📄 ইসলামের সম্ভাবনা
একুশ শতকে বিশ্বব্যাপী আজ ইসলামের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এখন প্রশ্ন, মানুষ ইসলাম সম্পর্কে অবহিত হতে পারবে কিনা? এ প্রশ্নের জবাব নির্ভর করছে, মুসলমানরা ইসলামকে সঠিকভাবে উপস্থাপন করছে নাকি তার ভ্রান্ত প্রতিনিধিত্ব করছে, তার ওপর।
বর্তমানে মুসলমানদের যে অবস্থা, তা দেখে কেউ ইসলাম গ্রহণ করতে উদ্বুদ্ধ হচ্ছে না। বিভিন্ন জন বিভিন্নভাবে ইসলাম গ্রহণ করছে। একথাই অতীব সত্য, আল্লাহ তাআলাই যাকে চান তাকে সোজা পথে চালান। সানফ্রান্সিকোর জেফরে লিংগা-এর মতো অনেক মানুষ শুধু কুরআন পড়ে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। অথচ এর পূর্বে মুসলমানদের সাথে তাদের কোনো সম্পর্কই ছিল না, কিন্তু আল্লাহ তাআলা সামগ্রিকভাবে মুসলমানদেরকে দীনের দাওয়াতদাতা হিসাবে ব্যবহার করেন। মুসলমানরা যদি পরিকল্পিতভাবে দীনের দাওয়াত-অন্যদের কাছ পর্যন্ত পৌঁছানোর চেষ্টা করত তাহলে ইসলামের আরো সম্ভাবনা দেখা দিত।
তাই আজ মুসলিম উম্মাহকে সর্বপ্রথম ইসলামের বাস্তব জীবনের দিকে ফিরে আসতে হবে। তারপর ইসলামকে বিশ্ববাসীর সামনে আবেদনময় করে উপস্থাপন করতে হবে। মানবতার কল্যাণকামী ও মুক্তির দিশাদানকারী ধর্ম হিসেবে উপস্থাপন করতে হবে। ইসলামকে রোগের এমন ব্যবস্থাপত্র হিসেবে পেশ করতে হবে, যাতে সব ধরনের রোগের চিকিৎসা রয়েছে। আত্মিক, মানসিক, শারীরিক সব ধরনের শান্তি-প্রশান্তি ইসলামে রয়েছে। এছাড়াও দাওয়াতের ক্ষেত্রে যে বিষয়গুলো তুলে ধরতে হবে তা নিম্নরূপ:
০১. এক আল্লাহর পরিচয় তুলে ধরতে হবে এভাবে যে, আসমান-যমীন, আরশ-কুরসী, লাওহ-কলম, চন্দ্র-সূর্য, তারা-নক্ষত্র, গাছপালা, তৃণলতা, পাহাড়-পর্বত, নদ-নদী, সাগর-মহাসাগর, এক কথায় দৃশ্যমান ও অদৃশ্য যত কিছু এই সৃষ্টি জগতে রয়েছে সব কিছুই সৃষ্টি করেছেন মহান আল্লাহ। তিনি স্ব-অস্তিত্বে সর্বদা বিরাজমান। তিনি চিরঞ্জীব। আল্লাহ তাআলার অস্তিত্বের বিষয়টা জটিল কিছু নয়। এ বিষয়টি অনুধাবন করার জন্য কোনো তীক্ষ্ম বুদ্ধির প্রয়োজন নেই। আমরা স্বভাবগতভাবেই বুঝতে পারি, বিশ্বজগত কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনার ফসল নয়; বরং এর পেছনে রয়েছে মহান স্রষ্টার অপূর্ব সৃষ্টি কৌশল।
তিনিই দৃশ্য-অদৃশ্য সব কিছুকে অস্তিত্ব দান করেছেন। মহান রাব্বুল আলামীন এ মহা বিশ্বকে তাঁর ইচ্ছানুযায়ী সুবিন্যস্ত ও সুনিপুণভাবে সৃষ্টি করেছেন। এ মহা বিশ্ব যে মহান আল্লাহ তাআলার সৃষ্টি, এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ-সংশয় নেই। আল্লাহ তাআলার এই পরিচয় তুলে ধরতে পারলে আধুনিক শিক্ষিত শ্রেণী কিছুটা হলেও আত্মিক প্রশান্তি লাভ করবে। দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলতে হবে, তাওহীদ তথা সব ধরনের সংমিশ্রণ থেকে পবিত্র এক আল্লাহই আমাদের প্রভু। তাওহীদ আমাদের বিরাট এক সম্পদ। আল্লাহ ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই। তিনি অদ্বিতীয়, লা-শরীক, তাঁর কোনো শরীক নেই, সহকারী-সহযোগীও নেই। এখানে তর্কের খাতিরে বলতে হয়, যদি একাধিক ইলাহ থাকে তবে তারা সমান সমান ক্ষমতাবান অথবা কেউ তুলনামূলক কম ক্ষমতাবান হবে। যারা কম ক্ষমতাবান হবে তারা ইলাহ হতে পারে না। কারণ তারা অপূর্ণ, অক্ষম। যদি সকলে সমান হয় তবে তারা একে অন্যের বিরুদ্ধাচরণ করতে পারে বা পারে না, যদি তা না পারে তবে তারা সকলেই অক্ষম। আর যদি করতে পারে তবে জগতে বিশৃঙ্খলা ঘটা অবশ্যম্ভাবী। অথচ আমরা দেখতে পাই, বিশ্বজগত পরিচালনায় কোনো বিশৃঙ্খলা নেই। চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ, নক্ষত্র, দিন, মাস, বছর, শীত, গ্রীষ্ম একই নিয়মে চলছে। সুতরাং একাধিক ইলাহ অসম্ভব। আল্লাহ এক, অদ্বিতীয়, তাঁর কোনো শরীক নেই, তিনি নিজ সত্তা ও গুণাবলীতে এক, একক। অতএব তাঁর সাথে কোনো শরীক না করে নির্ভেজাল তাওহীদ-বিশ্বাস আমাদের অত্যাবশ্যক, আর এই হলো 'সীরাতে মুসতাকীম' মুক্তির সরল পথ।
এই মহাবিশ্বের অবশ্যই একজন সৃষ্টিকর্তা রয়েছেন। তিনি অনাদি অনন্ত। তিনি সব সময় ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন। তিনি সমস্ত উত্তম গুণের অধিকারী, সব ধরনের দোষত্রুটি থেকে পূত পবিত্র। সকল কিছুই তাঁর জ্ঞানের আওতাভুক্ত। সকল বিষয়ের ওপর তিনি সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। সকল সৃষ্টি তাঁরই ইচ্ছায় আবর্তিত। তিনি সর্বশ্রোতা, সম্যক দ্রষ্টা। তাঁর কোনো উদাহরণ নেই, কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই এবং কোনো সহযোগীও নেই; তাঁর নযীর নেই, বেমিছাল তিনি। ইবাদত-বন্দেগী লাভের অধিকারে, বিশ্ব জাহানের শৃঙ্খলা বিধানে কেউ তাঁর শরীক সহযোগী নেই। ইবাদত ও চূড়ান্ত সম্মানের অধিকারী কেবল তিনিই। তিনিই অসুস্থকে সুস্থ করেন, সকল প্রাণীকে রিযিক দেন।
তিনিই বিপদ-আপদ, বালা-মসিবত ও দুঃখ-কষ্ট দূর করেন। আল্লাহ তাআলা অন্য কোন সত্তায় প্রবিষ্ট ও একীভূত হওয়া থেকে পবিত্র। তিনি তাঁর সত্তা ও গুণাবলী সব কিছুতেই অনাদি অনন্ত। তিনি দেহ ও আকৃতি বিশিষ্ট এবং দিক বা স্থানের গণ্ডিতে আবদ্ধ নন। তিনি সর্বত্র বিরাজমান। জান্নাতে মু'মিনগণ তাঁর দীদার লাভ করে ধন্য হবেন। তিনি যা চান তাই হয়, যা চান না তা হয় না। তিনি কোনো কিছুর মুখাপেক্ষী নন। তাঁর ওপর কারো আইন বা নির্দেশ চলে না। নিজের কাজ সম্পর্কে তাঁর কারো কাছে জবাবদিহি করতে হয় না। কিছু করা তাঁর জন্য অবশ্য কর্তব্য নয়। তাঁর প্রতিটি কাজই হিকমতপূর্ণ, প্রজ্ঞাসম্পন্ন। তিনি ব্যতীত যথাযথ কোনো নির্দেশদাতা, কোনো হাকিম নেই।
০২. মানব জীবনের পথনির্দেশনার জন্য আল্লাহ তাআলা যুগে যুগে নবী-রাসূল পাঠিয়েছেন। এক আল্লাহতে বিশ্বাস এবং একমাত্র তাঁরই ইবাদত আনুগত্যের প্রতি ছিল সকল নবীর আহবান, এরই নাম ইসলাম। ইসলাম মানে আল্লাহর ইচ্ছার কাছে নিরঙ্কুশ আত্মসমর্পণের মাধ্যমে শান্তি ও মুক্তিলাভ। তাই নবী-রাসূলগণ যুগে যুগে ইসলামের বাণী প্রচার করে গেছেন। হযরত মুহাম্মদ (সা.) সর্বশেষ নবী ও রাসূল। তাঁরই মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা ইসলামের পরিপূর্ণতা দান করেছেন। তাই ইসলামই একমাত্র পূর্ণাঙ্গ জীবনদর্শন, জীবন ব্যবস্থা। এ ব্যবস্থার মধ্যেই মানুষের একমাত্র শান্তি ও কল্যাণ নিহিত। এছাড়া অন্য কোন মত ও পথে শান্তি নেই। ইসলাম মানুষের জৈবিক, বুদ্ধিবৃত্তিক, আধ্যাত্মিক ও ব্যবহারিক জীবন থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক জীবন পর্যন্ত পরিব্যাপ্ত। হযরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর তেইশ বছরের নবুওতী জীবনে আল্লাহর বাণী আল কুরআনের ভিত্তিতে নিরলস সংগ্রাম ও অপরিসীম ত্যাগ-তিতিক্ষার মাধ্যমে এক সর্বাত্মক বিপ্লব সাধন করে এমন এক সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার গোড়াপত্তন করেছিলেন, যা পরবর্তী সকল কাল ও দেশের মানুষের জন্য দুনিয়া-আখিরাতের প্রকৃত কল্যাণ ও মুক্তির একমাত্র আদর্শরূপে বিদ্যমান রয়েছে।
রাসূলুল্লাহ (সা.) এর ওফাতের পর খোলাফায়ে রাশেদীন তাঁর প্রতিষ্ঠিত সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থাকে কুরআন-সুন্নাহর ভিত্তিতে সঠিক পথে পরিচালনা করে খেলাফত ব্যবস্থার অনুপম কল্যাণ প্রবাহ মানব জাতির সামনে তুলে ধরেছিলেন, যা পরবর্তী সকল যুগের ও সকল দেশের মানুষের জন্য এক অতুলনীয় দিক নির্দেশক দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। অতএব মানবতাকে মুক্তি পেতে হলে রাসূলুল্লাহ (সা.) প্রদর্শিত পথ ধরেই চলতে হবে।
০৩. ইসলাম একটি ন্যায় ইনসাফ, ভারসাম্য ও মধ্যপন্থী ধর্ম। আল্লাহ পাক বলেন, এমনিভাবে আমি তোমাদেরকে একটি মধ্যপন্থী উম্মত বানিয়েছি, যাতে তোমরা দুনিয়ার লোকদের জন্য সাক্ষী হতে পার।
ইসলাম প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি ধর্ম। এ ধর্ম ইনসাফ ও কল্যাণের গ্যারান্টি। অতি সংকোচন ও অতিরঞ্জন থেকে পবিত্র। স্বাধীনতা ও উন্নতি-প্রগতির পতাকাবাহী। এই দীন শরীর, জান-প্রাণ, রূহ, বস্তুগত, আধ্যাত্মিক, চারিত্রিক, নৈতিক ও ইহলৌকিক সকল প্রয়োজন পূরণ করে।
০৪. আকীদা-বিশ্বাসের পাশাপাশি বর্তমান সমাজের সামনে ইসলামের পারিবারিক ব্যবস্থাও তুলে ধরতে হবে। কারণ পাশ্চাত্য সভ্যতা আজ খুব দ্রুত পতনের কোলে ঢলে পড়ছে। আপনারা হয়ত অনুভব করছেন, পাশ্চাত্য সভ্যতার পতন শুরু হয়ে গেছে। এই পতনের অন্যতম বড় কারণ হলো, পাশ্চাত্যের পারিবারিক ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়েছে। ছিন্ন ভিন্ন হয়ে গেছে তাদের পারিবারিক সম্পর্ক। সেখানে এক ধরনের অস্থির বিশৃংখল অবস্থা বিরাজ করছে। তালাকের হার বিপজ্জনকহারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বড় বড় শহরের অর্ধেক ঘর একা এক ব্যক্তি চালাচ্ছে।
সে পুরুষ হলে তার স্ত্রী আর স্ত্রী হলে তার স্বামী নেই। নারীরা সন্তান চাচ্ছে কিন্তু স্বামী নেই। শিশুদের বিপুল অংশ পিতা ছাড়া প্রতিপালিত হচ্ছে। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যে আস্থা ও ভালবাসা হওয়া উচিত, তা ক্রমশঃ হ্রাস পাচ্ছে। এ নিয়ে বর্তমান সময়ের চিন্ত াবিদ ও দার্শনিকরা শংকিত। তারা একের পর এক গ্রন্থ রচনা করে যাচ্ছেন, কিভাবে পাশ্চাত্যের পারিবারিক ও সামাজিক ব্যবস্থাকে ভাঙ্গনের হাত থেকে রক্ষা করা যায়। স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক প্রেম-ভালবাসাই জীবনের প্রকৃত স্বাদ। কখনো এতে জোয়ার- ভাটা আসতে পারে, কিন্তু তা ধৈর্যের সাথে মোকাবেলা করতে হয়। আজো প্রাচ্যের অনেক দেশ রয়েছে যেখানে অনেক পরিবারে দু'মুঠো খাবার জোটে না, কিন্তু তারা জান্নাতের স্বাদ অনুভব করে। কারণ, তাদের পরস্পরে ভালবাসা আছে। তারা একে অপরের মুখ দেখেই দুঃখ-কষ্ট, ক্ষুধা-দারিদ্র্য ভুলে যায়। পক্ষান্তরে পাশ্চাত্যে সব কিছু আছে। আছে ঐশ্বর্য-প্রাচুর্যের ভাার। স্তূপ পড়ে আছে প্রাকৃতিক সম্পদের। সৃষ্টির বহু শক্তিকে তারা অনুগামী করে ফেলেছে, কিন্তু তারা তাদের হৃদয়রাজ্য এবং পরিবারকে জান্নাতে রূপান্তরিত করতে পারেনি।
পাশ্চাত্য জাতি আকাশ জয় করেছে, কিন্তু জীবনের অন্ধকার রাতকে উজ্জ্বল প্রভাতে রূপান্তরিত করতে পারেনি। যদি মহাকবি আল্লামা ইকবাল (র.) জীবিত থাকতেন তাহলে বলতেন, যে জাতি আজ সূর্য বিজয় করেছে, তারকারাজির রহস্য উদঘাটনে অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছে, সে জাতি এখনো তাদের চিন্তার রাজ্যে সফর করতে সক্ষম হয়নি। নিজ ঘরকে ফুলবাগিচা ও জান্নাত বানাতে সক্ষম হয়নি। যারা দুনিয়াকে জান্নাত বানানোর চেষ্টায় লিপ্ত, তাদের ঘর জাহান্নাম হয়ে আছে। প্রদীপের নিচে অন্ধকার। পাশ্চাত্যের অধিকাংশ পরিবারে শান্তির উপকরণ নেই। ফলে তারা ঘরের বাইরে, বিনোদনকেন্দ্রে আর নাইট ক্লাবে শান্তি খুঁজে ফিরে।
কারণ তারা ঘরে শান্তি পায় না। ঘরে এসে অনুভব করতে পারে না, তারা দুনিয়ার জান্নাতে প্রবেশ করেছে; বরং তারা ঘরের জীবন থেকে পালাবার চেষ্টা করে। আর মুসলমানদের পারিবারিক ব্যবস্থা বিশ্বায়ন, মিডিয়ার আগ্রাসন এবং অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও এখনো অটুট রয়েছে। পাশ্চাত্যের তুলনায় প্রাচ্যের পারিবারিক ব্যবস্থা বেশি নিরাপত্তা প্রদান করে। মুসলিম উম্মাহর এই রক্ষা করা উচিত। এভাবে বিশ্ববাসীর সামনে পাশ্চাত্যের পারিবারিক ব্যবস্থর করুণ চিত্র আর প্রাচ্য তথা ইসলামের পারিবারিক ব্যবস্থার সুন্দর চিত্র তুলে ধরতে হবে।
০৫. পাশ্চাত্য সমাজের দ্বিতীয় বড় বিপর্যয় হলো, সে সমাজে নেশা ও মাদক দ্রব্যের ছড়াছড়ি, যার মধ্যে সিগারেট, মদ, কোকেন, এস.ডি প্রভৃতি নেশাজাত দ্রব্য। এই নেশার মধ্যে টিভি এবং ইন্টারনেটকেও শামিল করা যেতে পারে। কোনো অতিরঞ্জন ছাড়াই বলা যেতে পারে, নেশা ও মাদক আজ পাশ্চাত্য সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়েছে। দুঃখের বিষয় হলো, লোকেরা মদের পেয়ালা, নেশাকর টেবলেট এবং বিশেষ ধরনের সিগারেট ছাড়া বাঁচতে পারে না। নেশা আর মদ তাদের উদভ্রান্ত দিগভ্রান্ত করে ফেলেছে। নিরাশ করে ফেলেছে জীবন সংগ্রাম থেকে। নেশার কারণে তারা প্রতিটা মুহূর্ত অশান্তির অনলে জ্বলছে। পশু আর জানোয়ারের মতো রোডে সড়কে আর নাইট ক্লাবে ঘোরাফেরা করে। জীবনের কোনো লক্ষ্যই তাদের সামনে নেই। এ রকম লোকেরা কার্যতঃ নতুন ধরনের শেরেকের ওপর আমল করে চলেছে। তারা আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছুর গোলাম হয়ে পড়েছে। কোথাও যদি রোযার নিয়ম-নীতি পালন করতে হয়, তা হলে একথা আরো সুস্পষ্ট হয়ে যাবে। তারা সেটা করতে পারবে না। কেননা, সে নিজেই নিজের অস্তিত্বের মালিক নয়।
