর ছিঁড়ে ফেলি। টুকরো টুকরো করে ফেলি। রক্ত চুষে ফেলি, গোশত খেয়ে ফেলি। আর তাদের দেহের জোড়াগুলো খুলে ফেলি। কাঁদ থেকে আলাদা করে ফেলি হাত। শরীর থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করে ফেলি। পা গুলো কোমর থেকে। হাটু উরু থেকে আলাদা করে ফেলি।
চুপ করলেন হযরত ওমর বিন আব্দুল আজিজ। গভীর বিষাদের ছায়া পড়ল তাঁর চেহারায়। ভিজে উঠল তাঁর চোখ দুটো। অনেকক্ষণ কাঁদলেন তিনি। তারপর কান্না ভেজা স্বরে বললেন—দুনিয়া দু'দিনের। আর এর ছলনা অনেক বেশি। আজ এখানে যে পেয়েছে খুব সম্মান। সম্মান পেয়ে ভুলে গেছে আল্লাহকে। পরকালে তার হবে অনেক অপমান। আজ এখানে যে ধনী পরকালে সেখানে হিসেবে আটকে যাবে। এখানের যৌবন খুব জলদি বার্ধক্যে গ্রাস করে। মৃত্যু এসে হানা দেয় যখন তখন। আচমকা কেড়ে নেয় প্রাণ। এই ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার ধোঁকায় পড়ো না। দেখো এখানকার রাজা বাদশাদের। কোথায় তারা আজ? তারা বড় বড় শহর তৈরি করেছিল। বড় বড় অট্টালিকা তৈরি করেছিলো। ফুলে ফলে সুশোভিত বাগান আবাদ করেছিল। তাদের তৈরি চোখ ঝলসানো ইমারতগুলো আজ এভাবেই পড়ে আছে। কে বাস করে আজ সেখানে? এর নির্মাতারা আজ কোথায়? সব ছেড়ে আজ তারা চলে গেছে। পড়ে আছে নির্জন কবরে। সেখানে একাকী তারা। গাঢ়ো আঁধার তাদের ঘিরে আছে। আলো নেই বাতাস নেই। স্ত্রী পুত্র পরিজন নেই। আনন্দ নেই। কবরে পড়ে আছে একাকী। আমল ছাড়া কোন সাথী নেই।
📄 এখন তারা পোকার খাদ্য
মহান রাব্বুল আলামীন তাঁর অসীম দয়া ও করুণায় এই সব মানুষগুলোকে দান করেছিলেন সুন্দর চেহারা। সুঠাম দেহ। দিয়েছিলেন মেধার প্রখরতা। দিয়েছিলেন সম্পদ রাজত্ব প্রভাব প্রতিপত্তি। তারা ভাবতেও পারেনি এসব তাদের কাছে থাকবে না। সব কেড়ে নেয়া হবে। শয়তানের ধোঁকায় পড়ে তারা জড়িয়ে পড়েছিল নাফরমানীতে। মহান মালিকের দেওয়া নেয়ামতকে তারা খরচ করেছিল অন্যায় কাজে। তারা কামাই করতো হারাম পন্থায়। খরচও করত হারাম পথে। এখন দেখো কি করুণ অবস্থা ওদের। কবরের মাটি তাদের দেহকে পঁচিয়ে ফেলেছে। হাড় থেকে গোশতগুলো আলাদা হয়ে গেছে। বিষাক্ত পোকা-মাকড় খাচ্ছে তাদের গোশত হাড়ের মজ্জা। তাদের শক্তিশালী সুন্দর সুঠামদেহের ক্ষমতা শেষ। ঘুমাতো নরম কোমল বিছানায়। চার পাশে থাকত সেবক সেবিকা। ঘুমের সময় তারা হাত পা টিপে দিতো। এরা ছিল ধনী। ধন-সম্পদ এদের পরকাল বিমুখ করে রাখতো। আর আজ? বড়ই করুন অবস্থা এদের। তাদের প্রশ্ন করো কেমন আছে তারা অন্ধকার কবরে? কি করে পড়ে আছে চাকর বাকরদের সাথে একই কবরস্থানে?
