📘 পশ্চিমা মিডিয়ার স্বরূপ > 📄 মিডিয়া বা গণমাধ্যম

📄 মিডিয়া বা গণমাধ্যম


এক সময় প্রশ্ন ছিল মিডিয়া বা গণমাধ্যম মানব জীবনে কোনো প্রভাব-প্রতিক্রিয়া ফেলতে পারে কিনা? কিন্তু এখন আর সে প্রশ্ন নেই। সে প্রশ্ন এখন দৃষ্টিভঙ্গির স্তর অতিক্রম করে কার্যক্ষেত্রে প্রবেশ করেছে। এখন বাস্তবতা, অভিজ্ঞতা ও ফলাফলের আলোকে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, জনগণের ওপর মিডিয়ার প্রভাব প্রতিক্রিয়া কি পরিমাণ পড়ছে এবং এ প্রভাব-প্রতিক্রিয়ার ধরন ও গভীরতাই বা কতটুকু? এ ধরনের প্রশ্ন ওঠাই এ কথার সুস্পষ্ট প্রমাণ এবং পরোক্ষ স্বীকারোক্তি যে, মিডিয়া আজ মানুষের জীবনে গভীর প্রভাব ফেলছে। এই যুগকে আমরা মিডিয়ার যুগ বলতে পারি। এই যুগে সমরাস্ত্র ও সেনাবাহিনীর মাধ্যমে মানুষ হত্যার পরিবর্তে মিডিয়ার মাধ্যমে মানুষ হত্যা করা হচ্ছে। একে আমরা সভ্যতা-সংস্কৃতি এবং মনস্তাত্ত্বিক লড়াই বলতে পারি, বলতে পারি স্নায়ু যুদ্ধ। এ যুদ্ধের মূল পরিকল্পনা তৈরি করে সংবাদপত্র, রেডিও ও টিভি বিশেষজ্ঞরা।
আর সামরিক যুদ্ধের পরিকল্পনা তৈরি করে সমর বিশেষজ্ঞরা। বর্তমান বিশ্বে সে ব্যক্তিই বিজয়ী ও প্রবল, যার প্রোপাগান্ডার পাল্লা ভারী। প্রোপাগান্ডা এমন এক শক্তিশালী ও কার্যকর হাতিয়ার, যার মোকাবেলায় উন্নত থেকে উন্নততর নৈতিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক মূল্যবোধ ও সৌন্দর্যবোধ, উত্তম থেকে উত্তমতর চিন্তা-চেতনা ও ধ্যান-ধারণার সামান্য কোনো মূল্য ও গুরুত্ব নেই। আজকাল শিক্ষিত শ্রেণীও প্রোপাগান্ডা, প্রচারণা ও বিজ্ঞাপন দ্বারা কোনো জিনিসের গুরুত্ব ও মূল্যের পরিমাপ করে। এটা প্রোপাগান্ডার সাফল্যও বলা যেতে পারে। প্রোপাগান্ডায় যে যত বেশি বিশেষজ্ঞ সে তত বেশি জনদরদী ও জনকল্যাণকামীর মর্যাদা অর্জন করে। এ বাস্তবতা সর্বজনবিদিত যে, এ প্রচার-প্রোপাগান্ডার অন্তরালে বড় বড় সরকারগুলোর রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক স্বার্থ লুকায়িত রয়েছে, যারা মিডিয়া বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের জন্য পরিকল্পনা তৈরি করা এবং সে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার জন্য মিডিয়াকে 'অগ্রগামী সেনাবাহিনী'র মর্যাদা প্রদান করে ময়দানে ছেড়ে দিয়েছে। এর অনিবার্য ফল হিসেবে শুধু অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক জীবনই নয়, বরং খোদ মানব জীবনও মিডিয়ার অনুগামী হয়ে পড়েছে।
মিডিয়ার সীমাহীন, সুদূরপ্রসারী, সর্বব্যাপী ও সর্বগ্রাসী প্রভাব-প্রতিক্রিয়ার ব্যাপারে সমাজ ও গণসংযোগ বিশেষজ্ঞরা এ পরিমাণ আস্থাবান যে, মিডিয়া যখন ইচ্ছা তার নির্ধারিত লক্ষ্য-উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য যে কোনো দেশ ও জাতি-গোষ্ঠীর চারিত্রিক, নৈতিক ও রাজনৈতিক মূল্যবোধ ওলট-পালট করে দেয়। তারা যখন এরকম উদ্যোগ গ্রহণ করে, তখন সঙ্গত কারণেই তাদের আস্থা ভরসা থাকে যে, তাদের লক্ষ্যীভূত দেশ ও জাতির লোকেরা তাদের ছড়ানো জালে ফেঁসে যাবে। কারণ সেসব দেশ ও জাতি-গোষ্ঠীর নিকট না মিডিয়ার সর্বগ্রাসী প্রভাব-প্রতিপত্তির মোকাবেলা করার শক্তি আছে, আর না এমন কোনো প্রযুক্তিগত শক্তি আছে, যার মাধ্যমে তারা এই প্রোপাগান্ডার জাল ছিন্ন করতে পারে। মিডিয়ার চাপ ও পথ-নির্দেশনায় যে সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়, তা স্বাভাবিকভাবেই মিডিয়া-প্রোপাগান্ডার অভ্যন্তরীণ চিন্তা-চেতনা, ধ্যান-ধারণা ও পরিকল্পনারই প্রতিচ্ছবি। প্রোপাগান্ডার মধ্যে যে চারিত্রিক মূল্যবোধ উপস্থাপন করা হয়, সে আলোকেই সমাজ গঠিত হয়।
