📄 চারদিকে শুধুই আগুন
প্রিয় ভাই ও বোন! জাহান্নামের কথা বলছিলাম, এই সেই লেলিহান অনন্ত অনল। চারদিকে শুধু লেলিহান আগুন, পরনে আলকাতরার পোশাক। প্রকাণ্ড হাতুড়ির প্রচণ্ড আঘাত। উপুড় করে ফেলা হবে আগুনে, উফ! সেই কি ভয়াবহ অবস্থা।
নীচে আগুন।
উপরে আগুন।
ডানে আগুন।
বামে আগুন。
সাঁতার কাটতে থাকবে আগুনে। ডুববে। আবার উঠবে। আবার ডুববে। খাদ্য হবে আগুন। আগুন তাদের পোশাক। আগুনের বালিশ। বিছানাও আগুনের। তারা পথ চলবে হেলে দুলে, জ্বলন্ত শরীর। শরীরের গোশতগুলো গলে গলে পড়বে। মাথার মগজ টগবগ করে ফুটতে থাকবে। তার চিৎকার করতে থাকবে হায় ধ্বংস, হায় ধ্বংস বলে। আর তখনই তাদের উপর ঢেলে দেওয়া হবে গরম পানি। ফলে তাদের পেটের ভেতরের সবকিছু গলে গলে বেরিয়ে আসবে। পিপাসায় ভেতরটা শুকিয়ে যাবে। চোখের মনি গলে গলে গালের উপর দিয়ে প্রবাহিত হবে। গালের চামড়াও খসে পড়বে। চামড়া যখন গলে গলে হাড্ডিসার হয়ে যাবে, তখন তাদের আবার নতুন চামড়ায় পরিণত করা হবে। তারা অসহ্য যন্ত্রণায় মৃত্যু কামনা করবে। কিন্তু মরতেও পারবে না। তাদের চেহারা কালো হয়ে যাবে। এ কালো চেহারা ও দৃষ্টি শক্তিহীন চোখের দিকে তাকালে বলুন তো কেমন লাগবে?
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা জুব্বুল হুজুন বা দুর্গতির গর্ত থেকে পানাহ চাও। আর ওয়াদিল হুজুন, বা দুশ্চিন্তাপূর্ণ নিম্নভূমি থেকে মহান রাব্বুল আলামীনের নিকট পানাহ চাও। সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! দুশ্চিন্তার নিম্নভূমি বা দুর্গতির গর্ত দ্বারা কি বুঝানো হয়েছে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তা হচ্ছে জাহান্নামের এমন একটি এলাকা যা হতে জাহান্নাম সত্তর বার আল্লাহর কাছে পানাহ চায়。
হযরত আনাস (রাযি.) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, সেই জিনিসের তামান্না করো যে জিনিসের প্রতি স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা তোমাদেরকে উৎসাহিত করেছেন। যে জিনিসের প্রতি আল্লাহ তায়ালা তোমাকে ভয়-ভীতি প্রদর্শন করেছেন সেই আযাব গজব ও জাহান্নামের ভয় করো। কারণ তোমাদের এই দুনিয়ার মধ্যে জান্নাতের একটি মাত্র বিন্দু ও যদি তোমাদের সঙ্গে থাকতো, তবে ঐ একটি বিন্দু তোমাদের জন্য সমগ্র দুনিয়াকে শান্তি ও আনন্দময় করে দিতো। পক্ষান্তরে, জাহান্নামের একটি মাত্র ফোটাও যদি এ দুনিয়ায় তোমাদের সঙ্গে থাকতো, তবে ঐ একটি ফোটাই সমগ্র দুনিয়া ও দুনিয়ার সব কিছুকে নোংড়া করে ফেলত。
হযরত আবু দারদা (রাযি.) