📄 প্রোপাগান্ডার পদ্ধতি
প্রোপাগান্ডার বিভিন্ন ধরন রয়েছে, কিন্তু তার মধ্যে নিম্নবর্ণিত ধরনগুলো তুলনামূলক বেশি প্রসিদ্ধ।
০১. সূক্ষ্ম পদ্ধতি : এ পদ্ধতির সম্পর্ক সেসব জাতিগোষ্ঠীর সাথে, যারা উন্নত জীবন মানে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। এই পদ্ধতি সাধারণত খুবই কার্যকর ও ফলপ্রসূ।
০২. পুনরাবৃত্তির পদ্ধতি : এই পদ্ধতিতে প্রোপাগান্ডাকারী সম্পূর্ণভাবে আশ্বস্ত হয়ে যায় যে, প্রচলিত প্রোপাগান্ডা মন মস্তিষ্কে গেঁথে গেছে।
০৩. দীনী পদ্ধতি : ইসলামী সমাজে এ নামের কোনো প্রোপাগান্ডা চলতে পারে না। কারণ ইসলামে প্রকৃতপক্ষে দীনী পদ্ধতি ও পার্থিব পদ্ধতি বলে ভিন্ন কিছু নেই। নিঃসন্দেহে ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ দীন, পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা, কিন্তু অন্যান্য সমাজে দীন ধর্মকে কিছু কাল পর্যন্ত প্রোপাগান্ডার সেবার জন্য ব্যবহার করা হয়।
০৪. মিথ্যা ও অপবাদ আরোপ পদ্ধতি : এই পদ্ধতির মধ্যে মিথ্যা, বিকৃতি, সংযোজন, বিয়োজন ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ভারতের বাবরী মসজিদ, গিয়াপী মসজিদ ও মথুরার ঈদগাহ সম্পর্কে হিন্দুদের প্রোপাগান্ডা এবং ফিলিস্তিন বিষয়ে ইসরাঈলের প্রোপাগান্ডা।
০৫. গান ও সংগীতের পদ্ধতি : এই পদ্ধতি জেহাদী চেতনা উজ্জীবিত করা, জালেমের বিরুদ্ধে প্রতিশোধস্পৃহা সৃষ্টি করা, মজলুমের সাহায্য-সহযোগিতা করা এবং দেশ জাতির হেফাযতের উদ্দীপনা সৃষ্টির জন্য অত্যন্ত ফলপ্রসূ, উপকারী ও কার্যকর।
০৬. উত্তেজনাকর শ্লোগানের পদ্ধতি : এই পদ্ধতির আসল উদ্দেশ্য হলো, কাপুরুষ নেতাদের হুমকিমূলক প্রচার-প্রচারণা, বক্তৃতা-বিবৃতি এবং ঐক্য-উন্নয়ন, তাহযীব-তামাদ্দুন, অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান, ইনসাফ-সমতা, গণতন্ত্র ও সচ্ছলতার শ্লোগানের পুনরাবৃত্তি করা। ভারতে বাবরী মসজিদ শহীদ করার ক্ষেত্রে এসব উত্তেজনা সৃষ্টিকারী বক্তৃতা বিবৃতি ও শ্লোগানের বিরাট ভূমিকা রয়েছে, যা এ ঘটনার পক্ষ-বিপক্ষের নেতারা বিভিন্ন সময় দিয়েছে। যেমন, আমরা রক্তের লোহিত সাগর সৃষ্টি করে দেব, রক্তের বন্যা বইয়ে দিব। আমরা প্রয়োজনে মাথার কুতুব মিনার বানাব। দিল্লী থেকে অযোধ্যা পর্যন্ত পথে যত মন্দির রয়েছে, আমরা তার সবগুলো মিসমার করে দেক। বিশ্ব হিন্দু পরিষদের শ্লোগান-মুসলিমদের রাস্তা দুটোই। হয় পাকিস্তান না হয় কবরস্তান। তেল লাগাও ডাবরের নাম মেটাও বাবরের।
০৭. জবাবী প্রোপাগান্ডা : আমরা এখানে ইসলামের জবাবী প্রোপাগান্ডার কথা উল্লেখ করব। এই প্রোপাগান্ডা আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ষড়যন্ত্রের মোকাবেলায় বস্তুগত টেকনিক দ্বারা সুসজ্জিত। প্রোপাগান্ডাকারীরা টিকটিকির মতো রঙ পরিবর্তন করে। কখনো কখনো বাস্তব ঘটনাবলী সংক্রান্ত তাদের ডকুমেন্টগুলো আগ্নিতে ভস্মীভূত করে দেয়। অতঃপর আফসোস করতে থাকে। ইসলামের জবাবী