এমনিভাবে তার উপস্থাপিত সামাজিক জীবন ও চারিত্রিক মূল্যবোধের বিপরীত অন্যান্য সকল সামাজিক জীবন ও চারিত্রিক মূল্যবোধের সাথে সে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে সেসবের প্রকৃতিকে সম্পূর্ণ বিকৃত করে দেয়। যে কোনো বাস্তবতা ও মতাদর্শের পরিবর্তন ঘটিয়ে তা বিকৃত করে দেবার মতো শক্তি মিডিয়ার রয়েছে। যখন বাস্তব অবস্থার পরিবর্তন সাধিত হয় তখন তা এমন প্রত্যাখ্যান অযোগ্য বাস্তবতা বলে গ্রহণ করে নেয়া হয়, যে সম্পর্কে কোনো আলোচনা পর্যালোচনা বা দ্বিমত পোষণ সম্ভব নয়; বরং সেটি ওহীর মর্যাদা লাভ করে। মিডিয়ার এই রাজত্ব সম্পূর্ণ ওয়ান ওয়ে ট্র্যাফিক নীতির ওপর পরিচালিত হয়। যাতে কারো কোনো কথা বলা কিংবা প্রভাব সৃষ্টি করার অধিকার থাকে না। মিডিয়া যদি কারো সম্পর্কে বলে, সে সুস্থ, তাহলে তার মধ্যে হাজারো রোগ-বালাই এবং এইডস থাকা সত্ত্বেও সে সুস্থ সবল পাহলোয়ান।
মিডিয়ার এই মনস্তত্ত্বকে প্রাচীন যুগের একটি ঘটনায় বড় সুন্দরভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। ঘটনাটি হলো, এক পাদরী কোথাও থেকে একটি ছাগল কিনে আনছে। রাস্তায় এক প্রতারকচক্র ফন্দি আঁটল, এই সহজ-সরল পাদরীর কাছ থেকে যে করেই হোক ছাগলটি ছিনিয়ে নিতে হবে। সেমতে প্রতারকচক্রের এক সদস্য অসহায় মিসকীন সেজে পাদরীকে বলল, এই কুকুরটি আপনি কত দিয়ে কিনেছেন? এটি কি আপনি ঘর-বাড়ী পাহারা দেবার জন্য কিনেছেন?
বেচারা পাদরী মিসকীনরূপী প্রতারকের কথা শুনে বিস্মিত হয়ে বলল, আরে! এটি কুকুর নয়, এটি তো ছাগল। কিছুক্ষণ চলার পর প্রতারকচক্রের আরেক সদস্য অত্যন্ত নিষ্ঠা ও ভক্তি-শ্রদ্ধার সাথে আবির্ভূত হয়ে আস্থাভরা কণ্ঠে পাদরীকে বলল, আপনার কুকুরটি তো অত্যন্ত সুন্দর এবং ভাল জাতের। এটি বাগান-বাড়ী পাহারা দেয়ার জন্য খুবই উপযোগী হবে। পর্যায়ক্রমে প্রতারকচক্রের তৃতীয় চতুর্থ সদস্যও ধরন পাল্টিয়ে একই কথা বলল। পর পর এত জনের মুখে একই কথা শুনে পাদরীর বিশ্বাস হয়ে গেল, এটি ছাগল নয়; বরং একটি কুকুর। যে এটি বিক্রি করেছে সে মনে হয় ছাগল বলে কুকুরই বিক্রি করেছে। শেষ পর্যন্ত পাদরী ধারাবাহিক প্রোপাগান্ডার জালে আটকা পড়ে ছাগলকে কুকুর মনে করে সেটি ছেড়ে দিয়ে পালিয়ে যায়।
এই ঘটনার আলোকে আধুনিক যুগের এক প্রতারক ও সুচতুর গোয়েবলস বলেছে, মিথ্যা এতবার বল, যাতে এক পর্যায়ে সেটা সত্য পরিণত হয়ে যায়। আধুনিক যুগের মিডিয়া আর প্রাচীন যুগের ধোকাবাজ প্রতারকদের মধ্যে যদি কোনো পার্থক্য থাকে তা হল, সে যুগে একজন পাদরী ধারাবাহিক প্রোপাগান্ডার জালে আটকা পড়ে একটি মাত্র ছাগল হারিয়েছিল আর বর্তমান যুগের বিভিন্ন দেশ ও জাতি-গোষ্ঠী তাদের আকীদা-বিশ্বাস, তাহযীব-তামাদ্দুন, সভ্যতা-সংস্কৃতি, কৃষ্টি-কালচার এবং নৈতিক ও চারিত্রিক মূল্যবোধ ইত্যাদি সবকিছু থেকে হাত ধুয়ে বসছে। তারা অত্যন্ত তুষ্টির সাথে নিজেদের ইতিহাস-ঐতিহ্য এবং জাতীয় উত্তরাধিকার হারিয়ে চলেছে।
মানব জীবনে মিডিয়ার প্রভাব-প্রতিক্রিয়া বহুমুখী। স্বল্প পরিসরে সবগুলোর বিশদ আলোচনা করা সম্ভব নয়। এখানে শুধু গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোরই সংক্ষিপ্তভাবে আলোচনা করা হবে।
বর্তমান যুগে মানুষের জন্য মিডিয়া একটি সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউশনের রূপ ধারণ করেছে, যা ছাড়া মানব জীবনের পরিভ্রমণ সম্ভব নয়। সামাজিক জীবনের মূল দুই স্তম্ভ-নারী পুরুষ মিডিয়া থেকেই জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অর্জন করে এবং মিডিয়ার সরবরাহকৃত তথ্য-উপাত্তকেই জীবনের খোরাক হিসেবে গ্রহণ করে। অন্য ভাষায়, মিডিয়ার দুর্দান্ত আধিপত্যের কারণে মানব জীবন থেকে বই-পুস্তকের গুরুত্ব নিঃশেষ হয়ে গেছে, যা বিগত শতাব্দীর সূচনালগ্নে বই-পুস্তক মুদ্রণ ও প্রকাশের কারণে সৃষ্টি হয়েছিল। বর্তমানে মানুষ জ্ঞান-গবেষণার নির্ভরযোগ্য উৎসের দিকে প্রত্যাবর্তন এবং সরাসরি সেসব উৎস থেকে উপকৃত হবার পরিবর্তে মিডিয়ার উপস্থাপিত ভাসা ভাসা জ্ঞান-গবেষণার ওপরই নির্ভর করতে শুরু করেছে।