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জাহান্নামীদের এমন কঠিনতর ক্ষুধায় যন্ত্রণাক্লিষ্ট করা হবে যা তাদের জন্য সমস্ত আযাবের বরাবর হয়ে যাবে। অর্থাৎ অন্যান্য আযাবের তুলনায় সে সময় ক্ষুধার যন্ত্রণাই সবচেয়ে বেশি কষ্টকর মনে হবে। জাহান্নামীরা খাবারের জন্য চিৎকার করতে থাকবে। তখন তাদেরকে এমন খাবার দেওয়া হবে যা তাদের গলায় আটকে যাবে। হঠাৎ তাদের মনে হবে দুনিয়াতে গলায় কিছু আটকে গেলে পানি পান করার পর তা নীচে নেমে যেত, তাই তারা পানির জন্য চিৎকার করতে থাকবে। তখন তাদেরকে গরম পানি দেওয়া হবে, ঐ পানি তারা মুখের কাছে নিতেই চেহারাটা ঝলসে যাবে। আর তা যখন পেটের ভেতর যাবে, তখন নাড়ি ভূড়ি গলে গলে ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে যাবে। তখন তারা বলাবলি করবে—চলো জাহান্নামের মুহাফিজ ফেরেশতাদের কাছে বলি তারা যদি একটা ব্যবস্থা করত। অতঃপর ফরিয়াদ জানাবে। বলবে তোমাদের মাবুদের কাছে বলো তিনি যেন আমাদের শান্তি অন্তত একদিনের জন্য হালকা করে দেন।
📄 হায় কি কঠিন যে আযাব
প্রিয় ভাই ও বোন! জাহান্নামের আযাবের বিভিন্ন প্রকার সংক্ষিপ্ত কিছু বর্ণনা করা হলো, বস্তুত জাহান্নামের ভয়াবহ আযাবের দুঃখ, বেদনা, লাঞ্চনা গঞ্জনা, আক্ষেপ অনুতাপের কোন সীমা পরিসীমা নেই। পবিত্র কোরআনে বলা হচ্ছে:
سَوَاءٌ عَلَيْنَا أَجَزِعْنَا أَمْ صَبَرْنَا مَا لَنَا مِنْ مَّحِيصٍ
আমাদের ছটফটানী, চিৎকার ও ধৈর্যধারণ সবই বরাবর। আমাদের যে কোনই পরিত্রাণ নেই। (সূরা ইবরাহীম-২১)
হযরত যায়েদ ইবনে আসলাম (রাযি.) এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন, ওরা অর্থাৎ জাহান্নামীরা একশত বছর ধৈর্যধারণ করে কাটিয়ে দিবে। তারপর আবার একশত বছর ছটফট ও চিৎকার করতে থাকবে। আবার একশত বছর যাবৎ ধৈর্যধারণ করে থাকবে। তারপর বলবে আমাদের ছটফটানী ও সবর করা সবই বরাবর।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কিয়ামতের দিন মৃত্যুকে একটি সুদর্শন ভেড়ার আকৃতিতে জান্নাত ও জাহান্নামের মাঝখানে হত্যা করা হবে এবং বলা হবে—হে জান্নাতের অধিবাসীরা! তোমরা চিরস্থায়ী জীবনের সুসংবাদ গ্রহণ করো। আর কোন মৃত্যু নেই। হে জাহান্নামের বাসিন্দারা! তোমরা ভয়াবহ আযাবের মধ্যে চিরস্থায়ীভাবে থাকো। আর কোন মৃত্যু নেই。
সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম হাসান (রাযি.) বলতেন, এক ব্যক্তিকে এক হাজার বছর পর জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেওয়া হবে। তিনি বললেন, হায়! সেই ব্যক্তিটি যদি আমি হতাম। একবার হযরত হাসান (রাযি.) কে নির্জনে বসে কাঁদতে দেখা গেল। জিজ্ঞাসা করা হলো, হে ইমাম! আপনি কাঁদছেন কেন? তিনি জবাব দিলেন, আমার ভয় হয় যে না জানি আমাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হয়。
প্রিয় ভাই ও বোন! দেখুন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রিয় নাতি, জান্নাতী যুবকদের সর্দার, তিনি নিজেও পরকাল নিয়ে কত চিন্তিত। তাঁদের এ অবস্থাও যদি আমাদের হুঁশ আসত কতইনা ভালো হতো। জাহান্নামীরা শুধু কি আগুন, সাপ, পুঁজ দ্বারাই শাস্তি প্রাপ্ত হবে? এসব কঠিন ও ভয়াবহ আযাবের সাথে সাথে তারা আরও নানা রকম শাস্তি তাদের জন্য বরাদ্ধ থাকবে। যেমন জান্নাতের অফুরন্ত নেয়ামত থেকে বঞ্চিত হওয়ার মনো কষ্ট। আল্লাহ তায়ালার দীদার না পাওয়ার যন্ত্রণা। আল্লাহ তায়ালার অসন্তুষ্টির যন্ত্রণা। এসব না পাওয়ার যন্ত্রণায় তারা ছটফট করবে। তারা বলাবলি করবে হায় আজ আমরা দুনিয়ার সামান্য ক'দিনের জাগতিক সুখের জন্য সামান্য ক'দিনের ভোগ বিলাসের জন্য জান্নাতের নেয়ামতগুলো থেকে বঞ্চিত হলাম। মনে মনে আক্ষেপ করবে। অনুতাপ করবে। বলবে হায় কেন আমরা আমাদের পালনকর্তার আনুগত্য করলাম না। আমাদের পালনকর্তার অবাধ্য হয়ে মূলত আমরা নিজেদেরকে ধ্বংস করলাম। কেন আমরা সামান্য ক'টি দিন নিজেদেরকে নিয়ন্ত্রণ করলাম না। আহ! যদি আনুগত্য করতাম। ফেলে আসা দুনিয়ার যিন্দেগী তো শেষ করেই এসেছি। আনুগত্য করলেও তো বিনিময়ে মহান রাব্বুল আলামীনের সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যমে তাঁর পরম সান্নিধ্য ও পুরস্কার প্রাপ্ত হতাম। এই বলে বলে তারা আফসোস করতে থাকবে। আর নিজেকে ধিক্কার দিবে。
প্রিয় ভাই ও বোন আমার! জাহান্নামে বসে অনুতপ্ত হয়ে কোন লাভ নেই। জাহান্নামে বসে নিজেকে ধিক্কার দিয়ে লাভ নেই। বরং এ কথাগুলো যদি আমাদের অন্তরে দাগ কাটে আর দুনিয়ার যিন্দেগীতে যদি মহান রাব্বুল আলামীনের সন্তুষ্টি অর্জন করে মরতে পারি তবেই আমাদের পরকাল আসান হয়ে যাবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, হাশরের দিনে কতিপয় মানুষকে জাহান্নামের দিক থেকে জান্নাতের দিকে নিয়ে আসা হবে। তারা যখন জান্নাতের নিকটবর্তী হবে জান্নাতের সুঘ্রাণ তাদের নাকে এসে লাগবে তারা এ ঘ্রাণে পাগল পারা হয়ে যাবে। জান্নাতের সুউচ্চ অট্টালিকা তাদের নজরে পড়বে। জান্নাতীদের জন্য আল্লাহ তায়ালা কর্তৃক দেওয়া অসংখ্য নেয়ামত সমূহ তারা দেখবে। এ সময় হুকুম আসবে—হে ফেরেশতারা! এখান থেকে তাদের সরিয়ে নাও তারা এসবের যোগ্য নয়। এগুলো তাদের নসীবে নেই। ফলে জাহান্নামীরা অবর্ণনীয় আক্ষেপ-হতাশা নিয়ে সেখান থেকে ফিরে আসবে এবং বলবে ‘হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি আপনার প্রিয় বান্দাদেরকে কত কি নেয়ামত ও পুরস্কার দ্বারা ভরে দিয়েছেন। এসব দেখানোর আগেই যদি আমাদেরকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করতেন তাহলে জাহান্নাম আমাদের পক্ষে আরও সহজ হতো। আমাদের অন্তরে এত আক্ষেপ থাকতো না।
আল্লাহ পাক জবাব দিবেন, আমি যে তা দেখালাম এ উদ্দেশ্য নিয়েই তো দেখালাম। তোমরা দুনিয়ার যিন্দেগীতে একাকী নির্জনে কত ভয়ংকর পাপাচারে লিপ্ত ছিলে। আবার মানুষের সামনে নিজেদেরকে মোত্তাকী হিসেবে জাহির করতে অথচ তা ছিলো আমার সাথে তোমাদের অন্তরের হালতের সম্পূর্ণ বিপরীত। হে হতভাগার দল! তোমরা মানুষের ভয় করলে? কিন্তু আমাকে ভয় করলে না? মানুষের চোখে সমাজের চোখে নিজেকে সম্মানিত করলে, আমার প্রতি খেয়াল করলে না! মানুষের জন্য কত কিছু বর্জন করলে কিন্তু আমার জন্য বুঝি বর্জন করা গেল না? তাই চিরস্থায়ী সুখ ও শান্তি তোমাদের জন্য হারাম করে দিয়েছি। সেই সাথে এই ভয়াবহ আযাব তোমাদের জন্য নির্ধারণ করেছি।
📄 আমাদের উপায় কি?
