📘 পৃথিবী আমার আসল ঠিকানা নয় 📄 বান্দার তওবায় আল্লাহর খুশি

📄 বান্দার তওবায় আল্লাহর খুশি


হযরত ইমাম হাসান (রাযি.) বলেন, যখন আল্লাহ তায়ালা হযরত আদম আলাইহিস সালাম এর তওবা কবুল করলেন তখন ফেরেশতাগণ তাঁকে মোবারকবাদ জানালো। এই সুবাদে হযরত জিবরাইল ও মিকাইল আলাইহিস সালামও এসে বললেন—আল্লাহ তায়ালা আপনার তওবা কবুল করেছেন। আপনার মনের আকাঙ্খা পূর্ণ করেছেন। হযরত আদম (আঃ) বললেন—হে জিবরাঈল! এখন তওবা কবুলের পর কি জানতে পারি যে আমার মাকাম ও অবস্থান কোন পর্যায়ে? তখন ওহি আসল—হে আদম! তোমার আওলাদ ও সন্তান সন্ততির জন্য আমি দুঃখ ক্লেশ ও যাতনা সাধনা অবধারিত করে দিয়েছি। আর তোমার সূত্রে তারাও তওবার উত্তরাধিকারী হবে। তাদের কেউ যখন আমার কাছে তওবা করবে আমি অবশ্যই তা কবুল করব। তাদের গুনাহ মাফ করে দেবো। এ ব্যাপারে আমি কোনরূপ কৃপণতা করব না। কেননা আমার সিফাত হলো বান্দার ডাকে সাড়া প্রদানকারী। আমি বান্দার অতি নিকটবর্তী。

হাদীস শরীফে এসেছে—রাত্রে যে গুনাহে লিপ্ত হয় তার গুনাহ মাফের জন্য আল্লাহ তায়ালা হস্ত প্রসারিত করে তাকে সারাদিন ডাকতে থাকেন। আর দিনের গুনাহের তওবার জন্য সারারাত ডাকতে থাকেন। এ ভাবে মাগরিব থেকে সূর্যদয় পর্যন্ত আল্লাহ তায়ালার ডাক অব্যাহত থাকে।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও এরশাদ করেন—কখনও কখনও এমন হয় যে বান্দা গুনাহ করার পর তওবা করলে তওবার কারণে সে জান্নাত লাভের সুযোগ পায়। জিজ্ঞাসা করা হলো—হে আল্লাহর রাসূল! এটা কি করে সম্ভব? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন—উক্ত গুনাহের কারণে বান্দা লজ্জিত ও অনুতপ্ত হয়, সে তওবা করে। পরবর্তীতে সে ঐ গুনাহ থেকে দূরে থাকে। এভাবে কৃত গুনাহের তওবা তাকে জান্নাতে পৌঁছে দেয়। আরও এরশাদ হচ্ছে—লজ্জা ও অনুতাপ বান্দার গুনাহের ক্ষতিপূরণ করে দেয়।

শয়তান অভিশপ্ত হওয়ার পর আল্লাহ তায়ালার নিকট কিছুকাল হায়াত প্রার্থনা করেছিলো। অতঃপর আল্লাহ তায়ালা তাকে কিয়ামত পর্যন্ত হায়াত দিয়েছেন। তখন সে বলল—হে আল্লাহ! তোমার ইজ্জতের কসম, বনী আদমের দেহে যতক্ষণ পর্যন্ত প্রাণবায়ু থাকে আমি তাদেরকে তোমার আনুগত্য হতে বিমুখ করে রাখব। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন—আমার ইজ্জতের ও পরাক্রমশীলতার কসম, প্রতি মুহূর্তে আমি বনী আদমের জন্য তওবার দরজা খোলা রাখব।

হযরত আব্দুল্লাহ বিন ওমর (রাযি.) বলেন, যে ব্যক্তি গুনাহের কথা স্মরণ করে দুঃখিত হয় এবং আল্লাহর ভয়ে শঙ্কিত হয় তার পাপ আমলনামা থেকে মিটিয়ে দেয়া হয়। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাযি.) কে এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করেছিল—একজন পাপী লোক তওবা করতে চায় তার তওবার কোনো অবকাশ আছে কি? একথা শুনে চেহারা অন্যদিকে ফিরিয়ে নিলেন। কিছুক্ষণ পর তার দিকে ফিরে অশ্রুশিক্ত নয়নে বললেন—জান্নাতের বহু দরজা রয়েছে। সেগুলো সময়ে সময়ে খোলা হয় আবার সময়ে সময়ে বন্ধ করা হয়। কিন্তু একমাত্র তওবার দরজা কখনও বন্ধ করা হয় না। বরং সর্বদা সেখানে একজন ফেরেশতা মোতায়ন রাখা হয়। সুতরাং তোমরা নেক আমল ও ইবাদতের ব্যাপারে কখনও নিরাশ হয়ো না。

