📄 হে যুবক!
প্রিয় ভাই ও বোন! আজ সেই যুব সম্প্রদায় কোথায়? যারা রাতের শেষ প্রহরে বিছানা ছেড়ে জেগে উঠতেন। তাহাজ্জুদের নামায পড়ে অন্তরে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ জিকিরের ধাক্কা লাগাতেন। যে ধাক্কায় তাদের অন্তরাত্মা আল্লাহর ভয়ে কেঁপে উঠত। এক কবি বলেছেন—ওগো দয়াময় আল্লাহ! তোমার আল্লাহ নামের মধুমাখা আওয়াজ আমার অন্তরে শিহরণ জাগায়। তোমার প্রেমের ব্যাকুলতায় আমার অন্তর অস্থির হয়ে যায়। এভাবে আল্লাহকে ডেকে যদি নিজেকে শুদ্ধি করতে পারি তাহলে আমার মর্যাদা এত উঁচুতে উঠবে যে আসমানের সুরাইয়্যা নামক-নক্ষত্রও আমার পেছনে পড়ে থাকবে।
আর এটা তখনই সম্ভব হবে যখন আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমার প্রতি সন্তুষ্ট হবেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমার প্রতি সন্তুষ্ট হলেই আমার অন্তরের অবস্থা কুদরতী নূরে পরিপূর্ণ হয়ে যাবে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বান্দার প্রতি সন্তুষ্ট নাকি অসন্তুষ্ট তা আমার কর্মের দ্বারা বুঝে আসে। অর্থাৎ বান্দার নেক আমল দেখে আল্লাহ তায়ালা সন্তুষ্ট হন। আর বদআমল দেখে হন অসন্তুষ্ট। অর্থাৎ আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সন্তুষ্টি কিংবা অসন্তুষ্টি বুঝার মাপকাঠি হলো বান্দার আমল। যখন বান্দার উপর আল্লাহর রহমত অবতীর্ণ হয় তখন তার চোখে ন্যায় অন্যায়ের পার্থক্য ফুটে উঠে। সে সময় মানুষের কর্তব্য তার কৃত অপরাধকে স্মরণ করা এবং সেই অপরাধের জন্য আল্লাহ পাকের কাছে ক্ষমা চাওয়া।
এক কবি কত সুন্দর করে বলেছেন—মুসলমানদের সে গৌরবময় দিনগুলো আমরা ভুলতে বসেছি। আর বিজাতিদের ইতিহাস স্মরণ রাখছি। ভুলে গিয়েছি নিজেদের গৌরব উজ্জ্বল ইতিহাস। আয়নায় নিজেদের চেহারার চাকচিক্য দেখছি কিন্তু অন্তরের ক্ষত দেখছি না। যে মুসলমান নিজেদের স্ত্রী সন্তানদের আল্লাহর কাছে সপে দিয়ে জিহাদের ময়দানে হাসিমুখে প্রাণ দিয়ে দিতো। আজ তারা মৃত্যুর কথা ভুলে গেছে। মুসলমানদের ইবাদতগাহের জৌলুস বৃদ্ধি পেয়েছে কিন্তু মুসল্লিদের এখলাস দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। আজ ঈমানদারদের কণ্ঠে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর ধ্বনি উচ্চারিত হচ্ছে কিন্তু যে ধ্বনি অন্তরাত্মায় পরিবর্তন ঘটায় তা উচ্চারিত হচ্ছে না। বলুন তো এমন কেন হচ্ছে? এর কারণ হলো আল্লাহ তায়ালার দেয়া প্রেসক্রিপশন মতো নিজেকে পরিচালনা করছি না। বান্দা যখন মহান রাব্বুল আলামীনের হুকুমগুলো অমান্য করতে থাকে তখন আল্লাহ তায়ালাও ঐ বান্দা থেকে রহমত তুলে নেন। ফলে তার উপর নেমে আসে বিভিন্ন রকমের বিপদাপদ। পেরেশানীতে ভরে যায় অন্তরটা।
মনোরোগে আক্রান্ত এক রোগী। দুনিয়ার সবচেয়ে বড় ডাক্তারের কাছ থেকে প্রেসক্রিপশন করিয়েছে। অতঃপর সেই প্রেসিক্রিপশন ভাজ করে পকেটে রেখে দিয়েছে। এভাবে বেশ কিছু দিন অতিবাহিত হলো। প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী সে কোন চিকিৎসাই গ্রহণ করলো না। যার দরুণ সে অসুস্থই থেকে গেলো। তার রোগ ভাল হওয়ার কোন লক্ষণই যখন দেখা গেল না তখন পুনরায় ডাক্তারের কাছে আসলো। এসে ডাক্তারকে বললো ডাক্তার সাহেব আমার রোগের কোন পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছি না। ডাক্তার জিজ্ঞেস করলেন আপনি কি প্রেসক্রিপশন মতো ঔষধ খেয়েছেন? জবাবে রোগী বলল আমি তা ভাঁজ করে পকেটে রেখে দিয়েছি। এবার ডাক্তার তাকে বললেন বেওকুফ। প্রেসক্রিপশন পকেটে রাখলে রোগ কি করে ভালো হবে? প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী তোমাকে ঔষধ খেতে হবে এবং দিকনির্দেশনা মেনে চলতে হবে। তবেই সুস্থ হতে পারবে।