এ কারণেই মিডিয়া থেকে উপকার গ্রহণকারীদের চিন্তা-চেতনা, ধ্যান-ধারণা, রুচি-অভ্যাস, সভ্যতা-সংস্কৃতি, কর্মধারা-কর্মপদ্ধতি এবং আচার-আচরণে অভিন্নতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। তাদের এমন এক ছাঁচে ঢালা মনে হচ্ছে, যা মিডিয়া তৈরি করেছে। এসব লোক সত্তাগতভাবে না নিরেট ভাল, আর না নির্ভেজাল মন্দই। অতএব সকল মানুষ একরকম হতে পারে না। কারণ সৃষ্টিকর্তা মানুষকে বিভিন্ন রকমের যোগ্যতা, প্রতিভা, জ্ঞান, বিবেক এবং বিভিন্ন স্তর ও শ্রেণীতে সৃষ্টি করেছেন। মানব সোসাইটি একটি ফুল কানন, যেখানে রঙ বেরঙয়ের ফুল ফোটে। এসব ফুল দ্বারাই বাগান সজীব সতেজ ও সৌন্দর্যমণ্ডিত হয়। যদি মানব সমাজ ফুল কাননের মতো না হয়ে গ্রন্থের মতো হয়ে যায়, তাহলে মানবিক বিবেক, যোগ্যতা, প্রতিভা, জ্ঞান-গবেষণা ও সভ্যতা, সংস্কৃতির আর কী উপকারিতা থাকে!
আজকের মিডিয়া মানুষের সামনে জীবন সম্পর্কে যে বাস্তবতা উপস্থাপন করে তার ওপর মানুষ অসাধারণ বিশ্বাস ও আস্থা রাখে। তারা মিডিয়ার পেশকৃত ভাসা ভাসা জানা-শোনা এবং সাময়িক কোনো জিনিসকেই বেশি পছন্দ করে। আজকের যুগকে 'স্পেশালাইস্ট বা বিশেষায়নের' যুগ বলা হয়। এ যুগে মানুষ জ্ঞান-গবেষণার আসল উৎসের দিকে প্রত্যাবর্তন করে না। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, বিশেষায়নের এ যুগে বিবিধ বিষয়ের জ্ঞান, জানা-শোনা এবং সাময়িক কোনো বিষয় কি আমাদের জন্য উপকারী এবং ফলপ্রসূ হতে পারে? অথচ আজ প্রতিটি জ্ঞানের শত শত শাখা-প্রশাখা এবং প্রতিটি বিষয়ে এক একটি গ্রন্থাগার সৃষ্টি হয়েছে। এর থেকে অস্থির হয়ে বড় বড় দেশগুলো তথ্য-ব্যাংক সৃষ্টি করেছে। এই তথ্য-ব্যাংক বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও এখনো কি লাইব্রেরী ও গবেষণা কেন্দ্রসমূহে যাওয়ার প্রয়োজন অবশিষ্ট নেই? তাহলে আমরা প্রাচীন জ্ঞান-ভাার থেকে কিভাবে উপকৃত হব।
এ যুগে মিডিয়া ও জাতীয় উন্নয়ন একে অপরের অপরিহার্য অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইউনেস্কোর তত্ত্বাবধানে এশিয়ান সংবাদপত্রের সম্পাদকদের গোলটেবিল সম্মেলনে মঞ্জুরকৃত সিদ্ধান্ত ও প্রস্তাবাবলী দ্বারা বিষয়টি আরো সুস্পষ্ট হয়। উক্ত সম্মেলনের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনার সফলতা সম্পূর্ণ জাতীয় চেতনার ওপর নির্ভর করছে। এই জাতীয় চেতনা সৃষ্টি তখনই সম্ভব যখন মিডিয়া এ ক্ষেত্রে সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে। এ প্রস্তাব যেন একথারই স্বীকৃতি যে, মিডিয়া ছাড়া জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা সফলকাম হতে পারে না।
এ জন্য দুনিয়ার যেখানেই অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন কর্মসূচী তৈরি করা হয়, সেখানে এর জন্য বস্তুগত ও অভ্যন্তরীণ প্রয়াসের প্রয়োজন। বাহ্যিক চেষ্টা-প্রচেষ্টা হলো, উন্নয়ন পরিকল্পনা তৈরিতে সরকার ও বিশেষজ্ঞদের প্রয়াস, যাতে শিল্প, কৃষি ও অবকাঠামো নির্মাণ পরিকল্পনা তৈরি করে জাতীয় আশা-আকাঙ্খার পূর্ণতা দান করা যায়, কিন্তু এ জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা শৈল্পিক বিশেষজ্ঞদের যত মেহনত ও প্রাণান্তকর প্রয়াসের মাধ্যমেই তৈরি করা হোক না কেন, যতক্ষণ পর্যন্ত মিডিয়ার মাধ্যমে জাতীয় চেতনা জাগ্রত না করা হবে ততক্ষণ পর্যন্ত জাতীয় পর্যায়ে সেই পরিকল্পনা পূর্ণতা লাভ করা অসম্ভব।