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাযি.) বলেন, কিয়ামতের দিন কিছু লোক এমন হবে যারা নিজেদেরকে তওবাকারী বলে দাবী করবে কিন্তু মহান রাব্বুল আলামীনের নিকট তাদেরকে প্রকৃত তওবাকারী হিসেবে গন্য করা হবে না। কারণ তারা তওবার প্রকৃত তরিকা অবলম্বন করে নাই। দুনিয়াতে তারা তওবা করে বটে কিন্তু কৃত গুনাহের জন্য লজ্জিত ও অনুতপ্ত হয় নাই। তারা ভবিষ্যতে গুনাহ থেকে আত্মরক্ষা করে নাই। আত্মরক্ষার দৃঢ় সংকল্পও করে নাই। তারা যাদের উপর জুলুম করেছিল তাদের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে নাই। তারা যাদের হক নষ্ট করেছিল যাদের হক আত্মস্যাৎ করেছিল তাদের হক আদায় করে নাই। অথচ এদের জন্য সে সুযোগ ছিল। অবশ্য চেষ্টা করা সত্ত্বেও যদি হক আদায় করা সম্ভব না হয় অতঃপর তাদের জন্য আল্লাহ তায়ালার দরবারে এস্তেগফার ও মঙ্গল কামনা করে তাহলে আশা করা যায় আল্লাহ তায়ালা হকদারকে রাজি করে তওবাকারীকে পরিত্রাণ দিবেন।

কিন্তু এ কথা স্মরণ রাখা কর্তব্য যে সবচেয়ে বড় আপদ হচ্ছে গুনাহ করে ভুলে যাওয়া এবং গুনাহের ব্যাপারে এমন গাফেল হওয়া যে তওবার কথা অন্তরে আসে না। অথবা অনেকে এসব গুনাহ ভুলে যায় তওবা করে না। তার জন্য রয়েছে ভয়াবহ বিপদ। তাই হে গাফেল! সর্বদা নিজের কার্যকলাপের প্রতি তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখো, অকস্মাৎ কোন গুনাহ হয়ে গেলে তৎক্ষণাৎ তওবা করো। এ ব্যাপারে অবহেলা করো না। অবশ্যই গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা কর্তব্য। যদি গুনাহ হয়েই যায় তবে অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহ তায়ালার দরবারে মাফ চাও।

এক বুযুর্গ সাধক কতই না সুন্দর করে বলেছেন:
يَا أَيُّهَا الْمُزْنِبُ الْمُحْصِي جَرَائِمَةً
لَا تَنْسَ ذَنْبَكَ وَاذْكُرُ مِنْهُ مَا سَلَفَفَا
ওহে পাপি! চরম পর্যায়ে উপনীত অপরাধী! তোমার গুনাহের কথা ভুলে যেও না। অতীতের সব গুনাহগুলো স্মরণ করো।
وَتُبْ إِلى اللهِ قَبْلَ الْمَوْتِ وَأَنْزَجِرَا
يَا عَاصِيَّا وَاعْتَرَفُ إِنْ كُنْتَ مُعْتَرِفًا
এবং মৃত্যুর পূর্বেই সতর্ক হয়ে আল্লাহ তায়ালার কাছে স্বীয় গুনাহের স্বীকারোক্তি দিয়ে অনুতপ্ত হও এবং সত্যিকারের তওবা করো।

📘 পৃথিবী আমার আসল ঠিকানা নয় 📄 নিজের প্রতি দয়া করো

📄 নিজের প্রতি দয়া করো


প্রিয় ভাই ও বোনেরা! নিজের প্রতি দয়া ও রহম প্রদর্শন করো। এ কথার অর্থ হলো সমস্ত গুনাহ পরিহার করে খালেস তওবা করা। নিষ্ঠার সাথে আল্লাহ তায়ালার আনুগত্য ও ইবাদত বন্দেগীতে লিপ্ত থেকে পরকালীন আযাব থেকে আত্মরক্ষা করা। আর নিজের উপর রহম করার অর্থ হলো অপর মুসলমান ভাইকে কষ্ট না দেয়া। শুধু মুসলমানই নয় বরং গোটা মানব ও জীব জন্তুর প্রতিও রহম করতে হবে।

