📄 মগজ ধোলাই
মগজ ধোলাই বিষয়ের বিশেষজ্ঞরা যেসব গ্রন্থ লেখেছেন, তার মধ্যে গেস্টাওলিবান রচিত ‘সাইকোলজি অফ গেদারিং’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। উক্ত গ্রন্থে তিনি মানব সমাবেশের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করতে গিয়ে লেখেন, মানুষ যতই সভ্য, সচেতন ও শিক্ষিত হোক না কেন, যখন সে কোনো গ্রুপ কিংবা সমাবেশের সাথে থাকবে তখন সে ওই গ্রুপ বা সমাবেশের মনস্তত্ত্ব এবং অবস্থার অনুগামী হয়েই থাকবে। ভাল বিবেকবান সচেতন মানুষও আবেগ তাড়িত হয়ে দলের পেছনে দৌড়াতে থাকে। অন্যকে যা সে করতে দেখে পশুর মতো বিনা চিন্তায় তাই করতে থাকে। যেন তার ওপর যাদু মন্ত্র প্রয়োগ করা হয়েছে।
ফ্রয়েডের মতো মনস্তত্ত্ববিদও একই মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, মানুষ দলের সাথে থাকতেই ভালবাসে। সুতরাং এমন পথ-নির্দেশকের প্রয়োজন, যে গোটা দল বা সমাবেশকেই যাদুগ্রস্ত করে দেবে।
গেস্টাওলিবান ও ফ্রয়েডের পর শত শত মনস্তত্ত্ববিদ এ বিষয়ে অনেক গ্রন্থ রচনা করেছেন। মগজ ধোলাই বিষয়ে এ পরিমাণ গবেষণা হয়েছে যে, এ বিষয়ে মনস্তত্ত্ববিদগণ দু'ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছেন। প্রথম দলের কেন্দ্র হলো ইংল্যান্ড। তারা মানবিক সম্পর্কের মনস্তত্ত্ব নিয়ে গবেষণা করেছেন। আর দ্বিতীয় দলের কেন্দ্র হলো ফ্রাঙ্কফুর্ট। তারা সামাজিক সম্পর্ক বিষয়ক মনস্তত্ত্বের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছেন। তারা মগজ ধোলাইয়ের উপকরণ এবং মাধ্যম নিয়ে গবেষণা ও পর্যালোচনা করেছেন। একে তারা উত্তম থেকে উত্তমতর বানানোর প্রয়াস চালিয়েছেন। উদাহরণস্বরূপ প্রিন্সটন প্ল্যানের আওতায় এই গ্রুপ রেডিও'র প্রভাব-প্রতিক্রিয়ার ওপর জরিপ চালিয়ে যে ফল বের করেছেন, তা আজ টেলিভিশন প্রোগ্রাম প্রস্তুতকারীদের কাজে আসছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বৃটেন ও জার্মানী মনস্তত্ত্ববিদদের সেবা নিয়ে রেডিও'র মাধ্যমে একে অপরের বিরুদ্ধে তুমুল মনস্তাত্ত্বিক লড়াই চালিয়েছিল। এই গ্রুপ প্রথম গ্রুপের সংগৃহীত ফল থেকে উপকৃত হয়ে বাস্তব প্রোগ্রাম রূপায়ণ করেছে।
মগজ ধোলাইয়ে সাধারণভাবে ব্যক্তির মনস্তত্ত্বকে ধারাবাহিক দ্বন্দ্ব-সংঘর্ষ ও অস্থিরতার মধ্যে ডুবিয়ে রাখার সর্বাত্মক প্রয়াস চালানো হয়। এমনকি এক পর্যায়ে সে তার অস্থিরতা প্রকাশের রাস্তা অনুসন্ধান করে কিংবা অস্থিরতাপূর্ণ পরিবেশের সাথে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেবার জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়, কিন্তু যখন দ্বন্দ্ব-সংঘর্ষ ও অস্থিরতার পরিবেশ দীর্ঘায়িত হয় এবং প্রতিটি মুহূর্তে তার ওপর নতুন নতুন অস্থিরতা চাপতে থাকে, তখন সে এ পরিবেশের সাথে ইতিবাচকভাবে খাপ খাইয়ে নেবার সক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। তখন সে এমন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বাধ্য হয়, যা তার ব্যক্তিত্ব ও কর্মকা ধ্বংস করে ছাড়ে। তখন সে পশুর চেয়েও নিচে নেমে যায়। যেখানে তার নৈতিক ও চারিত্রিক মূল্যবোধ বড় নির্দয় নির্মমভাবে পদদলিত হয়। সুতরাং মগজ ধোলাইয়ের প্রোগ্রামকে অত্যন্ত সুসংগঠিতভাবে আঞ্জাম দিতে হবে। মানব মনস্তত্ত্বকে অস্থিরতা পেরেশানীর মধ্যে লিপ্ত করতে এমন পদ্ধতি অবলম্বন করা হবে, যা হবে পরিকল্পিত। এর জন্য উত্তম পদ্ধতি হলো এমন স্থায়ী পরিবেশ সৃষ্টি করে দেয়া, যাতে বার বার সে দৃশ্যই তার সামনে এসে হাযির হয় এবং এক দীর্ঘ সময় ধরে পদ্ধতি ও ধরণ পাল্টিয়ে পরিকল্পিতভাবে তার মন-মস্তিষ্ক, মেধা-মগজ ও চেতনার ওপর সে বিষাক্ত পরিবেশ চাপিয়ে দেয়া হয়।
