📘 পশ্চিমা মিডিয়ার স্বরূপ > 📄 জনমত

📄 জনমত


দীনী ও নৈতিক মূল্যবোধের অনুপস্থিতিতে জনমত অথবা সংখ্যাগরিষ্ঠের ঝোঁকপ্রবণতা বাস্তবতা এবং ঘটনাসমূহ পরখ করার মাধ্যম বলে অভিহিত হয়। এক মনস্তত্ত্ববিদ জনমতের বিশ্লেষণ করতে গিয়ে লেখেন, সাধারণতঃ আমরা ধারণা করে থাকি, আমরা নিজেরাই নিজেদের অভিমত প্রতিষ্ঠা করি, কিন্তু বাস্তবতা তার উল্টো। কারণ সাধারণতঃ আমরা এই অনুমান করে সিদ্ধান্ত নেই যে, জনমত আমাদের তৎপরতা ও সিদ্ধান্তকে সমর্থন করবে। আমাদের প্রকৃতির অভ্যন্তরে এই ধারণা বদ্ধমূল রয়েছে।
জানাশোনা ও জ্ঞানের জন্য সংবাদ নয়; বরং সংবাদ হলো মগজ ধোলাইকারীদের পরিকল্পনা মোতাবেক মগজের অভ্যন্তরে বিদ্যমান চিত্র ও প্রতিচ্ছবিকে অন্যের নিকট পৌছানোর নাম। এটাকেই সে জনমত নামে আখ্যায়িত করে। নির্ধারিত চিত্র ও পরিকল্পনা মানুষের সামনে উপস্থাপন করার মাধ্যমে সে এটার পূর্ণতা দান করে। এর জন্য সে জনমত জরিপের চিত্তাকর্ষক নাম দিয়ে তার পক্ষে দলীল-প্রমাণ সরবরাহ করে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর জনমত জরিপের জন্য বহু প্রতিষ্ঠান অস্তিত্বশীল হয়েছে। সেসব প্রতিষ্ঠানে বড় বড় বিজ্ঞ মনস্তত্ত্ববিদ ও ব্রেন ওয়াশিং বিশেষজ্ঞরা কর্মরত রয়েছেন। হল বেকরিসা এ ধরনের জনমত জরিপের বিশ্লেষণ করতে গিয়ে লেখেন, যদি আপনি চান, মার্কিনীরা কোনো বিশেষ চিন্তা-চেতনা ও দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করে নিক, তাহলে আপনাকে শুধু এটা করতে হবে যে, আপনি জনমতের আশ্রয় নেবেন এবং বলবেন, জনমত এ কথা বলে। অতঃপর টেলিভিশন ও মিডিয়ার অন্যান্য মাধ্যমে তা প্রকাশ করে দেবেন। এর সহজ পদ্ধতি হলো, আপনি যত দক্ষতা ও প্রতিভার সাথে জনমত জানার জন্য প্রশ্নের অবকাঠামো তৈরি করবেন, সে আলোকেই আপনার পছন্দমতো জবাব পাবেন। উদাহরণস্বরূপ আপনি প্রশ্ন করবেন, ৮৫% মার্কিনীদের ধারণা, তারা নির্ভরযোগ্য সংবাদের জন্য টেলিভিশনের ওপর আস্থা রাখে, আপনার কি অভিমত? প্রত্যাশিত জবাব আপনি ইতিবাচকভাবে পেয়ে যাবেন। এখন এই আলোচনা নেই যে, টেলিভিশনের কোন সংবাদগুলো সম্পর্কে আপনার প্রশ্ন। রাজনৈতিক সংবাদ উদ্দেশ্য, না স্বাস্থ্য, সুস্থতা ও খেলাধুলা সম্পর্কে এই প্রশ্ন করা হচ্ছে। রাস্তা-ঘাটে চলমান লোকদের কাছে এ ধরনের প্রশ্ন প্রচার করে, তার নাম জনমত জরিপ দেয়া হয়। সাধারণভাবে জনগণ জনমত জরিপের এই পর্যালোচনায় অতি তাড়াতাড়ি প্রভাবিত হয়। বিশেষ করে যদি কোনো ব্যক্তি বিশেষের সফলতা ও ব্যর্থতার সাথে সম্পর্ক থাকে, তাহলে এটা আরো ফলপ্রসূ হয়। আজকাল টেলিভিশন ও দৈনিক পত্রপত্রিকার সহযোগিতায় শুধু একদিনেই জনমত জরিপ পর্যালোচনা করে ওই দিনই তা প্রচার করে দেয়া হয়, যাতে প্রত্যাশিত মনযিলের দিকে লোকদের পথপ্রদর্শন হয়ে যায়। দেখুন, ইহুদী প্রটোকলের দশম দস্তাবেজ।

