📄 হযরত ইবরাহীম আদহাম (রহ.)-এর চিন্তা
হযরত ইবরাহীম আদহামকে কেউ বললো, হযরত! আপনি বলেন আমি আপনার সান্নিধ্যে কিছু সময় কাটাবো। আপনি আমাকে কিছু ওয়াজ নসিহত করবেন। হযরত ইবরাহীম আদহাম বললেন, আমি এখনো চারটি কাজ শেষ করতে পারিনি। এগুলো শেষ হলে হয়তো বা অন্য কাজ করতে পারবো। সে জিজ্ঞেস করলো কাজ চারটি কি কি? তিনি বললেন—প্রথম কাজ হলো আল্লাহ তায়ালা রূহের জগতে বলেছিলেন লোকদের একদল জান্নাতী আর একদল জাহান্নামী। আমাকে সব সময় চিন্তায় অস্থির করে রাখে আমি কোন দলের অন্তর্ভুক্ত।
দ্বিতীয়—নারীর গর্ভে যখন বাচ্চা আসে ফেরেশতা আল্লাহকে জিজ্ঞেস করেন এ সন্তানের নামে সৌভাগ্যশীল লেখবো না দুর্ভাগা লিখবো? সব সময় আমার চিন্তা হয় না জানি আমাকে কোন নামে লেখা হয়েছে? সৌভাগ্যশীল না দুর্ভাগা!
তৃতীয়—ফেরেশতা যখন কারও জান কবজ করতে আসে আল্লাহকে জিজ্ঞেস করে এ আত্মা মুসলমানদের সাথে রাখবো না কাফেরদের সাথে রাখবো? সব সময় আমার ভাবনা হয় ফেরেশতাদের জিজ্ঞাসার জবাবে আমার বেলায় কি বলা হবে?
চতুর্থ—কেয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করবেন:
وَامْتَازُ الْيَوْمَ أَيُّهَا الْمُجْرِمُونَ
অপরাধীরা আজ তোমরা আলাদা হয়ে যাও। (সূরা ইয়াসীন : ৫৯)
আমার চিন্তা হয় আমার জায়গা অপরাধীদের সাথে হবে না আল্লাহর অনুগত বান্দাদের সাথে হবে! যতক্ষণ এ চার কাজে ব্যস্ত আছি অন্যকোন বিষয়ে কথা বলার সুযোগ নাই। আহ! তারা জীবনের সময়টাকে কত মূল্য দিতেন।
📄 আল্লাহর রহমত
প্রিয় ভাই ও বোন! এ জগতে যারা ভাল কাজ করবে তারা পরকালে নিজেদের অবস্থান দেখতে পাবে। তারা তাদের ভাল কাজের প্রতিদান যখন পাবে তখন দুনিয়ার সব কিছু ভুলে যাবে। তাদের এমন সম্মান দেওয়া হবে এরপর আর লাঞ্চিত হবে না। এমন বাদশাহী পাবে এরপর আর দারিদ্রতা আসবে না। এমন বড়ত্ব পাবে এরপর আর পিছনে ফিরতে হবে না। এমন ভালবাসা পাবে এরপর আর ঘৃণা আসবে না। আল্লাহ আকবার। সেইতো সফল যে দুনিয়াতে কয়েকটি দিন কষ্ট ভোগ করেছে। নামায পড়েছে। রোজা রেখেছে। তেলাওয়াত করেছে। নারী পর্দায় থেকেছে। নেক কাজও আল্লাহভীতির মধ্যে সময় কাটিয়েছে। তার জন্য সেই দিন সৌভাগ্যের দরজা খুলে যাবে। মহান রাব্বুল আলামীনের মেহমান হবে。
সেদিন এ লোক কার মেহমান হবে? নিজ প্রতিপালকের! আহ! কেমন যে হবে সে মেহমানদারী! মহান রব নিজে মেজবান। বান্দা মেহমান। দয়ালু আল্লাহ মেহমানদারী করার জন্য জান্নাত সাজিয়ে রেখেছেন। জান্নাতকে নাজ ও নেয়ামত দ্বারা ভরে দিয়েছেন। সব অনুগত বান্দার জন্য। বান্দার জন্য আল্লাহ তায়ালার রহমতের দ্বার উন্মুক্ত। আজও উন্মুক্ত পরকালেও উন্মুক্ত থাকবে। আল্লাহর রহমত অনেক প্রশস্ত। শায়েখ আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.) নিজের মুরিদদের সামনে ষোলটি বছর আল্লাহর রহমত নিয়ে বয়ান করলেন। এরপর একদিন আযাব সম্পর্কে আলোচনা করলেন। মুরিদরা আযাবের বর্ণনা শুনে ভয়ে অস্থির। চারদিকে কান্নার রোল পড়ে গেল। এমন সময় এলহাম হলো—হে আব্দুল কাদির! আমার রহমত কি শেষ হয়ে গেছে? তুমি আজাবের আলোচনা করে মানুষকে নিরাশ করছো?
