📘 পশ্চিমা মিডিয়ার স্বরূপ > 📄 নারী

📄 নারী


আমাদের সমাজে যদিও সাধারণতঃ নারীদের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, স্থানীয় ও আন্ত র্জাতিক খবরাখবরের ব্যাপারে কোনো আগ্রহ পরিলক্ষিত হয় না, কিন্তু শিক্ষিত নারীদের এসব ব্যাপারে আগ্রহ রয়েছে, যা তাদের স্বজাতীয়দের সাথে সম্পর্কিত। ইসলামী মিডিয়ার দায়িত্ব হলো, তারা নারীদের জন্য এমন প্রোগ্রাম উপস্থাপন করবে, যা দ্বারা তাদের দীনী ও চারিত্রিক প্রশিক্ষণ হয় এবং তাদের মাধ্যমে সমাজকে উন্নতির পথে নিয়ে যাওয়া সহজ হয়।
পারিবারিক সমস্যা সংকট থেকে দূরে থাকা এবং সেগুলো সমাধানের কৌশল, সামাজিক সমস্যা ও তার জটিলতার দিকে ইঙ্গিত, সমাজে প্রচলিত ভুল প্রথা-প্রচলন সংস্কারের প্রজ্ঞাপূর্ণ প্রয়াস, কাহিনী এবং সিরিজের মাধ্যমে টিভি থেকে রেডিও প্রোগ্রাম সমাজ সংস্কারে বেশি সহায়ক হয়। কারণ রেডিও শোনার জন্য সেই গুরুত্ব ও মনোযোগের প্রয়োজন নেই, টিভি দেখার জন্য যা প্রয়োজন হয়। যুবতী মেয়েরা যুবক ছেলেদের তুলনায় বেশি পড়ে এবং বেশি প্রভাবিত হয়। পরিবার ও সমাজে সংঘটিত ঘটনা দুর্ঘটনার ব্যাপারে তাদের অসাধারণ আগ্রহ দেখা যায়।
ইসলামী মিডিয়ার দায়িত্ব হলো, সে যুবতী মেয়েদের জন্য এমন প্রোগ্রাম উপস্থাপন করবে, বর্তমান প্রেক্ষাপট অনুযায়ী যা তাদের সন্তানদের দীনী, চারিত্রিক ও নৈতিক মূল্যবোধ সৃষ্টিতে সহায়ক হবে। মিডিয়া এসব নারীর প্রকৃতিগত যোগ্যতা ও প্রতিভাই শুধু বিকশিত করবে না; বরং তার উন্নতি বিধান করবে এবং তাদের পথ-নির্দেশও দেবে। তাদের সহজাত যোগ্যতা ও প্রতিভা বিনষ্ট হতে দেবে না। তাদের সেসব সমস্যা সংকট বুঝতে সহায়তা করবে, যার কারণে পারিবরিক ঐক্য বন্ধন ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যায়। সমাজে বিদ্যমান বিভিন্ন জীবন মানের মধ্যে ভারসাম্য সৃষ্টিতে সহায়তা করবে এবং একই মহল্লায় ও একই বিল্ডিংয়ে বসবাসকারীদের জীবন মানের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি করবে না।
শিশুদের শারীরিক আবেগ, জ্ঞান-বিবেক ও মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন সম্পর্কে তাদের শক্তিশালী তথ্য সরবরাহ করবে। আধুনিক তথ্য প্রযুক্তি, বিনোদন ও ভোগ সামগ্রী সম্পর্কে তাদের সঠিক ও ভারসাম্যপূর্ণ দিকনির্দেশনা দেবে, যাতে ঘরের নারীরা প্রত্যেক নতুন বস্তু ক্রয় এবং প্রত্যেক নতুন ফ্যাশনের পেছনে না পড়ে। এসব নারীর মধ্যে অল্পে তুষ্টির চেতনা জাগ্রত করবে। ফলে পারিবারিক জীবন সুন্দর ও সুখময় হবে। কখনো তাদের মাঝে বেশি বস্তুগত উপায়-উপকরণ সংগ্রহের আগ্রহ জাগিয়ে তুলবে না।