টিকাঃ
৫. বাবরী মসজিদ প্রসঙ্গে সর্বপ্রথম তা বিতর্কিত বাবরী মসজিদ 'রাম জন্মভূমি', অতঃপর রাম জন্মভূমি বাবরী মসজিদ, অতঃপর মসজিদের বিতর্ক কাঠামো এবং তা স্থানান্তর, এসব প্রোপাগান্ডা চালিয়ে অবশেষে মসজিদের দেয়াল ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে।

📘 পশ্চিমা মিডিয়ার স্বরূপ > 📄 যা ভাল ছিল না, ধীরে ধীরে তাই ভাল হয়ে গেছে

📄 যা ভাল ছিল না, ধীরে ধীরে তাই ভাল হয়ে গেছে


সিনেমা, নাটক, লিটারেচার, গল্প, উপন্যাস ইত্যাদি বিগত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশক থেকে অসাধারণ দ্রুততার সাথে সাধারণ ও বিশেষ সর্বশ্রেণীর চিন্তা-চেতনা ও ধ্যান- ধারণা সম্পূর্ণ পাল্টে দেয়। আকবর এলাহাবাদীর ভাষায়-'যা ভাল ছিল না, ধীরে ধীরে তাই ভাল হয়ে গেছে।'
কাউ বয়েজ সিরিজে কঠোর আইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদকারীদের পুলিশ গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। সেখানে পুলিশকে হিরো হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, কিন্তু দীনী, নৈতিকতার বিরোধীতাকারী অপরাধীদের আশ্রয়দাতাদের সম্মান করা হয়। দীন ও নৈতিকতার বিরোধীতাকে কোনো দৃষ্টিকোণ থেকেই অপরাধ মনে করা হয় না। এক মজলুম ব্যক্তি, যে আইনের যাঁতাকল থেকে বাঁচার জন্য পালিয়ে যায়, কিন্তু আইন তার পিছু ধাওয়া করে। পক্ষান্তরে এই আইনই সাদা পোশাকধারী অপরাধীদের নিরাপত্তা দান করে। এই সিনেমায় ইনসাফকারীদের উপহাস করা হয় এবং তাদের ঘুষখোর ও দুশ্চরিত্র প্রমাণ করার প্রয়াস চালানো হয়। ডান্ডা ও বিত্তের বলে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে চাপ প্রয়োগ করে সিদ্ধান্ত পরিবর্তনকারীদের হিরো বানিয়ে উপস্থাপন করা হয়।
পঞ্চাশের দশকের পূর্বে সিনেমাগুলোতে যৌনতার ইশারা-ইঙ্গিতও পাওয়া যেত না, কিন্তু পঞ্চাশের দশকের পরে সিনেমাগুলোতে প্রথমে ইশারা ইঙ্গিতে অতঃপর চলাফেরায় নড়াচড়ায় এরপর বাস্তবে যৌনতার প্রদর্শন শুরু হয়। এই অশ্লীলতা ও যৌনতাকে 'আমেরিকান ভালবাসা' নাম করা হয়েছে। 'প্রেম-ভালবাসার আমেরিকান পদ্ধতি' নামক ফিল্ম-সিরিজে যৌনতার দৃশ্যসমূহ খোলামেলাভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ১৯৭৫ সালে প্রতি সপ্তাহে যৌনতার দৃশ্য প্রদর্শনের হার ছিল ১৫%, যা ১৯৭৮ সালে ২৪%- এ উন্নীত হয়েছে। এখন টিভি সিরিজে মারপিট ও উগ্রতার দৃশ্য প্রদর্শনের হার ৬০% এবং যৌন মেলামেশার দৃশ্য প্রদর্শনের হার ৩৫%-এ উন্নীত হয়েছে। অনেক সময় একটি মাত্র সিনেমাতেই এই হার পূর্ণ হয়ে যায়।১