অনুরূপভাবে আল্লাহ তায়ালাও মানব মুক্তির জন্য কোরআন নামক প্রেসক্রিপশন পাঠিয়েছেন। যার মধ্যে মানুষের আত্মিক এবং দৈহিক মুক্তি নিহিত। অথচ আমরা একে ঘরের তাকে সাজিয়ে রাখছি। আর নিজেকে আত্মিক ও দৈহিক উভয় রকমের রোগে নিঃশেষ করে দিচ্ছি। যার দরুণ হতাশার মাঝে দিন দিন নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছি। ভাবছি অশান্তি কেন আজ আমাদের পিছু ছাড়ছে না? কেনই বা জীবনে শান্তি আসছে না। একটি সমস্যার মাঝে আর একটি সমস্যা এসে জড়ো হচ্ছে? বড়ই করুণ অবস্থা। সবাই বলছে কেন এমন হচ্ছে? কিছুইতো বুঝতে পারছি না? পরিবারগুলো আজ জ্বলন্ত কড়াইয়ের মত ফুটছে। ঝগড়া বিবাদ মামলা মোকাদ্দমা। হিংসা বিদ্বেষ। এসব অশান্তির কারণে পরিবার সমাজ সবজায়গায় পেরেশানী অস্থিরতা মানুষ মুক্তির উপায় খুঁজে পাচ্ছে না। মুক্তির উপায় তো আছে। আমরা জানতেও চাই না মানতেও চাই না। মুক্তির উপায় হলো আল্লাহ তায়ালার দেয়া প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী জীবন-যাপন করা। মানুষ যখন আল্লাহ তায়ালার হুকুম আহকামগুলোকে অমান্য করে তখন আল্লাহ পাকও ঐ বান্দা থেকে রহমত তুলে নেন। ফলে তার জীবনে বিপদ মুসিবত একটার পর একটা এসে হাজির হয়।
আমাদের কাজ তো ছিল জীবনের প্রতিটা মুহূর্তে মহান রাব্বুল আলামীনকে স্মরণ করা। এক মুহূর্তের জন্যেও তাকে না ভুলা। মানবজীবনের এটা উদ্দেশ্য। কেননা যার নেয়ামত খাও তাঁর শুকুর গুজারী কর। অকৃতজ্ঞ হয়ো না। যেমন ধরুন কৃষক একটি ফসল উৎপন্ন করতে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে কঠোর পরিশ্রম আর মেধা খরচ করে। তারপর জমিনে ফসল জন্ম নেয়। ফসল ফলাতে কৃষকের যেমন শ্রম রয়েছে তেমনিভাবে রয়েছে মহান রব্বে কারীমের অসীম কুদরতের কারিশমা। কৃষক যেমন জমিনে হালচাষ বীজ বপন এবং পানি সেচ দেয়, আল্লাহ পাক উক্ত রোপন কৃত বীজ জমিনের ভেতর লালন পালন করেন। আকাশ থেকে বৃষ্টি দিয়ে জমিন সতেজ করে রাখেন। আর চন্দ্র সূর্য তাতে দেয় আলো। আর বাতাস দিয়ে জমিনের ফসলকে তরতাজা রাখেন। আর এভাবেই ফসল আলো বাতাস পানি গ্রহণ করে আস্তে আস্তে বেড়ে উঠে। অবশেষে তাতে জন্ম নেয় গমের দানা বা ধান। আল্লাহ তায়ালার কুদরতে ফসল যখন এ স্তর অতিক্রম করে তখন তা খাদ্য হয়ে মানুষের সামনে আসে। মানুষ বড়ই অকৃতজ্ঞ। এই রিযিক মুখে দেয়ার সময় মানুষ আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে না। আরে ভাই! দুম্বা দেখেছেন? দুম্বা একটি চতুষ্পদ জন্তু। এ দুম্বা তার মালিককে ভুলে না। মালিক দুম্বার গলা থেকে যখন রশি খুলে দেয় তখন দুম্বা মালিকের পিছে পিছে হাঁটছে। মালিক যেদিকে যাচ্ছে দুম্বাও সেদিকেই যাচ্ছে। চতুস্পদ এ জানোয়ার তার মালিকের কথা ভুলে না। আর তুমি সৃষ্টির সেরা হয়েও মহান মালিককে ভুলে গেছো? আমরা এ অকৃতজ্ঞতার কি জবাব দেবো? মালিকের সামনে দাঁড়াবো কোন মুখ নিয়ে?
📄 হতাশ হবেন না
وَ نُفِخَ فِي الصُّورِ فَإِذَا هُمْ مِّنَ الْأَجْدَاثِ إِلَى رَبِّهِمْ يَنْسِلُونَ - قَالُوا يُوَيْلَنَا مَنْ بَعَثَنَا مِنْ مَّرْقَدِنَا - هُذَا مَا وَعَدَ الرَّحْمَنُ وَصَدَقَ الْمُرْسَلُونَ
হাশরের দিন, বড় কঠিন সে দিন। যখন শিঙায় ফুঁ দেয়া হবে, 'আর মানুষ দলে দলে তার প্রভুর দিকে ফিরে আসবে। তারা বলবে হায়! কি বিপদ! কে ঘুম থেকে ওঠালো আমাদের? জবাব আসবে, দয়ালু আল্লাহতো এরই ওয়াদা করেছিলেন। সতর্ককারীরা সাবধান করেছিলেন ঠিকই। (সূরা ইয়াসীন, ৫১,৫২)
প্রিয় ভাই বোন! বিচার দিবস, ফয়সালার দিন। অনন্ত জীবনের শুরু। হিসাবের জন্য দণ্ডায়মান সব বনী আদম। সবাই চিন্তিত, কি হয় ফয়সালা। কত বড় ভয়ের দিন। মানুষ ভীত সন্ত্রস্ত, পেরেশান, অসহায়। দ্বিধা আর শংকায় দুলছে মানুষ। কি আছে ভাগ্যে? জান্নাত না জাহান্নাম? সিদ্ধান্ত দিবেন আল্লাহ রাব্বুল আলামীন। ভয়ে বাদশাহ কাঁপছে, কাঁপছে প্রজা। কাঁপছে ধনী, কাঁপছে গরীব। ভীত সবাই। দিশেহারা হয়ে পড়বে দুনিয়ার মাতবর, সর্দার, এমপি, মন্ত্রী, দাপটওয়ালা রাজা বাদশা—সবাই। সবাই বিপন্ন, সবাই বিষণ্ণ।
চারদিক থেকে জমা হবে মানুষ। হাশরের বিশাল ময়দানে। ছুটতে ছুটতে আসবে পিপিলিকার মত। খোলা আকাশ, সমতল জমিন। সূর্য থাকবে মাথার আধহাত উপরে। সেদিন সব অবাধ্য বড় বড় শয়তান। অত্যাচারী আর সীমালঙ্ঘনকারীরা ভয়ে কাতর হয়ে দাঁড়াবে আল্লাহ তায়ালার সামনে। তাদের মাথা থাকবে নত। কোরআনুল কারীমে আল্লাহ তায়ালা বলেন:
فَوَرَبِّكَ لَنَحْشُرَنَّهُمْ وَالشَّيَاطِينَ ثُمَّ لَنُحْضِرَنَّهُمْ حَوْلَ جَهَنَّمَ جِثِيًّا
আপনার লালন পালনকারীর শপথ, আমি ওইসব অবিশ্বাসী ও অভিশপ্তদের ফের উঠাবো। তারা উপুড় হয়ে পড়ে থাকবে জাহান্নামের কিনারে।
হে মুসলমান! তুমি কি এখনও সাবধান হবে না? আল্লাহ তায়ালা বলেন:
قُلُوبٌ يَوْمَئِذٍ وَاجِفَةٌ
কিছু অন্তর ভয়ে কাঁপবে সেদিন। (সূর নাজিয়াত, ৮)
أَبْصَارُهَا خَاشِعَةٌ
তাদের দৃষ্টি নত, ভীত ও সন্ত্রস্ত থাকবে। (সূরা নাজিয়াত, ৯)
এখানে কিছু অন্তর মানে হলো যারা অবিশ্বাসী সীমালঙ্ঘনকারীও কপটেরা। তাদের দৃষ্টি থাকবে নত। ভয়ার্ত, সন্ত্রস্ত। আল্লাহ তায়ালার ওয়াদা যে কত সত্য তারা তা দেখতে পাবে। অথচ দুনিয়ায় থাকতে তারা এটা অবিশ্বাস করত। সে দিন তারা দেখবে কি ভয়ংকর বিভীষিকাময় সে আযাব। তাদের অন্তর সেদিন কাঁপবে। জাহান্নাম তারা দেখবে। আর যখন জাহান্নামকে প্রজ্জ্বলিত করা হবে তখন তারা সবাই দেখতে পাবে জাহান্নামকে। সেটা জ্বলছে দাউ দাউ করে। আর যখন জান্নাতকে কাছে নিয়ে আসা হবে, অবিশ্বাসীরা জান্নাত দেখবে। জান্নাতের নেয়ামত তারা দেখবে। তারা আফসোস করবে। তারা বুঝবে কি পরিমাণ ঠকেছে তারা। আর জান্নাতীরাও জাহান্নামকে দেখবে। তারা অনুভব করবে কি পরিমাণ বিপদ কি পরিমাণ বিভীষিকা থেকে তারা মুক্তি পাচ্ছে।
