📄 পাকিস্তানী সমাজে পশ্চিমা মিডিয়ার প্রভাব-প্রতিক্রিয়া
এসব সিনেমা ও টিভি প্রোগ্রাম নতুন প্রজন্মেও মেধা মননকে এ্যাডভেঞ্জার অথবা অন্যান্য মনস্তত্ত্বিক দিক থেকে অপরাধ, অশ্লীলতা ও নগ্নতার ওপর উসকে দিচ্ছে। ১৯৯১ সালে সংঘটিত ডাবল মার্ডার মামলার রায় দিতে গিয়ে বিচারপতি নাঈমুদ্দীনের নেতৃত্বে গঠিত সুপ্রিম কোর্টের অ্যাপিলেট ডিভিশন একথার স্বীকৃতি দিয়েছে। মামলার আলোকে আদালত সে সময়ের সরকারকে প্রস্তাব দেয় যে, অতি দ্রুত যৌনতা ও অপরাধ সম্বলিত সিনেমার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা উচিত, কিন্তু পাকিস্তানের বিভিন্ন বুক স্টল ও অলি গলিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা দোকানগুলোর প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করা হলে দেখা যায়, দেশী বিদেশী পত্র পত্রিকা, সংবাদপত্র, ম্যাগাজিন, সাময়িকী ও বই পুস্তকে এমন এমন চরিত্র বিধ্বংসী প্রবন্ধ-নিবন্ধ, মন্তব্য, রঙিন পৃষ্ঠা, মা বোনদের নগ্ন ও অর্ধ নগ্ন দেহের ছবিতে ভরা। এসব কিছুর মৌলিক উদ্দেশ্য সমাজে পশ্চিমা সভ্যতা সংস্কৃতির প্রাধান্য বিস্তার করা এবং মুক্ত চিন্তা ও স্বাধীন যৌন মেলামেশার কালচারের বিকাশ ঘটানো। ১৯৯২ সালে পাকিস্তানের একটি প্রসিদ্ধ ইংরেজি পত্রিকার শুক্রবারের সংখ্যায় একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছিল, যার উদ্দেশ্য ছিল ইউরোপ বিশেষ করে হল্যান্ডের প্রসিদ্ধ শহর আমস্টার্ডামের বিলাসিতা, বিনোদন ও যৌন আমোদ প্রমোদের স্থানগুলোর পরিচিতি পেশ করা এবং সেখানকার কোন গলিতে কি হয় তার বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরা। এটি এমন এক পত্রিকা যা প্রায় প্রতিটি ঘরেই পড়া হয়।
পশ্চিমা সমাজে মিডিয়ার ধ্বংসাত্মক ও নেতিবাচক প্রভাব-প্রতিক্রিয়ার ব্যাপারে খোদ পশ্চিমা বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে কোন দ্বি-মত নেই। আশ্চর্যের বিষয় হলো, প্রাচ্যের দেশগুলোর জন্যও তারা এসব সিনেমা চলচ্চিত্র পছন্দ করে না। যেমন মার্কিন এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিত ১৯৯৩ সালের ১০ই মার্চের এক সেমিনারে ওয়াশিংটনের জর্জ টাউন ইউনিভার্সিটির প্রফেসর ড. ওয়াল্টার বার্নাস বলেন, রক মিউজিক, হলিউডের সিনেমা ও অন্যান্য বিনোদনমূলক প্রোগ্রাম যা আমেরিকা বহির্বিশ্বে প্রেরণ করে, সেগুলো না শুধু সেখানের সমাজে বিরাট ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে; বরং তা মার্কিন সমাজকেও ক্ষত বিক্ষত করে। (ক্রিশ্চিয়ান সায়েন্স মনিটর মার্চ, ১৯৯১; সূত্র: আল ফারুক, করাচী, সংখ্যা-১৩, খণ্ড-১১)
