📘 পৃথিবী আমার আসল ঠিকানা নয় 📄 নিজের প্রতি দয়া করো

📄 নিজের প্রতি দয়া করো


প্রিয় ভাই ও বোনেরা! নিজের প্রতি দয়া ও রহম প্রদর্শন করো। এ কথার অর্থ হলো সমস্ত গুনাহ পরিহার করে খালেস তওবা করা। নিষ্ঠার সাথে আল্লাহ তায়ালার আনুগত্য ও ইবাদত বন্দেগীতে লিপ্ত থেকে পরকালীন আযাব থেকে আত্মরক্ষা করা। আর নিজের উপর রহম করার অর্থ হলো অপর মুসলমান ভাইকে কষ্ট না দেয়া। শুধু মুসলমানই নয় বরং গোটা মানব ও জীব জন্তুর প্রতিও রহম করতে হবে।

হাদীসে আছে—এ ঘটনাটি বেশ প্রসিদ্ধ। কোন এক পথিক কঠিন পিপাসায় পতিত। সে এক স্থানে একটি কুয়া দেখতে পেল। সে তাতে নেমে পানি পান করল। উপরে উঠে সে দেখে একটি কুকুর পিপাসায় কাতর হয়ে দাড়িয়ে আছে। পথিক ভাবলো পিপাসায় আমার যে অবস্থা হয়েছিল কুকুরটিরও তো একই অবস্থা। একথা ভেবে সে নিজের পা থেকে চামড়ার মুজা খুলে তাতে পানি ভরে কুকুরটিকে পান করাল। আল্লাহ তায়ালা পথিকের এই কাজটিকে পছন্দ করলেন এবং তাকে মাফ করে দিলেন। সাহাবায়ে কেরামগণ জিজ্ঞেস করলেন—হে আল্লাহর রাসূল! তাহলে কি জীব-জন্তুর প্রতি রহম করলেও তাতে আমাদের জন্য সাওয়াব আছে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন—অবশ্যই। প্রাণীর প্রতি দয়া প্রদর্শনের মাঝেও আল্লাহ তায়ালা সাওয়াব রেখেছেন।

হযরত আনাস (রাযি.) বলেন, একদিন আমীরুল মুমিনীন হযরত ওমর ফারুক (রাযি.) লোকজনের অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য গভীর রাতে একাকী ঘুরাফেরা করছিলেন। পথে এক স্থানে মুসাফিরদের একটি কাফেলার নিকটবর্তী হলেন। খলীফার আশংকা হলো রাতে কাফেলার মাল সামানা চুরি না হয়ে যায়। এমন সময় হযরত আব্দুর রহমান বিন আউফ (রাযি.) এর সঙ্গে দেখা হয়। তিনি বললেন—আমীরুল মুমিনীন! এত রাত্রে আপনি এখানে? হযরত ওমর (রাযি.) বললেন—আমি এই কাফেলার পার্শ্ব দিয়ে অতিক্রম করছিলাম। আমার আশংকা হলো রাতে যখন কাফেলার সবাই ঘুমিয়ে যাবে এই সুযোগে তাদের মালামাল চুরি হয়ে যায় কিনা? তাই চলো আমরা মাল সামানা পাহারা দেই। তারপর তাঁরা দুজন সারা রাত কাফেলার মাল সামানা পাহারা দিলেন। ফজরের সময় হলে হযরত উমর (রাযি.) আওয়াজ দিলেন—হে কাফেলার লোকজন! নামাযের সময় হয়েছে। তোমরা উঠো। যখন সবাই জাগ্রত হলো তিনি সেখান থেকে চলে এলেন।

সাহাবায়ে কেরামগণের জীবনে রয়েছে আমাদের জন্য অসংখ্য অগণিত শিক্ষণীয় আদর্শ। এগুলো আমাদের অনুসরণ করা উচিত। তাঁদের জীবনাদর্শ এমন ছিলো যে প্রতিটি সৃষ্টি জীবের প্রতি তাঁরা ছিলেন দয়াদ্রচিত্ত/স্নেহ ক্ষমাশীল। এমনকি বিধর্মীদের প্রতিও তাঁরা দয়া প্রদর্শন করেছেন। একদিন হযরত ওমর ফারুক (রাযি.) একজন বিধর্মী প্রজাকে দেখলেন সে ভিক্ষা করছে। লোকটি বৃদ্ধ ছিল। হযরত ওমর (রাযি.) তাকে বললেন—আমি তোমার প্রতি ইনসাফ ও ন্যায় বিচার করতে পারিনি। যখন তুমি যুবক ছিলে তখন তোমার নিকট থেকে কর আদায় করেছি। আর এখন তোমার প্রতি আমি খেয়াল করছি না। একথা বলে হযরত ওমর (রাযি.) তার জন্য বাইতুল মাল থেকে ভাতা নির্ধারণ করে দিলেন।