প্রিয় ভাই ও বোনেরা! আমাদের মানবীয় জ্ঞান যেখানে অনেক কিছু বুঝতে অপারগ। সেখানে মহান রাব্বুল আলামীন আমাদেরকে বলে দিয়েছেন আমাদের কি করণীয়। কোনটা ছাড়তে হবে আর কোনটা ধরতে হবে। আল্লাহ তায়ালা ঠিক করে দিয়েছেন আমাদের চলার পথ। জান্নাতের পথ ধরতে বলেছেন, জাহান্নামের পথ থেকে ভাগতে বলেছেন। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বলে দিয়েছেন, আসল হলো মৃত্যুর পরের জীবন। সেই জীবনের জন্য তোমরা প্রস্তুতি গ্রহণ করো—
লَا يَغُرَّنَّكَ تَقَلُّبُ الَّذِينَ كَفَرُوا فِي الْبِلَادِ - مَتَاعٌ قَلِيلٌ ثُمَّ مَأْواهُمْ جَهَنَّمُ وَبِئْسَ الْمِهَادُ
যারা কুফুরী করেছে, দেশে দেশে তাদের অবাধ বিচরণ যেন কিছুতেই তোমাকে বিভ্রান্ত না করে। এ স্বল্পকালীন ভোগমাত্র। তারপর জাহান্নাম তাদের আবাস। আর তা কত নিকৃষ্ট বিশ্রামস্থল। (সূরা আল ইমরান, ১৯৬, ১৯৭)
পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, দুনিয়া খেল তামাশা ছাড়া আর কিছু নয়। হে আমার ভাই, হে আমার বোন! আমরা এখানে প্রবাসী। এ জগত আমাদের আসল বাসস্থান নয়। আসল বাসস্থান হলো জান্নাত। এটা আমাদের সাময়িক নিবাস। কয়েকদিনের জন্য আমরা এখানে এসেছি। দুনিয়া পরীক্ষার জায়গা। আমাদের পরীক্ষা সব সময় চলবে। আমরা জেগে থাকি বা ঘুমিয়ে থাকি। আমরা বুঝতে পারি বা না পারি। আমাদের শেষ পরিণতি হলো মৃত্যু। প্রতিদিন আমরা একটু একটু করে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। আমাদের সামনে আশে পাশে কতজন কবরের যাত্রী হচ্ছে প্রতিদিন। এই তো কিছু দিন পূর্বে একজনকে রেখে এলাম কবরে। দুইদিন পূর্বেও তার সাথে আমার কথা হয়েছে। সুস্থ মানুষ। দুইদিন পর শোনলাম সে জগতে নেই। মানুষটিকে কবরে রেখে আসার সময় কবরস্থানে কত পরিচিত মানুষের কবর দেখে এলাম। নেমপ্লেটে লেখা আছে—অমুকের ছেলে অমুক। মৃত্যু এত তারীখে। আহ! এই তো জীবন! কত ক্ষণস্থায়ী এ জীবন。
বাপ বেচে আছে ছেলে নেই কবরবাসী হয়ে গেছে। মা বেঁচে আছে সন্তান মরে গেছে। দাদা বেঁচে আছে নাতি নেই মরে গেছে। আফসোস! মানুষ দীর্ঘ আশা করছে অথচ মৃত্যু তার নিকটে দাঁড়িয়ে মুচকি হাসছে। আমাদের অন্তরে এমন প্রলেপ পড়েছে যে মৃত্যুকে আমরা একেবারেই ভুলে গেছি। দুনিয়ার চাকচিক্যের প্রতি এতটাই ঝুকে পড়েছি যে আমার ঠিকানা ভুলে গেছি, আমার অবস্থান ভুলে গেছি, আমার গন্তব্য ভুলে গেছি。