শিশু-কিশোরদের জন্য যেসব সিরিজ, কার্টুন ও ভিডিও গেমস দেখানো হয়, তাতে জানোয়ারদের সৃষ্টির সেরা মানুষের আকৃতিতে দেখানো হয়। তারকা ও নক্ষত্র পূজা এবং চন্দ্র ও সূর্যকে সম্মান প্রদর্শনের জন্য মন-মানস প্রস্তুত করা হয়। শক্তি ও উগ্রতা প্রদর্শন করে এই ধারণা দেয়া হয় যে, শক্তি ও বিত্তই সকল বস্তু অর্জন ও অসাধ্য সাধন করার মোক্ষম অস্ত্র। সত্য ও সততার ওপর থাকা আসল সম্পদ নয়, আসল সম্পদ হলো শক্তি ও বিত্ত। ঘরগুলোতে দেখানো হয়, পিতা-মাতা সন্তানদের থেকে গাফেল উদাসীন এবং মা বয়ফ্রেন্ড ও পিতা গার্লফ্রেন্ড নিয়ে ব্যস্ত। আর বলা হয়, সন্তানের ওপর পিতা-মাতার শাসন-কর্তৃত্ব অকাম্য-অবাঞ্ছিত সীমা পর্যন্ত বেড়ে গেছে। পিতা-মাতা তাদের স্বাধীনতার পথে সবচে' বড় বাধা। এক সিনেমায় দেখানো হয়েছে, বিত্তশালী পিতা ঘরের বাইরে এত ব্যস্ত যে, স্ত্রী ও সন্তানদের দিকে তার কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। গভীর রাতে বাড়ীতে ফেরে এবং খুব প্রভাতেই বাড়ী থেকে বের হয়ে যায়। স্বামী ও পিতার ভালবাসা বঞ্চিত স্ত্রী ও সন্তানরা এ শূন্যতা তাদের ইচ্ছা ও পছন্দমতো পূরণ করে। তারা নিজ নিজ বন্ধু তালাশ করে নেয়। আর এতে তারা ন্যায়ের ওপর রয়েছে। অন্য এক সিনেমায় দেখানো হয়েছে, এক মেয়ে তার গবেট নির্বোধ পিতার ওপর আধিপত্য বিস্তার করে ফেলেছে। সে মনমতো বয়ফ্রেন্ড নিয়ে চলাফেরা ও রাত যাপন করে। অপর এক সিনেমায় দেখানো হয়েছে, ঘরে পিতা-মাতার কোনো ক্ষমতা-কর্তৃত্ব ও সম্মান-মর্যাদা নেই। দুষ্ট উচ্ছৃংখল ছেলে-মেয়েরা তাদের শাসকে পরিণত হয়েছে। এক সিনেমায় ভাই-বোন আর অপর সিনেমায় পিতা-মেয়ে যৌনতায়, এমনিভাবে মাকে তার ছেলের সাথে যৌনকর্মে লিপ্ত দেখানো হয়েছে।২
পঞ্চাশের দশকের পূর্বে সিনেমাতে দীনী ও নৈতিক মূল্যবোধ এবং সেগুলোর অন্তর্নিহিত রহস্যসমূহের সমালোচনা থেকে বিরত থাকা হতো। অবশ্য সরাসরি দীন ও নৈতিকতার আলোচনা করার পরিবর্তে সেসব রসম-রেওয়াজ, প্রথা-প্রচলন এবং সেগুলোর আনুগত্য অনুসরণের আলোচনা করা হতো, যা প্রাচীন যুগ থেকে চলে আসছিল। পারিবারিক জীবনে দীন ও নৈতিকতার যে সক্রিয় ভূমিকা ছিল, ইশারা-ইঙ্গিতেও তার আলোচনা করা হতো না। ষাটের দশকের পর এমন সিনেমা তৈরি হতে লাগল, যাতে সরাসরি দীনের সমালোচনা এবং চারিত্রিক ও নৈতিক মূল্যবোধকে টার্গেট বানানোর পরিবর্তে গির্জার পাদ্রীদের ব্যক্তিগত জীবনে ঘটে যাওয়া চারিত্রিক পদস্খলন, যৌন বিপথগামিতা এবং নৈতিক ধসের আলোচনা করা হতো। এভাবে মগজ ধোলাইয়ের ধারাবাহিক অভিযানের ফল যখন সামনে আসতে লাগল তখন সিনেমা ও টিভিতে দর্শক-শ্রোতাদের জন্য তিনটি পদ্ধতি উপস্থাপিত হতে লাগল।