📘 পশ্চিমা মিডিয়ার স্বরূপ > 📄 বয়স্ক ব্যক্তিবর্গ

📄 বয়স্ক ব্যক্তিবর্গ


নওজোয়ান ও নারীদের মতো বয়স্ক ব্যক্তিবর্গের প্রতিও ইসলামী মিডিয়ার মনোযোগী হওয়া উচিত। তাদের বাদ দিয়ে সামাজিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। কারণ সমাজ গঠনে তাদের মৌলিক ভূমিকা রয়েছে। জীবনের পড়ন্ত বেলায় উপনীত হওয়া সত্ত্বেও একটি সৎ সুস্থ সমাজ গঠন এবং তা উন্নততর বানাতে অবশ্যই তাদের প্রয়োজন রয়েছে। এ জন্য কোনো অবস্থাতেই তাদের অবহেলা করার সুযোগ নেই। ইসলামী মিডিয়ার মৌলিক দায়িত্ব হলো, সে নতুন প্রজন্মের পথ-নির্দেশ ও প্রশিক্ষণে বয়স্কদের থেকে সহযোগিতা নেবে এবং তাদের অভিজ্ঞতা থেকে উপকার লাভ করবে।
বয়স্ক ব্যক্তিবর্গ জীবনের এই পড়ন্ত বেলায় এসেও মিডিয়ার সংবাদ ও খবরাখবরের আলোচনা-পর্যালোচনা, ঘটনা-দুর্ঘটনা, তার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ও ফলাফলের ব্যাপারে বিরাট আগ্রহ পোষণ করেন। তাদের বেশি আগ্রহের বিষয় হলো, সেসব বিজ্ঞাপন, যার মধ্যে নতুন ও আধুনিক শিল্প-পণ্যের প্রচার এবং সৌন্দর্য তুলে ধরা হয়। এমনিভাবে শারীরিক দুর্বলতার এই বয়সে চিকিৎসা, ওষুধ-পথ্য এবং এ বিষয়ের আধুনিক গবেষণা সম্পর্কেও তাদের অসাধারণ আগ্রহ থাকে। অপরদিকে জীবন সায়াহ্নের এই মনযিলে হালকা পাতলা খবরাখবর, চিত্তাকর্ষক ও বিনোদনমূলক প্রোগ্রাম এবং নতুন কাহিনীর প্রতিও তাদের আগ্রহ থাকে।

📘 পশ্চিমা মিডিয়ার স্বরূপ > 📄 সফল মিডিয়ার বৈশিষ্ট্য

📄 সফল মিডিয়ার বৈশিষ্ট্য


সেসব বিষয়বস্তু মিডিয়া ও গণমাধ্যমের অন্তর্ভুক্ত, যেগুলো অন্যের নিকট পৌঁছানো হয়। তা লেখার মাধ্যমে হোক বা শ্রবণের মাধ্যমে হোক। প্রত্যক্ষ করার মাধ্যমে হোক বা দেখা, শ্রবণ ও মৌখিক কথোপকথনের মাধ্যমে সম্পন্ন হোক। মিডিয়ায় প্রকাশিত খবরাখবর ও রচনাবলীর মৌলিক উদ্দেশ্য, মিডিয়ার মাধ্যমে দর্শক-শ্রোতা ও পাঠকের ওপর প্রভাব ফেলা।
মিডিয়া তা যে আকৃতিতেই হোক, তার একটি নির্ধারিত উদ্দেশ্য ও পয়গাম থাকে। সেই পয়গাম ও উদ্দেশ্য তাতে প্রকাশিত খবরাখবর ও রচনাবলী দ্বারাই সুস্পষ্ট হয় এবং সে খবরাখবর ও রচনাবলীই দিক নির্ধারণ করে, তার কাজ কি, কোন্ সীমা পর্যন্ত তাকে এ কাজ আঞ্জাম দিতে হবে এবং কোথায় গিয়ে পৌঁছতে হবে। মিডিয়া কোনো একক ব্যক্তি বা বিশেষ ব্যক্তির জন্য হয় না; বরং তা কোনো বিশেষ দল, গোত্র, শ্রেণী কিংবা গোটা জাতির জন্য হয়। কখনো ব্যক্তিগত উদ্দেশ্যেও খবরাখবর ও রচনাবলী লেখা হয়ে থাকে, কিন্তু এমতাবস্থায় সেই খবরাখবর ও রচনাবলীর কপি তৈরি করে ব্যক্তিগতভাবে লোকদের নিকট পাঠানো হয়। অন্য ভাষায় আমরা বলতে পারি, প্রতিটি সংবাদের একটি নির্ধারিত উদ্দেশ্য ও বিশেষ পয়গাম থাকে। যদি কোন সাংবাদিক কিংবা রিপোর্টার তার সংবাদের মাধ্যমে কোনো পয়গাম পৌঁছাতে না পারে, তাহলে আধুনিক মিডিয়ার দৃষ্টিতে তার কোনো মূল্য নেই।
এমনিভাবে সংবাদের ফলাফলের প্রতি দৃষ্টি রাখা, সংবাদ নির্ধারিত লক্ষ্য-উদ্দেশ্য অর্জনে কতটুকু সফলকাম হয়েছে এবং সামনে আর কোন কোন স্তর বাকী আছে-তার প্রতিও দৃষ্টি রাখা জরুরী। জনতম গঠন ও মন-মানস তৈরির জন্য সাংবাদিকদের নিকট নিজস্ব মাধ্যম ও নির্ধারিত উপকরণ থাকে, যার মাধ্যমে তারা জেনে নেয়, তাদের সংবাদ, ছবি, ফটো, মন্তব্য, সাক্ষাতকার, বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা দ্বারা কি পরিমাণ মন-মানস তৈরি এবং কি পরিমাণ জনমত গঠন হয়েছে।
০১. পাঠক এবং শ্রোতাদের দৈনন্দিন জীবনের সাথে মিডিয়ার খবরাখবর ও রচনাবলীর সুগভীর সম্পর্ক রয়েছে। মিডিয়া জনগণের আবেগ-অনুভূতির প্রতিনিধিত্ব করে, তাদের কর্মপদ্ধতি ও আচরণ গঠনে উপকারী ও ফলপ্রসূ ভূমিকা পালন করে এবং পরিবেশ ও যাদের সাথে সে সম্পৃক্ত, তাদের ওপর প্রভাব ফেলে।
অভিজ্ঞতা দ্বারা এ কথা সুস্পষ্ট হয়, সাধারণতঃ পাঠক, শ্রোতা ও দর্শক নিজেদের আগ্রহ অভিরুচির জিনিসের সাথেই সম্পর্ক রাখে। যা তাদের রুচি ও আগ্রহের সাথে মিল খায় না, তা তারা গ্রহণ করে না। অন্য ভাষায় আমরা বলতে পারি, মিডিয়ার উপস্থাপিত বিষয়াবলী গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান করার ব্যাপারে লোকেরা স্বাধীন। জোরপূর্বক তাদের ওপর কোনো জিনিস চাপিয়ে দেয়া যায় না। বর্তমান যুগে প্রত্যেক ব্যক্তি নিজের মর্জি ও অভিরুচি অনুযায়ী সবকিছু দেখে, পাঠ করে ও শ্রবণ করে। এমনিভাবে কোনো বিষয়ের ওপর মতামত নির্ধারণ করা ও তার ওপর আস্থাশীল হওয়ার ব্যাপারে সে সর্বতোভাবে স্বাধীন।