হাদীসে আছে—এ ঘটনাটি বেশ প্রসিদ্ধ। কোন এক পথিক কঠিন পিপাসায় পতিত। সে এক স্থানে একটি কুয়া দেখতে পেল। সে তাতে নেমে পানি পান করল। উপরে উঠে সে দেখে একটি কুকুর পিপাসায় কাতর হয়ে দাড়িয়ে আছে। পথিক ভাবলো পিপাসায় আমার যে অবস্থা হয়েছিল কুকুরটিরও তো একই অবস্থা। একথা ভেবে সে নিজের পা থেকে চামড়ার মুজা খুলে তাতে পানি ভরে কুকুরটিকে পান করাল। আল্লাহ তায়ালা পথিকের এই কাজটিকে পছন্দ করলেন এবং তাকে মাফ করে দিলেন। সাহাবায়ে কেরামগণ জিজ্ঞেস করলেন—হে আল্লাহর রাসূল! তাহলে কি জীব-জন্তুর প্রতি রহম করলেও তাতে আমাদের জন্য সাওয়াব আছে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন—অবশ্যই। প্রাণীর প্রতি দয়া প্রদর্শনের মাঝেও আল্লাহ তায়ালা সাওয়াব রেখেছেন।

হযরত আনাস (রাযি.) বলেন, একদিন আমীরুল মুমিনীন হযরত ওমর ফারুক (রাযি.) লোকজনের অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য গভীর রাতে একাকী ঘুরাফেরা করছিলেন। পথে এক স্থানে মুসাফিরদের একটি কাফেলার নিকটবর্তী হলেন। খলীফার আশংকা হলো রাতে কাফেলার মাল সামানা চুরি না হয়ে যায়। এমন সময় হযরত আব্দুর রহমান বিন আউফ (রাযি.) এর সঙ্গে দেখা হয়। তিনি বললেন—আমীরুল মুমিনীন! এত রাত্রে আপনি এখানে? হযরত ওমর (রাযি.) বললেন—আমি এই কাফেলার পার্শ্ব দিয়ে অতিক্রম করছিলাম। আমার আশংকা হলো রাতে যখন কাফেলার সবাই ঘুমিয়ে যাবে এই সুযোগে তাদের মালামাল চুরি হয়ে যায় কিনা? তাই চলো আমরা মাল সামানা পাহারা দেই। তারপর তাঁরা দুজন সারা রাত কাফেলার মাল সামানা পাহারা দিলেন। ফজরের সময় হলে হযরত উমর (রাযি.) আওয়াজ দিলেন—হে কাফেলার লোকজন! নামাযের সময় হয়েছে। তোমরা উঠো। যখন সবাই জাগ্রত হলো তিনি সেখান থেকে চলে এলেন।

সাহাবায়ে কেরামগণের জীবনে রয়েছে আমাদের জন্য অসংখ্য অগণিত শিক্ষণীয় আদর্শ। এগুলো আমাদের অনুসরণ করা উচিত। তাঁদের জীবনাদর্শ এমন ছিলো যে প্রতিটি সৃষ্টি জীবের প্রতি তাঁরা ছিলেন দয়াদ্রচিত্ত/স্নেহ ক্ষমাশীল। এমনকি বিধর্মীদের প্রতিও তাঁরা দয়া প্রদর্শন করেছেন। একদিন হযরত ওমর ফারুক (রাযি.) একজন বিধর্মী প্রজাকে দেখলেন সে ভিক্ষা করছে। লোকটি বৃদ্ধ ছিল। হযরত ওমর (রাযি.) তাকে বললেন—আমি তোমার প্রতি ইনসাফ ও ন্যায় বিচার করতে পারিনি। যখন তুমি যুবক ছিলে তখন তোমার নিকট থেকে কর আদায় করেছি। আর এখন তোমার প্রতি আমি খেয়াল করছি না। একথা বলে হযরত ওমর (রাযি.) তার জন্য বাইতুল মাল থেকে ভাতা নির্ধারণ করে দিলেন।

