📄 একটি ঘটনা
পাকিস্তানের সাহেওয়াল নামক এলাকার ঘটনা। ধোপার ছেলে চিল্লা লাগালো। তারই গ্রামে এক মেয়ের সাথে তার বিয়ে ঠিক হয়েছিল। দিন তারিখ ঠিক হওয়ার পর সে চিল্লায় গিয়েছিল। যখন ফিরে এলো, তার মুখ ভর্তি দাড়ি। চিল্লায় যাওয়ার সময় ছিল ক্লিনসেভ। বিয়ের তারিখে বরযাত্রী কনের বাড়ি পৌঁছে গেল। ওই এলাকার নিয়ম ছিল বিয়েতে জমিদারও উপস্থিত থাকতেন।
বরযাত্রী কনের বাড়ি পৌঁছলে হাঙ্গামা শুরু হয়ে গেল। মেয়ে পক্ষ বলল, ছেলেকে যখন আমরা দেখেছিলাম, তখন তার মুখের দাড়ি ছিল না। এখন দাড়ি আছে। আগে দাড়ি কাট, তারপর মেয়ে বিয়ে দেব। বরপক্ষের সবাই বিষয়টা মেনে নিল। ভাই মানল, বোন মানল। বাপ মানল, চাচা মানল, সবাই বলল এটা কোনো সমস্যাই না। কয়েক মিনিটের কাজ মাত্র। আল্লাহ অনেক দয়ালু, তিনি মাফ করে দিবেন। সবাই বরকে বলল, তুমি দাড়ি কেটে ফেল, ঝামেলা মিটে যাক।
কিন্তু বর বলল, আমার গলাটা কেটে ফেলুন। গোটা জগত আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে ফেলতে পারব। তবুও দাড়ি কাটতে পারব না। যুবকের কথায় হাঙ্গামা আরো বেড়ে গেল। মেয়ে পক্ষ বলল, দাড়ি না কাটলে মেয়ে বিয়ে দেব না। বর বলল, না দাও, কোন সমস্যা নেই। আমি আল্লাহর রাসূলকে নারাজ করতে পারব না। এ হওয়ার নয়, হতে পারে না। রাসূলের মহব্বতে সব ছাড়তে আমি রাজি। হট্টোগল বেড়েই চলেছে।
ঘটনাটা সম্পূর্ণ দেখার পর উপস্থিত জমিদার সাহেব বললেন, বরপক্ষের সবাই আমার বাড়িতে চলুন। এ ছেলের কাছে আমার মেয়েকে বিবাহ দিব। সমস্ত বরযাত্রী জমিদারের বাংলোয় চলে গেল। জমিদার তার সুন্দরী কন্যাকে এ যুবকের সাথে বিয়ে দিয়ে দিলেন।
তো ভাই! মানুষ এখন বলে কি করব, সামাজিক অবস্থাতো দেখতে হয়, আধুনিকতার যুগ। ছেলে মেয়েরা এখন অনেক আধুনিক। আমি বলি, একথা বলুন, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে তো দেখতে হয়। যার অফাদারীই সত্য এবং জগতের অন্য সকলের অফাদারী মিথ্যা।
📄 পাথরী হৃদয়
প্রিয় ভাই ও বোন!
আমাদের অন্তর পাথর হয়ে গেছে। আল্লাহ এবং আল্লাহর রাসূলের সাথে এ অন্তরের কোন সম্পর্ক নেই। আমাদের সম্পর্ক কেবল আমাদের সাথে। আমাদের ভালবাসা কেবলই আমাদের কামনা বাসনার প্রতি। আল্লাহ তায়ালার ভালবাসা আমাদের অন্তরে নেই। রাসূলের আদর্শ আমাদের মাঝে নেই। আমাদের হৃদয় পরিপূর্ণ মৃত। অন্তর পাথর হয়ে গেছে। আমরা এখন কামনা বাসনার দাস। রিপুর তাড়নায় অন্ধ। আল্লাহ তায়ালার কাছে আমাদের বিন্দু পরিমাণ মূল্য নেই।
এ অবস্থা থেকে আমাদের উত্তরণ জরুরী। মৃত্যুর পূর্বেই আল্লাহর সাথে আমাদের বন্ধন প্রতিষ্ঠিত হওয়া আবশ্যক। আল্লাহর সাথে আমাদের সম্পর্ক এমন হওয়া উচিত- যেন আমাদের অন্তর দেখলেই আল্লাহ তায়ালা খুশি হয়ে যান। আমাদের সবাইকে এ বিষয় সর্বদাই মনে রাখতে হবে যে, এই দুনিয়া একদিন ছেড়ে যেতে হবে। দুনিয়াটা শুধুই ধোঁকার স্থান। আল্লাহ তায়ালার কাছে এর মর্যাদা মশার ডানার সমতুল্যও না। এ দুনিয়া মাকড়শার জালমাত্র। আসুন আমরা আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীনের কাছে এ প্রার্থনা করি। আল্লাহ পাক যেন আমাদের আমলী বান্দা হিসেবে জীবিত রাখেন। আমাদের টার্গেট হলো আখেরাত, যার যাত্রা শুরু হয় কবর থেকে。
