📄 জাহান্নাম যাদের জন্য
সবার উপরে হলো জাহান্নাম। জাহান্নাম কাদের জন্য? কারা যাবে জাহান্নামে?
হযরত আদম আলাইহিস সালাম থেকে শুরু করে উম্মতে মুহাম্মদী পর্যন্ত যত ঈমানদার মানুষ কবীরা গুনাহ করে তওবা ছাড়া মৃত্যুবরণ করেছে, তাদের জন্য জাহান্নাম। এখন জানা দরকার কবীরা গুনাহ কি? কবীরা গুনাহ হলো, যেনা করা। মদপান করা। সুদ খাওয়া, ঘুষ খাওয়া। মিথ্যা বলা। হত্যা করা। গীবত করা। কারও অর্থ আত্মসাত করা। অন্যের জমি দখল করা। নামায ছেড়ে দেয়া, ইত্যাদি।
যারা এসব গুনাহে লিপ্ত হয়ে তওবা না করে মারা যাবে, তাদের জন্য জাহান্নামের শাস্তি। প্রত্যেক নাফরমান ব্যক্তি নিজ নিজ গুনাহের অনুপাতে তার শাস্তি ভোগ করবে। অথচ ঈমানদার ছিল, গুনাহ করেছে, তওবা করেনি। কেউ অল্পতেই নিষ্কৃতি পাবে। আবার কেউ হাজার হাজার বছর সেখানে পড়ে থাকবে।
তো আমার ভাই ও বোনেরা! মিযানের পাল্লার চিন্তা ফিকির থেকে উদাসীন থেকো না। আমলনামা ডান হাতে মিলবে, না বাম হাতে মিলবে সেই বিষয়ে গাফেল থেকো না। কারণ এ সাওয়াল জাওয়াবের পর মানুষ তিন শ্রেণীতে বিভক্ত হয়ে যাবে। এক শ্রেণী হবে সম্পূর্ণ নেকী শূন্য। পাখিরা যেভাবে ঠোঁট দিয়ে দানা তুলে নেয়। অনুরূপভাবে জাহান্নাম থেকে একটি কালো গর্দান বের হয়ে তাদের গ্রাস করবে। তাদেরকে জাহান্নামে ফেলে দিবে। আগুন তাদের সম্পূর্ণ গিলে ফেলবে এবং ঘোষণা করা হবে, ওরা ব্যর্থ হয়েছে, আর কোন দিন তারা সফল হবে না。
আর এক শ্রেণী হবে, যার কোনই পাপ নেই। তাদের সম্পর্কে ঘোষণা করা হবে সর্বাবস্থায় আল্লাহর গুণাবলী বর্ণনাকারীগণ উঠো, চলো জান্নাতের দিকে। অতঃপর তারা জান্নাতের দিকে রওয়ানা হবে। অনুরূপভাবে যারা শেষ রাতে আরামের ঘুম ছেড়ে আল্লাহ তায়ালার এবাদত করেছে। জায়নামাযে দাঁড়িয়েছে এবং দুনিয়ার নানা রকম ব্যস্ততার মাঝেও যাদেরকে আল্লাহর এবাদত থেকে গাফেল করতে করেনি, তাদের সম্পর্কেও ঘোষণা করা হবে। তোমরাও চল জান্নাতের দিকে। তারাও জান্নাতে চলে যাবে। অতঃপর তাদের সকলের ব্যাপারে ঘোষণা দেয়া হবে, ওরা চিরস্থায়ী আনন্দের স্থান জান্নাতের বাসিন্দা হয়েছে। তারা সৌভাগ্যশীল。
এরপর তৃতীয় শ্রেণীটি রয়ে যাবে। আর তাদের সংখ্যাই হবে সর্বাধিক। তারা ভালও করেছে, মন্দও করেছে। এমন গুনাহ তারা করেছে, গোপনে গুনাহ করেছে। অথবা নিজের অজ্ঞাতে করেছে। কিন্তু আল্লাহর তায়ালার কাছে তা গোপন ছিল না। তা প্রকাশ হবে। অবশ্যই আল্লাহ তায়ালা সব কিছু সেদিন প্রকাশ করবেন। যদিও তারা ক্ষমাপ্রাপ্ত হয়, তবে তা আল্লাহ তায়ালার করুণার মাধ্যমে। এতে তারা আল্লাহ তায়ালার অনুগ্রহ উপলব্ধি করতে পারবে। আর শাস্তি প্রাপ্ত হলেও তারা বুঝতে পারবে তাদের গুনাহের কারণে তারা সাজাপ্রাপ্ত。