একবার হযরত আলী (রাযি.) এক কবরস্থানে গিয়ে মৃত ব্যক্তিদের সম্বোধন করে বলেছিলেন:
يَا أَهْلَ الْقُبُورِا أَمْوَا لُكُمْ قُسِمَتْ وَدِيَارُكُمْ سُكِنَتْ وَنِسَأَلُكُمْ زُوِّجَتْ وَأَوْلَا দكُمْ حُرِّمَتْ.
হে কবরবাসীরা! তোমাদের ধন সম্পদ ভাগ হয়ে গেছে। তোমাদের ঘর বাড়ি আবাদ করা হয়েছে। তোমাদের স্ত্রীরা আবার বিয়ে করেছে। তোমাদের সন্তানরা দিন দিন মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে।
একবার জীবিত লোকদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেছিলেন, দুনিয়া একটু একটু করে দূরে সরে যাচ্ছে আর আখেরাত একটু একটু করে এগিয়ে আসছে। তোমরা দুনিয়ার সন্তান না হয়ে আখেরাতের সন্তান হও। কেননা আজ আমলের সুযোগ আছে কিন্তু হিসেব নেই। কিন্তু পরকালে হিসাব দিতে হবে। তবে আমলের সুযোগ থাকবে না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দরবারে ক'জন যুবক সাহাবী এসে বললেন:
مَنْ أَكْيَسُ النَّاسُ وَاحْزَمُ النَّاسَ
সবচেয়ে বুদ্ধিমান ও প্রত্যয়ী কে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
أَكْثَرُهُمْ ذِكْرَ الْمَوْتِ وَأَكْثَرُهُمْ اِسْتِعْدَادًا لِلمَوْتِ الْئِكَ الْأَلْيাসُ ذَهَبُوا بِشَرْفِ الدُّنْيَا وَكَرَامَةَ الْآخِرَةِ
তারাই বুদ্ধিমান যারা বেশি বেশি মৃত্যুর কথা মনে করে, মৃত্যুর প্রস্তুতি নেয়। এরা দুনিয়াতে শ্রেষ্ঠত্ব আর আখেরাতে সম্মান অর্জন করেছে。
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, স্বাদ বিনষ্টকারী জিনিসের কথা বেশি বেশি স্মরণ করো। সাহাবায়ে কেরামগণ জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! স্বাদ বিনষ্টকারী জিনিসটা কি? উত্তরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, মৃত্যু।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন সাহাবায়ে কেরামদের জিজ্ঞেস করলেন, মৃত্যু সম্পর্কে তোমাদের ধারণা কি? একজন বললেন—সকালে যখন ঘুম থেকে জাগি নিশ্চিত বলতে পারিনা রাত পাব কিনা? আরেকজন বললেন—যখন চার রাকাত নামাযে দাঁড়াই নিশ্চিত বলতে পারিনা সবগুলো রাকাত শেষ করতে পারব কিনা? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন—আমার অবস্থা হলো নামাযে আমি যখন একদিকে সালাম ফিরাই বলতে পারিনা অপর দিকে সালাম ফেরাতে পারব কিনা?