প্রোপাগান্ডাকে আমরা নিম্নবর্ণিত বিষয়াবলীর আলোকে আমাদের জন্য আরো বেশি কার্যকর ও ফলপ্রসূ বানাতে পারি। জবাবী প্রোপাগান্ডার সফলতার প্রথম মৌলিক শর্ত হলো কিতাব ও সুন্নাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করা এবং তার শিক্ষার ওপর পূর্ণ আস্থা রাখা। শত্রুর প্রোপাগান্ডাকে দীন ও শরীয়তের মাপকাঠিতে পরিমাপ করে তার গুরুত্বপূর্ণ উপাদানগুলোর বিশ্লেষণ করা, যাতে তার বাস্তবতা সুস্পষ্ট হয়ে যায়।
০৮. শত্রুর প্রোপাগান্ডার দুর্বল দিকগুলো অনুসন্ধান করে তার ওপর আঘাত হানা। সরাসরি শত্রুর সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হওয়া থেকে বিরত থাকা। কারণ এতে শত্রু আরো শক্তিশালী ও সুসংগঠিত হয়।
০৯. শত্রুর প্রোপাগান্ডার জন্য বিরূপ পরিবেশ সৃষ্টির প্রয়াস চালানো। এমনকি যাতে মিডিয়ার ওপরও তার প্রভাব-প্রতিক্রিয়া না পড়ে। (সূত্র: তা'মীরে হায়াত-১৯৯২, জানুয়ারী সংখ্যা)
📄 লবিংয়ের আধুনিক সিস্টেম
প্রোপাগান্ডার উন্নত ও অত্যাধুনিক পদ্ধতি হলো লবিং (Lobbying)। লবিংয়ের অর্থ জনমত গঠন করা এবং কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য কোনো শ্রেণীর ওপর চাপিয়ে দেয়া। প্রোপাগান্ডার মতো এ লবিংও একটি নিয়মতান্ত্রিক পেশার রূপ ধারণ করেছে। এ উদ্দেশ্যের জন্য বিভিন্ন সরকার ও সংগঠন লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে। এ ময়দানে বিত্ত-বৈভবের কারণে ইহুদী গোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি এগিয়ে রয়েছে। আমেরিকা ও অন্যান্য পশ্চিমা দেশে ডজনে ডজনে ইহুদী সংস্থা প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যাদের কাজই শুধু লবিং করা। বিশেষ করে আমেরিকার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এর অসাধারণ গুরুত্ব দেয়া হয়। কারণ সেখানে সরকারের কর্মকান্ডের পরিধি অনেক ব্যাপক বিস্তৃত হয়ে গেছে এবং সমস্যাও সংখ্যা ও ধরন-ধারনের দিক থেকে অনেক বেড়ে গেছে। এ জন্য কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছতে হলে কংগ্রেস সদস্যদের সরকার ও পার্লামেন্টের বাইরে বিশেষজ্ঞদের সাথে পরামর্শ করতে হয়।
এই প্রয়োজন লবি সৃষ্টিকারী অসংখ্য পেশাদার সংগঠনের জন্ম দিয়েছে, যারা কংগ্রেসের সদস্যবর্গ ও তাদের সহকারীদের সাথে শুধু যোগাযোগই করে না; বরং তাদের ওপর প্রভাব সৃষ্টি করার অস্ত্রও প্রয়োগ করে। যার মধ্যে জরুরী আইনী নীতিমালার গবেষণা-পর্যালোচনা, বিজ্ঞাপন প্রচার এবং রেডিও-টিভিতে টকশো ছাড়াও সংশ্লিষ্ট সরকারী সদস্যদের নিকট জনগণ থেকে ফোন, চিঠিপত্র ও টেলিগ্রামের মাধ্যমে দাবী-দাওয়া পেশ করানোর কাজও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে লবিংকারী সংগঠন ও গণসংযোগকারী প্রতিষ্ঠানের মাঝে পার্থক্য রয়েছে, সেটা দৃষ্টিতে রাখা জরুরী। যদিও বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে উভয় প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য