📄 যখন আসবে মৃত্যুর ডাক
প্রিয় ভাই ও বোন!
মৃত্যু এমন এক অটল বাস্তবতা যে, জগতের সব নেশা ছুটিয়ে দেয়। এ জগত খেল-তামাশা ছাড়া কিছুই নয়। আমাদের পরিকল্পনা নিয়ে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। মৃত্যুও কিন্তু সাথে সাথেই চলছে। কিন্তু মৃত্যুর কথাটা আমাদের পরিকল্পনার বাইরে থেকে যায়। আমরা ভুলে থাকি মৃত্যুকে। অথচ মৃত্যু আমাদের সাথে সাথেই আছে, ভুলে না। কত সম্পদ উপার্জন করবেন? কবে পর্যন্ত কামাই করবেন? কোনো সীমা পরিসীমা আছে? সীমাতো থাকা দরকার। এক জায়গায় গিয়ে থেমে যাওয়াতো দরকার। আখেরাতের কিছু ভাবনা তো করা দরকার।
প্রতিদিন নতুন নতুন পরিকল্পনা হচ্ছে। জীবনকে স্বপ্নীল করার নতুন নতুন প্রোগ্রাম সাজাচ্ছি। আর আমরা হাটছি এক পা এক পা করে কবরের দিকে। একদিকে সুন্দর সুন্দর পোশাক তৈরী হচ্ছে। অন্যদিকে কাফনের কাপড় বাজারে আসছে।
সেদিন এক কবরস্থানের পাশে একটি দোকানে দেখলাম অনেকগুলো নতুন কফিন সাজিয়ে রাখা হয়েছে। কয়েকটা সাধারণ কফিন। আবার কয়েকটা সুন্দর কারুকাজ করা। দেখে মনটা আমার হু হু করে উঠল। এই কফিনগুলো কার জন্য তৈরী করা হয়েছে কেউ জানে না। শহরের কবরস্থানগুলো ভরে যাচ্ছে। প্রতি বছর কবরস্থান গুলো নতুন করে জায়গা বাড়াতে হচ্ছে। আমাদের শেষ নিবাসের জন্য। এখানেই সবাই যাচ্ছে, গোপন হয়ে যাচ্ছে। এ কবরস্থান সব মরহুমদের স্থায়ী নিবাস।
আমরা কেন ভাবিনা, লোকটা কেন মারা গেল? খাটিয়ার উপর শুয়ে নিথর দেহটা যাচ্ছে কোথায়? তার তৈরী সুন্দর বাড়ি থেকে তাকে কেন বের করে নেয়া হচ্ছে? খাটিয়ায় চড়ে কেউ একজন কবরে যাচ্ছে। একদিন আমাদেরকেও খাটিয়ায় চড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হবে কবরস্থানে। বিশাল বিশাল অট্টালিকায় আমার থাকার কোন অধিকার থাকবে না। আমার বাড়ি আমার থাকবে না। হয়ে যাবে স্ত্রী সন্তানদের। আমার থাকল না কিছুই। আমি তখন একটি লাশ।
প্রিয় ভাই ও বোন! মানুষ এ জগত ছেড়ে চলে যাচ্ছে। সামনে কি আর কোন জীবন আছে? নাকি এখানেই শেষ? মরে গেলাম। স্বজনরা কাঁদলো ক'দিন। তারপর সব স্বাভাবিক। মানুষ বলে, একে ছাড়া কিছুই হবে না। কিন্তু পরে দেখা যাচ্ছে একে ছাড়া সবই হচ্ছে। স্বজনরা কেঁদে কেঁদে বলে, একে হারিয়ে আমার জীবনটা অন্ধকার হয়ে গেল। কিন্তু তার ঘরেই বাতি জ্বলে। যেন কেউ মরেই নি। তো এখানে এসে বিবেক স্থির হয়ে যায়। প্রশ্ন জাগে, সামনে কি আছে?