মিডিয়ার অসাধারণ ক্ষমতা ও মানবজীবনে তার প্রভাব-প্রতিপত্তির বিষয়টি সেসব বিজ্ঞাপন দ্বারা সহজেই অনুমিত হয়, যা সুনিপুণ শৈল্পিক কলা-কৌশলের মাধ্যমে জনসাধারণের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা দৃষ্টিতে রেখে প্রস্তুত করা হয়। যেহেতু মিডিয়ার বিজ্ঞাপন দ্বারা একদিকে মিডিয়ার অস্তিত্ব অপরদিকে কলা-কুশলীদের বিরাট আর্থিক লাভের মাধ্যম, তাই এ দিকটির প্রতি প্রোপাগান্ডা বিশেষজ্ঞরা অসাধারণ মনোযোগ নিবদ্ধ করেছে। মিডিয়ার বিজ্ঞাপন জীবন-মান সম্পূর্ণ পাল্টে দিয়েছে। গোটা সমাজ প্রয়োজনীয় ও অপ্রয়োজনীয় শিল্প-পণ্য কেনাকাটার জ্বরে এমনভাবে আক্রান্ত হয়ে পড়েছে যে, তাদের সেসব পণ্যের ধরন, মান ও ভাল মন্দের পার্থক্য করারও হুশ অবশিষ্ট নেই। অন্য ভাষায়, মিডিয়ার বিজ্ঞাপন সমাজের যাদুকরী প্রভাব ফেলেছে, অথবা কোনো একটা আকর্ষণের শিকার হয়েছে, যাতে মিডিয়ার বিজ্ঞাপনে প্রভাবিত হয়ে শিল্প-পণ্য কেনাকাটায় তাদের ইচ্ছারও কোনো দখল থাকে না। সমাজের প্রতিটি সদস্যের যোগ্যতা, প্রতিভা ও বিবেক-বিবেচনার শক্তি অবশ অসার হয়ে গেছে। সম্ভবতঃ এই অসাধারণ প্রভাব-প্রতিপত্তির কারণেই মিডিয়াকে এই যুগের নেশা ও আফিম বলা হয়ে থাকে।
এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, আধুনিক যুগের তাহযীব-তামাদ্দুন, সভ্যতা-সংস্কৃতি মানুষকে সমাজ দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। আমাদের সমাজের প্রতিটি সদস্য চিন্তা-চেতনা, ধ্যান-ধারণা, সমস্যা-সংকট এবং উচ্ছ্বাস-আবেগের কারণে একে অপরের সাথে অপরিচিত হয়ে গেছে। কাজেই আশেপাশে যারা রয়েছে, তারা সবাই পরস্পরে অপরিচিত একটি সমাজ পরিবেশেই শ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহণ করছে। এ অবস্থায় মিডিয়ার বিজ্ঞাপন ও প্রচারের প্রভাব-প্রতিক্রিয়া উন্নতির শীর্ষে উপনীত হয়। অতঃপর প্রত্যেক ব্যক্তি সহজেই মিডিয়ার যাদুর শিকার হয়ে যায়। কেননা, সে মিডিয়ার নেশাকর ইনজেকশন গ্রহণ করেছে।

📘 পশ্চিমা মিডিয়ার স্বরূপ > 📄 মগজ ধোলাই

📄 মগজ ধোলাই


মগজ ধোলাই বিষয়ের বিশেষজ্ঞরা যেসব গ্রন্থ লেখেছেন, তার মধ্যে গেস্টাওলিবান রচিত ‘সাইকোলজি অফ গেদারিং’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। উক্ত গ্রন্থে তিনি মানব সমাবেশের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করতে গিয়ে লেখেন, মানুষ যতই সভ্য, সচেতন ও শিক্ষিত হোক না কেন, যখন সে কোনো গ্রুপ কিংবা সমাবেশের সাথে থাকবে তখন সে ওই গ্রুপ বা সমাবেশের মনস্তত্ত্ব এবং অবস্থার অনুগামী হয়েই থাকবে। ভাল বিবেকবান সচেতন মানুষও আবেগ তাড়িত হয়ে দলের পেছনে দৌড়াতে থাকে। অন্যকে যা সে করতে দেখে পশুর মতো বিনা চিন্তায় তাই করতে থাকে। যেন তার ওপর যাদু মন্ত্র প্রয়োগ করা হয়েছে।
ফ্রয়েডের মতো মনস্তত্ত্ববিদও একই মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, মানুষ দলের সাথে থাকতেই ভালবাসে। সুতরাং এমন পথ-নির্দেশকের প্রয়োজন, যে গোটা দল বা সমাবেশকেই যাদুগ্রস্ত করে দেবে।
