📄 জগতের বাস্তবতা এটাই
প্রিয় ভাই ও বোনেরা আমার!
পৃথিবীতে প্রত্যেকটা মানুষই নিজ নিজ মেহনতের একটি গন্তব্য ঠিক করে নেয়। আর এ গন্তব্য পর্যন্ত পৌঁছাকে মানুষ সফলতা মনে করে। আর গন্তব্য পর্যন্ত পৌঁছতে না পারলে তাকে ব্যর্থতা মনে করে।
আমাদের অসহায়ত্ব হলো জীবনে আমরা যে লক্ষ্য ও গন্তব্য ঠিক করে রাখি, সে পর্যন্ত পৌঁছতে পারে খুব অল্প মানুষ। মাঝপথেই হাজির হয় মৃত্যু। জীবনের মালিক আল্লাহ তায়ালা। আল্লাহ তায়ালার হাতেই এর লাগাম। তিনি যে সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছেন, বা নেন, তা আমাদের আশা আর স্বপ্ন বাস্তবায়নের ব্যবস্থাপনা দেখে করেন না। করেন নিজের ইচ্ছানুযায়ী।
এ কেমন আজব জগত যে, মানুষ আপন জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ঠিক করে। কিন্তু বেশির ভাগ মানুষই সেই লক্ষ্য পর্যন্ত পৌঁছার আগেই মৃত্যুবরণ করে। আর যারা লক্ষ্য পর্যন্ত পৌঁছে, তাদেরও জীবনের অন্তিম সময় এসে যায়। জীবনের দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে যখন সফল হয়, তখন তারও চলে যাওয়ার সময় হয়ে যায়। বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন রকম অসুস্থতা দেখা দেয়। খাবারে রুচি হয় না। অথচ কত খাদ্য ফ্রিজে পড়ে আছে। রাতে ঘুম হয় না। অথচ আরামদায়ক শয্যা তাঁর জন্য বিছানো আছে। এসব তার কোন কাজেই আসে না। শুধু দীর্ঘশ্বাস, আর হতাশা। একসময় মৃত্যুর ডংকা বেজে উঠে। সব ছেড়ে যুগ যুগের পরিশ্রমের ফসল অন্যদের হাতে তুলে দিয়ে কবরের বাসি হয়ে যায়। আপনি খেয়াল করে দেখুন, সমস্ত জগতের বাস্তবতা এটাই।
প্রিয় ভাই ও বোনেরা!
অনেক বড় বঞ্চনার বিষয় যে, জীবনের লক্ষ্যে পৌঁছার পর তাদের কাছে সর্বোচ্চ সত্তর আশি বছর সময় থাকে। তারপর তারা সব ত্যাগ করে চলে যায়। আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের বিস্ময়কর ব্যবস্থাপনা এমনই যে, তিনি আমাদের মাঝে চাহিদা রেখেছেন অসংখ্য। কিন্তু জীবন দান করেছেন সংক্ষিপ্ত। চাহিদা অনেক, জীবন তার চেয়েও ক্ষুদ্র। জীবনের চেয়ে বেশি চাওয়া আছে, চাহিদার শেষ নেই। চাহিদার হিসাব করলে বয়সের দ্বিগুণ হয়ে যাবে। চাওয়াকে জীবনের বৃত্তে বাধা যায় না। বৃত্ত ভেঙ্গে বেরিয়ে যায়। জীবন নিঃশেষ হয়ে যায়। চাহিদা থেকে যায়।
আমি যা বলছি তা শুধু এ যুগের চিত্রই না। বরং শত শত বছর এ ধারা চলে আসছে। কোরআনে পাকে আল্লাহ তায়ালা বলছেন, ﴿اَلْهُكُمُ التَّكَاثُرُنَ حَتَّى زُرْتُمُ الْمَقَابِرَنَ﴾ প্রাচুর্যের লালসা তোমাদেরকে গাফেল করে রাখে। এমনকি তোমরা কবরস্থানে পৌঁছে যাও। (সূরা তাকাসুর: ১,২)
📄 শেরশাহ সুরীর আক্ষেপ
শেরশাহ সুরী, দিল্লি বিজয় করেন শেষ বয়সে। দিল্লি বিজয় করে একটি মূল্যবান উক্তি করেছেন তিনি। তার সেই উক্তি জগতের সব মানুষের জন্যই প্রযোজ্য। তিনি বলেছেন, আমার মাথার উপর ক্ষমতার সূর্য সে সময় উদয় হয়েছে, যখন আমার নিজের জীবন সূর্য অস্তপ্রায়। তিনি ষাট বছর বয়সে দিল্লি জয় করেন। মাত্র ছয় বছর ক্ষমতার স্বাদ পেয়েছিলেন। ছেষট্টি বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। তার উক্তি সত্য প্রমাণিত হলো, ক্ষমতার সূর্য যখন চমকালো, তখন নিজের জীবনের সূর্য অস্ত গেলো।
এই তো জীবন। জীবন এমনই। ক্ষণস্থায়ী। অল্প কয়েকদিনের। এই অল্প কদিনের জীবনে নিজের চাওয়া পাওয়ার আপন পরিকল্পনায় মানুষ হয়ত পূর্ণতা পর্যন্ত পৌঁছতে সক্ষম হয়। যখন পৌঁছে, তখন মৃত্যু তার মাথার উপর এসে যায়।
📄 দু’দিনের দুনিয়া
আমরা এ জগতে মাত্র অল্প ক'দিনের বাসিন্দা। রঙিন দুনিয়ার মায়া ছেড়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে হবে। হয়ে যাব কবরের বাসিন্দা। এই তো মানুষের নিয়তি। এটাইতো বাস্তবতা। তারপরও কেন উদাসীন? আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদের কাছে কি চান, আর আমরা কি করছি?