নিজের ব্যাপারে অল্পে তুষ্টি ও বুঝকে বাস্তব আচরণে রূপান্তরিত করা বা পেছনে ঠেলে দেয়ারও সে সম্পূর্ণ স্বাধীন। যেমন সে বিড়ি-সিগারেট খাওয়া ক্ষতিকর মনে করে, কিন্তু সেটাকে পরিত্যাগ করে না। দ্রুত গতিতে গাড়ী চালানোকে সে বিপজ্জনক মনে করা সত্ত্বেও দ্রুতবেগে গাড়ী চালায়, কিন্তু সফল মিডিয়া তাই, যা পূর্বাহ্নে লোকদের বিড়ি-সিগারেট খাওয়ার ক্ষতিকর ও ধ্বংসাত্মক প্রভাব-প্রতিক্রিয়া এবং দ্রুত গতিতে গাড়ী চালানোর ফলে নিশ্চিত মৃত্যুর কথা বুঝিয়ে দেয়, এরপর তাকে আশ্বস্ত করে। তৃতীয় স্তরে সেটা তার বাস্তব কর্ম ও আচরণে রূপান্তরিত করে দেয়। তা এভাবে, বুঝা+রাজি-খুশি=বাস্তব আচরণ।
এর দ্বারা এই বাস্তবতা ভালভাবে সুস্পষ্ট হয়ে গেল যে, মিডিয়া জগতে বুঝাকে রাজি খুশির ভূমিকা আখ্যা দেয়া হয়। এই প্রয়োজনও সুস্পষ্ট হয় যে, তথ্য ও বিষয় এমনভাবে প্রস্তুত করা হবে, যাদের পর্যন্ত তার কথা পৌঁছানোর প্রয়োজন, সে তাদের ভালভাবে বুঝে নেবে, কিন্তু এটা জরুরী নয় যে, যে জিনিস কারো জন্য সুস্পষ্ট ও বোধগম্য, তা অন্যদের জন্যও বোধগম্য ও সুস্পষ্ট হবে। এটা নির্ভর করবে একজন সাংবাদিক তার সম্বোধিত ব্যক্তির মনস্তত্ত্ব, তার অভিরুচি ও ধ্যান-ধারণা, তার সংস্কৃতির মানদন্ড ও ঝোঁক সম্পর্কে কি পরিমাণ ওয়াকিফহাল-তার ওপর। কোনো বিষয়বস্তুর ওপর লেখা তৈরি করার পূর্বে এই বাস্তবতা তার সামনে থাকা উচিত। এ ক্ষেত্রে খোদ মিডিয়ার মৌলিক ভূমিকাকে কোনোক্রমেই পেছনে ঠেলে দেয়া যায় না। সে শ্রোতাদের জন্য পয়গামকে উদ্দেশ্যপূর্ণ ও ফলপ্রসূ বানানোর ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় গুরুত্ব রাখে। মিডিয়ার জগতে উল্লিখিত বৈশিষ্ট্যগুলোকে সূচনার স্তর বলা হয়।
০২. সফল মিডিয়ার দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য হলো, সে পাঠকের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হবে। অর্থাৎ খবরাখবর ও রচনাবলী এমনভাবে প্রস্তুত করতে হবে, যাতে তা অতিরঞ্জন মুক্ত হয়। তা উপস্থাপন করার ক্ষেত্রে রং চড়ানো এবং প্রতিক্রিয়া ব্যক্তকরণে অতিরঞ্জন ও সংকোচন থেকে মুক্ত হবে। সংবাদের মধ্যে না বেশি উষ্ণতা ও সুড়সুড়ি থাকবে আর না বেশি শীতলতা থাকবে। কারণ খবরের গভীরে ক্রিয়াশীল উদ্দেশ্যই মৌলিক গুরুত্ব রাখে, উল্লিখিত উভয় অবস্থায় সে তার প্রভাব ও উপকারিতা খুইয়ে ফেলবে। পাশাপাশি পাঠকদের সম্পর্কে সাংবাদিকদের এই প্রত্যাশাও রাখা উচিত নয় যে, সাংবাদিকদের পূর্বে পাঠক তার খবরাখবর দ্বারা প্রভাবিত হবে।
অর্থাৎ সর্বাগ্রে সাংবাদিকদেরই খবরাখবর ও রচনাবলী থেকে প্রভাবিত হওয়া জরুরী। তখনই এই প্রভাব ও শক্তিকে সে খবরের মাধ্যমে অন্যের নিকট স্থানান্তরিত করতে সক্ষম হবে। যদি সে স্বয়ং খবরের বাস্তবতা সম্পর্কে ওয়াকিফহাল না হয় এবং তার অভ্যন্তরে লুকায়িত পয়গাম ও উদ্দেশ্যাবলী সম্পর্কে বেখবর হয়, তাহলে অন্যের থেকে তার কোনো ধরনের প্রত্যাশা রাখা উচিত নয়। মিডিয়া বা গণমাধ্যম যতই শক্তিশালী হোক না কেন।