রেডিও আবিষ্কারের পর ব্রেন ওয়াশিং বিশেষজ্ঞরা একে বিভিন্ন জাতি গোষ্ঠী ও দেশের মগজ ধোলাই করার একটি সুবর্ণ সুযোগ মনে করে। সেমতে প্রিন্সটন প্ল্যানের আওতায় রেডিও'র একক ও ব্যাষ্টিক প্রভাব-প্রতিক্রিয়া পর্যালোচনা করা হয়। সে পর্যালোচনার আলোকে এ বাস্তবতাই ফুটে উঠেছে যে, শ্রোতা কোনো সংবাদ, প্রস্তাব কিংবা শৈল্পিক বিষয় গ্রহণ করার ক্ষেত্রে বিষয় ও তার তথ্যাবলী থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে যে বিষয় দ্বারা প্রভাবিত হয় সেটি হলো, সে সংবাদের পুনরাবৃত্তি ও তা উপস্থাপন করার ধরন-পদ্ধতি কেমন। কোনো সাধারণ সংবাদ যদি শক্তিশালী ভঙ্গিতে পাঠ বা উপস্থাপন করা হয়, তাহলে শ্রোতা এর দ্বারা বেশি প্রভাবিত হয়, কিন্তু যদি হাজারো মানুষের 'গণহত্যার সংবাদকে অত্যন্ত ঠান্ডা ও দূর্বল ভঙ্গিতে পাঠ বা উপস্থাপন করা হয় তাহলে শ্রোতা এর দ্বারা মোটেও প্রভাবিত হয় না। টেলিভিশন আবিষ্কারের পর ব্রেন ওয়াশিং বিশেষজ্ঞদের সে হাতিয়ার অর্জিত হয়েছে, যা তারা স্বপ্নেও দেখেনি। সুতরাং টিভির প্রভাব-প্রতিক্রিয়া বিশ্লেষণ করতে গিয়ে এক মগজ ধোলাই বিশেষঞ্জ থিউডোর এডওয়ার্ড বলেন, টেলিভিশন আবিষ্কারের ফলে মানুষের মন মস্তিষ্ক ও আবেগ-উচ্ছ্বাসের ওপর পরিপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ আরোপের একটি শক্তিশালী মাধ্যম আমাদের হাতে এসে গেছে, যা আমরা স্বপ্নেও কল্পনা করিনি।
টেলিভিশনের মৌলিক ও অসাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো, তা আওয়াজ ও ছবি উভয়টিকে এমনভাবে উপস্থাপন করে, যা দ্বারা সর্বোত্তমভাবে মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব অস্থিরতার পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব হয়। আবার তা দ্বারাই সে পরিবেশ সর্বোত্তমভাবে প্রশমিত করা যায়।
টেলিভিশন আপনার সামনে এমন এমন জিনিস উপস্থাপন করে, আপনি চান আর না চান, কিন্তু আপনি সেটা পছন্দ করতে বাধ্য হবেন। টেলিভিশন এমন পদ্ধতিতে তা উপস্থাপন করবে, যেন তা ছাড়া আর কোনো উপায়ই নেই। সে আপনার চিন্তাশক্তি স্থবির করে দেবে। এমন পরিস্থিতিতে আপনি নিজের মধ্যে বিবেকের পরিবর্তে যৌন উত্তেজনা ও প্রবৃত্তির অগ্নি প্রজ্বলিত দেখতে পাবেন। নিজের মাঝে শিশুসুলভ চেতনা ও অনুভূতি প্রোথিত দেখবেন। আপনি মনে করবেন, প্রতিটি মানুষ একই চিন্তা করছে, একই কথা বলছে, একই কাজ করছে। ধীরে ধীরে আপনার সামনে পছন্দনীয় ও চিত্তাকর্ষক বস্তু উপস্থাপন করা হবে। সংবাদ এমনভাবে উপস্থাপন করা হবে, যেন এটাই জনমত। উদাহরণস্বরূপ কোনো খবর বিভিন্ন টিভি স্টেশনের বরাত দিয়ে একই ধরনে একই পদ্ধতিতে উপস্থাপন করা হয়।