আল্লাহ তায়ালা বলেন, হে আমার বান্দা! তুমি চাও এক আর আমি চাই আরেক। তোমরা আমার ইচ্ছা ও চাহিদার কাছে আত্মসমর্পণ করো, তাহলে তুমি যা চাইবে তা আমি তোমাকে দান করব। তুমি তোমার চোখ দিয়ে দুনিয়ার চাকচিক্য দেখ। আকাশ দেখ, নদী দেখ, সাগর দেখ, সুশোভিত বৃক্ষরাজী দেখ। এগুলো দেখার জন্যই তোমার দুটি চোখ আমি দিয়েছি। তোমার চোখ একটি নেয়ামত। আমার সৃষ্টির সৌন্দর্য ও নেয়ামত। এগুলো তোমাদের জন্যই। কিন্তু একটি সীমা আছে। দেখতে গিয়ে সেই সীমা লংঘন করো না। কোরআনে কারীমে বলা হয়েছে-
قُلْ لِلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ
ঈমানদার পুরুষদেরকে বলে দিন, তারা তাদের চোখগুলোকে অবনত রাখুক। (সূরা নূর, আয়াত: ৩০)
قُلْ لِلْمُؤْمِنَتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ
ঈমানদার মহিলাদেরকে বলে দিন, তারা তাদের চোখগুলোকে অবনত রাখুক। (সূরা নূর, আয়াত: ৩১)
দুনিয়াতে দেখা হারাম নয়, কিন্তু আল্লাহ তায়ালা বলে দিয়েছেন তোমরা তোমাদের চোখগুলোকে অবনত রাখো। সীমা লংঘন করো না। আমি তোমাকে শুনতে বারণ করিনি। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, তোমরা হারাম শুনো না। ভুল ও মিথ্যা কথা থেকে তোমাদের কানগুলোকে হেফাযত করো। তোমাদের জবানকে হেফাযত করো। দ্বীনের উপর চলা কঠিন হতো যদি আল্লাহ তায়ালা বলতেন, তুমি অন্ধ হয়ে থাক, দেখতে পারবে না। তুমি বধির হয়ে যাও, শুনতে পারবে না। তুমি ক্ষুধার্ত থাক, খেয়ো না। তুমি বোবা হয়ে যাও, কথা বলতে পারবে না। তুমি লেংড়া হয়ে থাকো, হাটা যাবে না।
আল্লাহ তায়ালা এসব বলেন নি। তিনি সব কিছুর জন্য একটি সীমানা নির্ধারণ করে দিয়েছেন যে, এতটুকু তুমি দেখতে পার। এতটুকু নয়। আমরা সবাই জানি কি দেখা যাবে, আর কি দেখা যাবে না। কি শোনা যাবে আর কি শোনা যাবে না। কি বলা যাবে আর কি বলা যাবে না। সত্যটা বলতে হবে। মিথ্যা বলা যাবে না। কোরআন পড়, কোরআন শোন। গান শোন না। অর্থাৎ যা আমি চাই, তা করবে। তাহলে আমি তাই করব, যা তুমি চাও?