যেদিন মহান রাব্বুল আলামীন অধিষ্ঠিত থাকবেন আরশে আজীমে। আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীন প্রশ্ন করবেন—হে বনী আদম! তোমাকে জীবন দিয়েছিলাম। সম্পদ দিয়েছিলাম। বুদ্ধি দিয়েছিলাম। বলো আজ কি নিয়ে এসেছো? আমার দেয়া জীবন কিভাবে ব্যয় করেছো? কি করে এসেছো? বুদ্ধি দিয়েছিলাম তা ব্যয় করেছো আমার বিরুদ্ধে। সম্পদ দিয়েছিলাম তা কাজে লাগিয়েছো আমার দুশমনিতে। হে বিদ্রোহী! হে বিশ্বাস ঘাতক! আমার খেয়ে আমার পরে আমার আশ্রয়ে ঘুমাতে। আমাকে একবারও স্মরণ করোনি? হায়! সেদিন মহান রবের নূর প্রকাশিত হবে। আর সরে যাবে পর্দা। রব্বে কারীমের অবর্ণনীয় জ্যোতির উজ্জ্বলতায় সিজদায় লুটিয়ে পড়বে বিশ্বাসীগণ। তাদের দেখাদেখি সিজদা দিতে চাইবে অবিশ্বাসীরাও। কিন্তু পারবে না। আল্লাহ তায়ালা তাদের শিরদাঁড়াকে লোহার মত শক্ত করে দিবেন।
আল্লাহ তায়ালা বলবেন—হে আমার বান্দারা! বলো তোমরা দুনিয়াতে কার উপাসনা করে এসেছো? বান্দা জবাব দিবে—হে আমাদের প্রতিপালক, আমরা তোমার ইবাদত করে এসেছি। যখন মুয়াজ্জিন তোমার নামে আহ্বান করেছে আমরা তোমার ঘরে ছুটে গেছি। রুকু করেছি সেজদা করেছি। তোমার কালাম তেলাওয়াত করেছি। তোমার শোকুর গোজারী করেছি। তোমার নবীর আদর্শে নিজেকে সাজিয়েছি। তোমার আদেশ নিষেধ মেনে চলেছি। তোমাকে এক অদ্বিতীয় মেনেছি। তোমার জন্য জানমাল কোরবান করেছি—বলবে মুমিনগণ।
তারপর অবিশ্বাসীরাও বলতে থাকবে—আমরাও তো এভাবেই এবাদত করেছি। তারা বুঝে যাবে তারা ধরা পড়ে গেছে। পালাবার পথ খুঁজবে। আল্লাহ তায়ালার দৃষ্টির বাইরে তারা যেতে পারবে না। তারপর ঘোষণা হবে মীমাংসার চরম উচ্চারণ। সত্য আর মিথ্যাকে আলাদা করে চেনার উচ্চারণ। ঘোষণা হবে আল্লাহ তায়ালার আদেশ:
وَامْتَازُ الْيَوْمَ أَيُّهَا الْمُجْرِمُونَ
হে অপরাধীরা আজ আলাদা হয়ে যাও। (সূরা ইয়াসীন : ৫৯)
এ হুকুম জারী হওয়ার পর কঠিন চেহারার ফিরিশতারা অবিশ্বাসী আর অংশীবাদীদের টেনে বের করে নেবে মুমিনদের কাতার থেকে। বিশ্বাসী আর অবিশ্বাসীরা আলাদা হয়ে যাবে। চিহ্নিত হয়ে যাবে তারা। এরপর মহান রাব্বুল আলামীন নজর দেবেন ঈমানদারদের উপর। এদের তিন ভাগে ভাগ করে দেয়া হবে। প্রথম দলটি থাকবে একেবারে সামনে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের কাছাকাছি। তারা পাবে মহান রাব্বুল আলামীনের ভালবাসা। তারাই সম্মানিত। মহান প্রভুর আপনজন।
দ্বিতীয় দলটি থাকবে ডানে। তৃতীয় দলটি থাকবে বায়ে। সামনের দলটি সম্মানিত। তারা আল্লাহ পাকের যোগ্য বান্দা। তারা হবেন নবী রাসূল, সিদ্দীক, শহীদ ও আল্লাহর ওলিগণ। এরা আল্লাহ তায়ালার আপনজন। ভালোবাসার মানুষ। এরা আল্লাহর প্রেমিক। এরা সফল। চিরদিনের জন্য।
