📄 টিভির নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া : একটি পর্যালোচনা
এক সময় রেডিও, সিনেমা ও নাটক বিনোদনের প্রধান মাধ্যম ছিল। সময়ের বিবর্তনে পৃথিবীর পরিবেশ বদলে যেতে থাকে। নতুন নতুন জিনিস আবিষ্কৃত হয়। টিভি, ইন্টারনেটের দাপটে সনাতন যুগের বিনোদন ব্যবস্থা মুখ থুবড়ে পড়ে। উদ্ভাবিত হয় আধুনিক যন্ত্রপাতি। রিমোর্ট চাপলেই টিভির পর্দায় গোটা পৃথিবী চোখের সামনে হাজির। তাই মানুষ ঝুঁকে পড়ে টিভি এবং ইন্টারনেটের প্রতি। ঘরে টিভি থাকলে মানুষ আর কোনো কাজের যোগ্য থাকে না। একাকী টিভি প্রোগ্রাম দর্শকের অনুভব অনুভূতি সামগ্রিক অনুভব অনুভূতির থেকে আলাদা রকমের হয়ে থাকে। দর্শক যখন মনোযোগ সহকারে একা একা কোনো অনুষ্ঠান দেখে তখন সে পুরোপুরি তাতে ডুবে যায়। তখন তার ব্যক্তিগত মতামত প্রকাশ বা পর্যালোচনা করার ক্ষমতা সে হারিয়ে ফেলে। ঠিক-বেঠিক প্রশ্নে সে তখন টিভি অনুষ্ঠানের ওপরই ভরসা করে।
চব্বিশ ঘণ্টা দেশী-বিদেশী অসংখ্য চ্যানেলে পাশ্চাত্য সভ্যতা-সংস্কৃতির প্রচার-প্রসার আমাদের যুব সমাজের চরিত্র ও মন মানসিকতায় যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে এবং ভবিষ্যতে আরো যা প্রভাব-প্রতিক্রিয়া ফেলবে, তা সূর্যালোকের চেয়েও সুস্পষ্ট।
নতুন প্রজন্মের ওপর টিভির ভয়াবহ নেতিবাচক প্রভাব-প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে পশ্চিমা বিশ্বে বিশেষ করে আমেরিকান সমাজে শিশুদের ওপর টিভির প্রভাব-প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে যথেষ্ট গবেষণা হয়েছে। আমাদের দেশেও এ বিষয়ে গবেষণা চলছে।
এখানে আমি ফিকাহ ও ফতোয়ার পরিবর্তে খোদ পশ্চিমা বিশ্বের মনোবিজ্ঞানী, গবেষক, শিক্ষাবিদ, সমাজকর্মী এবং মাঠ পর্যায়ে পরিচালিত জরিপের কিছু উদ্ধৃতি পেশ করছি।
✓ আমেরিকার কর্নেল ইউনিভার্সিটির মানব বংশ বৃদ্ধি বিষয়ক লেকচারার ড. জন কোন্ডারী তার গবেষণামূলক এক প্রবন্ধে উল্লেখ করেন, অল্প বয়সের ছেলে-মেয়েরা টিভিকে নির্ভরযোগ্য মনে করে। টিভির পর্দায় তারা যা দেখে সবই বিশ্বাস করে। অধিকাংশ শিশু মনে করে, টিভির ছবিগুলোও তাদের দেখে।
✓ বিশিষ্ট মনস্তত্ত্ববিদ ড. জন এম. হিলে তার যুগশ্রেষ্ঠ গ্রন্থে শিশুদের ওপর টিভির প্রভাব বিষয়ে নিরীক্ষা চালানোর পর মন্তব্য করেন, সাধারণতঃ সপ্তাহে ২৮ ঘণ্টা টিভি দেখে এমন কমবয়সী শিশুদের মস্তিষ্কের শক্তি বৃদ্ধিতে পরিবর্তন দেখা দেয়। আর এ পরিবর্তন তাদের ভাল ও সুন্দরের দিকে পরিচালিত করে না
✓ শিশুদের পড়াশোনার ওপর টিভির প্রভাব বিশ্লেষণ করতে গিয়ে কর্নেল ইউনিভার্সিটির মনস্তত্ত্ববিদ ড. জেরভী সিনগার লেখেন, শিশুদের পড়ালেখায় অমনোযোগী এবং দক্ষতা অর্জনে পিছিয়ে পড়ার পেছনে মুখ্য ভূমিকা পালন করছে আমেরিকান টেলিভিশন। টিভি দেখায় অভ্যস্ত শিশুরা পড়ালেখায় অনগ্রসর এবং দুর্বল হয়ে থাকে। (সূত্র: টাইমস, অক্টোবর-১৯৯৯)
