📄 নগ্নতা অশ্লীলতার প্রসারে ভারতীয় মিডিয়ার ভূমিকা
প্রাচ্যের কবি আল্লামা ইকবাল ভারতীয় সমাজের একটি মৌলিক দুর্বলতা সরাসরি বর্ণনা করার পরিবর্তে এখানকার কবি, চিত্রশিল্পী এবং কাহিনীকারদের মেধা-মনন ও ধমনীতে যৌনতার প্রাবাল্যের উল্লেখ করেছেন। আর এটা এক বাস্তবও বটে। যৌনতা ভারতীয় সমাজের বৈশিষ্ট্য। ভারতের প্রাচীন ইতিহাসও যৌনতার প্রতি বিশেষ দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছে। ইলোরা, অজন্তা ও খাজুরায় অবস্থিত মূর্তি, ভাষ্কর্য এবং সেখানের ধর্মীয় গ্রন্থ, ধর্মীয় ব্যক্তিবর্গ, দেব-দেবীর ছবি, অংকন এবং তাদের যৌন কর্মকা েও এ বিষয়টা অসাধারণ প্রবল হয়ে ফুটে ওঠেছে। এমনকি প্রাচীন ভারতে যৌন সম্পর্ক ও মেলামেশা পবিত্রতার মর্যাদা অর্জন করেছিল, যার অনিবার্য প্রভাব-প্রতিক্রিয়া আধুনিক ভারতীয় সমাজে দৃশ্যমান। আধুনিক ভারতের কবি, সাহিত্যিক, গবেষক, বুদ্ধিজীবী এবং প্রাচীন ভারতের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সমাজব্যবস্থা, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের চিত্র অংকনকারী চলচ্চিত্র নির্মাতারা তাদের গবেষণায় যৌনতার এ বিষয়টিকে নতুন গতি ও ব্যাপকতা দান করেছে। আমরা ইসলামী ও নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে যেসব বিষয়কে নগ্নতা, অশ্লীলতা ও অনর্থক কর্মকা আখ্যা দেই এবং যেগুলোকে ইসলামের পবিত্রতা ও মর্যাদার খেলাফ মনে করি, সেগুলোকে ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ পবিত্র ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার মনে করে, যার মূল উৎস কামশাস্ত্র, ইলোরা, অজন্তা ও খাজুরার গুহা। মহাদেব ও কৃষ্ণের যৌন লীলা তাদের জন্য বাস্তব কর্মের নমুনা। সাধারণতঃ ধারণা করা হয়, ভারতে বর্তমান যৌনতা, নগ্নতা ও উলঙ্গপনার যে ছড়াছড়ি, তা পশ্চিম থেকে আমদানীকৃত চলচ্চিত্র, টিভি ও ডিশ এন্টিনার মাধ্যমে তা প্রসার লাভ করেছে-এ ধারণা ঠিক নয়; বরং যৌনতা নগ্নতার চলমান স্রোত ভারতের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। কারণ ভারত কয়েক শতাব্দী পূর্বে কামশাস্ত্রকে একটি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও তার আদলে নির্মিত ইলোরা, অজন্তা ও খাজুরার যৌন উত্তেজক মুর্তি ও ভাস্কর্যগুলোকে সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের মর্যাদা দিয়ে রেখেছে। কামশাস্ত্রের ব্রাক্ষণ লেখককে আজো ভারতীয় সমাজে যৌন গুরু নামে সম্মান করা হয়। খৃস্টীয় চতুর্থ শতাব্দীতে লেখা এই গ্রন্থ এক শতাব্দী পূর্বেও পাশ্চাত্যে নিষিদ্ধ ছিল। ভারত থেকে চোরাই পথে যাওয়া এ গ্রন্থ ইউরোপের বিভিন্ন পরিবারে খুব গোপনে পাঠ করা হত। বৃটেনে এই গ্রন্থ ১৯৬২ সাল থেকে হস্তগত হতে শুরু করে। আজ থেকে দেড় হাজার বছর পূর্বে ভারতে কামশাস্ত্রকে নাবালেগ স্কুল শিশুদের বালেগ বানানোর মাধ্যম মনে করা হতো। কামশাস্ত্রের একটি শিক্ষা হচ্ছে, অন্যের স্ত্রীকে কিভাবে ফুসলিয়ে অনৈতিক কাজে লিপ্ত করানো যায়। অনৈতিক ও প্রকৃতিবিরোধী যৌন কর্মকান্ড, সমকামিতা ও দেহ ব্যবসার এমন এমন পদ্ধতি এ গ্রন্থে উল্লেখ আছে, যার সামনে বর্তমান যুগের সকল পতিতাবৃত্তি, দেহ ব্যবসা ও বেশ্যাপনার সব রীতি-পদ্ধতি পানি পানি হয়ে যাবে। যদি একথা বলা হয়, ভারত ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় দিক দিয়ে একটি নগ্নতা, যৌনতা ও অশ্লীলতার প্রবক্তা দেশ, তাহলে সেটা অতিরঞ্জন হবে না। শুধু এটাই নয়; বরং কামশাস্ত্র যৌনতা এবং দেহকে অর্থ উপার্জনের মাধ্যম বানানোর জন্যে কয়েকটি মূলনীতি পেশ করে। অর্থ ও নারী বর্তমান যুগে যে ধ্বংসের কারণ, কামশাস্ত্রের নিকট সেটা গ্রহণযোগ্য বিষয়। এ ধ্বংস গ্রহণীয়। এ জন্যই সিনেমা, টিভি সিরিজ, নাটক, উপন্যাস, কাহিনী, পত্র-পত্রিকা, ম্যাগাজিন ও বিভিন্ন বই পুস্তকে যেভাবে নগ্নতা, যৌনতা, অশ্লীলতা ও দেহ ব্যবসাকে অত্যন্ত প্রমাণসিদ্ধ ও সজ্জিত আকারে ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক ঐতিহ্য হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, তা এখানকার সমাজব্যবস্থার অবিকল প্রতিচ্ছবি। অশ্লীল ম্যাগাজিন, সিনেমা ও যৌন সম্পর্কের ওপর নির্মিত সিরিজগুলোর সমর্থনে ভারতীয় মিডিয়া অত্যন্ত সক্রিয় এবং একে পবিত্রতার মর্যাদা দেয়ার জন্য সে তার সর্বশক্তি নিয়োগ করছে।