আরে ভাই! আমরা তাবলীগ ওয়ালারা কোন কঠিন কথা তো বর্ণনা করছি না। এর চেয়ে কঠিন কথা আপনারা শোনার জন্য লাইন ধরে দাঁড়িয়ে থাকেন। আমরা তো চেষ্টা করছি, আল্লাহ ও তাঁর প্রিয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ভালবাসার যে বীজটি আপনার ভেতরে কোথাও অবহেলিত হয়ে পড়ে আছে। সেই পর্যন্ত যেন আমাদের আকুতি পৌঁছে যায়। কোথাও থেকে যেন সেটি কিছু পানি পেয়ে যায়। যেন সেটি অংকুরিত হয়ে ডালপালা গজিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে। আমরা চাই সে জীবনটি পুনরায় নবজীবন লাভ করুক। যেটি কোন এক সময় আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ভালবাসায় কাঁদত।
আল্লাহর কসম, কখনও কখনও একান্তে খুব কান্না আসে, অন্তর বড়ই পেরেশান হয়ে যায়। হে আল্লাহ! এত বয়স চলে গেল জীবনে তোমার ভালবাসায় একটি সিজদাও নসিব হল না। কেমন অকৃতজ্ঞ আমরা! কেমন ফকীর আমরা! কেমন নিঃস্ব, অথর্ব আমরা!
প্রিয় ভাই ও বোন!
তোমার ভাণ্ডার থেকে কিছু সম্পদ আল্লাহর কাছে জমা করতে থাকো। খালি হাতে মৃত্যুবরণ করো না। পরকালের পুঁজি আগেই সঞ্চয় করে রাখো। আল্লাহর ভাণ্ডারে সব আমানত থাকবে। সেই ভাণ্ডার লুট হয় না। আগুনে পোড়ে না। পানিতে নিমজ্জিত হয় না। যেদিন সবাই তোমাকে ছেড়ে যাবে, সেদিন সে সব তোমার কাজে আসবে। তোমার ভাণ্ডার তোমাকে ফিরিয়ে দেয়া হবে।
প্রত্যেক নারী-পুরুষ যদি এ জীবনের উপর এসে যায় তাহলে দুনিয়া জান্নাতে পরিণত হবে। অর্থ দ্বারা জান্নাত গড়ে না। বিত্ত দ্বারা সুখের উপকরণ কেনা যায়, সুখ কেনা যায় না। টাকা দ্বারা ঘুমের আরামদায়ক জায়গা কেনা যায়, ঘুম কেনা যায় না। অর্থ দ্বারা মর্যাদার উপকরণ কেনা যায়, মর্যাদা কেনা যায় না। সুখ-আনন্দ আরাম-মর্যাদা দেওয়ার মালিক আল্লাহ তায়ালা। এসব আল্লাহ তায়ালা দান করে থাকেন। তিনি যাকে ইচ্ছা এসব দান করেন। গোলাম যদি মহান মালিককে খুশি করতে পারে তাহলে মালিক গোলামকে এসব দান করেন। তাই আসুন, দুনিয়ায় থাকতেই পরকালের জন্য তৈরী হই। প্রত্যেক মানুষের দুনিয়া ও আখেরাত তখন গড়বে যখন মানুষ আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূল (সাঃ) এর আদেশমত চলবে। অন্যথায় মানুষের দুনিয়া ও আখেরাত সবই বরবাদ হবে।
📄 জাহান্নামের স্তর
প্রিয় ভাই ও বোন! কেয়ামত কায়েম হয়ে যাবে। সেইদিন হাশরের দিন, বড় কঠিন দিন আল্লাহ তায়ালা বলছেন,
كَلَّا إِذَا دُكَّتِ الْأَرْضُ دَكَّا دَكَّا
যেইদিন চৌচির হয়ে ফেটে যাবে জমিন। (সূরা ফজর: ২১)
يَوْمَ يَخْرُجُونَ مِنَ الْأَجْدَاثِ سِرَاعًا
যেইদিন তুমি কবর থেকে বেরিয়ে আসবে দ্রুতগতিতে। (সূরা মাআরিজ: ২৩)
সেদিন সবাই পেরেশান। কি হবে? কি হবে? বিচারের দিন। আমরা আসামি। বিচারক স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা। হিসাব নেবেন কড়ায় গণ্ডায়। সেদিন সবার দৃষ্টি হবে অবনত। চেহারায় নামবে বিষাদ।
يَأَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمْ إِنَّ زَلْزَلَةَ السَّاعَةِ شَيْءٌ عَظِيمٌ
হে মানুষ! ভয় করো তোমাদের প্রতি পালককে, নিশ্চয়ই সেদিন বড় ভয়ংকর। যেদিন প্রবল ভূমিকম্প হবে। (সূরা হজ্ব: ১)
কেয়ামতের দিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলবেন, হে আল্লাহ! আমার উম্মতের হিসাবের দায়িত্ব আমার হাতে সোপর্দ করুন, আমি নিজে তাদের হিসাব নিয়ে ফেলি। যাতে তাদেরকে আর কারও সামনে লজ্জিত হতে না হয়। আল্লাহ তায়ালা বলবেন, হে আমার নবী! যখন আপনি হিসাব নিবেন এবং তাদের পাপরাশি আপনার সম্মুখে এসে পড়বে, তখন এরা আপনার সামনে লজ্জিত হবে। সে জন্য এদেরকে আমি আপনার হাতে সোপর্দ করব না। বরং আমিই পর্দার আড়ালে তাদের হিসাব নিয়ে নেব। কেউ জানবে না এরা দুনিয়াতে কি সব অপরাধ করেছে। তাদের যারা জাহান্নামে যাবে, তারাও পর্দার আড়ালে আড়ালে যাবে।
📄 জাহান্নামের স্তর সাতটি
সবচেয়ে উপরের টার নাম (১) জাহান্নাম। যেই মুসলমান তওবা ছাড়া মৃত্যুবরণ করেছে তাদের জন্য। তারপর (২) হুতামা। খৃষ্টানদের জন্য। তারপর (৩) লাযা। ইহুদিদের জন্য। তারপর (৪) সায়ীর। অগ্নি পূজারীদের জন্য। তারপর (৫) সাকার। সূর্য পূজারীদের জন্য। তারপর (৬) জাহীম। পাথর পূজারী মুশরিকদের জন্য। তারপর (৭) হাবিয়া। মুনাফিকদের জন্য।
আল্লাহপাক যখন জাহান্নামের আগুনকে উত্তেজিত করেন, তখন হাবিয়ার পর্দা উঠে যায়। তার মধ্য থেকে যে আগুন বেরিয়ে আসে, তার তাপে জাহান্নামের আগুন ও চিৎকার করতে শুরু করে। মহান রাব্বুল আলামীন তাঁর গুনাহগার ও অবাধ্য বান্দাদেরকে শাস্তি দেবার জন্য এই সাতটি জাহান্নাম সৃষ্টি করেছেন। সেই সাতটি স্তরে কে কে থাকবে তা তিনি জিবরাঈল আলাইহিস সালাম এর মাধ্যমে প্রিয় হাবীবের কাছে বিবৃত করলেন। কিন্তু জাহান্নাম নামক স্তরটির কথা বলার সময় জিবরাঈল আলাইহিস সালাম নীরব হয়ে গেলেন। জিবরাঈল আলাইহিস সালামকে নীরব হয়ে যেতে দেখে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আপনি নীরব হয়ে গেলেন কেন? জিবরাঈল আলাইহিস সালাম বললেন, আপনার নিকট তা প্রকাশ করতে আমার লজ্জাবোধ হচ্ছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, বলে ফেলুন। তখন জিবরাইল আলাইহিস সালাম বললেন, জাহান্নাম নামক স্তরটি আপনার ঐ সকল গুনাহগার উম্মতদের জন্য। যারা তওবা না করেই মৃত্যুবরণ করবে।
একথা শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অস্থির হয়ে গেলেন। তাঁর পবিত্র চোখ থেকে অঝোর ধারায় অশ্রু ঝরতে লাগল। এরপর থেকে তিনদিন পর্যন্ত তিনি শুধু নামাযের জন্য ঘর থেকে বের হতেন। আবার ফিরে এসে ঘরের দরজা বন্ধ করে উম্মতের জন্য কাঁদতেন। উম্মতের দরদী নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের জন্য কেঁদেছেন। আর আমরা কি করছি? আজ আমরা সেই নবীর আদর্শকে জবাই করছি। আমরা মোহাম্মদী বাগানের মালি। আজ আমরা সেই বাগান বিরান করছি।