নেলসন মিডিয়া রিসার্চের শিক্ষা বিভাগ থেকেও অনুরূপ বক্তব্য পাওয়া যায়। শিশুরা টিভি দেখায় যত বেশি অভ্যস্ত হয়ে পড়ে, লেখাপড়ায় ততবেশি দুর্বল হতে থাকে। এক জরিপে দেখা যায়, সপ্তাহে ১০ ঘণ্টার বেশি সময় টিভি দেখায় অভ্যস্ত ছাত্ররা ২ ঘণ্টা টিভি দেখায় অভ্যস্ত ছাত্রদের তুলনায় ১০% নম্বর কম পায়। পড়ালেখার ক্ষতি ছাড়াও শিশু স্বাস্থ্যের ওপরও টিভি মারাত্মক প্রভাব ফেলে। যেমন ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটির শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ড. কিরিট ভি গোল্ড তার এক প্রবন্ধে লেখেন, যে শিশুরা টিভি কম দেখে তাদের তুলনায় যারা দৈনিক দু' থেকে চার ঘণ্টা টিভি দেখে তাদের রক্তে কোলেস্টরেলের পরিমাণ দ্বিগুণ বেড়ে যায়।
কোলেস্টরেল বেড়ে যাওয়ার ফলে অধিকাংশ শিশু বড় হওয়ার পর অসময়ে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ার সম্ভাবনা থাকে। শারীরিক সুস্থতা ব্যতীত আত্মিক ও নৈতিক অবক্ষয়েও টিভির বিরাট ভূমিকা রয়েছে। ম্যাচাসুয়েট্স ইউনিভার্সিটির প্রফেসর ড. ডেন্সিল এ. এন্ডারসন তার সতের বছরের অনুসন্ধানী গবেষণার ফল এভাবে বর্ণনা করেন, 'টিভিতে প্রচারিত ভয়ংকর দৃশ্য সম্বলিত প্রোগ্রাম শিশুর বাস্তব জীবনে সন্ত্রাসী মনোভাব জন্ম দেয়। যে সমস্ত শিশু ভয়ানক দৃশ্য লুটতরাজ এবং মারামারির দৃশ্য মিশ্রিত টিভি প্রোগ্রাম বেশি বেশি দেখে, তারা অত্যধিক আক্রমণাত্মক মনোভাবাপন্ন হয়। দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর দেখা গেছে, ভয়ংকর চরিত্রের দৃশ্যসমূহ দেখার ফলে শিশুদের ভবিষ্যত জীবনেও মেজাজে উগ্রতা, হঠকারিতা এবং লড়াই ঝগড়ার প্রবণতা প্রসার লাভ করে। (সূত্র: টিভি গাইড- মার্চ, ১৯৯৩)
এমন গবেষণার ফল সে জরিপ থেকেও জানা যায়, যা টিভির যৌন উত্তেজক প্রোগ্রামসমূহের ব্যাপারে পরিচালিত হয়েছে। আমেরিকার অধিকাংশ মানুষ এখন অনুভব করতে শুরু করেছে, এসব প্রোগ্রাম বন্ধ করার জন্য সরকারীভাবে আইন প্রণয়ন করা জরুরী। এসব অনুষ্ঠানের ব্যাপারে আশংকা প্রকাশ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন কেনেডির শাসনামলে ফেডারেল কমিউনিকেশনের চেয়ারম্যান এবং কলাম্বিয়া ব্রডকাস্টিং সিস্টেমের সাবেক ডাইরেক্টর নিউটন মেনু আমেরিকান টিভি সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে টিভি স্টেশনকে সবচেয়ে দুষ্কর্মশীল প্রতিষ্ঠান আখ্যায়িত করে বলেন, ১৯৬১ সালে আমি পেরেশান হতাম, আমার সন্তানরা আমেরিকান টিভি চ্যানেলগুলো থেকে বিশেষ কোন উপকার পাচ্ছে না। আজ ১৯৯৬ সালে এসে আমাকে এ অস্থিরতা পেয়ে বসেছে, আমার নাতী-পুতীরা টিভি দেখার ফলে কত বড় ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। আমেরিকায় ১৮ বছর বয়সে উপনীত একটি শিশু হত্যা, লুটপাট, মারামারি এবং যৌন উত্তেজনামূলক অশ্লীল চরিত্র সম্বলিত কমপক্ষে ২ হাজার ৫ শ' দৃশ্য দেখে থাকে। (সূত্র: লন্ডন অবজারভার-১৯৯২)