আরব কবি যুহাইর ইবনে আবু সালমা এই বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, মানুষ তার চরিত্র ও গুণাবলীকে যতই লুকানোর প্রচেষ্টা করুক, কিন্তু তা মানুষের নিকট পৌছে যায়। আরবী বাগধারা, 'তোমার ব্যক্তিত্বের মধ্যে যে বৈশিষ্ট্য নিহিত আছে, তা তোমার কথাবার্তা দ্বারাই প্রকাশ হয়ে পড়বে।'
অনেক রচনা, খবরাখবর ও কার্টুন এমন হয়, সত্তাগতভাবে যাতে অতিরঞ্জনের উদ্দেশ্য নিহিত থাকে। এভাবেও পাঠকের আস্থা অর্জন করা যায়। যেমন কার্টুনের মধ্যে অনেক মানব অঙ্গকে অত্যন্ত আলোকিত ও কৌতুকপূর্ণ আকারে পেশ করে, যা দেখলেই হাসি আসে। উদাহরণস্বরূপ কোনো কৃপণকে কার্টুনের আকৃতিতে এভাবে দেখানো হয়, তার দুটো হাতই বেঁটে, যা কৃপণের আলামত। এর দ্বারা মৌলিক উদ্দেশ্য হলো, লোকদের হৃদয়ে কৃপণতার প্রতি সাধারণ ঘৃণা ও তার সম্পর্কে হেয় মনোভাব সৃষ্টি করা।
এখানে একটি প্রশ্নের উদয় হয়, পাঠকের আস্থা অর্জন করাকে সফল মিডিয়ার মৌলিক শর্ত কেন আখ্যা দেয়া হয়? এর জবাব হলো, আস্থা অর্জন করতে আপনি আপনার ইচ্ছানুযায়ী যে কোনো পয়গাম তার কাছে সহজেই পৌঁছাতে পারবেন। সে চোখ বুজে আপনার ওপর আস্থা রাখবে। তাই কোনো সাংবাদিকের কাছে একজনের মৌলিক দাবী হলো, সে যে তথ্যই উপস্থাপন করুক, তাতে যুক্তি ও ভারসাম্য থাকবে এবং তা ধমক, প্রতিশ্রুতি, অঙ্গীকার, আত্মঅহংকার ও আত্মগরিমা মুক্ত হবে; বরং মিডিয়ার বিষয়াবলী নম্রতা, ভালবাসা ও দয়ার ওপর প্রতিষ্ঠিত হবে।
০৩. সফল মিডিয়ার তৃতীয় বৈশিষ্ট্য হলো, সংবাদ ও রচনা উপস্থাপনে মনস্তাত্ত্বিক সমন্বয় ও বিন্যাসের প্রতি লক্ষ্য রাখা। এই মৌলিক বাস্তবতা প্রতিটি সংবাদপত্রের সম্পাদক এবং রেডিও-টিভির প্রোগ্রাম তৈরিকারীদের সামনে থাকা উচিত, তারা সংবাদ উপস্থাপনে মনস্তাত্ত্বিক বিন্যাসের প্রতি লক্ষ্য রাখবে। বার্তা সম্পাদকের আসল পূর্ণতা ও সৌন্দর্য এটা নয় যে, তিনি যেনতেনভাবে সংবাদ উপস্থাপন করে দেবে, বরং আসল পূর্ণতা ও সৌন্দর্য হচ্ছে, শ্রোতা ও প্রত্যক্ষকারীরা যেভাবে উত্তম থেকে উত্তম অবস্থায় তা শুনতে ও দেখতে চায়, সেভাবে বার্তা সম্পাদক সংবাদ প্রকাশ করবেন।