স্বাধীনতার পর থেকে ভারতে পশ্চিমা সিনেমার অনুকরণে যেসব সিনেমা নির্মিত এবং যেসব ম্যাগাজিন ও বই পুস্তক প্রকাশিত হয়েছে, তাতে ধীরে ধীরে অবৈধ যৌন সম্পর্কের সমর্থনে দলীল-প্রমাণ সরবরাহ করা হতে থাকে। ১৯৬০ সালের পর অবাধ স্বাধীন যৌন সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে অশ্লীল উপন্যাস লেখা শুরু হয়, কিন্তু তখন এগুলো অত্যন্ত গোপনীয়ভাবে সাপ্লাই করা হতো। তখনকার পরিবারের লোকেরা পারিবারিক সম্পর্ক ও পবিত্র সমাজব্যবস্থার ওপর নির্মিত সুস্থ পরিচ্ছন্ন ধারার সিনেমা দেখা খারাপ মনে করত না, কিন্তু সভ্যতা-সংস্কৃতি বিনিময়ের নামে পশ্চিমের যেসব সিনেমা আজ ঘরে ঘরে দেখানো হচ্ছে, তা ভারতের রুচি ও মেযাজই সম্পূর্ণ পাল্টে দিয়েছে। এসব পশ্চিমা সিনেমাগুলো প্রথমে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য নির্ধারিত ছিল, কিন্তু এখন তো বেশির ভাগ ভারতীয় সিনেমা প্রাপ্তবয়স্কদের জন্যই নির্মাণ করা হয়। প্রথমে এসব সিনেমা হলগুলোতে প্রদর্শন করা হতো। এখন তা ভিসিআর, ডিশ এন্টিনা ও ইন্টারনেটের সাহায্যে দীনী ও নৈতিক মূল্যবোধ পদদলিত করে প্রতিটি ঘরে ঘরে প্রদর্শন করা হচ্ছে। আজকের যুগের প্রতিটি ঘর এক একটি মিনি সিনেমা হল ও নগ্ন নাইট ক্লাবে পরিণত হয়েছে। নগ্ন সিনেমা ছাড়াও গোটা ভারতে বর্তমানে কমবেশি একশ'টি এমন পত্র-পত্রিকা ও ম্যাগাজিন বের হচ্ছে, যা নারীর পবিত্রতা ও তার সংশ্লিষ্ট চারিত্রিক মূল্যবোধের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব নগ্ন ও অশ্লীল মাগ্যাজিনের মধ্যে 'ফ্যান্টাসি' এমন একটি নাম, যা বর্তমানে চারিত্রিক ও নৈতিক মূল্যবোধের যেটুকু আওয়াজ অবশিষ্ট রয়েছে, সেটুকুও মাটিচাপা দিয়ে দিয়েছে। যদিও ম্যাগাজিনটি বর্তমানে তার প্রকাশের সপ্তম বর্ষে পদার্পণ করছে, কিন্তু ১৯৯৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে ম্যাগাজিনটি তখন সংবাদ মাধ্যমের শিরোনামে আসে, যখন তাতে এক স্কুল ছাত্রীর নগ্ন ছবি ছাপা হয়। রিপোর্ট অনুযায়ী দিল্লীর ষোল বছরের এক ছাত্রীকে কিছু ফটোগ্রাফার ফুসলিয়ে বিভ্রান্ত করে তার উলঙ্গ ছবি তোলে এবং সে ছবিগুলো ফ্যান্টাসির এক সংখ্যায় ছাপা হয়। কিশোরীর পিতা-মাতা যখন বিষয়টি পুলিশকে অবহিত করে তখন পুলিশ পত্রিকার সম্পাদক ও ফটোগ্রাফারদের গ্রেফতার করে, কিন্তু সামান্য কিছু জামানতের বিনিময়ে খুব দ্রুতই মুক্ত করে দেয়া হয়। এ ঘটনার পর গোটা মিডিয়া জগতে আলোচনার ঝড় ওঠে, ফ্যান্টাসি সম্পাদকের গ্রেফতার সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ওপর হামলা, অনৈতিক ও বেআইনী কাজের বিরুদ্ধে শিক্ষামূলক অভিযান? অথচ এ ধরনের নগ্নতা অশ্লীলতার প্রসার সমাজের জন্য কতটুকু বিষাক্ত এবং ধ্বংসাত্মক, সে আলোচনা মিডিয়ায় ওঠেনি। এ ঘটনার কয়েক মাস পরেই আবার দিল্লীর এক মহিলা উকিল নারী অঞ্জলী কাপুর তার নগ্ন দেহের ছবি ফ্যান্টাসিতে প্রকাশ করে। সে তার নগ্ন ছবি প্রকাশের পক্ষে প্রমাণ পেশ করেছে, নারী যদি তার চেহারা দেখাতে পারে তাহলে তার শরীরের অন্যান্য অংশ কেন দেখাতে পারবে না। এটি আমার শরীর। আমি আমার শরীরের সাথে যা ইচ্ছা তাই করব, তাতে কারো কিছু বলার অধিকার নেই। নারী অধিকার আন্দোলনের অন্যতম অগ্রগামী নেত্রী মধু কিশোর এক বিবৃতিতে বলেছেন, এসব নগ্ন অশ্লীল ম্যাগাজিনের বিরুদ্ধে হাঙ্গামা সৃষ্টির কোনো কারণই থাকতে পারে না।
ফ্যান্টাসি ছাড়াও ডেবোনোর নামক আরেকটি ইংরেজী পত্রিকা-যা দীর্ঘ দিন ধরে প্রকাশিত হয়ে আসছে, সে নগ্নতা অশ্লীলতার প্রসারে তার সকল শক্তি নিয়োগ করা সত্ত্বেও তথাকথিত উন্নতি ও প্রগতিপ্রিয়দের মাঝে অনেক জনপ্রিয়। এ দু'টি পত্রিকা ছাড়াও আরো দেড়শ'র বেশি পত্রিকা রয়েছে, যা গুজরাটী, হিন্দী, মিরাঠী, তামিল ও অন্যান্য ভারতীয় ভাষায় প্রকাশিত হচ্ছে এবং মানবিক, নৈতিক ও চারিত্রিক মূল্যবোধের সকল সীমা ডিঙ্গিয়ে ভারতীয় সমাজকে যৌনতার সমুদ্রে নিমজ্জিত করে চলেছে। আশ্চর্যের বিষয়, এগুলোর আবার রেজিস্ট্রারার অব নিউজ পেপারের পক্ষ থেকে রেজিস্ট্রেশনও রয়েছে।