ওয়াশিংটনের জর্জ টাউন ইউনিভার্সিটির প্রফেসর ড. ওয়াল্টার প্রিন্স তার এক বক্তৃতায় বলেন, রক মিউজিক হলিউডের ফিল্ম ও অন্যান্য বিনোদনমূলক প্রোগ্রাম যেগুলো আমেরিকা বিশ্বের অন্যান্য দেশে সরবরাহ করে, সেগুলো শুধু সেখানকার সমাজে ক্ষতিকর প্রভাবই ফেলে না; বরং মার্কিন সমাজের চিত্রকেও ক্ষত-বিক্ষত করে। (সূত্র ক্রিশ্চিয়ান সায়েন্স মনিটর, মার্চ ১৯৯২)
'আমেরিকান সমাজে জুলুম অত্যাচার বিস্তারে টিভি এবং ফিল্মের ভূমিকা: প্রশাসনের দায়িত্ব' শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ওয়াশিংটন পোস্ট, নিউইয়র্ক টাইমস এবং লস এঞ্জেলেস টাইমস। প্রতিবেদকগণ মার্কিন সিনেটের কংগ্রেস কমিটির এক বৈঠকে আমেরিকান মিডিয়ার ভয়াবহ চিত্র সম্পর্কে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে এটর্নি জেনারেল ক্ষোভে উত্তেজিত হয়ে ধমকের স্বরে বলেন, টিভি চ্যানেলগুলো বছরের শেষ নাগাদ সতর্ক না হলে কংগ্রেস নেতৃবৃন্দের সাহায্যে প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিন্টনের প্রশাসন কঠোর আইন প্রণয়ন করে অনুষ্ঠান সম্প্রচার নিয়ন্ত্রণ করবে।
এসব আমেরিকান সাংবাদিকদের বর্ণনা মোতাবেক আমেরিকা বর্তমানে এক ক্রান্তি কাল অতিবাহিত করছে। সারা দেশে অবাধে হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট এবং যৌন কেলেংকারির ঘটনা ঘটে চলেছে। যুবকদের অশোভন অভদ্র আচরণকে সুসময় বলে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। টিভির ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে আমেরিকার বিভিন্ন সমাজের মানুষের প্রতিক্রিয়া জানতে চাওয়া হলে সিংহভাগ মানুষ টিভিকে ফেতনা-ফাসাদ প্রচারের ইউনিভার্সিটি বলে মত ব্যক্ত করেছেন। অথচ ঘরে টিভি নেই আমেরিকান সমাজে এমন মানুষের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।
✓ আমেরিকার এটর্নি জেনারেল জেনিট রেনভ সিনেটের বৈঠকে একথাও বলেছেন, ভয়ংকর চরিত্র প্রদর্শনের ক্ষেত্রে আমেরিকা দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়ে আসছে। ফলে রাত-দিন মানুষ এগুলোতেই মেতে থাকে। তিনি একথাও স্বীকার করেন, শুধু কোন এক ফিল্মের কিছু অংশ বাদ দিয়ে দিলেই হবে না কিংবা কোনো একটি চ্যানেলের ওপর বিধি-নিষেধ আরোপ করলেই এ সমস্যার সমাধান হবে না। কারণ এক দুটি নয়, পাঁচশত চ্যানেলের সাথে এ সমস্যা জড়িত। অপরদিকে আমেরিকার আইন প্রণয়নকারী সংস্থা এবং আদালতসমূহ ঐতিহাসিকভাবে শিল্প সম্পর্কে উদারনীতির সহযোগী ছিল। (সূত্র : নিউজউইক, ১লা নভেম্বর, ১৯৯৩)
বিখ্যাত ম্যাগাজিন রিডারস ডাইজেস্ট ১৯৬১ সালে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল, যার শিরোনাম ছিল 'টিভিতে প্রদর্শিত অপরাধ বনাম ঘরে সংঘটিত অপরাধ'। এই প্রতিবেদনের শুরুতে আর্ক বিশপের বিবৃতিও যোগ করা হয়েছে। তিনি বলেন, টিভির মাধ্যমে প্রোপাগান্ডা চালানো হয়, হত্যা, লুটপাট খুব স্বাভাবিক কাজ। ধীরে ধীরে সকল দর্শকের মন-মগজে এ বিষয়টি দৃঢ়ভাবে আসন গেড়ে বসে। ফলে তার দ্বারা এগুলো সংঘটিত হওয়াও স্বাভাবিক।