এখানে কোরআন আমাদের রাহবারী করছে। কোরআন বলছে, মৃতুর পর একটি জীবন আছে। খেল তামাশা নয়।
اَيَحْسَبُ الْاِنْسَانُ اَنْ يُّতْرَكَ سُدًى
মানুষ কি মনে করে তাকে এমনিতেই ছেড়ে দেয়া হবে? (সূরা কিয়ামাহ : ৩৬)
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলছেন, হে আমার বান্দা! এই ভাবনা মন থেকে বের করে দাও যে, মৃত্যুর পর প্রতিদান ও শাস্তি নেই।
اِنَّ يَوْمَ الْفَصْلِ مِيْقَاتُهُمْ اَজْمَعِيْنَ
সকলের জন্য নির্ধারিত আছে তাদের বিচার দিবস। (সূরা দুখান : ৪০)
فَتأْتُونَ أَفْوَاجًا
সেদিন আসবে তোমরা দলে দলে। (সূরা নাবা : ১৮)
وَ فُتِحَتِ السَّمَاءُ فَكَانَتْ أَبْوَابًا
আকাশ খুলে দেয়া হবে। ফলে সেটি হবে বহু দরজা বিশিষ্ট। (সূরা নাবা : ১৯)
وَأُزْلِفَتِ الْجَنَّةُ لِلْمُتَّقِينَ
জান্নাতকে মুত্তাকিদের নিকটবর্তী করা হবে। (সূরা শূয়ারা : ৯০)
وَبُرِّزَتِ الْجَحِيمُ لِلْগَاوِينَ
পথভ্রষ্টদের জন্য জাহান্নামকে উন্মোচিত করা হবে। (সূরা শূয়ারা: ১১)
সেদিন সফলতা ও ব্যর্থতার চূড়ান্ত ফয়সালা হবে। স্পষ্ট হয়ে যাবে, কে সফল, কে বিফল। কোরআনের ভাষায় সা'ঈদ ও সাকী। সা'ঈদ অর্থ কামিয়াবী [সফল], যে নেক আমল করেছে, নেকীর পাল্লা তার ভারি হয়ে যাবে। জিবরাঈল আলাইহিস সালাম ঘোষণা করবেন, অমুকের পুত্র অমুক, অমুকের কন্যা অমুক সফল। তার নেকীর পাল্লা ভারি হয়েছে, অমুক সফলকাম হয়েছে। তারপর বদ আমলের কারণে যার বদ এর পাল্লা ভারি হবে। সে বিফল হবে। সে লোক চূড়ান্তরূপে হতভাগ্য। জাহান্নাম তার জন্য অবধারিত হয়ে যাবে।
📄 হযরত আয়েশা (রাযি.)-এর আখেরাতের ভয়
আম্মাজান হযরত আয়েশা (রাযি.) এর জীবনের শেষ মুহূর্ত। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাযি.) এসে দেখতে পেলেন তিনি কাঁদছেন, কাঁদতে কাঁদতে তাঁর উড়না ভিজে গেছে। সেটি ছিল মোটা কাপড়ের বড় চাদর। পুরোটাই চোখের পানিতে ভিজে গেছে। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাযি.) জিজ্ঞেস করলেন, আম্মাজান! আপনি কাঁদছেন কেন? আপনিতো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর স্ত্রী, যার বুকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মাথা মোবারক ছিল। আর সেই অবস্থায় তিনি মহান বন্ধুর দরবারে হাজির হয়েছেন। তো আপনি কেন কাঁদছেন? আপনি তো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সবচেয়ে প্রিয় স্ত্রী।
হযরত আয়েশা (রাযি.) বললেন, এসব কথা দ্বারা আমাকে ধোঁকা দিও না। হায়! আমি যদি কিছুই না হতাম!