সাইয়্যিদুনা হযরত হাসান (রাযি.) বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আয়েশা (রাযি.) এর কোলে মাথা রেখে শুয়েছিলেন। তিনি তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েন। ইতিমধ্যে হযরত আয়েশা (রাযি.) আখেরাতের কথা স্মরণ করে কাঁদতে লাগলেন। হযরত আয়েশা (রাযি.) এর চোখের পানি প্রবাহিত হয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর চেহারা মোবারকে পড়ল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ঘুম ভেঙ্গে যায়। তিনি জিজ্ঞেস করেন, হে আয়েশা! তুমি কাঁদছো কেন? হযরত আয়েশা (রাযি.) বললেন, হে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আখেরাতের কথা আমার খুব মনে পড়ছে। আচ্ছা, তখন আমাদের কথা কি আপনার মনে থাকবে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ فِي ثَلَاثِ مَوَاطِنَ فَإِنَّ أَحَدًا لَا يَذْكُرُ إِلَّا نَفْسَهُ إِذَا وُضِعَتِ الْمَوَازِينُ وَوُزِنَتِ الْأَعْمَالُ حَتَّى يَنْظُرَ ابْنُ آدَمَ أَيَخِفُ مِيزَانُهُ أَمْ يَثْقُلُ وَعِنْدَ الصُّحُفِ حَتَّى يَنْظُرَ اَبِيَمِينِهِ يَأْخُذُ كِتَابَهُ أَوْ بِشِمَالِهِ وَعِنْدَ الصِّرَاطِ .
সেই আল্লাহর শপথ- যার হাতে আমার জীবন-মরণ, তিন জায়গায় তো কারোই কারও কথা স্মরণ থাকবে না—তখন মীযানের পাল্লা স্থাপন করা হবে। আমলের পরিমাপ করা হবে। মানুষ ভীত বিহ্বল থাকবে এই জন্য যে, তার নেকী পাল্লা ভারী হয় নাকি বদীর পাল্লা, আমলনামা বিতরণের সময় তা ডান হাতে আসে নাকি বাম হাতে। আর পুলসিরাত পার হওয়ার সময়।
হযরত আনাস (রাযি.) বলেন, কিয়ামতের দিবসে প্রত্যেক আদম সন্তানকে মীযানের পাল্লার সম্মুখে এনে দাঁড় করানো হবে। প্রত্যেকের উপর একজন ফেরেশতা নিযুক্ত করা হবে। যদি তার নেকীর পাল্লা ভারী হয়, তাহলে উক্ত ফেরেশতা এত বুলন্দ আওয়াজে তা ঘোষণা করবে যে, সমস্ত মানুষ তা শুনতে পাবে—অমুকের সন্তান অমুক চিরস্থায়ীভাবে কামিয়াব হয়ে গেছে। এরপর সে আর কখনো দুর্ভোগ বা দুর্ভাগ্যে পতিত হবে না। আর নেকীর পাল্লা হালকা হলে বা বদীর পাল্লাভারী হলে সেই ফেরেশতা ঘোষণা করবে, অমুকের সন্তান অমুক চিরস্থায়ী ভাবে হতভাগ্য হয়ে গেছে। কোন দিন সে সৌভাগ্যের মুখ দেখবে না। তারপর আযাবের ফেরেশতারা জাহান্নামীদেরকে ধরে জাহান্নামে নিয়ে যাবে। তাদের হাতে থাকবে বিরাট বিরাট হাতুড়ি। আর আগুনের দোররা。