গেস্টাওলিবান ও ফ্রয়েডের পর শত শত মনস্তত্ত্ববিদ এ বিষয়ে অনেক গ্রন্থ রচনা করেছেন। মগজ ধোলাই বিষয়ে এ পরিমাণ গবেষণা হয়েছে যে, এ বিষয়ে মনস্তত্ত্ববিদগণ দু'ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছেন। প্রথম দলের কেন্দ্র হলো ইংল্যান্ড। তারা মানবিক সম্পর্কের মনস্তত্ত্ব নিয়ে গবেষণা করেছেন। আর দ্বিতীয় দলের কেন্দ্র হলো ফ্রাঙ্কফুর্ট। তারা সামাজিক সম্পর্ক বিষয়ক মনস্তত্ত্বের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছেন। তারা মগজ ধোলাইয়ের উপকরণ এবং মাধ্যম নিয়ে গবেষণা ও পর্যালোচনা করেছেন। একে তারা উত্তম থেকে উত্তমতর বানানোর প্রয়াস চালিয়েছেন। উদাহরণস্বরূপ প্রিন্সটন প্ল্যানের আওতায় এই গ্রুপ রেডিও'র প্রভাব-প্রতিক্রিয়ার ওপর জরিপ চালিয়ে যে ফল বের করেছেন, তা আজ টেলিভিশন প্রোগ্রাম প্রস্তুতকারীদের কাজে আসছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বৃটেন ও জার্মানী মনস্তত্ত্ববিদদের সেবা নিয়ে রেডিও'র মাধ্যমে একে অপরের বিরুদ্ধে তুমুল মনস্তাত্ত্বিক লড়াই চালিয়েছিল। এই গ্রুপ প্রথম গ্রুপের সংগৃহীত ফল থেকে উপকৃত হয়ে বাস্তব প্রোগ্রাম রূপায়ণ করেছে।
মগজ ধোলাইয়ে সাধারণভাবে ব্যক্তির মনস্তত্ত্বকে ধারাবাহিক দ্বন্দ্ব-সংঘর্ষ ও অস্থিরতার মধ্যে ডুবিয়ে রাখার সর্বাত্মক প্রয়াস চালানো হয়। এমনকি এক পর্যায়ে সে তার অস্থিরতা প্রকাশের রাস্তা অনুসন্ধান করে কিংবা অস্থিরতাপূর্ণ পরিবেশের সাথে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেবার জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়, কিন্তু যখন দ্বন্দ্ব-সংঘর্ষ ও অস্থিরতার পরিবেশ দীর্ঘায়িত হয় এবং প্রতিটি মুহূর্তে তার ওপর নতুন নতুন অস্থিরতা চাপতে থাকে, তখন সে এ পরিবেশের সাথে ইতিবাচকভাবে খাপ খাইয়ে নেবার সক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। তখন সে এমন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বাধ্য হয়, যা তার ব্যক্তিত্ব ও কর্মকা ধ্বংস করে ছাড়ে। তখন সে পশুর চেয়েও নিচে নেমে যায়। যেখানে তার নৈতিক ও চারিত্রিক মূল্যবোধ বড় নির্দয় নির্মমভাবে পদদলিত হয়। সুতরাং মগজ ধোলাইয়ের প্রোগ্রামকে অত্যন্ত সুসংগঠিতভাবে আঞ্জাম দিতে হবে। মানব মনস্তত্ত্বকে অস্থিরতা পেরেশানীর মধ্যে লিপ্ত করতে এমন পদ্ধতি অবলম্বন করা হবে, যা হবে পরিকল্পিত। এর জন্য উত্তম পদ্ধতি হলো এমন স্থায়ী পরিবেশ সৃষ্টি করে দেয়া, যাতে বার বার সে দৃশ্যই তার সামনে এসে হাযির হয় এবং এক দীর্ঘ সময় ধরে পদ্ধতি ও ধরণ পাল্টিয়ে পরিকল্পিতভাবে তার মন-মস্তিষ্ক, মেধা-মগজ ও চেতনার ওপর সে বিষাক্ত পরিবেশ চাপিয়ে দেয়া হয়।
রেডিও আবিষ্কারের পর ব্রেন ওয়াশিং বিশেষজ্ঞরা একে বিভিন্ন জাতি গোষ্ঠী ও দেশের মগজ ধোলাই করার একটি সুবর্ণ সুযোগ মনে করে। সেমতে প্রিন্সটন প্ল্যানের আওতায় রেডিও'র একক ও ব্যাষ্টিক প্রভাব-প্রতিক্রিয়া পর্যালোচনা করা হয়। সে পর্যালোচনার আলোকে এ বাস্তবতাই ফুটে উঠেছে যে, শ্রোতা কোনো সংবাদ, প্রস্তাব কিংবা শৈল্পিক বিষয় গ্রহণ করার ক্ষেত্রে বিষয় ও তার তথ্যাবলী থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে যে বিষয় দ্বারা প্রভাবিত হয় সেটি হলো, সে সংবাদের পুনরাবৃত্তি ও তা উপস্থাপন করার ধরন-পদ্ধতি কেমন। কোনো সাধারণ সংবাদ যদি শক্তিশালী ভঙ্গিতে পাঠ বা উপস্থাপন করা হয়, তাহলে শ্রোতা এর দ্বারা বেশি প্রভাবিত হয়, কিন্তু যদি হাজারো মানুষের 'গণহত্যার সংবাদকে অত্যন্ত ঠান্ডা ও দূর্বল ভঙ্গিতে পাঠ বা উপস্থাপন করা হয় তাহলে শ্রোতা এর দ্বারা মোটেও প্রভাবিত হয় না। টেলিভিশন আবিষ্কারের পর ব্রেন ওয়াশিং বিশেষজ্ঞদের সে হাতিয়ার অর্জিত হয়েছে, যা তারা স্বপ্নেও দেখেনি। সুতরাং টিভির প্রভাব-প্রতিক্রিয়া বিশ্লেষণ করতে গিয়ে এক মগজ ধোলাই বিশেষঞ্জ থিউডোর এডওয়ার্ড বলেন, টেলিভিশন আবিষ্কারের ফলে মানুষের মন মস্তিষ্ক ও আবেগ-উচ্ছ্বাসের ওপর পরিপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ আরোপের একটি শক্তিশালী মাধ্যম আমাদের হাতে এসে গেছে, যা আমরা স্বপ্নেও কল্পনা করিনি।