খবর পরিবেশনের সময় সর্বপ্রথম দেশীয় ও আন্তর্জাতিক খবর পরিবেশন করা হয়। এরপর বিশেষ প্রতিবেদন, সর্বশেষ খেলাধুলা, আর্ট ও সাহিত্য বিষয়ে সংবাদ পরিবেশন করা হয়, কিন্তু এই খবরের আড়ালে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে শৈল্পিকপদ্ধতিতে প্রোপাগান্ডা চালানো হতে থাকে। খবরের প্রতিটি শব্দ প্রতিটি বাক্য এমনভাবে নির্বাচন করা হয়, যাতে তা শ্রোতা ও দর্শকদের মন মস্তিষ্কে সুদূরপ্রসারী প্রভাব-প্রতিক্রিয়া ফেলে যায়। এসব শব্দ এবং বাক্যের জন্যও সীমিত কিছু সময় নির্ধারিত থাকে।
ব্রেন ওয়াশিং বিশেষজ্ঞরা যখন সংবাদ বিন্যাস করে তখন তারা তাদের মৌলিক লক্ষ্য-উদ্দেশ্য সামনে রাখে, কোনো অবস্থায়ই যা তারা এড়িয়ে যেতে পারে না। সংবাদের প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি বাক্য ও প্রতিটি ছবি এমনভাবে চয়ন করা হয় যে, তা বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ উভয় ধরনের তাৎপর্য বহন করে। সাধারণভাবে আন্তর্জাতিক সংবাদগুলো ব্রেন ওয়াশিং বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিভঙ্গি ও মর্জির আলোকেই পরিবেশন করা হয়। পৃথিবীর সেসব চিত্র, যা দ্বন্দ্ব-সংঘর্ষ ও অস্থিরতায় পরিপূর্ণ, যা দেখলে মানসিক অস্থিরতা আরো বেড়ে যায়, সেগুলো বার বার দেখানো হয়। টিভিতে প্রতিটি ছবির স্থায়িত্ব ত্রিশ সেকেন্ড থেকে বেশি হয় না। উদাহরণস্বরূপ কোনো শিশু বহুতল ভবনের ছাদ থেকে পড়ে যাওয়া কিংবা গুলির আঘাতে ছটফট করা, পুলিশ কোনো অপরাধীকে ধাওয়া করা, সন্ত্রাসীর গুলিতে রক্তাক্ত ব্যক্তির স্বজনদের আহাজারি, বহুতল ভবনে ভয়াবহ অগ্নিকা, সড়ক দূর্ঘটনা এবং যুদ্ধ ও দুর্ভিক্ষের করুণ অবস্থার দৃশ্যগুলো টিভির পর্দায় বার বার দেখানো হয়। শুধু দৃশ্যগুলোই বার বার দেখানো হয়, কিন্তু ঘটনার বিস্তারিত কিছুই বলা হয় না। এসব দৃশ্য দেখে দর্শক-শ্রোতারা শুধু এ প্রতিক্রিয়াই গ্রহণ করে যে, কোথাও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে কিংবা ভয়াবহ আগুন লেগেছে। এরপর অর্থনৈতিক সংবাদ পরিবেশন করা হয়। যেমন ডলার ও স্বর্ণের বর্তমান বাজার মূল্য ইত্যাদি। উল্লিখিত সংবাদ ও দৃশ্যগুলো দেখে স্বাভাবিকভাবেই দর্শক-শ্রোতার মানসিক অস্থিরতা বৃদ্ধি পায়। এরপর এমন সংবাদ পরিবেশন করা হয়, যাতে মানসিক অস্থিরতা হ্রাস পায়। যেমন অতি নিম্নস্তরের যৌন কাহিনী, ধর্ষণ ও ইজ্জত হরণ, ফ্যাশন শো'র নগ্ন দৃশ্য এবং চলচ্চিত্র জগতের অভিনেতা-অভিনেত্রীদের প্রেম-ভালবাসার রোমান্টিক কাহিনীগুলোকে রং চড়িয়ে পরিবেশন করা ইত্যাদি। এরপর টেলিভিশন তার নির্ধারিত লক্ষ্য-উদ্দেশ্য সামনে রেখে সেসব রাজনীতিবিদদের বক্তব্য বিবৃতি প্রচার করে, যা তার নির্ধারিত লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ও দৃষ্টিভঙ্গির সমর্থন করে। টেলিভিশন এসব সংবাদ অত্যন্ত গুরুত্ব ও মনোযোগের সাথে পরিবেশন করে। ফলে লাখ লাখ কোটি কোটি দর্শক-শ্রোতা একে সত্য বলে গ্রহণ করে নেয়। অথচ দর্শক সেসব সচিত্র সংবাদ দেখেছে, যা পশ্চিমা মিডিয়া নিজের তরফ থেকে মনগড়াভাবে উপস্থাপন করেছে।