প্রিয় ভাই ও বোন! গাফেল হয়ো না। দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী চাকচিক্যের মাঝে নিজেকে জড়িয়ে পরকালকে ধ্বংস করো না। ধোকাগ্রস্ত হয়ো না। যে স্থান ছেড়ে তোমাকে চলে যেতে হবে, তার চিন্তা পরিত্যাগ করো। যে জীবন তোমার চিরস্থায়ী, সে জীবনের জন্য চিন্তামগ্ন হও।
📄 এক শিশুর জাহান্নামের ভয়
হযরত বাহলুল (রহ.) কোথাও যাচ্ছিলেন। পথে এক স্থানে তিনি দেখলেন, একটি শিশু দাঁড়িয়ে কাঁদছে। পাশে আরেকটি শিশু আখরোট নিয়ে খেলছে। বাহলুল মনে করলেন, এই শিশুটির কাছে আখরোট নেই বলে কাঁদছে। তাই আমি তাকে বললাম, বেটা শোন তুমি কেঁদনা। আমি তোমাকে আখরোট দেব, তুমিও খেলবে। শিশুটি বললো, হে বাহলুল! আমরা কি দুনিয়াতে খেলতে এসেছি?
এ বয়সে শিশুটির এমন জবাব শুনে বাহলুল বিস্মিত হলেন। তিনি প্রশ্ন করলেন, তাহলে আমরা কিসের জন্য এসেছি? শিশুটি বলল, আমরা আল্লাহ তায়ালার ইবাদত করতে এসেছি। বাহলুল বললেন, চমৎকার হয়েছে বেটা। কিন্তু তুমি এখনও ছোট, তোমার চিন্তার কোন কারণ নেই। এই মনজিলে আসতে তোমার এখনও অনেক দেরি আছে। শিশুটি বলল, হে বাহলুল! ধোঁকা দিও না। আমি আমার মাকে দেখেছি, তিনি সকাল বেলা যখন আগুন জ্বালান, তখন প্রথমে ছোট লাকড়ি দ্বারা আগুন ধরান, পরে বড় লাকড়ি চুলায় দেন। আমার ভয় হচ্ছে এই জন্য যে, জাহান্নামের আগুন আমাকে দিয়েই ধরানো হয় কিনা? শিশুটির এমন কথা শুনে বাহলুল বেহুঁশ হয়ে পড়ে গেলেন।
📄 জাহান্নামীদের সংখ্যা
প্রিয় ভাই ও বোন! আল্লাহ পাক আমাদের ক্ষমা করুন। আমাদের অবস্থা যেন এমন না হয়। আমাদের আমলনামায় যদি এমন কোন অপরাধ দেখা যায় যাকে আমরা তুচ্ছ ভেবেছিলাম অথচ তা আল্লাহ তায়ালার নিকট বড় অপরাধ, তাহলে সেদিন আল্লাহ তায়ালা আমার প্রতি ক্রোধান্বিত হয়ে বলবেন, হে নাফরমান বান্দা! তোমার উপর আমার লানত। আমি তোমার কোন ইবাদতই কবুল করব না। এই ঘোষণা শোনার পর অপরাধীর চেহারা কালো হয়ে যাবে। অতঃপর আল্লাহ তায়ালাকে রাগান্বিত দেখে ফেরেশতাগণও তোমার উপর ক্ষেপে যাবে এবং বলবে, তোমার উপর আমাদের লানত এবং সমগ্র মাখলুকের লানত। ঠিক ঐ মুহূর্তে যাবানিয়া নামক আযাবের ফেরেশতারা তোমার দিকে অগ্রসর হবে। তারা তোমার প্রতি অত্যন্ত কঠোর আচরণ করবে। তাদের চেহারা এবং গঠনও হবে খুবই ভীতিপ্রদ। তারা তোমাকে উপুড় করে তোমার কপালের চুল ধরে হেচড়িয়ে হেচড়িয়ে টেনে নিয়ে যাবে। লোকেরা তোমার কালো কুশ্রী চেহারা ও তোমার এ অপমান ও লাঞ্চনা দেখতে