পক্ষান্তরে ইসলামের অনুসারীরা গর্ব করতে পারে যে, তারা তাদের অস্তিত্বের ব্যাপারে অত্যন্ত সচেতন। তারা প্রতিটি মুহূর্তে সচেতন ও চৌকস। তারা নেশাকে প্রশ্রয় দেয় না। নেশার পেছনে পড়ে স্বীয় জীবন ধ্বংসের পথে ঠেলে দেয় না। কারণ ইসলাম নেশা কঠোরভাবে নিষেধ করেছে, বরং নেশার ধারে কাছে যেতেও নিষেধ করেছে। ফলে আজো ইসলামের পারিবারিক ব্যবস্থা সুন্দর ও অটুট আছে। এক কথায়, ইসলাম বিশ্ববাসীর জন্য স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন এক বিকল্প জীবনব্যবস্থা। কেবল ইসলামই পাশ্চাত্যকে চলমান বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করতে পারে।
০৬. সাম্প্রদায়িকতা, জাতিগোষ্ঠীগত দ্বন্দ্ব, বর্ণ ও বংশ বৈষম্য, কালো-সাদার দ্বন্দ্ব এবং অন্যান্য ধর্মের সাথে বৈষম্যমূলক আচরণ ইত্যাদি পশ্চিমা সমাজের প্রধান বৈশিষ্ট্য। তাদের দাসত্বের ইতিহাস আজও আমেরিকায় প্রত্যক্ষ করা যায়। নিকট অতীতে ইউরোপ-আমেরিকায় যত দ্বন্দ্ব লড়াই সংঘটিত হয়েছে, তার বেশির ভাগ হয়েছে জাতিগত ও সাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্বের কারণে।
পক্ষান্তরে ইসলাম দৃষ্টিভঙ্গি ও কার্যত এমন এক ধর্ম, যেখানে গোত্র, বর্ণ, বংশ ও জাতিগত বৈষম্যের পরিবর্তে তাকওয়া ও খোদাভীতিকে মানদন্ড বানিয়ে প্রতিটি মানুষকে উম্মাহর মধ্যে গ্রহণ করে এবং নিষ্ঠার সাথে অন্য ধর্মকে সহ্য করে সাম্প্রদায়িকতা ও বহু ধর্মীয় সমাজের সমস্যার সমাধান করে দিয়েছে। পাশ্চাত্যের লোকেরা যখন ইসলামের এই বৈশিষ্ট্যের কথা জানতে পারবে, তখন তারা ইসলামকে হারানো জান্নাত মনে করে বরণ করে নেবে। মেইলকাম এক্স যখন জানতে পারলেন, উম্মাহর মধ্যে সকল সম্প্রদায়ই অন্তর্ভূক্ত হতে পারে, তখন তার চক্ষু খুলে যায়।
আসুন! আমরা এই মূল্যবোধকে বাস্তব জীবনের অংশ বানিয়ে সর্বপ্রকার বর্ণ, বংশ, ভাষা ও এ ধরনের সকল বৈষম্য নির্মূল করে এ থেকে পূর্ণাঙ্গভাবে উপকৃত হওয়ার চেষ্টা করি। আমেরিকার লাখ লাখ আফ্রিকান প্রজন্ম ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় নিয়েছে। রাসূলুল্লাহর মুআয্যিন হযরত বেলালও এই আফ্রিকার লোক ছিলেন, তাহলে সেখানকার লাখ লাখ মানুষ কেন তাঁর অনুসরণ করবে না? সকল ধর্মের সাথে উদারতা ও সাম্যের আচরণ করার নির্দেশ কুরআনুল কারীমে রয়েছে। কুরআনের বিভিন্ন স্থানে এ নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। ইসলামের এই মৌলিক উদারতা ও সাম্য যার ওপর আন্ত র্জাতিক খৃস্ট ঐক্য আন্দোলনের পূর্বে চৌদ্দশ বছর পর্যন্ত আমল করা হয়েছে, পশ্চিমাদের দৃষ্টিতে এত অসাধারণ মর্যাদা রাখে যে, তার প্রশংসা ব্যতিরেকে কেউ থাকতে পারে না।
ইসলাম বিশেষ কোনো জাতি ও গোত্রের জন্য নয়; বরং পৃথিবীতে বসবাসকারী প্রত্যেক মানবের জন্য। ইসলাম বিশেষ কোনো জাতিকেই তার দিকে আহবান করেনি; বরং গোটা মানব জাতিকেই সে নিজের দিকে আহবান করেছে। তার দাওয়াত ও পয়গাম কোনো গোত্র, বংশ, জাতি কিংবা ভৌগোলিক সীমারেখার মধ্যেই সীমিত থাকেনি। বিশ্বের যে কোণায় মানুষ কদম রেখেছে, ইসলামের দাওয়াতও সেখানে পৌঁছেছে এবং তার উন্নত শিক্ষা ও সমুন্নত মূল্যবোধ দ্বারা মানুষকে স্বীয় ক্রোড়ে তুলে নিয়েছে।
বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার ও সমাজের অবহেলিত লোকদের সামনে ইসলাম সাম্যের সেই শিক্ষা পেশ করেছে, যাতে দাস ও মনিবের মাঝে কোনো পার্থক্য নেই। ইসলামের এই উন্নত শিক্ষা, উচ্চ মূল্যবোধ এবং নযীরবিহীন তুলনাহীন ন্যায় ইনসাফের ফলে তার ক্রোড়ে বাদশাহও এসেছে, জনসাধারণও এসেছে, আরবও এসেছে, অনারবও এসেছে, শ্বেতাঙ্গও এসেছে, কৃষাঙ্গও এসেছে। মোটকথা, প্রতিটি শ্রেণীর, প্রতিটি স্তরের লোক ইসলাম দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে এবং তার সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় নিয়েছে। নিঃসন্দেহে তারা ইসলাম গ্রহণ করে এমন সম্পদ অর্জন করেছে, যা তাদের কখনো অর্জন হতো না।
এই বৈচিত্রময় পৃথিবীর প্রতিটি শ্রেণীর ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আসাই ইসলাম একটি সার্বজনীন বিশ্বজনীন ধর্ম হওয়ার প্রমাণ। যদি ইসলাম কোনো বিশেষ জাতি কিংবা গোত্রের জন্য হতো তাহলে তার অনুসারীরা প্রতিটি জাতি ও গোত্রের সাথে সম্পৃক্ত হতো না, কিন্তু পাশ্চাত্য জগত বর্ণ, বংশ ও ধর্ম বৈষম্যে বিশ্বাসী। যদি তাই না হবে তাহলে তুর্কীদের শাসনামলে ৫০০ বছর পর্যন্ত গ্রামের অর্থোডক্স খৃস্টানরা তাদের অধিকার নিয়ে বসবাস করেছে, কিন্তু ৮০০ বছর ধরে স্পেনে বসবাসকারী মুসলমানরা কোথায় গেল? একথা বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরতে হবে।
০৭. পাশ্চাত্যের নতুন প্রজন্ম নিজেদের স্বাধীন মনে করে এবং সেই স্বাধীনতা অটুট রাখতে চায়। তারা উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া পথ-প্রদর্শক ও পাদরীদের ধর্মীয় রসম-রেওয়াজ, রহস্যময় আকীদা-বিশ্বাস এবং চার্চসংশ্লিষ্ট সকল নিয়ম-নীতি ঘৃণা করে।
এ ধরনের লোকেরা তখন প্রশান্তির তাজ্জবে হারিয়ে যায়, যখন তারা জানতে পারে যে, ইসলাম চার্চ, ইউরোপ, রসম-রেওয়াজ, আল্লাহর শরীর, ত্রিত্ববাদ, ক্রুশে মুক্তি এবং উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া গুনাহর মতো অস্থিরপূর্ণ পরিকল্পনাকে স্বীকার করে না। যখন তারা জানতে পারে, মুসলমানদের থেকে বেশি বিধি-নিষেধমুক্ত ঈমানদার আর কেউ নেই, তখন তারা বিস্ময় প্রকাশ করে। তাদের জন্য এটি বিস্ময়ের কারণ যে, মুসলমানরা আল্লাহ ও বান্দার মাঝে কোন ওসীলা বা মাধ্যম মানে না। তা পাদরী ও সন্ন্যাসীর আকৃতিতেই হোক না কেন।
মুসলমান ইবাদতের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ একক ও ব্যক্তিগতভাবে আল্লাহর সামনে উপস্থাপিত হয়। একথা শুনে আপনারা বিস্মিত হবেন, যৌন বিষয়ে মুসলমানদের নিয়ম-নীতি আজো অসংখ্য নওজোয়ানকে ইসলামের দিকে ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে, যারা 'মূল্যবোধের প্রাচীনতাপ্রিয়' দৃষ্টিভঙ্গির সমর্থক। অসংখ্য পশ্চিমা নারী যারা হাট-বাজারে, অলি-গলিতে পুরুষের যৌন সম্ভোগের বস্তুতে পরিণত হতে লজ্জা ও ঘৃণাবোধ করে, তারা সেসব মুসলিম নারীদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ যারা পর্দা-পুশিদার সাথে চলাফেরা করে এবং সুস্পষ্ট জানান দেয় যে, সে কোনো সস্তা যৌন পণ্য নয়। পশ্চিমা দেশে অশ্লীল লিটারেচার, চলচ্চিত্র, ফ্যাশন শো, সুন্দরী প্রতিযোগিতা এবং নগ্ন যৌন বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে আজ নারীদের ইজ্জত লুণ্ঠন করা হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে নারী স্বাধীনতার সমর্থক পশ্চিমা নারীরাও বুঝতে শুরু করেছে, মুসলিম নারীরাও যে এ উদ্দেশ্যে, অর্থাৎ নারীর মর্যাদা, ইজ্জত-সম্ভ্রম রক্ষার জন্য প্রচেষ্টা করছে, তারা তাদের তুলনায় অনেক সফলতার সাথে এ কাজ আঞ্জাম দিচ্ছে।
'মায়ের জীবন যখন সংকটপূর্ণ হয়ে দাঁড়াবে তখনই কেবল গর্ভপাতের অনুমতি রয়েছে' গর্ভপাতের ব্যাপারে ইসলামের এই দৃষ্টিভঙ্গি আজ পাশ্চাত্যে অত্যন্ত সম্মানের দৃষ্টিতে দেখা হচ্ছে। এ দ্বারা বোঝা যায়, ইসলাম শিশুর জীবনের ব্যাপারে অত্যন্ত সুস্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি রাখে। ক্যাথলিক বিশপও বিভিন্নভাবে নারীদের গর্ভপাতের অনুমতি দেয়।
পাশ্চাত্যের নিরব সংখ্যাগরিষ্ঠ সমকামিতার ব্যাপারেও ইসলামের অবস্থানকে সম্মান করে। এই নিরব সংখ্যাগরিষ্ঠ পশ্চিমের নতুন পলিসির তীব্র সমালোচনা করে। যার অধীনে এক লিঙ্গের মধ্যকার সম্পর্ককে একটি জীবনপদ্ধতি মনে করে গ্রহণ করা হয়ে থাকে। অনেক পশ্চিমা বুদ্ধিজীবীর আশঙ্কা, জনসাধারণ পর্যায়ে সমকামীদের মর্যাদা বৃদ্ধি করা, যার মধ্যে সমকামী বিবাহও শামিল রয়েছে, অধঃপতন ও ধ্বংসের সুস্পষ্ট নিদর্শন। এসব বুদ্ধিজীবী অত্যন্ত লজ্জা অনুভব করেন যে, সানফ্রান্সিসকোর দুটি শহরে সম্পূর্ণ সমকামীদের বসবাস। পশ্চিমের এসব লোক যদি মুসলিম দৃষ্টিভঙ্গির সমর্থন করে থাকে, যাতে সমকামিতাকে ঘৃণা করা হয়েছে, তাহলে এটা কোন তাজ্জবের বিষয় নয়।
পশ্চিমে একই সাথে দুটি কট্টর দৃষ্টিভঙ্গি পাওয়া যায়। একদিকে যৌনতাকে সম্পূর্ণ পরিহার করার দৃষ্টিভঙ্গি অপরদিকে লাগামহীন যৌন স্বাধীনতার দৃষ্টিভঙ্গি। এই বিপরীতমুখী দুই কট্টর দৃষ্টিভঙ্গির কারণে পশ্চিমের জ্ঞানী-গুণী লোকেরা ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি বিরাট প্রভাবিত। ইসলাম এ দুয়ের মাঝামাঝি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত যৌনতার সমর্থক, যা একটি নির্ধারিত নিয়মের আওতায় হতে হবে। যখন যেভাবে ইচ্ছা যৌন কামনা চরিতার্থ করা যাবে না। ইসলামের বিয়ের পবিত্র বন্ধন পশ্চিমের লাগামহীন যৌনতার সাথে কোনভাবেই তুলনা হতে পারে না। এই বন্ধনের মাধ্যমে উভয়ের দাম্পত্য জীবনকে ইসলাম ইবাদত আখ্যা দিয়েছে।
০৮. ইসলামের অর্থব্যবস্থা মানবতার জন্য আল্লাহ তাআলার এক বিশেষ রহমত। ইসলামী অর্থ ব্যবস্থার এমন কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা পৃথিবীর অন্য কোনো অর্থব্যবস্থার মধ্যে নেই। যেমন-
ক. ইসলামী অর্থব্যবস্থার সাধারণ নীতিমালা আল্লাহ পাকের তৈরি, যিনি মানব জাতির স্রষ্টা এবং কি ধরনের অর্থব্যবস্থা তাদের জন্য কল্যাণকর হবে, সেটা ভালভাবে জ্ঞাত আছেন। আর অন্যান্য অর্থ ব্যবস্থার জনক মানব মস্তিষ্ক, যাতে ভুল-ভ্রান্তির যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। নিঃসন্দেহে আল্লাহর দেয়া ব্যবস্থা আর মানব রচিত ব্যবস্থার মধ্যে তেমনিই পার্থক্য যেমন আসমান-যমীনের মাঝে পার্থক্য।
খ. মানব রচিত অর্থব্যবস্থা শুধু বস্তুগত সমাধান পেশ করেছে। তার চূড়ান্ত উদ্দেশ্য সম্পদ উপার্জন করা। আর ইসলামের দৃষ্টিতে বস্তু শুধু একটি উপায় উপকরণ, উদ্দেশ্য নয়; বরং মানবের আসল উদ্দেশ্য প্রভুর পরিচয় লাভ করা।
গ. মানব রচিত অর্থব্যবস্থার মধ্যে নৈতিকতা, উন্নত চরিত্র ও সমুন্নত মূল্যবোধের কোনো গুরুত্ব নেই; বরং তার সকল মনোযোগ উৎপাদন বৃদ্ধির প্রতি কেন্দ্রীভূত থাকে। যে কোনোভাবে হোক না কেন। আর ইসলামী অর্থব্যবস্থার ইসলামী মূল্যবোধের সাথে পূর্ণাঙ্গ সম্পর্ক রয়েছে; বরং তা ইসলামের স্বচ্ছ ঝর্ণাধারা থেকে প্রবাহিত, যা মানুষের একে অপরকে সাহায্য করার এবং পরস্পরে ভালবাসা ও ভ্রাতৃত্বের শিক্ষা দেয়।
ঘ. ইসলামী অর্থব্যবস্থাকে ইসলামী আকীদা, ইসলামী শরীয়ত ও নৈতিকতা থেকে পৃথক করে অধ্যয়ন করা সম্ভব নয়। কারণ ইসলামী অর্থব্যবস্থা শরীয়তের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।
ঙ. ইসলামী অর্থব্যবস্থা ব্যক্তি ও সমাজের মধ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ অর্থব্যবস্থা। আর পুঁজিবাদী ব্যবস্থা, যা বিশ্বায়নের বুনিয়াদ, তার সমগ্র মনোযোগ ব্যক্তি মালিকানার দিকে। এ ব্যবস্থার দৃষ্টিতে ব্যক্তিই একক মালিক, তার নিকট ব্যক্তিস্বার্থ সামাজিক স্বার্থ থেকে ঊর্ধ্বে।
পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থার ফলে মজুদদারী ব্যবস্থা বৃদ্ধি পায়। মানুষের যে বস্তুর সবচে' প্রয়োজন, পুঁজিবাদীরা তাই স্টক করে রাখে। পরবর্তীতে চড়া মূল্যে বিক্রি করে। উপরন্তু এ ব্যবস্থার কারণে বেকারত্ব বৃদ্ধি পায়। এ দু'টি বিষয় আজকাল ভালভাবে প্রত্যক্ষ করা যাচ্ছে। অপরদিকে সমাজতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থার সকল মনোযোগ সামষ্টিক স্বার্থের ওপর নিবদ্ধ থাকে। এ ব্যবস্থায় উৎপাদনের সকল মাধ্যম ও উপকরণ, যেমন ক্ষেত, বাগান ও কারখানা ইত্যাদি রাষ্ট্রের মালিকানা। জনগণ শুধু বেতনের অধিকার রাখে, যা সমাজের খেদমতের বিনিময়ে সে পাবে।
এ ব্যবস্থার সবচে' ক্ষতিকর দিক হলো, এটা প্রকৃতি বিরোধী ব্যবস্থা, যা মালিক হওয়ার অভিলাষের সময় মানুষের মধ্যে পাওয়া যায়। তাছাড়া অলসতা এবং হীনমন্যতা এই ব্যবস্থার ধর্ম। এ কারণেই সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নে উৎপাদনের হার প্রচুর কম দেখা গেছে; বরং এমনও অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে যে, এক বেলার খাবার জোগাতে লোকদের স্বর্ণ-রৌপ্য পর্যন্ত বিক্রি করতে হয়েছে, কিন্তু ইসলামী অর্থনীতি ব্যক্তি ও সমষ্টি উভয়ের স্বার্থের প্রতি লক্ষ্য রেখেছে। এ ব্যবস্থা একদিকে যেমন প্রকৃতি এবং ব্যক্তির অধিকার রক্ষাকারী, তেমনি অভ্যন্তরীণভাবে তা কিছু নৈতিক সীমারেখা এবং বাহ্যিকভাবে কিছু আইনগত সীমারেখার অধীন। ইসলামী অর্থব্যবস্থায় সামষ্টিক মালিকানারও স্বীকৃতি রয়েছে।