আরে ভাই! দুনিয়াতে কতদিন পর্যন্ত দেখবেন? দেখতে দেখতে একদিন চোখের পাওয়ার কমে যাবে। চোখে চশমা উঠবে। তারপর একসময় চশমাও কোন কাজে আসবে না। চোখের আলো আল্লাহ তায়ালার নেয়ামত। একদিন তা নিভে যাবে। আলোহীন চোখ কিছুই দেখতে পাবে না। কান দ্বারা আর কতদিন শুনবেন? একদিন কানের পর্দায় তালা লেগে যাবে। বধির হয়ে যাবেন। কিছুই শোনেন না। কানে যন্ত্র লাগানো হবে। একসময় যন্ত্রও বেকার হয়ে যাবে। মুখ দ্বারা কতদিন পর্যন্ত কথা বলবেন? কতদিন পর্যন্ত চেঁচাবেন? একদিন এ জবান বন্ধ হয়ে যাবে। জিহ্বা নড়বে না। তারপর এ আওয়াজ চিরদিনের জন্য নীরব হয়ে যাবে। এই শরীর কতদিন থাকবে? আর কতদিন পর্যন্ত তুমি শরীরের চাহিদার পায়রবী করবে? একদিন পেশীবহুল শরীর এ লাবণ্যময় চেহারায় ভাঁজ পড়ে যাবে। এই রূপ সৌন্দর্য একদিন হারিয়ে যাবে। আর এই চেহারা, যার জন্য এত গর্ব, এত চাহিদা, যার দর্শনে চোখ কখনও ক্লান্ত হতো না, এই চেহারায় একবার চোখ পড়লে চোখ ফিরিয়ে নিতে মন চাইতো না। একদিন তা বিরক্তিকর বিশ্রী বস্তুতে পরিণত হবে?
তোমার দেহ ভরা যৌবন ছিল। সদম্ভে হেটে বেড়াতে যে পা দিয়ে। ভরা যৌবনে সদম্ভে দেখিয়ে বেড়াতে যে শরীর। আজ তা ন্যূয়ে পড়েছে বয়সের ভারে। আজ এতই দুর্বল যে দুজন মানুষের কাঁধে ভর দিয়ে তোমাকে চলতে হয়। পা দুটি মাটিতে স্থীর হয়ে দাঁড়াতে পারছে না। অন্যের সাহায্যে চলতে হয়। এ শরীর আজ বিছানায় পড়ে আছে। গড়াগড়ি খাচ্ছে। উঠতে পারছে না। এসব ভাবনার বিষয়। এটাই তো বাস্তবতা। এ যৌবন হারিয়ে যাবে। জীবন প্রদীপ নিভে যাবে। একদিন মাটির নিচে দাফন হয়ে যাবে এ দেহ। তারপর একটি সময় আসবে, যেন কেউ কারও না।
এই মা এই বাবা, পুত্র, কন্যা, ভাই, বোন সবাই ভুলে যাবে। তার পর আমি একটি ভুলে যাওয়া কাহিনীতে পরিণত হবো। ভুলিয়ে দিবে দুনিয়ার ব্যস্ততা। একসময় কবরের চিহ্ন পর্যন্ত মুছে যাবে। নাতির জানা থাকবে না তার দাদার কবর কোথায়। আজ তো ছেলে মেয়েরাও অনেক সময় ভুলে যায় বাবার কবর কোথায়?
📄 রুস্তমে হিন্দ-এর কবর
মাওলানা তারীক জামীল সাহেব বলেন, এক সাথীর কবরে ফাতেহা পড়তে আমি মিয়ানী শরীফ নামক কবরস্থানে গেলাম। কবরস্থানে পৌঁছার পর একটি কবর আমাকে থামিয়ে দিল। সে এক ভাঙ্গা-চুরা এমন অবহেলিত কবর! আমার মনে হলো যেন এ কবরটির কথা স্মরণ করার মত কেউ নেই। অথচ তার সাথে আমার বিশেষ সম্পর্ক নেই। তবে সম্পর্ক একটা আছে, তা হলো ঈমানের সম্পর্ক। এ বন্ধনে পৃথিবীর সকল মুসলমানই পরস্পরের আত্মীয়। আমি কবরটির দিকে এগিয়ে গেলাম। ভাবলাম, হায় আল্লাহ! মানুষ এভাবে হারিয়ে যায়? কাছে গিয়ে দেখলাম কবরের ফলকে খোদাই করে লেখা, রুস্তমে হিন্দ এর কবর। লেখা আছে, জন্ম ১৮৪৪ খৃ. ও মৃত্যু ১৯০৮। আমার কান্না এসে গেল। আমি আমার সাথীর কবরে ফাতেহা পড়ার কথা ভুলে গেলাম। আমি রুস্তমে হিন্দের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে ফাতেহা পড়লাম। আমার মন বলছিলো, পৃথিবীর সকল মানুষ বুঝি এ কবরের কথা ভুলে গেছে। কি অসহায় ভাবে পড়ে আছে রুস্তমে হিন্দ।