📄 বড়দের পদাঙ্ক অনুসরণে ছোটরা
দৈনিক পাইওনিয়ার দিল্লী, ৭ সেপ্টেম্বর-১৯৯৪ এবং দৈনিক টাইমস অফ ইন্ডিয়া-১৯৯৬ সালের ডিসেম্বর সংখ্যায় লাখনৌ, দিল্লী ও উত্তর প্রদেশের অল্প বয়স্ক শিশুদের অপরাধ সংক্রান্ত একটি বিস্তারিত রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে, যা দ্বারা সহজেই অনুমিত হয়, নতুন প্রজন্ম কোন পথে ধাবমান।
উক্ত রিপোর্ট অনুযায়ী দিল্লীতে প্রতিমাসে দুই হাজার অবিবাহিত মেয়ে গর্ভপাত ঘটায়। দিল্লীর বিভিন্ন আদালতে ধর্ষণের ৮৯৩টি মামলা বিচারাধীন। ১৯৯৬ সালে গোটা দেশে চল্লিশ হাজার ধর্ষণের ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। অথচ ৯০% ধর্ষণের ঘটনা বদনামের ভয়ে থানায় ডায়েরী করা হয় না। ২
দিল্লী থেকে প্রকাশিত দৈনিক পাইওনিয়ার ক্রাইম কমিশনারের উদ্ধৃতি দিয়ে লেখেছে, তের বছরের এক স্কুল ছাত্র ব্যাগে করে ছুরি নিয়ে এক ব্যাংকে ঢুকে ক্যাশিয়ারকে চাকু দেখিয়ে বলেছে, সব টাকা পয়সা দিয়ে দাও। তিন জন অল্প বয়ষ্ক ছাত্র বাইশ বছরের এক ছাত্রীর সতীত্বহানি করে। মেয়েদের উত্ত্যক্ত করা, বিবাহিত ও অবিবাহিত মেয়েদের বিনোদনমূলকভাবে অপহরণ করে গাড়ীতে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া, বিনোদন ও পয়সার জন্য গাড়ী চুরি করা, নারীদের গলার স্বর্ণের অলংকার ছিনিয়ে নেয়া ইত্যাদি দিল্লীর অল্প বয়স্ক ছেলেদের নিত্য-নৈমিত্তিক অপরাধ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী যৌন অপরাধ ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড স্যাটেলাইট ও টিভির মাধ্যমে প্রসার হচ্ছে। খেলাধুলার সংবাদ সম্প্রচারক টিভি এবং ইন্টারনেট সোনায় সোহাগার কাজ করেছে। অল্প মূল্যে লগ্ন ছবি সম্বলিত সাহিত্য ও সিনেমার ভিসিডি প্রত্যেক রোডে রোডে, অলিতে গলিতে ও মোড়ে মোড়ে পাওয়া যাচ্ছে।
বিত্তশালী পরিবারের সাত নওজোয়ানকে সামাজিক অপরাধে এবং আট জনকে কার চুরির অপরাধে গ্রেফতার করা হয়েছে। দু'জন অল্প বয়স্ক ছেলে এক মাসের মধ্যে তাদের এলাকা থেকে এগারটি কার চুরি করেছে। শুধু পশ্চিম দিল্লীতেই ১৯৯৩ সালে মেয়েদের উত্যক্ত করার অপরাধ উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। গ্রেফতারকৃত নওজোয়ানদের সংখ্যা একশ' দশ। এর মধ্যে ২৪ জনের বিরুদ্ধে ধর্ষণ, ২৫ জনের বিরুদ্ধে হত্যা, ২৭ জনের বিরুদ্ধে হত্যার ষড়যন্ত্র, ২০ জনের বিরুদ্ধে ডাকাতি এবং ১৪ জনের বিরুদ্ধে মেয়েদের উত্ত্যক্ত করা ও তাদের গলা থেকে স্বর্ণালংকার ছিনিয়ে নেয়ার অভিযোগে মামলা করা হয়েছে। এসব নওজোয়ানের ৯৫%-ই বিত্তশালী পরিবারের। ১৯৯১ সালে পাঁচ জন শিশুকে হত্যার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছে। এদের চার জনের বয়স ১২ থেকে ১৬ বছরের মধ্যে। ১৯৯২ সালে নয় শিশুকে হত্যার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়। তাদের সাত জনের বয়স ১৬ বছরের নিচে। পুলিশ কমিশনার এসব অপরাধের কারণের ওপর আলোকপাত করে বলেন, শিশুদের বাড়ীতে তেমন একটা দেখাশোনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় না। পিতা-মাতা যার যার কাজে ব্যস্ত থাকে। পারিবারিক ঐক্য-বন্ধন বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্ত হয়ে চলেছে। সামাজিক ও চারিত্রিক মূল্যবোধ নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। যেটুকুও বা অবশিষ্ট ছিল ক্যাবল টিভি সেটুকুও শেষ করে দিয়েছে। এদিকে একবছর ধরে ইন্টারনেট ধ্বংস আরো বৃদ্ধি করে দিয়েছে। চলমান পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে আমাদের ভবিষ্যদ্বাণী হচ্ছে, ক্রমেই অবস্থা খারাপ থেকে খারাপতর থাকবে।
মহিলা সাংবাদিক মঞ্জরী মিশ্রের টাইমস অফ ইন্ডিয়ায় প্রকাশিত একটি রিপোর্ট চমকে দেয়ার মতো এবং উপদেশমূলকও। উক্ত রিপোর্টের সারকথা হচ্ছে, অপরাধকর্ম সংঘটকদের বেশির ভাগই এখনো কৈশরের সীমা অতিক্রম করেনি, কিন্তু তাদের মেধা মস্তিষ্ক যথেষ্ট কাজ করে। পাশ্চাত্যের অনুকরণে তারা সর্বোত্তম বস্তু চায়, তাও কোনো বিলম্ব ছাড়াই, তা যেভাবেই লাভ হোক। গু। বদমাশদের যথারীতি সুসংঘটিত দল তো এখন বিলীয়মান। এখন অল্প বয়সী যুবকদের ব্রিগেড সে জায়গা দখল করে নিয়েছে। সুতরাং প্রাদেশিক শহরগুলোতে অপরাধ সংঘটনে বিশ বছরের কম বয়সী ছেলেদের অগ্রগামী দেখা যায়। উত্তর প্রদেশের রাজধানী লাখনৌতে চুরি, ডাকাতি, ধর্ষণ, অপহরণ, মেয়েদের উত্ত্যক্ত করা ও তাদের গলা থেকে অলংকার ছিনিয়ে নেয়া ইত্যাদিতে বেপরোয়া হয়ে ওঠেছে। প্রতিটি শহরেরই একই অবস্থা। রিপোর্টে আরো বলা হয়েছে, ১৬ থেকে ১৮ বছরের শিশু-কিশোরদের এ সিন্ডিকেট-যাদের বিভিন্ন অপরাধে গ্রেফতার করে উত্তর প্রদেশের জেলে পাঠানো হয়েছে, তাদের সংখ্যা ১৯৯৩ সালে ছিল মাত্র ১৬ জন, কিন্তু ১৯৯৫ সাল আসতে না আসতেই তাদের সংখ্যা এসে দাঁড়ায় এক হাজার তিনশ' পঁচাত্তরে। আর ত্রিশ বছরের ঊর্ধ্বে যাদের বয়স তাদের সংখ্যা ছিল ১৯৯৩ সালে এক লাখ বিশ হাজার চারশ' বিয়াল্লিশ জন, কিন্তু ১৯৯৫ সালে এ সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় এক লাখ ছাব্বিশ হাজার নয়শ' একাত্তর জনে। লাখনৌতে নারীদের গলার চেইন ছিনতাইয়ের ৯০ শতাংশ এবং মোটর গাড়ী চুরির ৭৫ ভাগ ঘটনার সাথে জড়িত সকলেই অল্প বয়ষ্ক শিশু-কিশোর এবং বিত্তশালী পরিবারের ছেলে সন্তান।