এক অভিন্ন হয়ে যায়, কিন্তু লবিংকারী প্রতিষ্ঠানের কাজ হলো মার্কিন কংগ্রেসের বিভিন্ন পর্যায়ে যোগাযোগ রক্ষা করা এবং আইন প্রণয়নে যে কোনো ধরনের জটিলতার মোকাবেলা করা। আর গণসংযোগকারী প্রতিষ্ঠানের কাজ হলো মিডিয়ার মাধ্যমে কোনো কাজের প্রতি জনগণের সমর্থন ও বিরোধিতাকে প্রভাবিত করা। অনেক সময় লবিংকারী প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের মিশনে সফলতার জন্য গণসংযোগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সাহায্য ও সেবা গ্রহণ করে।
দুনিয়ার অন্যান্য সরকারের মোকাবেলায় মার্কিন সরকারের কর্মকান্ডের ধরন সম্পূর্ণ ভিন্ন। অন্যান্য দেশে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ কিংবা আইনের কোনো পরিবর্তন ও সমর্থনের জন্য সরকারের দু'চার জন ব্যক্তির সাথে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখলেই যথেষ্ট, কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এ কাজের জন্য হাজার হাজার ব্যক্তিকে আন্দোলিত করতে হয় এবং এটিকে গণমুখী রূপ দিতে হয়।
ওয়াশিংটনে বিদেশী বিভিন্ন সরকারের জন্য লবি সৃষ্টি করা একটি নিয়মতান্ত্রিক শিল্পে পরিণত হয়েছে। কারণ আমেরিকা গোটা বিশ্বের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করে। আমেরিকার মর্জি ছাড়া বিশ্বের কোনো সরকারই এককভাবে কিছু করতে পারে না। এজন্য মার্কিন প্রশাসনে প্রভাব-প্রতিপত্তি বাড়ানো কিংবা তার দৃষ্টি আকর্ষণে প্রচেষ্টারত দেশের সংখ্যা বিগত কয়েক বছরে বিশেষ করে ঠান্ডা লড়াইয়ের পরিসমাপ্তির পর থেকে খুব দ্রুত বেড়ে গেছে।
অনেক ছোট দেশ রয়েছে, যারা পূর্বে আমেরিকা বিরোধী ছিল, কিন্তু এখন তারা আমেরিকার সমর্থনের আকাঙ্খী। এসব দেশ ও সরকার সরাসরি মার্কিন প্রশাসন কিংবা পার্লামেন্টের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে না, এর জন্য লবির দরকার হয়। ফলে এখন লবির প্রয়োজন সীমাহীন বেড়ে গেছে। বর্তমানে আমেরিকায় নয়শ' বিয়াল্লিশটি লবি শুধু বিদেশী গ্রাহকদের জন্য কাজ করছে। এসব লবির মধ্যে শুধু ইসরাঈলের জন্য কাজ করছে প্রায় দেড়শ' প্রতিষ্ঠান, যাদের বার্ষিক বাজেট এক কোটি ডলার। (আশ-শারকুল আওসাত পত্রিকা, ১০ ডিসেম্বর-১৯৯৪)
এসব লবি বিভিন্ন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, সংগঠন, সংস্থা ও মিডিয়ার সাথে সরাসরি যোগাযোগ করে ইসরাঈলের পক্ষে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করে। এ ছাড়াও এসব লবি খোদ আমেরিকায় বসবাসরত ইহুদীদের বিভিন্ন সমস্যা সংকটে জনমত সৃষ্টির কাজ করে। নির্বাচন ও আইন প্রণয়নের সময় এসব লবির কর্মতৎপরতা আরো বেড়ে যায়। এছাড়া সারা দুনিয়ায় ইহুদীদের জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য এসব লবি ইহুদী মিডিয়া ও কূটনৈতিক মিশনগুলোর সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে কাজ বাগিয়ে নেয়।