থাকবে। আর তুমি বলতে থাকবে হায় ধ্বংস, হায় আমার বরবাদী। তুমি চিৎকার করতে থাকবে। জবাবে ফেরেশতারা বলবে, আজ শুধু একটি ধ্বংসের আহ্বান করো না, বরং শত শত ধ্বংসের আহ্বান করো। তারা ঘোষণা করবে যে এ ব্যক্তি অমুকের সন্তান অমুক। আল্লাহ পাক তাকে তার নাফরমানীর কারণে অপদস্ত করেছেন। তার অপকর্মের কারণে তার উপর লানত বর্ষণ করেছেন। ফলে তার কপাল এমন পোড়াই পুড়েছে যে, কোনদিন আর এই কপাল জোড়া লাগবে না। ভাগ্যের এ বিড়ম্বনা থেকে তার কখনও মুক্তি নেই।
হে ভাই ও বোন! বহু ক্ষেত্রে এ ধরনের পরিণতি ভোগ করতে হবে সে সব গুনাহের দরুণ, যা তুমি লোক চক্ষুর অন্তরালে নির্জনে করেছো। অথবা মানুষের মাঝে জনপ্রিয় হওয়ার জন্য এমন কাজ করেছো যা ছিল ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক। অথবা লোকলজ্জার ভয়ে নিজেকে জড়িয়ে নিয়েছো কোন পাপাচারে। তুমি কি ভেবেছো! তুমি কত বড় মূর্খ? যে তুমি ক্ষণস্থায়ী এই দুনিয়ার কিছু মানুষের অন্তরে জায়গা পাওয়ার জন্য আল্লাহর নাফরমানী করছো? অথচ কেয়ামতের ময়দানে বিশাল কাফেলার সামনে অপদস্ত হওয়ার কথা ভাবছ না। সেখানে তো শুধু তোমাকে অপমানই হতে হবে না বরং আল্লাহ তায়ালার রোষানলে পড়তে হবে। ভীষণ যন্ত্রণাদায়ক আযাবের সম্মুখীন হতে হবে। অথচ তুমি ভয়হীন, বেপরোয়া。
আল্লাহ পাক কোরআন কারীমে বলেছেন:
وَإِنْ مِنْكُمْ إِلَّا وَارِدُهَا كَانَ عَلَى رَبِّكَ حَتْمًا مَّقْضِيًّا - ثُمَّ نُنَجِّي الَّذِينَ اتَّقَوْا وَنَذَرُ الظَّلِمِينَ فِيهَا جِثِيًّا
তোমাদের প্রত্যেকেরই জাহান্নাম অতিক্রম করতে হবে। এটি আল্লাহর অবধারিত সিদ্ধান্ত। অতঃপর আমি আল্লাহভীরুদেরকে নাজাত দিবো। আর জালিম পাপিষ্ঠদিগকে উপুড় করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবো। (সূরা মারইয়াম, ৭১, ৭২)
এখানে সবাইকে জাহান্নাম অতিক্রম করানো হবে অর্থ হলো, হাশরের প্রাথমিক অবস্থায় মুমিন, কাফের, ভাগ্যবান, হতভাগা, সবাইকে জাহান্নামের চারদিকে সমবেত করা হবে। সবাই ভীত বিহ্বল নতজানু অবস্থায় পড়ে থাকবে। এরপর মুমিন ও ভাগ্যবানদেরকে জাহান্নাম অতিক্রম করিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে। ফলে জাহান্নামের ভয়াবহ দৃশ্য দেখার পর তারা পুরোপুরি খুশি ও ধর্মদ্রোহীদের দুঃখে আনন্দ এবং জান্নাত লাভের কারণে অধিকতর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে। যদিও মুমিন ও ভাগ্যবান ব্যক্তি জাহান্নাম অতিক্রম করার সময় জাহান্নামের একটু আঁচড়ও তাদের গায়ে পড়বে না। (সূত্র: তাফসীরে মা'আরেফুল কোরআন)