পাকিস্তানী বুদ্ধিজীবী জামিলুদ্দীন আলী পাক টিভির প্রোগ্রামগুলোর বিশ্লেষণ করতে গিয়ে লেখেন, বর্তমানে পাকিস্তানের উচ্চ শ্রেণীর কথা বাদই দিলাম, তারা তো নিজেদের স্বার্থ ছাড়া আর কারো স্বার্থই দেখে না। বর্তমানকালে আমার তো মধ্যম শ্রেণীর অশিক্ষিতদের সম্পর্কে ঈর্ষা হয়। করাচী, বসনিয়া ও কাশ্মীরের মতো দুনিয়ার বড় বড় বিপদ বিপর্যয়েও প্রভাবিত হয় না তাদের সাংস্কৃতিক প্রোগ্রামগুলো। হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতিতে বিয়ের অনুষ্ঠান, সাংস্কৃতিক ও বিনোদন অনুষ্ঠান, কোনো না কোনো উপলক্ষ্যে নগ্ন ও অর্ধ নগ্ন যুবক যুবতীদের বড় বড় নাচ গানের আসর ইত্যাদিতে কোনো ভাটা আসে না। যে কোনো জাতীয় দুর্যোগেও তা স্তিমিত হয় না। ১৯৯৫ সালে স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে পাকিস্তানী একটি ব্যাংকার সংগঠন এমন একটি সঙ্গীতানুষ্ঠানের আয়োজন করে, যাতে আট লাখ টাকা ব্যয় করা হয়েছে। পাকিস্তানী টিভিও এমন এমন শো'র আয়োজন করে, যা দেখলে মনে হয় গোটা পাকিস্তান একটি অতি সচ্ছল ও উন্নত রাষ্ট্র। (দৈনিক জং করাচী, ২২ সেপ্টেম্বর, ১৯৯৫)
নগ্নতা ও অশ্লীলতার সয়লাবে সবচে বেশি ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে মিডিয়া। মিডিয়া নারীর রূপ-লাবণ্য, নারীর চেহারা ও নারীর নগ্ন দেহকে তার ব্যবসা প্রসারের কৌশল হিসেবে গ্রহণ করেছে। কত পত্র পত্রিকা, ম্যাগাজিন ও সাময়িকী রয়েছে যেগুলো শুধু অশ্লীল সংবাদ, অশ্লীল কিস্সা-কাহিনী ও নগ্ন নারী দেহের মাধ্যমেই চলছে। পৃথিবীর কোনো স্থানে অশ্লীলতা নগ্নতার কোনো ঘটনা ঘটলে কিংবা কোন অভিনেতা-অভিনেত্রীর স্ক্যান্ডেল হলে কিংবা কোনো খেলোয়াড়ের প্রেম-ভালবাসার আলোচনা শুরু হলে পাকিস্তানী পত্র পত্রিকা ও ম্যাগাজিনগুলো তাতে আরো রং চড়িয়ে প্রকাশ করা তার গুরুদায়িত্ব মনে করে। সম্ভবত তারা মনে করে যদি এ স্ক্যান্ডেল সম্পর্কে আমাদের জাতি না জানে তাহলে তারা উন্নতি প্রগতির ক্ষেত্রে পেছনে রয়ে যাবে।
নগ্নতার বিকাশ ও বিস্তারে বিজ্ঞাপনের ভূমিকা অতীব গুরুত্বপূর্ণ। দুনিয়ার কোনো বস্তুর বিজ্ঞাপন নারীর ছবি ছাড়া পূর্ণতা পায় না। লেবাস পোশাকে নারী, শিল্প-পণ্যে নারী, এমনকি যেসব বিষয় একান্তই পুরুষের জন্য, তাতেও নারীর ছবি। মোটর সাইকেল এবং ট্রাক্টরের বিজ্ঞাপনেও নারীর ছবি। নারীর একেক অঙ্গ প্রদর্শন করে অঢেল বিত্ত-বৈভব অর্জন করা হচ্ছে। মডেলিং একটি বিরাট লাভজনক ব্যবসা হয়ে গেছে। যেখানে নামী দামী ঘরের যুবতী মেয়েরা তাদের শরীরের প্রদর্শনী করে চড়া বিনিময় আদায় করে, কিন্তু নগ্নতা অশ্লীলতার বিকাশে মডেলিংয়ের চেয়েও বেশি ভূমিকা পালন করছে নাটক ও চলচ্চিত্র। এখন তো টিভি ভিসিআর প্রতিটি ঘরকে এক একটি মিনি সিনেমা হল বানিয়ে দিয়েছে। এর আগ্রাসন থেকে ভদ্র অভিজাত পরিবারগুলোও নিরাপদ নেই। এখন তো ডিশ এন্টিনা ও ইন্টারনেটের কারণে দুনিয়ার নিকৃষ্টতম ব্লু-ফিল্মগুলো এক ক্লিকেই সামনে চলে আসে। একবার তাতে ঢুকে পড়লে দর্শকদের দিন কিভাবে চলে যায় তা অনুমানই করা যায় না।