ফ্যান্টাসির প্রচার সংখ্যা বর্তমানে আট লাখ ছাড়িয়ে গেছে। একই অবস্থা ডেবোনার নামক ইংরেজি ম্যাগাজিনেরও। শুধু এ দু'টিই নয়; বরং অশ্লীল নগ্ন পত্র-পত্রিকার সবগুলোরই প্রচার সংখ্যা কল্পনার থেকেও বেশি। এখন তো উপন্যাসগুলোতেও অশ্লীল আলোচনার পাশাপাশি নারী-পুরুষের ছবি থাকে, যাতে পাঠক অশ্লীল সাহিত্যে আত্মতৃপ্ত না হলে কমপক্ষে নগ্ন দেহের চিত্তহারী প্রদর্শনী দেখে চক্ষুর তৃপ্তি অর্জন করতে পারে।
জওহর লাল নেহরু ইউনিভার্সিটির এক রিচার্স স্কলার অরবিন্দ কুমার এসব অশ্লীল ম্যাগাজিন ও উপন্যাসগুলোর উলঙ্গ ছবি দেখে বলেন, এসব উলঙ্গ ও নগ্ন ছবিগুলো বিষের চেয়েও বেশি ভয়াবহ। এগুলো ধীরে ধীরে আমাদের নিঃশেষ করে দিচ্ছে। গবেষণায় তিনি স্বীকার করেছেন, আমার কামরায় ডজনকে ডজন অশ্লীল ম্যাগাজিন উপন্যাস ছাড়াও অসংখ্য অগণিত নগ্ন ছবির ছড়াছড়ি রয়েছে। এগুলো আমি দেখি ও পড়ি এবং এর প্রতিক্রিয়াস্বরূপ প্রকৃতিবিরোধী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নিজের স্বাস্থ্য ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছি। নগ্ন ছবি ও টিভি সিনেমায় উত্তেজিত হয়ে দু'জন স্কুল ছাত্র দিল্লীর এক স্কুল ছাত্রীকে অপহরণ করে জনমানবহীন অঞ্চলে নিয়ে গিয়ে তাকে পালাক্রমে ধর্ষণ করে এবং তাদের এ অনৈতিক কর্মকাণ্ড কে ক্যামেরায় ধারণ করে বিভিন্ন পত্রিকা ও ম্যাগাজিনের কাছে বিক্রি করে। মহারাষ্ট্রের জুলগাঁয়েও এমন এক ট্রাজেডির কথা জনসম্মুখে প্রকাশ পেয়ে যায়, যার ধারাবাহিকতা কয়েক বছর পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। কয়েক ডজন যুবক যুবতী স্বেচ্ছায় এ অনৈতিক কাজ চালিয়ে যেতে থাকে। অনুসন্ধানে এও জানা গেছে, উভয় পক্ষ আয়-রোজগার বাড়ানোর ধান্ধায় পারস্পরিক সম্মতিক্রমে এ কাজ করেছে। অনৈতিক কাজে লিপ্ত হয়ে বিভিন্নভাবে সেগুলো ক্যামেরায় ধারণ করে পরে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা ও ম্যাগাজিনের কাছে বিক্রি করে। যেমন ফ্যান্টাসির সম্পাদক এক সাক্ষাতকারে বলেছেন, 'আমরা কি করব, আমাদের নিকট বিবাহিত অবিবাহিত নারী, স্কুল কলেজের ছাত্রী, প্রাইভেট কোম্পানীতে উচ্চপদে কর্মরত যুবতী মেয়ে, এমনকি কুমারী মেয়েদের পিতা-মাতা পর্যন্ত ধারাবাহিক টেলিফোন করে এ ধরণের অশ্লীল ও নগ্ন ছবি প্রকাশ করার আবেদন করতে থাকে। কারণ তাদের আমদানীর একটা মাধ্যম দরকার।' বোম্বের এক বিবাহিত নারী বলে, আমি বিত্তশালী। আমার উলঙ্গ ও নগ্ন ছবি তোলার প্রচন্ড আগ্রহ রয়েছে। আমার স্বামী বলেন, তুমি যখন সুন্দরী, তখন তোমার সুন্দর দেহ অন্যকেও দেখাও, যাতে আমি গর্ব করতে পারি, আমিও একজন সুন্দরী নারীর স্বামী।
দিল্লীর খালসা কলেজের একুশ বছর বয়সের এক ছাত্রী বলে, 'মমতা কুলকারনী ও পূজাভাট যখন সিনেমায় অশ্লীল দৃশ্যে আবির্ভূত হয়, আর তাদের অভিনেতা-অভিনেত্রী বলা হয় এবং সমাজে তাদের সম্মানের দৃষ্টিতে দেখা হয়, তখন আমরা কেন আমাদের শরীরের নগ্ন প্রদর্শনী করতে পারব না। নগ্নতা প্রদর্শনের পক্ষে এমন দলীল-প্রমাণ খোশবস্তু সিংয়ের মতো খ্যাতিমান সাংবাদিকও দিয়ে থাকেন। ফ্যান্টাসি ও ডেবোনারের মতো অশ্লীল ম্যাগাজিন ও উপন্যাসগুলোর পক্ষে সাফাই গেয়ে বলেন, এসব পত্রিকা ও ম্যাগাজিন যৌনতা বঞ্চিত মানুষের বিরাট খেদমত করে যাচ্ছে, কিন্তু সম্ভবত তিনি জানেন না, এসব পত্র-পত্রিকা ও ম্যাগাজিন শুধু বিত্তশালীরাই পড়ে এবং এর দ্বারা তাদের যৌনতা স্তিমিত হওয়ার পরিবর্তে আরো উত্তেজিত হয়। ফলে আজ সমাজে যেনা ব্যভিচার ও ধর্ষণের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
অশ্লীল টিভি সিরিজ ও যৌন মেলামেশা সম্বলিত সিনেমা টিভিতে প্রদর্শনের পক্ষে ওকালতি করে জৈন টিভির মালিক ড. জে কে জৈন বলেন, আমরা সেক্স সম্বলিত সিনেমা টিভিতে প্রদর্শন করি, এতে দোষটা কোথায়। এ ধরনের উলঙ্গ দৃশ্য দেখে মানুষ ক্লান্ত হয়ে যাবে। ফলে যেনা ব্যভিচার ও ধর্ষণের ঘটনা এমনি এমনিই কমে যাবে।