০১. উঁচু সোসাইটি ও উন্নত জীবন মানে পৌঁছতে না পারার কারণে নিরাশ হয়ে মনস্তাত্ত্বিকভাবে নিজেকে পরাজিত ধারণা করা এবং কঠোর পরিশ্রমের জীবন গ্রহণ করার পরিবর্তে শেষ উপায় হিসেবে মাদকের আশ্রয় নেয়া। পশ্চিমা লেখক এলডাস হ্যাক্সলের স্বরচিত গ্রন্থ 'বীরত্ব ও সাহসিকায় পূর্ণ এক নতুন পৃথিবী'-তে এমন একটি সোসাইটির চিত্র অঙ্কন করেছেন, যার মধ্যে কোন নিয়ম-নীতি, চরিত্র ও নৈতিকতার কোনো শাসন নেই।
০২. বড় বড় সোসাইটিকে ছোট ছোট সোসাইটিতে ভাগ করে দেয়া, যাতে ব্যক্তি সোসাইটির চাহিদা থেকে নিজেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ মনে করে। কারণ সামাজিক ঐক্য কঠোরতা ছাড়া বাকী থাকতে পারে না। এই প্রস্তাবের বাস্তব রূপায়ণ করা হচ্ছে এভাবে, বড় বড় দেশগুলোকে আঞ্চলিকতা, গোত্রগত, ভাষা, বর্ণ ও জাতীয়তার ভিত্তিতে বিভক্ত করে দেয়া হচ্ছে।
০৩. ব্যক্তি সামাজিক ও পারিবারিক জীবন থেকে নিজেকে আলাদা করে নেবে। সে সর্বদা নিজেকে টেলিভিশনের আশ্রয়ে ছেড়ে দেবে, যাতে সামাজিক ও পারিবারিক জীবন থেকে আলাদা হওয়ার কারণে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে, টিভি তা পূর্ণ করে দেয়। সে ঘরের কোণে বসে টিভিতে ফুটবল ও ক্রিকেট ম্যাচ দেখবে আর নিজেকে সমাজের অন্তর্ভুক্ত মনে করবে। তা এভাবে টিভিতে শয়তানদের পূজা করা, জীব-জানোয়ারদের সম্মান করা এবং মানুষকে লাঞ্ছিত অপদস্থ করার যে দৃশ্যাবলী উপস্থাপন করা হয়, সেসব দেখে সে সত্যিই শয়তানকে পূজার যোগ্য, জীব-জানোয়ারকে সম্মানের পাত্র এবং এবং মানুষকে ঘৃণার পাত্র মনে করতে থাকে। মার্কিন লেখক টনি ব্রেগস তার গ্রন্থে দেখিয়েছেন, স্কুল, কলেজ ও প্রচলিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কোনো ফায়দা নেই। কারণ এতে পড়াশোনাকারীদের রাস্তা-ঘাটে সড়কে আশ্চর্য ধরনের পোশাক পরে নেশায় বুঁদ দেখা যায় এবং বিভিন্ন ধরনের ধ্বংসাত্মক কাজে লিপ্ত থাকে। এই গ্রন্থের নায়কের নির্ধারিত কোনো রাজনৈতিক ও চারিত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি নেই। সে নতুন প্রজন্মের ভাষা, অনুভূতি ও চেতনা পর্যন্ত পৌঁছতে পারে না। সে সর্বক্ষণ শুধু কল্পনার জগতে বিচরণ করে এবং উঁচু ধ্যান-ধারণা প্রকাশ করতে থাকে। (সূত্র: দস্তাবেজ-১৩)

টিকাঃ
১. উত্তর প্রদেশের রাজধানী লাখনৌর সাতটি সিনেমা হলে এমন সাতটি সিনেমা প্রদর্শন করা হয়েছে, যার পোষ্টারে লেখা ছিল-'প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য'। সূত্র: কওমী আওয়াজ, ১৯ সেপ্টেম্বর-১৯৯৬। এছাড়া ভারতীয় ও বাইরের টিভি চ্যানেলগুলোতে যৌনতার দৃশ্য সম্বলিত যেসব সিনেমা প্রদর্শিত হচ্ছে, তার সংখ্যা ২৫% থেকে ২৮%-এর মধ্যে। সূত্র: কওমী আওয়াজ, ২০ সেপ্টেম্বর-১৯৯৬।