ইন্দিরা নগর ব্যাংক ডাকাতিসহ অন্যান্য বারটি ডাকাতির ঘটনার সাথে লাখনৌ ইউনিভার্সিটি ও ইউনিভার্সিটি সংযুক্ত কলেজের ছাত্ররা জড়িত ছিল। সতের বছরের এক ছাত্র স্বীকার করেছে, নারীদের গলা থেকে স্বর্ণের চেইন সে এজন্য ছিনতাই করত যে, এর দ্বারা সে মোটর সাইকেল কিনবে। যখন তার এ আশা পূরণ হয় তখন দামী দামী ফাইভ স্টার হোটেলে নারীদের নিয়ে ডিনার খাওয়া ও বিনোদনের জন্য গলার চেইন ছিনতাই শুরু করে। যৌন অপরাধেও এ ধরনের শিশু কিশোররা অগ্রগামী; বরং এ ধারায় ক্রমাগত প্রবৃদ্ধি ঘটছে। টাইমস অফ ইন্ডিয়ার মহিলা সাংবাদিকের ভাষ্যমতে এসবই ক্যাবল টিভি ও তথ্য-প্রযুক্তির বিস্ফোরণের ফল।
প্রতিবছর দিল্লীর অপরাধ বিষয়ক পুলিশ কমিশনার দিল্লীতে সংঘটিত সকল অপরাধের রিপোর্ট জারি করেন এবং বিগত বছরের সাথে তুলনামূলক বিশ্লেষণ করেন। ১৯৯৫ ও ১৯৯৬ সালে সংঘটিত অপরাধ সম্পর্কে তুলনামূলক বিশ্লেষণ করতে গিয়ে পুলিশ কমিশনার বলেন, ১৯৯৫ সালে সংঘটিত অপরাধের তুলনায় ১৯৯৬ সালে ২৫% প্রবৃদ্ধি ঘটেছে। ১৯৯৫ সালে দিল্লীর বিভিন্ন আদালতে বোমা হামলা, হত্যা, অপহরণ, পতিতাবৃত্তি, ধর্ষণ ইত্যাদি সংক্রান্ত মামলার সংখ্যা ছিল ৪৫ হাজার ৩ শ' ৬৪টি। আর ১৯৯৬ সালে এ সংখ্যা দাঁড়ায় ৬৫ হাজার। দু'বছরের মধ্যে এফ.আই.আর-এর সংখ্যায় ৮৮% প্রবৃদ্ধি ঘটে। ভারতে যে কত দ্রুত অপরাধ বাড়ছে, তা ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরোর ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৬ সালের তৈরিকৃত রিপোর্ট সহজেই অনুমান করা যায়। এ রিপোর্টে বলা হয়েছে, ইন্ডিয়ান প্যানাল কোডের অধীন অপরাধের সংখ্যা দেশের ৩৩টি বড় শহরে উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। এসব শহরে ১৯৯৪ সালে অপরাধের সংখ্যা ছিল ২ লাখ ৩০ হাজার ৪ শ' ৬৯টি, ১৯৯৫ সালে ২ লাখ ৪৭ হাজার ৯ শ' ৩০ এবং ১৯৯৬ সালে এসে দাঁড়ায় ২ লাখ ৫৩ হাজার ৫৭। দেশের যে চারটি বড় শহরে অপরাধের হার রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে, সেগুলো হলো দিল্লী, মোম্বাই, আহমদাবাদ ও ব্যাঙ্গালোর। দিল্লীতে ৪.২১%, মোম্বাইতে ৮.১২%, আহমাদাবাদে ৬% এবং ব্যাঙ্গালোরে ৪.১১%। এ চারটি বড় শহরে যে পরিমাণ অপরাধ সংঘটিত হয়েছে তা গোটা দেশে সংঘটিত অপরাধের অর্ধেক। শুধু ১৯৯৭ সালে দিল্লীতে সংঘটিত অপরাধের ধরন ও সংখ্যা নিম্নরূপ-
০১. ধর্ষণের ঘটনা-১৪ হাজার ৯ শ' ৯৮টি, অথচ ধর্ষণের ঘটনা সরকারী রেকর্ডে কেবল ১০%ই লেখানো হয়।
০২. মেয়েদের যৌন উত্ত্যক্তকরণ ও ধর্ষণের চেষ্টা সংক্রান্ত অপরাধ ২৭ হাজার ৯ শ'।
০৩. গৃহপরিচারিকা ও নিকটাত্মীয়ের সতীত্ব হানি সংক্রান্ত অপরাধ ৭০ হাজার ৬ শ' ৫২।
০৪. যৌতুকের কারণে মৃত্যুর সংখ্যা ৪ শ' ২০।
দিল্লীতে নারী সংক্রান্ত অপরাধের হার প্রতি লাখে ১.৩২% আর গোটা দেশে প্রতি লাখে ৫.৯% হয়ে গেছে। জাতীয় হারের তুলনায় শুধু দিল্লীতে নারীদের যৌন হয়রানির হার দ্বিগুণ এবং কন্যা শিশুদের চার গুণ বেশি। ১৯৯৬ সালের জরিপ অনুযায়ী যেনা-ব্যভিচার ও ধর্ষণের ঘটনা বেশির ভাগ নিকটাত্মীয়দের সাথে সংঘটিত হয়, এর হার ৮৮%। গোটা দেশে নারী নির্যাতনের যত ঘটনা সংঘটিত হয়, তার মধ্যে ১৮% শুধু দিল্লীতেই সংঘটিত হয়। এছাড়াও মেয়েদের অপহরণ, ধর্ষণ ও উত্ত্যক্ত করার ঘটনা গোটা দেশের তুলনায় দিল্লীতে ছয় গুণ বেশি। ৩ গর্ভপাতের আধিক্যের কারণে দিল্লীতে নারী পুরুষের হারেও পার্থক্য এসে গেছে। নারীর তুলনায় পুরুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে এক হাজার পুরুষের মোকাবেলায় নারীর সংখ্যা ৯ শ' ২৯ জন।৪