হযরত আলী (রাযি.) বলেন: একদিন আমি হযরত ওমর (রাযি.) কে দেখি উটের পিঠে আরোহণ করে সকাল সকাল আবতাহ্ অঞ্চলে ঘুরাফেরা করছেন। কারণ জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন—বাইতুল মালের একটি উট হারিয়ে গেছে তা তালাশ করছি। আমি বললাম—হে আমীরুল মুমিনীন! আপনি এভাবে কষ্ট করে পরবর্তী খলীফাদের দায়িত্ব কঠিনতর করে দিচ্ছেন। হযরত ওমর (রাযি.) বললেন—হে আবুল হাসান! (হযরত আলী (রাযি.) এর উপনাম) মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে নবুওয়াত প্রদানকারী আল্লাহর কসম। সাধারণ একটি বকরীর বাচ্চা ও যদি ফুরাত নদীর তীরে চলে যায় আর আমি সেটার হেফাযত না করি তাহলে এ অবহেলার জন্য কেয়ামতের দিন আমাকে জবাবদিহি করতে হবে।

সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম হাসান (রাযি.) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন—আমার উম্মতের আবদাল বুযুর্গগণ নামায রোযার আধিক্যের কারণে জান্নাত প্রাপ্তির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যাবে। তারপরও তাদের অন্তরের নিষ্কলুষতা ও হিংসা বিদ্বেষ মুক্ত এবং তাদের হৃদয় উদার ও সকলের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ার কারণে তারা জান্নাতের যোগ্যতা অর্জন করবে। একদা হযরত মুসা আলাইহিস সালাম আরজ করেন—ইযা রব্ব! আপনি আমাকে কোন বিষয়টির কারণে বিশেষ বন্ধুরূপে গ্রহণ করেছেন? আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বললেন—আমার সৃষ্টির প্রতি তোমার দয়া ও অনুগ্রহের কারণে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন—মুসলমানদের পারস্পরিক সহানুভূতি ও সৌহার্দ্য এবং ভালবাসার উদাহরণ হচ্ছে একটি দেহ। দেহের যে কোন একটি অঙ্গ পীড়িত হলে গোটা দেহটি পীড়িত হয় জর্জরিত হয়। অনুরূপভাবে যে কোন একজন মুসলমানের দুঃখ যাতনায় সকল মুসলমান জর্জরিত হবে।

বনী ইসরাইলের একজন আবেদ লোক একটি জনপদ দিয়ে যাওয়ার সময় সেখানকার লোকজনকে দুর্ভিক্ষের কারণে কঠিন জঠর জ্বালায় পতিত দেখে অত্যন্ত আবেগ আপ্লুত হয়ে মনে মনে আরজু আকাঙ্খা করে বলেছিলেন—হায়! আমার কাছে যদি এদের ক্ষুধা নিবারণের পরিমাণ আটা থাকতো তাহলে আমি তার সবটা তাদের জন্য বিলিয়ে দিতাম। তারা পরিতৃপ্ত হয়ে আহার করত। আল্লাহ তায়ালার নিকট বান্দার এ আবেগটা খুব পছন্দ হলো। আল্লাহ তায়ালা তৎকালীন সময়ের নবীর নিকট ওহি প্রেরণ করলেন—হে আমার নবী! তুমি আমার সেই আবেদ বান্দাকে জানিয়ে দাও আমি শুধু তার উক্ত আকাঙ্খার কারণে তার আমলনামায় সেই পরিমাণ সাওয়াব লিখে দিয়েছি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন—বস্তুত দয়া ও মহত্ব জান্নাতের একটি বৃক্ষ। যার শাখা-প্রশাখা সর্বদা পৃথিবীর দিকে নত হয়ে আছে। এসবের যে কোন একটিকে যে কেউ অবলম্বন করবে সে জান্নাতের পথে অগ্রসর হবে। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে কবুল করুন। আমীন।