এ কারণেই যদি কখনো ব্যক্তি ও সামষ্টিক স্বার্থের মধ্যে সংঘর্ষ সৃষ্টি হয় তখন ইসলাম সামষ্টিক স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়। ফুকাহায়ে কেরাম অনুমতি দিয়েছেন, প্রয়োজন পড়লে এমন ব্যক্তির কাছ থেকে জোরপূর্বক খাদ্য-শস্য ছিনিয়ে নেয়া যেতে পারে, যে ব্যক্তি তা স্টক করে রেখেছে। ইসলামী অর্থব্যবস্থার এই বৈশিষ্ট্যের কারণেই ফ্রান্সের অর্থনীতি বিভাগের প্রফেসর' জ্যাক আউস্ট্রোবী 'প্রচলিত অর্থব্যবস্থা ও ইসলামী অর্থব্যবস্থা' নামক স্বীয় গ্রন্থে একথা বলতে বাধ্য হয়েছেন। অর্থনৈতিক উন্নয়ন পুঁজিবাদ ও সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং দ্বিতীয় আরেকটি ব্যবস্থা রয়েছে, যাকে ইসলামী অর্থব্যবস্থা বলা হয়। বাহ্যিক দৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, ইসলামী অর্থব্যবস্থাই ভবিষ্যত অর্থনীতির নেতৃত্ব দেবে।
সমাজতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থা, যা কয়েক বছর হলো দাফন হয়ে গেছে। এ ব্যবস্থার প্রতিরোধের জন্যই পাশ্চাত্য পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থাকে বিকল্প হিসেবে বিশ্ববাসীর সামনে পেশ করেছে, যা আজ বিশ্বায়নের ভিত্তি, কিন্তু এ ব্যবস্থার উল্লিখিত ক্ষতিকর বিষয়াব- লীর আলোকে এ কথা বলা ১০০% সঠিক হবে যে, আসলে ইসলামী অর্থব্যবস্থাই পুরো বিশ্বের নেতৃত্ব দেবার যোগ্যতা রাখে।
০৯. ইসলামের আরো অনেক দিক রয়েছে, যেগুলো পশ্চিমাদের আকর্ষণের কারণ। তার মধ্যে স্বাস্থ্যের দৃষ্টিকোণ থেকে রমাযানের রোযা অন্যতম।
সর্বশেষ বিশ্লেষণ অনুযায়ী পশ্চিম ও প্রাচ্যের মাঝে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মতানৈক্য হলো জীবনের কোয়ালিটির ব্যাপারে। জীবনের কোয়ালিটি নির্ধারণ হবে মান হিসেবে না পরিমাণ ও সংখ্যা হিসেবে, এ নিয়ে দুই মেরু দুই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে। পশ্চিম পরিমাণ ও সংখ্যার দিককে এ পরিমাণ প্রিয় মনে করে, যতক্ষণ পর্যন্ত কোন জিনিসের পরিমাণ ও তার সংখ্যা নিরুপণ না করা হবে ততক্ষণ পর্যন্ত তা তাদের নিকট কোন গুরুত্ব ও মূল্য রাখে না। প্রকৃতপ্রস্তাবে পশ্চিমে এই প্রবণতা ব্যাপকহারে প্রচলন হয়ে গেছে যে, যার বস্তুগত পরিমাণ নির্ধারণ সম্ভব নয়, সেটা শুধু আধ্যাত্মিক সত্যতা।
ইসলামী বিশ্বসহ প্রাচ্য যদিও নতুন নতুন জীবনোপকরণ ব্যবহারে অর্জিত আনন্দের প্রতি বেশ ধাবিত, যা বিশ্বায়নের কারণে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় স্থানান্তরিত হচ্ছে। কিন্তু এখনো এ অঞ্চলে জীবনের কোয়ালিটি নির্ধারণে মানের দিককে পরিমাণের তুলনায় বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়। ইসলামী যিন্দেগীর কোয়ালিটির মধ্যে আত্মিক প্রশান্তি অবসর, চিন্তা-ভাবনা, আত্মীয়তা, বন্ধুত্ব ও আতিথেয়তা বিশেষভাবে গুরুত্বের অধিকারী। এই বাস্তবতা পশ্চিমের সেসব লোককে আকর্ষণ করে, যারা নির্বোধ বস্তুতান্ত্রিকতা থেকে ভীত-সন্ত্রস্ত।
📄 পথের অন্তরায়
০১. ওপরে আলোচনা করা হয়েছে, অনেক কারণের ভিত্তিতে ইসলাম পাশ্চাত্যের দুর্বল শ্রেণীর জন্য মহৌষধ মনে করা হয় এবং মনে করা উচিত। সেই ভিত্তিতে ইসলাম একুশ শতকের পথপ্রদর্শক ও আইডোলজি হতে পারে।
তবে কিছু কারণ এমনও রয়েছে, যেগুলো বিপরীতমুখে কাজ করছে। যেমন মুসলিম উম্মাহ এখনো পর্যন্ত বিশ্বের কোথাও স্বতন্ত্র কোনো মুসলিম সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়নি। গণতন্ত্র, মানবাধিকার, নারী অধিকার ইত্যাদি বিষয়েও মুসলমানদের অবস্থান অস্পষ্ট এবং তাদের শিক্ষাব্যবস্থা এখানো বিশ্বের উপযোগী করে গড়ে তোলা হয়নি।
০২. এছাড়াও অধিকাংশ মুসলমানের যাপিত জীবনপদ্ধতি দাওয়াত ও তাবলীগের প্রয়াসকে নিষ্ফল করে দেয়। পশ্চিমা দেশে বসবাসকারী অনেক মুসলমান বিশেষ করে অশিক্ষিত শ্রেণী ইসলামের আকীদা-বিশ্বাস উপস্থাপন করার যোগ্যতা রাখে না। ফলে তারা নিম্নশ্রেণীর জীবন-যাপন করে। নিজ দেশের সংস্কৃতি, খাদ্য, লেবাস-পোশাক, গান-বাদ্য, সামাজিক প্রথা-প্রচলন এবং ভাষা সংরক্ষণের জন্য তারা তাদের জাতীয় পরিকল্পনা ও রসম-রেওয়াজের সমষ্টিকেই ইসলাম হিসেবে উপস্থাপন করে।
এর থেকেও বেশি সেসব প্রবাসীর আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হয় তাদের পৈতৃক দেশ, যেখানে তারা অতি দ্রুত ফিরে যেতে চায়। জার্মানীতে বসবাসরত একজন তুর্কী নাগরিক তুরস্কে ইসলামী জাগরণের প্রত্যাশা করে। নিঃসন্দেহে অতিথি দেশে দাওয়াতের কাজের জন্য বেশি কিছু করার থাকে না। আবার যেসব লোক পশ্চিমা দেশে ইসলামের প্রচারের জন্য প্রয়াস চালাচ্ছে, তারা ইসলামকে এমনভাবে বেঢঙ্গা ও নিরসভাবে উপস্থাপন করছে যে, আত্মিক ও মানসিক অস্থিরতার শিকার পশ্চিমের লোকেরা তাতে কোন আত্মিক ঠিকানা খুঁজে পাচ্ছে না।
ইসলাম উপস্থাপন করার ক্ষেত্রে তারা ইসলামের আত্মিক ও অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্য থেকে বাহ্যিক দিকটা বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। অধিকাংশ শাখা-প্রশাখা গত মাসায়েলকে মৌলিক ও কেন্দ্রীয় আখ্যা দিয়ে তাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। এসব কারণের ভিত্তিতে অতিথি মুসলিমরা তাদের প্রতিবেশী পশ্চিমাদেরকে স্বীয় ধর্মের দিক দিয়ে প্রভাবিত করতে পারছে না।
০৩. এছাড়াও আরেকটি বড় কারণ যা ইসলামের বিজয়ের পথে বাঁধা সৃষ্টি করছে তা হলো, মানুষ খুব সহজেই বাস্তবতা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবার যোগ্যতা রাখে। একজন রোগী নিজেকে রোগী মনে করার পাশাপাশি তাকে ট্যাবলেটও খেতে হবে। ট্যাবলেট না খেলে তো রোগ ভাল হবে না। এর বিকল্প কোনো কিছু হতে পারে না। তদ্রূপ পাশ্চাত্য হলো রোগী। তাকে রোগ স্বীকার করে তা প্রতিকারের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এছাড়া তার রোগমুক্তির কোনো রাস্তা নেই। জার্মানীর এক সাবেক প্রেসিডেন্টের বক্তব্য, 'আমাদের সমস্যা জানা নয়, বরং জেনে তা প্রতিকারের ব্যবস্থা করা।'
পবিত্র কুরআনে সেসব জাতিগোষ্ঠীর ইতিহাস বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে, যারা তাদের কাছে প্রেরিত কিতাব পড়তে অস্বীকার করেছিল এবং ঐশী সতর্কবাণীর প্রতি কোনো গুরুত্ব দিয়েছিল না। পরিশেষে তাদের শোচনীয় পরিণতি ভোগ করতে হয়েছে। তদ্রূপ পাশ্চাত্যও আজ সে পথে ধাবমান। পাশ্চাত্যের আজ অনিবার্য পতন শুরু হয়ে গেছে। পতনের বেলাভূমিতে দাঁড়িয়ে আছে পাশ্চাত্য সভ্যতা। পাশ্চাত্যকে যদি পতনের হাত থেকে রক্ষা পেতে হয়, তাহলে তাকে নতুনভাবে আল্লাহর অস্তিত্ব এবং ঐশী ফরমানের স্বীকৃতি দিতে হবে। আল্লাহকে এক বলে মানতে হবে, মুহাম্মদ (সা.)-কে সর্বশেষ নবী হিসেবে গ্রহণ করতে হবে, কুরআনকে সর্বশেষ কিতাব হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে এবং মুহাম্মদ (সা.)-এর আনীত সর্বশেষ ধর্ম ইসলাম অনুযায়ী জীবন যাপন করতে হবে।
তাই তো দেখা যাচ্ছে, পাশ্চাত্যে আজ ইসলাম গ্রহণের হিড়িক পড়ে গেছে। অশান্ত ঘর্মক্লান্ত মানুষগুলো দলে দলে ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় নিচ্ছে। এক জরিপ অনুযায়ী বর্তমানে আমেরিকায় বসবাসরত মুসলমানদের মধ্যে চল্লিশ শতাংশ নও মুসলিম। কেউ অধ্যয়ন করে ইসলাম গ্রহণ করেছে। কেউ বৈবাহিক সূত্রের কারণে মুসলমান হয়েছে। বিপুল একটি অংশ খৃস্টবাদের বৈপরীত্য, স্ববিরোধিতা এবং প্রকৃতিবিরোধী হওয়ার কারণে ইসলাম গ্রহণ করেছে।
ইউ.এস.এ টুডে পত্রিকা ইসলাম গ্রহণের এই হিড়িককে এমন একটি তুফান হিসেবে আখ্যায়িত করেছে, যে তুফান মার্কিনীদের মন মস্তিষ্কে একটি সার্বজনীন বিশ্বজনীন ধর্মে দ্রুত অন্তর্ভুক্ত হওয়ার উত্তাল তরঙ্গ সৃষ্টি করে দিয়েছে, কিন্তু পশ্চিমা জগতে ইসলাম কোনো আন্দোলন কিংবা প্রোপাগান্ডার মাধ্যমে প্রসরিত হয়নি; বরং একটি গণ আহবানের মাধ্যমে প্রসারিত হয়েছে। ইহুদী ও খৃস্টান সংগঠনগুলো এই আহবানে ভীত-সন্ত্রস্ত এবং এর প্রসারিত প্রভাব-প্রতিক্রিয়ারও স্বীকৃতি দিয়েছে।
এই আহবান একটি অক্ষমতার ফসল, যা নিজেই রাস্তা বের করে নিয়েছে। পাশ্চাত্য বর্তমান যে চারিত্রিক ও নৈতিক অধঃপতনের শিকার, তার সমাধান করতে সে ঘর্মক্লান্ত হয়ে পড়েছে। উপসাগরীয় যুদ্ধের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট এক বক্তৃতায় বলেছিলেন, 'যদিও এই যুদ্ধে আমরা বিজয় লাভ করেছি, কিন্তু মাদকতা নির্মূলের যুদ্ধে আমরা পরাজিত হয়েছি। আরো ব্যাপক শব্দে আমরা জীবনের অন্যান্য সকল ময়দানে পরাজিত হয়েছি। তথাপি মার্কিন জনগণ এই যুদ্ধে বিজয়ী হতে যে সহযোগিতা দিয়েছে তা স্বীকার না করলে বড় বিশ্বাসঘাতকতা হবে।'
বাস্তবতা হলো, শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই নয়; বরং পাশ্চাত্যের সকল দেশে বসবাসরত মুসলমানরা জাতি হিসেবে মাদকতা থেকে বেঁচে থাকে এবং হালাল-হারামের মধ্যে পার্থক্য ঠিক রাখার চেষ্টা করে। এ কারণেই ইউরোপ আমেরিকার বাজারে প্রতিটি স্থানে হালাল-হারামের পৃথক পৃথক তালিকা লটকানো দেখতে পাওয়া যায়।
পশ্চিমা দেশে বসবাসরত মুসলমানদের একটি উজ্জ্বল দিক হলো, তারা প্রবৃত্তির চাহিদা, নির্লজ্জতা ও অশ্লীলতা থেকে বেঁচে থাকে। মার্কিন সমাজে যৌনতা, নগ্নতা ও অশ্লীলতার এমন অন্ধ তুফান বয়ে চলেছে যে, এক মার্কিন চিন্তাবিদ নির্লজ্জভাবে তার একটি গ্রন্থের নাম রেখেছেন 'কনডম নেশন'।
১৯৯৫ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পক্ষ থেকে একটি আন্তর্জতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সম্মেলনে গর্ভ বিনষ্টকরণকে আইনী মর্যাদা দেয়ার পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছিল, কিন্তু মার্কিন ক্রিশ্চিয়ান এসোসিয়েশন কাঠোরভাবে তার প্রতিবাদ করে। আর আরব বিশ্ব ও পাকিস্তান সম্ভবত আমেরিকার ভয়ে কিংবা মৌলবাদের অপবাদ থেকে বাঁচার জন্য নিরবতা অবলম্বন করে। পরিণামে সম্মেলন তার অবস্থান পরিবর্তন করে এই সুপারিশ করতে বাধ্য হয়, সম্মেলন যদি চায় তাহলে গর্ভ বিনষ্টকরণকে আইনী মর্যাদা দিতে পারে। মার্কিন জনগণ সেখানে চলমান অশ্লীলতা, নির্লজ্জতা, বেহায়াপনা, বেলেল্লাপনা থেকে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে।
তাদের এই অতিষ্ঠতার কথা বিভিন্ন সময়ে তাদের পত্র-পত্রিকা ও সংবাদপত্রের মাধ্যমে প্রকাশ করতে দেখা যায়। অনুভূতিসম্পন্ন সচেতন মার্কিন জনগণ আজ ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে। ইসলামিক সেন্টারগুলোতে নও মুসলিমদের ব্যাপকহারে আনাগোনা দেখা যায়। অনেক সময় এমন নওজোয়ান ছেলে মেয়েদেরও ইসলামিক সেন্টারগুলোতে দেখা যায়, যাদের উদ্দেশ্য ইসলাম ও ইসলামী যিন্দেগী সম্পর্কে গবেষণাপূর্ণ অধ্যয়ন করা। এসব লোক জামাআতে নামায দ্বারা খুব প্রভাবিত হয়। অনেকে মার্কিন নও মুসলিম তার আচরণ ও কর্মের মাধ্যমে খুব দ্রুত জাতীয় হিরোতে পরিণত হয়ে যায়। যেমন বক্সিং জগতের হিরো মুহাম্মদ আলী ক্লে, হাকীম আলী জেওয়ান, মাইক টাইসন আবদুল আজীজ এবং বৃটিশ পপস্টার ইউসুফ। ইসলাম প্রমুখ।
ইহুদী মেধা-মস্তিষ্ক এবং খৃস্টানদের আসবাব-উপকরণের ফলে বিশ্ব পরিম লে মানব সমাজ যে অসাধারণ ভয়াবহ ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে এবং যেভাবে শয়তানী শক্তি মিডিয়াকে তারা মুখপাত্র বানিয়ে নিয়েছে, তার সুদূরপ্রসারী সঙ্গীন প্রভাব-প্রতিক্রিয়া কল্পনা করলেও শরীরের লোম শিউরে ওঠে। একজন মুসলমানের চোখের ঘুম উড়ে যায়। সে 'জলে স্থলে যে বিপর্যয় সৃষ্টি হয় তা তোমাদের কর্মফল' আল্লাহর বাণীর দৃশ্য দেখে অস্থির হয়ে পড়ে, কিন্তু এর সাথে আবার তারা এ কথাও স্বীকার করে, আল্লাহ তাআলা তাঁর আরহামুর রাহিমীন গুণের কারণেই আজো সবাইকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। নতুবা ইবলিসী শক্তি পৃথিবীর বুকে এমন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে যে, পাহাড়ও স্বীয় জায়গা থেকে হটে যেতে বাধ্য।
সাম্রাজ্যবাদী শক্তি উপমহাদেশের মুসলমানদের নিঃশেষ নির্মূল করার জন্য একশ' বছরের বেশি সময় ধরে তার সকল শক্তি ও উপকরণ প্রয়োগ করেছে। হাজার হাজার ওলামায়ে কেরাম ও মুসলিম যুবককে ফাঁসি কাষ্ঠে ঝুলিয়েছে। পরিকল্পিত মুসলিম হত্যাযজ্ঞ ঘটিয়েছে। মানুষ হত্যার পাশাপাশি মুসলমানদের শিক্ষাকেও হত্যা করেছে। অবশেষে মুসলমানরা এর বিরুদ্ধে জেগে উঠেছে এবং গণবিপ্লবের মাধ্যমে উপমহাদেশ থেকে তাদের বিতাড়িত করেছে। তারা এ দেশ থেকে চলে গেছে ঠিক, কিন্তু উপমহাদেশের মানষদের মগজ ধোলাই করে মানসিকভাবে তাদের গোলাম বানিয়ে রেখে গেছে। তারা সশরীরে চলে গেলেও রেখে গেছে তাদের সভ্যতা-সংস্কৃতি, কৃষ্টি- কালচার। উপমহাদেশের মুসলমানরা ভৌগোলিকভাবে স্বাধীন হলেও মানসিক ও চিন্ত াগতভাবে স্বাধীন হতে পারেনি। তাই দেখা যায়, সাম্রাজ্যবাদী শক্তি চলে যাওয়ার পর যারাই এদেশে ক্ষমতাসীন হয়েছে তারাই বৃটিশদের কর্মসূচী মুসলিম হত্যা, মুসলিম শিক্ষা হত্যার ধারা চালু রেখেছে।