অন্য ভাষায়, সংবাদ উপস্থাপনকারীদের উচিত, সংবাদ-শ্রোতাদের হৃদয়ের আওয়াজ, অনুভূতি, তার বুঝ, গ্রহণযোগ্যতা, রাজি-খুশি এবং চেতনার সাথে সাথে চলবে এবং বিবেকের পূর্বে অনুভূতিকে প্রভাবিত করতে সফলকাম হবে। সংবাদের প্রতিটি শব্দ এবং প্রতিটি বাক্য এমনভাবে আদায় করবে এবং সেই পদ্ধতিই গ্রহণ করবে, যা তার জন্য উপযোগী। অর্থাৎ রচনাবলী ও তার প্রাণের সাথে পুরোপুরি সমন্বয় করে সেই চেতনা নিজের ওপর চাপিয়ে নেবে, যা খবরের গভীরে লুকায়িত থাকে। আমরা এই মর্মকে এভাবেও আদায় করতে পারি, মিডিয়ার বিষয়বস্তু ও তথ্যাবলী বিবেক এবং চেতনার দুই বাহুর সাহায্যে আকাশে বিচরণ করে।
মিডিয়ার জগতে এই মৌলিক প্রশ্ন সর্বদা সামনে থাকে যে, এক মিডিয়ার পয়গাম অপর মিডিয়ার পয়গামের সাথে সমন্বয়পূর্ণ হবে, না তার বিপরীত হবে। সমন্বয় হওয়ার ক্ষেত্রে আপনার মিডিয়ার পয়গাম ফলপ্রসূ ও উপকারী প্রমাণিত হবে না। কারণ দর্শক অথবা পাঠক অথবা শ্রোতা সর্বদা নিত্য নতুন জ্ঞান, দুর্লভ খবরাখবর ও সর্বাধুনিক বাস্তবতার সন্ধানে থাকে। সে আপনার কাছ থেকে এক খবর বা একই গান বার বার শুনে তার সময় নষ্ট করবে না। এমতাবস্থায় কোনো কিতাব প্রণয়ন, রেডিও-টিভির প্রোগ্রাম তৈরি ও বিশ্লেষণ, পত্র পত্রিকার সংবাদ ও সম্পাদকীয় তৈরি এবং লেখার ক্ষেত্রে নতুনত্ব ও অভিনবত্ব থাকা জরুরী। একই অবস্থা গ্রন্থ রচনার বেলায়ও প্রযোজ্য। একই বিষয়ের ওপর এত ব্যাপক কিতাব, পত্র-পত্রিকা ও ম্যাগাজিন রয়েছে, যেগুলোর ডজন ডজন কিতাব, পত্র-পত্রিকা ও ম্যাগাজিনে আপনার কাজের কথা শতকরা দুই শতাংশেরও কম পাবেন।
প্রোগ্রামসমূহের পারস্পরিক বৈপরীত্য ও বিরোধের ক্ষেত্রে মিডিয়ার দায়িত্ব অত্যন্ত বিপজ্জনক সীমা পর্যন্ত স্পর্শকাতর ও নাযুক হয়। কারণ দুই পরস্পর বিরোধী প্রোগ্রাম দেখে বা শুনে পাঠক শ্রোতা হয়রান পেরেশান হয়ে যায়। তার বুঝে আসে না, সে কোনটির সমর্থন ও সত্যায়ন করবে। দুটি প্রোগ্রামে দ্বন্দ্ব বৈপরীত্য থাকলে পাঠক দর্শক তাৎক্ষণিকভাবে দুটোই প্রত্যাখ্যান করে এবং এ কথা বলে নিজের আঁচল ছাড়িয়ে নেয় যে, দুটোই মিথ্যা। মিডিয়ার কাছে তো তার প্রত্যাশা থাকে, সে তার পথ নির্দেশ করবে, কিন্তু এর পরিবর্তে সে দেখে, সে মিডিয়ার বিভিন্ন তীরের নিশানায় পরিণত হচ্ছে। এমতাবস্থায় প্রোগ্রাম প্রস্তুতকারীদের মৌলিক দায়িত্ব হলো, সে এমনভাবে প্রোগ্রাম উপস্থাপন করবে যে, স্বয়ং তার অভ্যন্তরীণভাবে আস্থা সৃষ্টি হবে, তার মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব বিরোধ থাকবে না।