এসব অশ্লীল ম্যাগাজিন এবং উপন্যাস ছাড়াও টিভিতে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর বিজ্ঞাপন এমন এমন ভঙ্গিতে দেখানো হয়, যাতে মানবতা লজ্জায় পানি পানি হয়ে যায়।১
📄 বিজ্ঞাপনের নমুনা
জাতীয় পত্র-পত্রিকাগুলোতে কামসূত্র নামক কনডমের বিজ্ঞাপনে বিশেষ বেপরোয়া দুঃসাহসিকতা প্রদর্শন করা হয়েছে। বিজ্ঞাপনের দৃশ্যে প্রায় ৯৫ ভাগ নগ্ন এক যুবক যুবতী এমন কর্মকা েলিপ্ত দেখানো হয়েছে, যা কেবল বেডরুমের একান্ত দৃশ্যই হতে পারে। সমুদ্র তীরে যুবক যুবতীকে যে অবস্থায় যে কর্মকা েলিপ্ত দৃশ্যে বিভিন্ন ভঙ্গিমায় পেশ করা হয়েছে, তা আমেরিকার প্রসিদ্ধতম প্লেবয় ও লেসমেকারের মতো পত্রিকার নগ্ন অশ্লীল ছবিগুলোকেও লজ্জিত করে।
এসব নগ্ন পত্র-পত্রিকা এবং সিনেমা ছাড়াও অশ্লীল সাহিত্য ভারতীয় সমাজকে যৌনতা, নগ্নতা ও অশ্লীলতার এমন এক সেচ্ছাচারিতা উপহার দিয়েছে, যাকে পশ্চিমা দেশে Spuose Swap-Hing অথবা Couple Exchange বলে।
কিন্তু এ ফ্যাশন এখন শুধু পশ্চিমেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং ভারতও তার প্রাচীন মতবাদ 'ষোল স্বামী এক স্ত্রী'র ভিত্তিতে নতুন আঙ্গিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
ইন্ডিয়া টুডে'র এক জরিপ অনুযায়ী ভারতের বড় বড় শহরগুলোতে ব্যাপক আকারে বাধাহীনভাবে দুর্দান্ত প্রতাপের সাথে এসব অশ্লীল, অনৈতিক ও যৌন কর্মকা চলছে। এ ক্ষেত্রে অশ্লীল ম্যাগাজিনগুলো কি ব্যাপক ভূমিকা রাখছে, তা নিম্নের বিজ্ঞাপন দ্বারা সহজেই অনুমিত হয়। এসব বিজ্ঞাপন বহুল প্রচারিত অশ্লীল পত্রিকা ও ম্যাগাজিনগুলোতে নিয়মিত ছাপা হচ্ছে।
আমার নাম রবীন্দ্র মোহন। আমার বয়স পঁচিশ বছর। শিক্ষাগত যোগ্যতা এম.এ। আমার স্ত্রীর নাম সুনীতা। তার বয়স বিশ বছর। আমরা অত্যন্ত উদার ও প্রশস্ত দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী। আমরা উলঙ্গ সিনেমা অশ্লীল ম্যাগাজিন দেখতে খুব ভালভাসি। স্বামী স্ত্রীর সম্পর্কের ভিত্তিতে আমরা পরস্পরকে যৌন রহস্য সম্পর্কে ওয়াকিফহাল ও স্বাদ উপভোগ করাতে পারি এবং একের স্ত্রী অপরজন ব্যবহার করতে পারি। আপনি যদি আপনার স্ত্রীকে আমার স্ত্রীর সাথে বিনিময় করতে চান তাহলে নিম্নের ঠিকানায় যোগাযোগ করুন।
ফ্যান্টাসির শুধু একটি সংখ্যার 'কলম বন্ধুত্ব' কলামে এ ধরনের বায়ান্নটি বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হয়েছে। পত্রিকার সম্পাদকের বক্তব্য হলো, প্রতিটি বিজ্ঞাপনের জবাবে কমপক্ষে দশটি জবাবী পত্র আমরা অবশ্যই পেয়ে থাকি।
১৯৯৪ সালের এপ্রিল সংখ্যায় এ ধরনের সত্তরটি বিজ্ঞাপনের জবাবে ছয়শ' উদার দৃষ্টিভঙ্গির স্বামী স্ত্রীর জবাব পাওয়া গেছে।
বি, এম: এ্যাডেস ও মোম্বাই আইয়েট-এর মতো অশ্লীল ম্যাগাজিনের একটি সংখ্যায় এ ধরনের ছয়শ' বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হয়। ফিসোলিস, পাল্লে দে এবং গায়েজ এন্ড গার্লসে মুদ্রিত এসব বিজ্ঞাপন নগ্নতা ও অশ্লীলতায় সীমাহীন প্রবৃদ্ধি ঘটিয়ে চলেছে। এর বাস্তব প্রদর্শনী বড় বড় হোটেলগুলোতে স্ত্রীদের বিনিময় চাবির বিনিময়ের আকৃতিতে হচ্ছে এ সাধারণ যৌন মেলামেশায় না বয়সের আর না আত্মীয়তার শর্ত আছে। অসংখ্য নওজোয়ান এ কথা স্বীকার করেছে, তারা এই বিনিময়ে আপন বোন, চাচী, ভাতিজী, ভাগিনী, এমনকি আপন মেয়েদের সাথেও যৌন কর্মে পরিতৃপ্ত হয়েছি। তাদের কথা হলো, জীবন স্বল্প সময়ের জন্য। এই স্বল্প সময়ে যেভাবে ইচ্ছা উপভোগ করে নাও। এ হিসেবে আমাদের সন্তানরাও তো যুবক যুবতী। তাদেরও প্রবৃত্তির চাহিদা আছে। তাদেরও অবাধ স্বাধীন মেলামেশার সুযোগ সরবরাহ করা উচিত। আমরা যখন স্বাধীন তখন আমাদের সন্তানদেরও স্বাধীন ছেড়ে দেয়া কর্তব্য। তারা তাদের পথ অবলম্বনে তেমনি স্বাধীন, যেভাবে আমরা স্বাধীন। ইন্ডিয়া টুডে'র রিপোর্টার সবশেষে এ কথার ওপর তার রিপোর্টের ইতি টেনেছে, 'মোটকথা আমাদের তো একথা প্রমাণ করতেই হবে, ভারত কামশাস্ত্রের ভূ-খণ্ড'।