📘 পৃথিবী আমার আসল ঠিকানা নয় 📄 মৃত্যু মুমিনের উপহার

📄 মৃত্যু মুমিনের উপহার


প্রিয় ভাই ও বোন! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা দুনিয়ার আমোদ প্রমোদ ধ্বংসকারী মৃত্যুর কথা বেশি বেশি স্মরণ করো। অর্থাৎ মৃত্যুর কথা চিন্তা করলেই তোমাদের অন্তর থেকে দুনিয়ার মায়া মহব্বত কমে যাবে। আর দুনিয়ার মোহাব্বত কমে গেলেই আখেরাতের এবং আল্লাহ তায়ালার প্রতি অন্তর আকৃষ্ট হবে।

হযরত আয়েশা (রাযি.) আরয করলেন—ইয়া রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! হাশরের দিনে শহীদদের সঙ্গে আরও কোন লোক শাহাদাতের ফযীলত প্রাপ্ত হবে কি? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন—হাঁ, যে ব্যক্তি দিবা-রাত্রি বিশবার মৃত্যুকে স্মরণ করে সেও শহীদদের দলভুক্ত হবে। মৃত্যুর ধ্যান ও চিন্তার এমন অধিক ফযীলত হওয়ার কারণ হলো এ দ্বারা মানুষ পার্থিব জগতের মায়া মোহ থেকে মুক্ত ও নিবৃত থাকে এবং আখেরাতের জন্য প্রস্তুতি কার্যে সদা নিমগ্ন থাকে।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন একদল লোককে উচ্চঃস্বরে কথাবার্তা ও হাসি ঠাট্টা করতে দেখলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে লক্ষ্য করে বললেন—হাসি ঠাট্টার অহেতুক আসরকে যে বস্তুটি তিক্ত করে দেয় তোমরা সেই বস্তুটিকে স্মরণ করো। জিজ্ঞাসা করা হলো—তা কি? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন—মৃত্যু। একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দেখলেন কিছু লোক হাসি ঠাট্টা করছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের বললেন—মৃত্যুকে স্মরণ করো। আল্লাহর কসম! যদি তোমরা তা জানতে যা আমি জানি তাহলে তোমরা কম হাসতে এবং অধিক পরিমাণে কাঁদতে। তিনি বলেছেন—তোমরা মৃত্যুকে অধিক পরিমাণে স্মরণ করো। কেননা মৃত্যুর চিন্তা গুনাহসমূহকে বিলুপ্ত করে দেয়। দুনিয়ার প্রতি অন্তরে ঘৃণা জন্মায়।

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রাযি.) বলেন, একদা আমরা দশজন লোক রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পবিত্র দরবারে উপস্থিত হলাম। সর্বশেষ উপস্থিত হয়েছি আমি। তখন একজন আনসারী সাহাবী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খেদমতে আরজ করলেন—ইয়া রাসূলাল্লাহ (সাঃ)! সর্বাপেক্ষা জ্ঞানী, বুদ্ধিমান ও সম্মানি ব্যক্তি কে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন—যে ব্যক্তি মৃত্যুকে অধিক পরিমাণ স্মরণ করে, মৃত্যুর জন্য সর্বদা প্রস্তুত থাকে সেই প্রকৃত জ্ঞানী। দুনিয়াও আখেরাতে সম্মানিত ও সফলকাম।

এক বুযুর্গ ব্যক্তি স্বীয় ভাইকে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেন—মৃত্যুকে ভয় করো। মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করো। আখেরাতে পৌঁছার পূর্বেই তুমি সেখানের প্রস্তুতি সম্পন্ন করে নাও যেখানে তোমাকে চিরকাল থাকতে হবে। এক মহান বুযুর্গ ইবরাহীম তাইমী (রহ.) বলেন—দুটি বিষয়ের চিন্তা দুনিয়াকে আমার নিকট বিষাদময় করে দিয়েছে। এক—মৃত্যু। দ্বিতীয় হলো আল্লাহ তায়ালার সম্মুখে দণ্ডায়মান হওয়ার ভয়।