দুনিয়া পরীক্ষার স্থান। রঙ তামাশা হাসি মযাক এবং ভোগ-বিলাসের স্থান নয়। আজ আমরাতো পরীক্ষার এ স্থানকে ফুর্তির মঞ্চ বানিয়ে নিয়েছি। অথচ আমাদের জীবনের মূল উদ্দেশ্য হওয়ার কথা ছিল আল্লাহ তায়ালার গোলামী। বান্দাতো তাকেই বলে যার মাঝে বন্দেগী আছে। অন্যথায় সে দুর্গন্ধময় মিথ্যুক প্রতারক ও ধোকা-বাজে পরিণত হয়। মানুষকে সংযত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। লাগামহীন জীবন-যাপনে আল্লাহ তায়ালার দয়া ও রহমত বর্ষিত হয় না। কেননা এমন সংযমহীন জীবন মানুষের নয়। গবাদি পশু ও জানোয়ারের জীবন হয় অসংযত লাগামহীন।
বুঝতে হবে আমাদের জীবন লাগামহীন নয়। আল্লাহ তায়ালা ভালবেসে আমাদের সৃষ্টির সেরা বানিয়েছেন। তাকে জীবন পরিচালনা করার জন্য বেশ কিছু নির্দেশনা দান করেছেন। তাকে সেই নির্দেশ মত চলতে হবে। মানুষ নিজ ইচ্ছায় পৃথিবীতে আসতে পারেনি আবার তার খুশি মতও যেতে পারবে না। অতএব মধ্যবর্তী সময়টুকু নিজের মন মত করে কাটানোর অধিকারও তার নেই। আল্লাহ তায়ালার নির্দেশ মেনে চলার মাঝেই জীবনের সফলতা। আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছায় দুনিয়া এসেছি আবার আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছায়ই দুনিয়া থেকে বিদায় নেব। তাহলে তাঁর নির্দেশ ছাড়া কার নির্দেশ মানব? আল্লাহ ছাড়া কে এমন আছে যার মতাদর্শে পূর্ণ সফলতা আছে? নেই। পৃথিবীতে এমন কেউ নেই একমাত্র আল্লাহ তায়ালার পথেই সকল সফলতা, মুক্তি এবং কামিয়াবী। জীবন থেকে শেষ হয়ে যাওয়া একটি দিন পৃষ্ঠা স্বরূপ। আমরা উক্ত পৃষ্ঠায় প্রশংসাও লিখতে পারি আবার লিখতে পারি দুর্নামও। এটা আমাদের আকলের বিষয়। এ কথাতো সত্য যে আমাদের জীবন থেকে যে দিনটি চলে যাচ্ছে তা কোন ভাবেই ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। অর্থাৎ যেদিনটি চলে গেছে তা মূলত চিরতরে হারিয়ে গেছে। তাই সামনে যেটুকু সময় আছে তা আল্লাহ তায়ালার বন্দেগীতে কাটিয়ে দেয়া।
এক বুযুর্গ বলেছেন, সময় তিন শ্রেণীতে বিভক্ত।
(এক) যা গত হয়েছে। আর গত হওয়া সময়গুলো তোমার জীবন থেকে হারিয়ে গেছে।
(দুই) যা এখনো শেষ হয়নি। আগামীতে আসবে। সেই আগত আগামী দিনগুলো সম্পর্কে তোমার ধারণা নেই। তুমি জাননা সে দিনগুলো তোমার জীবনে আসবে কিনা? হয়ত বা আগামী দিনের সূর্য উঠার পূর্বেই তোমার জীবন প্রদীপ চিরতরে নিভে যাবে।