ব্রেন ওয়াশিং-এর আরেক বিশেষজ্ঞ ফ্রেডারিক আইমোর টেলিভিশনের ছবির গভীর প্রভাব-প্রতিক্রিয়া বিশ্লেষণ করতে গিয়ে লেখেন, টেলিভিশনের ছবিগুলো এত প্রভাব সৃষ্টিকারী ও যাদুকরী হয়, যা দর্শক-শ্রোতাদের সকল মনোযোগ তার দিকে টেনে নেয়। টেলিভিশন বিশেষভাবে চোখ ও মস্তিষ্ককে অসাধারণ প্রভাবিত করে। তা এভাবে, আওয়াজ, ছবি ও অতীত ঘটনাবলীর মাঝে চোখ অতি দ্রুত সংযোগ প্রতিষ্ঠা ও সমন্বয়ের কাজ আঞ্জাম দেয়। এমতাবস্থায় মস্তিষ্ক, যার আসল কাজ ঘটনাবলীর জরিপ, বিশ্লেষণ এবং সংবাদ ও ছবিগুলো ধারাবাহিক দেখা ও ফল বের করানো, কিন্তু সে তার কাজ আঞ্জাম দিতে সক্ষম নয় এজন্য যে, প্রতিটি মুহূর্তে দৃশ্যের পরিবর্তন হতে থাকে। ফলে সে কোনোভাবেই দ্রুত পরিবর্তনশীল দৃশ্য ও ঘটনাবলীর বিচার-বিশ্লেষণ করার উপযোগী থাকে না। কারণ এমতাবস্থায় বিবেক ও মস্তিষ্কের শূন্য জায়গা কোনো বিচার-বিশ্লেষণ ও ফলাফলে পৌঁছা ছাড়াই দ্রুত পরিবর্তনশীল দৃশ্য ও ঘটনাবলীকে হুবহু গ্রহণ করে নেয়। অন্য ভাষায়, দর্শক-শ্রোতারা চুম্বক আকর্ষণের শিকার হয়ে যায়।
ফ্রেডারিক আইমোর অল্প বয়স্ক শিশুদের মন-মস্তিষ্ক ও ধমনীর ওপর টেলিভিশনের প্রভাব-প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে লেখেন, শিশুদের জন্য প্রস্তুতকৃত প্রোগ্রামগুলো সাদামাটাভাবে পুনরাবৃত্তির কারণে মানুষের ধমনীসমূহকে পূর্ণাঙ্গভাবে রুদ্ধ করে দেয়। থিউডোর এডওয়ার্ডের ভাষায়, মিডিয়ার মাধ্যমে লোকদের মস্তিষ্কগত পশ্চাদপদতায় বাধ্য করা যায়। প্রাপ্তবয়স্ক ও সভ্য-সংস্কৃতিবান মানুষদের সহজেই শিশুদের কাতারে এনে দাঁড় করানো যায়। টেলিভিশন এমন বস্তুগত ও প্রাকৃতিক পরিবেশ সৃষ্টি করে, যাতে আবেগ-অনুভূতিকে উত্তেজিত ও আন্দোলিতকরণে জ্ঞান-বিবেককে খুবই কম কাজে লাগানো হয়। মগজ ধোলাইয়ের সবচে' সফল ও প্রভাবক, বরং সহজ পদ্ধতি হলো, মগজকে যৌন পরিবেশের সাথে জুড়ে দেয়া এবং এমন অবস্থা সৃষ্টি করা, যদিও তা মরীচিকার মতোই হোক, মানুষ যেন তার পেছনে দেওয়ানার মতো ছুটতে বাধ্য হয়। পশ্চিমা সিনেমায় শৈশবকালকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়, যেন সেটি অত্যন্ত আনন্দঘন সময় ছিল। উদাহরণস্বরূপ ষাটের দশকে শৈশবকাল সম্পর্কে একটি সিনেমা গোটা বিশ্বে প্রদর্শন করা হয়েছে, তাতে শৈশবকালকে একটি উন্মাদনার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখানো হয়েছে। এ বয়সে একজন নওজোয়ান কিভাবে প্রতিবেশীর মেয়ের সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলে এবং কিভাবে তারা আবেগ-উচ্ছ্বাসের জোয়ারে ভেসে যেতে থাকে। এটাই ছিল আলোচ্য সিনেমার প্রতিপাদ্য বিষয়। সত্তরের দশকে এমন সিনেমা দেখানো হয়েছে যাতে বলা হয়েছে, পঞ্চাশের দশকের নওজোয়ানরা কেমন হতো। এসব সিনেমা প্রদর্শনের মাধ্যমে সত্তর বছরের বৃদ্ধদের মধ্যে বিশ বছরের নওজোয়ানদের চেতনা সৃষ্টির প্রয়াস-প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে।
📄 মিডিয়ার চিত্র
ক. পাঠের উপকরণ।
খ. শ্রবণের উপকরণ।
গ. দর্শনের উপকরণ।
ঘ. দর্শন ও শ্রবণের উপকরণ।
ঙ. বলার উপকরণ।
পাঠের উপকরণ: পত্র-পত্রিকা, ম্যাগাজিন, বই-পুস্তক ও হ্যান্ডবুকস ইত্যাদি।
শ্রবণের উপকরণ: রেডিও, আলোচনা, কবিতা, লেকচার, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম ও বিতর্ক ইত্যাদি।
দর্শনের উপকরণ: টেলিভিশন, নাটক সিনেমা ইত্যাদি।
দর্শন ও শ্রবণের উপকরণ: যেমন-বিজ্ঞাপন, স্টিকার, মূর্তি, ভাস্কর্য, ফ্রেম, শিলালিপি, আর্ট, ছবি ইত্যাদি।