অন্য সব নৈতিক চারিত্রিক অপরাধের পাশাপাশি মাদক অপরাধেও লন্ডন এবং ওয়াশিংটনের সাথে দিল্লীর প্রতিযোগিতা রয়েছে। ১৯৯৬ সালের এক সরকারী জরিপে মাদকের ফল পর্যালোচনা করে নিম্নরূপ সংখ্যা উল্লেখ করা হয়েছে। দিল্লীতে ৩৫% থেকে ৭০% বন্দী মদপানের কারণে শাস্তি ভোগ করছে। ৬০% যৌন অপরাধ মদের কারণে সংঘটিত হয়, ৬৯% ধর্ষণের ঘটনা নেশাজাত দ্রব্য ব্যবহারের কারণে ঘটে, ৫০% চুরির ঘটনা মদের কারণে, ৮০% তালাকের ঘটনা মদের কারণে সংঘটিত হয় এবং ৯০% সড়ক দুর্ঘটনা মদ পান করে গাড়ী চালানোর কারণে ঘটে। এগুলো তো সেসব অপরাধ যা সরকারী খাতায় রেকর্ড রয়েছে। তাও আবার কেবল দিল্লীর একটি মাত্র শহরের। এছাড়া সরকারী বেসরকারী হিসাব মতে আরো কত অপরাধ রয়েছে যার কোনো ইয়াত্তা নেই। তার মধ্যে ধোকা প্রতারণা, ঘুষ দেয়া খাওয়া, সরকারী তহবিল লুটপাট, দুর্নীতি, কাজে চুরি, টেলিফোন, বাণিজ্য, কৃষি ও অন্যান্য সরকারী বেসরকারী প্রতিষ্ঠান ও কোম্পানীর কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অর্থ আত্মসাতের কেলেংকারি ফাঁস বা ভারতে লক্ষ্মীপূজার উপকারিতা; বরং তার পবিত্রতার ওপর সত্যায়নের ওপর মহর মেরে দিয়েছে।
টিকাঃ
২. ১৯৯৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ২৭ হাজার। ইন্ডিয়া টুডে'র ১৯৯৭ সালের ১৬ই জানুয়ারী সংখ্য থেকে জানা যায়, আমেরিকার মতো ভারতেও মিনিট ও ঘন্টার হারে অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ প্রতি ৪৫ মিনিটে একটি ধর্ষণের ঘটনা সংঘটিত হচ্ছে, প্রতি ২৬ মিনিটে একটি যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটছে, প্রতি ১ ঘন্টা ১৫ মিনিটে একজন নারীকে যৌতুকের জন্য আগুনে জ্বালিয়ে দেয়া হচ্ছে এবং প্রতি ৩৩ মিনিটে একটি জুলুমের ঘটনা ঘটছে। সাপ্তাহিক সানডে'র ১৯৯৭ সালের জুন সংখ্যায় 'হেল্প লাইন' নামক একটি সংস্থা পরিচালিত এক জরিপে প্রকাশিত হয়েছে, তাতে দেখানো হয়েছে, কিভাবে পিতা-মেয়ে, মা-ছেলে, ভাই-বোন, মামা-ভাগিনা ও চাচা-ভাতিজীর মাঝে অবৈধ যৌন সম্পর্কের ঘটনা ঘটছে। এ সংখ্যা বিপজ্জনক হারে বাড়ছে।
৩. দিল্লীর ৯০% নারী রিপোর্ট দিয়েছে, আজকাল মিল-কারখানা, অফিস-আদালত, রাস্তাঘাট এবং পরিবহনে যৌন হয়রানি উদ্বেগজনক হারে বেড়ে গেছে। দিল্লীর এক হাজার নারীর ওপর পরিচালিত এক জরিপ দ্বারা জানা গেছে, তাদের মধ্যে ৯২% নারী কোনো না কোনো পুরুষের লোলুপ দৃষ্টির শিকার হয়েছে। জওহর লাল নেহরু ইউনিভার্সিটির একটি জরিপ থেকে জানা গেছে, ৬৭% ছাত্রী কখনো না কখনো অবশ্যই যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে। তাদের মধ্যে ৭.৫৮% ছাত্রী হোস্টেলে অবস্থানকারী। ১৯৯৬ সালে গৃহপরিচারিকা ও নিকটাত্মীয়ের সাথে ব্যভিচারের হার ৬৮% বৃদ্ধি পেয়েছে।
৪. এমন হবেই বা না কেন, যখন টিভি ও সংবাদ পত্রসমূহে বিজ্ঞাপন দেয়া হয়, 'এখন পাঁচ হাজার টাকা খরচ করে ভবিষ্যতের পঞ্চাশ হাজার টাকা বাঁচান'। (অমৃতসরের ড. ভান্ডারির বিজ্ঞাপন) অর্থাৎ যদি পেটে মেয়ে সন্তান থাকে তাহলে পাঁচ হাজার টাকার বিনিময়ে গর্ভপাত ঘটিয়ে ভবিষ্যতে তার বিয়ে-শাদীর খরচ বাবদ পঞ্চাশ হাজার টাকা বাঁচান। অমৃতসরে ৯৫% নারী তাদের গর্ভের কন্যা সন্তান বিনষ্ট করেছে। ১৯৯৫ সালে সরকার অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ত্রিশ লাখ গর্ভ নষ্ট করা হয়েছে। ১৯৯১ সালে সামগ্রিকভাবে কন্যা সন্তান জন্মের হার সাড়ে সাত লাখ হ্রাস পেয়েছে। সরকারী হিসাবমতে শুধু যৌতুকের কারণেই প্রতিবছর গোটা দেশে আট হাজার নয়শ' সাতাশি জন নারীকে আগুনে জ্বালিয়ে হত্যা করা হয়। 'আমরা দুজন আমাদের দুজন' জন্ম নিয়ন্ত্রণ শ্লোগানের চক্করে পড়ে প্রতিবছর যেসব শিশুকে হত্যা করা হয়, তাদের সংখ্যা আলাদা।
📄 ভারতীয় সমাজে টিভির প্রভাব-প্রতিক্রিয়া
ভারতীয় সমাজে মিডিয়া বিশেষ করে সিনেমা যে প্রভাব-প্রতিক্রিয়া ফেলছে তা কোনো গোপন বিষয় নয়। সিনেমার অভিনেতা-অভিনেত্রী, নর্তকী ও গায়িকা- গীতকারের যে মর্যাদা ভারতীয়দের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছে, সম্ভবত সে মর্যাদা অন্য কারো নেই। এক সিনেমা অভিনেতা খান ড্রেস পরিধান করেছে তো জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সকলেই খান ড্রেস পরা শুরু করেছে। এক সিনেমায় এক মেয়ে তার প্রেমিকের সাথে ঘর থেকে বের হয়ে যায়। যাওয়ার সময় দেয়ালে লেখে গেছে, 'প্রেম যখন করেছি তখন ভয় কিসের'। এর কিছু দিনের মধ্যেই ডজনের পর ডজন এমন ঘটনা ঘটে যায়। সিনেমায় যা কিছু দেখে নতুন প্রজন্ম তা বাস্তবায়ন শুরু করে দেয়। অভিনেতা চওড়া অথবা সংকীর্ণ প্যান্ট পরল তো এটা ফ্যাশন হয়ে গেল। সিনেমায় ডাকাতির দৃশ্য দেখে অল্প বয়স্ক শিশুরা ব্যাংকের ওপর হানা দিয়েছে, বাস লুটপাট করেছে। স্বয়ং দিল্লী সরকারের রিপোর্ট অনুযায়ী যেনা-ব্যাভিচার ও ধর্ষণের ঘটনায় ডিশ এন্টিনার আগমনের পর থেকে ৭০% প্রবৃদ্ধি ঘটেছে। এক জরিপ মোতাবেক শুধু দিল্লী শহরের সীমানা পর্যন্ত টিভির প্রভাব- প্রতিক্রিয়া ও কুফল লক্ষ্য করুন-খুব কাছে থেকে টিভি দেখলে শিশুদের মৃগী ও মোটা হয়ে যাওয়ার মতো শারীরিক ও ধমনী রোগ সৃষ্টি হতে পারে। যেসব শিশু বেশি সময় কাছে থেকে টিভি দেখে তাদের অনিদ্রা, ধমনী রোগ, খিটখিটে মেযাজ প্রভৃতি সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে। একথার সমর্থন করেছেন মস্তিস্ক, মানসিক ও ধমনী রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. নীনা দোহরা, ডা. মনোরঞ্জন সুহা, ডা. নলীম কুমার দোহরা, লেফটেন্যান্ট কর্নেল এম. সি. শ্রী বাস্তব এবং ডা. সতীশ আগারওয়াল প্রমুখ। ১৯৯৬ সালের টিভিতে কোকাকোলার বিজ্ঞাপনের অনুকরণ করতে গিয়ে লাখনৌর ছয় বছরের শিশু রিংকু তিন তলা বিল্ডিং থেকে পড়ে নিহত হয়েছে। এমনিভাবে টিভিতে প্রদর্শিত এক সিনেমায় এক অভিনেতাকে আত্মহত্যা করতে দেখে দিল্লীর সলিমপুরের নয় বছরের শিশু পূজা নির্মমভাবে আত্মহত্যা করে মৃত্যুবরণ করেছে। এসব ঘটনা টিভির ভয়াবহ ক্রমবর্ধমান ক্ষতিকর দিকগুলোর মুখোশ উন্মোচন করে দেয়। মনস্তত্ত্ব বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য হলো, টিভিতে প্রদর্শিত অনুষ্ঠান ও দৃশ্যাবলী শিশুদের মধ্যে গভীর প্রভাব ফেলে। তাদের দ্বারা সেসব দৃশ্যের বাস্তবায়ন যে কোনো সময় হতে পারে। মনস্তত্ত্ববিদদের মতে টিভির ক্ষতিকর প্রভাব সবচে বেশি শিশুদের ওপর পতিত হয়। কারণ তারা কোন দলীল-প্রমাণ ছাড়াই টিভির অনুষ্ঠান ও দৃশ্যগুলো যথার্থ মনে করে তার অনুকরণ করতে থাকে। এক অনুমান মতে দিল্লীতে একটি শিশু প্রতি সপ্তাহে গড়ে ১৭ ঘন্টা টেলিভিশন দেখে। এমন শিশুদের সংখ্যা সবচে বেশি, যারা পড়াশোনা, বাড়ীর কাজ, খাবার-দাবার, খেলাধুলা- বিনোদন ও শোয়া-ঘুমানোর কাজে যতটুকু সময় ব্যয় করে তার চেয়ে বেশি সময় ব্যয় করে টিভি স্ক্রিনের সামনে। এক অনুমানমতে আট বছরের একটি শিশু আগামী দশ বছরের মধ্যে প্রতি মাসে ৬৮ ঘন্টা সময় টিভি দেখায় অতিবাহিত করবে। মনস্তত্ত্ববিদ ডা. মনোরঞ্জন সুহা বলেন, টিভি দেখা শিশুদের একটি নেশা। যেসব শিশু এই নেশায় বুঁদ হয়ে যায় তারা ঘন্টার পর ঘন্টা টিভি দেখেও ক্লান্ত হয় না। যদিও টিভির অনুষ্ঠান অস্বস্তিকর ও বিরক্তিকর হোক না কেন।
অস্ট্রেলিয়ান বিশেষজ্ঞদের মতে টিভি থেকে বের হওয়া আলোকরশ্মি মস্তিষ্কের কর্মশক্তিকে প্রভাবিত করে। শিশুদের মস্তিষ্ক টিভির উজ্জ্বল আলোকরশ্মি বরদাশত করতে পারে না। যখন একবার মস্তিষ্ক প্রভাবিত হয়ে যায় তখন সে নেশায় বুঁদ হয়ে সারাক্ষণ টিভি দেখায় নিমগ্ন থাকে। এভাবে শিশু যেন টিভির মধ্যে বন্দী হয়ে অনবরত টিভি দেখতে থাকে, তা যে কোনো প্রোগ্রামই আসতে থাকুক।
ডা. রাম মনোহার লোহিয়া হাসপাতালের ডা. নীনা দোহরার মতে মস্তিষ্কের যে অংশটুকু আলোকরশ্মি দ্বারা প্রভাবিত হয়, সে অংশটুকু টিভি দেখার সময় খুব দ্রুত কাজ করতে থাকে। ফলে এক পর্যায়ে মস্তিষ্ক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে মেধাশক্তি ওলটপালট হয়ে যায়। এক সময় তা মৃগী রোগের আকৃতি ধারণ করে। এ ধরনের রোগ নির্ণয় করা খুবই কঠিন। কারণ এ অবস্থায় মুখ থেকে লালা পড়ে না। ফলে লোকেরা সঠিক সময়ে এ রোগ সম্পর্কে অবগতি লাভ করতে পারে না। শেষ পর্যন্ত তা দূরারোগ্য ব্যধিতে পরিণত হয়।
এক জরিপ অনুযায়ী ভারতে ৫২ লাখ মৃগী রোগী আছে, যার মধ্যে ৩ লাখ শুধু লাগাতার টিভি দেখার কারণে মৃগী রোগের শিকার হয়েছে। ১৯৯৬ সালের ২রা মে ইউ এন আই পরিচালিত এক জরিপে ডা. মনোরঞ্জনের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, টিভি দেখা যেসব শিশুর নেশায় পরিণত হয়ে যায় তাদের যদি এ থেকে নিষেধ করা হয়, তাহলে তারা উগ্র বদমেযাজী হয়ে ওঠে। এই রিপোর্ট প্রকাশের এক মাস পর ১৯৯৬ সালের ৩রা মে দ্বিতীয় আরেকটি রিপোর্ট ভারতীয় সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। তাতে ভারতীয় সমাজে টিভির প্রভাব-প্রতিক্রিয়ার বিশ্লেষণ করে বলা হয়েছে, ভারতীয়দের এখন এ বাস্তব বতা স্বীকার করতে হবে, টিভির পর্দায় প্রদর্শিত উগ্র পন্থা আর বাস্তব জীনের উগ্র পন্থার মধ্যে আর কোনো পার্থক্য থাকেনি; বরং ক্রমেই এ পার্থক্য হ্রাস পাচ্ছে।
এখন টিভি ও সিনেমার প্রতি মানুষের আঙ্গুলি ওঠছে। বিশেষ করে টিভির প্রতি মানুষের অভিযোগ বাড়ছে যে, এর মাধ্যমে সকল শয়তানী কাজকর্ম ও বিশৃংখলা সরাসরি ঘরে পৌঁছছে।
দক্ষিণ দিল্লীর এডিশনাল পুলিশ কমিশনার মি. প্রমিরা বলেন, সিনেমা ও টিভি দুটোই যৌনতা ও উগ্রতাকে নিন্দনীয়ভাবে উপস্থাপন করার পরিবর্তে নান্দনিকভাবে উপস্থাপন করে। যা অল্প বয়স্ক শিশুদের অপরাধের দিকে ঠেলে দিতে সিনেমা টিভি দুটোই সমান যিম্মাদার। তিনি বলেন, সিনেমায় প্রয়োজনের চেয়ে বেশি উগ্রতা দেখানো হয়। নতুন প্রজন্মের মেধা-মননে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। তিনি আরো বলেন, নতুন প্রজন্মকে উগ্রতা, বিদ্রোহ ও বিপথগামিতার দিকে ঠেলে দিতে একদিকে যেমন সিনেমা যিম্মাদার, অপরদিকে যিম্মাদার কঠোর আইনের অনুপস্থিতি। তিনি বলেন, কেবল টিভির প্রচলন হওয়া মাত্রই যৌনতা ও উগ্রতা সম্পর্কিত সিনেমা ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে। এসব সিনেমার কারণে কচি মস্তিষ্কের শিশুরা গোমরাহীর পথে দ্রুত ধাবিত হচ্ছে।