📄 পাঞ্জাব প্রদেশের চলচ্চিত্র
১৯৯৬ সালের অপরাধ সংক্রান্ত এক জরিপ অনুযায়ী পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশে বিগত পাঁচ বছরের গড় হিসাবে বিভিন্ন অপরাধে ৩৯৫%, হত্যার ঘটনায় ৩৪%, ছিনতাই ও পকেট মারের ঘটনায় ৫৩%, অপহরণের ঘটনায় ২১% এবং ধর্ষণের ঘটনায় ২১% বৃদ্ধি ঘটেছে। প্রকাশ থাকে যে, উল্লিখিত জরিপে ধর্ষণের ঘটনা মাত্র ২% অন্তর্ভূক্ত হয়েছে। এছাড়া ব্যাংক ডাকাতিও ৪৩৩% প্রবৃদ্ধি ঘটেছে। এমনিভাবে পেট্রোল পাম্প লুট ও রাস্তাঘাটে লুণ্ঠনের ঘটনায়ও ১৬৭% প্রবৃদ্ধি ঘটেছে। শুধু এতটুকুই নয়, মোটর গাড়ী চুরিতেও ব্যাপক প্রবৃদ্ধি ঘটেছে। এক সিনিয়র পুলিশ অফিসার বলেন, পুলিশের পাশাপাশি ক্ষমতাশালী লোকেরাও আইন শৃংখলা বিনষ্টে একই রকম দায়ী। পুলিশ বিভাগেও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে কৃতিত্বের অধিকারী বিপুল সংখ্যক লোক রয়েছে। ৮
উল্লিখিত জরিপ ২০০২ সালের। দৈনিক নাওয়ায়ে ওয়াক্ত লাহোর সর্বসাম্প্রতিক জরিপ প্রকাশ করেছে, যা আমরা মাসিক বেদার ডাইজেস্ট লাহোর, ফেব্রুয়ারী, ২০০৫-এর সূত্রে নিম্নে উপস্থাপন করছি।
২০০৪ সালের প্রথম দশ মাসে শুধু পাঞ্জাব প্রদেশেই ৬ হাজার ১ শ' ২০ জন নারী আর্থিক সংকট ও পারিবারিক সমস্যায় অতিষ্ঠ হয়ে আত্মহত্যা করেছে, আর ১ হাজার ৯৪ জন বিভিন্ন অপরাধে জড়িত হয়ে জেলে গেছে। তাদের ৩ শ' ৪৭ জন হত্যার অভিযোগে, ২ শ' ৯৪ জন ব্যভিচারের অভিযোগে, ১৫ জন অবৈধ অস্ত্র রাখার অভিযোগে, ১৬ জন ডাকাতির অভিযোগে, ১৬ জন চুরির অভিযোগে, ২ শ' ২০ জন আইন-শৃংখলা ভঙ্গের অভিযোগে, ৫০ জন অন্যান্য অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে জেলে গেছে। বিগত ১২ মাসে ১ হাজার ৬৫ জন নারী সামাজিক নিপীড়ন, ১ হাজার ১ শ' জন পারিবারিক নিপীড়ন ও ৯ শ' ৭৩ জন যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে। পাঁচ জন নারীকে গায়ে তেল ঢেলে আগুন ধরিয়ে অথবা এসিড নিক্ষেপে হত্যা করা হয়েছে, ৪ হাজার ৯ শ' ৬৭ জনকে অপহরণ করা হয়েছে, ২ হাজার ৮ শ' ৬০ জনকে হত্যা করা হয়েছে আর ১ হাজার ৫ শ' জনকে বদকার ব্যভিচারিণী অভিহিত করে নির্দয়ভাবে হত্যা করা হয়েছে। ২০০৪ সালে হত্যার ৫ হাজার ৫ শ' ৯টি, জোরপূর্বক ধর্ষণের ২ হাজার ১ শ' ৬০টি এবং গণধর্ষণের ২ শ' ২০টি ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। এই হলো পাকিস্তানের একটি মাত্র প্রদেশ পাঞ্জাবের চালচিত্র।
টিকাঃ
৮. ভারতের উত্তর প্রদেশ পুলিশের ডিরেক্টর জেনারেলের বর্ণনামতে, উত্তর প্রদেশের পুলিশ বিভাগে অপরাধমূলক কর্মকা েলিপ্ত পুলিশের সংখ্যা ১০ হাজার, যাদের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বদলী করা হয়েছে। এ বদলী সম্ভবতঃ অপরাধ সংঘটনে অধিক অনুশীলন ও অভিজ্ঞতা অর্জনের লক্ষ্যেই।