আর যারা ডানে থাকবে তারা আমলনামা পাবে ডান হাতে। তারা জান্নাতী। তারা কামিয়াব সফলকাম। তারা চিরদিনের জন্য কামিয়াব হয়ে যাবে। আর যারা বামে থাকবে তাদের কর্মফল দেয়া হবে বাম হাতে। এরা জাহান্নামী। এরা ব্যর্থ। তারা যখন তাদের আমলনামা হাতে পাবে তারা অবাক হবে। নিজেকে ধিক্কার দিবে। দিশেহারা হয়ে পড়বে। তাকে বলা হবে পড়ো যা তুমি দুনিয়াতে করেছো। পাপী আমলনামা পড়ে আশ্চর্য হবে। বলবে একি! এতে দেখছি কোন কিছুই বাদ পড়েনি। আমি যা করেছিলাম সবই লেখা আছে।
বিশ্বাসী, আল্লাহ ভীরুদের হিসাব খুব জলদি শেষ হবে। পাপীদের হিসাব খুব কঠিন হবে। তারা নির্দিষ্ট একটা সময় পর্যন্ত তাদের পাপের শাস্তি ভোগ করবে। শাস্তি শেষ হলে মুক্তি পাবে।
তো ভাই ও বোনেরা! মহান রাব্বুল আলামীনের নিকট সর্বাধিক প্রিয় আওয়াজ হচ্ছে গুনাহের পর তওবাকারী বান্দার আওয়াজ। যে বান্দা আল্লাহকে ডেকে বলে ইয়া রব্ব! তখন আল্লাহ তায়ালা বলেন—ওহে আমার বান্দা! আমি তোমার সম্মুখেই আছি। তোমার যা ইচ্ছা আমার কাছে চাও, তোমার ডাক শোনার জন্যই আমি অপেক্ষায় আছি। আমি তোমার ডান বাম উপর সবদিকে বিরাজমান এবং তোমার অন্তরের অতি নিকটবর্তী। হে আমার ফেরেশতাগণ! তোমরা সাক্ষী থেকো আমি আমার এ অনুতপ্ত বান্দার তওবা গ্রহণ করলাম আর তাকে মাফ করে দিলাম।
এক কবি বলেন:
يَا أَيُّهَا الْمُزْنِبُ الْمُحْصِي جَرَائِمَهُ لَا تَنْسَ ذَنْبَكَ وَاذْكُرْ مِنْهُ مَا سَلَفَا وَتُبْ إِلى الله
ওহে পাপী, চরম পর্যায়ে উপনীত অপরাধী! তোমার পাপাচারের কথা ভুলে যেওনা। অতীতের সব পাপগুলো স্মরণ করো এবং আল্লাহর কাছে তওবা করো।
📄 এক গুনাহগার যুবকের তওবা
ফকীহ আবুল লাইস সমরকন্দি (রহ.) একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন যে একদা হযরত ওমর (রাযি.) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দরবারে কাঁদতে কাঁদতে এসে হাজির হলেন। কারণ জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন—ইয়া রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। আপনার দরজায় একজন যুবক দাঁড়িয়ে আছে। সে আমার অন্তর জ্বালিয়ে দিয়েছে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন তাকে ভেতরে নিয়ে এসো। অতঃপর যুবক কাঁদতে কাঁদতে ভেতরে প্রবেশ করলো। আল্লাহর রাসূল তাকে কাঁদার কারণ জিজ্ঞেস করলেন—সে বললো হুজুর! আমার দ্বারা মারাত্মক গুনাহ হয়ে গেছে। তাই মহান আল্লাহর আযাবের ভয়ে আমি কাঁদছি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন—তুমি কি আল্লাহর সঙ্গে শিরক করেছো? কাউকে অন্যায়ভাবে কতল করেছো? সে বললো না আল্লাহর রাসূল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন—তাহলে আল্লাহ তায়ালা তোমার গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন। চাই সে গুনাহ আসমান জমিন পরিমাণ হউক না কেন। যুবক বললো—হে আল্লাহর রাসূল! আমার গুনাহ এর চেয়েও বড় এবং অধিক মারাত্মক। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন—তোমার গুনাহ কি আল্লাহর ক্ষমার চাইতেও বড়? যুবক বললো—হুজুর! আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সবচাইতে মহান। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন—তাহলে শোন মহান আল্লাহ তায়ালা বড় বড় গুনাহ ও মাফ করে দেন।
অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন—তুমি কি গুনাহ করেছো? আমাকে বল। যুবক বললো—হে আল্লাহর রাসূল! তা বর্ণনা করতে আমার অত্যন্ত লজ্জাবোধ হচ্ছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পুনরায় তাকে বলতে নির্দেশ করলেন। সে বললো—আমি বিগত সাত বছর যাবত কাফন চুরি করে আসছি। কিছুদিন হয় এক আনসারী যুবতীর মৃত্যু হয়। তাকে দাফন করার পর কবর খুড়ে আমি তার কাফন চুরি করতে ছিলাম। এমন সময় শয়তান আমার অন্তরে কুমন্ত্রণা দেয়। ফলে আমি মৃত সে যুবতীর সাথে যিনা করেছি। তারপর আমি কিছু দূর যেতে না যেতেই হঠাৎ যুবতী কবর থেকে দাঁড়িয়ে বলতে লাগল—ওহে যুবক! তোর ধ্বংস হোক। মহান আল্লাহ তায়ালার প্রতি কি তোর কোন ভয় নেই? তিনি মজলুমের পক্ষ হয়ে জালিমের প্রতিশোধ নিবেন। তুই আমাকে অগণিত মৃতের সামনে লজ্জিত করলি।
যুবকের এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে গর্দান ধরে বের করে দিলেন এবং বললেন—হে ফাসেক! তুই তো জাহান্নামের উপযুক্ত কাজ করেছিস। তারপর যুবক সেখান থেকে কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে গেলো। দীর্ঘ চল্লিশ রাত সে একাধারে আল্লাহ তায়ালার দরবারে অনুতাপ ও কান্নাকাটি করে কাঁদলো। ক্ষমা চাইলো। আকাশের দিকে মাথা তুলে বললো—ওগো আল্লাহ! মুহাম্মদ, আদম ও ইবরাহীম আলাইহিস সালাম এর খোদা! যদি তুমি আমাকে মাফ করে দিয়ে থাকো তাহলে এ খবর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সাহাবায়ে কেরামদের জানিয়ে দাও। আর যদি মাফ না করে থাক তাহলে আসমান থেকে অগ্নি বর্ষণ করে আমাকে জ্বালিয়ে দাও এবং আখেরাতে তোমার আযাব থেকে রক্ষা করো।
অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পবিত্র খেদমতে হযরত জিবরাইল আলাইহিস সালাম উপস্থিত হয়ে বললেন—ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার রব আপনাকে সালাম জানিয়েছেন এবং বলেছেন তিনি সেই যুবককে ক্ষমা করে দিয়েছেন। তারপর রাসূলল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেই যুবককে ডেকে উক্ত সুসংবাদ শুনিয়ে দিলেন।
প্রিয় ভাই ও বোন! এ হলো আল্লাকে ভয় করে অনুশোচনার অশ্রু ঝরানোর পুরস্কার। কোরআনে পাকে বলা হচ্ছে:
إِنَّ اللهَ يُحِبُّ التَّوَّابِينَ وَيُحِبُّ الْمُتَطَهِّرِينَ
নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা তওবাকারী এবং অপবিত্রতা থেকে যারা বেঁচে থাকে তাদেরকে ভাল বাসেন। (সূরা বাক্বারা-২২২)
📄 বান্দার তওবায় আল্লাহর খুশি
হযরত ইমাম হাসান (রাযি.) বলেন, যখন আল্লাহ তায়ালা হযরত আদম আলাইহিস সালাম এর তওবা কবুল করলেন তখন ফেরেশতাগণ তাঁকে মোবারকবাদ জানালো। এই সুবাদে হযরত জিবরাইল ও মিকাইল আলাইহিস সালামও এসে বললেন—আল্লাহ তায়ালা আপনার তওবা কবুল করেছেন। আপনার মনের আকাঙ্খা পূর্ণ করেছেন। হযরত আদম (আঃ) বললেন—হে জিবরাঈল! এখন তওবা কবুলের পর কি জানতে পারি যে আমার মাকাম ও অবস্থান কোন পর্যায়ে? তখন ওহি আসল—হে আদম! তোমার আওলাদ ও সন্তান সন্ততির জন্য আমি দুঃখ ক্লেশ ও যাতনা সাধনা অবধারিত করে দিয়েছি। আর তোমার সূত্রে তারাও তওবার উত্তরাধিকারী হবে। তাদের কেউ যখন আমার কাছে তওবা করবে আমি অবশ্যই তা কবুল করব। তাদের গুনাহ মাফ করে দেবো। এ ব্যাপারে আমি কোনরূপ কৃপণতা করব না। কেননা আমার সিফাত হলো বান্দার ডাকে সাড়া প্রদানকারী। আমি বান্দার অতি নিকটবর্তী。
হাদীস শরীফে এসেছে—রাত্রে যে গুনাহে লিপ্ত হয় তার গুনাহ মাফের জন্য আল্লাহ তায়ালা হস্ত প্রসারিত করে তাকে সারাদিন ডাকতে থাকেন। আর দিনের গুনাহের তওবার জন্য সারারাত ডাকতে থাকেন। এ ভাবে মাগরিব থেকে সূর্যদয় পর্যন্ত আল্লাহ তায়ালার ডাক অব্যাহত থাকে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও এরশাদ করেন—কখনও কখনও এমন হয় যে বান্দা গুনাহ করার পর তওবা করলে তওবার কারণে সে জান্নাত লাভের সুযোগ পায়। জিজ্ঞাসা করা হলো—হে আল্লাহর রাসূল! এটা কি করে সম্ভব? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন—উক্ত গুনাহের কারণে বান্দা লজ্জিত ও অনুতপ্ত হয়, সে তওবা করে। পরবর্তীতে সে ঐ গুনাহ থেকে দূরে থাকে। এভাবে কৃত গুনাহের তওবা তাকে জান্নাতে পৌঁছে দেয়। আরও এরশাদ হচ্ছে—লজ্জা ও অনুতাপ বান্দার গুনাহের ক্ষতিপূরণ করে দেয়।
শয়তান অভিশপ্ত হওয়ার পর আল্লাহ তায়ালার নিকট কিছুকাল হায়াত প্রার্থনা করেছিলো। অতঃপর আল্লাহ তায়ালা তাকে কিয়ামত পর্যন্ত হায়াত দিয়েছেন। তখন সে বলল—হে আল্লাহ! তোমার ইজ্জতের কসম, বনী আদমের দেহে যতক্ষণ পর্যন্ত প্রাণবায়ু থাকে আমি তাদেরকে তোমার আনুগত্য হতে বিমুখ করে রাখব। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন—আমার ইজ্জতের ও পরাক্রমশীলতার কসম, প্রতি মুহূর্তে আমি বনী আদমের জন্য তওবার দরজা খোলা রাখব।