আল্লাহর নবী হযরত দাউদ আলাইহিস সালাম মৃত্যুর চিন্তায় অধীর হয়ে এত বেশী কাঁদতেন যে তাঁর শরীর নিস্তেজ হয়ে যেত। পুনরায় যখন আল্লাহর রহমত ও দয়ার আলোচনা করা হতো তখন তিনি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতেন। হযরত আবু মুসা তামিমী (রহ.) বলেন, প্রখ্যাত বুযুর্গ কবি ফারাযদাকের স্ত্রীর জানাযায় বড় বড় বুযুর্গগণ উপস্থিত হয়েছিলেন। তাদের মধ্যে হযরত হাসান বসরী (রহ.)ও ছিলেন। তিনি ফারাযদাককে জিজ্ঞেস করলেন—পরকালের জন্য তুমি কি প্রস্তুতি গ্রহণ করেছো? সে জবাব দিল—দীর্ঘ ষাট বছর যাবৎ কালেমায়ে তাইয়্যেবার সাক্ষ্য দিয়ে আসছি। স্ত্রীর দাফন শেষ হওয়ার পর কবরের পার্শ্বে দাঁড়িয়ে কবি ফারাযদাক কবিতার কয়েকটি লাইন আবৃত্তি করেন:
ওগো আল্লাহ! আমি পরবর্তী ঘাঁটিগুলো সম্পর্কে অধিকতর ভীত, সন্ত্রস্ত। ওগো আল্লাহ! আপনি যদি আমাকে মাফ না করেন তবে সেই ভীষণ ও মর্মন্তুদ আযাব থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য কোন উপায় নেই। হাশরের সেই ভয়াবহ দিনে আমি ফারাযদাকের কি দশা হবে? যেদিন অগ্র পশ্চাতে ফেরেশতাগণ তাকে হাঁকিয়ে নিয়ে যাবে। সেদিন সেই আদম সন্তানটি কতই না হতভাগা হবে যাকে বেড়ী পরিয়ে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে।

হযরত আবু সুলাইমান দারানী (রহ.) বলেন, আমি প্রখ্যাত আবেদা উম্মে হারুনকে জিজ্ঞেস করলাম—তুমি কি মৃত্যু কামনা করো? সে জবাব দিল—যে ক্ষেত্রে আমি সাধারণ কোন মানুষের অবাধ্যতা করলে তার সম্মুখিন হতে লজ্জাবোধ করি সেখানে আহকামুল হকিমীন মহান রাব্বুল আলামীনের অবাধ্য হয়ে কিভাবে তাঁর সম্মুখে দণ্ডায়মান হতে সাহস করতে পারি। দেখুন তাদের অন্তরের বিশ্বাস কত প্রগাঢ় ছিল। প্রকৃত পক্ষে তো বিচার দিবসে মহান রাব্বুল আলামীনের সামনে উপস্থিত হতে হবে। এটি কোন সাধারণ বিষয় নয়।

📘 পৃথিবী আমার আসল ঠিকানা নয় 📄 নামাযের একাগ্রতা

📄 নামাযের একাগ্রতা


আমি তখন কলেজে পড়তাম। তখন দেখতাম কলেজের এক ছাত্র কলেজে দাওয়াত দিতো ছাত্রদের মাঝে। তার নাম ছিল নাইম বাঙালী। আমাকে তখনও তার দাওয়াতে আকৃষ্ট করেনি। কিন্তু তার একটি আমল আমাকে বদলে দিয়েছে। একদিন তাকে আমি নামায পড়তে দেখলাম। নামাযে তার মনোযোগ, তার একাগ্রতা আমাকে আকৃষ্ট করল। তার নামাযের বাহিরটা ছিল শানদার আর ভেতরটা ছিল জানদার। নাইম ভায়ের নামায আমার অন্তরে এমনভাবে ক্রিয়া করল যে আমার অন্তর সাক্ষ্য দিল যে সে যে দাওয়াত দিচ্ছে সে দাওয়াতে আমাদের যা বলেছিল সবই সঠিক। তার দাওয়াত কবুল করে আল্লাহর পথের পথিক হওয়া আবশ্যক। অবশ্যই সে পথে শান্তি ও নাজাতের উপায় নিহিত।