টেলিভিশনের মৌলিক ও অসাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো, তা আওয়াজ ও ছবি উভয়টিকে এমনভাবে উপস্থাপন করে, যা দ্বারা সর্বোত্তমভাবে মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব অস্থিরতার পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব হয়। আবার তা দ্বারাই সে পরিবেশ সর্বোত্তমভাবে প্রশমিত করা যায়।
টেলিভিশন আপনার সামনে এমন এমন জিনিস উপস্থাপন করে, আপনি চান আর না চান, কিন্তু আপনি সেটা পছন্দ করতে বাধ্য হবেন। টেলিভিশন এমন পদ্ধতিতে তা উপস্থাপন করবে, যেন তা ছাড়া আর কোনো উপায়ই নেই। সে আপনার চিন্তাশক্তি স্থবির করে দেবে। এমন পরিস্থিতিতে আপনি নিজের মধ্যে বিবেকের পরিবর্তে যৌন উত্তেজনা ও প্রবৃত্তির অগ্নি প্রজ্বলিত দেখতে পাবেন। নিজের মাঝে শিশুসুলভ চেতনা ও অনুভূতি প্রোথিত দেখবেন। আপনি মনে করবেন, প্রতিটি মানুষ একই চিন্তা করছে, একই কথা বলছে, একই কাজ করছে। ধীরে ধীরে আপনার সামনে পছন্দনীয় ও চিত্তাকর্ষক বস্তু উপস্থাপন করা হবে। সংবাদ এমনভাবে উপস্থাপন করা হবে, যেন এটাই জনমত। উদাহরণস্বরূপ কোনো খবর বিভিন্ন টিভি স্টেশনের বরাত দিয়ে একই ধরনে একই পদ্ধতিতে উপস্থাপন করা হয়।
খবর পরিবেশনের সময় সর্বপ্রথম দেশীয় ও আন্তর্জাতিক খবর পরিবেশন করা হয়। এরপর বিশেষ প্রতিবেদন, সর্বশেষ খেলাধুলা, আর্ট ও সাহিত্য বিষয়ে সংবাদ পরিবেশন করা হয়, কিন্তু এই খবরের আড়ালে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে শৈল্পিকপদ্ধতিতে প্রোপাগান্ডা চালানো হতে থাকে। খবরের প্রতিটি শব্দ প্রতিটি বাক্য এমনভাবে নির্বাচন করা হয়, যাতে তা শ্রোতা ও দর্শকদের মন মস্তিষ্কে সুদূরপ্রসারী প্রভাব-প্রতিক্রিয়া ফেলে যায়। এসব শব্দ এবং বাক্যের জন্যও সীমিত কিছু সময় নির্ধারিত থাকে।
ব্রেন ওয়াশিং বিশেষজ্ঞরা যখন সংবাদ বিন্যাস করে তখন তারা তাদের মৌলিক লক্ষ্য-উদ্দেশ্য সামনে রাখে, কোনো অবস্থায়ই যা তারা এড়িয়ে যেতে পারে না। সংবাদের প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি বাক্য ও প্রতিটি ছবি এমনভাবে চয়ন করা হয় যে, তা বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ উভয় ধরনের তাৎপর্য বহন করে। সাধারণভাবে আন্তর্জাতিক সংবাদগুলো ব্রেন ওয়াশিং বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিভঙ্গি ও মর্জির আলোকেই পরিবেশন করা হয়। পৃথিবীর সেসব চিত্র, যা দ্বন্দ্ব-সংঘর্ষ ও অস্থিরতায় পরিপূর্ণ, যা দেখলে মানসিক অস্থিরতা আরো বেড়ে যায়, সেগুলো বার বার দেখানো হয়। টিভিতে প্রতিটি ছবির স্থায়িত্ব ত্রিশ সেকেন্ড থেকে বেশি হয় না। উদাহরণস্বরূপ কোনো শিশু বহুতল ভবনের ছাদ থেকে পড়ে যাওয়া কিংবা গুলির আঘাতে ছটফট করা, পুলিশ কোনো অপরাধীকে ধাওয়া করা, সন্ত্রাসীর গুলিতে রক্তাক্ত ব্যক্তির স্বজনদের আহাজারি, বহুতল ভবনে ভয়াবহ অগ্নিকা, সড়ক দূর্ঘটনা এবং যুদ্ধ ও দুর্ভিক্ষের করুণ অবস্থার দৃশ্যগুলো টিভির পর্দায় বার বার দেখানো হয়। শুধু দৃশ্যগুলোই বার বার দেখানো হয়, কিন্তু ঘটনার বিস্তারিত কিছুই বলা হয় না। এসব দৃশ্য দেখে দর্শক-শ্রোতারা শুধু এ প্রতিক্রিয়াই গ্রহণ করে যে, কোথাও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে কিংবা ভয়াবহ আগুন লেগেছে। এরপর অর্থনৈতিক সংবাদ পরিবেশন করা হয়। যেমন ডলার ও স্বর্ণের বর্তমান বাজার মূল্য ইত্যাদি। উল্লিখিত সংবাদ ও দৃশ্যগুলো দেখে স্বাভাবিকভাবেই দর্শক-শ্রোতার মানসিক অস্থিরতা বৃদ্ধি পায়। এরপর এমন সংবাদ পরিবেশন করা হয়, যাতে মানসিক অস্থিরতা হ্রাস পায়। যেমন অতি নিম্নস্তরের যৌন কাহিনী, ধর্ষণ ও ইজ্জত হরণ, ফ্যাশন শো'র নগ্ন দৃশ্য এবং চলচ্চিত্র জগতের অভিনেতা-অভিনেত্রীদের প্রেম-ভালবাসার রোমান্টিক