বলার উপকরণ: ইন্টারভিউ, সাক্ষাতকার, আলোচনা, কথাবার্তা ও গুজব ইত্যাদি।
📄 জনমত
দীনী ও নৈতিক মূল্যবোধের অনুপস্থিতিতে জনমত অথবা সংখ্যাগরিষ্ঠের ঝোঁকপ্রবণতা বাস্তবতা এবং ঘটনাসমূহ পরখ করার মাধ্যম বলে অভিহিত হয়। এক মনস্তত্ত্ববিদ জনমতের বিশ্লেষণ করতে গিয়ে লেখেন, সাধারণতঃ আমরা ধারণা করে থাকি, আমরা নিজেরাই নিজেদের অভিমত প্রতিষ্ঠা করি, কিন্তু বাস্তবতা তার উল্টো। কারণ সাধারণতঃ আমরা এই অনুমান করে সিদ্ধান্ত নেই যে, জনমত আমাদের তৎপরতা ও সিদ্ধান্তকে সমর্থন করবে। আমাদের প্রকৃতির অভ্যন্তরে এই ধারণা বদ্ধমূল রয়েছে।
জানাশোনা ও জ্ঞানের জন্য সংবাদ নয়; বরং সংবাদ হলো মগজ ধোলাইকারীদের পরিকল্পনা মোতাবেক মগজের অভ্যন্তরে বিদ্যমান চিত্র ও প্রতিচ্ছবিকে অন্যের নিকট পৌছানোর নাম। এটাকেই সে জনমত নামে আখ্যায়িত করে। নির্ধারিত চিত্র ও পরিকল্পনা মানুষের সামনে উপস্থাপন করার মাধ্যমে সে এটার পূর্ণতা দান করে। এর জন্য সে জনমত জরিপের চিত্তাকর্ষক নাম দিয়ে তার পক্ষে দলীল-প্রমাণ সরবরাহ করে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর জনমত জরিপের জন্য বহু প্রতিষ্ঠান অস্তিত্বশীল হয়েছে। সেসব প্রতিষ্ঠানে বড় বড় বিজ্ঞ মনস্তত্ত্ববিদ ও ব্রেন ওয়াশিং বিশেষজ্ঞরা কর্মরত রয়েছেন। হল বেকরিসা এ ধরনের জনমত জরিপের বিশ্লেষণ করতে গিয়ে লেখেন, যদি আপনি চান, মার্কিনীরা কোনো বিশেষ চিন্তা-চেতনা ও দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করে নিক, তাহলে আপনাকে শুধু এটা করতে হবে যে, আপনি জনমতের আশ্রয় নেবেন এবং বলবেন, জনমত এ কথা বলে। অতঃপর টেলিভিশন ও মিডিয়ার অন্যান্য মাধ্যমে তা প্রকাশ করে দেবেন। এর সহজ পদ্ধতি হলো, আপনি যত দক্ষতা ও প্রতিভার সাথে জনমত জানার জন্য প্রশ্নের অবকাঠামো তৈরি করবেন, সে আলোকেই আপনার পছন্দমতো জবাব পাবেন। উদাহরণস্বরূপ আপনি প্রশ্ন করবেন, ৮৫% মার্কিনীদের ধারণা, তারা নির্ভরযোগ্য সংবাদের জন্য টেলিভিশনের ওপর আস্থা রাখে, আপনার কি অভিমত? প্রত্যাশিত জবাব আপনি ইতিবাচকভাবে পেয়ে যাবেন। এখন এই আলোচনা নেই যে, টেলিভিশনের কোন সংবাদগুলো সম্পর্কে আপনার প্রশ্ন। রাজনৈতিক সংবাদ উদ্দেশ্য, না স্বাস্থ্য, সুস্থতা ও খেলাধুলা সম্পর্কে এই প্রশ্ন করা হচ্ছে। রাস্তা-ঘাটে চলমান লোকদের কাছে এ ধরনের প্রশ্ন প্রচার করে, তার নাম জনমত জরিপ দেয়া হয়। সাধারণভাবে জনগণ জনমত জরিপের এই পর্যালোচনায় অতি তাড়াতাড়ি প্রভাবিত হয়। বিশেষ করে যদি কোনো ব্যক্তি বিশেষের সফলতা ও ব্যর্থতার সাথে সম্পর্ক থাকে, তাহলে এটা আরো ফলপ্রসূ হয়। আজকাল টেলিভিশন ও দৈনিক পত্রপত্রিকার সহযোগিতায় শুধু একদিনেই জনমত জরিপ পর্যালোচনা করে ওই দিনই তা প্রচার করে দেয়া হয়, যাতে প্রত্যাশিত মনযিলের দিকে লোকদের পথপ্রদর্শন হয়ে যায়। দেখুন, ইহুদী প্রটোকলের দশম দস্তাবেজ।
টিকাঃ
৫. বাবরী মসজিদ প্রসঙ্গে সর্বপ্রথম তা বিতর্কিত বাবরী মসজিদ 'রাম জন্মভূমি', অতঃপর রাম জন্মভূমি বাবরী মসজিদ, অতঃপর মসজিদের বিতর্ক কাঠামো এবং তা স্থানান্তর, এসব প্রোপাগান্ডা চালিয়ে অবশেষে মসজিদের দেয়াল ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে।