দিল্লীর এক নারী-যে আমদানী-রপ্তানীর কাজ করে, সে বলে, সিনেমার প্রথম কাজ ও গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য হলো, দর্শদের পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন বিনোদন উপহার দেয়া, কিন্তু সিনেমা লোকদের সচেতন ওয়াকিফহাল বানাবে এ উদ্দেশ্য বহু পূর্বেই নিঃশেষ হয়ে গেছে। দুঃখের বিষয়, আজ সিনেমাগুলো মানব জীবনের ইতিবাচক মূল্যবোধগুলো শিক্ষা দেয়ার প্রতি মোটেও দৃষ্টি নিবদ্ধ করছে না।
'বাজিগর' সিনেমা একটি ব্যবসা সফল সিনেমা ছিল। এ সিনেমায় প্রভাবিত হয়ে মোম্বাইয়ের এক নওজোয়ান দানেশ কাজী তার প্রেমিকা ভারতী রামচন্দ্রকে হত্যা করার পূর্বে তার থেকে একটি আত্মহত্যার চিঠি লিখিয়ে নিয়েছিল। এরপর একটি উঁচ ভবনের ছাদে নিয়ে সেখান থেকে নিচে ফেলে দিয়ে তাকে হত্যা করেছে। এমনিভাবে 'রঘুবীর' সিনেমার একটি দৃশ্যে প্রভাবিত হয়ে এক অল্প বয়স্ক নওজোয়ান তার সমবয়সী এক বন্ধুকে হত্যা করেছে। এ তো মাত্র দু'টি দৃষ্টান্ত পেশ করা হলো। নতুবা সিনেমার নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার হাজার হাজার দৃষ্টান্ত ও ঘটনা রয়েছে, যাতে প্রভাবিত হয়ে আজ নওজোয়ানরা ক্রমেই অপরাধের পথে ধাবিত হচ্ছে।
মনস্তত্ত্ববিদ ডা. এল কে ভগত বলেন, সিনেমার দু'টি দিক রয়েছে, তা হলো, হিরো বা নায়ক ভাল ও সুন্দর দৃশ্যে আর ভিলেন খল চরিত্রে অভিনয় করে, কিন্তু জীবনের ভারসাম্যের দিকটি ধামাচাপা পড়ে যায়। ভলিউডের রাজা শাহরুখ খান সিনেমায় অসংখ্য মানুষকে হত্যা করে বেঁচে যায়। এতে করে নওজোয়ানদের মধ্যে বিরাট প্রভাব পড়ে। এছাড়াও নায়কের চরিত্র ও ভূমিকা এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়, যাতে লোকেরা নিজেদের সেসব চরিত্রের সাথে একাকার করতে প্রয়াস চালায়।
বেসরকারী একটি সংস্থার ডাইরেক্টর মি. অনিল কলি বলেন, মাদক ও টেলিভিশন মানুষের মধ্যে বিদ্রোহ সৃষ্টি করে। এ দু'টি নওজোয়ানদেরকে বিদ্রোহে অনুপ্রাণিত উৎসাহিত করে। যদি কখনো সফল হয় তা হলে অপরাধের যে খবর সৃষ্টি হয় তা প্রায় প্রতিদিনই পড়তে পাওয়া যায়।
মি. কলি আরো বলেন, সিনেমা শুধু মধ্য ও উচ্চবিত্ত পরিবারের ছেলে-মেয়েদের ওপর প্রভাব ফেলে। তারা সিনেমায় যেসব দৃশ্য দেখে তা নিজেদের জীবনে বাস্তবায়ন করতে প্রয়াস চালায়। ফলে তারা ধীরে ধীরে অপরাধ জগতে পা বাড়ায়। এছাড়াও সিনেমা সামাজিক বিশৃংখলা ও যৌন বিপথগামিতা বৃদ্ধি করছে। এর চেয়েও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সিনেমা নওজোয়ানদের জীবনের সমস্যা সংকট মোকাবেলার সাহস যোগানোর পরিবর্তে তা থেকে পলায়নে বাধ্য করে।
সাম্প্রতিককালে দিল্লী পুলিশ এক কিশোরীকে অপহরণ করে কয়েক মাস আটকে রেখে পালাক্রমে ধর্ষণ করার অপরাধে সাত নওজোয়ানকে গ্রেফতার করে। তারা স্বীকার করেছে, টিভির একটি সিনেমায় প্রভাবিত হয়ে তারা এ জগতে পা বাড়িয়েছে। ১৯৯৬ সালের জুনে পরিচালিত ইউ এন আই'র এক জরিপ অনুযায়ী দিল্লীর সাবেক এডিশনাল পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম) আর কে তেওয়াারি বলেন, এসব অপরাধের জন্য সিনেমা ও অশ্লীল ম্যাগাজিনের মতো পিতা-মাতাও একইভাবে যিম্মাদার।
দিল্লীর একটি আদালত নারীবাদী সংগঠন 'জাগ্রত মহিলা সমিতি'র প্রেসিডেন্ট নরমিলা শরমার আবেদনের প্রেক্ষিতে ঝিটিভি, স্টার টিভি ও দূর-দর্শনকে তারা তাদের কোম্পানীর পরিচালনা পরিষদের সদস্যবৃন্দ, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, অনুষ্ঠানমালার পরিকল্পনাকারী ও প্রডিউসারদের নাম আদালতকে অবহিত করতে নোটিশ দিয়েছে। আদালত এসব কোম্পানীর বিরুদ্ধে এ্যাকশন নিতে পারে। জাগ্রত মহিলা সমিতির, প্রেসিডেন্ট নরমিলা শরমা টাইমস অফ ইন্ডিয়াকে এক সাক্ষাতকারে বলেন, কোনো ভদ্র রুচিশীল মানুষ ঘরের লোকদের সাথে বসে এসব প্রোগ্রাম দেখতে পারে না। কারণ এতে নির্লজ্জ নগ্ন দৃশ্য দেখানো হয়। তিনি আরো বলেন, নতুন প্রজন্মের শিশুরা এসব প্রোগ্রাম দেখে অশ্লীলতা শিখছে। পাশাপাশি তাদের মধ্যে উগ্রতাও বাড়ছে। তিনি আরো বলেন, একত্রিশটি প্রোগ্রামের মধ্যে আটটি প্রোগ্রাম এমন রয়েছে, যেগুলো প্রদর্শনের অনুমতি দেয়া যায় না। এতদসত্ত্বেও তা উন্মুক্তভাবে দেখানো হচ্ছে। ঝিটিভি ও স্টার টিভির আইনজীবীরা বলেন, যেহেতু এসব প্রোগ্রাম হংকং থেকে প্রচার করা হয়-এ জন্য তাদের বিরুদ্ধে কোনো আইনী এ্যাকশন নেয়া যাচ্ছে না। (সূত্র: ত্রৈমাসিক দাওয়াত, জুন-১৯৯৬)
