📄 ইসলামে মিডিয়ার দ্বীনী গুরুত্ব
নিম্নবর্ণিত বুনিয়াদগুলোর ভিত্তিতে ইসলামে মিডিয়া ও প্রচার মাধ্যমের গুরুত্ব অপরিসীম।
০১. ইসলামের আবির্ভাব গোটা বিশ্ব ও সমগ্র মানবতার জন্য। আর আল্লাহ তাআলা সমগ্র সৃষ্টির সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা ও মালিক। সৃষ্টির প্রতিটি অণু-পরমাণু তাঁর একত্ববাদের সাক্ষ্য দেয়।
০২. যে ব্যক্তিই এ দীন গ্রহণ করবে, তার ওপর এ দীন অন্যের নিকট পৌছানোর দায়িত্বও অনিবার্যভাবে এসে যায়। স্ব স্ব যুগে প্রত্যেক নবী-রাসূল এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব আঞ্জাম দিয়েছেন। পবিত্র কুরআন হাদীসেও এর তাগিদ এসেছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন, 'আপনার পালনকর্তার পথের প্রতি আহবান করুন জ্ঞানের কথা বুঝিয়ে ও উপদেশ শুনিয়ে উত্তমরূপে এবং তাদের সাথে বিতর্ক করুন পছন্দযুক্ত পন্থায়।' (সূরা আন নাহল-১২৫)
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, 'আমার পক্ষ থেকে তোমরা যাই জান, তাই পৌঁছে দাও। যদিও তা একটি আয়াতই হোক।'
রাসূলুল্লাহ (সা.) অন্যত্র বলেন, 'আল্লাহ তাআলা ওই ব্যক্তির চেহারা উজ্জ্বল করুন, যে আমার কথা শুনল অতঃপর তা অন্যের নিকট পৌছে দিল।'
০৩. শেষ নবী, তাঁর সঙ্গী-সাথীগণ ও পর্যায়ক্রমে পরবর্তীদের দায়িত্ব এ দীন অন্যের নিকট পৌঁছে দেয়া। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, 'রাসূলের দায়িত্ব শুধু পৌছে দেয়া।'
০৪. ইসলামের পয়গাম অন্যের নিকট না পৌঁছানো বড় গুনাহ। কারণ তখন তা একরকম ইসলাম গোপন করার শামিল হবে। এজন্য প্রতিটি মুসলমানের অবশ্য করণীয় হলো জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত দীনের পয়গাম অন্যের নিকট পৌঁছাতে থাকা। রাসূলুল্লাহ (সা.) ও তাঁর সাহাবায়ে কেরামকে দীনের বাণী অন্যের নিকট পৌঁছাতে গিয়ে যে সীমাহীন দুঃখ-যাতনা ও অবর্ণনীয় জুলুম নির্যাতনের সম্মুখীন হতে হয়েছিল, ইসলামী ইতিহাসে তা ভরপুর।
📄 মিডিয়া ও দাওয়াত
পবিত্র কুরআনে মিডিয়া বা প্রচার মাধ্যমের অর্থ প্রকাশ করার জন্য 'দাওয়াহ' শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, যা একটি অতি ব্যাপক, বিস্তৃত, সাহিত্যপূর্ণ, অলংকারপূর্ণ ও শক্তিশালী শব্দ। এর বিকল্প অন্য কোন শব্দ নেই। 'দাওয়াহ' শব্দ কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন-'আপনার পালনকর্তার পথের প্রতি (দাওয়াত) আহবান করুন জ্ঞানের কথা বুঝিয়ে ও উপদেশ শুনিয়ে উত্তমরূপে এবং তাদের সাথে বিতর্ক করুন পছন্দযুক্ত পন্থায়।' (সূরা আন নাহল-১২৫)
অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে, 'হে ঈমানদারগণ! আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশ মান্য কর, যখন তোমাদের সে কাজের প্রতি আহবান করা হয়, যাতে রয়েছে তোমাদের জীবন।' (সূরা আনফাল-২৪)
আরো ইরশাদ হয়েছে, 'আর তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকা উচিত যারা আহবান জানাবে সৎকর্মের প্রতি, নির্দেশ দেবে ভাল কাজের এবং বারণ করবে অন্যায় কাজ থেকে, আর তারাই সফলকাম।' (সূরা আলে ইমরান-১০৪)
আরো ইরশাদ হয়েছে, 'সে বলল, হে আমার পালনকর্তা, আমি আমার সম্প্রদায়কে দিবারাত দাওয়াত দিয়েছি।' (সূরা নূহ-৫)
কুরআনের আলোচ্য আয়াতগুলোর 'দাওয়াত বা আহবান' শব্দ দ্বারা সুস্পষ্ট প্রতিভাত হয়, ওলামায়ে কেরাম ও দীনদার শ্রেণীর দায়িত্ব হলো আল্লাহ ও তাঁর দীন ইসলামের প্রতি মানুষকে আহবান করা। এ বিষয়ে 'দাওয়াহ' শব্দটি অন্যান্য শব্দের তুলনায় অতি ব্যাপক বিস্তৃত এবং এর মধ্যে দাঈ'র দাওয়াতী কার্যক্রম ও কর্মতৎপরতাও চিহ্নিত হয়ে যায়। 'দাওয়াহ' শব্দ দ্বারা যে মর্মার্থ ফুটে ওঠে তা নিম্নরূপ-