তাহলে তোমার জাহান্নাম অতিক্রম চূড়ান্ত বিষয়, কিন্তু নাজাত পাওয়া নিশ্চিত নয়। তাই অন্তরের মাঝে সেই ভীতিপ্রদ ঘাটির দৃশ্যটা অনুভব করো। হয়ত তা তোমাকে নাজাতের প্রস্তুতি গ্রহণে উৎসাহিত করবে। চিন্তা করো হাশরের মাঠের সেই ভয়াবহ অবস্থার মধ্যে মানুষের কি অবর্ণনীয় দুর্ভোগ হবে। তারা কেয়ামতের প্রকৃত খবরাখবর ও সুপারিশকারীদের সুপারিশের অপেক্ষায় থাকবে। হঠাৎ করে ভয়াবহ রকমের অন্ধকার অপরাধীদের ঘিরে ফেলবে। জাহান্নামের লেলিহান আগুন তাদের উপর দিয়ে বিস্তৃত হবে। তারা জাহান্নামের বিকট-চিৎকার ও গর্জন শুনতে পাবে। সেই মুহূর্তে বিশ্বাস করবে যে, তারা দুর্ভাগা, তাদের ধ্বংস অবধারিত। এমনকি সৎ লোকেরাও অশুভ পরিণামের আশংকায় আতংকিত হয়ে পড়বে। এমন সময় একজন আযাবের ফেরেশতা ঘোষণা করবেন, অমুকের পুত্র অমুক কোথায়? দুনিয়ার জীবনকে অন্যায়ভাবে ধ্বংস করেছো। ফেরেশতারা লোহার হাতুড়ি নিয়ে তার দিকে ছুটে যাবে, কঠোর ধমক দিয়ে তাকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাবে। অতঃপর কঠিন জাহান্নামে নিক্ষেপ করবে এবং বলবে:
ذُقْ إِنَّكَ أَنْتَ الْعَزِيزُ الْكَرِيمُ
হাঁ, মজা চাখো তুমি কিনা খুব প্রভাবশালী ও মর্যাদাশীল মানুষ। (সূরা দুখান, ৪৯)
📄 চারদিকে শুধুই আগুন
প্রিয় ভাই ও বোন! জাহান্নামের কথা বলছিলাম, এই সেই লেলিহান অনন্ত অনল। চারদিকে শুধু লেলিহান আগুন, পরনে আলকাতরার পোশাক। প্রকাণ্ড হাতুড়ির প্রচণ্ড আঘাত। উপুড় করে ফেলা হবে আগুনে, উফ! সেই কি ভয়াবহ অবস্থা।
নীচে আগুন।
উপরে আগুন।
ডানে আগুন।
বামে আগুন。
সাঁতার কাটতে থাকবে আগুনে। ডুববে। আবার উঠবে। আবার ডুববে। খাদ্য হবে আগুন। আগুন তাদের পোশাক। আগুনের বালিশ। বিছানাও আগুনের। তারা পথ চলবে হেলে দুলে, জ্বলন্ত শরীর। শরীরের গোশতগুলো গলে গলে পড়বে। মাথার মগজ টগবগ করে ফুটতে থাকবে। তার চিৎকার করতে থাকবে হায় ধ্বংস, হায় ধ্বংস বলে। আর তখনই তাদের উপর ঢেলে দেওয়া হবে গরম পানি। ফলে তাদের পেটের ভেতরের সবকিছু গলে গলে বেরিয়ে আসবে। পিপাসায় ভেতরটা শুকিয়ে যাবে। চোখের মনি গলে গলে গালের উপর দিয়ে প্রবাহিত হবে। গালের চামড়াও খসে পড়বে। চামড়া যখন গলে গলে হাড্ডিসার হয়ে যাবে, তখন তাদের আবার নতুন চামড়ায় পরিণত করা হবে। তারা অসহ্য যন্ত্রণায় মৃত্যু কামনা করবে। কিন্তু মরতেও পারবে না। তাদের চেহারা কালো হয়ে যাবে। এ কালো চেহারা ও দৃষ্টি শক্তিহীন চোখের দিকে তাকালে বলুন তো কেমন লাগবে?