কাহিনীগুলোকে রং চড়িয়ে পরিবেশন করা ইত্যাদি। এরপর টেলিভিশন তার নির্ধারিত লক্ষ্য-উদ্দেশ্য সামনে রেখে সেসব রাজনীতিবিদদের বক্তব্য বিবৃতি প্রচার করে, যা তার নির্ধারিত লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ও দৃষ্টিভঙ্গির সমর্থন করে। টেলিভিশন এসব সংবাদ অত্যন্ত গুরুত্ব ও মনোযোগের সাথে পরিবেশন করে। ফলে লাখ লাখ কোটি কোটি দর্শক-শ্রোতা একে সত্য বলে গ্রহণ করে নেয়। অথচ দর্শক সেসব সচিত্র সংবাদ দেখেছে, যা পশ্চিমা মিডিয়া নিজের তরফ থেকে মনগড়াভাবে উপস্থাপন করেছে।
ব্রেন ওয়াশিং-এর আরেক বিশেষজ্ঞ ফ্রেডারিক আইমোর টেলিভিশনের ছবির গভীর প্রভাব-প্রতিক্রিয়া বিশ্লেষণ করতে গিয়ে লেখেন, টেলিভিশনের ছবিগুলো এত প্রভাব সৃষ্টিকারী ও যাদুকরী হয়, যা দর্শক-শ্রোতাদের সকল মনোযোগ তার দিকে টেনে নেয়। টেলিভিশন বিশেষভাবে চোখ ও মস্তিষ্ককে অসাধারণ প্রভাবিত করে। তা এভাবে, আওয়াজ, ছবি ও অতীত ঘটনাবলীর মাঝে চোখ অতি দ্রুত সংযোগ প্রতিষ্ঠা ও সমন্বয়ের কাজ আঞ্জাম দেয়। এমতাবস্থায় মস্তিষ্ক, যার আসল কাজ ঘটনাবলীর জরিপ, বিশ্লেষণ এবং সংবাদ ও ছবিগুলো ধারাবাহিক দেখা ও ফল বের করানো, কিন্তু সে তার কাজ আঞ্জাম দিতে সক্ষম নয় এজন্য যে, প্রতিটি মুহূর্তে দৃশ্যের পরিবর্তন হতে থাকে। ফলে সে কোনোভাবেই দ্রুত পরিবর্তনশীল দৃশ্য ও ঘটনাবলীর বিচার-বিশ্লেষণ করার উপযোগী থাকে না। কারণ এমতাবস্থায় বিবেক ও মস্তিষ্কের শূন্য জায়গা কোনো বিচার-বিশ্লেষণ ও ফলাফলে পৌঁছা ছাড়াই দ্রুত পরিবর্তনশীল দৃশ্য ও ঘটনাবলীকে হুবহু গ্রহণ করে নেয়। অন্য ভাষায়, দর্শক-শ্রোতারা চুম্বক আকর্ষণের শিকার হয়ে যায়।
ফ্রেডারিক আইমোর অল্প বয়স্ক শিশুদের মন-মস্তিষ্ক ও ধমনীর ওপর টেলিভিশনের প্রভাব-প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে লেখেন, শিশুদের জন্য প্রস্তুতকৃত প্রোগ্রামগুলো সাদামাটাভাবে পুনরাবৃত্তির কারণে মানুষের ধমনীসমূহকে পূর্ণাঙ্গভাবে রুদ্ধ করে দেয়। থিউডোর এডওয়ার্ডের ভাষায়, মিডিয়ার মাধ্যমে লোকদের মস্তিষ্কগত পশ্চাদপদতায় বাধ্য করা যায়। প্রাপ্তবয়স্ক ও সভ্য-সংস্কৃতিবান মানুষদের সহজেই শিশুদের কাতারে এনে দাঁড় করানো যায়। টেলিভিশন এমন বস্তুগত ও প্রাকৃতিক পরিবেশ সৃষ্টি করে, যাতে আবেগ-অনুভূতিকে উত্তেজিত ও আন্দোলিতকরণে জ্ঞান-বিবেককে খুবই কম কাজে লাগানো হয়। মগজ ধোলাইয়ের সবচে' সফল ও প্রভাবক, বরং সহজ পদ্ধতি হলো, মগজকে যৌন পরিবেশের সাথে জুড়ে দেয়া এবং এমন অবস্থা সৃষ্টি করা, যদিও তা মরীচিকার মতোই হোক, মানুষ যেন তার পেছনে দেওয়ানার মতো ছুটতে বাধ্য হয়। পশ্চিমা সিনেমায় শৈশবকালকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়, যেন সেটি অত্যন্ত আনন্দঘন সময় ছিল। উদাহরণস্বরূপ ষাটের দশকে শৈশবকাল সম্পর্কে একটি সিনেমা গোটা বিশ্বে প্রদর্শন করা হয়েছে, তাতে শৈশবকালকে একটি উন্মাদনার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখানো হয়েছে। এ বয়সে একজন নওজোয়ান কিভাবে প্রতিবেশীর মেয়ের সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলে এবং কিভাবে তারা আবেগ-উচ্ছ্বাসের জোয়ারে ভেসে যেতে থাকে। এটাই ছিল আলোচ্য সিনেমার প্রতিপাদ্য বিষয়। সত্তরের দশকে এমন সিনেমা দেখানো হয়েছে যাতে বলা হয়েছে, পঞ্চাশের দশকের নওজোয়ানরা কেমন হতো। এসব সিনেমা প্রদর্শনের মাধ্যমে সত্তর বছরের বৃদ্ধদের মধ্যে বিশ বছরের নওজোয়ানদের চেতনা সৃষ্টির প্রয়াস-প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে।

📘 পশ্চিমা মিডিয়ার স্বরূপ > 📄 মিডিয়ার চিত্র

📄 মিডিয়ার চিত্র


ক. পাঠের উপকরণ।
খ. শ্রবণের উপকরণ।
গ. দর্শনের উপকরণ।