জিজ্ঞেস করো ধনীরা! কি কাজে এসেছে তোমাদের সম্পদ? গরীবকে জিজ্ঞেস করো সে সম্পদ না পেয়ে কি ঠকেছিল? এখানে কবরে তো সবাই একই অবস্থায় পড়ে আছে। বিছানা নেই বালিশ নেই আলো নেই সঙ্গী নেই। একাকী নির্জনে পড়ে আছে সবাই। আমল ছাড়া কোন সাথী নেই।
প্রিয় ভাই ও বোন! কবরের পাশে দাঁড়িয়ে বলছিলেন খলিফা উমর বিন আব্দুল আজিজ। বলছিলেন—দেখো এদের অবস্থা! এরা কেউ কেউ কালকেও ছিলো দুনিয়াতে। সুস্থ ঠোঁট জিভ ব্যবহার করে কত কথাই না বলত! রঙিন এ দুনিয়াকে দেখত চোখ দুটি দিয়ে। দেখত লাল নীল সবুজ সাদা কালো। কতো রঙীন দুনিয়ার রূপ দেখতো। কত তৃপ্তি ছিল। দেখত হারাম বস্তুও। কারও চোখ জোড়া ছিল হরিণীর মত সুন্দর। কত নারীর চোখের দৃষ্টিতে আলোড়ন উঠতো পুরুষের হৃদয়ে। সেই চোখ দুটোর আজ কি করুণ দশা। বেরিয়ে পড়েছে মণি। গলে পচে খসে গেছে পাতা আর পাপড়ি। আজ কোথায় সেই লম্বা পাপড়ি? তরবারির মতো ভ্রু? বাদামী সবুজ মনি? কোথায় আজ তাদের চোখ ঝলসানো রূপ যৌবন? নরম কোমল বিলাস প্রিয় দেহ? যা সামান্য কষ্ট সহ্য করার ক্ষমতা ছিল না। কবরের কীট আর পোকা কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে তাদের অহংকারী দেহ। খসে গেছে শরীরের চামড়া। মাটি খেয়ে ফেলেছে অঙ্গ প্রত্যঙ্গ। কবরের তাপ দেহের হাড়গুলো গলিয়ে দিয়েছে। গলে পচে খসে গেছে সে মূল্যবান শরীর যা দুনিয়াতে চলত দম্ভভরে। হাটতো মাথা উঁচু করে।
হযরত উমর বিন আব্দুল আজিজ বলছেন আর কাঁদছেন। খলিফা অনেক আবেগতাড়িত হয়ে পড়েছিলেন। তিনি বলছেন—আহ! আজ কি পরিণতি হচ্ছে তোমাদের? আজ কোথায় তোমাদের আরাম আয়েশের উপকরণ? কোথায় আজ তোমাদের সেই চাকর বাকর? তুমি তাদের ইশারা করতে তারা তড়িৎ ছুটে আসতো। তোমার ভয়ে সব করত। তোমার ভয়ে আল্লাহর নাফরমানী করত। এখন কোথায় তারা? সেই সব বিশাল অট্টালিকা? সাজানো গোছানো বাগানবাড়ি? আরাম আয়েশের বিলাস ভবন?
মৃত্যু তো এমনই এক বাস্তবতা যা কেড়ে নেয় সব কিছু। ভেঙ্গে চুরমার করে দেয় সব স্বপ্ন-সাধ। তোমার কামাই করা সম্পদ তোমার থাকে না। তোমার স্ত্রী সন্তানরা তোমাকে ভুলে গেছে। তোমার কামাই করা সম্পদে তারা আজ বিলাসিতায় মজে আছে। তোমার কথা ভাববার এত সময় কোথায় তাদের? তোমার একাকীত্ব তোমার অসহায়ত্বের কোন খবর তাদের কানে পৌঁছে না। তোমাকে তারা ভুলে গেছে। তোমার স্ত্রী ভুলে গেছে তোমাকে। তোমার ছেলে মেয়ে ভুলে গেছে তোমাকে। তোমার বন্ধু-বান্ধব সবাই ভুলে গেছে তোমাকে। কেউ মনে রাখেনি তোমায়। তোমাকে আর কারও প্রয়োজন নেই। তুমি একা। একেবারে একা। তোমার সুন্দরী স্ত্রী বিয়ে করেছে এখন তোমার কথা মনেও নেই। তোমার স্বামী বিয়ে করেছে। এটাই তো জগতের নিয়ম। ধোঁকা শুধু ধোঁকা দুনিয়া ধোঁকার ঘর। প্রতারণার বাজার। কিন্তু তুমি বুঝনি।
এমন অনেক কথা বললেন মহান খলিফা উমর বিন আব্দুল আজিজ (রহঃ)। তারপর বললেন দুটি কথা—হে আহাম্মক! দুনিয়ার মিথ্যা ধোঁকায় পড়ে জীবন পার করো না। জীবন কিন্তু সংক্ষিপ্ত। আর মৃত্যু তো তোমার ঘাড়ের রগের চেয়েও নিকটে। তাই পুঁজি সংগ্রহ করে কবরের জন্য প্রস্তুত হও।