বিশ্ব পরিমণ্ডলে আজ সাম্রাজ্যবাদী শক্তি মুসলমানদের গণহত্যা, তাদের সভ্যতা- সংস্কৃতি, মানসিক, চিন্তাগত ও অর্থনৈতিকভাবে ধর্মান্তরের জন্য তাদের সকল শক্তি, উপকরণ ও মাধ্যম কাজে লাগাচ্ছে। একই পদ্ধতিতে দেশে দেশে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির দোসর ক্ষমতাসীন মুসলিম শাসকরাও তাদের প্রভুদের আদলে মুসলমানদের ইসলামী স্বাতন্ত্র্য ও বৈশিষ্ট্য থেকে বঞ্চিত করার প্রাণান্তকর প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে। যেখানেই ইসলামের আলো উদ্ভাসিত হতে দেখা যায় সেখানেই সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ও তাদের দেশীয় দালাল গোষ্ঠী ইসলামের আলো নির্বাপিত করার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ে। তারা তাদের সকল শক্তি প্রয়োগ করে।
মুসলমানদের বাহ্যিকভাবে কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। একদিকে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির নির্যাতন-অত্যাচার, অপরদিকে তাদের দেশীয় দালালদের নির্যাতনের স্টীম রোলার। মুসলমানদের জীবন আকাশের ঈষাণ কোণে কালো মেঘের ঘনঘটা। চারদিকে শুধুই অন্ধকার। আফগানিস্তান, চেচনিয়া, বসনিয়া, কাশ্মীর, আরাকান, ফিলিস্তীন, ফিলিপাইন এবং ইরাকের জনগণের ওপর শুধু এ জন্যই পাশবিক বর্বর নির্যাতন করা হচ্ছে যে, তারা মুসলমান। তাদের অপরাধ কেবলই তারা মুসলমান, কিন্তু নির্যাতন- নিপীড়নের তলদেশ দিয়েই রচিত হয় মুক্তির রাজপথ। আল্লাহ তাআলা সমহিমায় আবির্ভূত হন। ঘন অন্ধকারের মধ্যেও আল্লাহ তাআলা আশার আলো দেখান। আঁধার থেকে আলোর পথে নিয়ে যান।
গাঢ় তমসা আর উত্তাল হাওয়ার মধ্যেও আল্লাহ তাআলা ঈমানের আলো প্রজ্বলিত করেন। আল্লাহ তাআলা তাঁর আলো পূর্ণ করেই ছাড়বেন, যদিও কাফিররা তা অপছন্দ করে। এরকম হাজার হাজার দৃষ্টান্তের মাত্র কিছু দৃষ্টান্ত নিম্নে তুলে ধরা হলো-এটা প্রমাণ করার জন্য যে, নির্যাতন-নিপীড়নের তলদেশ দিয়েই রচিত হয় মুক্তির রাজপথ, প্রত্যেক কারবালার পরই যিন্দা হয় ইসলাম এবং প্রত্যেক তাতারী আগ্রাসনের পরই কাবার নতুন প্রহরী মিলে যায়।
০১. আমেরিকার এক শহরে বিদেশ থেকে একটি তাবলিগী জামাআত গিয়েছিল। এয়ারপোর্টের কাজ শেষ করে দু'টি কারে করে জামাআতের লোকজন মারকাযের উদ্দেশে রওয়ানা হন। একটি কার আগে আর একটি কার পেছনে। পেছনের কার রাস্তা হারিয়ে ফেলে। এদিকে মাগরিবের নামাযের সময়ও একেবারে সংকীর্ণ হয়ে গেছে। তাই পেছনের কারের সাথীরা এক ময়দানে গাড়ি থামিয়ে জামাআতের সাথে নামায আদায় করতে লাগলেন। পাশেই কিছু মার্কিন নওজোয়ান খেলাধুলা করছিল। তারা খেলাধুলা ছেড়ে তাবলীগের সাথীদের নামাযের আশ্চর্য অভিনব অবস্থা দেখতে লাগল। নামায শেষ হলে নওজোয়ানরা জিজ্ঞেস করল, আপনারা কি করছিলেন? তাবলীগের সাথীরা তাদের প্রশ্নের জবাবে সাধামাটা ভাষায় ইসলামের কিছু পরিচিতি তুলে ধরেন। পনের বিশ মিনিটের আলোচনার পর তিন নওজোয়ান ইসলাম গ্রহণে আগ্রহ প্রকাশ করল। নিকস্থ হোটেলে গিয়ে তারা গোসল করে কাপড়-চোপড় পরিবর্তন করে ইসলাম গ্রহণ করে। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই আগের কারটি তাদের তালাশে এখানে এসে পৌঁছে। এভাবে তাবলীগের এই কাফেলা তিনজন নও মুসলিমসহ মারকাযে পৌঁছে।
০২. কানাডার মনট্রিল শহরের ২৫ বছরের এক যুবতী পাদরী, যে খৃস্টবাদের প্রচার-প্রসারকেই তার জীবনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য বানিয়ে নিয়েছিল। খৃস্টবাদের দাওয়াত দেয়ার উদ্দেশে সে এক আরব যুবকের বাড়ীতে যায়। আরব যুবক তার সাথে কথা বলার জন্য কিছুক্ষণ সময় প্রার্থনা করেন। অতঃপর তিনি ভালভাবে ওযু করে খোশবু লাগিয়ে কুরআন পাকের তিলাওয়াত শুরু করেন। খৃস্টান যুবতী তার এই পুরা কর্মকান্ড নোট করে। ওযু ও খোশবু লাগানোর গুরুত্ব এবং কুরআন তিলাওয়াতের সময়ের অবস্থাটা সে খুব ভালভাবে অনুধাবন করে।
তিলাওয়াতের সময় যুবকের চোখ দিয়ে প্রবাহিত অশ্রুধারা, করুণ সুর এবং আবেগমাখা শব্দাবলী শুনে খৃস্টান যুবতীর মনে হলো, সে কোনো নতুন জগতে প্রবেশ করেছে এবং তার সামনে ফিরিশতা আসমানী কালাম শোনাচ্ছেন। খৃস্টান যুবতী আরব যুবকের রূহানী পরিবেশে খুবই প্রভাবিত হয়। যুবকের তিলাওয়াত শেষ হলে খৃস্টান যুবতী যে আরব যুবককে শিকার করতে এসেছিল, সে নিজেই আরব যুবক তথা ইসলামের শিকার হয়ে সাথে সাথে ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় নিল।
০৩. লন্ডনের এক যুবতী ডাষ্টবিনে একখানা ছেঁড়া কাগজের টুকরো পায়। তাতে কুরআনের কিছু আয়াত ও তার অর্থ লেখা ছিল। যুবতী আয়াতগুলোর অর্থ পড়ে যথেষ্ট প্রভাবিত হয়। অতঃপর সে অনুসন্ধান শুরু করল, এগুলো কিসের অর্থ। অনেক অনুসন্ধানের পর জানা গেল, এগুলো কুরআনের আয়াত। এ ঘটনার পরের দিনই সে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নেয়।
০৪. পাপাচার আর অপরাধের পচা কর্দম স্তূপে আবদ্ধ প্যারিসের এক নৃত্যশিল্পীর প্যারিসের রাজপথে এক আরব নারীর সাথে সাক্ষাত হয়। বোরকা পরিহিতা আরব নারীকে দেখে নৃত্যশিল্পী প্রশ্ন করে, আপনাকে তো পবিত্র মারইয়ামের রূহ মনে হচ্ছে। আপনি কে? আরব নারী বললেন, আমি একজন মুসলমান। ইসলামই আমাকে এই লেবাস দান করেছে। একজন মুসলিম নারী- যিনি ইসলাম অনুযায়ী স্বীয় জীবন ঢেলে সাজিয়েছেন, তিনি একজন সর্বগুণে গুণান্বিত মহান ব্যক্তিত্বের অধিকারী হন। তিনি রূপ-লাবণ্য ও সৌন্দর্যের সবচে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান লজ্জা-শরম ও সতীত্বের মূর্ত প্রতীক হন। লজ্জার চাদরে আচ্ছাদিত থাকেন। পবিত্রতা ও সতীত্ব তাঁর সৌন্দর্যকে আরো মহিমান্বিত করে তোলে। তাঁর আঁচলে কোনো কালিমা নেই। কুদুষ্টি তাঁর প্রতি নিবদ্ধ হতে পারে না। তিনি তাঁর খোদা প্রদত্ত সৌন্দর্যের প্রতি সীমাহীন খুশি। এই সৌন্দর্যের তিনি যথাযথ মূল্যায়ন করেন। তা খোলা বাজারে ফেরি করে বেড়ান না। নাপাক নিকৃষ্ট কোনো পুরুষকে তিনি ধারে কাছেও ভিড়তে দেন না। তাঁর আবৃত শরীর বাজারের কোনো সওদা নয় যে, তা যে কোনো ব্যক্তি ক্রয় করতে পারে। আবার তিনি লজ্জা শরমের আবরণে এমন ভুলাভালা সহজ-সরলও নন যে, যে কেউ তাঁকে ধোকা দিতে পারে। তিনি আত্মসম্মান, আত্মমর্যাদাবোধ ও আত্মবিশ্বাসের মূর্ত প্রতীক হন। বড় থেকে বড় প্রবঞ্চক ধোকাবাজও তাঁকে ধোকা দিতে পারে না। প্রেম-ভালবাসার মায়াবী হাতছানি তাঁকে শিকার করতে পারে না।
মুখরোচক মিষ্টি কথা তাঁকে শীশমহলের অভিযাত্রী করতে পারে না। আরব নারীর এ হৃদয়গ্রাহী কথাগুলো শুনে তাঁর নিষ্পাপ, হৃদয়গ্রাহী পবিত্র লেবাস দেখে প্যারিসের অর্ধনগ্ন নৃত্যশিল্পী অত্যন্ত প্রভাবিত হয়। তার বিবেকের বদ্ধ দুয়ার খুলে যায়। চোখে তার অশ্রু আসে। সে অবচেতনভাবে আরব নারীর পেছন পেছন চলতে শুরু করে। এক পর্যায়ে আরব নারীর অবস্থানস্থলে গিয়ে এই বলে চিৎকার করে কান্না শুরু করে, আপনারা কত পবিত্র, কত নিষ্পাপ। আপনাদের ধর্ম আপনাদের কত সম্মান দিয়েছে। আর আমাদের সমাজের নারীরা সীমাহীন লাঞ্ছিত, বঞ্চিত, অপদস্থ। আমাদের সমাজের মানুষগুলো অবলা নারীর ওপর অকথ্য নির্যাতন চালিয়ে তাকে প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে।
এক শ্রেণীর হিংস্র যৌনপুজারী পুরুষ নারীদের নিজেদের যৌন ভোগ-সম্ভোগ, অবৈধ চিত্তবিনোদন, মনোরঞ্জন ও আমোদ-প্রমোদের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছে। তারা মানবিক চেতনা, উঁচু মূল্যবোধ এবং সুক্ষ্ম আত্মিক অনুভূতিকে পদদলিত করে নিজেদের দগ্ধ পিপাসা নিবারণ করতে চায়। তারা আইন প্রণয়ন করে নারীর লজ্জা-শরম, ইজ্জত-আব্রু, যা নারীর সবচে নিরাপদ রক্ষাকবচ, উত্তম অলংকার এবং তার সৌন্দর্য ও রূপ-লাবণ্যের সূক্ষ্ম প্রকাশ-সেগুলো তারা মূল্যহীন করে দিয়েছে। মিশিয়ে দিয়েছে ধুলোয়।
আমাদের নারীদের ইজ্জত সম্মান বলতে কিছু নেই। আমাদের সমাজের নারীরা কেবলই পুরুষের ভোগ-সম্ভোগের বস্তু। নৃত্যশিল্পী এই কথাগুলো বলে সাথে সাথে আরব নারীর হাতে ইসলামের দীক্ষা গ্রহণ করেন এবং সেখান থেকেই সোজা বায়তুল্লাহ শরীফে চলে যান। বাকী জীবন তিনি মক্কাতেই কাটিয়ে দেন।
০৫. প্যারিসের খ্যাতিমান এক ডাক্তার। আলজেরিয়ার এক সম্মানিতা নারী চিকিৎসা নেবার জন্য প্যারিসে তার নিকট যান। মহিলার সারা শরীর ক্ষত-বিক্ষত চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে আছে, কিন্তু ডাক্তার তাকে রোগের বিবরণ জিজ্ঞেস করলে তিনি প্রতিটি কথায় অত্যন্ত খুশি ও প্রশান্তির সাথে আলহামদু লিল্লাহ বলেন। প্রতিবার আলহামদু লিল্লাহ বলার সাথে সাথেই তার চেহারায় এক ধরনের আলো ঝলসে ওঠত। সীমাহীন কষ্ট সত্ত্বেও তিনি হায়-হুতাশ ও নিরাশা প্রকাশ করেন না। ডাক্তার রোগিনীকে ভালভাবে পর্যবেক্ষণ করে দেখেন, সীমাহীন কষ্ট সত্ত্বেও তার দৃঢ়তায় সামান্যতম পদস্খলন ঘটেনি। পাহাড়ের চেয়েও তিনি বেশি অবিচল। ডাক্তার আরো দেখেন, সীমাহীন কষ্ট সত্ত্বেও এই বৃদ্ধা ইশারা-ইঙ্গিতে হাত বাঁধছেন আর ঠোঁট নাড়িয়ে কি যেন পড়ছেন। মহিলার এই অবস্থা দেখে ডাক্তার বিরাট প্রভাবিত হন। তিনি মহিলাকে তার আত্মিক প্রশান্তি, দৃঢ়তা ও অবিচলতার কারণ এবং আলহামদু লিল্লাহ'র অর্থ জিজ্ঞেস করেন। বৃদ্ধার উত্তর শুনে ডাক্তার দ্বিতীয় দিনই মুসলমান হয়ে যান।
০৬. আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পত্রিকা নিউইয়র্ক টাইমসের এক ক্যামেরাম্যান, যিনি মার্কিনীদের জাতীয় নেতা জর্জ ওয়াশিংটনের প্রোপৌত্র। মিডিয়ার অব্যাহত প্রোপাগান্ডায় মুসলমান বিশেষ করে আরবদের বিরুদ্ধে ঘৃণা বিদ্বেষ তার মন মস্তিষ্কে স্থায়ী আসন গেড়ে নিয়েছিল। তিনি একবার পেশাগত কারণে বাধ্য হয়ে লেবানন ও আফগানিস্তানে যান, যাতে সেখানে চলমান যুদ্ধের চিত্র মিডিয়াকে সরবরাহ করতে পারেন। সেখানে অনেক মুসলমানের সাথে তার সাক্ষাত হয়। মুসলমানদের প্রকৃত আচার-আচরণ অতি কাছে থেকে দেখে তার বিবেকের বদ্ধ দুয়ার খুলে যায়। মস্তিষ্কে গেঁথে থাকা তার পূর্বের কল্পনা সম্পূর্ণ চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে পড়ে। পশ্চিমা প্রোপাগান্ডার মুখোশ তার দৃষ্টির সামনে উম্মোচিত হয়।
এ ক্যামেরাম্যান আফগানিস্তান থেকে বসনিয়া যান। সেখানে দেখতে পান, জাতিসংঘের পতাকা তলে মার্কিন চৌধুরী সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে মুসলমানদের ওপর জুলুম-নির্যাতনের স্টীম রোলার চালিয়ে যাচ্ছে। মুসলমানদের রক্তে হোলিখেলা খেলছে। অসহায় অবলা মুসলিম নারীদের ইজ্জত-সম্ভ্রম ধুলোয় মিশিয়ে দিচ্ছে। এই ভয়াবহ দৃশ্য দেখে খৃস্টবাদের প্রতি তার ঘৃণা জন্মে। তিনি বাচ্চাদের মতো হাউ মাউ করে কেঁদে ওঠেন। নিজের কাছে প্রশ্ন করেন, শুধু মুসলমান হওয়ার অপরাধে আজ এই নিরস্ত্র মানুষগুলোর ওপর জুলুম করছে? তিনি যুদ্ধে নিহত একজন মুসলমান বন্ধুর দাফনের জন্য গেলেন।
সেখানে তার দাফন-কাফনে শরীক হওয়ার জন্য আসা বিভিন্ন দেশের মুসলমানদেরও দেখতে পান। তারা শুধু ইসলামী ভ্রাতৃত্বের বন্ধনের কারণেই এখানে এসেছেন। ক্যামেরাম্যান এই দৃশ্য দেখে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন এবং অবচেতনভাবে একথা বলতে বাধ্য হন, ইসলামই একমাত্র ধর্ম যা দুনিয়ার সকল সমস্যা-সংকটের সমাধান করতে পারে। এরপর তিনি কালেমা পড়ে ইসলামের শান্তির ছায়াতলে আশ্রয় নেন।
০৭. রাশিয়ান এক যুবক ইসলামের টানে স্ত্রী-পুত্র, পরিবার-পরিজন সব কিছু ত্যাগ করেন। বাকী জীবন ইসলামের প্রচার-প্রসারকেই জীবনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য বানিয়ে নেন। ইসলাম প্রচারের জন্য রাশিয়া থেকে চলে যান জাপান। সেখানে শিল্পপতিদের ইসলামের শান্তির ছায়াতলে আনার জন্য তিনি নিজেকে উৎসর্গ করে দেন। তার কাজ হলো, যার সাথেই দেখা হয় তাকেই কয়েকবার ইসলামের কালেমা উচ্চারণ করার জন্য বলেন এবং তার একটি ইসলামী নাম রেখে দেন, কিন্তু কাউকে তিনি প্রকাশ্যে ইসলাম গ্রহণ করার কথা বলেন না। এটাই তার সারাদিনের কাজ। তিনি শুধু বলেন, জাপানীরা অনেক ভাল জাতি। আমি যেভাবে একথাগুলো বলছি, আপনিও সেভাবে বলুন। সে বাক্যগুলোর মর্মার্থ বুঝা ছাড়াই তার সাথে সাথে উচ্চারণ করতে থাকে। তার তো জানা নেই, এই বাক্যগুলো কত আলোকিত, কিন্তু কি আশ্চর্য! কিছু দিন পরেই আল্লাহর মহিমায় কালেমা তাইয়্যিবার নূর পাঠকারী অন্তররাজ্যকে আলোকিত করে তোলে এবং সে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নেয়।
একবার টোকিও ইউনিভার্সিটির এক প্রফেসর তার কাছে ইসলাম সম্পর্কে জানতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত তিনি মুসলমান হয়ে ফিরে আসেন। দ্বিতীয় দিন তিনি রাশিয়ান যুবককে তার ইউনিভার্সিটিতে ইসলামের ওপর লেকচার দেয়ার জন্য আহবান জানান। সেখানে পনের জন প্রফেসর উপস্থিত ছিলেন। রাশিয়ান যুবক তাদের বলেন, এই কথাগুলো আমি যেভাবে বলব, আপনারাও সেভাবে বলবেন। এভাবে যুবক প্রফেসরগণকে কয়েকবার কালেমাটি উচ্চারণ করান। এরপর তাদের সবার একটা করে ইসলামী নাম রেখে দেন। ব্যস, তার লেকচার শেষ। কি আশ্চর্য! কিছুদিন পর প্রফেসরদের সবাই ইসলাম গ্রহণ করেন। এটা ছিল তার একদিনের সাফল্য।