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা জুব্বুল হুজুন বা দুর্গতির গর্ত থেকে পানাহ চাও। আর ওয়াদিল হুজুন, বা দুশ্চিন্তাপূর্ণ নিম্নভূমি থেকে মহান রাব্বুল আলামীনের নিকট পানাহ চাও। সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! দুশ্চিন্তার নিম্নভূমি বা দুর্গতির গর্ত দ্বারা কি বুঝানো হয়েছে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তা হচ্ছে জাহান্নামের এমন একটি এলাকা যা হতে জাহান্নাম সত্তর বার আল্লাহর কাছে পানাহ চায়。
হযরত আনাস (রাযি.) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, সেই জিনিসের তামান্না করো যে জিনিসের প্রতি স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা তোমাদেরকে উৎসাহিত করেছেন। যে জিনিসের প্রতি আল্লাহ তায়ালা তোমাকে ভয়-ভীতি প্রদর্শন করেছেন সেই আযাব গজব ও জাহান্নামের ভয় করো। কারণ তোমাদের এই দুনিয়ার মধ্যে জান্নাতের একটি মাত্র বিন্দু ও যদি তোমাদের সঙ্গে থাকতো, তবে ঐ একটি বিন্দু তোমাদের জন্য সমগ্র দুনিয়াকে শান্তি ও আনন্দময় করে দিতো। পক্ষান্তরে, জাহান্নামের একটি মাত্র ফোটাও যদি এ দুনিয়ায় তোমাদের সঙ্গে থাকতো, তবে ঐ একটি ফোটাই সমগ্র দুনিয়া ও দুনিয়ার সব কিছুকে নোংড়া করে ফেলত。
হযরত আবু দারদা (রাযি.) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জাহান্নামীদের এমন কঠিনতর ক্ষুধায় যন্ত্রণাক্লিষ্ট করা হবে যা তাদের জন্য সমস্ত আযাবের বরাবর হয়ে যাবে। অর্থাৎ অন্যান্য আযাবের তুলনায় সে সময় ক্ষুধার যন্ত্রণাই সবচেয়ে বেশি কষ্টকর মনে হবে। জাহান্নামীরা খাবারের জন্য চিৎকার করতে থাকবে। তখন তাদেরকে এমন খাবার দেওয়া হবে যা তাদের গলায় আটকে যাবে। হঠাৎ তাদের মনে হবে দুনিয়াতে গলায় কিছু আটকে গেলে পানি পান করার পর তা নীচে নেমে যেত, তাই তারা পানির জন্য চিৎকার করতে থাকবে। তখন তাদেরকে গরম পানি দেওয়া হবে, ঐ পানি তারা মুখের কাছে নিতেই চেহারাটা ঝলসে যাবে। আর তা যখন পেটের ভেতর যাবে, তখন নাড়ি ভূড়ি গলে গলে ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে যাবে। তখন তারা বলাবলি করবে—চলো জাহান্নামের মুহাফিজ ফেরেশতাদের কাছে বলি তারা যদি একটা ব্যবস্থা করত। অতঃপর ফরিয়াদ জানাবে। বলবে তোমাদের মাবুদের কাছে বলো তিনি যেন আমাদের শান্তি অন্তত একদিনের জন্য হালকা করে দেন।