📄 পাকিস্তানী মিডিয়া : ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
পাকিস্তানে টেলিভিশনের আগমনের পূর্বে এসব ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার পলিসি নির্ধারণ করার জন্য যুলফিকার বোখারীর সভাপতিত্বে একটি উচ্চ পর্যায়ের মিটিং অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত মিটিংয়ে লেখক, সাহিত্যিক, শিল্পী, সাংবাদিক, পরিচালক ও সম্ভাব্য প্রসিউডারদের আহবান জানানো হয়। সে মিটিংয়ে বোখারী সাহেব পাকিস্তানী টিভির দু'টি মৌলিক উদ্দেশ্য তুলে ধরেন।
এক. প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের কীর্তি ও অবদানের কথা ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয়া।
দুই. জাতি এবং সর্বাগ্রে মধ্যম শ্রেণীর লোকদের প্রাচীন ধর্মীয় চিন্তাধারা থেকে মুক্ত করা। আর এটিই হলো সবচে' গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য। এ উদ্দেশ্য এমনভাবে আঞ্জাম দেয়া হবে, যেন লোকেরা কোনো অবস্থায়ই বুঝতে না পারে যে, নতুন প্রজন্মকে ধর্মের প্রভাব থেকে মুক্ত করার অভিযান চালানো হচ্ছে। আপনারা যদি এ কাজ করতে পারেন তাহলে মনে রাখবেন, চিরকালের জন্য আমরা ধর্মীয় উন্মাদ ও মোল্লাদের থেকে আমাদের সমাজ ও রাজনীতিকে পবিত্র করতে সক্ষম হব।
মৌলিক উদ্দেশ্য বর্ণনা করার পর বোখারী সাহেব উপস্থিত সুধীবর্গকে পৃথক পৃথক দিক-নির্দেশনা দিতে গিয়ে বলেন, আপনাদের মধ্যে যারা আরবী চর্চা করবে তাদের আমি নির্ধারিত অনুষ্ঠানমালার বিনিময় ছাড়াও আরো দুইশ' টাকা করে প্রতি মাসে আমার পক্ষ থেকে দেব। যাতে আরবী শেখার পর আপনাদের রেডিও ও টিভির পক্ষ থেকে আলেম এবং নতুন চিন্তাবিদ হিসেবে প্রচারণা চালিয়ে সেসব ধর্মীয় গোঁড়া মোল্লাদের প্রভাব ও কর্তৃত্ব নির্মূল করা যায়, যারা নিজেদের ধর্মের ঠিকাদার বানিয়ে বসে আছে। ধর্মের জঞ্জাল থেকে সমাজকে পবিত্র করার দায়িত্ব আপনাদেরই নিতে হবে। তাই আমরা এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সম্পূর্ণ আধুনিক মেধা মননের অধিকারীদের সামনে নিয়ে আসতে চাই। নতুন মিডিয়ার মাধ্যমে আধুনিক মেধা মননের অধিকারীদের কেবল সেকেলে ও পশ্চাদপদ ধ্যান ধারণা থেকে পবিত্রকরণে ব্যবহার করা হবে; পুরো জাতির চিন্তাধারা ও ধ্যান-ধারণা পাল্টানোর দায়িত্ব মিডিয়াকেই গ্রহণ করতে হবে।
আপনারা এ উদ্দেশ্য এভাবে বাস্তবায়ন করতে পারেন যে, মোনাফেকী, কপটতা ও দ্বি-মুখী চরিত্রে খল নায়কদের দাড়ি এবং উপহাস ও বিদ্রূপাত্মক চরিত্রে প্রাচ্যের পোশাক ব্যবহার করবেন। আর স্মরণ রাখবেন, আপনাদের সকল অভিনেতা ও মডারেটদের সে লেবাস পরিধান করাতে হবে, যা আমাদের উন্নত সমাজে একশ' বছর পর প্রচলন হওয়া উচিত এবং যা উচ্চ শ্রেণীর শতকরা এক পার্সেন্টের মাঝে ইতোমধ্যেই প্রচলন লাভ করেছে।'
এসব নির্দেশনা যদিও বোখারী সাহেবের মুখ থেকে বের হয়েছে, কিন্তু বাস্তবে এটি সেই মৌলিক পলিসির অংশ, যা পাশ্চাত্য সৃষ্ট ধর্মহীন রাজ কর্মচারী ও ক্ষমতাসীন শাসকগোষ্ঠী তৈরি করেছিল এবং যা অর্জন করার জন্য কোটি কোটি ডলার ঋণ নিয়ে টিভি মিডিয়াকে পাকিস্তানে আনা হয়েছে। এ কারণে সূচনালগ্ন থেকেই সেই পলিসির ওপর কাজ করা হচ্ছে। শহীদ জেনারেল জিয়াউল হকের শাসনামলে এই পলিসি কিছুটা পরিবর্তন করা হয়েছিল। কিন্তু বেনজীরের সরকার জাতীয় পলিসির নামে মিডিয়ার জন্য যে প্রোগ্রাম জারি করে গেছে তা থেকে সুস্পষ্ট হয়, পাকিস্তানকে পুরোপুরি পশ্চিমের মতো করে ঢেলে সাজানোর প্রোগ্রাম অব্যাহত থাকবে এবং যেটুকু বাকী থাকবে তা পশ্চিমা মিডিয়ার মাধ্যমে পূর্ণ করা হবে। 'পাকিস্তানের সাংস্কৃতিক পলিসি' শিরোনামে বেনজীরের সরকার ১৯৯৫ সালের আগস্টের প্রথম সপ্তাহে তার সাংস্কৃতিক পলিসির ঘোষণা দেয়। এই পলিসির গুরুত্বপূর্ণ কিছু দিক খুব জোরে শোরে ঘোষণা দেয়া হয়। ১৯৬৮ সাল থেকে ১৯৭৫ সালের মাঝের সময়কালে তথাকথিত কমিউনিস্ট বুদ্ধিজীবী ও নগ্নতা অশ্লীলতাপ্রিয় ধর্মহীন গোষ্ঠী যার প্রদর্শনী করেছিল। যদি পলিসির ঘোষণা নাও দেয়া হত, তবুও পাকিস্তানের সকল সরকারী প্রচার মাধ্যম এবং সরকারী উৎসব অনুষ্ঠানসমূহের রীতি-নীতি ও ধরন সুস্পষ্টভাবে এ ঘোষণা দিচ্ছিল, এই জাতির ওপর ধর্মহীন গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক আগ্রাসন খুব জোরেশোরে শুরু হয়েছে এবং নতুন প্রজন্মকে একটি বিশেষ চিন্তাধারার প্রতি নিয়ে যাওয়ার প্রাণান্তকর প্রয়াস চালানো হচ্ছে। বিশেষ করে টিভির মাধ্যমে যা কিছু উপস্থাপন করা হচ্ছে তা জাতীয় উপকরণ দ্বারা জাতিকেই ধ্বংস করার একটি প্রয়াস।