(তিন) উপস্থিত সময় বা দিন। এটি তোমার চলমান সময়। এ সময়টা তোমার ক্ষমতায় আছে। সুতরাং গত হওয়া দিন নিয়ে ভেবো না। আগামী দিন নিয়ে ভরসা করে বসে থেকো না। তোমার নিকট চলমান যে দিনটি আছে তাকে গনিমত মনে করো। এ দিনটিকে আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি বা খুশির পেছনে লাগাও। তাহলেই তুমি ধন্য।
হযরত রাবেয়া বসরী (রহ.) এর কথা মনে আছে? আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য পেয়ে যারা নিজেকে ধন্য করেছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম রাবেয়া বসরী। তিনি বিরল প্রকৃতির আল্লাহর ওলি ছিলেন। বছরের যে ক'দিন রোজা রাখা হারাম তা বাদে বছরে প্রতিদিনই তিনি রোযা রাখতেন। তার জবানে সর্বদা আল্লাহ তায়ালার যিকির থাকতো। তিনি অকৃতজ্ঞ বান্দাদের বলতেন—হে মানব! আল্লাহর নেয়ামত খেয়ে খেয়ে তোমার দাঁত ক্ষয় করে ফেলেছো অথচ সামান্য সময় তোমার জবান তাঁর প্রশংসায় ব্যয় করছো না। তুমি আর কত অকৃতজ্ঞ থাকবে!
📄 হে যুবক!
প্রিয় ভাই ও বোন! আজ সেই যুব সম্প্রদায় কোথায়? যারা রাতের শেষ প্রহরে বিছানা ছেড়ে জেগে উঠতেন। তাহাজ্জুদের নামায পড়ে অন্তরে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ জিকিরের ধাক্কা লাগাতেন। যে ধাক্কায় তাদের অন্তরাত্মা আল্লাহর ভয়ে কেঁপে উঠত। এক কবি বলেছেন—ওগো দয়াময় আল্লাহ! তোমার আল্লাহ নামের মধুমাখা আওয়াজ আমার অন্তরে শিহরণ জাগায়। তোমার প্রেমের ব্যাকুলতায় আমার অন্তর অস্থির হয়ে যায়। এভাবে আল্লাহকে ডেকে যদি নিজেকে শুদ্ধি করতে পারি তাহলে আমার মর্যাদা এত উঁচুতে উঠবে যে আসমানের সুরাইয়্যা নামক-নক্ষত্রও আমার পেছনে পড়ে থাকবে।
আর এটা তখনই সম্ভব হবে যখন আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমার প্রতি সন্তুষ্ট হবেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমার প্রতি সন্তুষ্ট হলেই আমার অন্তরের অবস্থা কুদরতী নূরে পরিপূর্ণ হয়ে যাবে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বান্দার প্রতি সন্তুষ্ট নাকি অসন্তুষ্ট তা আমার কর্মের দ্বারা বুঝে আসে। অর্থাৎ বান্দার নেক আমল দেখে আল্লাহ তায়ালা সন্তুষ্ট হন। আর বদআমল দেখে হন অসন্তুষ্ট। অর্থাৎ আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সন্তুষ্টি কিংবা অসন্তুষ্টি বুঝার মাপকাঠি হলো বান্দার আমল। যখন বান্দার উপর আল্লাহর রহমত অবতীর্ণ হয় তখন তার চোখে ন্যায় অন্যায়ের পার্থক্য ফুটে উঠে। সে সময় মানুষের কর্তব্য তার কৃত অপরাধকে স্মরণ করা এবং সেই অপরাধের জন্য আল্লাহ পাকের কাছে ক্ষমা চাওয়া।