প্রোগ্রাম তৈরিতে মৌলিক যে বিষয়ের লক্ষ্য রাখা জরুরী তা হলো, যা কিছু উপস্থাপন করা হবে তা যৌক্তিক ও দলীল-প্রমাণভিত্তিক হবে। বিষয়গুলো এমন দলীল প্রমাণভিত্তিক হবে যা প্রত্যাখ্যান বা জবাব দেয়া অসম্ভব হয়ে যায়। কারণ মিডিয়ার পয়গাম যখন ছাঁচে ঢালা হয় তখন তাতে চেতনা ও যুক্তি উভয়টির প্রতিই পুরোপুরি লক্ষ্য রাখা হয়। এটা বাস্তবতা যে, বাস্তব জীবনের ওপর প্রতিষ্ঠিত ঘটনা ও তথ্যাবলী ব্যক্তিগত চিন্তা-ভাবনা, ধ্যান-ধারণার মোকাবেলায় বেশি ফলপ্রসূ, শক্তিশালী ও হৃদয়গ্রাহী হয়। দ্বিতীয় বাস্তবতা হলো, মিডিয়ার পয়গাম সুস্পষ্ট ও তার উদ্দেশ্য নির্ধারিত হওয়া উচিত। সাংবাদিক তার খবরাখবর, ছবি, কার্টুন ও সম্পাদকীয় দ্বারা লোকদের কি পয়গام দিতে চান, তার কি কোনো সীমিত উদ্দেশ্য আছে? সে স্বয়ং সুস্পষ্টভাবে তার উদ্দেশ্যাবলী বর্ণনা করে না; বরং সে তা পাঠক দর্শক ও শ্রোতার মেধার ওপর ছেড়ে দেয় অথবা খবরের উদ্দেশ্য সুস্পষ্টভাবে বলে দেয়, যাতে পাঠক- শ্রোতার কোনো কষ্ট না হয়।
অতঃপর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিষয়ের ওপর লেখার জন্য জরুরী হলো, সে এ বিষয়ে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি অথবা খোদ নিজের অভিমত প্রকাশ করে দেবে। আমেরিকার দুই সাংবাদিক একটি বিষয়ে মাঠ জরিপ চালিয়েছিল। তাদের জরিপের যে ফলাফল সামনে আসে তা হলো, যেসব প্রোগ্রামের উদ্দেশ্য সুস্পষ্ট ও নির্ধারিত ছিল, সেগুলো ৪৮% শ্রোতা বুঝেছে। আর যেসব প্রোগ্রামের উদ্দেশ্য সুস্পষ্ট ও নির্ধারিত ছিল না, তার সম্পর্কে ১৯% শ্রোতা পছন্দ ও পরিবর্তনের কথা বলেছেন। এমনিভাবে মিডিয়ার জগতে একথার ওপর মৌলিক গুরুত্ব দেয়া উচিত যে, মিডিয়ার পয়গাম সুস্পষ্ট ও নির্ধারিত হওয়ার পাশাপাশি সে কাজের ধরন পদ্ধতিও আলোচনা করা জরুরী। এও জরুরী যে, সে খবরের সময় ও স্থান তার সাথে সম্পৃক্ত এবং উপযোগীও।
প্রোগ্রাম প্রস্তুতকারীদের জন্য এটাও জরুরী যে, তারা পাঠক শ্রোতার সাধারণ ধ্যান-ধারণা থেকে উপকৃত হবে এবং নতুন নতুন চিন্তা-ভাবনা ও ধ্যান-ধারণা পাঠকের সামনে উপস্থাপন করবে। এই পদ্ধতিতে হিটলারের যুগে গোয়েবলস বিরাট ফায়দা লাভ করেছে।
০৪. ইসলাম উপকরণ ও উদ্দেশ্যের মধ্যে কোনো পার্থক্য রাখেনি। তার নিকট উভয়ের মাঝে না শুধু সমন্বয় জরুরী; বরং ইসলামের মাপকাঠিই চূড়ান্ত। শালীন উন্নত উদ্দেশ্যাবলী অর্জন করার জন্য অশালীন নিম্নমানের উপকরণ গ্রহণ করা যেতে পারে না।
