📄 ভাবনার বিষয়
প্রিয় ভাই ও বোন!
আজ আমাদের ভাবনার বিষয়গুলো নিয়ে আমাদের আগ্রহ কম। আল্লাহ তায়ালার হুকুম আহকামগুলো মানতে আমাদের অনিহা। আমরা আজ এমন অবস্থায় দিনাতিপাত করছি যে, কাফের মুশরিকরাও আমাদের দেখলে লজ্জা পায়। আজ আমাদের ঘরগুলোতে এতটুকু পরিবেশও নেই যে, আমরা ভেবে দেখব, আমাদের রব আমাদের প্রতি সন্তুষ্ট আছেন কিনা? আমাদের সন্তানদের প্রতিপালন এমন ধারায় হচ্ছে না যে, তারা ভাবতে শিখবে, আমরা কিভাবে মহান রাব্বুল আলামীনকে রাজি করব। পিতা-মাতা ডাণ্ডা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, পড়ো, লেখাপড়া করে রোজগারের যোগ্য হও। কামাই করতে হবে। টাকা বানাতে হবে। বাড়ি গাড়ির মালিক হও। মোটকথা, আমাদের পূর্ণ শক্তি ও মেধা সব ব্যয় করি দুনিয়া গড়ার পেছনে। আল্লাহকে খুশি করনেওয়ালা মন মানসিকতাই শেষ হয়ে গেছে。
নামায পড়লেও আনন্দ নেই, না পড়লেও বেদনা নেই। কোরআন তেলাওয়াত করলেও আনন্দ নেই, না করলেও বেদনা নেই। আত্মার কেমন নির্জীবতা! কিছু টাকা মুনাফা হলে আমরা সবাই কত আনন্দিত হই। দশ টাকা লোকসান হলে অন্তরে কত ব্যথা পাই। ঘরে কারও অসুখ হলে সবাই কত পেরেশান হয়ে যাই। কোন আনন্দের বিষয় হলে সবাই আনন্দিত হই।
আমার ভাই ও বোনেরা! এগুলোও কি কোন আনন্দের বিষয় হলো? এগুলোও কি কোন বেদনার বিষয় হলো? এক ওয়াক্ত নামায ছুটে গেলে আমাদের অন্তর কেঁপে উঠার দরকার ছিল যে, হায় আল্লাহ! আমার নামায ছুটে গেছে! আমার রোজা ছুটে গেছে! কিন্তু মাসের পর মাস চলে যায়, আমার ফরজ নামাযগুলো কাযা হয়ে যাচ্ছে। ব্যথা-বেদনা উৎকণ্ঠা পেরেশানী, যা আল্লাহর জন্য হওয়া প্রয়োজন ছিল, তা না হয়ে অর্থের জন্য আমাদের অন্তর উৎকণ্ঠিত। দুনিয়ার আনন্দ বেদনায় আমাদের প্রাধান্য।
আমরা আল্লাহর অফাদারী করি না। আমরা তো দুনিয়ার সম্পদ আর ভোগ-বিলাসের পেছনে দৌড়াই। আমাকে বলুন তো, টাকায় কখনও ঘরে সুখ এনে দিতে পেরেছে? সন্তান কম হওয়াতে কি কারও ঘরে সাচ্ছন্দ্য এসেছে? পরিবার ছোট হোক বা বড় হোক, ধনী হোক বা গরিব হোক, যে ঘরে দ্বীন নেই, সে ঘরে জাহান্নামে আগুনে ভরা। আল্লাহ পাক কোরআনে কারীমে বলেছেন,
اعْلَمُوا أَنَّمَا الْحَيُوةُ الدُّنْيَا لَعِبٌ وَلَهُمْ وَزِينَةً وَتَفَاخُرُ بَيْنَكُمْ وَتَكَاثُرُ فِي الْأَمْوَالِ وَالْأَوْلَادِ
তোমরা যেনে রাখ, পার্থিব জীবনে ক্রীড়া-কৌতুক, জাঁকজমক পারস্পরিক গর্ব অহংকার, ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে প্রাচুর্য লাভের প্রতিযোগীতা ব্যতীত আর কিছু নয়। (সূরা হাদিদ, ২০)
তো ভাই ও বোনেরা! মিমাংসার দিন সামনে আসবে। মিমাংসার জন্য হাশর আসছে। আমরা দলে দলে বের হব। আমরা থাকব আসামীর কাঠগড়ায়। আল্লাহ পাক স্বয়ং বিচারক। তাই সেই দিনটির সফলতা ও ব্যর্থতার একটিই মাপকাঠি। যে ব্যক্তি নিজেকে পবিত্র করে নিল সে সফল। আর যে নিজেকে দুনিয়ার পিছে ব্যয় করল সে বিফল।
📄 আল্লাহর সন্তুষ্টিই আমাদের প্রধান কাজ
প্রিয় ভাই ও বোন! আসুন আমরা নিজেকে শোধরাই। নিজেদের জীবন থেকে বদ-দ্বীনীগুলো ঝেড়ে ফেলী। নিজেদের ঘরগুলো থেকে আল্লাহর নাফরমানিকে তাড়িয়ে দেই। এটা জানাও মানার বিষয়। শুধু জানলাম কিন্তু মানলাম না, তবে কিছুই হবে না। দ্বীন জানতে হবে। দ্বীন মানতে হবে। দ্বীনের পথে চলতে হবে। অনেকেই বলেন, দ্বীন আমিও জানি। আল্লাহর হুকুম আহকামগুলোর দাওয়াত দিতে গেলে অনেকেই এমন কথা বলতে শোনা যায়। মদখোর মদ খাচ্ছে। তাকে যদি বলেন, ভাই মদপান করনা, এটি হারাম। সুদখোর, ঘুষখোরকে যদি বলেন, এটা হারাম, সে বলে, এত ফতোয়া দিবেন না। ইসলাম আমরাও বুঝি। আরে ভাই! বুঝে আপনার কি লাভ হলো, যদি মানতে না-পারলেন? ইসলামকে শুধু জানলে হবে না। মানতে হবে। আমি অনেক বড় বড় বিধর্মী পণ্ডিতদের দেখেছি, তারা ইসলাম সম্পর্কে অনেক জ্ঞান রাখে। কিন্তু সে তো জানলই, মানল না। কি লাভ হল? ইসলামকে জানতে হবে, মানতে হবে। জানা না থাকলে আলেমদের কাছ থেকে জেনে মানতে হবে。
আমরা যদি মৃত্যু বরণ করেই মরে যেতাম, তাহলে ভাল ছিল। কিন্তু মৃত্যুর পর তো জবাব দিহিতাও আছে। সেটি কেন ভুলে যাই? দুনিয়াতে সাধারণ একটি মামলার জন্যও বড় বড় আইনজ্ঞের দ্বারস্থ হতে হয়। সামান্য অসুখের জন্যও বড় বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে হয়। কিন্তু আমাদের মনেই নেই যে, আমাদের গোটা জীবনের মামলা একদিন আল্লাহর আদালতে উপস্থিত হবে। যে আল্লাহ আমাদের চোখের নড়াচড়া দেখেন, আমরা কানে যা কিছু শুনি, সব দেখেন, রাতের আঁধার তাঁর জন্য আড়াল তৈরি করতে পারেনা। একান্ত গোপনীয়তায় করা আমাদের কাজ তাঁর দৃষ্টির আড়ালে নয়। সেই মহান শক্তিধর আল্লাহর সামনে আমাদেরকে দাঁড়াতেই হবে।
প্রিয় ভাই ও বোনেরা! তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে, মহান রবকে ভয় করো। কারণ, কেয়ামতের মহা কম্পন আসছে। তোমরা আল্লাহর দিকে দৌড়াও। যেই দিন কম্পন দেখা দেবে, কম্পনের পর আরও কম্পন আসবে। সেই দিনটির জন্য তোমরা প্রস্তুতি গ্রহণ করো।
📄 দুনিয়া ক্ষণস্থায়ী
প্রিয় ভাই ও বোন! সে দিনের প্রস্তুতি গ্রহণ করার জন্যই দুনিয়াতে আমাদের পাঠানো হয়েছে। এখানে আমরা একজন মুসাফির ছাড়া আর কিছু না। এ জগত মূলত একটি অস্থায়ী আবাস। একদিন আমাদের এ দুনিয়া ছেড়ে যেতেই হবে। দুনিয়াকে যারা ভালবেসে আপন করে নিয়েছে, দুনিয়া তাদের ধোঁকা দিয়েছে। দুনিয়ার শান্তি খুঁজতে খুঁজতে জীবন শেষ করেছে। কিন্তু শান্তি পায়নি। দুনিয়া যাদেরকে দংশন করেছে, তারা কখনও শান্তি পায়নি। দুনিয়া একটি বিষধর সাপ। সবচেয়ে বড় বিশ্বাসঘাতক। কাজেই সতর্ক হোন。
এ দুনিয়ার বুকে এমন একদিন আসবে, যে দিনের ভয়াবহতা যুবকদেরকেও বৃদ্ধ বানিয়ে দেবে। সেদিন আল্লাহ তায়ালা আত্মপ্রকাশ করবেন। ফেরেশতাগণও দলে দলে এসে উপস্থিত হবেন। হাজির করা হবে সব বনী আদমকে। তখন আল্লাহ তায়ালা ডেকে বলবেন, ওহে আমার বান্দারা! যেদিন আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছিলাম, সেদিন থেকে আজ পর্যন্ত আমি তোমাদেরকে শুধু দেখে এসেছি। তোমাদের কর্মকাণ্ড দেখেছি। কিছুই বলিনি। রাতে যে সেজদারত ছিলে তাকেও দেখেছি। যে গানবাদ্য করেছো তাকেও দেখেছি। তোমাদের চারিত্রিক স্খলনও দেখেছি। তোমাদের অপকর্মে লিপ্ত হওয়াও দেখেছি। কে হালাল রোজগার করেছো তাও দেখেছি। কে হারাম কামাই করেছে, সুদ-ঘুষের টাকায় সম্পদ গড়েছে, কে কোন পথে চলেছো সব দেখেছি। জালেমের জুলুম দেখেছি। মজলুমের আর্তনাদ শুনেছি। ইনসাফও দেখেছি। শুধু দেখেছি, বলিনি কিছুই। আজ বলার সময় এসেছে। প্রস্তুত হও। কি ভেবেছিলে? এ বিশ্ব জগত নিজে নিজে সৃষ্টি হয়েছে? তোমাদের সুঠাম সুন্দর দেহ, যৌবনের উদ্যমতা আপনা আপনি এসেছে? দুনিয়ার অঢেল সম্পদ, বিশাল অট্টালিকা যা নিয়ে তুমি গর্ব করতে, তা নিজের বুদ্ধিতে অর্জন করেছিলে? ভেবেছিলে কি? হিসাব দিতে হবে না কোন কিছুরই? তাই বেপরোয়া জীবন যাপন করেছিলে? আজ সেই দিন, হিসাবের দিন। এসো। আজ তোমাদের জীবনের সমস্ত অপকর্মের পুঙ্খানুপুঙ্খানু হিসাব গ্রহণ করা হবে। সে কঠিন সময়ের জন্য প্রস্তুত হয়ে যাও। হিসাব দেয়ার জন্য।
তারপর এমন কঠিন অবস্থার সৃষ্টি হবে যে, মানুষ নিজের স্ত্রী, সন্তান, পিতা-মাতা ও ভাই বোনের বিনিময়েও নিজেকে বাঁচাতে চাইবে। আল্লাহ তায়ালার কাছে আর্তি জানিয়ে বলবে, হে আল্লাহ! আমার স্ত্রীকে জাহান্নামে দিয়ে হলেও আমাকে মুক্তি দিন। আমার ভাই-বোনকে জাহান্নামে দিয়ে আমাকে মুক্তি দিন। আমার মা-বাপ সন্তানকে জাহান্নামে দিয়ে হলেও আমাকে মুক্তি দিন।
يُبَصَّرُونَهُمْ يَوَدُّ الْمُجْرِمُ لَوْ يَفْتَدِى مِنْ عَذَابِ يَوْمِئِذٍ بِبَنِيهِ
অপরাধীরা সেদিন শাস্তির বদলে দিতে চাইবে তার সন্তান সন্তুতিকে। (সূরা মাআরিজ ১১)
وَصَاحِبَتِهِ وَأَخِيهِ
তার স্ত্রী ও ভ্রাতাকে। (সূরা মাআরিজ ১২)
وَفَصِيلَتِهِ الَّتِي تُوِيهِ
তার জ্ঞাতি গোষ্ঠী, যারা তাকে আশ্রয় দিত। (সূরা মাআরিজ ১৩)
وَمَنْ فِي الْأَرْضِ جَمِيعًا ثُمَّ يُনْجِيهِ
পৃথিবীর সকল মানুষকে জাহান্নামে নিয়ে হলেও আমাকে মুক্তি দিন। (সূরা মাআরিজ ১৪)
আল্লাহ তায়ালা বলবেন না, কখনোও নয়। অপরাধী তার অপরাধের জন্য ধৃত হবে। এটা দুনিয়া নয় যে অপরাধী নিরাপদ আশ্রয়ে বসে থাকবে আর নিরপরাধ ব্যক্তি সাজা ভোগ করবে। এটা আল্লাহ তায়ালার আদালত।
فَمَنْ يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْرًا يَرَهُ - وَمَنْ يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ شَرًّا يَّرَهُ
কেউ অনুপরিমাণ নেক আমল করলেও তা দেখতে পাবে। কেউ অনুপরিমাণ অসৎ কর্ম করলেও তা দেখতে পাবে। (সূরা যিলযাল, ৭-৮)
ফেরেশতারা একজন অপরাধীকে ঘাড় ধরে পাল্লার সামনে দাড় করিয়ে দেবে। পাল্লার সামনে যখন উপস্থিত করা হবে, তখন তাদের দেহ এমনভাবে কম্পন সৃষ্টি হবে যে তারা ভয়ে কাঁপতে থাকবে। তারা স্থির হয়ে দাঁড়াতে পারবে না। একবার এদিকে হেলে পড়বে, একবার ওদিকে হেলে পড়বে। দুনিয়ার বড় বড় ক্ষমতাশালী বাদশারাও সেদিন থরথর করে কাঁপবে। তাদের পা দুটি সেদিন তাদের দেহের ভার বহন করতে অক্ষম হবে। তাদের একদিকে থাকবে জাহান্নামের লেলিহান অনন্ত অনল। আরেকদিকে থাকবে সেই মনোরম জান্নাতের দৃশ্য। জাহান্নাম চিৎকার করে বলতে থাকবে, আরও চাই, আরও চাই।
তারপর তার আমলনামা ওজন করা হবে মিযানের পাল্লায়। কারো কন্যাকে, কারো পুত্রকে, কারও পিতা-মাতাকে, ভাইকে, বোনকে, স্বজনকে সবাইকে। একদিকে পাপ, একদিকে পুণ্য। তাদের আমল মিযানের পাল্লায় তোলা হবে। হাশরের সেই আশ্চর্য পাল্লায় কারও বংশ মর্যাদা মাপা হবে না। মাপা হবে বান্দার আমলগুলো। সে পাল্লায় বান্দার চরিত্রের সৌন্দর্য, হালাল উপার্জনের সওয়াব, সকল মন্দ কাজ থেকে বেঁচে থাকার সাওয়াব। বান্দার মন্দ আমলের ওজন করা হবে। যদি মন্দ কাজের ওজন বেশি হয়ে যায়, তাহলে অশেষ দুর্গতি তার কপালে জুটল। হযরত জিবরাইল আলাইহিস সালাম তখন ঘোষণা করবেন, অমুকের পুত্র অমুক তার পরীক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে। সে দুনিয়ার জীবনে গুনাহের কারণে বিফল হয়েছে।
প্রিয় ভাই ও বোন! বুঝতে চেষ্টা করুন, এ ব্যর্থতা দুনিয়ার জীবনে পরীক্ষার ব্যর্থতা নয়। এ পরাজয় দুনিয়ার জীবনে নির্বাচনে পরাজয় নয়। কারণ, এ ব্যর্থতার পরও রয়েছে এক কঠিন ও ভয়াবহ জীবনের সূচনা। সে জীবনের কোন সমাপ্তি নেই। শুরু আছে, শেষ নেই। তো ভাই! আসুন আমরা তাওবা করি আমাদের জীবনের গুনাহগুলো থেকে। আমরা এ যাবত যত গুনাহ করেছি, আল্লাহ পাকের যত নাফরমানী করেছি, তার জন্য তাওবা করি। কারণ তাওবা এমন একটি আমল যা জীবনের সমস্ত গুনাহকে ধুয়ে পরিষ্কার করে দেয়। আল্লাহ তায়ালা এত দয়ালু যে একদিকে আমরা বলি মাফ করে দাও, ওদিকে আল্লাহ বলেন যাও মাফ করে দিলাম। আমিতো তোমার তাওবার অপেক্ষায়ই বসে আছি।
📄 ঈমান সবার আগে
প্রিয় ভাই ও বোন! ঈমান হলো সবচেয়ে বড় সম্পদ। অথচ আজ মানুষের কাছে সেই ঈমানই হলো সবচেয়ে অবহেলার বস্তু। দু'চারশত টাকার জিনিস কিনে মানুষ তা হেফাযতের জন্য কতইনা ব্যবস্থা করে। কাচা মাছ, মাংস কিনে তা সংরক্ষণের জন্য ফ্রিজে রাখে। সামান্য কাপড় চোপড় সুন্দর রাখার জন্য আলমারীতে সংরক্ষণ করে।
আমার ভাই ও বন্ধুগণ! দুনিয়ার সামান্য এ বস্তুগুলোর হেফাযতের জন্য আমাদের তো আয়োজনের কমতি নেই। ফিকিরেরও কমতি নেই। কিন্তু অমূল্য সম্পদ ঈমান হেফাযতের জন্য আমাদের কি ফিকির ও কি চেষ্টা রয়েছে? এর জন্য আমরা কি মেহনত করি? আজ আমরা চোখ দিয়ে হারাম বস্তু দেখি, প্রতিদিন দুটি চোখ দিয়ে কত গুনাহই না করছি। কান দিয়ে কত মিথ্যা শুনছি। বিশ্বাস করছি। গান বাদ্য শুনছি। জবানকে ব্যবহার করছি অশ্লীল বাক্য বলে। মিথ্যা বলে, গান গেয়ে, গীবত করে। হারাম ও শরীয়ত নিষিদ্ধ বস্তু ভক্ষণ করছি, পান করছি। এ সবই আমাদের ঈমানের চরম ক্ষতি করছে। এসব অসঙ্গত ও অবৈধ আচরণের মাধ্যমে নিজের সবচেয়ে বড় সম্পদ ঈমানের ক্ষতি করার পর আমরা যতই অর্থ বিত্ত ও সহায় সম্পদ অর্জন করি না কেন, তাতে কোন উপকারই নেই। এ তুচ্ছ সম্পদ আর চিত্ত বৈভব আমার আপনার চূড়ান্ত মুক্তি ও কামিয়াবীর ব্যবস্থা করে দিতে পারবে না। তাই আমার অনুরোধ, আসুন ঈমানের হেফাযত করে আল্লাহর সন্তুষ্টির দিকে মন দেই। নেক কাজ যত ছোটই হোক, তা নেক কাজই। আর গুনাহ যতই ছোট হোক, তা গুনাহই। তা থেকে আত্মরক্ষা করে চলাই হলো ঈমান。
আল্লাহ তায়ালা বলেন, হে আমার বান্দাগণ! তোমরা যখন কোন নাফরমানী কর, সে নাফরমানী ছোট কি বড় তার প্রতি লক্ষ্য না রেখে দেখ কার নাফরমানী করছো? গুনাহ যত ছোটই হোক তাতে আল্লাহ তায়ালারই অবাধ্যতা করা হচ্ছে। কাজেই সেই মহান জাতে পাকের প্রতি লক্ষ্য রেখে তাঁর অবাধ্যতা থেকে আত্মরক্ষা করা আমাদের কর্তব্য। এর নামই ঈমান। আমাদের প্রতি মহান রাব্বুল আলামীনের কত বড় মেহেরবানী যে তিনি আমাদের মানুষরূপে সৃষ্টি করেছেন। তারপর ঈমানের মত দৌলত দান করেছেন। আর আখেরী নবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ভাগ্যবান উম্মত হিসেবে কবুল করেছেন। সেই মহান রবের অসংখ্য অনুগ্রহের পরও তুচ্ছ এ অর্থ সম্পদ আর দুনিয়াবী ক্ষণিকের সুখ শান্তির জন্য আল্লাহ তায়ালার অবাধ্য হচ্ছি।
আহ! বড়ই আফসোসের বিষয়! মানুষ সামান্য কিছু ডলার বা উন্নত দেশের ভিসার জন্য ঈমান বিকিয়ে দিচ্ছে। মানুষ নির্ভাবনায় সন্তানকে সেই কুফরের আখড়ায় পাঠিয়ে দিচ্ছে। হে ভাই আমার! এতে আপনি কি হারালেন আর কি পেলেন হিসাব করে দেখেছেন? হিসাব করা দরকার। আমরা মুসলমান। ঈমান আমার জীবনের চেয়ে দামী। আর ঈমান পৃথিবীর সবকিছুর চেয়ে বড়। একটু সম্পদের জন্য একটু সুখ স্বাচ্ছন্দ্যের লোভে একটি গ্রীণ কার্ডের জন্য সে ঈমান বিক্রি হতে পারে না। কুফর ও বেঈমান অবস্থায় মৃত্যুবরণ করার চেয়ে মন্দ কপাল আর হতে পারেনা।
এখনো আমার একটি কথা মনে হলে কষ্টে অন্তরটা ফেটে যায়। একবার ইংল্যান্ড সফরে এক লোকের সাথে সাক্ষাত হলো। লোকটি মুসলমান ছিল। লোকটি বলল, মুসলমান ছিলাম। আমি অবাক হলাম লোকটির কথা শুনে—মুসলমান ছিলাম। আমি জিজ্ঞেস করলাম এখন কি আপনি মুসলমান নন? লোকটি জবাব দিল অর্থ-সম্পদ কামাই করতে গিয়ে ঈমান বিক্রি করে দিয়েছি। অর্থ-সম্পদ কামাই করতে গিয়ে সন্তানদের প্রতি খেয়াল রাখতে পারিনি, তারা যে যেভাবে পারছে চলছে। তাদের উপর আমার কোন নিয়ন্ত্রণ নেই। তারা বিয়ে করেছে খৃষ্টান মেয়ে। মেয়েরা বিয়ে করেছে খৃষ্টান ছেলে। এখন নিজেকে বড়ই বদ নসিব মানুষ মনে হয়। না হলে কেউ নিজেকে এভাবে ধ্বংস করে? লোকটা কেঁদে দিল। অনেকক্ষণ কাঁদল। আমি তাকে শান্তনা দিলাম, বললাম ভাই আপনি হতাশ হবেন না। আপনি মুসলমান থেকে তো খারিজ হয়ে যাননি, আপনি আবার তাওবা করে মহান রব্বে কারীমের নিকট ক্ষমা চান, তিনি অনেক মেহেরবান। দয়ালু তিনি। বান্দার অনুতপ্ত হৃদয়ের কথা তিনি শোনেন। তিনি তাওবাকারীকে ভালবাসেন। লোকটি আশ্বস্ত হলেন, মনটা তার খুশিতে নেচে উঠল। হতাশায় ভরে যাওয়া অন্তরটা আশায় ভরে উঠল।
ভাই! সকল মুসলমানের ঈমান আমল পরিশুদ্ধ হোক। যারা ঈমানও দ্বীনী পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে গেছে তারা ঈমান ও ইসলামের পথে ফিরে আসুক। দাওয়াত ও তাবলীগের মেহনত এমন এক মেহনত এর সঙ্গে যুক্ত হলে মানুষ ঈমান ও আমলের নূর লাভ করে। ক্রমশ সে আলোর উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি পেতে থাকে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে হেফাযত করুন।