হযরত আলী (রাযি.) বলেন: একদিন আমি হযরত ওমর (রাযি.) কে দেখি উটের পিঠে আরোহণ করে সকাল সকাল আবতাহ্ অঞ্চলে ঘুরাফেরা করছেন। কারণ জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন—বাইতুল মালের একটি উট হারিয়ে গেছে তা তালাশ করছি। আমি বললাম—হে আমীরুল মুমিনীন! আপনি এভাবে কষ্ট করে পরবর্তী খলীফাদের দায়িত্ব কঠিনতর করে দিচ্ছেন। হযরত ওমর (রাযি.) বললেন—হে আবুল হাসান! (হযরত আলী (রাযি.) এর উপনাম) মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে নবুওয়াত প্রদানকারী আল্লাহর কসম। সাধারণ একটি বকরীর বাচ্চা ও যদি ফুরাত নদীর তীরে চলে যায় আর আমি সেটার হেফাযত না করি তাহলে এ অবহেলার জন্য কেয়ামতের দিন আমাকে জবাবদিহি করতে হবে।

সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম হাসান (রাযি.) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন—আমার উম্মতের আবদাল বুযুর্গগণ নামায রোযার আধিক্যের কারণে জান্নাত প্রাপ্তির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যাবে। তারপরও তাদের অন্তরের নিষ্কলুষতা ও হিংসা বিদ্বেষ মুক্ত এবং তাদের হৃদয় উদার ও সকলের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ার কারণে তারা জান্নাতের যোগ্যতা অর্জন করবে। একদা হযরত মুসা আলাইহিস সালাম আরজ করেন—ইযা রব্ব! আপনি আমাকে কোন বিষয়টির কারণে বিশেষ বন্ধুরূপে গ্রহণ করেছেন? আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বললেন—আমার সৃষ্টির প্রতি তোমার দয়া ও অনুগ্রহের কারণে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন—মুসলমানদের পারস্পরিক সহানুভূতি ও সৌহার্দ্য এবং ভালবাসার উদাহরণ হচ্ছে একটি দেহ। দেহের যে কোন একটি অঙ্গ পীড়িত হলে গোটা দেহটি পীড়িত হয় জর্জরিত হয়। অনুরূপভাবে যে কোন একজন মুসলমানের দুঃখ যাতনায় সকল মুসলমান জর্জরিত হবে।

বনী ইসরাইলের একজন আবেদ লোক একটি জনপদ দিয়ে যাওয়ার সময় সেখানকার লোকজনকে দুর্ভিক্ষের কারণে কঠিন জঠর জ্বালায় পতিত দেখে অত্যন্ত আবেগ আপ্লুত হয়ে মনে মনে আরজু আকাঙ্খা করে বলেছিলেন—হায়! আমার কাছে যদি এদের ক্ষুধা নিবারণের পরিমাণ আটা থাকতো তাহলে আমি তার সবটা তাদের জন্য বিলিয়ে দিতাম। তারা পরিতৃপ্ত হয়ে আহার করত। আল্লাহ তায়ালার নিকট বান্দার এ আবেগটা খুব পছন্দ হলো। আল্লাহ তায়ালা তৎকালীন সময়ের নবীর নিকট ওহি প্রেরণ করলেন—হে আমার নবী! তুমি আমার সেই আবেদ বান্দাকে জানিয়ে দাও আমি শুধু তার উক্ত আকাঙ্খার কারণে তার আমলনামায় সেই পরিমাণ সাওয়াব লিখে দিয়েছি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন—বস্তুত দয়া ও মহত্ব জান্নাতের একটি বৃক্ষ। যার শাখা-প্রশাখা সর্বদা পৃথিবীর দিকে নত হয়ে আছে। এসবের যে কোন একটিকে যে কেউ অবলম্বন করবে সে জান্নাতের পথে অগ্রসর হবে। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে কবুল করুন। আমীন।

📘 পৃথিবী আমার আসল ঠিকানা নয় 📄 মৃত্যু মুমিনের উপহার

📄 মৃত্যু মুমিনের উপহার


প্রিয় ভাই ও বোন! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা দুনিয়ার আমোদ প্রমোদ ধ্বংসকারী মৃত্যুর কথা বেশি বেশি স্মরণ করো। অর্থাৎ মৃত্যুর কথা চিন্তা করলেই তোমাদের অন্তর থেকে দুনিয়ার মায়া মহব্বত কমে যাবে। আর দুনিয়ার মোহাব্বত কমে গেলেই আখেরাতের এবং আল্লাহ তায়ালার প্রতি অন্তর আকৃষ্ট হবে।