এক কবি কত সুন্দর করে বলেছেন—মুসলমানদের সে গৌরবময় দিনগুলো আমরা ভুলতে বসেছি। আর বিজাতিদের ইতিহাস স্মরণ রাখছি। ভুলে গিয়েছি নিজেদের গৌরব উজ্জ্বল ইতিহাস। আয়নায় নিজেদের চেহারার চাকচিক্য দেখছি কিন্তু অন্তরের ক্ষত দেখছি না। যে মুসলমান নিজেদের স্ত্রী সন্তানদের আল্লাহর কাছে সপে দিয়ে জিহাদের ময়দানে হাসিমুখে প্রাণ দিয়ে দিতো। আজ তারা মৃত্যুর কথা ভুলে গেছে। মুসলমানদের ইবাদতগাহের জৌলুস বৃদ্ধি পেয়েছে কিন্তু মুসল্লিদের এখলাস দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। আজ ঈমানদারদের কণ্ঠে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর ধ্বনি উচ্চারিত হচ্ছে কিন্তু যে ধ্বনি অন্তরাত্মায় পরিবর্তন ঘটায় তা উচ্চারিত হচ্ছে না। বলুন তো এমন কেন হচ্ছে? এর কারণ হলো আল্লাহ তায়ালার দেয়া প্রেসক্রিপশন মতো নিজেকে পরিচালনা করছি না। বান্দা যখন মহান রাব্বুল আলামীনের হুকুমগুলো অমান্য করতে থাকে তখন আল্লাহ তায়ালাও ঐ বান্দা থেকে রহমত তুলে নেন। ফলে তার উপর নেমে আসে বিভিন্ন রকমের বিপদাপদ। পেরেশানীতে ভরে যায় অন্তরটা।
মনোরোগে আক্রান্ত এক রোগী। দুনিয়ার সবচেয়ে বড় ডাক্তারের কাছ থেকে প্রেসক্রিপশন করিয়েছে। অতঃপর সেই প্রেসিক্রিপশন ভাজ করে পকেটে রেখে দিয়েছে। এভাবে বেশ কিছু দিন অতিবাহিত হলো। প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী সে কোন চিকিৎসাই গ্রহণ করলো না। যার দরুণ সে অসুস্থই থেকে গেলো। তার রোগ ভাল হওয়ার কোন লক্ষণই যখন দেখা গেল না তখন পুনরায় ডাক্তারের কাছে আসলো। এসে ডাক্তারকে বললো ডাক্তার সাহেব আমার রোগের কোন পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছি না। ডাক্তার জিজ্ঞেস করলেন আপনি কি প্রেসক্রিপশন মতো ঔষধ খেয়েছেন? জবাবে রোগী বলল আমি তা ভাঁজ করে পকেটে রেখে দিয়েছি। এবার ডাক্তার তাকে বললেন বেওকুফ। প্রেসক্রিপশন পকেটে রাখলে রোগ কি করে ভালো হবে? প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী তোমাকে ঔষধ খেতে হবে এবং দিকনির্দেশনা মেনে চলতে হবে। তবেই সুস্থ হতে পারবে।