২. এসব দৃশ্য আগে শুধু পাশ্চাত্যের সিনেমায় দেখানো হতো, কিন্তু ১৯৯৩ সাল থেকে ভারতীয় সিনেমাতেও এ ধরনের ডায়ালগ প্রচারিত এবং দৃশ্য প্রদর্শিত হচ্ছে। গানের মাধ্যমে অশ্লীলতা শিক্ষা দেয়ার কাজ তো ১৯৬০ সাল থেকেই শুরু হয়েছে। 'সঙ্গম হবে কিনা' এবং 'ভালবাসা যখন করেছি তখন ভয় কিসের' ইত্যাদি গানের ধারা ১৯৬০ সাল থেকেই শুরু হয়েছে। পরিস্থিতি এ পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে যে, পিতা এবং মেয়ের মধ্যেও এ ধরনের অশ্লীল যৌন কথোপকথন ও গানের ধারা শুরু হয়ে গেছে, যা সম্ভবত স্বামী-স্ত্রীও বলতে পছন্দ করবে না। ব্যান্ডেট কোয়েনের দৃশ্য ও খলনায়কের গান পশ্চিমা সিনেমার যথার্থ চিত্র। ১৯৯৭ সালের মার্চের প্রথম সপ্তাহে দিল্লীতে জাপান চলচ্চিত্র উৎসব পালন করা হয়েছে। দৈনিক কওমী আওয়াজ পত্রিকায় এক চলচ্চিত্র সমালোচক এই চলচ্চিত্র উৎসবের ওপর মন্তব্য করতে গিয়ে লেখেন, দু'টি জাপানী সিনেমায় আপন ভাই-বোনের মাঝে যৌন সম্পর্কের উন্মুক্ত দৃশ্য দেখানো হয়েছে। নির্দেশকরা কাহিনী ও ঘটনার স্বার্থে এমনটি করা হয়েছে বলে এর বৈধতার প্রমাণ পেশ করেছেন এবং এ ধরনের সম্পর্কের পরিণামও পূর্ণ দক্ষতার সাথে দেখিয়েছেন। সিনেমার কাহিনীতে দেখানো হয়েছে, ভাইয়ের স্মৃতিশক্তি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। ছোট বোন ভাইকে খুব ভালবাসে। এজন্য ভালবাসার উপহারস্বরূপ ভাইকে তার শরীর দান করে। আসলে তারা যা করে, সেটিকে শয়তান তাদের সামনে সুন্দর ও আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করে। সূত্র: দৈনিক কওমী আওয়াজ, ১০ মার্চ-১৯৯৭।
৩. সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলো ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, আফগানিস্তান, রাশিয়া, যুগোশ্লাভিয়া ইত্যাদি দেশগুলো আমাদের সামনে আছে, এমনিভাবে ইরাক, ইরান ও তুরস্কের সীমান্ত, পাকিস্তান ও ভারতের পশ্চিম এবং পূর্ব সীমান্তে বসবাসকারী জনগণের মাঝে বিভক্তির পর বিভক্তি সৃষ্টির ধারা শুরু করেছে। সূত্র: ইহুদী প্রটোকল, পঞ্চম দস্তাবেজ।

📘 পশ্চিমা মিডিয়ার স্বরূপ > 📄 প্রকাশনার বৈশিষ্ট্য

📄 প্রকাশনার বৈশিষ্ট্য


প্রকাশিত উপকরণ ও মাধ্যম স্বয়ং নিজে কোন যোগাযোগ ও সংযোগের মাধ্যম নয়; বরং তার মূল উদ্দেশ্য সাধারণ লোকেরা তা পড়ুক, তার পয়গাম গ্রহণ করুক, সেটা ভালভাবে বুঝুক ও আত্মস্থ করুক। এক কথায়, তার অভ্যন্তরের পয়গামই মূল কথা। আর তখনই কেবল বলা যেতে পারে, মিডিয়ার মাধ্যমে দেয়া পয়গাম পৌছে গেছে, কিন্তু নিম্নবর্ণিত অবস্থাগুলোর কারণে যদি এই পয়গাম পৌঁছতে না পারে তাহলে আমরা আমাদের উদ্দেশ্য অর্জনে ব্যর্থ বলে অভিহিত করব।