০৮. জাপানের রাজপরিবারের একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি সৈন্য-সামন্ত নিয়ে বিনোদনের উদ্দেশে টোকিও'র বাইরে রাজপথ দিয়ে যাচ্ছিলেন। এ রাজ কাফেলা পথিমধ্যে একটি মনোরম স্বচ্ছ ঝরণার নিকট কিছুক্ষণের জন্য যাত্রা বিরতি করে। সেখানে তারা দেখে, সাদা কাপড় পরিহিত কিছু লোক ওঠ-বস করছে। তাদের চেহারায় বিস্ময়কর আলো চমকাচ্ছে। একজন সবার আগে আর বাকীরা পেছনে সারিবদ্ধ হয়ে তার অনুসরণ করছে। তাদের জন্য এটা আজব অভিনব দৃশ্য ছিল। এঁরা ছিলেন তাবলীগ জামাআতের লোকজন।
নামাযের সময় হয়ে গেছে, তাই রাস্তার পাশেই দাঁড়িয়ে গেছেন। দোভাষীর মাধ্যমে উভয় কাফেলার মধ্যে কথাবর্তা হয়। তাবলীগী ভাইদের সহজ সরল নিষ্ঠাপূর্ণ কথা ও দাওয়াতের যাদু রাজ কাফেলাকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। পরে এ রাজ-কাফেলার সবাই ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নেয়। জাপানীদের অধিকাংশই বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী। ১৯৯৭ সালের এক রিপোর্ট অনুযায়ী প্রত্যহ একশ' জাপানী ইসলাম গ্রহণ করে। টোকিও'র ইসলামিক সেন্টার সেখানে একটি ইসলামী ইউনিভার্সিটি স্থাপন করার পরিকল্পনা তৈরি করছে।
০৯. ডেনিয়েল টিস এবং ক্যারেটস দু'ভাই কোটিপতি খান্দানের আদরের দুলাল। একজনের বয়স ১২ বছর আর অপরজনের বয়স ১৩ বছর, কিন্তু এত অল্প বয়সেই তারা অপরাধ জগতের রাজপুত্র হয়ে ওঠে। কোটিপতি পিতা-মাতা তাদের সঠিক পথে আনার জন্য লক্ষ লক্ষ ডলার তাদের পেছনে ব্যয় করেছিলেন। তারা মনস্তত্ত্ব বিশেষজ্ঞ, শিক্ষাবিদ এবং শীর্ষস্থানীয় খৃস্টান ধর্ম প্রচারকদের পর্যন্ত সাহায্য নিয়েছিলেন তাদের অপরাধ জগত থেকে ফিরিয়ে আনার জন্য, কিন্তু কোনো প্রচেষ্টাই ফলপ্রসু হয়নি। কোনো এক ব্যক্তি তাদের এক ইসলামী মাদরাসায় ভর্তি করার পরামর্শ দেন। পিতা-মাতা তার পরামর্শ মতে ইসলামী মাদরাসায় ভর্তি করিয়ে দেন এবং তাদের সন্তানদের সমস্ত ঘটনা আদ্যোপান্ত মাদরাসার পরিচালক জনাব আবদুল বাকী সাহেবকে বলেন। সন্তানদের সঠিক পথে আনার জন্য পরিচালককে পঞ্চাশ হাজার ডলারও প্রদান করেন, কিন্তু অবদুল বাকী সাহেব এই ডলার ফিরিয়ে দিয়ে সন্তানদের মাদরাসায় রেখে দেন।
ভর্তির প্রথম দিনই মাদরাসার অন্যান্য ছেলেদের সাথে মারপিটের এগারটি ঘটনা সংঘটিত হয়। নিষেধ করা হলে তারা কারো নিষেধ মানতে অস্বীকার করে, কিন্তু আবদুল বাকী সাহেব নিরাশ হলেন না। তিনি মুহাব্বত-ভালবাসার এমন আচরণ করলেন, যাতে তৃতীয় দিনই তারা মোমের মত গলে গেল। চতুর্থ দিন অন্যান্য ছেলেদের সাথে নামাযে শরীক হতে লাগল। এক মাসে পাঁচ পারা কুরআন মুখস্থ করে ফেলে। এভাবে মাত্র এক মাসের ব্যবধানে কোটিপতির দুই সন্তান ভালো হয়ে গেল এবং পেছনের জগত থেকে সম্পূর্ণ তওবা করল।
এত অল্প দিনের মাথায় ছেলেদের এভাবে ভাল হয়ে যেতে দেখে কোটিপতির গোটা পরিবার এই বলে স্থায়ীভাবে ইসলামের শান্তির ছায়ায় আশ্রয় নিল, যে ধর্ম আমাদের সন্তানদের মানুষ বানিয়েছে আমরা সে ধর্ম গ্রহণ করব। আবদুল বাকী বলেন, মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে এমন ষোলটি খৃস্টান পরিবার ইসলামে আশ্রয় নিয়েছে, যাদের সন্তান ইসলাম গ্রহণ করেছে। জনাব আবদুল বাকী সাহেবের বর্ণনামতে আমেরিকায় প্রতিষ্ঠিত ইসলামী মাদরাসাগুলো দাওয়াতের ময়দানে অভাবনীয় সাফল্যের সাথে কাজ করে যাচ্ছে। সেসব মাদরাসয় পাঠরত ছাত্রদের অভিভাবকরা অত্যন্ত পরিষ্কার ভাষায় মার্কিন শিক্ষা ব্যবস্থার সমালোচনা করে বলেন, আমরা ইসলামী মাদরাসাগুলোকে মূল্যায়ন করি, যেখানে একজন মানুষকে নতুনভাবে ঢেলে সাজানো হয়।
এসব মাদরাসায় ছাত্রদের না যৌনতার শিক্ষা দেয়া হয় আর না মাদক ও অপরাধের শিক্ষা দেয়া হয়। আবদুল বাকী সাহেব আরো বলেন, মার্কিন সমাজে নৈতিক ও চারিত্রিক অধঃপতন ব্যাপক হওয়া সত্ত্বেও সেখানে এমন কিছু পরিবারও পাওয়া যায়, যারা মদ, নেশা ও যৌনতার ধারে কাছেও যায় না। যাদের অস্থির আত্মা স্বস্তি ও প্রশান্তির অন্বেষায় ব্যস্ত। টিভিতে আধ্যাত্মিক অনুষ্ঠানমালার অসাধারণ জনপ্রিয়তা পশ্চিমা সমাজের ইখলাস নিষ্ঠা পূর্বের তুলনায় আরো বেশি সুস্পষ্ট করে দিয়েছে। ইসলামের প্রতি ঘৃণা-বিদ্বেষ ও শত্রুতার বন্ধন এখন শিথিল হওয়া শুরু হয়ে গেছে। এখন খৃস্টানরা তাদের বিকৃত ধর্ম ও গির্জার দুর্বল পাকড়াও থেকে মুক্ত হয়ে ইসলামের খুব কাছাকাছি হতে শুরু করেছে। সেখানকার ইসলামী মাদরাসাগুলো, যা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল শুধু মুসলমান সন্তানদের দীনী শিক্ষা-দীক্ষার জন্য, সেগুলো আজ অমুসলিমদের মধ্যেও ইসলামের দাওয়াত প্রসারের মাধ্যমে পরিণত হচ্ছে।
১০. মিসরী নাগরিক ইঞ্জিনিয়ার মুহাম্মদ তাওফীকের দাওয়াতী তৎপরতা উল্লেখ করার মতো। তাঁর কাজ নিরবে ঘরে বসে হাজার মাইল দূরে মার্কিন জেলখানায় বন্দী অপরাধীদের ইসলামের ছায়াতলে নিয়ে আসার মিশন পরিচালনা করা। ইঞ্জিনিয়ার মুহাম্মদ তাওফীক শহীদ ইমাম হাসানুল বান্না (র.)-এর একজন খাছ শাগরেদ। তিনি উচ্চ শিক্ষার জন্য আমেরিকা যান। সেখানে গিয়ে দাওয়াতী কাজে লেগে পড়েন। মার্কিন সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের সাথে মেলামেশার পর তার অনুমাণ হয়, এসব মানুষ ইসলামের ঝরণা ধারার তালাশে অস্থির পেরেশান। হেরেমের দিকে তাদের নিয়ে যাবার কেউ নেই। দাওয়াতী মিশন নিয়ে তিনি মার্কিন বন্দীশালাগুলোতেও যান। সেখানে অল্প পরিশ্রমে বিশাল ফল লাভ করেন। পরে তিনি একটি নির্ধারিত পরিকল্পনার আওতায় এ কাজ শুরু করেন।
তিনি বলেন, 'আমি আমেরিকায় অবস্থানকালে বিভিন্ন জেলখানায় দাওয়াতের কাজ শুরু করে দিয়ে এসেছি। এর জন্য সেখানে একটি টিমও তৈরি করে রেখে এসেছি। তারা আমার নির্দেশনামতে কাজ করে। আমেরিকা থেকে মিসর ফেরার পর চিঠি-পত্রের মাধ্যমে তাদের সাথে আমার যোগাযোগ হয়। পত্রের মাধ্যমে বন্দীদের মস্তিষ্ক গঠনের কাজ চলে। দুই তিন মাসের মধ্যেই এসব বন্দী ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নেয়। যে নতুন ইসলাম গ্রহণ করে, সে অন্য নতুন বন্দীদের নাম, অপরাধ ও তার শাস্তি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পত্রের মাধ্যমে টিমের কাছে পাঠায় এবং সে নিজেও দাঈ'র ভূমিকা পালন করে। অধিকাংশ জেলখানার দায়িত্বশীলরা এ কাজে আমাদের টিমকে সাহায্য করে। বিশেষ করে যেসব বন্দী জেলখানার নিয়ম-কানুন মেনে চলে না, তাদের সম্পর্কে আমাদের টিমকে অবহিত করে।
টিম আমাকে জানায়। তখন আমি তাদের কাছে ব্যক্তিগতভাবে পত্র লেখি এবং ইসলামের পরিচয় তুলে ধরি। তারা কিতাব চাইলে কিতাব না দিয়ে পত্রের মাধ্যমেই তাদের মস্তিষ্ক গঠন চলতে থাকে। এক পর্যায়ে যখন তারা সুশৃংখল জীবনে ফিরে আসার কারণে জেল থেকে মুক্তি লাভ করে, তখন আমাদের টিম তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করে। ইঞ্জিনিয়ার সাহেব বলেন, এভাবে এ পর্যন্ত প্রায় দেড় লাখ লোক মুসলমান হয়েছে। এটা একমাত্র আল্লাহ তাআলার দয়া ও ইহসান। আমাদের গর্বের কিছু নেই। ইঞ্জিনিয়ার সাহেব কয়েক বছর পূর্বে ইন্তেকাল করেছেন। নির্ভরযোগ্য সূত্রমতে, ইঞ্জিনিয়ার সাহেবের মৃত্যুর পর্যন্ত মার্কিন জেলে ইসলাম গ্রহণকারীদরে সংখ্যা দুই লাখ উন্নীত হয়েছিল। এ ধারা এখনো অব্যাহত রয়েছে।
মার্কিন জেল সম্পর্কে এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, বিশ বছরের ভেতরে পাঁচ লাখ বন্দীর অবস্থায় পরিবর্তন আসার কারণে তাদের মুক্তি দেয়া হয়েছে এবং সম্মানজনক জীবন-যাপন করার জন্য তাদের আর্থিক সহায়তাও দেয়া হয়েছে। এই রিপোর্টে আরো বলা হয়েছে, বন্দীদের সংশোধনের জন্য মুসলিম আলেমদের চেষ্টা-প্রচেষ্টা উল্লেখ করার মতো। এজন্য কর্তৃপক্ষ তাদের সুযোগ-সুবিধা আরো বৃদ্ধির জন্য পরিকল্পনা করছে।
ভারতের অধিবাসী মাওলানা মুহাম্মদ আইয়ুব গত দশ বছর ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন জেলখানায় দাওয়াতী কাজ করছেন। ইতোমধ্যে মার্কিন সরকার তাকে ধর্মীয় মুবাল্লিগ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। প্রতিমাসে তার হাতে গড়ে চার পাঁচ জন বন্দী ইসলামে দীক্ষিত হচ্ছে।
ইঞ্জিনিয়ার তাওফীকের মতো আরো কত অখ্যাত মানুষ ফ্রান্স, বৃটেন ও অন্যান্য ইউরোপিয়ান দেশে কোনো প্রচার-প্রোপাগান্ডা ছাড়াই এ পবিত্র কর্ম আঞ্জাম দিয়ে যাচ্ছেন। ভারতেও একাজ চলছে, কিন্তু অত্যন্ত সীমিত পর্যায়ে।
১১. আপনি কেন ইসলাম গ্রহণ করতে চান। আপনি কোন দেশের বাসিন্দা। আপনার দীন-ধর্ম কি? আমার নাম মাইক। ফিলিপাইন আমার দেশ। খৃস্টবাদ আমার ধর্ম। আমার নাম রামচন্দ্র। আমি হিন্দু। ভারত আমার দেশ। আমার শিক্ষাগত যোগ্যতা এম.এ। এক বছর ধরে আমি সৌদি আরবে অবস্থান করছি। আপনাদের নামায আমার কাছে খুব ভালো লাগে। রমযানে আপনারা সবাই এক সাথে ইফতার করেন, নামায পড়েন, যা আমার কাছে খুব ভাল লাগে।
আমাদের কোম্পানীতে বারটি দেশের লোক কাজ করে। এখানে যত মুসলমান কাজ করে সবার ভাষা ও দেশ আলাদা আলাদা, কিন্তু যখন তারা এক সাথে ইফতার করে, নামায পড়ে তখন মনে হয় সবাই আপন ভাই। এটা আমার কাছে খুব ভাল লাগে, কিন্তু আমাদের ধর্মে এরকম পারস্পরিক মিলমিশ নেই। আমাদের মধ্যে সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব নেই। এ ধরনের প্রশ্ন উত্তর প্রতি সপ্তাহে জেদ্দা, কুয়েت, দুবাই ও রিয়াদের ইসলামিক সেন্টারে ইসলাম গ্রহণকারীদের মাঝে হয়ে থাকে। আপনি যদি ফজরের পর জেদ্দা রেডিও'র আরবী প্রোগ্রাম শুনেন তাহলে প্রতি সপ্তাহে কমপক্ষে আট দশ জন ইসলাম গ্রহণকারীদের সাক্ষাতকার শুনতে পারবেন।
যারা ইসলাম গ্রহণের আগ্রহ প্রকাশ করেন প্রথমে তাদের ইসলাম সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ধারণা দেয়া হয়। ইসলাম গ্রহণের পর ইসলামের মৌলিক কর্তব্যগুলো তাদের অবগত করানো হয় এবং সম্ভাব্য বিপদ-আপদ থেকেও সতর্ক করা হয়। যখন তারা ইসলাম সম্পর্কে সম্পূর্ণ প্রশান্তিআত্মতৃপ্তি লাভ করে, তখন তাদের আনুষ্ঠানিক কালেমা পড়িয়ে তাদের থেকে হলফনামায় স্বাক্ষর গ্রহণ করা হয় যে, তারা স্বেচ্ছায় ও সজ্ঞানে ইসলাম গ্রহণ করেছে।
এ ধরনের অসংখ্য ঘটনা সৌদি আরব, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং থাইল্যান্ডে সংঘটিত হচ্ছে। মালয়েশিয়ায় বসবাসরত চাইনিজ ও হিন্দুদের ইসলাম গ্রহণের হার অন্যান্য দেশের তুলনায় বেশি।
ইউরোপ-আমেরিকার সমাজে ইসলাম কিভাবে তার স্থান মজবুত করছে এবং কোন কোন মাধ্যমে সেখানে প্রবেশ করছে-এ সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে মার্কিন দৈনিক লস এঞ্জেলেস টাইমস তার সার্ভে রিপোর্টে লেখে, উত্তর আমেরিকায় দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্ম হিসেবে ইসলাম খুব দ্রুত প্রসার লাভ করছে। এ দৈনিকের রিপোর্ট অনুযায়ী আমেরিকায় মুসলমানের সংখ্যা আশি লাখের কাছাকাছি, কিন্তু পত্রিকাটির মতে, এই অনুমাণ সুনিশ্চিত নয়। পত্রিকার জরিপে যদিও মুসলমানের সংখ্যা পাঁচ লাখ বলা হয়েছে, কিন্তু সাথে সাথে একথাও বিশ্লেষণ করে দেয়া হয়েছে যে, এই সংখ্যা কেবল সেসব মুসলমানের যারা আমেরিকার মসজিদসমূহে নিয়মিত নামায আদায় করে। সার্ভেকারীরা আমেরিকার এক হাজার ছেচল্লিশটি মসজিদের দায়িত্বশীলদের কাছে জিজ্ঞেস করেছে, তাদের মসজিদে প্রত্যহ কতজন মুসল্লী নিয়মিত জামাআতে শরীক হয়। দায়িত্বশীলরা বলেন, এরকম নিয়মিত মুসল্লীর সংখ্যা ৪৬৫ জন।
উক্ত রিপোর্টেই বলা হয়ে, মুসলমানদের সামষ্টিক সংখ্যার দশ শতাংশ নিয়মিত মসজিদে নামায আদায় করে। সুতরাং মুসলমানদের সামষ্টিক সংখ্যা পাঁচ লাখ থেকে কম নয়, কিন্তু একথা থেকে এ ফল বের করা যুক্তিসঙ্গত নয় যে, আর বাকী নব্বই শতাংশ মুসলমান, যারা নিয়মিত মসজিদে যায় না, তারা নামায থেকে একেবারে বঞ্চিত। হতে পারে তাদের অনেকে ঘরে, অফিস-আদালতে কিংবা মহল্লার কোনো ছোটখাট স্থানে নামায আদায় করে নেয়। দৈনিকটি আরো লেখেছে, প্রতি বছর আমেরিকায় সোয়া লাখ নতুন মুসলমানের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়।
লন্ডনের প্রসিদ্ধ পত্রিকা লন্ডন টাইমস ১৯৯৩ সালের ৯ই নভেম্বর একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে, যার শিরোনাম ছিল-' পশ্চিমা মিডিয়ার বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাব সত্ত্বেও ইসলাম পশ্চিমাদের হৃদয় জয় করে নিচ্ছে'। উক্ত শিরোনামে বলা হয়েছে, যে বিপুল হারে বৃটিশ নাগরিকরা আজ ইসলাম গ্রহণ করছে, তার কোন নযীর অতীতে পাওয়া যায় না। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী বিশ বছরের মধ্যে বৃটিশ নও মুসলিমদের সংখ্যা সেসব মুসলমানদের তুলনায় বহুগুণে বেড়ে যাবে যারা অন্যান্য দেশ থেকে এসে বসতি স্থাপন করেছে। উক্ত রিপোর্টে আরো বলা হয়েছে, সেসব নও মুসলিমদের মধ্যে নারীদের সংখ্যা পুরুষের তুলনায় চার গুণ বেশি। অথচ পাশ্চাত্যে ইসলাম সম্পর্কে সবারই এ ধারণা বদ্ধমূল রয়েছে যে, ইসলাম নারীদের সাথে অমানবিক আচরণ করেছে, তাদেরকে অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে।