অনুরূপভাবে আল্লাহ তায়ালাও মানব মুক্তির জন্য কোরআন নামক প্রেসক্রিপশন পাঠিয়েছেন। যার মধ্যে মানুষের আত্মিক এবং দৈহিক মুক্তি নিহিত। অথচ আমরা একে ঘরের তাকে সাজিয়ে রাখছি। আর নিজেকে আত্মিক ও দৈহিক উভয় রকমের রোগে নিঃশেষ করে দিচ্ছি। যার দরুণ হতাশার মাঝে দিন দিন নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছি। ভাবছি অশান্তি কেন আজ আমাদের পিছু ছাড়ছে না? কেনই বা জীবনে শান্তি আসছে না। একটি সমস্যার মাঝে আর একটি সমস্যা এসে জড়ো হচ্ছে? বড়ই করুণ অবস্থা। সবাই বলছে কেন এমন হচ্ছে? কিছুইতো বুঝতে পারছি না? পরিবারগুলো আজ জ্বলন্ত কড়াইয়ের মত ফুটছে। ঝগড়া বিবাদ মামলা মোকাদ্দমা। হিংসা বিদ্বেষ। এসব অশান্তির কারণে পরিবার সমাজ সবজায়গায় পেরেশানী অস্থিরতা মানুষ মুক্তির উপায় খুঁজে পাচ্ছে না। মুক্তির উপায় তো আছে। আমরা জানতেও চাই না মানতেও চাই না। মুক্তির উপায় হলো আল্লাহ তায়ালার দেয়া প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী জীবন-যাপন করা। মানুষ যখন আল্লাহ তায়ালার হুকুম আহকামগুলোকে অমান্য করে তখন আল্লাহ পাকও ঐ বান্দা থেকে রহমত তুলে নেন। ফলে তার জীবনে বিপদ মুসিবত একটার পর একটা এসে হাজির হয়।
আমাদের কাজ তো ছিল জীবনের প্রতিটা মুহূর্তে মহান রাব্বুল আলামীনকে স্মরণ করা। এক মুহূর্তের জন্যেও তাকে না ভুলা। মানবজীবনের এটা উদ্দেশ্য। কেননা যার নেয়ামত খাও তাঁর শুকুর গুজারী কর। অকৃতজ্ঞ হয়ো না। যেমন ধরুন কৃষক একটি ফসল উৎপন্ন করতে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে কঠোর পরিশ্রম আর মেধা খরচ করে। তারপর জমিনে ফসল জন্ম নেয়। ফসল ফলাতে কৃষকের যেমন শ্রম রয়েছে তেমনিভাবে রয়েছে মহান রব্বে কারীমের অসীম কুদরতের কারিশমা। কৃষক যেমন জমিনে হালচাষ বীজ বপন এবং পানি সেচ দেয়, আল্লাহ পাক উক্ত রোপন কৃত বীজ জমিনের ভেতর লালন পালন করেন। আকাশ থেকে বৃষ্টি দিয়ে জমিন সতেজ করে রাখেন। আর চন্দ্র সূর্য তাতে দেয় আলো। আর বাতাস দিয়ে জমিনের ফসলকে তরতাজা রাখেন। আর এভাবেই ফসল আলো বাতাস পানি গ্রহণ করে আস্তে আস্তে বেড়ে উঠে। অবশেষে তাতে জন্ম নেয় গমের দানা বা ধান। আল্লাহ তায়ালার কুদরতে ফসল যখন এ স্তর অতিক্রম করে তখন তা খাদ্য হয়ে মানুষের সামনে আসে। মানুষ বড়ই অকৃতজ্ঞ। এই রিযিক মুখে দেয়ার সময় মানুষ আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে না। আরে ভাই! দুম্বা দেখেছেন? দুম্বা একটি চতুষ্পদ জন্তু। এ দুম্বা তার মালিককে ভুলে না। মালিক দুম্বার গলা থেকে যখন রশি খুলে দেয় তখন দুম্বা মালিকের পিছে পিছে হাঁটছে। মালিক যেদিকে যাচ্ছে দুম্বাও সেদিকেই যাচ্ছে। চতুস্পদ এ জানোয়ার তার মালিকের কথা ভুলে না। আর তুমি সৃষ্টির সেরা হয়েও মহান মালিককে ভুলে গেছো? আমরা এ অকৃতজ্ঞতার কি জবাব দেবো? মালিকের সামনে দাঁড়াবো কোন মুখ নিয়ে?