০১. প্রকাশনা যদি সঠিক সময়ে প্রকাশিত না হয় এবং সেসব লোকের হাতে সময়মতো না পৌঁছে, যাদের সাথে এর সম্পর্ক।
০২. উপযুক্ত সময়ে পৌঁছলেও তা ব্যাপকভাবে পঠিত না হলে।
০৩. সঠিক সময়ে পৌঁছে গেছে, তা পাঠও করা হয়েছে, কিন্তু তার ভেতরের পয়গাম বোঝা হয়নি।
০৪. সঠিক সময়ে পৌছে গেছে, তা পাঠও করা হয়েছে, তার পয়গামও বোঝা গেছে, কিন্তু তা তৈরিতে সামান্য ভুল রয়ে গেছে। প্রকাশনায় উপস্থাপিত চিন্তা-চেতনা, ধ্যান-ধারণার জ্ঞানগত ও শৈল্পিক দুর্বলতা, অনুপযুক্ত সময়ে সেসব প্রকাশনার প্রচার-প্রসার কিংবা অধিক ভুলের কারণে তার গুরুত্ব ও উপকারিতা নিঃশেষ হয়ে যায়।
০১. প্রকাশনার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, বিপুল হারে তা প্রচার-প্রসার হয়, তার প্রভাব-প্রতিক্রিয়া সুদূরপ্রসারী ও স্থায়ী হয় এবং তা খুব সহজেই এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় স্থানান্তরিত করা যেতে পারে। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর লোকেরা তা থেকে উপকৃত হতে পারে, একাধিকবার তা পাঠ করা যায় এবং একাধিক ব্যক্তি তা থেকে উপকৃত হয়। এভাবে প্রকাশনা তার নির্ধারিত পয়গাম ও উদ্দেশ্যাবলী মন মস্তিষ্কে সুদৃঢ় করে দিতে বুনিয়াদী ভূমিকা পালন করে। কারণ একই পয়গাম বার বার বিভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয়ে থাকে।
লিখিত উপকরণ ও মাধ্যম এদিক দিয়েও অন্যের ওপর প্রভাবশীল হওয়ার শক্তি সামর্থ্য রাখে যে, পাঠক নিজের মতামত গঠনের ব্যাপারে সম্পূর্ণ স্বাধীন। পাঠক চিন্তা-ভাবনা দ্বারা কাজ নেয় এবং চিন্তা করে। দুই তিন বার তা পাঠ করে সে ওইসব বিষয়বস্তুর সমালোচনা করে অথবা গ্রহণ করে নেয়। এভাবে পাঠক ও লেখকের মাঝে একটি নিরব আলোচনা চলে, যা उभয়ের মাঝে চালু থাকে। এই নিরব অধ্যয়নের মাঝে পাঠককে সর্বাবস্থায় গ্রন্থের বিষয়বস্তুর প্রভাব-প্রতিক্রিয়া গ্রহণ করতে হয়। এর অনিবার্য ফল হলো, পাঠকের মন মস্তিষ্কে সে চিন্তা-চেতনা ছেয়ে যায় এবং বিষয়বস্তুর প্রাণ পাঠকের চিন্তা-চেতনায় সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে, যা শিক্ষক থেকেও বেশি প্রভাবশালী ও প্রতিক্রিয়াশীল হয়। এর মৌলিক কারণ হলো, লিখিত শব্দাবলীর মধ্যে মন-মস্তিষ্কের ওপর প্রভাবশালী হওয়ার যাদুকরী শক্তি আছে। তবে শর্ত হলো, সে প্রকাশনা তৈরিতে শৈল্পিক দক্ষতা থাকতে হবে এবং বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ উভয় দিক দিয়ে শক্তিশালী পদ্ধতি হতে হবে। এরপরই লিখিত শব্দাবলী পাঠকের অনুমতি ছাড়াই অতি নিরবে তা হৃদয়ে পৌঁছে যায় এবং পাঠকের আবেগ অনুভূতি সে বিষয়বস্তুর প্রবক্তা ও জোরালো সমর্থক সাহায্যকারী হয়ে যায়।