ঘ. দর্শন ও শ্রবণের উপকরণ।
ঙ. বলার উপকরণ।
পাঠের উপকরণ: পত্র-পত্রিকা, ম্যাগাজিন, বই-পুস্তক ও হ্যান্ডবুকস ইত্যাদি।
শ্রবণের উপকরণ: রেডিও, আলোচনা, কবিতা, লেকচার, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম ও বিতর্ক ইত্যাদি।
দর্শনের উপকরণ: টেলিভিশন, নাটক সিনেমা ইত্যাদি।
দর্শন ও শ্রবণের উপকরণ: যেমন-বিজ্ঞাপন, স্টিকার, মূর্তি, ভাস্কর্য, ফ্রেম, শিলালিপি, আর্ট, ছবি ইত্যাদি।
বলার উপকরণ: ইন্টারভিউ, সাক্ষাতকার, আলোচনা, কথাবার্তা ও গুজব ইত্যাদি।

📘 পশ্চিমা মিডিয়ার স্বরূপ > 📄 জনমত

📄 জনমত


দীনী ও নৈতিক মূল্যবোধের অনুপস্থিতিতে জনমত অথবা সংখ্যাগরিষ্ঠের ঝোঁকপ্রবণতা বাস্তবতা এবং ঘটনাসমূহ পরখ করার মাধ্যম বলে অভিহিত হয়। এক মনস্তত্ত্ববিদ জনমতের বিশ্লেষণ করতে গিয়ে লেখেন, সাধারণতঃ আমরা ধারণা করে থাকি, আমরা নিজেরাই নিজেদের অভিমত প্রতিষ্ঠা করি, কিন্তু বাস্তবতা তার উল্টো। কারণ সাধারণতঃ আমরা এই অনুমান করে সিদ্ধান্ত নেই যে, জনমত আমাদের তৎপরতা ও সিদ্ধান্তকে সমর্থন করবে। আমাদের প্রকৃতির অভ্যন্তরে এই ধারণা বদ্ধমূল রয়েছে।
জানাশোনা ও জ্ঞানের জন্য সংবাদ নয়; বরং সংবাদ হলো মগজ ধোলাইকারীদের পরিকল্পনা মোতাবেক মগজের অভ্যন্তরে বিদ্যমান চিত্র ও প্রতিচ্ছবিকে অন্যের নিকট পৌছানোর নাম। এটাকেই সে জনমত নামে আখ্যায়িত করে। নির্ধারিত চিত্র ও পরিকল্পনা মানুষের সামনে উপস্থাপন করার মাধ্যমে সে এটার পূর্ণতা দান করে। এর জন্য সে জনমত জরিপের চিত্তাকর্ষক নাম দিয়ে তার পক্ষে দলীল-প্রমাণ সরবরাহ করে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর জনমত জরিপের জন্য বহু প্রতিষ্ঠান অস্তিত্বশীল হয়েছে। সেসব প্রতিষ্ঠানে বড় বড় বিজ্ঞ মনস্তত্ত্ববিদ ও ব্রেন ওয়াশিং বিশেষজ্ঞরা কর্মরত রয়েছেন। হল বেকরিসা এ ধরনের জনমত জরিপের বিশ্লেষণ করতে গিয়ে লেখেন, যদি আপনি চান, মার্কিনীরা কোনো বিশেষ চিন্তা-চেতনা ও দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করে নিক, তাহলে আপনাকে শুধু এটা করতে হবে যে, আপনি জনমতের আশ্রয় নেবেন এবং বলবেন, জনমত এ কথা বলে। অতঃপর টেলিভিশন ও মিডিয়ার অন্যান্য মাধ্যমে তা প্রকাশ করে দেবেন। এর সহজ পদ্ধতি হলো, আপনি যত দক্ষতা ও প্রতিভার সাথে জনমত জানার জন্য প্রশ্নের অবকাঠামো তৈরি করবেন, সে আলোকেই আপনার পছন্দমতো জবাব পাবেন। উদাহরণস্বরূপ আপনি প্রশ্ন করবেন, ৮৫% মার্কিনীদের ধারণা, তারা নির্ভরযোগ্য সংবাদের জন্য টেলিভিশনের ওপর আস্থা রাখে, আপনার কি অভিমত? প্রত্যাশিত জবাব আপনি ইতিবাচকভাবে পেয়ে যাবেন। এখন এই আলোচনা নেই যে, টেলিভিশনের কোন সংবাদগুলো সম্পর্কে আপনার প্রশ্ন। রাজনৈতিক সংবাদ উদ্দেশ্য, না স্বাস্থ্য, সুস্থতা ও খেলাধুলা সম্পর্কে এই প্রশ্ন করা হচ্ছে। রাস্তা-ঘাটে চলমান লোকদের কাছে এ ধরনের প্রশ্ন প্রচার করে, তার নাম জনমত জরিপ দেয়া হয়। সাধারণভাবে জনগণ জনমত জরিপের এই পর্যালোচনায় অতি তাড়াতাড়ি প্রভাবিত হয়। বিশেষ করে যদি কোনো ব্যক্তি বিশেষের সফলতা ও ব্যর্থতার সাথে সম্পর্ক থাকে, তাহলে এটা আরো ফলপ্রসূ হয়। আজকাল টেলিভিশন ও দৈনিক পত্রপত্রিকার সহযোগিতায় শুধু একদিনেই জনমত জরিপ পর্যালোচনা করে ওই দিনই তা প্রচার করে দেয়া হয়, যাতে প্রত্যাশিত মনযিলের দিকে লোকদের পথপ্রদর্শন হয়ে যায়। দেখুন, ইহুদী প্রটোকলের দশম দস্তাবেজ।

টিকাঃ
৫. বাবরী মসজিদ প্রসঙ্গে সর্বপ্রথম তা বিতর্কিত বাবরী মসজিদ 'রাম জন্মভূমি', অতঃপর রাম জন্মভূমি বাবরী মসজিদ, অতঃপর মসজিদের বিতর্ক কাঠামো এবং তা স্থানান্তর, এসব প্রোপাগান্ডা চালিয়ে অবশেষে মসজিদের দেয়াল ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00