যে ভূ-খণ্ডে যৌন স্বাধীনতা ও মেলামেশাকে পবিত্রতার মর্যাদা দেয়া হয়েছে, সে ভূ-খন্ডে যদি এ ধরনের ম্যাগাজিন ও পত্র পত্রিকা প্রকাশিত হয়, তাও আবার সরকারী পৃষ্ঠপোষকতায় ও বুদ্ধিজীবীদের সমর্থনে এবং সেসব পত্র-পত্রিকায় খোলা যৌন স্বাধীনতার আহবান জানানো হয়, তাহলে এটা কোনো আশ্চর্যের বিষয় নয়। এমনিভাবে উভয় পক্ষ যদি স্বেচ্ছায় এসব অনৈতিক কর্মকান্ডে লিপ্ত হয় তবে সেটা পাকড়াও করার বিষয় হবে না। যেমন পশ্চিমের ধাঁচে গড়া ভারতীয় আইন এ কথাই বলে। এমতাবস্থায় জোরপূর্বক সতীত্ব বিনাশ প্রবৃদ্ধি ও ব্যাপকতার ওপর প্রতিবাদ করার কোন অর্থ থাকে না। আর না এটাকে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের জন্য কোনো বিপদ বিপর্যয় আখ্যা দেয়া যেতে পারে। কারণ তাদের দৃষ্টিতে এটি একটি পবিত্রতম কাজ এবং তারা তাদের উপাসকদের এক বিরাট অংশকে অবাধ যৌন স্বাধীনতার নমুনা হিসেবে উপস্থাপন করে। এটা তো সঙ্গীন সমস্যা মুসলমানদের, যারা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তাদের প্রতিবেশি ও বন্ধু। তারা জীবনের বহু বিষয়, লেনদেন, আকীদা-বিশ্বাস এবং সামাজিক ও নৈতিক বিষয়াবলীতে তারা নিজেদের বহু শতাব্দীকালের প্রতিবেশী বন্ধুদের দ্বারা প্রভাবিত। পশ্চিমা শিক্ষা কারিকুলাম ও অশ্লীলতার উত্তাল তরঙ্গ মুসলিম সমাজের ঐক্যের অটুট বন্ধন একটি সীমা পর্যন্ত বিক্ষিপ্ত করে দিয়েছে।
ভারতে মুসলমানদের আগমনের পর থেকে এখানকার সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ আকীদা, বিশ্বাস, পারস্পরিক লেনদেন, সামাজিক, চারিত্রিক ও নৈতিক বিষয়াবলীতে মুসলমানদের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল। যতদিন পর্যন্ত মুসলমানরা এখানে শাসনকার্য পরিচালনা করেছে ততদিন পর্যন্ত তাদের সভ্যতা-সংস্কৃতির প্রভাব-প্রতিক্রিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ওপর পতিত হয়েছে। সাম্রাজ্যবাদের আগমনরে পর যেমনিভাবে মুসলমানদের সামাজিক অবকাঠামো প্রভাবিত হয়েছে, তেমনি হিন্দুদের সমাজও কামশাস্ত্রের উত্তাল তরঙ্গের শিকার হয়েছে। মুসলমানদের নিকট তো পরিবর্তিত অবস্থায়ও আল্লাহর ভয়, লজ্জা-শরম, সতীত্ব ও পবিত্রতার সুস্পষ্ট কল্পনা এবং শক্তিশালী চারিত্রিক সীমারেখা, দাম্পত্য জীবনের সুদৃঢ় নীতিমালা ও নবী-রাসূলের নমুনা বিদ্যমান আছে, আছে হালাল-হারামের পার্থক্য, কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের নিকট না আছে ইবাদত-বন্দেগী, না আছে আকীদা-বিশ্বাস, না আছে হালাল-হারামের পার্থক্য আর না আছে চারিত্রিক ও নৈতিক মূল্যবোধের সীমারেখা। আধুনিক পশ্চিমা শিক্ষাব্যবস্থা মুসলিম উম্মাহর শক্তিশালী সুদৃঢ় পারিবারিক ব্যবস্থায় ফাটল ধরানোর প্রাণান্তকর প্রয়াস চালিয়েছে। এমনিভাবে সহশিক্ষা ব্যবস্থা অমুসলিমদের সাথে বিয়ে শাদীর কিছু দৃষ্টান্তও সৃষ্টি করেছে। মজবুত পর্দা ব্যবস্থার পর বেপর্দার সয়লাব এসেছে। আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা শুধু আধুনিক শিক্ষিত শ্রেণীরই নয়; বরং ঐতিহ্যগতভাবে দীনদার ঘরানার মজবুত দুর্গেও ফাটল ধরানোর প্রচেষ্টায় সফল হয়েছে। আরব বিশ্বে উপার্জিত অঢেল বিত্ত-বৈভব ও ডিশ এন্টিনার কালচার মুসলিম সমাজের শক্তিশালী খুঁটিগুলো দুর্বল করে দিয়েছে। ভারতীয় মুসলমানরা যৌন ও নৈতিক অপরাধে কতটুকু অগ্রগামী, তার রেকর্ড তো আমাদের নিকট নেই, তবে প্রতিবেশী মুসলিম দেশ পাকিস্তানের সমাজব্যবস্থা সম্পর্কে সর্বশেষ যে জরিপ আমাদের সামনে রয়েছে, সে অনুযায়ী পাঞ্জাব প্রদেশে গত এক বছরে চারিত্রিক ও নৈতিক অপরাধের সূচক যে অসাধারণ দ্রুততার সাথে ওপরের দিকে ওঠেছে, তা প্রতিবেশী হিন্দুদের থেকে কোন অংশে কম নয়।
টিকাঃ