আরেকদিন আমরা ক'জন বন্ধু হোটেলের চেয়ারে বসে খোশগল্প করছিলাম। হোটেলটি দো'তলা ছিল। নাইম ভাই সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়েছিলেন। তার পা দুটি ভেঙ্গে গিয়েছিল। আমি দেখলাম নাইম ভাই পা টেনে টেনে একটি একটি করে সিঁড়ি ভেঙ্গে নিচে নামছেন। তিনি নামাযের জন্য মসজিদে আসছিলেন। আমি বিস্মিত হলাম। ভেতর থেকে আক্ষেপ বেরিয়ে এলো—আহ্! পঙ্গু হওয়া সত্ত্বেও ছেলেটি নামাযের জন্য কত কষ্ট করে দোতলা থেকে নিচে নামছে। কত কষ্ট স্বীকার করছে। আর আমরা সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়া সত্ত্বেও মসজিদে যাচ্ছি না!

আমি জেনারেল হামিদকে দেখেছি, তিনি বলতেন—হে আল্লাহ! তোমার প্রিয় বান্দারা যেভাবে নামায পড়েছিলেন আমিও তেমন নামায পড়ব। তেমন নামায পড়ার চেষ্টা করব। কিন্তু নামায পড়ার পর বলতেন—আফসোস আমি তেমন ভাবে নামায পড়তে পারলাম না!

📘 পৃথিবী আমার আসল ঠিকানা নয় 📄 আমার এক ক্লাস মেটের ঘটনা

📄 আমার এক ক্লাস মেটের ঘটনা


আমার এক ক্লাস মেট ছিল, সরকারী কলেজে এক সাথে লেখাপড়া করতাম। জবরদস্ত মানুষ ছিল, সুঠাম সুপুরুষ। মরি থেকে ইসলামাবাদ পায়ে হেটে চলে আসত। পঁয়তাল্লিশ কিলোমিটার পথ। পিতা ব্রিগেডিয়ার। মা ও উচ্চ বংশের শিক্ষিত মেয়ে ছিল। তার নাম ছিল মোস্তফা। একটা সময় খারাপ ছেলেদের সাথে মিশে সে মদ ও নারীতে আসক্ত হয়ে পড়ে। সমাজের অপরাধীদের সাথে তার বন্ধুত্ব গড়ে উঠে।

একবার আমরা জামাতসহ ইসলামাবাদ গেলাম। এক ব্যক্তি আমাকে বলল—আপনার এক বন্ধু আছে এখানকার পরিবেশ সে নোংড়া করে রেখেছে। তার কারণে সমাজে নানা রকমের অপকর্ম হচ্ছে। সে এগুলোর সাথে জড়িত। আমি আপনার সাথে তাকে সাক্ষাত করিয়ে দেব। সাক্ষাতের সময় ঠিক হলো। কিন্তু বৃষ্টির কারণে আমাদের ব্যস্ততা বেড়ে যাওয়ায় তার সাথে সাক্ষাত হয়নি।

সেদিনই এক নামাযের সময় আমি শুকনো স্থান খুঁজে নামায পড়তে গেলাম। নামায শেষে দেখি একটু দূরেই তার মত এক ব্যক্তি বসে আছে। আমি তাকে ভালভাবে দেখলাম কিন্তু পুরোপুরি চিনতে পারিনি। সেও আমাকে দেখছে কিন্তু কিছু বলছে না। আমি এক ব্যক্তিকে তার নিকট পাঠালাম। বললাম ওকে গিয়ে বলবে তোমার নাম কি মোস্তফা? যদি মোস্তফা হয় তাহলে বলবে তারিক জামিল তোমাকে ডাকছে। তার অবস্থা অন্য রকম ছিল। চেহারা সুরত বদলে গিয়েছিল। দুই কানে সোনার দুল, পরনের পোশাকও বিস্ময়কর ধরনের।

লোকটি গিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করল—তোমার নাম কি মোস্তফা? সে বলল—হে, আমার নাম মোস্তফা। লোকটি বলল—তোমাকে তারিক জামিল ডাকছেন। সে এলো আমার কাছে। এসেই বলল—শুনেছি তুমি নাকি তাবলীগ জামাতের বড় নেতা হয়ে গেছো? আমি বললাম—না, আমি কিছুই হইনি। মোস্তফা বলল—আমি তোমার ব্যাপারে অনেক কিছু শুনেছি। এভাবে তার সাথে অনেক কথা হলো। তাকে বুঝাতে শুরু করলাম। একসময় সে এক চিল্লার জন্য রাজি হলো।