আমেরিকান এক সার্জন টিভির প্রভাব সম্পর্কে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে লেখেন, ভয়ঙ্কর চিত্র দেখার ফলে, চাই সেটা চলমান কার্টুন হোক না কেন, এতে শিশুদের ভেতর উগ্রতা, নিষ্ঠুরতা, নির্দয়তা, নির্মমতা বৃদ্ধি পায়।
আধুনিক গবেষণায় ফল বেরিয়ে এসেছে, মিডিয়ায় সন্ত্রাসের দৃশ্য প্রদর্শনীতে সমাজে সন্ত্রাস সৃষ্টির মূলে পানি সিঞ্চন করা হয়। এক ফরাসী সাংবাদিক বলেছে, টিভিতে সন্ত্রাস, জোর-জুলুমের দৃশ্য সমাজেরই প্রতিচ্ছবি। এতে সন্ত্রাস, জোর জুলুম সংগঠনে সাহস বর্ধিত করা হয়। নতুন এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, মিডিয়ার উগ্রতার ফলে সমাজেও উগ্রতা বেড়ে চলেছে। ফ্রান্সের এক প্রতিবেদক মন্তব্য করেন, টিভিতে উগ্র ও ভয়ংকর দৃশ্য প্রদর্শনের ফলে সমাজে উগ্রতা শতগুণে বৃদ্ধি করার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করছে।
ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির মনস্তত্ত্ব বিভাগের প্রফেসর ড. কার্ল বাটস শিশুদের জন্য প্রচারিত বিভিন্ন অনুষ্ঠান সম্পর্কে পর্যালোচনা করে লেখেন, ফিল্ম, টিভি সিরিজ, কাল্পনিক ঘটনাবলী এবং কার্টুন নির্ভর অনুষ্ঠান দেখার ফলে শিশুদের ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়ে। যে সকল প্রতিষ্ঠান ভিডিও গেমস এবং কার্টুন প্রোগ্রাম নির্মাণ করে তাদের উচিত, এ সকল প্রোগ্রামের নেতিবাচক প্রভাব এবং সমূহ সমস্যা নিয়ে গভীর অনুসন্ধান করে এগুলো থেকে উত্তরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা। তার গবেষণায় ভিডিও গেমস এবং কার্টুন নির্ভর প্রোগ্রাম দেখার ফলে শিশুরা নিম্ন বর্ণিত রোগে আক্রান্ত হয়। যেমন হাত ঘর্মাক্ত হয়ে যায়, মাথা ব্যথা, মৃগী, বমি ভাব ছাড়াও বদ হজমী এবং ধমনীতন্ত্রে খিচুনি সৃষ্টি হয়। কাল্পনিক প্রোগ্রাম দীর্ঘক্ষণ দেখার ফলে মস্তিষ্কে প্রচ চাপ পড়ে, মানসিক কষ্ট বহন করতে হয়। অনুষ্ঠান শেষ হলে তখন সে বাস্তব জগতে ফিরে আসে।
স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির অধীনে পরিচালিত জরিপ অনুযায়ী নিম্নবর্ণিত বাস্তব অবস্থা সামনে আসে। জন্মের পরই মানুষ নির্দিষ্ট কোনো পদ্ধতিতে চলতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। নির্দিষ্ট পথ ধরেই সে বাড়তে থাকে। জীবনের প্রতি মুহূর্তে তার নিরেট বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়, কিন্তু যখন কল্পনা ও বাস্তবতার মাঝে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়, তখন শিশুরা প্রচ মানসিক আঘাত পায়। ফলে শিশুর মাঝে অস্থিরতা বিরাজ করে। সে বাস্তবতা থেকে দূরে সরে যেতে থাকে। একটি বটন টিপেই কল্পনার রঙিন পৃথিবীতে পৌছে যায় যে শিশুটি, সে কামনা করে এবং প্রাণান্তকর চেষ্টাও করে রাঙন পৃথিবীটাকে বাস্তবে পাওয়ার জন্য। যখন বাস্তবে তা সম্ভব হয় না তখন সে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। কাল্পনিক দৃশ্য দেখার ফলে চোখেও কষ্ট অনুভব হয়। ফলে সে মাথা ঘূর্ণন এবং মৃগী রোগে আক্রান্ত হয়।