১ টিভিতে পরিবার পরিকল্পনার বিজ্ঞাপন যে নগ্নতার ভঙ্গিতে দেখানো হয়, তা সম্পূর্ণ বেডরুমের দৃশ্য। শিশু কিশোদের ওপর এর যে প্রভাব-প্রতিক্রিয়া পড়ে, তারা পিতা-মাতার নিকট যেভাবে প্রশ্ন করে এবং 'একটি হলে ভালো হয়, দু'টির বেশি নয়' কথাটি এমনভাবে তাদের মন মস্তিষ্কে বসে যায়, যাতে পিতা-মাতার কোলে তৃতীয় আরেকজনের আগমনে তারা ঘৃণা ও অসন্তোষ প্রকাশ করতে থাকে। মিসরে দুই ভাই মিলে তাদের নবজাত তৃতীয় ভাইকে গলা টিপে হত্যা করে। হত্যার পর এই নিষ্পাপ শিশুরা উত্তর দিয়েছে, তৃতীয় জনকে আমরা মেনে নিতেই পারি না। ভারতীয় টিভিতে কনডমের বিজ্ঞাপনে ধর্মীয় রং প্রলেপ করা হয়েছে। অভিযোগ করা হলে তারা উত্তর দিয়েছে, এর চেয়েও তো বেশি যৌন সুড়সুড়িমূলক ছবি আমাদের মন্দিরগুলোতে রয়েছে। সূত্র: কওমী আওয়াজ-১৯৯৬ সালের ১২ই জানুয়ারী সংখ্যায় প্রকাশিত ড. রফীক খানের নিবন্ধ-'বিজ্ঞাপন ও সমাজ'।
📄 বিশ্ব সভ্যতায় ভারতের অবস্থান
দিল্লী থেকে প্রকাশিত মাসিক ইউজানার ১৯৯৫ সালের আগস্ট সংখ্যায় ড. সবিতা বাখেরীর একটি সার্ভে রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। তাতে তিনি ভারতীয় সমাজে সিনেমার ইতিবাচক ও নেতিবাচক প্রভাব-প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে লোকদের নিকট যেসব প্রশ্ন করেছেন এবং লোকেরা তার যেসব জবাব প্রদান করেছে, সেগুলো বিশ্লেষণ করে তিনি যে ফলাফল বের করেছেন তা নিম্নরূপ-
ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া: সিনেমা আনন্দ-বিনোদন, আমোদ-প্রমোদ, জ্ঞান-গবেষণা এবং আত্মিক ও মানসিক প্রশান্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া: সিনেমা অশ্লীল মূল্যবোধের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ, যৌনতা অশ্লীলতার প্রসার, সামাজিক ও নৈতিক অপরাধে প্রবৃদ্ধি, বাস্তবতার পরিবর্তে অলীক স্বপ্নের জগতে বিচরণ, বাস্তব সমস্যা সংকটের মোকাবেলা ও সমাধান করার পরিবর্তে ধ্বংসাত্মক কর্মকান্ডে উৎসাহিত করা, গুন্ডামি, সন্ত্রাস, হত্যা, ব্যভিচারসহ অন্যান্য চারিত্রিক ও নৈতিক অপরাধে জড়িয়ে পড়া এবং যারা এসব অপরাধে জড়িয়ে আছে তাদের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করা এবং সামাজিক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাপারে ঘৃণা সৃষ্টি করার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎস।
উক্ত জরিপে বলা হয়েছে, ৩৩% লোকের অভিমত, সিনেমা দেখায় আত্মিক প্রশান্তি লাভ হয়, ২৭% লোকের অভিমত, সামাজিক বিপর্যয় ও যৌন উত্তেজনা সৃষ্টিতে সিনেমা বিরাট ভূমিকা পালন করে, ৩৪% লোকের অভিমত দশ বছর পূর্বেও সিনেমা বিনোদনের মাধ্যম ছিল, কিন্তু এখন তা যৌন ও চারিত্রিক বিপথগামিতা, সন্ত্রাস ও বিশৃংখলা শেখানোর একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।
উক্ত জরিপে শুধু দিল্লীর যে রিপোর্ট পেশ করা হয়েছে তা কোনো মন্তব্য ছাড়াই আমরা এখানে পেশ করছি। এ দ্বারাই আপনি অনুমাণ করতে পারবেন, ভারতীয় সমাজ কোনো কর্দমে ফেঁসে যাচ্ছে। সাপ্তাহিক দাওয়াতে দিল্লী তার এক সংখ্যায় 'এটা ভারতের সংবাদ' শিরোনামে নিম্নের সংবাদগুলো উপস্থাপন করেছে-
ক. ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা তার মেয়ের সাথে অনৈতিক কাজে লিপ্ত হয়েছেন।
খ. ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের পরিকল্পনা মন্ত্রী দীর্ঘ দিন যাবত তার মেয়ের সাথে অনৈতিক কাজ করে আসছেন।
গ. নয়াদিল্লীর আদালতের ম্যাজিস্ট্রেট এস. এস. মালহোত্রা জোরপূর্বক ব্যভিচার সংক্রান্ত এক মামলার তদন্তের বাহানায় তার সরকারী চেম্বারে মজলুম নারীর প্রতি হস্ত সম্প্রসারিত করেছেন।
ঘ. ভারতের একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতা সীতা প্রকাশ যাদবকে এ জন্য গ্রেফতার করা হয়েছে, সে তার নিজের মেয়ের সাথে অনৈতিক কাজ করার পর তাকে হত্যা করে প্রতিবেশীর বাড়ীর নিকটে ফেলে রেখেছে। তার মেয়ের বয়স ছিল আট বছর। এই নেতা ইতোপূর্বেও তার ভাড়া বাড়ীর মালিকের বোনের সতীত্বহানি করেছে।
ঙ. মাসিক কওমী আওয়াজের রিপোর্ট অনুযায়ী উত্তর প্রদেশের এক গ্রামের এক লম্পট ব্যক্তি জং বাহাদুর সিং তার বিধবা পুত্রবধুর সাথে, এরপর তালাকপ্রাপ্তা যুবতী মেয়ে এবং নাতনীর সাথেও জোরপূর্বক অবৈধ যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেছে। লম্পট পিতার এ কর্মকাণ্ডে ক্ষুদ্ধ হয়ে তালাকপ্রাপ্তা মেয়ে ভাড়াটিয়া খুনী দিয়ে তাকে হত্যা করিয়েছে।