লন্ডন টাইমস তার ১৯৯৩ সালের ৯ নভেম্বর সংখ্যায় বৃটিশ বংশদ্ভূত উচ্চ শিক্ষিতা অনেক নারীর সাক্ষাতকার প্রকাশ করেছে, যারা জেনে শুনে অধ্যয়ন করে ইসলাম গ্রহণ করেছে। অনেকগুলো সাক্ষাতকার উদ্ধৃত করার পর পত্রিকাটি লেখে, অনেক নও মুসলিম নারী ইসলাম ও পাশ্চাত্যের মাঝে তুলনামূলক বিশ্লেষণ করে বলেন, ইসলামে নারীর সম্মান-মর্যাদা বেশি। ইসলাম নারীদের যে সম্মানের দৃষ্টিতে দেখে, পাশ্চাত্য তা দেখে না। পাশ্চাত্যের নিকট নারীরা পুরুষের ভোগ-সম্ভোগ, আনন্দ-বিনোদন, মনোরঞ্জন ও আমোদ-প্রমোদের বস্তু ছাড়া আর কিছুই নয়। পাশ্চাত্যের নারী স্বাধীনতার শ্লোগান ধোকা-প্রবঞ্চনা ছাড়া আর কিছুই নয়। ইসলাম নারীদের প্রকৃত স্বাধীনতা দিয়েছে। সর্ব সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী বিগত দশ বছরে আটাত্তর হাজার বৃটিশ নাগরিক ইসলাম গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে নারীদের হার ২৬ শতাংশ।
উপরোক্ত দুই পত্রিকার রিপোর্ট দ্বারা হালকাভাবে অনুমাণ করা যায়, আমাদের মুসলমানদের আমলহীনতা সত্ত্বেও আল্লাহ তাআলা অদৃশ্য থেকে ইসলাম প্রচারের উপকরণ সৃষ্টি করে দিচ্ছেন।
ফ্রান্সে বিগত পনের বছরে ষাট হাজার ফরাসী নাগরিক ইসলাম গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে নারীর হার ৬৭ শতাংশ। ইসলাম গ্রহণকারীদের মধ্যে বিজ্ঞানী, ইঞ্জিনিয়ার, রাষ্ট্রদূত, পাদরী, চিন্তাবিদ, বুদ্ধিজীবী, প্রফেসর, ডাক্তার, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, মনস্তত্ত্ববিদ, ফিল্ম স্টার এবং সামরিক অফিসার সবাই রয়েছেন।
সৌদি আরবের রিয়াদ থেকে প্রকাশিত মাসিক আদ দাওয়ার এক রিপোট থেকে জানা যায়, ফরাসী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক রিপোর্টে সে দেশের সরকার স্বীকার করেছে, মুসলমানরা যে অঞ্চলে মসজিদ নির্মাণ করে সেখানে অপরাধ বিস্ময়করভাবে কমে যায়। ফ্রান্সের এক শহরে বসবাসরত মুসলমানরা সেখানকার সিটি করপোরেশনের নিকট মসজিদ নির্মাণের জন্য আবেদন করে, কিন্তু করপোরেশনের মেয়র তাদের আবেদন প্রত্যাখ্যন করে। একাধারে চার বছর পর্যন্ত বার বার এই আবেদন প্রত্যাখ্যান হতে থাকে। বাধ্য হয়ে মুসলমানরা একটি বাণিজ্যিক কমপ্লেক্স নির্মাণ করে সেখানে একটি বড় হলে নামায আদায় শুরু করে।
ফরাসী পুলিশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে রিপোর্ট দিয়েছে, যখন থেকে মুসলমানরা এখানে নামায পড়া শুরু করেছে তখন থেকে এই এলাকায় অপরাধ কমতে থাকে। পুলিশের এই রিপোর্টের পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সেসব মহল্লায় সংঘটিত অপরাধের সার্ভে শুরু করে যেখানে মসজিদ রয়েছে। রিপোর্টে স্বীকার করা হয়েছে, কোনো মহল্লায় সাধারণতঃ মসজিদ নির্মাণের পর বিস্ময়করভাবে সেখানে অপরাধের হার কমতে থাকে। এর কারণ কি? এর কারণ আমাদের জানা নেই। এ রিপোর্টকে ভিত্তি বানিয়ে ফরাসী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সারা দেশে মসজিদ নির্মাণের সাধারণ অনুমতি দিয়ে দেয়।
সরকারীভাবে স্বীকার করা হয়েছে, ফ্রান্স ও ইউরোপের দেশগুলোতে অপরাধের ওপর নিয়ন্ত্রণের জন্য কোটি কোটি ডলার খরচ করা হয়ে থাকে, তারপরও তারা ব্যর্থ হয়। এই রিপোর্টের পরই ফ্রান্সের জেল কর্তৃপক্ষ জেলে আবদ্ধ কয়েদীদের সংশোধনের জন্য মুসলমান দাঈদের আহবান জানাতে শুরু করে। খুব দ্রুত তারা এর ফলাফল দেখতে পায়। অপরদিকে ফ্রান্সের মুসলমানরা তাদের সন্তানদের শিক্ষা-দীক্ষার জন্য এমন ব্যবস্থা করেছে, যাতে তারা উচ্চ নাম্বার নিয়ে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সরকারী গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হয়।
সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিন্টনের উপমহাদেশ সফরের সময় যে টিম তার সাথে এসেছিল, তার মধ্যে পাচ জন ছিল মুসলমান। একজন মার্কিন কৃষি মন্ত্রণালয়ের বিশেষজ্ঞ, দ্বিতীয় জন বিল ক্লিন্টনের প্রেস সচিব, তৃতীয় জন মার্কিন রাষ্ট্রদূত, চতুর্থ জন অর্থ বিষয়ক উপদেষ্টা এবং পঞ্চম জন একজন নারী।
সম্প্রতি লন্ডনে আহমদ আবদুর রহমন নামক এক দাঈ একটি ডকুমেন্টারী সিনেমা তৈরি করেছেন, যাতে তিনি সাতচল্লিশ জন নও মুসলিমের নিকট তাদের ইসলাম গ্রহণের কারণ সম্পর্কে প্রশ্ন করেছেন। উক্ত সিনেমায় আমেরিকা ও ইউরোপের ষোল জন নও মুসলিমের সাক্ষাতকার বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। সিনেমার এক অংশে বলা হয়েছে, সাধারণত পশ্চিমা দেশে ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে কি ধরনের সন্দেহ-সংশয় রয়েছে এবং পশ্চিমা মিডিয়া কিভাবে তার সর্বশক্তি ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে নিয়োগ করে।
কিন্তু এত কঠিন বিদ্বেষ বিরোধিতা সত্ত্বেও ইসলাম কেন প্রসার লাভ করছে এবং সরকারের কোনো ধরনের পৃষ্ঠপোষকতা ও উৎসাহ-উদ্দীপনা ছাড়াই মানুষ কেন দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করছে। এই বাস্তবতা স্বীকার করে সাবেক এক বৃটিশ রাষ্ট্রদূত যিনি ইসলাম গ্রহণ করার পর তার নাম রেখেছেন হাসান, তিনি লেখেন, আমার বিস্ময় লাগে, ইসলাম ও মুসলমানদের সাথে এত কঠোর বিরোধীতা শত্রুতা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত মানুষ কেন ইসলাম গ্রহণ করছে। এই ধর্মে কি এত আকর্ষণ রয়েছে যে, লোকেরা নিজে নিজেই অবচেতনভাবে এর পেছনে ছুটছে।
এ প্রশ্ন সম্পর্কে চিন্তা ভাবনা করে যে উত্তর আমি পেয়েছি তা হলো, ইসলামই একমাত্র সর্বশেষ ধর্ম, যা সমগ্র মানবতার হেদায়াত, পথনির্দেশ ও তার প্রকৃত সফলতার গ্যারান্টি। এই ধর্ম যেহেতু হুবহু মানবপ্রকৃতি অনুযায়ী, সেজন্য সে মানুষের সমস্যা সংকট থেকে চোখ বন্ধ করে থাকতে পারে না; বরং এসব সমস্যা সংকটে সে সঠিক সমাধান পেশ করার চেষ্টা করে। অস্থির পেরেশান মানুষের আত্মিক মানসিক শান্তি প্রশান্তি দান করে। এজন্য মানুষ যদি দলে দলে এ ধর্ম গ্রহণ করে তাহলে আমার কাছে তা তাজ্জবের বিষয় নয়।
সাবেক বৃটিশ রাষ্ট্রদূত বিভিন্ন মুসলিম অমুসলিম দেশে অবস্থানের সময় উভয়ের মাঝে যে মৌলিক পার্থক্য অনুভব করেছেন তা তিনি নিজের ভাষায় এভাবে ব্যক্ত করেছেন, 'মুসলিম দেশগুলোতে আমি সাধারণভাবে শান্তি ও নিরাপত্তা পেয়েছি। মুসলিম সোসাইটিতেও শান্তি ও স্বস্তি দেখেছি। পক্ষান্তরে অমুসলিম দেশগুলোতে আমি মানুষদের চেহারায় চিন্তা- পেরেশানীর ছাপ দেখেছি।'
ফ্রান্সের এক সাবেক রাষ্ট্রদূত যিনি সৌদি আরব, কুয়েত এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে রাষ্ট্রদূত হিসেবে কাজ করেছেন, তিনিও ঠিক একই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন, আমি রিয়াদ ও জেদ্দায় কোনো রক্ষী ছাড়া একাই ঘোরাফেরা করতাম। হাজার হাজার ডলার আমার পকেটে থাকত। আমার অবস্থানস্থলের দরোজাও সাধারণত খোলা থাকত। কখনো চুরি হতো না। কেনা-বেচায় কেউ আমাদের সাথে প্রতারণা করত না। ভুলে যদি কখনো দোকানদারকে বেশি টাকা দিয়ে দিতাম তাহলে দোকানদার তা ফিরিয়ে দিতেন। মুসলিম দেশ থেকে যখন আমরা প্যারিসে পৌঁছলাম তখন প্রথম দিনেই আমার পকেট তার হয়ে যায়। দ্বিতীয় দিন আমার স্ত্রীর স্বর্ণের অলংকার এবং তৃতীয় সপ্তাহে আমাদের ফ্ল্যাটে চুরি হলো। এ ঘটনার পর আমি ইসলাম সম্পর্কে কিছু চিন্তা- ভাবনা এবং কিছু লেখাপড়া করি। এরপর মুসলমান হয়ে যাই। কারণ খৃস্ট ধর্ম একটি প্রাণহীন লাশ। যিন্দেগীর সাথে তার কোন সম্পর্ক নেই। যদি এর সুস্পষ্ট কোন দলীল আপনি চান তাহলে তাদের দেখুন যারা নিয়মিত গুরুত্বের সাথে গির্জায় যাওয়া আসা করে। ফ্রান্সে শুধু চার শতাংশ লোক রবিবার গির্জায় যায়। জার্মানীতে ছয় শতাংশ আর বৃটেনে সাত শতাংশ লোক নিয়মিত গির্জায় যাওয়া আসা করে, কিন্তু মুসলমান প্রতি দিন পাচ বার মসজিদে যায়।
তাদের নিয়মিত মসজিদে গমনকারীর সংখ্যা ষাট থেকে সত্তর শতাংশ। মুসলমানদের দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য হলো, দীন ধর্মের সাথে তাদের প্রাণবন্ত সম্পর্ক রয়েছে। ইসলাম তাদের চব্বিশ ঘন্টার জীবন পরিবেষ্টন করে আছে। আমরা পশ্চিমা দেশের লোকদের বিভিন্ন ব্যক্তিগত মজলিসে তাদের থেকে শুনেছি, তারা বলাবলি করছে, খৃস্টবাদ থেকে আমাদের আস্থা উঠে গেছে। আমাদের ধর্ম প্রচারকরা বিভিন্নভাবে অর্থনৈতিক ও চারিত্রিক অপরাধের সাথে জড়িয়ে পড়েছেন।
আহমদ আবদুর রহমানের সিনেমায় ইসলাম গ্রহণ করার যে কারণ বলা হয়েছে, সামগ্রিকভাবে সবার দৃষ্টিতে তা হচ্ছে, ইসলামই একমাত্র ধর্ম যা গোটা মানবতাকে ধ্বংস ও বরবাদীর হাত থেকে রক্ষা করতে পারে। অক্সফোর্ড ইসলামিক সেন্টারের ড. গ্রাহাম বলেন, এখন ইসলাম পূর্ব ও পশ্চিমের বিষয় নয়; বরং সে একটি পূর্ণাঙ্গ সমাজের এবং তাওহীদের সবচে বড় আহবায়ক।
বৃটেনের এক সাবেক খৃস্টধর্ম প্রচারক বলেন, আমি ইসলাম গ্রহণ করার পূর্বে একজন গোঁড়া খৃস্টান ছিলাম। ইহুদীদের প্রতি আমার এত বড় সহানুভূতি ছিল যে, আমি তাদের সাহায্যের জন্য ইসরাঈলে পর্যন্ত গিয়েছি। সেখানে ইহুদী ও ফিলিস্তিনি মুসলমানদের সাথে মেলামেশার কিছুদিন পরই আমার অনুমান হয়ে গেল, প্রকৃতপক্ষে মুসলমানরা মজলুম। ইহুদীরা তাদের ভূমি জবরদখল করে নিয়েছে। ইহুদী বড় জালেম, অত্যাচারী, পাষ, অহংকারী, দুশ্চরিত্র, দুষ্কৃতকারী, মানবতার শত্রু এবং ধোকা প্রতারণাই তাদের জীবনের প্রধানতম বৈশিষ্ট্য। তারা একেবারেই মনুষ্যত্ব শূন্য।
পক্ষান্তরে মুসলমানদেরকে আমি চরিত্রগতভাবে অনেক উন্নত পেয়েছি। ইসরাঈল থেকে আমি দ্বিতীয় সপ্তাহেই ফিরে এসে মুসলমানদের সাথে সম্পর্ক বাড়িয়ে দেই এবং ইসলাম ও মুসলমানদের সম্পর্কে পড়াশোনা শুরু করি। পরে বুঝতে পারলাম, আসলেই মুসলমানরা মজলুম। পশ্চিমা মিডিয়া মুসলমানদের বিরুদ্ধে আমাদের মন মগজ বিষাক্ত করে তুলেছে। এর এক মাস পরই আমি ইসলাম গ্রহণ করি।
সিনেমার এক অংশে বলা হয়েছে, ইসলাম গ্রহণকারীদের জীবনে বিরাট বড় পবির্তন এসেছে। বিশেষ করে পশ্চিমা পরিবেশে লালিত-পালিত নারীরা ইসলামের আরোপিত বিধি নিষেধ বড় সানন্দে গ্রহণ করে নিয়েছে। কারণ জার্মান নারী হান্নার বক্তব্য অনুযায়ী ইসলাম নারীদের যে অধিকার দিয়েছে অন্য কোনো ধর্ম তা দেয়নি। ইসলামের পারিবারিক বন্ধন অটুট থাকে। বেলজিয়ামের নও মুসলিম মহিলা রাবেয়া বলেন, মুসলিম পরিবারে নারীদের বিরাট সম্মান রয়েছে। যতই তাদের বয়স বৃদ্ধি হয় ততই তাদের সম্মান মর্যাদা ও মূল্যায়ন বৃদ্ধি পায়। ইসলামের সৌন্দর্য বর্ণনা করতে গিয়ে সাবেক এক মহিলা খৃস্ট ধর্ম প্রচারক বলেন, যখন আমরা নামাযে থাকি তখন সরাসরি আমরা সৃষ্টিকর্তার সাথে কথা বলি। আমাদের মাঝখানে কোনো মাধ্যম থাকে না, যেমন খৃস্ট ধর্মে পাদরীরা মাধ্যম থাকে।
মার্কিন নও মুসলিম মহিলা আয়েশা সুফিয়া বলেন, ইসলামে তাকদীরের ওপর ঈমান আনা ইসলামের এমনই এক সৌন্দর্য যে, পাশ্চাত্য যদি এর ওপর ঈমান আনত তাহলে তাদের সকল আত্মিক, মানসিক ও শারীরিক রোগের চিকিৎসা হয়ে যেত। অপর এক নও মুসলিম যিনি ইহুদী এবং ফ্রি মিশন আন্দোলনের একজন সক্রিয় ও কর্মতৎপর কর্মী ছিলেন, তিনি বলেন, ইসলাম গ্রহণ করার পর আমি আমার নাম রেখেছি রোকনুদ্দীন। তিনি কুরআন শরীফ সম্পর্কে তার প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন, যখন আমি প্রথমবার কুরআন পড়লাম তখন আমার কাছে এটি অলৌকিক মনে হয়েছে। এর নূর আমার হৃদয়ে প্রবেশ করে।
জীবনে আমার প্রথমবার আত্মপ্রশান্তি অর্জিত হলো। এই অনুভূতিই আমাকে ইসলামের দিকে ধাবিত করেছে। যে ব্যক্তির আত্ম প্রশান্তির প্রয়োজন সে যেন পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত করে। যে ব্যক্তি একবারও কুরআন পড়বে সে একথা অস্বীকার করতে পারবে না, এটি আল্লাহর কালাম। আমি আত্মিক ও মানসিক প্রশান্তির জন্য সমগ্র পৃথিবীতে হন্যে হয়ে ঘুরেছি। লক্ষ লক্ষ ডলার খরচ করেছি, কিন্তু পবিত্র কুরআন আমাকে যে সম্পদ দান করেছে তার কোনো মূল্য হয় না। কুরআন পাঠ করে আমার জীবন সম্পূর্ণ পাল্টে গেছে, যা একমাত্র কুরআনের অলৌকিকতা। আফসোস! দুনিয়া এই আলো থেকে বঞ্চিত।
সিনেমার শেষ অংশে নও মুসলিমগণ পশ্চিমা সোসাইটির সমস্যা, সংকট ও তার ইসলামী সমাধান পেশ করেছেন। তারা বলেছেন, অমুসলিম সোসাইটি যে যৌনতার দাবাগ্নি, চারিত্রিক বিপথগামিতা, অর্থনৈতিক বিপর্যয় এবং মানসিক রোগের শিকার, তা থেকে মুক্তির পথ একমাত্র ইসলাম। কেবল ইসলামই পারে তাদের এ সংকট থেকে মুক্তি দিতে। পশ্চিম জার্মানীর নও মুসলিম রাবেয়া বলেন, পশ্চিমা সমাজে নারীদের যে স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে তা সম্পূর্ণ মিথ্যা, নিছক প্রতারণা।