সাংস্কৃতিক পলিসির গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোতে বাদ্য, নৃত্য, মিউজিক, গান, লোক গীতি, সিনেমা, টেলিভিশন, নৃত্যশিল্পী, কণ্ঠশিল্পী, গায়ক, অভিনেতা, অভিনেত্রী ইত্যাদি শব্দগুলো কমপক্ষে সতের বার ব্যবহার করা হয়েছে। যেন গোটা সাংস্কৃতিক নীতির প্রাণই হলো গান, নৃত্য, বাদ্য, বাজনা, সংগীত ইত্যাদি। এ পলিসিতে দ্বিতীয় যে দিকটির জোর দেয়া হয়েছে। তা হলো আঞ্চলিকতা, আঞ্চলিক ভাষা, আঞ্চলিক কালচার, স্থানীয় ও আঞ্চলিক বুদ্ধিজীবী এবং বিভিন্ন শহর ও প্রদেশের ইতিহাস ইত্যাদি। পলিসির তৃতীয় হলো সংস্কৃতির আন্তর্জাতিক বিনিময়। যার মধ্যে রয়েছে পাকিস্তান ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলোর মাঝে সাংস্কৃতিক যোগাযোগের বিকাশ ঘটানো।
পলিসির চতুর্থ গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা তথা এনজিওদের পৃষ্ঠপোষকতা।৬
📄 পাকিস্তানের সাংস্কৃতিক পলিসির কিছু দৃষ্টান্ত
০১. সাহিত্য, নির্মাণ, খেলাধুলা, নৃত্য, সঙ্গীত, লোকগীতি, আর্টস, সিনেমা, টেলিভিশন, রেডিও, প্রচার মাধ্যম এবং সংস্কৃতির সাথে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিভাগে পাকিস্তানের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার সংরক্ষণ করা।
০২. শিল্পী, গীতিকার, কণ্ঠশিল্পী, অভিনেতা-অভিনেত্রী, চলচ্চিত্র নির্মাতা, নাট্যকার ও নর্তক-নর্তকীদের জাতীয় একাগ্রতা ও একমুখিতার কর্মপ্রচেষ্টার সাথে সম্পৃক্ত রাখা। অভিনেতা-অভিনেত্রী, প্রডিউসার ও চলচ্চিত্র পরিচালকদের তালিকা তৈরি করা, সঙ্গীত, লোকসঙ্গীত, কল্যাসিক্যাল সঙ্গীত, জনপ্রিয় সঙ্গীত, গানের সুর-সজ্জা এবং আবৃতির মূল্যায়ন, সাংস্কৃতিক প্রদর্শনী, সঙ্গীত সভার আয়োজন অনুষ্ঠান-এসব সাংস্কৃতির পলিসির অন্তর্ভূক্ত কতিপয় লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের চিত্রাংকন মাত্র।
এগুলো পাকিস্তানের সাংস্কৃতিক পলিসির যৎকিঞ্চিত ঝলক। এখন দেখার বিষয় এগুলো কিভাবে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
পাকিস্তানী টেলিভিশনের সকল চ্যানেল ছাড়া পশ্চিমা টিভি কোম্পানী এস.টি.এন, সি.এন.এন, বি.বি.সি ও এন.টি.এম ইত্যাদি চ্যানেল থেকে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে যেসব অনুষ্ঠান প্রচার করা হচ্ছে, তা জাতিকে ময়ূর নাচে উম্মাদ দিশাহারা করার সুদূরপ্রসারী, সুপরিকল্পিত ও সুসংগঠিত প্রয়াস। সাম্প্রতিককালে পাকিস্তানী টিভির অনুষ্ঠানমালায় যে পরিবর্তন সূচিত হয়েছে তা নিম্নরূপ-
০১. টেলিভিশনের সময় বৃদ্ধি করা হয়েছে। এখন চব্বিশ ঘন্টা কোনো না কোনো চ্যানেল চালু থাকছে। পাকিস্তানী টিভির দুই নম্বর চ্যানেলটিকে শিক্ষা চ্যানেল বলা হয়, কিন্তু এই চ্যানেলে যেসব প্রোগ্রাম প্রচার করা হয় তার মাত্র বিশ শতাংশ শিক্ষা বিষয়ক, আর বাকী আশি শতাংশ বিনোদনমূলক। পুরাতন নাটক বার বার দেখানো হয়। এভাবে নতুন প্রজন্মের শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও আরামের সময়কে বিনোদনমূলক প্রোগ্রামে ব্যয় করা হচ্ছে। টিভির এসব প্রোগ্রাম নৈতিক ও চারিত্রিক ধ্বংসের সাথে সাথে স্বাস্থ্যগত ধ্বংসেরও কারণ হচ্ছে। আজকাল স্কুলের ৪২% ছেলে-মেয়ে চশমা ব্যবহার শুরু করেছে, অথচ চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে টিভির অধিক সম্প্রচার বিভিন্ন ক্যান্সারের মতো কষ্টকর জীবনবিনাশী রোগের কারণ হতে পারে। পাকিস্তানী সমাজের ওপর শারীরিক সুস্থ্যতা ব্যতীত মনস্তত্ত্ব এবং স্বভাব চরিত্র গঠনেও টিভি প্রোগ্রামসমূহের ধ্বংসকর প্রভাব-প্রতিক্রিয়া পড়ছে। এ্যাকশন, মারপিট ও অপরাধে ভরপুর সিনেমাগুলো আগে হলে দেখানো হতো, কিন্তু এখন ভিসিআরের কারণে মহল্লায় মহল্লায়, অলিতে গলিতে ব্যাঙের ছাতার মতো সিডি ভিসিডির দোকান গজিয়ে ওঠেছে। আর ডিশ এন্টিনা তো প্রতিটি ঘরকে পতিতাবৃত্তি শিক্ষার কেন্দ্র বানিয়ে দিয়েছে। একটি পাশ্চাত্য টিভি চ্যানেল চব্বিশ ঘন্টা এমন যৌন প্রোগ্রাম দেখায় যা স্বয়ং পাশ্চাত্যেও নিষিদ্ধ।
০২. পাকিস্তানী টিভি ও এনটিভিএম-এর প্রোগ্রামগুলো সঙ্গীত চ্যানেল বনে গেছে, যেখান থেকে গোটা জাতিকে নর্তন কুর্দনের প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। গীতিকার, কণ্ঠশিল্পী ও চলচ্চিত্র তারকাদের হিরো বানিয়ে উপস্থাপন করা হয়ে থাকে। পশ্চিমা সমাজের মতো যুবক-যুবতীদের সম্মিলিত উত্তাল সঙ্গীতের তালে তালে নাচ-গান, ঢলাঢলি এবং একে অন্যের ওপর পতিত হওয়ার দৃশ্যও দেখানো হয়। এছাড়া পাকিস্তানী সিনেমা হলগুলোতে পাশ্চাত্য থেকে আমদানীকৃত হত্যা, মারপিট, ছিনতাই, ডাকাতি, নগ্নতা, অশ্লীলতা, নির্লজ্জতা ও যৌন সুড়সুড়ি ভরপুর ইংরেজি সিনেমা প্রকাশ্যে প্রদর্শন করা হচ্ছে। আর এগুলোর অনুকরণে পশতু, উর্দু, পাঞ্জাবী ভাষায় সিনেমা ও ক্যাসেট তৈরি করে ব্যাপকভাবে প্রসার করা হচ্ছে। ভারতীয় সিনেমা ছাড়াও বিনোদনের নামে পাশ্চাত্য কলুষতায় কলুষিত নাটক ও নাচ গানের অনুষ্ঠানগুলো প্রদর্শিত হয়। আর পাকিস্তান সরকার এর পেছনে পানির মতো অর্থ ব্যয় করে।