হযরত আয়েশা (রাযি.) আরয করলেন—ইয়া রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! হাশরের দিনে শহীদদের সঙ্গে আরও কোন লোক শাহাদাতের ফযীলত প্রাপ্ত হবে কি? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন—হাঁ, যে ব্যক্তি দিবা-রাত্রি বিশবার মৃত্যুকে স্মরণ করে সেও শহীদদের দলভুক্ত হবে। মৃত্যুর ধ্যান ও চিন্তার এমন অধিক ফযীলত হওয়ার কারণ হলো এ দ্বারা মানুষ পার্থিব জগতের মায়া মোহ থেকে মুক্ত ও নিবৃত থাকে এবং আখেরাতের জন্য প্রস্তুতি কার্যে সদা নিমগ্ন থাকে।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন একদল লোককে উচ্চঃস্বরে কথাবার্তা ও হাসি ঠাট্টা করতে দেখলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে লক্ষ্য করে বললেন—হাসি ঠাট্টার অহেতুক আসরকে যে বস্তুটি তিক্ত করে দেয় তোমরা সেই বস্তুটিকে স্মরণ করো। জিজ্ঞাসা করা হলো—তা কি? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন—মৃত্যু। একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দেখলেন কিছু লোক হাসি ঠাট্টা করছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের বললেন—মৃত্যুকে স্মরণ করো। আল্লাহর কসম! যদি তোমরা তা জানতে যা আমি জানি তাহলে তোমরা কম হাসতে এবং অধিক পরিমাণে কাঁদতে। তিনি বলেছেন—তোমরা মৃত্যুকে অধিক পরিমাণে স্মরণ করো। কেননা মৃত্যুর চিন্তা গুনাহসমূহকে বিলুপ্ত করে দেয়। দুনিয়ার প্রতি অন্তরে ঘৃণা জন্মায়।

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রাযি.) বলেন, একদা আমরা দশজন লোক রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পবিত্র দরবারে উপস্থিত হলাম। সর্বশেষ উপস্থিত হয়েছি আমি। তখন একজন আনসারী সাহাবী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খেদমতে আরজ করলেন—ইয়া রাসূলাল্লাহ (সাঃ)! সর্বাপেক্ষা জ্ঞানী, বুদ্ধিমান ও সম্মানি ব্যক্তি কে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন—যে ব্যক্তি মৃত্যুকে অধিক পরিমাণ স্মরণ করে, মৃত্যুর জন্য সর্বদা প্রস্তুত থাকে সেই প্রকৃত জ্ঞানী। দুনিয়াও আখেরাতে সম্মানিত ও সফলকাম।

এক বুযুর্গ ব্যক্তি স্বীয় ভাইকে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেন—মৃত্যুকে ভয় করো। মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করো। আখেরাতে পৌঁছার পূর্বেই তুমি সেখানের প্রস্তুতি সম্পন্ন করে নাও যেখানে তোমাকে চিরকাল থাকতে হবে। এক মহান বুযুর্গ ইবরাহীম তাইমী (রহ.) বলেন—দুটি বিষয়ের চিন্তা দুনিয়াকে আমার নিকট বিষাদময় করে দিয়েছে। এক—মৃত্যু। দ্বিতীয় হলো আল্লাহ তায়ালার সম্মুখে দণ্ডায়মান হওয়ার ভয়।

আল্লাহর নবী হযরত দাউদ আলাইহিস সালাম মৃত্যুর চিন্তায় অধীর হয়ে এত বেশী কাঁদতেন যে তাঁর শরীর নিস্তেজ হয়ে যেত। পুনরায় যখন আল্লাহর রহমত ও দয়ার আলোচনা করা হতো তখন তিনি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতেন। হযরত আবু মুসা তামিমী (রহ.) বলেন, প্রখ্যাত বুযুর্গ কবি ফারাযদাকের স্ত্রীর জানাযায় বড় বড় বুযুর্গগণ উপস্থিত হয়েছিলেন। তাদের মধ্যে হযরত হাসান বসরী (রহ.)ও ছিলেন। তিনি ফারাযদাককে জিজ্ঞেস করলেন—পরকালের জন্য তুমি কি প্রস্তুতি গ্রহণ করেছো? সে জবাব দিল—দীর্ঘ ষাট বছর যাবৎ কালেমায়ে তাইয়্যেবার সাক্ষ্য দিয়ে আসছি। স্ত্রীর দাফন শেষ হওয়ার পর কবরের পার্শ্বে দাঁড়িয়ে কবি ফারাযদাক কবিতার কয়েকটি লাইন আবৃত্তি করেন:
ওগো আল্লাহ! আমি পরবর্তী ঘাঁটিগুলো সম্পর্কে অধিকতর ভীত, সন্ত্রস্ত। ওগো আল্লাহ! আপনি যদি আমাকে মাফ না করেন তবে সেই ভীষণ ও মর্মন্তুদ আযাব থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য কোন উপায় নেই। হাশরের সেই ভয়াবহ দিনে আমি ফারাযদাকের কি দশা হবে? যেদিন অগ্র পশ্চাতে ফেরেশতাগণ তাকে হাঁকিয়ে নিয়ে যাবে। সেদিন সেই আদম সন্তানটি কতই না হতভাগা হবে যাকে বেড়ী পরিয়ে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে।