পশ্চিমা স্বাধীনতার অর্থই হলো, প্রবৃত্তির চাহিদামতো জীবন যাপন করা, কিন্তু প্রকৃত নারী স্বাধীনতা কেবল ইসলামেই রয়েছে। ইসলামী শিক্ষা ও নীতিমালার ওপর আমল করলেই কেবল সেই স্বাধীনতা অর্জিত হতে পারে। পশ্চিম জার্মানীতে বিগত আট বছরে বার হাজার নারী ইসলাম গ্রহণ করেছে। তুরস্কে নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত ইসলাম গ্রহণ করে তার নাম রেখেছেন মুরাদ হোফম্যান। তিনি ইসলামের প্রতিরক্ষা বিষয়ে কয়েকটি চমৎকার গ্রন্থ রচনা করেছেন, যা পড়ার মতো। জার্মান সরকার এখন মুসলমানদের অনুমতি প্রদান করেছে, তারা তাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে দীনিয়াত বিষয় পড়াতে পারবে।
বৃটেনের প্রসিদ্ধ পপস্টার ইসলাম গ্রহণ করে তার নাম রেখেছেন ইউসুফ ইসলাম। তিনি তার বাকী জীবন নতুন প্রজন্মের শিক্ষা-দীক্ষার জন্য উৎসর্গ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। পাশাপাশি তিনি ইসলামী ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সীরাত বিষয়ে ভিডিও ক্যাসেট বের করছেন, যাতে এ সম্পর্কে অমুলিমদের ভুল ধারণার নিরসন হতে পারে। এ ছাড়াও যেসব বৃটিশ নারী ইসলাম গ্রহণ করেছেন তাদের সংখ্যা প্রায় সাতাত্তর হাজার।
মার্কিন কেন্দ্রীয় গির্জা সংগঠন ছয় হাজার চারশ' তিপান্ন জন খৃস্টান ধর্ম প্রচারককে বিভিন্ন ইসলামী ও আফ্রিকান দেশে প্রেরণ করেছে, যাতে সেখানে তারা খৃস্টবাদের প্রচার করতে পারে। তাদের পেছনে দশ বছরে এক কোটি ত্রিশ লক্ষ ডলার ব্যয় করা হয়েছে, কিন্তু দুই বছর পর রিপোর্ট এসেছে, অর্ধেকের বেশি খৃস্টান ধর্ম প্রচারক মুসলমান হয়ে গেছে। এখন তারা ইসলামী ও আফ্রিকান দেশে মুসলিম দায়ী হিসেবে ইসলামের প্রচার করছে। পাদরীদের ইসলাম গ্রহণের এই ঘটনা বেশির ভাগ আফ্রিকান দেশে সংঘটিত হয়েছে।
১৯৯৬ সালে মার্কিন মুসলমানদের সম্পর্কে প্রকাশিত রিপোর্টে বলা হয়েছে, মার্কিন সেনাবাহিনীর মধ্যে মুসলমানের সংখ্যা দশ হাজার। এর মধ্যে বেশির ভাগ সেসব মুসলমান যারা সৌদি আরবে অবস্থানকালে ইসলাম গ্রহণ করেছে। এসব মুসলিম সেনা সদস্যেও দীনী দিক-নির্দেশনা, চারিত্রিক ও নৈতিক দীক্ষা এবং নামাযের ইমামতির জন্য সেনা সদস্য আবদুর রশীদকে নিযুক্ত করা হয়েছে। তাকে যে সামরিক ব্যাজ দেয়া হয়েছে তাতে চাঁদ-তারকাও রয়েছে। সেনাবাহিনী সদস্যদের দুই ঈদের নামায ও খুতবা যখন প্রথমবার টিভি-রেডিওতে প্রচার করা হয়, তখন থেকে ছয় মাসের মধ্যে পনেরশ' সেনা সদস্য আবদুর রশীদের হাতে ইসলাম গ্রহণ করে। আবদুর রশীদ বলেন, দুই ঈদের নামায প্রচার হওয়ার পর কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় সেনা দফতর থেকে আমার কাছে ফোন এসেছে ইসলাম সম্পর্কে জানার জন্য।
মার্কিন সেনাবাহিনীতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মুসলমান, খোদ আমেরিকায় মুসলমানদের ক্রমবর্ধমান সংখ্যা এবং তাদের গঠনমূলক কর্মতৎপরতার কারণে আমেরিকার ইতিহাসে প্রথমবার মার্কিন কংগ্রেস প্রাসাদে ইফতার পার্টি এবং হোয়াইট হাউসে ঈদ পুনর্মিলনী অনুষ্ঠান হয়েছে, তাতে দেড়শ' মুসলমানকে দাওয়াত করা হয়েছে। সাবেক মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট আলগোর ওয়াশিংটনের ইসলামিক সেন্টার পরিদর্শন করেছেন এবং ইসলাম সম্পর্কে তার ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ও মনোভাব ব্যক্ত করেছেন।
বৃটেনের মতো ইসলাম ও মুসলিম-বিদ্বেষী দেশে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে ইসলামিক সেন্টার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বৃটিশ রাজপুত্র চার্লস বিশ্ব সভ্যতায় ইসলামের প্রভাব-প্রতিক্রিয়া এবং মানব সোসাইটির ওপর তার অবদানের কথা স্বীকার করেছেন। বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার বলেছেন, তিনি বর্তমানে কুরআন অধ্যয়ন করছেন, যাতে বৃটেনে বসবাসরত মুসলমানদের আকীদা-বিশ্বাস, জীবন পদ্ধতি ও সভ্যতা সম্পর্কে অবগতি লাভ করা যায়।
এ তো শুধু পশ্চিমা দেশ সম্পর্কে কিছু ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ পেশ করা হলো, নতুবা আফ্রিকান ও এশিয়ান দেশগুলোতে ইসলাম গ্রহণের অসংখ্য অগণিত ঘটনা সংঘটিত হচ্ছে। এসব দেশে অঞ্চলের পর অঞ্চল ইসলামের ছায়ায় আশ্রয় নিচ্ছে। আফ্রিকান দেশগুলোতে সবচে বেশি ইসলাম গ্রহণের ঘটনা ঘটছে। ভারতের হিন্দুদের মধ্যেও শ্রেণী বৈষম্য ও নিম শ্রেণীর ওপর ব্রাহ্মণ্যবাদী জুলুম নির্যাতন তাদের ইসলামের দিকে ধাবিত করছে। এছাড়াও হিন্দু ধর্মের আকীদা-বিশ্বাস, প্রথা-প্রচলনও হিন্দু ধর্মের বিরুদ্ধে তদের অনুসারীদের মধ্যে ঘৃণা সৃষ্টি হতে দেখা যাচ্ছে। কিছু কিছু হিন্দু যুবক তাদের মায়ের মৃত্যুর পর তাদের অগ্নিতে জ্বলতে দেখে এবং লাশের বেইজ্জতী বরদাশত না করতে পেরে ইসলাম গ্রহণ করেছে।
গোটা বিশ্বে ইসলামের জাগরণের দ্বিতীয় দিক স্বয়ং মুসলমানদের চেষ্টা প্রচেষ্টা। এই জাগরণ বিভিন্ন ইসলামী দেশ, দীনী সংগঠন, প্রখ্যাত দাঈ ও কলম সৈনিকদের সক্রিয় চেষ্টা প্রচেষ্টা এবং প্রাণান্তকর সংগ্রামের ফলে সৃষ্টি হচ্ছে। মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে সর্বশীর্ষে সৌদি আরব। নিঃসন্দেহে সৌদি আরব খেলাফতে উসমানিয়ার পতনের পর ইসলামী বিশ্বের নেতৃত্বের যে গুরুদায়িত্ব আঞ্জাম দিয়েছে তা বলাই বাহুল্য। খেলাফতে উসমানিয়ার পতনের পর যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছিল সে শূন্যতা পুরণে সৌদি আরব বীরের ভূমিকা পালন করেছে। ইসলামী জাগরণের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ খুঁটি হলো বিভিন্ন দীনী, দাওয়াতী ও সেবা সংগঠন-সংস্থা, যেগুলোর পৃষ্ঠপোষকতা করছেন সরাসরি সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ।
১৯২৪ সালে মোস্তফা কামাল পাশা আতাতুর্ক খেলাফতে উসমানিয়ার পতনের ঘোষণা দিলে গোটা ইসলামী বিশ্বে এ ঘোষণার বিরুদ্ধে বিরাট প্রতিবাদ হয়, কিন্তু মুসলমানরা নিরাশা ও হীনমন্যতার শিকার হয়ে পড়েছিল। ফলে তারা এই নাযুক পরিস্থিতি থেকে বাঁচার জন্য ব্যক্তিগত ও সামষ্টিকভাবে চেষ্টা-প্রচেষ্টা শুরু করেন। ভারতের খেলাফত আন্দোলন গোটা বিশ্বে মুসলমানদের মধ্যে দীনী ও রাজনৈতিক চেতনা সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এ সময় দীনী শিক্ষার ময়দানও প্রসারিত হতে থাকে।
প্রতিষ্ঠিত হয় দারুল উলুম দেওবন্দ, দারুল উলূম নদওয়াতুল ওলামা এবং আলীগড় মুসলিম ইউনিভার্সিটি। এসব দীনী ও সাধারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান উপমহাদেশের মুসলিম নওজোয়ানদের মস্তিষ্কে ইসলাম সম্পর্কে সৃষ্ট সন্দেহ-সংশয় ও ধর্মহীন চিন্তা- চেতনা দূর করে নতুনভাবে ইসলামের ওপর আস্থাশীল করার জন্য নিরন্তর সংগ্রাম করে যাচ্ছে এবং জনসাধারণের মধ্যেও ব্যাপকভাবে দীনের মৌলিক শিক্ষা প্রসার করার জন্য নিরবচ্ছিন্ন প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে। আজ উপমহাদেশ পেরিয়ে গোটা বিশ্বে তার প্রভাব পড়ছে। এ ক্ষেত্রে দারুল উলূম দেওবন্দের ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বলা চলে, উপমহাদেশে ইসলামকে টিকিয়ে রাখতে সবচে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে দারুল উলুম দেওবন্দ। পাক-ভারত উপমহাদেশে দারুল উলুম দেওবন্দের আদলে হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ মকতব-মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যারা ইসলাম ও ইসলামী শিক্ষা প্রসারে নিরন্তর প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে।
মিসরের ইমাম হাসানুল বান্না (র.) এবং তাঁর ইখওয়ানুল মুসলিমীন আন্দোলন গোটা আরব বিশ্বে দীনী জাগরণের উত্তাল তরঙ্গ সৃষ্টি করেছে। শুধু আরব বিশ্বেই নয়, বরং গোটা দুনিয়াতেই তাঁর আন্দোলন বিরাট আলোড়ন সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে। সৌদি আরবের শাসক মালিক আব্দুল আজীজ প্রথম ধাপেই হিজাযে শান্তি নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর জনসাধারণের মধ্যে প্রসারিত শিরক, বিদআত ও কুসংস্কার নির্মূলের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করেন। মালিক আব্দুল আজীজ দুনিয়া থেকে চির বিদায় নিলে অনুসারীরা তাঁরই পদাঙ্ক অনুসরণে গোটা পৃথিবীর মুসলমানদের মধ্যে দীনী জাগরণের জন্য উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছেন।
দুনিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাসরত মুসলমান, চাই সংখ্যাগরিষ্ঠ হোক আর চাই সংখ্যালঘু হোক, সবারই বস্তুগত, নৈতিক, চারিত্রিক পৃষ্ঠপোষকতা এবং ইসলামী দাওয়াত ও শিক্ষা ব্যাপক করার জন্য নিরন্তর প্রয়াস চালিয়েছেন। যেসব মুসলিম দেশে পূর্ব থেকে দীনী দাওয়াত ও শিক্ষার কাজ চলে আসছে, সেখানকার অবকাঠামোগত ও শিক্ষাগত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য মন খুলে মুক্ত হস্তে সাহায্য সহযোগিতা করেছেন। আফ্রিকা, এশিয়া, আমেরিকা, ইউরোপ ও অস্ট্রেলিয়াতে তাদের প্রতিনিধি পাঠিয়ে মুসলমানদের অবস্থা সার্ভে করিয়েছেন। নিজস্ব ব্যয়ে মসজিদ, মাদরাসা, হাসপাতাল ও রেডিও স্টেশন স্থাপন করেছেন।
কুয়েতের সেবা সংস্থা আল হাইয়্যাতুল খায়রিয়্যাহ, সৌদি আরবের রাবেতা আলমে ইসলামী, জামিআ ইসলামিয়া, ধর্ম মন্ত্রণালয়, দারুল ইফতা, নদওয়াতুশ শাবাব আল ইসলামী, মুআছছাছাতুল হারামাইন, মুআছছাছাতু ইকরা আল খায়রিয়্যাহ, মুআছছাছতুল মালিক ফয়সাল আল খাইরিয়্যাহ, সংযুক্ত আরব আমিরাতের রেড ক্রিসেন্ট, মুআছছাছা শেখ যায়েদ বিন সুলতান আল নাহিয়ানসহ আরো অসংখ্য অগণিত সেবা সংস্থা গোটা বিশ্বে মুসলমানদের বিভিন্নভাবে সাহায্য করে যাচ্ছে। সাহায্য সেবার পর সৌদি আরবের দ্বিতীয় বড় কীর্তি হলো, কুরআন ছাপিয়ে প্রচার করা।
অপরদিকে গোটা বিশ্বের মুসলিম নওজোয়ানদের দীনী শিক্ষা-দীক্ষার জন্য তাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো দরোজা খুলে দিয়েছে। রাবেতা আলমে ইসলামীর মাধ্যমে ষাট হাজারের বেশি মসজিদ নির্মিত হয়েছে, পঁচিশ হাজারের বেশি মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং পূর্বপ্রতিষ্ঠিত হাজার হাজার মাদরাসায় সাহায্য সহযোগিতা দিয়েছে। মুআচ্ছাছাতুল মালিক ফয়সাল আল খায়রিয়্যাহ দীনী, দাওয়াতী, সাহিত্য ও ইলমী ময়দানে কর্মরত ব্যক্তিত্ব, দাঈ, মুরব্বী, ওলামা ও গবেষকদের উৎসাহ বৃদ্ধির জন্য মূল্যবান পুরস্কার প্রদানের ধারা চালু করেছে। সম্প্রতি দুবাই সরকারও বার্ষিক 'ইসলামী ব্যক্তিত্ব সম্মাননা' প্রদানের ধারা চালু করেছে। সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং লিবিয়া জাতীয় উন্নয়নের জন্য মুসলমান বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে সাহায্য নিয়েছে।
এর দ্বার একদিকে মুসলমানদের অর্থনৈতিক সচ্ছলতা এসেছে, অপরদিকে তাদের আকীদা ও আমলের মধ্যে মৌলিক পরিবর্তন এসেছে। অমুসলিম দেশের জনগণও আরব বিশ্বে ব্যাপকভাবে কাজ করছে। এতে তারা আরবদের মধ্যে নিরাপদে অবস্থান করে মুসলমানদের খুব কাছে থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছে। মুসলমানদের আকীদা-বিশ্বাস ও সভ্যতা-সংস্কৃতি প্রত্যক্ষভাবে অধ্যয়ন করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। সেখানকার শান্তি-নিরাপত্তা ও ইসলামী সাম্য-মৈত্রীর পরিবেশ দেখে প্রভাবিত হয়েছে। ফলে বিপুল সংখ্যক অমুসলিম ইসলামের শান্তির ছায়াতলে আশ্রয় নিয়েছে আর বিপুল সংখ্যকের মধ্যে ইসলামের প্রতি সহানুভূতি সৃষ্টি হয়েছে। আরব দেশে প্রতিবছর তিন হাজারের বেশি লোক ইসলাম গ্রহণ করছে। তার মধ্যে নারীদের হার ২৭ শতাংশ। এদের বেশির ভাগ শ্রীলংকা, ফিলিপাইন ও ভারতের।
সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার ও তুরস্ক ইসলাম প্রচারে আধুনিক মিডিয়া এবং প্রযুক্তিও ব্যবহার করেছে, যার সুদূরপ্রসারী ফল পাওয়া যাচ্ছে। ১৯৯৯ সালে সৌদি আরব ১২০টি দেশে হজ্জের প্রোগ্রাম প্রচার করার জন্য বিবিসি, সিএনএন ও স্টার টিভির সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে। হজ্জের পরের রিপোর্ট থেকে জানা যায়, এই আন্তর্জাতিক প্রোগ্রাম দেখে টিভি দর্শকরা ইউরোপ-আমেরিকার ইসলামিক সেন্টারে ফোনের মাধ্যমে যে যোগাযোগ করেছে, তার সংখ্যা আট লাখের উর্ধ্বে। সেসব ফোনকারীর মধ্যে বিপুল সংখ্যক এমনও ছিল যারা স্বীকার করেছে, এর পূর্বে ইসলাম সম্পর্কে তাদের মন মস্তিষ্কে অনেক সন্দেহ-সংশয় এবং মুসলমানদের সম্পর্কে কু-ধারণা বদ্ধমূল ছিল। হজ্জের প্রোগ্রাম দেখে তা দূর হয়েছে।
সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার এবং তুরস্কে ইন্টারন্টে ও টিভির মাধ্যমে গোটা বিশ্বে ইসলামী দাওয়াত প্রচার-প্রসারের প্রচেষ্টা চলছে। তুরস্কে তিনটি টিভি চ্যানেল ইসলামী নীতিমালা মেনে উন্নত মানসম্পন্ন অনুষ্ঠান প্রচার করছে। এর সীমারেখা পূর্ব ইউরোপ এবং পশ্চিম জার্মানী পর্যন্ত প্রসারিত। অর্থনৈতিকভাবেও এসব চ্যানেল বিরাট লাভবান হচ্ছে। অপরদিকে ইসলামী নীতিমালার আলোকে অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, কল-কারখানা ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠান দেশকে স্বয়ং সম্পূর্ণ ও স্বাবলম্বী বানানোর জন্য অগ্রগামী ভূমিকা পালন করছে। তুরস্কে প্রস্তুতকৃত টিভি অনুষ্ঠানের চাহিদা আরব বিশ্বেও ব্যাপকভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কাতার সরকার একটি স্যাটেলাইট চ্যানেল স্থাপন করে ইসলামী দাওয়াতের জন্য ওয়াকফ করে দিয়েছে। এই চ্যানেলটি বিশ্ববিখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ড. ইউসুফ আল কারযাভীর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে। ইসলামী ব্যাংক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো যদিও মুসলিম দেশে তেমন একটা সফলকাম হচ্ছে না, কিন্তু পশ্চিমা দেশে ইসলামী ব্যাংককে বিপুলভাবে স্বাগত জানানো হচ্ছে। অমুসলিম ব্যবসায়ী ও পুঁজিপতিরা এমন ব্যাংকে পুঁজি বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করছে। পশ্চিমা দেশে ক্রমশঃ ইসলামী ব্যাংকিংয়ের চাহিদা বাড়ছে। অন্য ভাষায়, পশ্চিমা দেশে অর্থনৈতিক ময়দানেও মুসলমানরা অগ্রসর হচ্ছে। কম্পিউটার সফটওয়ারের দ্বিতীয় বৃহত্তম শিল্পনগরী ক্যালিফোর্নিয়াতে একজন মুসলমান আছেন, যিনি বিল গেটস কোম্পানীর সবচে বড় সাপ্লায়ার।
ইউরোপ, আমেরিকা এবং আফ্রিকা ছাড়া ইসলাম পৃথিবীর যে কোণায় কদম রেখেছে সেখানেই নিজের আসন করে নিয়েছে এবং নেতিয়ে যাওয়া মুসলমানদের মধ্যে ইসলামী জাগরণের উত্তাল তরঙ্গ সৃষ্টি করে দিয়েছে। রাশিয়া পৃথিবীর সুপার শক্তি ছিল এবং সত্তর বছর পর্যন্ত দুর্দান্ত প্রতাপের সাথে পৃথিবী শাসন করেছে। ইসলামের উত্তপ্ত রশ্মি সেই সুপার শক্তিকে বিগলিত করে ছেড়েছে। এখন তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। চেচনিয়ার নিরস্ত্র মুসলমানদের কাছে শান্তি ও নিরাপত্তা ভিক্ষা চাইতে হচ্ছে।
এই মহাশক্তির পতন শুরু হয় ১৯৭৯ সাল থেকে, যখন সে আফগানিস্তানে হামলা চালায়। রাশিয়ার যেসব সৈন্য আফগানিস্তানে লড়াই করতে এসেছিল, তারা হয় আফগান মুজাহিদদের হাতে জাহান্নামে পৌঁছেছে আর না হয় ইসলামের যাদুতে আচ্ছন্ন হয়েছে। রাশিয়া আফগানিস্তানের মুসলমানদের সাথে লড়াই করার জন্য মুসলিম সৈন্যদের পাঠাত। এর উদ্দেশ্য ছিল, হয় তারা তাদেরই জাতি ভাইদের সাথে লড়াই করে বিজয়ীবেশে আর না হয় লাশ হয়ে ফিরে আসবে। উভয় অবস্থায়ই রাশিয়ার বিজয়, কিন্তু তাদের এ পরিকল্পনা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে, কারণ রাশিয়ার এই মুসলিম সেনারা আফগানিস্তান থেকে নতুন চেতনা নিয়ে স্বদেশে ফিরত। দেশে ফিরে তারা আপন আপন অঞ্চলে ইসলামের তাবলীগের কাজ শুরু করে দিত।
অপরদিকে আফগানিস্তানে রাশিয়ার অর্থনৈতিক ও সামরিক মেরুদণ্ড সম্পূর্ণ ভেঙ্গে যায়। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ মার্কিন সরকারকে রিপোর্ট দিয়েছে, যদি অতি দ্রুত আফগানিস্তানের সাথে রাশিয়ার চলমান যুদ্ধের ইতি টানা না হয় তাহলে রাশিয়া টুকরো টুকরো হয়ে যাবে, এমনকি ইউরোপ-আমেরিকার স্বার্থও প্রভাবিত হবে। কারণ আফগানিস্তানের যুদ্ধের ফলে গোটা দুনিয়ার মুসলমানদের মধ্যে জেহাদের চেতনা উজ্জীবিত হবে, বিশেষ করে আরব যুবকরা দলে দলে আফগানিস্তানের জেহাদে অংশ গ্রহণ করছে। এতে এ আশংকা আরো প্রকট হয়ে ওঠেছে যে, মুসলিম দেশগুলোর বর্তমান ধর্মনিরপেক্ষ ও একনায়কতান্ত্রিক সরকারগুলোর পতন ঘটবে। অন্য ভাষায়, এসব মুসলিম দেশের সাথে পাশ্চাত্যের যে স্বার্থ সংশ্লিষ্ট রয়েছে তা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। গোয়েন্দা সংস্থার এই রিপোর্টের পর শেষ পর্যন্ত আমেরিকা রাশিয়ার ওপর চাপ সৃষ্টি করে সসম্মানে আফগানিস্তান থেকে বের হয়ে আসতে বাধ্য করে। এভাবে দুনিয়ার পরাশক্তি রাশিয়াকে পরাজিত করার পরিকল্পনা তৈরিকারী মর্দে মুমিন জেনারেল জিয়াউল হক শহীদ এবং জেনারেল আখতার আবদুর রহমান শহীদ (র.) এর ভবিষ্যদ্বাণী অক্ষরে অক্ষরে প্রতিফলিত হয়েছে। তাঁরা ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, আফগান যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটবে রাশিয়ার মাটিতে। এভাবে আফগান যুদ্ধের তলদেশ দিয়ে বিশ্বব্যাপী জেহাদের পতাকা উড্ডীন হয়েছে। সৃষ্টি হয়েছে ইসলামের পুনর্জাগরণ। পৃথিবীর মানুষ ইসলামের পতাকাতলে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। এসবই নিরস্ত্র আফগান মুজাহিদদের অবদান। এখন মুসলিম উম্মাহ অপেক্ষায় আছে, যেভাবে বর্তমানে আমেরিকার নৈতিক ও চারিত্রিক পতন ঘটেছে তেমনিভাবে তার রাজনৈতিক শক্তিও টুকরো টুকরো হয়ে যাক। মুসলিম উম্মাহ আমেরিকার জানাযা পড়ার অধীর অপেক্ষায় দিন গুনছে।
ইতোপূর্বে আমি আমেরিকার নৈতিক পতনের বিশদ আলোচনা করেছি এবং এর সপক্ষে মার্কিন চিন্তাবিদ, বুদ্ধিজীবী ও গবেষকদের সাক্ষ্য-প্রমাণও পেশ করেছি। আর এখন নৈতিক পতনের পাশাপাশি তার অর্থনৈতিক পতনেরও সূচনা হয়ে গেছে। আমেরিকার অর্থনীতি পর্যবেক্ষকদের বক্তব্য, আমেরিকা উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রতিরক্ষার জন্য বার্ষিক ত্রিশ থেকে ষাট মিলিয়ন ডলার ব্যয় করে, যাতে জাপান, ইরান, ইরাক, চীন ও রাশিয়ার ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে পারে, কিন্তু আসল উপকার হচ্ছে জাপানের। জাপান বিদ্যুৎ শিল্পের ওপর আধিপত্য বিস্তার করে আমেরিকাকে বিশ্ব বাজার থেকে বের করে দিয়েছে।
দ্বিতীয়ত আমেরিকা ইসরাঈলকে রক্ষার জন্য অঢেল অর্থ ব্যয় করে চলেছে, যাতে মধ্যপ্রাচ্যের সাথে সংশ্লিষ্ট আমেরিকার স্বার্থের কোনো ক্ষতি না হয়। এই ভিত্তিতে আমেরিকা প্রতিবছর দুই কোটি ডলার ঋণী হচ্ছে। যার অনিবার্য ফল হলো, অর্থনৈতিক ময়দানেও আমেরিকার পতন অবশ্যম্ভাবী। পল কেনেডি ১৯৮৭ সালে একটি গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। যার শিরোনাম ছিল 'পরাশক্তিগুলোর উত্থান-পতন'। উক্ত গ্রন্থে লেখক ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, চলমান শতাব্দীর শেষের দিকে আমেরিকার পতন ঘটবে, যার সূচনা হয়েছে দ্বিতীয় বিশ্ব থেকে।
লেখক বলেন, যত বেশি আমেরিকা তার সামরিক বাহিনী ও যুদ্ধ-বিগ্রহের জন্য অর্থ ব্যয় করছে, তত বেশি তার অর্থনৈতিক শক্তি দুর্বল হচ্ছে। আমেরিকার এই ভারসাম্যহীন পলিসির ফলে ক্রমশ: বিনিয়োগ কমছে, অর্থনীতির সূচক নিম্নগামী হচ্ছে এবং সাধারণ জনগণের ওপর ট্যাক্সের বোঝা বৃদ্ধি পাচ্ছে। রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রবৃদ্ধি ঘটবে। পশ্চিমা বিশেষজ্ঞদের ধারণা, আমেরিকা একুশ শতকে তার ভারসাম্য হারিয়ে ফেলবে। আন্তর্জাতিক বাজারে আমেরিকার বাণিজ্যিক ভারসাম্য ত্রিশ শতাংশ কমে গেছে। স্থানীয় বাজারেও জাপানের কারণে তাকে পিছু হটতে হয়েছে। জাপান বিদ্যুৎ ও ইলেকট্রনিক্স সরঞ্জামাদি, মেশিনারিজ এবং রঙিন টিভির মার্কিন বাজার দখল করে নিয়েছে। এসব ক্ষেত্রে দশ শতাংশ থেকে পঁচিশ শতাংশ এবং অন্যান্য পণ্যসামগ্রীর ক্ষেত্রে নব্বই শতাংশ মার্কিন বাণিজ্য হ্রাস পেয়েছে।
আন্তর্জাতিক কোম্পানীগুলোকে দেখুন। ১৯৮৭ সালে আমেরিকায় আন্তর্জাতিক কোম্পানীর সংখ্যা ছিল ৩৪টি আর জাপানে ছিল ৫৩টি। আমেরিকার একশটি ব্যাংক আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কাজ করছিল, এখন তাতে হ্রাস পেয়েছে আর জাপানের রয়েছে আঠাশটি ব্যাংক, যা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কাজ করছে। তৃতীয় নম্বরে জার্মানী, তার রয়েছে এগারটি আন্তর্জাতিক ব্যাংক। আমেরিকার বর্তমান পরিস্থিতি দেখে সেখানকার এক গ্রুপের বক্তব্য হলো, আমেরিকাকে তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য অতিরিক্ত ব্যয়ের ব্যাপারে ভয় করলে চলবে না, যাতে আন্তর্জাতিক বাজার তার দখলে থাকে। দ্বিতীয় গ্রুপের বক্তব্য হলো, বাইরের দিকে বেশি মনোনিবেশ না করে আমেরিকাকে সর্বাগ্রে তার অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি সামাল দেয়া প্রয়োজন। এই গ্রুপ আরো বলছে, অদূর ভবিষ্যতে আমেরিকার প্রকৃত নাগরিকরা সংখ্যালঘুতে আর অভিবাসীরা ক্রমেই সংখ্যাগরিষ্ঠে পরিণত হবে।
এজন্য এখন থেকেই বাইরের লোকদের আমেরিকায় আসার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা উচিত। বিশেষ করে আরব ও মুসলমানদের, যাদের সংখ্যা খুব দ্রুত বাড়ছে। তাদের কারণে মার্কিন ভূ-খন্ডে সন্ত্রাস বৃদ্ধি পাচ্ছে। চতুর্দিক থেকে আমেরিকা বিপদের মুখোমুখি। আমেরিকাতে ক্রমেই আয়ের তুলনায় ব্যয় বাড়ছে। এ নিয়ে বিশেষজ্ঞরা আলোচনা, পর্যালোচনা ও বিতর্ক চালিয়ে যাচ্ছেন। ইহুদীরা বলছে, আরব ও মুসলমানরা আমেরিকার জন্য বিপজ্জনক। আগামীতে যে দ্বন্দ্ব হবে তা হবে সভ্যতার দ্বন্দ্ব। এই দ্বন্দ্বে মুসলমানরা চীনের মিত্র হবে, যাতে আমেরিকাকে পরাস্ত করা যায়। আরেক গ্রুপের বক্তব্য হলো, তৃতীয় বিশ্বের সাথে আমাদের কোনো স্বার্থ সংশ্লিষ্ট নেই। তাই তাদের নিয়ে বেশি মাথা ঘামানো উচিত নয়। আমরা কেন ইসরাঈলের জন্য এত বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করছি।
সামরিক, অর্থনৈতিক সাহায্য ছাড়াও বিনা কারণে ইসরাঈলকে কোটি কোটি ডলার সাহায্য দেয়া হচ্ছে। ছোট একটি দেশের জন্য ডজনের পর ডজন দেশকে অসন্তুষ্ট করা হচ্ছে। ফলে ক্রমাগত আমেরিকার শত্রু বাড়ছে। একথাগুলো ২০০০ সালে লেখা হয়েছিল। আজ থেকে সাত বছর পর আমেরিকা আফগানিস্তান ও ইরাকের ওপর সামরিক আগ্রাসন চালিয়ে পৃথিবীর বিরাট একটি অংশকে শত্রু বানিয়ে ফেলেছে। ফলে অনেক পশ্চিমা দেশও আমেরিকাকে ঘৃণা করছে। এতে সন্দেহ নেই, এসব কিছু আমেরিকার জুলুম-নির্যাতন ও মানবতার প্রতি বিদ্বেষের ফল। এতেও কোনো সন্দেহ নেই, পরাশক্তি আমেরিকাকে জিরোশক্তি বানানোর জন্য ইহুদীরা উঠে পড়ে লেগেছে। এক কথায়, পাশ্চাত্য তথা আমেরিকার পতন অনিবার্য। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ধ্বংসের খুব কাছাকাছি। তার পথ চলা একেবারেই শেষ প্রান্তে।
📄 প্রমাণপঞ্জি
গ্রন্থাবলী
০১. আল আদাবুল আরাবী আল হাদীস- আদ দুসূতীকৃ
০২. আত তাবশীর ওয়াল ইস্তে'মার- ওমর ফররুখ
০৩. আল ই'লামুল খালিজী- মুহাম্মদ আলী আল আবিনী কৃত
০৪. আল ই'লামুল ইসলামী ওয়াল আলাকাতুল ইনসানিয়্যাহ- নদওয়াতুশ শাবাব আল ইসলামী, রিয়াদ কর্তৃক সংকলিত
০৫. আল ই'লামুদ-দুওয়ালী
০৬. আল ই'লামুস সৌদি
০৭. আত তিলফিযিয়্যূন ফি দুওয়ালিল খালীজ
০৮. আল ই'লাম ওয়াল বাইতিল মুসলিম-ফাহমী তায়্যেব আন নাজ্জার কৃত
০৯. মিন খাসায়িসিল ই'লাম আল ইসলামী-মুহাম্মদ খায়ের রমযান ইউসুফ কৃত
১০. উসূলুল ই'লাম আল ইসলামী-ইবরাহীম ইমাম কৃত
১১. উসূলুল ই'লাম আল ইসলামী ওয়া আসাসুহু- সাইয়েদ মুহাম্মদ সাদাতী কৃত
১২. আল ই'লামুল ইসলামী ওয়া তাতবীকাতুল ইলমিয়্যাহ- মুহিউদ্দীন আবদুল হালীম কৃত
১৩. আল ই'লাম ফি সদরিল ইসলাম-আবদুল লতীফ হামযা কৃত
১৪. আল ই'লাম ওয়াদ দিআ'য়া-মুহাম্মদ মুনীর হিজাব কৃত
১৫. আল ইসলাম ফি ওয়াজহিত তাগরীব-আনওয়ার আল জুনদী কৃত
১৬. দাম্মিরুল ইসলাম ওয়া আবীদূ আহলাহু-জালালুল আলম কৃত
১৭. ইলা আইনা ইয়াত্তাজিহু ই'লামুনাল ইসলামী আল মুআসির- আল মুস্তাশার আলী জারীশা কৃত
১৮. খাসায়িসুল ই'লামুল ইসলামী-আলী জারীশা কৃত
পত্র-পত্রিকা ও সাময়িকী
০১. দৈনিক আল আহরাম, কায়রো (আরবী)
০২. দৈনিক আল আখবার, কায়রো (আরবী)
০৩. দৈনিক আশ-শারকুল আওসাত, জেদ্দা (আরবী)
০৪. দৈনিক আল ক্বাবক্স, কুয়েত (আরবী)
০৫. দৈনিক আস সিয়াসাহ, কুয়েত (আরবী)
০৬. দৈনিক আর-রাইয়ুল আম, কুয়েত (আরবী)
০৭. দৈনিক আশ-শারূক, দোহা, কাতার (আরবী)
০৮. দৈনিক উকায, রিয়াদ (আরবী)
০৯. দৈনিক কওমী আওয়াজ, লাখনৌ (উর্দু)
১০. দৈনিক টাইমস অফ ইন্ডিয়া, লাখনৌ (ইংরেজী)
১১. দৈনিক ইন্ডিয়া টুডে, দিল্লী (ইংরেজী)
১২. মাসিক আল বা'দুল ইসলামী, লাখনৌ (আরবী)
১৩. মাসিক আল ইযাআ' ওয়াত তিলফিযিয়্যূন, কায়রো (আরবী)
১৪. মাসিক আদ দওয়াহ, রিয়াদ (আরবী)
১৫. মাসিক আল মুখতারুল ইসলামী, কায়রো (আরবী)
১৬. মাসিক আল ই'তিসাম, কায়রো (আরবী)
১৭. মাসিক আদ দওয়াহ, লন্ডন (আরবী)
১৮. মাসিক আফকারে মিল্লী, দিল্লী (উর্দু)
১৯. পাক্ষিক তা'মীরে হায়াত, লাখনৌ (উর্দু)
২০. পাক্ষিক আর রা'য়িদ, লাখনৌ (আরবী)
২১. সাপ্তাহিক রোজ আল ইউসূফ, কায়রো (আরবী)
২২. সাপ্তাহিক আখিরু ছাআ', কায়রো (আরবী)
২৩. সাপ্তাহিক আশ-শাবকা, বৈরুত (আরবী)
২৪. সাপ্তাহিক আস সাইয়াদ, বৈরুত (আরবী)
২৫. সাপ্তাহিক সাইয়্যিদাতী, লন্ডন (আরবী)