০২. লিখিত শব্দাবলী ও বিষয়বস্তুর মর্ম উপলদ্ধি করতে পাঠক কারো মুখাপেক্ষী হয় না। সে সরাসরি তা থেকে উপকৃত হয় এবং সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে বিষয়বস্তুর মূল্য মান নির্ধারণ করে। কোন জিনিস তার ওপর চাপিয়ে দেয়া হয় না।
০৩. লিখিত বিষয় পড়া দ্বারা পাঠকের ব্যক্তিত্ব এবং আত্মবিশ্বাস শক্তিশালী হয়। সে নিজেই তার বিবেক ও চিন্তাশক্তি দ্বারা লিখিত বিষয়ের মর্মের গভীরে পৌঁছতে পারে এবং তার ইশারা-ইঙ্গিত ও জটিলতার সমাধান করে। অন্য ভাষায় সে শিক্ষকের ভূমিকা পালন করে। এটি প্রসিদ্ধ মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতা যে, পাঠক যখন নিজেই নিজের শিক্ষকের ভূমিকা পালন করে এবং নিজেকে উপদেশ ও শিক্ষা দেয়ার দায়িত্ব আঞ্জাম দিতে থাকে, তখন গ্রন্থের বিষয়বস্তু তার ব্যক্তিত্বের মধ্যে ভালভাবে গেঁথে যায়। এর অর্থ এটা ছাড়া আর কিছুই নয় যে, লিখিত বিষয়বস্তু বোঝার ক্ষেত্রে ইতিবাচক দিকের প্রাধান্য রয়েছে। দ্বিতীয়ত এর ফলে পাঠকের ব্যক্তিত্ব এবং কোনো বিষয়বস্তু দ্বারা আশ্বস্ত হওয়া, অন্যকে তা দ্বারা আশ্বস্ত করার বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তি ও যোগ্যতা প্রমাণিত হয়। একে মনস্তত্ত্ববিদরা কর্মের মাধ্যমে শিক্ষা নামে আখ্যায়িত করেন।
০৪. লিখিত শব্দাবলী পাঠ করার ফলে পাঠকের ওপর সামাজিক দায়িত্ব অর্পিত হয়। তার মধ্যে আরো বেশি জ্ঞান অর্জন এবং অন্যের নিকট তা স্থানান্তর করার আগ্রহ ও চেতনা সৃষ্টি হয়। যখন মূর্খ লোক শিক্ষিত লোকের মুখ থেকে নতুন জ্ঞান ও উদ্ভাবনের কথা শুনে তখন তার মধ্যে জ্ঞান অর্জনের আগ্রহ উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়। অপরদিকে পাঠকের ইচ্ছা হয়, সে আরো জ্ঞান অর্জন করুক এবং তার জ্ঞান শুধু তার সমাজ, দেশ ও জীবন সম্পর্কেই সীমাবদ্ধ না থাকুক; বরং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সমস্যা সংকট, চিন্তা-দর্শন, মতবাদ, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ সম্পর্কেও জ্ঞান অর্জন করুক।
০৫. লিখিত শব্দাবলী পাঠে পাঠকের জ্ঞান ও বুদ্ধিবৃত্তিক কল্পনার জগতে ডুব দেয়ার সুযোগ ঘটে। সে পড়ার চেয়ে বেশি বুঝে ও চিন্তা করে। যতটা না সে বুঝে কল্পনার জগতে তার চেয়ে বেশি বিচরণ করে। কখনো চিন্তা করলে আরো বোঝার চেষ্টা করে। কখনো সে কল্পনার পাখা লাগিয়ে উড়ে এবং কখনো তার বিবেক ও বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তিকে সমস্যা সংকটের সমাধানে ব্যবহার করে।
০৬. পত্র পত্রিকা ও ম্যাগাজিনের লেখাগুলোতে নিম্নবর্ণিত শৈল্পিক বৈশিষ্ট্যাবলী নিহিত রয়েছে:
ক. সাধারণ ও বিশেষ সর্বশ্রেণীর জন্য সাংবাদিকতার লেখা নবতর জ্ঞানের ভাণ্ডার হয়।