ক্যানসাস ইউনিভার্সিটির স্বর বিশেষজ্ঞ মাইকেল তার এক গবেষণায় প্রকাশ করেন, চৌদ্দ মাসের কম বয়সী শিশু যদি টিভি স্কিন দেখে তাহলে তার ভেতরেও এর মারাত্মক প্রভাব পড়ে। বড় হয়ে এ সব শিশু দাম্ভিকতা, উগ্রতা, হত্যা ও ধর্ষণে লিপ্ত হয়।
একজন আমেরিকান মনস্তত্ত্ববিদ লিউনার্ড আইরি একটি শিশুর বেড়ে ওঠা নিয়ে বিস্তর বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি তার গবেষণাকর্ম ১৯৬০ সাল থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত প্রলম্বিত করেছেন। ১৯৬০ সালে যেসব শিশু জন্ম গ্রহণ করেছে, ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত তাদের জীবন কেমন কেটেছে, তিনি তার গবেষণা জরিপে এ বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। ড. লিউনার্ড মিশিগান ইউনিভার্সিটির তত্ত্বাবধানে নিউইয়র্কে জন্মগ্রহণকারী সাড়ে ছয়শ শিশুর ওপর জরিপ চালিয়েছেন। শিশুরা অকপটে স্বীকার করেছে, হত্যা, ধর্ষণ, চুরি, ডাকাতি এবং সকল প্রকার অপকর্মের পেছনে আমাদের ওপর টিভি সিনেমার যথেষ্ট ভূমিকা রয়েছে। এসব শিশু পড়ালেখায় উন্নতি করতে পারেনি। ১৬-১৭ বছর বয়স হওয়ার সাথে সাথে এরা হত্যা, লুটতরাজে জড়িয়ে পড়ে সকল প্রকার অবৈধ পন্থা অবলম্বন করতে থাকে। তারা নিজ নিজ স্ত্রীদের মারপিট করেছে, যেনা ব্যভিচার প্রভৃতি সকল অপকর্মের পথ অবলম্বন করেছে। মদ নেশায় আসক্ত হয়ে পড়েছে।
✓ বৃটেনের মহিলা মনস্তত্ত্ববিদ সোজান ব্যাল বৃটেনের ঘাতকগোষ্ঠীর যে সাক্ষাতকার নিয়েছেন এবং তাদের জীবনের ওপর পর্যালোচনা চালিয়ে এ সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, এসব ঘাতকের ৪৫ শতাংশ ভয়ংকর চরিত্রনির্ভর ফিল্ম দেখত।
১৯৯৪ সালের ৩ অক্টোবর সিনেমা দেখার সময় উত্তেজিত হয়ে আমেরিকান এক যুবক মা-বাবা, বোন এবং স্ত্রীকে হত্যা করে ফেলে। ফরাসী একটি ফিল্ম দেখে এক যুবক নিজ পরিবারের পাঁচ জন সদস্যকে একের পর এক গুলি করে। এই ফিল্মে বার বার এই ডায়ালগ উচ্চারিত হচ্ছিল, যদি তোমার হাতে রিভলবার থাকে তাহলে সবকিছু তোমার অধীন।
লন্ডনের মনস্তত্ত্ববিদগণ তাদের এক গবেষণায় এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, পনেরশ বালক-বালিকার ওপর জরিপ চালিয়ে জানা গেছে, এরা সাধারণতঃ সিনেমার অশ্লীল এবং খারাপ চরিত্রের দৃশ্যগুলো ভুলে যায়, কিন্তু সন্ত্রাসের ভয়ংকর দৃশ্যগুলো কখনো ভুলতে পারে না। এসব দৃশ্যের কথা মনে হলে ঘুম উড়ে যায়। শত চেষ্টা করেও তারা মাথা থেকে এগুলো সরাতে পারে না, কিন্তু বাস্তবতা হল, শিশুরা অধিক পরিমাণে এবং দীর্ঘ সময় ভয়ংকর দৃশ্য সম্বলিত ফিল্ম দেখা পছন্দ করে।