দিল্লীর পুলিশ কমিশনার ১৯৯৫ সালে তার বছর শেষের কার্যক্রম বিশ্লেষণ করতে গিয়ে এ বাস্তবতা স্বীকার করেছেন, ১৯৯৪ সালের তুলনায় ১৯৯৫ সালে অপরাধের হারে ২৪% প্রবৃদ্ধি ঘটেছে। আরও প্রকাশ থাকে, কেবল ২০% অপরাধ পুলিশের রেকর্ডে লিপিবদ্ধ করা হয়। পুলিশ কমিশনার একথাও বলেছেন, পুলিশের হেফাযতে নেয়া অপরাধীদের মধ্যে ৮৮% এমন যারা প্রথমবার মাত্র অপরাধ করেছে। পূর্বে তাদের অপরাধের কোনো রেকর্ড নেই।
যদি অপরাধের কারণ ও প্রেক্ষাপট অনুসন্ধান করা হয় তাহলে নিম্নবর্ণিত কারণগুলো সামনে আসে-
ক. অশ্লীল ও নগ্ন সিনেমা, খ. টিভি সিরিয়াল, গ. চরিত্রবিধ্বংসী অশ্লীল ম্যাগাজিন, পত্র-পত্রিকা ও বই পুস্তক, ঘ. নাইট ক্লাব ও হোটেলগুলোতে নগ্ন অর্ধনগ্ন নারী নৃত্য ও ড্যান্স. ঙ. যৌন সুড়সুড়িমূলক পোস্টার ও ছবি, চ. যৌন উত্তেজক বিজ্ঞাপন, ছ. অর্ধনগ্ন লেবাস পরে নারীদের অবাধ চলাফেরা, জ. সহশিক্ষা, ঝ. বাজার, ক্লাব, স্কুল, কলেজ, পার্ক ও বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে নারী পুরুষের অবাধ মেলামেশা এবং ঞ. মাদক ও নেশাজাত দ্রব্যের ব্যাপক প্রসার।
📄 বড়দের পদাঙ্ক অনুসরণে ছোটরা
দৈনিক পাইওনিয়ার দিল্লী, ৭ সেপ্টেম্বর-১৯৯৪ এবং দৈনিক টাইমস অফ ইন্ডিয়া-১৯৯৬ সালের ডিসেম্বর সংখ্যায় লাখনৌ, দিল্লী ও উত্তর প্রদেশের অল্প বয়স্ক শিশুদের অপরাধ সংক্রান্ত একটি বিস্তারিত রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে, যা দ্বারা সহজেই অনুমিত হয়, নতুন প্রজন্ম কোন পথে ধাবমান।
উক্ত রিপোর্ট অনুযায়ী দিল্লীতে প্রতিমাসে দুই হাজার অবিবাহিত মেয়ে গর্ভপাত ঘটায়। দিল্লীর বিভিন্ন আদালতে ধর্ষণের ৮৯৩টি মামলা বিচারাধীন। ১৯৯৬ সালে গোটা দেশে চল্লিশ হাজার ধর্ষণের ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। অথচ ৯০% ধর্ষণের ঘটনা বদনামের ভয়ে থানায় ডায়েরী করা হয় না। ২
দিল্লী থেকে প্রকাশিত দৈনিক পাইওনিয়ার ক্রাইম কমিশনারের উদ্ধৃতি দিয়ে লেখেছে, তের বছরের এক স্কুল ছাত্র ব্যাগে করে ছুরি নিয়ে এক ব্যাংকে ঢুকে ক্যাশিয়ারকে চাকু দেখিয়ে বলেছে, সব টাকা পয়সা দিয়ে দাও। তিন জন অল্প বয়ষ্ক ছাত্র বাইশ বছরের এক ছাত্রীর সতীত্বহানি করে। মেয়েদের উত্ত্যক্ত করা, বিবাহিত ও অবিবাহিত মেয়েদের বিনোদনমূলকভাবে অপহরণ করে গাড়ীতে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া, বিনোদন ও পয়সার জন্য গাড়ী চুরি করা, নারীদের গলার স্বর্ণের অলংকার ছিনিয়ে নেয়া ইত্যাদি দিল্লীর অল্প বয়স্ক ছেলেদের নিত্য-নৈমিত্তিক অপরাধ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী যৌন অপরাধ ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড স্যাটেলাইট ও টিভির মাধ্যমে প্রসার হচ্ছে। খেলাধুলার সংবাদ সম্প্রচারক টিভি এবং ইন্টারনেট সোনায় সোহাগার কাজ করেছে। অল্প মূল্যে লগ্ন ছবি সম্বলিত সাহিত্য ও সিনেমার ভিসিডি প্রত্যেক রোডে রোডে, অলিতে গলিতে ও মোড়ে মোড়ে পাওয়া যাচ্ছে।
বিত্তশালী পরিবারের সাত নওজোয়ানকে সামাজিক অপরাধে এবং আট জনকে কার চুরির অপরাধে গ্রেফতার করা হয়েছে। দু'জন অল্প বয়স্ক ছেলে এক মাসের মধ্যে তাদের এলাকা থেকে এগারটি কার চুরি করেছে। শুধু পশ্চিম দিল্লীতেই ১৯৯৩ সালে মেয়েদের উত্যক্ত করার অপরাধ উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। গ্রেফতারকৃত নওজোয়ানদের সংখ্যা একশ' দশ। এর মধ্যে ২৪ জনের বিরুদ্ধে ধর্ষণ, ২৫ জনের বিরুদ্ধে হত্যা, ২৭ জনের বিরুদ্ধে হত্যার ষড়যন্ত্র, ২০ জনের বিরুদ্ধে ডাকাতি এবং ১৪ জনের বিরুদ্ধে মেয়েদের উত্ত্যক্ত করা ও তাদের গলা থেকে স্বর্ণালংকার ছিনিয়ে নেয়ার অভিযোগে মামলা করা হয়েছে। এসব নওজোয়ানের ৯৫%-ই বিত্তশালী পরিবারের। ১৯৯১ সালে পাঁচ জন শিশুকে হত্যার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছে। এদের চার জনের বয়স ১২ থেকে ১৬ বছরের মধ্যে। ১৯৯২ সালে নয় শিশুকে হত্যার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়। তাদের সাত জনের বয়স ১৬ বছরের নিচে। পুলিশ কমিশনার এসব অপরাধের কারণের ওপর আলোকপাত করে বলেন, শিশুদের বাড়ীতে তেমন একটা দেখাশোনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় না। পিতা-মাতা যার যার কাজে ব্যস্ত থাকে। পারিবারিক ঐক্য-বন্ধন বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্ত হয়ে চলেছে। সামাজিক ও চারিত্রিক মূল্যবোধ নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। যেটুকুও বা অবশিষ্ট ছিল ক্যাবল টিভি সেটুকুও শেষ করে দিয়েছে। এদিকে একবছর ধরে ইন্টারনেট ধ্বংস আরো বৃদ্ধি করে দিয়েছে। চলমান পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে আমাদের ভবিষ্যদ্বাণী হচ্ছে, ক্রমেই অবস্থা খারাপ থেকে খারাপতর থাকবে।
মহিলা সাংবাদিক মঞ্জরী মিশ্রের টাইমস অফ ইন্ডিয়ায় প্রকাশিত একটি রিপোর্ট চমকে দেয়ার মতো এবং উপদেশমূলকও। উক্ত রিপোর্টের সারকথা হচ্ছে, অপরাধকর্ম সংঘটকদের বেশির ভাগই এখনো কৈশরের সীমা অতিক্রম করেনি, কিন্তু তাদের মেধা মস্তিষ্ক যথেষ্ট কাজ করে। পাশ্চাত্যের অনুকরণে তারা সর্বোত্তম বস্তু চায়, তাও কোনো বিলম্ব ছাড়াই, তা যেভাবেই লাভ হোক। গু। বদমাশদের যথারীতি সুসংঘটিত দল তো এখন বিলীয়মান। এখন অল্প বয়সী যুবকদের ব্রিগেড সে জায়গা দখল করে নিয়েছে। সুতরাং প্রাদেশিক শহরগুলোতে অপরাধ সংঘটনে বিশ বছরের কম বয়সী ছেলেদের অগ্রগামী দেখা যায়। উত্তর প্রদেশের রাজধানী লাখনৌতে চুরি, ডাকাতি, ধর্ষণ, অপহরণ, মেয়েদের উত্ত্যক্ত করা ও তাদের গলা থেকে অলংকার ছিনিয়ে নেয়া ইত্যাদিতে বেপরোয়া হয়ে ওঠেছে। প্রতিটি শহরেরই একই অবস্থা। রিপোর্টে আরো বলা হয়েছে, ১৬ থেকে ১৮ বছরের শিশু-কিশোরদের এ সিন্ডিকেট-যাদের বিভিন্ন অপরাধে গ্রেফতার করে উত্তর প্রদেশের জেলে পাঠানো হয়েছে, তাদের সংখ্যা ১৯৯৩ সালে ছিল মাত্র ১৬ জন, কিন্তু ১৯৯৫ সাল আসতে না আসতেই তাদের সংখ্যা এসে দাঁড়ায় এক হাজার তিনশ' পঁচাত্তরে। আর ত্রিশ বছরের ঊর্ধ্বে যাদের বয়স তাদের সংখ্যা ছিল ১৯৯৩ সালে এক লাখ বিশ হাজার চারশ' বিয়াল্লিশ জন, কিন্তু ১৯৯৫ সালে এ সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় এক লাখ ছাব্বিশ হাজার নয়শ' একাত্তর জনে। লাখনৌতে নারীদের গলার চেইন ছিনতাইয়ের ৯০ শতাংশ এবং মোটর গাড়ী চুরির ৭৫ ভাগ ঘটনার সাথে জড়িত সকলেই অল্প বয়ষ্ক শিশু-কিশোর এবং বিত্তশালী পরিবারের ছেলে সন্তান।
ইন্দিরা নগর ব্যাংক ডাকাতিসহ অন্যান্য বারটি ডাকাতির ঘটনার সাথে লাখনৌ ইউনিভার্সিটি ও ইউনিভার্সিটি সংযুক্ত কলেজের ছাত্ররা জড়িত ছিল। সতের বছরের এক ছাত্র স্বীকার করেছে, নারীদের গলা থেকে স্বর্ণের চেইন সে এজন্য ছিনতাই করত যে, এর দ্বারা সে মোটর সাইকেল কিনবে। যখন তার এ আশা পূরণ হয় তখন দামী দামী ফাইভ স্টার হোটেলে নারীদের নিয়ে ডিনার খাওয়া ও বিনোদনের জন্য গলার চেইন ছিনতাই শুরু করে। যৌন অপরাধেও এ ধরনের শিশু কিশোররা অগ্রগামী; বরং এ ধারায় ক্রমাগত প্রবৃদ্ধি ঘটছে। টাইমস অফ ইন্ডিয়ার মহিলা সাংবাদিকের ভাষ্যমতে এসবই ক্যাবল টিভি ও তথ্য-প্রযুক্তির বিস্ফোরণের ফল।
প্রতিবছর দিল্লীর অপরাধ বিষয়ক পুলিশ কমিশনার দিল্লীতে সংঘটিত সকল অপরাধের রিপোর্ট জারি করেন এবং বিগত বছরের সাথে তুলনামূলক বিশ্লেষণ করেন। ১৯৯৫ ও ১৯৯৬ সালে সংঘটিত অপরাধ সম্পর্কে তুলনামূলক বিশ্লেষণ করতে গিয়ে পুলিশ কমিশনার বলেন, ১৯৯৫ সালে সংঘটিত অপরাধের তুলনায় ১৯৯৬ সালে ২৫% প্রবৃদ্ধি ঘটেছে। ১৯৯৫ সালে দিল্লীর বিভিন্ন আদালতে বোমা হামলা, হত্যা, অপহরণ, পতিতাবৃত্তি, ধর্ষণ ইত্যাদি সংক্রান্ত মামলার সংখ্যা ছিল ৪৫ হাজার ৩ শ' ৬৪টি। আর ১৯৯৬ সালে এ সংখ্যা দাঁড়ায় ৬৫ হাজার। দু'বছরের মধ্যে এফ.আই.আর-এর সংখ্যায় ৮৮% প্রবৃদ্ধি ঘটে। ভারতে যে কত দ্রুত অপরাধ বাড়ছে, তা ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরোর ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৬ সালের তৈরিকৃত রিপোর্ট সহজেই অনুমান করা যায়। এ রিপোর্টে বলা হয়েছে, ইন্ডিয়ান প্যানাল কোডের অধীন অপরাধের সংখ্যা দেশের ৩৩টি বড় শহরে উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। এসব শহরে ১৯৯৪ সালে অপরাধের সংখ্যা ছিল ২ লাখ ৩০ হাজার ৪ শ' ