📄 জাহান্নামের স্তর সাতটি
সবচেয়ে উপরের টার নাম (১) জাহান্নাম। যেই মুসলমান তওবা ছাড়া মৃত্যুবরণ করেছে তাদের জন্য। তারপর (২) হুতামা। খৃষ্টানদের জন্য। তারপর (৩) লাযা। ইহুদিদের জন্য। তারপর (৪) সায়ীর। অগ্নি পূজারীদের জন্য। তারপর (৫) সাকার। সূর্য পূজারীদের জন্য। তারপর (৬) জাহীম। পাথর পূজারী মুশরিকদের জন্য। তারপর (৭) হাবিয়া। মুনাফিকদের জন্য।
আল্লাহপাক যখন জাহান্নামের আগুনকে উত্তেজিত করেন, তখন হাবিয়ার পর্দা উঠে যায়। তার মধ্য থেকে যে আগুন বেরিয়ে আসে, তার তাপে জাহান্নামের আগুন ও চিৎকার করতে শুরু করে। মহান রাব্বুল আলামীন তাঁর গুনাহগার ও অবাধ্য বান্দাদেরকে শাস্তি দেবার জন্য এই সাতটি জাহান্নাম সৃষ্টি করেছেন। সেই সাতটি স্তরে কে কে থাকবে তা তিনি জিবরাঈল আলাইহিস সালাম এর মাধ্যমে প্রিয় হাবীবের কাছে বিবৃত করলেন। কিন্তু জাহান্নাম নামক স্তরটির কথা বলার সময় জিবরাঈল আলাইহিস সালাম নীরব হয়ে গেলেন। জিবরাঈল আলাইহিস সালামকে নীরব হয়ে যেতে দেখে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আপনি নীরব হয়ে গেলেন কেন? জিবরাঈল আলাইহিস সালাম বললেন, আপনার নিকট তা প্রকাশ করতে আমার লজ্জাবোধ হচ্ছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, বলে ফেলুন। তখন জিবরাইল আলাইহিস সালাম বললেন, জাহান্নাম নামক স্তরটি আপনার ঐ সকল গুনাহগার উম্মতদের জন্য। যারা তওবা না করেই মৃত্যুবরণ করবে।
একথা শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অস্থির হয়ে গেলেন। তাঁর পবিত্র চোখ থেকে অঝোর ধারায় অশ্রু ঝরতে লাগল। এরপর থেকে তিনদিন পর্যন্ত তিনি শুধু নামাযের জন্য ঘর থেকে বের হতেন। আবার ফিরে এসে ঘরের দরজা বন্ধ করে উম্মতের জন্য কাঁদতেন। উম্মতের দরদী নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের জন্য কেঁদেছেন। আর আমরা কি করছি? আজ আমরা সেই নবীর আদর্শকে জবাই করছি। আমরা মোহাম্মদী বাগানের মালি। আজ আমরা সেই বাগান বিরান করছি।
📄 মৃত্যুর আগে তওবা করো
আমার ভাই ও বোনেরা!
আসুন মহান মালিকের সামনে আমরা নিজেকে পেশ করি। নিজের কৃত অপরাধের জন্য তওবা করি। আমরা বলি, হে আল্লাহ! আমার জীবনের কৃত গুনাহগুলো মাফ করে দিন। আমাদের জীবনকে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর তরিকার উপর এনে দিন।
আল্লাহ পাক তো কারুনকেও মাফ করার জন্য বসে আছেন। সেই আল্লাহ এই উম্মতকে কেন মাফ করবেন না? দুনিয়ার রাজা বাদশাদের দরবার তো রাতের বেলা বন্ধ হয়ে যায়, কিন্তু আল্লাহ তায়ালার মহান দরবার, বান্দার জন্য সর্বক্ষণ খোলা আছে। তাহাজ্জুদের সময় বিশেষভাবে খোলা থাকে। দুনিয়ার রাজা বাদশাদের দুটি দরবার থাকে। একটি আম দরবার, আরেকটি খাস দরবার। আমরা জামাতে দিল্লি গিয়েছিলাম। সে সময় আমি সম্রাট শাহ জাহানের দরবার দেখেছিলাম। লাল পাথর দিয়ে তৈরি আম দরবার। আর মর্মর পাথর দিয়ে তৈরী খাস দরবার।
মহান রাব্বুল আলামীনের দরবার সব সময় খোলা থাকে। দিনেও থাকে রাতেও থাকে। কিন্তু রাত বারটার পরে খাস দরবার খুলে যায়। আল্লাহ পাকের আরশ প্রথম আসমানে চলে আসে। আর খাস দরবার খুলে যায়। ঘোষণা হয়: আছে কি আমার কোন বান্দা-বান্দি! যে আমার সাথে আপোশ করতে আগ্রহী? যে আমার কাছ থেকে কিছু নিতে চায়? যে আমাকে নিজের দুর্দশার কথা শোনাতে চায়? যে তার কৃত অপরাধের জন্য অনুতপ্ত হয়ে তওবা করতে চায়?