বৃটিশ মেডিকেলের তত্ত্বাবধানে প্রকাশিত ম্যাগাজিন মিডিয়ার বিরুদ্ধে এই অভিযোগ উত্থাপন করেছে যে, মিডিয়া ভিডিও গেমস এবং কার্টুননির্ভর অনুষ্ঠান সম্প্রচার করে বর্তমান প্রজন্মকে ধ্বংসের পথে ঠেলে দিচ্ছে। টিভি ইঞ্জিনিয়ার, প্রোগ্রাম ডাইরেক্টর এবং দর্শক সকলের অভিযোগ হলো, মানসিকভাবে তারা অস্থিরতায় ভোগে। বৃটেনের সাম্প্রতিক চিত্র হলো, শিশুদের জন্য নির্মিত প্রোগ্রামে ৪০% কার্টুন দেখানো হয়, যা ভয়ংকর দৃশ্য সম্বলিত হয়ে থাকে। শিক্ষা বিষয়ক প্রোগ্রাম কমে এখন মাত্র ৭% অবশিষ্ট আছে। পৃথিবী জুড়ে ডিশ এন্টিনার সুবাদে শিশুদের জন্য প্রচারিত প্রোগ্রামসমূহে কার্টুনের পরিমাণ ৭০% বৃদ্ধি পেয়েছে।
উপরোল্লিখিত জরিপ তথ্য ছাড়াও আমেরিকানিবাসী বিল ম্যায়কেন টিভি প্রোগ্রামসমূহ সম্পর্কে চমকপ্রদ আরেকটি আলাদা ধরনের জরিপ চালিয়েছেন। তিনি নাম দিয়েছেন সময় হত্যা। তিনি ভার্জিনিয়ার এমন একটি শহরকে তার গবেষণা জরিপ চালানোর জন্য নির্বাচন করেন যেখানে একশ চ্যানেল সব রকমের প্রোগ্রাম প্রচার করে থাকে। বিল ম্যায়কেন সিদ্ধান্ত নেন, সবগুলো চ্যানেলের প্রোগ্রাম ২৪ ঘণ্টা করে দেখবেন। অতএব ২৪ ঘণ্টা করে প্রত্যেক চ্যানেলের অনুষ্ঠান ভিডিও ক্যাসেটে টেপ করে একের পর এক দেখা শুরু করেন।
মোট ২ হাজার ঘণ্টার এই ভিডিও চিত্র দেখার পর তিনি এই পরিণতিতে উপনীত হয়েছেন যে, টিভি শুধুই বিনোদনের মাধ্যম, অপরাধের মাধ্যম। এর দ্বারা জ্ঞানে, জানাশোনায় সামান্যও প্রবৃদ্ধি ঘটে না। বিল ম্যাকেন মার্কিন মনস্তত্ত্ববিদ ড. কুমারের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, মার্কিন চলচ্চিত্র গোটা পৃথিবীতে যৌন প্রবৃত্তি উসকিয়ে দিতে মৌলিক ভূমিকা পালন করেছে। কারণ আমেরিকার ৯৯% চলচ্চিত্রে যৌনতাকে প্রধান বিষয় বানানো হয়। যুবক-যুবতীরা এসব চলচ্চিত্র দেখে যৌনতার শিক্ষা গ্রহণ করে। মাদক ব্যবহার, চুরি, ডাকাতি, বাটপারি, হত্যা, লুটপাট ও অনৈতিকতা ইত্যাদি এসব ফিল্ম দেখে শিক্ষা পায়।
কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির মনস্তত্ত্ববিদ ড. স্টিফেন বলেন, জেলখানাকে অপরাধের আখড়া বলা হয়, কিন্তু বর্তমানে টিভি হলো অপরাধ শেখানোর প্রাথমিক স্কুল, যেখানে অতি যত্ন সহকারে এবং সুশৃংখলভাবে অপরাধীদের গড়ে তোলা হয়।
অস্ট্রেলিয়ান বিশেষজ্ঞদের মতে টিভির স্কিন থেকে বের হওয়া রশ্মি মস্তিষ্কের কর্মপরিকল্পনার ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। শিশুদের মস্তিষ্ক টিভির রশ্মি সহ্য করার ক্ষমতা রাখে না। রশ্মির তেজস্ক্রিয়ায় মস্তিষ্ক পক্ষাঘাতের ন্যায় অবশ হয়ে যায়। এরপর তার দৃষ্টি পর্দার সাথেই আটকে থাকে। এভাবে একটি শিশু টিভি দেখার সময় যেন বন্দী হয়ে যায়। যে কোনো ধরনের অনুষ্ঠানই হোক সে তা দেখতে থাকে।