হযরত আব্দুল্লাহ বিন ওমর (রাযি.) বলেন, যে ব্যক্তি গুনাহের কথা স্মরণ করে দুঃখিত হয় এবং আল্লাহর ভয়ে শঙ্কিত হয় তার পাপ আমলনামা থেকে মিটিয়ে দেয়া হয়। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাযি.) কে এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করেছিল—একজন পাপী লোক তওবা করতে চায় তার তওবার কোনো অবকাশ আছে কি? একথা শুনে চেহারা অন্যদিকে ফিরিয়ে নিলেন। কিছুক্ষণ পর তার দিকে ফিরে অশ্রুশিক্ত নয়নে বললেন—জান্নাতের বহু দরজা রয়েছে। সেগুলো সময়ে সময়ে খোলা হয় আবার সময়ে সময়ে বন্ধ করা হয়। কিন্তু একমাত্র তওবার দরজা কখনও বন্ধ করা হয় না। বরং সর্বদা সেখানে একজন ফেরেশতা মোতায়ন রাখা হয়। সুতরাং তোমরা নেক আমল ও ইবাদতের ব্যাপারে কখনও নিরাশ হয়ো না。
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাযি.) বলেন, কিয়ামতের দিন কিছু লোক এমন হবে যারা নিজেদেরকে তওবাকারী বলে দাবী করবে কিন্তু মহান রাব্বুল আলামীনের নিকট তাদেরকে প্রকৃত তওবাকারী হিসেবে গন্য করা হবে না। কারণ তারা তওবার প্রকৃত তরিকা অবলম্বন করে নাই। দুনিয়াতে তারা তওবা করে বটে কিন্তু কৃত গুনাহের জন্য লজ্জিত ও অনুতপ্ত হয় নাই। তারা ভবিষ্যতে গুনাহ থেকে আত্মরক্ষা করে নাই। আত্মরক্ষার দৃঢ় সংকল্পও করে নাই। তারা যাদের উপর জুলুম করেছিল তাদের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে নাই। তারা যাদের হক নষ্ট করেছিল যাদের হক আত্মস্যাৎ করেছিল তাদের হক আদায় করে নাই। অথচ এদের জন্য সে সুযোগ ছিল। অবশ্য চেষ্টা করা সত্ত্বেও যদি হক আদায় করা সম্ভব না হয় অতঃপর তাদের জন্য আল্লাহ তায়ালার দরবারে এস্তেগফার ও মঙ্গল কামনা করে তাহলে আশা করা যায় আল্লাহ তায়ালা হকদারকে রাজি করে তওবাকারীকে পরিত্রাণ দিবেন।
কিন্তু এ কথা স্মরণ রাখা কর্তব্য যে সবচেয়ে বড় আপদ হচ্ছে গুনাহ করে ভুলে যাওয়া এবং গুনাহের ব্যাপারে এমন গাফেল হওয়া যে তওবার কথা অন্তরে আসে না। অথবা অনেকে এসব গুনাহ ভুলে যায় তওবা করে না। তার জন্য রয়েছে ভয়াবহ বিপদ। তাই হে গাফেল! সর্বদা নিজের কার্যকলাপের প্রতি তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখো, অকস্মাৎ কোন গুনাহ হয়ে গেলে তৎক্ষণাৎ তওবা করো। এ ব্যাপারে অবহেলা করো না। অবশ্যই গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা কর্তব্য। যদি গুনাহ হয়েই যায় তবে অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহ তায়ালার দরবারে মাফ চাও।
এক বুযুর্গ সাধক কতই না সুন্দর করে বলেছেন:
يَا أَيُّهَا الْمُزْنِبُ الْمُحْصِي جَرَائِمَةً
لَا تَنْسَ ذَنْبَكَ وَاذْكُرُ مِنْهُ مَا سَلَفَفَا
ওহে পাপি! চরম পর্যায়ে উপনীত অপরাধী! তোমার গুনাহের কথা ভুলে যেও না। অতীতের সব গুনাহগুলো স্মরণ করো।
وَتُبْ إِلى اللهِ قَبْلَ الْمَوْتِ وَأَنْزَجِرَا
يَا عَاصِيَّا وَاعْتَرَفُ إِنْ كُنْتَ مُعْتَرِفًا
এবং মৃত্যুর পূর্বেই সতর্ক হয়ে আল্লাহ তায়ালার কাছে স্বীয় গুনাহের স্বীকারোক্তি দিয়ে অনুতপ্ত হও এবং সত্যিকারের তওবা করো।