📄 হতাশ হবেন না
وَ نُفِخَ فِي الصُّورِ فَإِذَا هُمْ مِّنَ الْأَجْدَاثِ إِلَى رَبِّهِمْ يَنْسِلُونَ - قَالُوا يُوَيْلَنَا مَنْ بَعَثَنَا مِنْ مَّرْقَدِنَا - هُذَا مَا وَعَدَ الرَّحْمَنُ وَصَدَقَ الْمُرْسَلُونَ
হাশরের দিন, বড় কঠিন সে দিন। যখন শিঙায় ফুঁ দেয়া হবে, 'আর মানুষ দলে দলে তার প্রভুর দিকে ফিরে আসবে। তারা বলবে হায়! কি বিপদ! কে ঘুম থেকে ওঠালো আমাদের? জবাব আসবে, দয়ালু আল্লাহতো এরই ওয়াদা করেছিলেন। সতর্ককারীরা সাবধান করেছিলেন ঠিকই। (সূরা ইয়াসীন, ৫১,৫২)
প্রিয় ভাই বোন! বিচার দিবস, ফয়সালার দিন। অনন্ত জীবনের শুরু। হিসাবের জন্য দণ্ডায়মান সব বনী আদম। সবাই চিন্তিত, কি হয় ফয়সালা। কত বড় ভয়ের দিন। মানুষ ভীত সন্ত্রস্ত, পেরেশান, অসহায়। দ্বিধা আর শংকায় দুলছে মানুষ। কি আছে ভাগ্যে? জান্নাত না জাহান্নাম? সিদ্ধান্ত দিবেন আল্লাহ রাব্বুল আলামীন। ভয়ে বাদশাহ কাঁপছে, কাঁপছে প্রজা। কাঁপছে ধনী, কাঁপছে গরীব। ভীত সবাই। দিশেহারা হয়ে পড়বে দুনিয়ার মাতবর, সর্দার, এমপি, মন্ত্রী, দাপটওয়ালা রাজা বাদশা—সবাই। সবাই বিপন্ন, সবাই বিষণ্ণ।
চারদিক থেকে জমা হবে মানুষ। হাশরের বিশাল ময়দানে। ছুটতে ছুটতে আসবে পিপিলিকার মত। খোলা আকাশ, সমতল জমিন। সূর্য থাকবে মাথার আধহাত উপরে। সেদিন সব অবাধ্য বড় বড় শয়তান। অত্যাচারী আর সীমালঙ্ঘনকারীরা ভয়ে কাতর হয়ে দাঁড়াবে আল্লাহ তায়ালার সামনে। তাদের মাথা থাকবে নত। কোরআনুল কারীমে আল্লাহ তায়ালা বলেন:
فَوَرَبِّكَ لَنَحْشُرَنَّهُمْ وَالشَّيَاطِينَ ثُمَّ لَنُحْضِرَنَّهُمْ حَوْلَ جَهَنَّمَ جِثِيًّا
আপনার লালন পালনকারীর শপথ, আমি ওইসব অবিশ্বাসী ও অভিশপ্তদের ফের উঠাবো। তারা উপুড় হয়ে পড়ে থাকবে জাহান্নামের কিনারে।
হে মুসলমান! তুমি কি এখনও সাবধান হবে না? আল্লাহ তায়ালা বলেন:
قُلُوبٌ يَوْمَئِذٍ وَاجِفَةٌ
কিছু অন্তর ভয়ে কাঁপবে সেদিন। (সূর নাজিয়াত, ৮)
أَبْصَارُهَا خَاشِعَةٌ
তাদের দৃষ্টি নত, ভীত ও সন্ত্রস্ত থাকবে। (সূরা নাজিয়াত, ৯)