আমার প্রিয় ভাই ও বোনেরা! বুদ্ধিমানতো সেই ব্যক্তি, যে নিজেকে চিনেছে এবং মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। সেই ব্যক্তি বুদ্ধিমান, যে আখেরাতের প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। আমাদের জন্য রয়েছে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আদর্শ। তিনি জগতে সমস্ত জিন ও ইনসানের রাহবার। পথপ্রদর্শক। যে নারী পুরুষ সেই আদর্শে চলল, তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করল, তার আখেরাতের প্রস্তুতি পরিপূর্ণ হয়ে গেল। আমরা মানুষকে তাঁরই আদর্শের দিকে আহ্বান করি যে, নিজের জীবনটাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বরকতময় পথে নিয়ে আসুন। তাঁর মত আদর্শবান মানুষ না আল্লাহ কাউকে তৈরি করেছেন, না কেউ তৈরি হতে পারে।
📄 একটি ঘটনা
পাকিস্তানের সাহেওয়াল নামক এলাকার ঘটনা। ধোপার ছেলে চিল্লা লাগালো। তারই গ্রামে এক মেয়ের সাথে তার বিয়ে ঠিক হয়েছিল। দিন তারিখ ঠিক হওয়ার পর সে চিল্লায় গিয়েছিল। যখন ফিরে এলো, তার মুখ ভর্তি দাড়ি। চিল্লায় যাওয়ার সময় ছিল ক্লিনসেভ। বিয়ের তারিখে বরযাত্রী কনের বাড়ি পৌঁছে গেল। ওই এলাকার নিয়ম ছিল বিয়েতে জমিদারও উপস্থিত থাকতেন।
বরযাত্রী কনের বাড়ি পৌঁছলে হাঙ্গামা শুরু হয়ে গেল। মেয়ে পক্ষ বলল, ছেলেকে যখন আমরা দেখেছিলাম, তখন তার মুখের দাড়ি ছিল না। এখন দাড়ি আছে। আগে দাড়ি কাট, তারপর মেয়ে বিয়ে দেব। বরপক্ষের সবাই বিষয়টা মেনে নিল। ভাই মানল, বোন মানল। বাপ মানল, চাচা মানল, সবাই বলল এটা কোনো সমস্যাই না। কয়েক মিনিটের কাজ মাত্র। আল্লাহ অনেক দয়ালু, তিনি মাফ করে দিবেন। সবাই বরকে বলল, তুমি দাড়ি কেটে ফেল, ঝামেলা মিটে যাক।
কিন্তু বর বলল, আমার গলাটা কেটে ফেলুন। গোটা জগত আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে ফেলতে পারব। তবুও দাড়ি কাটতে পারব না। যুবকের কথায় হাঙ্গামা আরো বেড়ে গেল। মেয়ে পক্ষ বলল, দাড়ি না কাটলে মেয়ে বিয়ে দেব না। বর বলল, না দাও, কোন সমস্যা নেই। আমি আল্লাহর রাসূলকে নারাজ করতে পারব না। এ হওয়ার নয়, হতে পারে না। রাসূলের মহব্বতে সব ছাড়তে আমি রাজি। হট্টোগল বেড়েই চলেছে।
ঘটনাটা সম্পূর্ণ দেখার পর উপস্থিত জমিদার সাহেব বললেন, বরপক্ষের সবাই আমার বাড়িতে চলুন। এ ছেলের কাছে আমার মেয়েকে বিবাহ দিব। সমস্ত বরযাত্রী জমিদারের বাংলোয় চলে গেল। জমিদার তার সুন্দরী কন্যাকে এ যুবকের সাথে বিয়ে দিয়ে দিলেন।
তো ভাই! মানুষ এখন বলে কি করব, সামাজিক অবস্থাতো দেখতে হয়, আধুনিকতার যুগ। ছেলে মেয়েরা এখন অনেক আধুনিক। আমি বলি, একথা বলুন, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে তো দেখতে হয়। যার অফাদারীই সত্য এবং জগতের অন্য সকলের অফাদারী মিথ্যা।
📄 পাথরী হৃদয়
প্রিয় ভাই ও বোন!