এক চিল্লা লাগানোর পর সে সব অপকর্ম ছেড়ে দিল। কিন্তু পরে আবার মদ ধরল। নারী আর জুয়া ছেড়ে দিল। তারপর ১৯৯৬ সালে আবার তার সাথে সাক্ষাত হলো, বললাম—মোস্তফা! নারী ও জুয়াতো ছেড়েছো। মদ ছেড়ে দাও। মোস্তফা বলল—২০০০ সালে তিন চিল্লা দিব। তারপর পাক্কা তওবা করে সব ছেড়ে দেব। নিজেও হজ্জ করব মাকেও হজ্জ করাবো। আমি বললাম—দোস্ত তোমার কাছে এমনকি গ্যারান্টি আছে যে তুমি ২০০০ সাল পর্যন্ত বেঁচে থাকবে? সে বলল মরব না। তার কথাগুলো পাগলের প্রলাপ মনে হলো। ১লা সেপ্টেম্বর ১৯৯৬ তার সাথে আমার এসব কথা হয়েছিল। ৯৮ সালের অক্টোবরে সংবাদ পেলাম সে মারা গেছে। আমার বিস্মিত হওয়ার কোন কারণ ছিল না। মৃত্যু তো এমনই। মৃত্যু আমাদের কত কাছে কিন্তু আমাদের খবর নাই।

তবে মোস্তফা নামায পড়ত। নামায ছাড়ত না। আমি গেলাম তার জানাযায়। তার বাড়িতেও গেলাম। তারা আমাকে ভেতরে নিয়ে বসালো। তার মা কাঁদতে ছিলেন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে বললেন—মোস্তফা তোমাকে অনেক স্মরণ করত। আর বলত আমার একজনই বন্ধু আছে যে আমাকে সত্য পথের সন্ধান দিয়েছে।

আর আমার কথাই ধরুন না। আমি তারিক জামিল, ১৯৯১ সালে তিনদিন তাবলীগে সময় দিলাম। তারপর সেই তিনদিন থেকে চার মাস। এদিকে আমার এলাকায় খবর ছড়িয়ে পড়ল—জমিদার মৌলভী বখশের ছেলেকে একদল মোল্লা অপহরণ করে নিয়ে গেছে। আমার তাবলীগে যাওয়া নাকি অপহরণ ছিল। আমি যখন কলেজ ত্যাগ করে মাদরাসায় ভর্তি হলাম আব্বাজান লাঠি হাতে তেড়ে এলেন। আম্মাজান বললেন—তোকে ত্যাজ্য করব। এ বাড়ি থেকে বের করে দেব। তুই মোল্লা হয়ে আমাদের নাক কান কাটতে চাচ্ছিস! এতদিনে তোর পেছনে আমরা হাজার হাজার টাকা খরচ করেছি। এখন তুই মোল্লা হবি? আমরা কিছুতেই তা মেনে নিতে পারিনা। আজ থেকে ছাব্বিশ বছর আগের কথা এগুলো। আর আজ কোটিপতি বাবার সন্তানরা মাদরাসায় পড়ছে চাটাইয়ের উপর বসে কোরআন হাদীস পড়ছে।

তো ভাই ও বোন! দ্বীন বুঝার জন্য কুরবানী দরকার। দ্বীন পালনেও কুরবানী দরকার। দ্বীনের পথে কুরবানীর মানসিকতা থাকলে দ্বীন বুঝা ও মানা সহজ হয়ে যায়। তাই আসুন আমরা দ্বীনের জন্য নিজেদের কুরবান করি। নিয়ত করুন আমরা আল্লাহকে রাজি করব। আল্লাহর রাসূলের আনুগত্য করে জীবন চালাব। মানুষ যখন নিয়্যত করে তখন থেকেই সাওয়াব শুরু হয়ে যায়। একাগ্রতার সাথে পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়ুন। কোরআন তেলাওয়াত করুন। আল্লাহ পাকের যিকির করুন। সন্তানদের দ্বীনী শিক্ষায় শিক্ষিত করুন। ঘরে দ্বীনের পরিবেশ তৈরি করুন।

ফন্ট সাইজ
15px
17px