এখানে কিছু অন্তর মানে হলো যারা অবিশ্বাসী সীমালঙ্ঘনকারীও কপটেরা। তাদের দৃষ্টি থাকবে নত। ভয়ার্ত, সন্ত্রস্ত। আল্লাহ তায়ালার ওয়াদা যে কত সত্য তারা তা দেখতে পাবে। অথচ দুনিয়ায় থাকতে তারা এটা অবিশ্বাস করত। সে দিন তারা দেখবে কি ভয়ংকর বিভীষিকাময় সে আযাব। তাদের অন্তর সেদিন কাঁপবে। জাহান্নাম তারা দেখবে। আর যখন জাহান্নামকে প্রজ্জ্বলিত করা হবে তখন তারা সবাই দেখতে পাবে জাহান্নামকে। সেটা জ্বলছে দাউ দাউ করে। আর যখন জান্নাতকে কাছে নিয়ে আসা হবে, অবিশ্বাসীরা জান্নাত দেখবে। জান্নাতের নেয়ামত তারা দেখবে। তারা আফসোস করবে। তারা বুঝবে কি পরিমাণ ঠকেছে তারা। আর জান্নাতীরাও জাহান্নামকে দেখবে। তারা অনুভব করবে কি পরিমাণ বিপদ কি পরিমাণ বিভীষিকা থেকে তারা মুক্তি পাচ্ছে।
যেদিন মহান রাব্বুল আলামীন অধিষ্ঠিত থাকবেন আরশে আজীমে। আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীন প্রশ্ন করবেন—হে বনী আদম! তোমাকে জীবন দিয়েছিলাম। সম্পদ দিয়েছিলাম। বুদ্ধি দিয়েছিলাম। বলো আজ কি নিয়ে এসেছো? আমার দেয়া জীবন কিভাবে ব্যয় করেছো? কি করে এসেছো? বুদ্ধি দিয়েছিলাম তা ব্যয় করেছো আমার বিরুদ্ধে। সম্পদ দিয়েছিলাম তা কাজে লাগিয়েছো আমার দুশমনিতে। হে বিদ্রোহী! হে বিশ্বাস ঘাতক! আমার খেয়ে আমার পরে আমার আশ্রয়ে ঘুমাতে। আমাকে একবারও স্মরণ করোনি? হায়! সেদিন মহান রবের নূর প্রকাশিত হবে। আর সরে যাবে পর্দা। রব্বে কারীমের অবর্ণনীয় জ্যোতির উজ্জ্বলতায় সিজদায় লুটিয়ে পড়বে বিশ্বাসীগণ। তাদের দেখাদেখি সিজদা দিতে চাইবে অবিশ্বাসীরাও। কিন্তু পারবে না। আল্লাহ তায়ালা তাদের শিরদাঁড়াকে লোহার মত শক্ত করে দিবেন।
আল্লাহ তায়ালা বলবেন—হে আমার বান্দারা! বলো তোমরা দুনিয়াতে কার উপাসনা করে এসেছো? বান্দা জবাব দিবে—হে আমাদের প্রতিপালক, আমরা তোমার ইবাদত করে এসেছি। যখন মুয়াজ্জিন তোমার নামে আহ্বান করেছে আমরা তোমার ঘরে ছুটে গেছি। রুকু করেছি সেজদা করেছি। তোমার কালাম তেলাওয়াত করেছি। তোমার শোকুর গোজারী করেছি। তোমার নবীর আদর্শে নিজেকে সাজিয়েছি। তোমার আদেশ নিষেধ মেনে চলেছি। তোমাকে এক অদ্বিতীয় মেনেছি। তোমার জন্য জানমাল কোরবান করেছি—বলবে মুমিনগণ।
তারপর অবিশ্বাসীরাও বলতে থাকবে—আমরাও তো এভাবেই এবাদত করেছি। তারা বুঝে যাবে তারা ধরা পড়ে গেছে। পালাবার পথ খুঁজবে। আল্লাহ তায়ালার দৃষ্টির বাইরে তারা যেতে পারবে না। তারপর ঘোষণা হবে মীমাংসার চরম উচ্চারণ। সত্য আর মিথ্যাকে আলাদা করে চেনার উচ্চারণ। ঘোষণা হবে আল্লাহ তায়ালার আদেশ:
وَامْتَازُ الْيَوْمَ أَيُّهَا الْمُجْرِمُونَ
হে অপরাধীরা আজ আলাদা হয়ে যাও। (সূরা ইয়াসীন : ৫৯)