আল্লাহ বান্দাদের এভাবে ডাকেন। বান্দার তওবায় আল্লাহ তায়ালা খুশি হন। আমাদের তওবায় আকাশ সজ্জিত হয়। ফেরেশতাগণ উৎসব করেন। মহান রাব্বুল আলামীন খুশি হয়ে বলতে থাকেন, বাহ্! আমার বান্দা আমার হয়ে গেছে। ফিরে এসেছে। আমার বান্দা আমার কাছে চলে এসেছে।
আপনারা সবাই আমার নাম জানেন। কিন্তু আমি কারও নাম জানি না। কিন্তু আমার ভায়েরা! যেই মাত্র আপনি বলবেন, হে আল্লাহ! আমি গুনাহগার। আমি তওবা করছি। আমাকে মাফ করুন। সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহ বলবেন: ওহে আমার ফেরেশতারা! অমুকের পুত্র উমুক! অমুকের কন্যা অমুক তওবা করেছে, তোমরা সাক্ষী থেকো। আমি তাকে মাফ করে দিলাম।
প্রিয় ভাই ও বোন! আসুন আমরা আল্লাহ তায়ালার রাজি খুশিকে লক্ষ্য বানিয়ে নেই। আল্লাহ পাক পুরুষ ও মহিলাদের জন্য রাস্তা ঠিক করে দিয়েছেন। হে আমার বান্দা-বান্দি! আমাকে সামনে রেখে চলো, আমি তোমাদের সৃষ্টিকর্তা ও অধিপতি। আমি তোমাদের মা'বুদ। তোমরা আমাকে রাজি করো। আল্লাহর প্রতি নিবেদিত হওয়া এবং আল্লাহকে রাজি করা আমাদের জীবনের লক্ষ্য হওয়া উচিত। আল্লাহকে সন্তুষ্ট করা খুবই সহজ। আল্লাহ তায়ালা বান্দার তাওবার অপেক্ষায় থাকেন যে, আমার বান্দা আমাকে যতই অসন্তুষ্ট করুক না কেন, সে যদি তওবা করে, আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে, আমি তাকে মাফ করে দেব।
📄 ভাবনার বিষয়
প্রিয় ভাই ও বোন!
আজ আমাদের ভাবনার বিষয়গুলো নিয়ে আমাদের আগ্রহ কম। আল্লাহ তায়ালার হুকুম আহকামগুলো মানতে আমাদের অনিহা। আমরা আজ এমন অবস্থায় দিনাতিপাত করছি যে, কাফের মুশরিকরাও আমাদের দেখলে লজ্জা পায়। আজ আমাদের ঘরগুলোতে এতটুকু পরিবেশও নেই যে, আমরা ভেবে দেখব, আমাদের রব আমাদের প্রতি সন্তুষ্ট আছেন কিনা? আমাদের সন্তানদের প্রতিপালন এমন ধারায় হচ্ছে না যে, তারা ভাবতে শিখবে, আমরা কিভাবে মহান রাব্বুল আলামীনকে রাজি করব। পিতা-মাতা ডাণ্ডা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, পড়ো, লেখাপড়া করে রোজগারের যোগ্য হও। কামাই করতে হবে। টাকা বানাতে হবে। বাড়ি গাড়ির মালিক হও। মোটকথা, আমাদের পূর্ণ শক্তি ও মেধা সব ব্যয় করি দুনিয়া গড়ার পেছনে। আল্লাহকে খুশি করনেওয়ালা মন মানসিকতাই শেষ হয়ে গেছে。
নামায পড়লেও আনন্দ নেই, না পড়লেও বেদনা নেই। কোরআন তেলাওয়াত করলেও আনন্দ নেই, না করলেও বেদনা নেই। আত্মার কেমন নির্জীবতা! কিছু টাকা মুনাফা হলে আমরা সবাই কত আনন্দিত হই। দশ টাকা লোকসান হলে অন্তরে কত ব্যথা পাই। ঘরে কারও অসুখ হলে সবাই কত পেরেশান হয়ে যাই। কোন আনন্দের বিষয় হলে সবাই আনন্দিত হই।
আমার ভাই ও বোনেরা! এগুলোও কি কোন আনন্দের বিষয় হলো? এগুলোও কি কোন বেদনার বিষয় হলো? এক ওয়াক্ত নামায ছুটে গেলে আমাদের অন্তর কেঁপে উঠার দরকার ছিল যে, হায় আল্লাহ! আমার নামায ছুটে গেছে! আমার রোজা ছুটে গেছে! কিন্তু মাসের পর মাস চলে যায়, আমার ফরজ নামাযগুলো কাযা হয়ে যাচ্ছে। ব্যথা-বেদনা উৎকণ্ঠা পেরেশানী, যা আল্লাহর জন্য হওয়া প্রয়োজন ছিল, তা না হয়ে অর্থের জন্য আমাদের অন্তর উৎকণ্ঠিত। দুনিয়ার আনন্দ বেদনায় আমাদের প্রাধান্য।
আমরা আল্লাহর অফাদারী করি না। আমরা তো দুনিয়ার সম্পদ আর ভোগ-বিলাসের পেছনে দৌড়াই। আমাকে বলুন তো, টাকায় কখনও ঘরে সুখ এনে দিতে পেরেছে? সন্তান কম হওয়াতে কি কারও ঘরে সাচ্ছন্দ্য এসেছে? পরিবার ছোট হোক বা বড় হোক, ধনী হোক বা গরিব হোক, যে ঘরে দ্বীন নেই, সে ঘরে জাহান্নামে আগুনে ভরা। আল্লাহ পাক কোরআনে কারীমে বলেছেন,
اعْلَمُوا أَنَّمَا الْحَيُوةُ الدُّنْيَا لَعِبٌ وَلَهُمْ وَزِينَةً وَتَفَاخُرُ بَيْنَكُمْ وَتَكَاثُرُ فِي الْأَمْوَالِ وَالْأَوْلَادِ
তোমরা যেনে রাখ, পার্থিব জীবনে ক্রীড়া-কৌতুক, জাঁকজমক পারস্পরিক গর্ব অহংকার, ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে প্রাচুর্য লাভের প্রতিযোগীতা ব্যতীত আর কিছু নয়। (সূরা হাদিদ, ২০)
তো ভাই ও বোনেরা! মিমাংসার দিন সামনে আসবে। মিমাংসার জন্য হাশর আসছে। আমরা দলে দলে বের হব। আমরা থাকব আসামীর কাঠগড়ায়। আল্লাহ পাক স্বয়ং বিচারক। তাই সেই দিনটির সফলতা ও ব্যর্থতার একটিই মাপকাঠি। যে ব্যক্তি নিজেকে পবিত্র করে নিল সে সফল। আর যে নিজেকে দুনিয়ার পিছে ব্যয় করল সে বিফল।
📄 আল্লাহর সন্তুষ্টিই আমাদের প্রধান কাজ
প্রিয় ভাই ও বোন! আসুন আমরা নিজেকে শোধরাই। নিজেদের জীবন থেকে বদ-দ্বীনীগুলো ঝেড়ে ফেলী। নিজেদের ঘরগুলো থেকে আল্লাহর নাফরমানিকে তাড়িয়ে দেই। এটা জানাও মানার বিষয়। শুধু জানলাম কিন্তু মানলাম না, তবে কিছুই হবে না। দ্বীন জানতে হবে। দ্বীন মানতে হবে। দ্বীনের পথে চলতে হবে। অনেকেই বলেন, দ্বীন আমিও জানি। আল্লাহর হুকুম আহকামগুলোর দাওয়াত দিতে গেলে অনেকেই এমন কথা বলতে শোনা যায়। মদখোর মদ খাচ্ছে। তাকে যদি বলেন, ভাই মদপান করনা, এটি হারাম। সুদখোর, ঘুষখোরকে যদি বলেন, এটা হারাম, সে বলে, এত ফতোয়া দিবেন না। ইসলাম আমরাও বুঝি। আরে ভাই! বুঝে আপনার কি লাভ হলো, যদি মানতে না-পারলেন? ইসলামকে শুধু জানলে হবে না। মানতে হবে। আমি অনেক বড় বড় বিধর্মী পণ্ডিতদের দেখেছি, তারা ইসলাম সম্পর্কে অনেক জ্ঞান রাখে। কিন্তু সে তো জানলই, মানল না। কি লাভ হল? ইসলামকে জানতে হবে, মানতে হবে। জানা না থাকলে আলেমদের কাছ থেকে জেনে মানতে হবে。
আমরা যদি মৃত্যু বরণ করেই মরে যেতাম, তাহলে ভাল ছিল। কিন্তু মৃত্যুর পর তো জবাব দিহিতাও আছে। সেটি কেন ভুলে যাই? দুনিয়াতে সাধারণ একটি মামলার জন্যও বড় বড় আইনজ্ঞের দ্বারস্থ হতে হয়। সামান্য অসুখের জন্যও বড় বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে হয়। কিন্তু আমাদের মনেই নেই যে, আমাদের গোটা জীবনের মামলা একদিন আল্লাহর আদালতে উপস্থিত হবে। যে আল্লাহ আমাদের চোখের নড়াচড়া দেখেন, আমরা কানে যা কিছু শুনি, সব দেখেন, রাতের আঁধার তাঁর জন্য আড়াল তৈরি করতে পারেনা। একান্ত গোপনীয়তায় করা আমাদের কাজ তাঁর দৃষ্টির আড়ালে নয়। সেই মহান শক্তিধর আল্লাহর সামনে আমাদেরকে দাঁড়াতেই হবে।
প্রিয় ভাই ও বোনেরা! তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে, মহান রবকে ভয় করো। কারণ, কেয়ামতের মহা কম্পন আসছে। তোমরা আল্লাহর দিকে দৌড়াও। যেই দিন কম্পন দেখা দেবে, কম্পনের পর আরও কম্পন আসবে। সেই দিনটির জন্য তোমরা প্রস্তুতি গ্রহণ করো।