📄 যা ভাল ছিল না, ধীরে ধীরে তাই ভাল হয়ে গেছে
সিনেমা, নাটক, লিটারেচার, গল্প, উপন্যাস ইত্যাদি বিগত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশক থেকে অসাধারণ দ্রুততার সাথে সাধারণ ও বিশেষ সর্বশ্রেণীর চিন্তা-চেতনা ও ধ্যান- ধারণা সম্পূর্ণ পাল্টে দেয়। আকবর এলাহাবাদীর ভাষায়-'যা ভাল ছিল না, ধীরে ধীরে তাই ভাল হয়ে গেছে।'
কাউ বয়েজ সিরিজে কঠোর আইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদকারীদের পুলিশ গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। সেখানে পুলিশকে হিরো হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, কিন্তু দীনী, নৈতিকতার বিরোধীতাকারী অপরাধীদের আশ্রয়দাতাদের সম্মান করা হয়। দীন ও নৈতিকতার বিরোধীতাকে কোনো দৃষ্টিকোণ থেকেই অপরাধ মনে করা হয় না। এক মজলুম ব্যক্তি, যে আইনের যাঁতাকল থেকে বাঁচার জন্য পালিয়ে যায়, কিন্তু আইন তার পিছু ধাওয়া করে। পক্ষান্তরে এই আইনই সাদা পোশাকধারী অপরাধীদের নিরাপত্তা দান করে। এই সিনেমায় ইনসাফকারীদের উপহাস করা হয় এবং তাদের ঘুষখোর ও দুশ্চরিত্র প্রমাণ করার প্রয়াস চালানো হয়। ডান্ডা ও বিত্তের বলে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে চাপ প্রয়োগ করে সিদ্ধান্ত পরিবর্তনকারীদের হিরো বানিয়ে উপস্থাপন করা হয়।
পঞ্চাশের দশকের পূর্বে সিনেমাগুলোতে যৌনতার ইশারা-ইঙ্গিতও পাওয়া যেত না, কিন্তু পঞ্চাশের দশকের পরে সিনেমাগুলোতে প্রথমে ইশারা ইঙ্গিতে অতঃপর চলাফেরায় নড়াচড়ায় এরপর বাস্তবে যৌনতার প্রদর্শন শুরু হয়। এই অশ্লীলতা ও যৌনতাকে 'আমেরিকান ভালবাসা' নাম করা হয়েছে। 'প্রেম-ভালবাসার আমেরিকান পদ্ধতি' নামক ফিল্ম-সিরিজে যৌনতার দৃশ্যসমূহ খোলামেলাভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ১৯৭৫ সালে প্রতি সপ্তাহে যৌনতার দৃশ্য প্রদর্শনের হার ছিল ১৫%, যা ১৯৭৮ সালে ২৪%- এ উন্নীত হয়েছে। এখন টিভি সিরিজে মারপিট ও উগ্রতার দৃশ্য প্রদর্শনের হার ৬০% এবং যৌন মেলামেশার দৃশ্য প্রদর্শনের হার ৩৫%-এ উন্নীত হয়েছে। অনেক সময় একটি মাত্র সিনেমাতেই এই হার পূর্ণ হয়ে যায়।১
শিশু-কিশোরদের জন্য যেসব সিরিজ, কার্টুন ও ভিডিও গেমস দেখানো হয়, তাতে জানোয়ারদের সৃষ্টির সেরা মানুষের আকৃতিতে দেখানো হয়। তারকা ও নক্ষত্র পূজা এবং চন্দ্র ও সূর্যকে সম্মান প্রদর্শনের জন্য মন-মানস প্রস্তুত করা হয়। শক্তি ও উগ্রতা প্রদর্শন করে এই ধারণা দেয়া হয় যে, শক্তি ও বিত্তই সকল বস্তু অর্জন ও অসাধ্য সাধন করার মোক্ষম অস্ত্র। সত্য ও সততার ওপর থাকা আসল সম্পদ নয়, আসল সম্পদ হলো শক্তি ও বিত্ত। ঘরগুলোতে দেখানো হয়, পিতা-মাতা সন্তানদের থেকে গাফেল উদাসীন এবং মা বয়ফ্রেন্ড ও পিতা গার্লফ্রেন্ড নিয়ে ব্যস্ত। আর বলা হয়, সন্তানের ওপর পিতা-মাতার শাসন-কর্তৃত্ব অকাম্য-অবাঞ্ছিত সীমা পর্যন্ত বেড়ে গেছে। পিতা-মাতা তাদের স্বাধীনতার পথে সবচে' বড় বাধা। এক সিনেমায় দেখানো হয়েছে, বিত্তশালী পিতা ঘরের বাইরে এত ব্যস্ত যে, স্ত্রী ও সন্তানদের দিকে তার কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। গভীর রাতে বাড়ীতে ফেরে এবং খুব প্রভাতেই বাড়ী থেকে বের হয়ে যায়। স্বামী