এ হুকুম জারী হওয়ার পর কঠিন চেহারার ফিরিশতারা অবিশ্বাসী আর অংশীবাদীদের টেনে বের করে নেবে মুমিনদের কাতার থেকে। বিশ্বাসী আর অবিশ্বাসীরা আলাদা হয়ে যাবে। চিহ্নিত হয়ে যাবে তারা। এরপর মহান রাব্বুল আলামীন নজর দেবেন ঈমানদারদের উপর। এদের তিন ভাগে ভাগ করে দেয়া হবে। প্রথম দলটি থাকবে একেবারে সামনে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের কাছাকাছি। তারা পাবে মহান রাব্বুল আলামীনের ভালবাসা। তারাই সম্মানিত। মহান প্রভুর আপনজন।
দ্বিতীয় দলটি থাকবে ডানে। তৃতীয় দলটি থাকবে বায়ে। সামনের দলটি সম্মানিত। তারা আল্লাহ পাকের যোগ্য বান্দা। তারা হবেন নবী রাসূল, সিদ্দীক, শহীদ ও আল্লাহর ওলিগণ। এরা আল্লাহ তায়ালার আপনজন। ভালোবাসার মানুষ। এরা আল্লাহর প্রেমিক। এরা সফল। চিরদিনের জন্য।
আর যারা ডানে থাকবে তারা আমলনামা পাবে ডান হাতে। তারা জান্নাতী। তারা কামিয়াব সফলকাম। তারা চিরদিনের জন্য কামিয়াব হয়ে যাবে। আর যারা বামে থাকবে তাদের কর্মফল দেয়া হবে বাম হাতে। এরা জাহান্নামী। এরা ব্যর্থ। তারা যখন তাদের আমলনামা হাতে পাবে তারা অবাক হবে। নিজেকে ধিক্কার দিবে। দিশেহারা হয়ে পড়বে। তাকে বলা হবে পড়ো যা তুমি দুনিয়াতে করেছো। পাপী আমলনামা পড়ে আশ্চর্য হবে। বলবে একি! এতে দেখছি কোন কিছুই বাদ পড়েনি। আমি যা করেছিলাম সবই লেখা আছে।
বিশ্বাসী, আল্লাহ ভীরুদের হিসাব খুব জলদি শেষ হবে। পাপীদের হিসাব খুব কঠিন হবে। তারা নির্দিষ্ট একটা সময় পর্যন্ত তাদের পাপের শাস্তি ভোগ করবে। শাস্তি শেষ হলে মুক্তি পাবে।
তো ভাই ও বোনেরা! মহান রাব্বুল আলামীনের নিকট সর্বাধিক প্রিয় আওয়াজ হচ্ছে গুনাহের পর তওবাকারী বান্দার আওয়াজ। যে বান্দা আল্লাহকে ডেকে বলে ইয়া রব্ব! তখন আল্লাহ তায়ালা বলেন—ওহে আমার বান্দা! আমি তোমার সম্মুখেই আছি। তোমার যা ইচ্ছা আমার কাছে চাও, তোমার ডাক শোনার জন্যই আমি অপেক্ষায় আছি। আমি তোমার ডান বাম উপর সবদিকে বিরাজমান এবং তোমার অন্তরের অতি নিকটবর্তী। হে আমার ফেরেশতাগণ! তোমরা সাক্ষী থেকো আমি আমার এ অনুতপ্ত বান্দার তওবা গ্রহণ করলাম আর তাকে মাফ করে দিলাম।
এক কবি বলেন:
يَا أَيُّهَا الْمُزْنِبُ الْمُحْصِي جَرَائِمَهُ لَا تَنْسَ ذَنْبَكَ وَاذْكُرْ مِنْهُ مَا سَلَفَا وَتُبْ إِلى الله
ওহে পাপী, চরম পর্যায়ে উপনীত অপরাধী! তোমার পাপাচারের কথা ভুলে যেওনা। অতীতের সব পাপগুলো স্মরণ করো এবং আল্লাহর কাছে তওবা করো।