আমাদের অন্তর পাথর হয়ে গেছে। আল্লাহ এবং আল্লাহর রাসূলের সাথে এ অন্তরের কোন সম্পর্ক নেই। আমাদের সম্পর্ক কেবল আমাদের সাথে। আমাদের ভালবাসা কেবলই আমাদের কামনা বাসনার প্রতি। আল্লাহ তায়ালার ভালবাসা আমাদের অন্তরে নেই। রাসূলের আদর্শ আমাদের মাঝে নেই। আমাদের হৃদয় পরিপূর্ণ মৃত। অন্তর পাথর হয়ে গেছে। আমরা এখন কামনা বাসনার দাস। রিপুর তাড়নায় অন্ধ। আল্লাহ তায়ালার কাছে আমাদের বিন্দু পরিমাণ মূল্য নেই।
এ অবস্থা থেকে আমাদের উত্তরণ জরুরী। মৃত্যুর পূর্বেই আল্লাহর সাথে আমাদের বন্ধন প্রতিষ্ঠিত হওয়া আবশ্যক। আল্লাহর সাথে আমাদের সম্পর্ক এমন হওয়া উচিত- যেন আমাদের অন্তর দেখলেই আল্লাহ তায়ালা খুশি হয়ে যান। আমাদের সবাইকে এ বিষয় সর্বদাই মনে রাখতে হবে যে, এই দুনিয়া একদিন ছেড়ে যেতে হবে। দুনিয়াটা শুধুই ধোঁকার স্থান। আল্লাহ তায়ালার কাছে এর মর্যাদা মশার ডানার সমতুল্যও না। এ দুনিয়া মাকড়শার জালমাত্র। আসুন আমরা আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীনের কাছে এ প্রার্থনা করি। আল্লাহ পাক যেন আমাদের আমলী বান্দা হিসেবে জীবিত রাখেন। আমাদের টার্গেট হলো আখেরাত, যার যাত্রা শুরু হয় কবর থেকে。
আরে ভাই! আমরা তাবলীগ ওয়ালারা কোন কঠিন কথা তো বর্ণনা করছি না। এর চেয়ে কঠিন কথা আপনারা শোনার জন্য লাইন ধরে দাঁড়িয়ে থাকেন। আমরা তো চেষ্টা করছি, আল্লাহ ও তাঁর প্রিয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ভালবাসার যে বীজটি আপনার ভেতরে কোথাও অবহেলিত হয়ে পড়ে আছে। সেই পর্যন্ত যেন আমাদের আকুতি পৌঁছে যায়। কোথাও থেকে যেন সেটি কিছু পানি পেয়ে যায়। যেন সেটি অংকুরিত হয়ে ডালপালা গজিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে। আমরা চাই সে জীবনটি পুনরায় নবজীবন লাভ করুক। যেটি কোন এক সময় আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ভালবাসায় কাঁদত।
আল্লাহর কসম, কখনও কখনও একান্তে খুব কান্না আসে, অন্তর বড়ই পেরেশান হয়ে যায়। হে আল্লাহ! এত বয়স চলে গেল জীবনে তোমার ভালবাসায় একটি সিজদাও নসিব হল না। কেমন অকৃতজ্ঞ আমরা! কেমন ফকীর আমরা! কেমন নিঃস্ব, অথর্ব আমরা!
প্রিয় ভাই ও বোন!
তোমার ভাণ্ডার থেকে কিছু সম্পদ আল্লাহর কাছে জমা করতে থাকো। খালি হাতে মৃত্যুবরণ করো না। পরকালের পুঁজি আগেই সঞ্চয় করে রাখো। আল্লাহর ভাণ্ডারে সব আমানত থাকবে। সেই ভাণ্ডার লুট হয় না। আগুনে পোড়ে না। পানিতে নিমজ্জিত হয় না। যেদিন সবাই তোমাকে ছেড়ে যাবে, সেদিন সে সব তোমার কাজে আসবে। তোমার ভাণ্ডার তোমাকে ফিরিয়ে দেয়া হবে।
প্রত্যেক নারী-পুরুষ যদি এ জীবনের উপর এসে যায় তাহলে দুনিয়া জান্নাতে পরিণত হবে। অর্থ দ্বারা জান্নাত গড়ে না। বিত্ত দ্বারা সুখের উপকরণ কেনা যায়, সুখ কেনা যায় না। টাকা দ্বারা ঘুমের আরামদায়ক জায়গা কেনা যায়, ঘুম কেনা যায় না। অর্থ দ্বারা মর্যাদার উপকরণ কেনা যায়, মর্যাদা কেনা যায় না। সুখ-আনন্দ আরাম-মর্যাদা দেওয়ার মালিক আল্লাহ তায়ালা। এসব আল্লাহ তায়ালা দান করে থাকেন। তিনি যাকে ইচ্ছা এসব দান করেন। গোলাম যদি মহান মালিককে খুশি করতে পারে তাহলে মালিক গোলামকে এসব দান করেন। তাই আসুন, দুনিয়ায় থাকতেই পরকালের জন্য তৈরী হই। প্রত্যেক মানুষের দুনিয়া ও আখেরাত তখন গড়বে যখন মানুষ আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূল (সাঃ) এর আদেশমত চলবে। অন্যথায় মানুষের দুনিয়া ও আখেরাত সবই বরবাদ হবে।