ও পিতার ভালবাসা বঞ্চিত স্ত্রী ও সন্তানরা এ শূন্যতা তাদের ইচ্ছা ও পছন্দমতো পূরণ করে। তারা নিজ নিজ বন্ধু তালাশ করে নেয়। আর এতে তারা ন্যায়ের ওপর রয়েছে। অন্য এক সিনেমায় দেখানো হয়েছে, এক মেয়ে তার গবেট নির্বোধ পিতার ওপর আধিপত্য বিস্তার করে ফেলেছে। সে মনমতো বয়ফ্রেন্ড নিয়ে চলাফেরা ও রাত যাপন করে। অপর এক সিনেমায় দেখানো হয়েছে, ঘরে পিতা-মাতার কোনো ক্ষমতা-কর্তৃত্ব ও সম্মান-মর্যাদা নেই। দুষ্ট উচ্ছৃংখল ছেলে-মেয়েরা তাদের শাসকে পরিণত হয়েছে। এক সিনেমায় ভাই-বোন আর অপর সিনেমায় পিতা-মেয়ে যৌনতায়, এমনিভাবে মাকে তার ছেলের সাথে যৌনকর্মে লিপ্ত দেখানো হয়েছে।২
পঞ্চাশের দশকের পূর্বে সিনেমাতে দীনী ও নৈতিক মূল্যবোধ এবং সেগুলোর অন্তর্নিহিত রহস্যসমূহের সমালোচনা থেকে বিরত থাকা হতো। অবশ্য সরাসরি দীন ও নৈতিকতার আলোচনা করার পরিবর্তে সেসব রসম-রেওয়াজ, প্রথা-প্রচলন এবং সেগুলোর আনুগত্য অনুসরণের আলোচনা করা হতো, যা প্রাচীন যুগ থেকে চলে আসছিল। পারিবারিক জীবনে দীন ও নৈতিকতার যে সক্রিয় ভূমিকা ছিল, ইশারা-ইঙ্গিতেও তার আলোচনা করা হতো না। ষাটের দশকের পর এমন সিনেমা তৈরি হতে লাগল, যাতে সরাসরি দীনের সমালোচনা এবং চারিত্রিক ও নৈতিক মূল্যবোধকে টার্গেট বানানোর পরিবর্তে গির্জার পাদ্রীদের ব্যক্তিগত জীবনে ঘটে যাওয়া চারিত্রিক পদস্খলন, যৌন বিপথগামিতা এবং নৈতিক ধসের আলোচনা করা হতো। এভাবে মগজ ধোলাইয়ের ধারাবাহিক অভিযানের ফল যখন সামনে আসতে লাগল তখন সিনেমা ও টিভিতে দর্শক-শ্রোতাদের জন্য তিনটি পদ্ধতি উপস্থাপিত হতে লাগল।
০১. উঁচু সোসাইটি ও উন্নত জীবন মানে পৌঁছতে না পারার কারণে নিরাশ হয়ে মনস্তাত্ত্বিকভাবে নিজেকে পরাজিত ধারণা করা এবং কঠোর পরিশ্রমের জীবন গ্রহণ করার পরিবর্তে শেষ উপায় হিসেবে মাদকের আশ্রয় নেয়া। পশ্চিমা লেখক এলডাস হ্যাক্সলের স্বরচিত গ্রন্থ 'বীরত্ব ও সাহসিকায় পূর্ণ এক নতুন পৃথিবী'-তে এমন একটি সোসাইটির চিত্র অঙ্কন করেছেন, যার মধ্যে কোন নিয়ম-নীতি, চরিত্র ও নৈতিকতার কোনো শাসন নেই।
০২. বড় বড় সোসাইটিকে ছোট ছোট সোসাইটিতে ভাগ করে দেয়া, যাতে ব্যক্তি সোসাইটির চাহিদা থেকে নিজেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ মনে করে। কারণ সামাজিক ঐক্য কঠোরতা ছাড়া বাকী থাকতে পারে না। এই প্রস্তাবের বাস্তব রূপায়ণ করা হচ্ছে এভাবে, বড় বড় দেশগুলোকে আঞ্চলিকতা, গোত্রগত, ভাষা, বর্ণ ও জাতীয়তার ভিত্তিতে বিভক্ত করে দেয়া হচ্ছে।
০৩. ব্যক্তি সামাজিক ও পারিবারিক জীবন থেকে নিজেকে আলাদা করে নেবে। সে সর্বদা নিজেকে টেলিভিশনের আশ্রয়ে ছেড়ে দেবে, যাতে সামাজিক ও পারিবারিক জীবন থেকে আলাদা হওয়ার কারণে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে, টিভি তা পূর্ণ করে দেয়। সে ঘরের কোণে বসে টিভিতে ফুটবল ও ক্রিকেট ম্যাচ দেখবে আর নিজেকে সমাজের অন্তর্ভুক্ত মনে করবে। তা এভাবে টিভিতে শয়তানদের পূজা করা, জীব-জানোয়ারদের সম্মান করা এবং মানুষকে লাঞ্ছিত অপদস্থ করার যে দৃশ্যাবলী উপস্থাপন করা হয়, সেসব দেখে সে সত্যিই শয়তানকে পূজার যোগ্য, জীব-জানোয়ারকে সম্মানের পাত্র এবং এবং মানুষকে ঘৃণার পাত্র মনে করতে থাকে। মার্কিন লেখক টনি