ক. আধুনিক যুগে বিত্তশালী, পুঁজি বিনিয়োগকারী এবং বড় বড় রাজনীতিক তাদের বস্তুগত স্বার্থ অর্জনের জন্য পত্র পত্রিকা ও মিডিয়াকে দ্বিতীয় উপকরণ হিসেবে গ্রহণ করে। এখন তো মিডিয়া একটি স্বতন্ত্র শিল্পের রূপ ধারণ করেছে।
খ. শাহ ওয়ালী উল্লাহ (র.) তাঁর নযীরবিহীন গ্রন্থ 'হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা'য় লেখেন, অর্থনীতি চরিত্রের অনুগামী হওয়া উচিত, কিন্তু আধুনিক যুগে বস্তুতান্ত্রিক মেধা মাদকদ্রব্য, নাইট ক্লাব, নৃত্যমঞ্চ এবং সিনেমার বিকাশের জন্য মিডিয়ায় বড় বড় বিজ্ঞাপনের আশ্রয় নিয়েছে, কিন্তু ইসলামী মিডিয়া এ ধরনের বিজ্ঞাপন প্রচার ইসলামী চরিত্র ও মৌলিক নীতিমালার পরিপন্থী মনে করে।
গ. ইসলামী মিডিয়ায় সর্বাবস্থায় প্রতিটি জিনিসের ওপর চারিত্রিক মূল্যবোধ ও মৌলিক নীতিমালার প্রাধান্য রয়েছে, অন্যান্য সকল বস্তু তার অনুগামী। পক্ষান্তরে পাশ্চাত্য মিডিয়ায় বস্তুগত স্বার্থের মোকাবেলায় অভ্যন্তরীণ ও চারিত্রিক মূল্যবোধের কোনো মর্যাদা নেই। জনগণের জন্য যে প্রোগ্রামই উপস্থাপন করা হবে, তাতে বস্তুগত স্বার্থ ও লাভ সর্বাধিক মর্যাদা রাখে। কারণ তার সামনে কোনো উচ্চ শালীন মর্যাদাকর উদ্দেশ্য নেই, না কোনো সুস্পষ্ট লক্ষ্য-উদ্দেশ্য আছে, আর না কোনো মানবীয় সমস্যার ব্যাপারে পশ্চিমা মিডিয়ার নিষ্ঠা ও আন্তরিকতাপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। পশ্চিমা মিডিয়া যে কোনো মূল্যে বস্তুতান্ত্রিক মূল্যবোধকে অগ্রাধিকার দেয়। এর জন্য তাকে হারামের আশ্রয় নিতে হোক অথবা মাদক ও যৌন চেতনা উসকে দেয়ার প্রয়োজন পড়ুক অথবা পাশবিক প্রবৃত্তি বিকশিত করতে যত নিম্নেই অবতরণ করতে হোক না কেন, তার জন্য সে প্রস্তুত।
ঘ. উপায়-উপকরণ ও মাধ্যমসমূহকে যখন পবিত্র উদ্দেশ্যের ধারক হতে হবে তখন খবরাখবর ও রচনাবলীও পবিত্র এবং উন্নত হতে হবে। জ্ঞান, প্রজ্ঞা, নিষ্ঠাপূর্ণ পথনির্দেশ এবং কল্যাণকামিতার চেতনা তার গভীরে ক্রিয়াশীল হতে হবে। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তার উদ্দেশ্য হতে হবে মানবতার পুনর্গঠন। ইসলামী মিডিয়া সচেতন ও ভারসাম্যপূর্ণ হয়। উত্তেজনা ও অহেতুক চেতনা থেকে মুক্ত থাকে। এসব কিছু থেকে যে বিষয়টি সর্বপ্রধান তা হলো, তার ভিত্তি হবে তাওহীদের বিশ্বাসের ওপর। বিদআত, কুসংস্কার প্রবৃত্তির কামনা-বাসনা থেকে মুক্ত থাকে। কারণ ইসলামী মিডিয়া ও দাওয়াত একে অপরের সাথে সংযুক্ত।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00