হযরত আবু সুলাইমান দারানী (রহ.) বলেন, আমি প্রখ্যাত আবেদা উম্মে হারুনকে জিজ্ঞেস করলাম—তুমি কি মৃত্যু কামনা করো? সে জবাব দিল—যে ক্ষেত্রে আমি সাধারণ কোন মানুষের অবাধ্যতা করলে তার সম্মুখিন হতে লজ্জাবোধ করি সেখানে আহকামুল হকিমীন মহান রাব্বুল আলামীনের অবাধ্য হয়ে কিভাবে তাঁর সম্মুখে দণ্ডায়মান হতে সাহস করতে পারি। দেখুন তাদের অন্তরের বিশ্বাস কত প্রগাঢ় ছিল। প্রকৃত পক্ষে তো বিচার দিবসে মহান রাব্বুল আলামীনের সামনে উপস্থিত হতে হবে। এটি কোন সাধারণ বিষয় নয়।

📘 পৃথিবী আমার আসল ঠিকানা নয় 📄 নামাযের একাগ্রতা

📄 নামাযের একাগ্রতা


আমি তখন কলেজে পড়তাম। তখন দেখতাম কলেজের এক ছাত্র কলেজে দাওয়াত দিতো ছাত্রদের মাঝে। তার নাম ছিল নাইম বাঙালী। আমাকে তখনও তার দাওয়াতে আকৃষ্ট করেনি। কিন্তু তার একটি আমল আমাকে বদলে দিয়েছে। একদিন তাকে আমি নামায পড়তে দেখলাম। নামাযে তার মনোযোগ, তার একাগ্রতা আমাকে আকৃষ্ট করল। তার নামাযের বাহিরটা ছিল শানদার আর ভেতরটা ছিল জানদার। নাইম ভায়ের নামায আমার অন্তরে এমনভাবে ক্রিয়া করল যে আমার অন্তর সাক্ষ্য দিল যে সে যে দাওয়াত দিচ্ছে সে দাওয়াতে আমাদের যা বলেছিল সবই সঠিক। তার দাওয়াত কবুল করে আল্লাহর পথের পথিক হওয়া আবশ্যক। অবশ্যই সে পথে শান্তি ও নাজাতের উপায় নিহিত।

আরেকদিন আমরা ক'জন বন্ধু হোটেলের চেয়ারে বসে খোশগল্প করছিলাম। হোটেলটি দো'তলা ছিল। নাইম ভাই সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়েছিলেন। তার পা দুটি ভেঙ্গে গিয়েছিল। আমি দেখলাম নাইম ভাই পা টেনে টেনে একটি একটি করে সিঁড়ি ভেঙ্গে নিচে নামছেন। তিনি নামাযের জন্য মসজিদে আসছিলেন। আমি বিস্মিত হলাম। ভেতর থেকে আক্ষেপ বেরিয়ে এলো—আহ্! পঙ্গু হওয়া সত্ত্বেও ছেলেটি নামাযের জন্য কত কষ্ট করে দোতলা থেকে নিচে নামছে। কত কষ্ট স্বীকার করছে। আর আমরা সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়া সত্ত্বেও মসজিদে যাচ্ছি না!

আমি জেনারেল হামিদকে দেখেছি, তিনি বলতেন—হে আল্লাহ! তোমার প্রিয় বান্দারা যেভাবে নামায পড়েছিলেন আমিও তেমন নামায পড়ব। তেমন নামায পড়ার চেষ্টা করব। কিন্তু নামায পড়ার পর বলতেন—আফসোস আমি তেমন ভাবে নামায পড়তে পারলাম না!

ফন্ট সাইজ
15px
17px