এক বুযুর্গ কবরস্থানে মোরাকাবা করতেন। লোকেরা জিজ্ঞেস করলো, হযরত! আপনি কবরবাসীকে কি অবস্থায় দেখেছেন? তিনি বললেন, তারা তাদের দুনিয়ার জীবন নিয়ে এতটাই অনুতপ্ত যে তা যদি দুনিয়ার লোকদের মাঝে ভাগ করে দেয়া হয় তবে তারা পাগল হয়ে যাবে।
📄 মৃত্যু কেন আসে?
একবার হযরত মূসা আলাইহিস সালাম আল্লাহকে জিজ্ঞেস করলেন, আল্লাহ! আপনি মানুষকে সৃষ্টি করেন আবার মেরেও ফেলেন কেন? আল্লাহ তায়ালা বললেন, মূসা! তুমি জমিনে ফসল ফলাও। হযরত মূসা আলাইহিস সালাম জমিনে গম চাষ করলেন। কিছুদিন পর ফসল পেকে গেলো। হযরত মুসা আলাইহিস সালাম যখন দেখলেন ফসল পেকে গেছে তখন তিনি এগুলো কাটার চিন্তা করলেন। তিনি ফসল কেটে গম ও ভূষি আলাদা করলেন এবং যত্ন করে গমগুলো রেখে দিলেন। আর ভূষিগুলো আলাদা রেখে দিলেন। আল্লাহ তায়ালা জিজ্ঞেস করলেন, হে মুসা! তুমি গম এবং ভূষিগুলো আলাদা করলে কেন? মূসা আলাইহিস সালাম বললেন, ফসল পেকে গেছে তাই আলাদা করে ফেলেছি। এবার আল্লাহ তায়ালা বললেন, মুসা! আমিও তো এটাই করি। যখন মানুষের জীবনের ফসল পেকে যায় আমি তা কেটে নেই। বীজের মত লোকদের জান্নাতে ফেলে দিই। আর ভূষির মত কিছু লোককে জাহান্নামে ফেলে দিই。
এক বুযুর্গ বলেন, মানুষ যত চেষ্টা করে জাহান্নাম কামাই করছে এর অর্ধেক চেষ্টা করলে সে জান্নাতের মালিক হয়ে যেতো। বাস্তবতা তো হলো আমরা অনেক পরিশ্রম করে জাহান্নাম ক্রয় করছি। যেমন চুরি করা। চুরি করা কবীরা গুনাহ। এর জন্য মানুষ কত শ্রম দেয় মেধা খরচ করে রাতের ঘুম নষ্ট করে চুরির মত জঘন্য কাজটি করে।
প্রিয় ভাই! আল্লাহর প্রিয় বান্দাগণ তাদের দীপ্তি ও বরকত সহ খুব দ্রুতই দুনিয়া ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। তাদের খালি জায়গা অন্ধকারে ভরে যাচ্ছে। শয়তান এ জায়গা পূরণ করে ফেলছে। মনে হচ্ছে দুনিয়া তার শেষ পরিণতি বরণ করতে প্রস্তুত। দেখুন! আজ যেসব বুযুর্গ দুনিয়া ছেড়ে যাচ্ছেন পরবর্তীতে তাদের মতো কাউকে দেখা যাচ্ছে না। এখন সে সময়টা আমরা অতিক্রম করছি। বড়ই নাযুক মুহূর্ত। এ সময় বড় বড় আল্লাহ ওয়ালারাও ঈমান হারানোর ভয়ে থাকে। আর আমরা! আমাদের ঈমান তো হলো তিল পরিমাণ। আর এ তিল পরিমাণ ঈমান নিয়েও আমরা উদাসীন। আল্লাহ্ পাক আমাদের দ্বীনের উপর অটল থাকার তৌফিক দান করুন। ইমাম কুরতুবি (রহ.) বলেন, মৃত্যু আসলেই একটি বড় মুসিবত। কিন্তু এর চেয়েও বড় মুসিবত হলো এর প্রতি উদাসীন থাকা। এর জন্য প্রস্তুত না থাকা।