ব্রেগস তার গ্রন্থে দেখিয়েছেন, স্কুল, কলেজ ও প্রচলিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কোনো ফায়দা নেই। কারণ এতে পড়াশোনাকারীদের রাস্তা-ঘাটে সড়কে আশ্চর্য ধরনের পোশাক পরে নেশায় বুঁদ দেখা যায় এবং বিভিন্ন ধরনের ধ্বংসাত্মক কাজে লিপ্ত থাকে। এই গ্রন্থের নায়কের নির্ধারিত কোনো রাজনৈতিক ও চারিত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি নেই। সে নতুন প্রজন্মের ভাষা, অনুভূতি ও চেতনা পর্যন্ত পৌঁছতে পারে না। সে সর্বক্ষণ শুধু কল্পনার জগতে বিচরণ করে এবং উঁচু ধ্যান-ধারণা প্রকাশ করতে থাকে। (সূত্র: দস্তাবেজ-১৩)
টিকাঃ
১. উত্তর প্রদেশের রাজধানী লাখনৌর সাতটি সিনেমা হলে এমন সাতটি সিনেমা প্রদর্শন করা হয়েছে, যার পোষ্টারে লেখা ছিল-'প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য'। সূত্র: কওমী আওয়াজ, ১৯ সেপ্টেম্বর-১৯৯৬। এছাড়া ভারতীয় ও বাইরের টিভি চ্যানেলগুলোতে যৌনতার দৃশ্য সম্বলিত যেসব সিনেমা প্রদর্শিত হচ্ছে, তার সংখ্যা ২৫% থেকে ২৮%-এর মধ্যে। সূত্র: কওমী আওয়াজ, ২০ সেপ্টেম্বর-১৯৯৬।
২. এসব দৃশ্য আগে শুধু পাশ্চাত্যের সিনেমায় দেখানো হতো, কিন্তু ১৯৯৩ সাল থেকে ভারতীয় সিনেমাতেও এ ধরনের ডায়ালগ প্রচারিত এবং দৃশ্য প্রদর্শিত হচ্ছে। গানের মাধ্যমে অশ্লীলতা শিক্ষা দেয়ার কাজ তো ১৯৬০ সাল থেকেই শুরু হয়েছে। 'সঙ্গম হবে কিনা' এবং 'ভালবাসা যখন করেছি তখন ভয় কিসের' ইত্যাদি গানের ধারা ১৯৬০ সাল থেকেই শুরু হয়েছে। পরিস্থিতি এ পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে যে, পিতা এবং মেয়ের মধ্যেও এ ধরনের অশ্লীল যৌন কথোপকথন ও গানের ধারা শুরু হয়ে গেছে, যা সম্ভবত স্বামী-স্ত্রীও বলতে পছন্দ করবে না। ব্যান্ডেট কোয়েনের দৃশ্য ও খলনায়কের গান পশ্চিমা সিনেমার যথার্থ চিত্র। ১৯৯৭ সালের মার্চের প্রথম সপ্তাহে দিল্লীতে জাপান চলচ্চিত্র উৎসব পালন করা হয়েছে। দৈনিক কওমী আওয়াজ পত্রিকায় এক চলচ্চিত্র সমালোচক এই চলচ্চিত্র উৎসবের ওপর মন্তব্য করতে গিয়ে লেখেন, দু'টি জাপানী সিনেমায় আপন ভাই-বোনের মাঝে যৌন সম্পর্কের উন্মুক্ত দৃশ্য দেখানো হয়েছে। নির্দেশকরা কাহিনী ও ঘটনার স্বার্থে এমনটি করা হয়েছে বলে এর বৈধতার প্রমাণ পেশ করেছেন এবং এ ধরনের সম্পর্কের পরিণামও পূর্ণ দক্ষতার সাথে দেখিয়েছেন। সিনেমার কাহিনীতে দেখানো হয়েছে, ভাইয়ের স্মৃতিশক্তি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। ছোট বোন ভাইকে খুব ভালবাসে। এজন্য ভালবাসার উপহারস্বরূপ ভাইকে তার শরীর দান করে। আসলে তারা যা করে, সেটিকে শয়তান তাদের সামনে সুন্দর ও আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করে। সূত্র: দৈনিক কওমী আওয়াজ, ১০ মার্চ-১৯৯৭।
৩. সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলো ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, আফগানিস্তান, রাশিয়া, যুগোশ্লাভিয়া ইত্যাদি দেশগুলো আমাদের সামনে আছে, এমনিভাবে ইরাক, ইরান ও তুরস্কের সীমান্ত, পাকিস্তান ও ভারতের পশ্চিম এবং পূর্ব সীমান্তে বসবাসকারী জনগণের মাঝে বিভক্তির পর বিভক্তি সৃষ্টির ধারা শুরু করেছে। সূত্র: ইহুদী প্রটোকল, পঞ্চম দস্তাবেজ।