টিকাঃ
৫. প্রকাশ থাকে যে, পাকিস্তানের পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর মধ্যে সবচে বড় ও নিকটতম দেশ হলো ভারত, যার ব্রাহ্মণ্যবাদী সংস্কৃতির সাথে নিজেকে জোড়ার জন্য পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী সদা অস্থির পেরেশান থাকে। পাকিস্তানে ভারতীয় সিনেমার ব্যাপক জনপ্রিয়তা তার বাস্তব প্রমাণ।
৬. উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এনজিও এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলোকে বিরাট গুরুত্ব দেয়া হয়। এসব সংস্থা ফ্রি-মিশন আন্দোলনের অধীনে লায়ন্স ক্লাব, রোটারী ক্লাব, রেডক্রস সোসাইটি এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠনের নামে কাজ করে থাকে, বিদেশী বৃহৎ শক্তিবর্গ যাদের পৃষ্ঠপোষকতা করে এবং বিপুল পরিমাণ আর্থিক ফান্ড সরবরাহ করে থাকে। গত বছর বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে এসব এনজিও এবং সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর ব্যাপারে অনুসন্ধান চালানোর দাবী উঠলে বৃহৎ দেশগুলোর দূতাবাস চাপ দিয়ে তা বন্ধ করে দেয়। পক্ষান্তরে দীনী মাদরাসাগুলোর ওপর জোরেশোরে এই অপবাদ দেয়া হচ্ছে, তারা বিদেশ থেকে সাহায্য পেয়ে থাকে। ভারতেও দীনী মাদরাসাগুলোর ওপর একই অপবাদ আরোপ করা হচ্ছে। অপরদিকে আরব বিশ্বের ওপর চাপ প্রয়োগ করে দীনী ও সেবা সংস্থাগুলোকে চাঁদা ও সাহায্য দেয়া বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এর পেছনে যুক্তি দেখানো হছে, এই সাহায্য দ্বারা মৌলবাদ ও ধর্মীয় কট্টরপন্থীদের শক্তি যোগানো হয়।
৭. সাংস্কৃতিক পলিসি নির্মাতারা শুধু নাচ, গান, বাদ্য, বাজনা, নগ্ন শরীর প্রদর্শনী, চিত্রাংকন, ভাস্কর্য নির্মাণ ইত্যাদিকেই সংস্কৃতি গণ্য করেছেন। অথচ দুনিয়ার কোনো অভিধানেই সংস্কৃতির এ অর্থ নেয়া হয়নি, আর না আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সুপরিচিত বুদ্ধিজীবীদের নিকট কালচার সংস্কৃতির পরিধি এত সীমিত। সংস্কৃতির আরবী শব্দ 'ছাকাফাহ', এর মূল ধাতু ছাক্কুন। ছাকফুন শব্দের অর্থ কাটছাঁট করা। অর্থাৎ ডালপালা কেটেছেঁটে সুন্দর করা। এমনিভাবে আরবী তাহযীব শব্দের মধ্যেও গাছপালার তরতাজা পাতাগুলো কেটেছেঁটে পরিষ্কার করার অর্থ রয়েছে। আজকাল সমাজবিজ্ঞানে তাহযীব দ্বারা উদ্দেশ্য নেয়া হয় কোন ব্যক্তি কিংবা সমাজ পবিত্রতা ও মার্জিত আচার-আচরণের ভূষণে সজ্জিত হওয়া। আরবী ছাকাফাহ অর্থে ইংরেজীতে কালচার শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। 'কালচার শব্দটি গ্রীক ভাষা থেকে এসেছে। বেকন এটিকে পশ্চিমা বিশ্বে পরিচিত করেছেন। ইংরেজি কালচার শব্দের মধ্যেও কাটছাঁট করার অর্থ পাওয়া যায়। এগ্রিকালচার শব্দটিও কালচার থেকেই এসেছে। এ্যামারসনের মতে কালচারের মূল লক্ষ্য মানবতার সৌন্দর্য চেতনা জাগ্রত করা। আর্নলডের মতে, কালচার হলো এমন একটি বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ কর্ম, যার কাজ হলো মানব জীবনে সৌন্দর্য ও উজ্জ্বলতা সৃষ্টি করা। গয়েটের মতে সংস্কৃতির তিনটি অংশ রয়েছে, এক. বিশ্ব ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে অবগতি লাভ করা। দুই. সচ্চ চরিত্রের আদর্শ হওয়া, তিন, সুক্ষ্ম রুচি দ্বারা উপকৃত হওয়া। সংস্কৃতির উপরোল্লিখিত ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ পশ্চিমা বিশেষজ্ঞদের। কুরআন, সুন্নাহ ও ইসলামী বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য এখানে পেশ করা হয়নি, যাতে পাশ্চাত্য প্রভাবিত ও পাশ্চাত্যের যে কোনো চাকচিক্যপূর্ণ বস্তুকে খাঁটি সোনা ধারণকারী তথাকথিত বুদ্ধিজীবীদের নিকট সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, পশ্চিম থেকে আমদানীকৃত যে নাচ-গান, বাদ্য-বাজনা, অশ্লীল বিনোদন ও নগ্ন নারী দেহের প্রদর্শনকে আমরা সংস্কৃতি হিসেবে চালিয়ে দেই, সেগুলো পশ্চিমা বুদ্ধিজীবীদের কাছে আসল সংস্কৃতির শত ভাগের এক ভাগও নয়। ওপরের আলোচনা থেকে সুস্পষ্ট প্রতীয়মান হয়, চলমান অশ্লীলতা নগ্নতা পশ্চিমা বুদ্ধিজীবী চিন্তাবিদদের মতেও মোটেই সংস্কৃতি নয়। মূলতঃ এগুলো সংস্কৃতির নামে অপসংস্কৃতি।