খ. সাংবাদিকতার লেখা দ্বারা জাতির মধ্যে সাংস্কৃতিক ও সামাজিক ঐক্য সৃষ্টি হয়, যার ফলাফল অনেক গভীর ও সুদূরপ্রসারী।
গ. সাংবাদিকতার পাতায় প্রকাশিত সাক্ষাতকার, সেমিনারের রোয়েদাদ, গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ-নিবন্ধ, সামাজিক ও জ্ঞানমূলক জরিপ, বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন, সরকারের বিবৃতি ও ঘোষণা জাতির অর্থনৈতিক তৎপরতার অগ্রগতিতে মৌলিক ভূমিকা পালন করে।
ঘ. সাংবাদিকতা এমন এক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন দর্পণ, যার মধ্যে জীবন প্রাণ-চাঞ্চল্য ও শক্তিতে ভরপুর দৃষ্টিগোচর হয়। তাতে ব্যক্তি, দল ও সরকারের চিত্র দেখা যায়।
ঙ. সাংবাদিকতাকে আমরা যুগের সাক্ষী এবং প্রত্যক্ষদর্শীও বলতে পারি, যার মধ্যে গোটা দুনিয়া গুটিয়ে যায়।
চ. আধুনিক যুগের সাংবাদিকতা মুদ্রণের অসাধারণ সহজলভ্যতা, রঙিন ছাপা, স্যাটেলাইটের সুযোগ-সুবিধা, উন্নত থেকে উন্নততর শৈল্পিক উদ্ভাবন, সর্বোন্নত বিন্যাস ও সংকলন পদ্ধতি, উপরন্তু সর্বনিম্ন মূল্য, বেশির থেকে বেশি তাজা সংবাদ এবং সকল প্রকার রুচিসম্পন্ন পাঠকের চিত্তাকর্ষক পঠনসামগ্রীর উপস্থিতি এবং সর্বত্র পাওয়া যাওয়ার কারণে অনেক আকর্ষণীয় ও হৃদয়গ্রাহী হয়ে গেছে। সাংবাদিকতা জীবনের এক বিরাট বড় অংশের ওপর তার আধিপত্য বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছে। কারণ সাংবাদিকতা যত অসাধারণ দ্রুততার সাথে লোকদের নিকট পৌঁছতে পারে, অন্য কোেনা লেখা তত দ্রুত লোকদের নিকট পৌঁছতে পারে না। এজন্য সাংবাদিকতার প্রভাব-প্রতিক্রিয়াও বড় দ্রুততা এবং শক্তিমত্তার সাথে প্রসার লাভ করে।

📘 পশ্চিমা মিডিয়ার স্বরূপ > 📄 শ্রবণ উপকরণ

📄 শ্রবণ উপকরণ


মানব জীবনে রেডিও শ্রবণের যে প্রভাব-প্রতিক্রিয়া পড়ে তার বিশ্লেষণ করার পূর্বে সে সংবাদ অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পড়া উচিত যাতে বলা হয়েছে, কোরিয়ার যুদ্ধের সময় কমিউনিস্ট সরকার যখন সিউল দখল করে নেয়, তখন সর্বপ্রথম পদক্ষেপ হিসেবে সিউলের জনগণের নিকট বিদ্যমান সকল রেডিও জব্দ করে নেয়। অথচ রেডিও স্টেশন দখল করে নেয়ার পর এর কোন প্রয়োজন ছিল না। সমাজতান্ত্রিক সরকার এই পদক্ষেপ এজন্য গ্রহণ করেছিল, যাতে সিউলের জনগণ গোপন স্টেশন থেকে প্রচারিত রেডিওর কোনো সংবাদ শুনতে না পারে। সেকালে কোরিয়ায় রেডিও রাখা এবং ভিনদেশ থেকে প্রচারিত সংবাদ শ্রবণের শাস্তি ছিল মৃত্যুদন্ড। এ খবর দ্বারাই আপনি অনুমান করুন, মানুষের বিবেক বুদ্ধি ও চেতনা গঠনে রেডিও কত ভয়ানক ভূমিকা পালন করে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00