ক. দাওয়াহ পরিভাষার মধ্যে ব্যাপক জনগোষ্ঠীর নিকট পয়গাম পৌছানো কিংবা সীমিত ও পরিচিত ব্যক্তিবর্গের নিকট আহবান পৌঁছানো উভয়ই শামিল রয়েছে। এই পরিভাষার মধ্যে পথনির্দেশ ও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের গুণ-বৈশিষ্ট্য পাওয়া পাওয়া। পাশাপাশি এতে দাওয়াতে সম্বোধিত ব্যক্তির মনস্তত্ত্ব সম্পর্কে ওয়াকিফহাল হওয়ার কথাও রয়েছে, যাতে দাওয়াত নিশ্চিতভাবে সফলকাম ও ফলপ্রসূ হয়।
খ. দাওয়াহ পরিভাষার মধ্যে সম্বোধিত ব্যক্তির ব্যাপারে দাঈ'র যিম্মাদারী বা দায়িত্ববোধও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সে দায়িত্ববোধ হলো, দাওয়াতের প্রতি দাঈ'র পূর্ণ আস্থা-বিশ্বাস থাকতে হবে। তার বিবেক বুদ্ধি অন্তর ও শিরা-উপশিরায় তা সংক্রমিত হতে হবে। কারণ দাওয়াতের প্রয়োজনীয়তাবোধ থেকেই সে অন্যের নিকট এ পয়গাম পৌঁছাতে বাধ্য, যাতে অন্যরাও তার আলোয় আলোকিত হয়, যে আলোয় সে আলোকিত হয়েছে।
গ. দাওয়াহ পরিভাষার মধ্যে আনুগত্য অনুসরণ ও তত্ত্বাবধানের মর্মও শামিল রয়েছে, যাতে সে জানতে পারে, অন্যদের ওপর দাওয়াতী পয়গামের কি প্রতিক্রিয়া হয়েছে, সে কি পরিমাণ ভূমিকা পালন করেছে, সেই প্রতিক্রিয়ার ধরন ধারণ এবং অবস্থাই বা কি? কোথাও এমনটি তো হয়নি যে, তার দাওয়াত ব্যর্থ হয়েছে।
মোটকথা, দাওয়াহ শব্দের মধ্যে নিরবচ্ছিন্ন কর্মতৎপরতা, চেষ্টা-প্রচেষ্টা ও সংগ্রামের অর্থ অন্তর্নিহিত রয়েছে। আধুনিক যুগের পরিভাষায় ডাইনামিক আন্দোলন এবং নিরলস নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম বলা যেতে পারে। এই পরিভাষার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ এভাবে বুঝা যেতে পারে, মিডিয়ার প্রভাবের তিনটি বিভাগ রয়েছে, এক. পুনরাবৃত্তি, দুই. নতুনত্ব, তিন. মনে করিয়ে দেয়া।
📄 পুনরাবৃত্তি
কোনো পয়গাম অন্যের নিকট নিত্য নতুন পদ্ধতিতে পৌছানো এবং লাগাতার তার পুনরাবৃত্তি ঘটানোর অর্থ হচ্ছে, অবস্থা ও ঘটনাভেদে একই পয়গাম নিত্য নতুন ও অভিনব পদ্ধতিতে বার বার উপস্থাপন করা, যাতে তার মধ্যে অসাধারণ শক্তি ও প্রভাব এসে যায়। এরপর আবার যখন সুযোগ আসবে তখন সেটাকে গনীমত মনে করে সেই একই পয়গাম অভিনব পন্থায় মোড়ক পাল্টিয়ে উপস্থাপন করা, যাতে দর্শক-শ্রোতার নিকট তা একেবারে নতুন মনে হয়।
এতে কোনো সন্দেহ নেই, মানবজীবনের সাথে সংশ্লিষ্ট এমন অনেক মৌলিক প্রয়োজন রয়েছে যা তার আকীদা-বিশ্বাস ও আচরণের অবিচ্ছেদ্য অংশ, যার পুনরাবৃত্তি অতি জরুরী হয়ে পড়ে। উদাহরণস্বরূপ পোলিও ও অন্যান্য রোগ বালাই থেকে হেফাযতের জন্য টিকা দেয়া, যার জন্য সময় সময় মিডিয়ার মাধ্যমে প্রচারণা চালানো হয়। এমনিভাবে ইসলামী শরীয়ার বিধি-নিষেধ, যেমন নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাত, কুরবানী ইত্যাদির মাসায়েল সর্বদা নতুন নতুন আঙ্গিকে ফলপ্রসূ পদ্ধতিতে উপস্থাপন করা এবং কুরআন-হাদীসের দাওয়াত পদ্ধতি বার বার পুনরাবৃত্তির সাথে অভিনব ও নতুন আঙ্গিকে তুলে ধরা।
📄 নতুনত্ব
'নতুনত্ব' শিরোনাম দ্বারাই একথা ভালভাবে সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, এর অর্থ এক চিন্তা থেকে অন্য চিন্তা গ্রহণ করা। কারণ উভয়ের মাঝে একটি সম্পর্ক ও যোগাযোগ আছে। উদাহরণস্বরূপ তাওহীদ বিষয়ে আলোচনা করার অর্থ হলো, শিরক, কুফর ও মূর্তিপূজার প্রতি ঘৃণা সৃষ্টি করা। এমনিভাবে নবী-রাসূলগণের জীবন ও চরিত্র নিয়ে নিত্য নতুন পদ্ধতিতে আলোচনা করার অর্থ হলো, সবার জন্য এমন জীবন ও এমন চরিত্রই প্রত্যাশা করা। সভ্য মানুষে পরিণত হওয়ার আহবানের অর্থ হলো, মূর্খতা নিরক্ষরতা নির্মূল করা, সমাজে সুশৃংখল জীবন যাপন করা, পরিবেশকে দূষণ থেকে রক্ষা করা এবং নাগরিক আইন-কানুন ও ব্যবস্থাপনার প্রতি যত্নবান হওয়ার আহবান করা-এসব কিছুই এতে অন্তর্ভুক্ত।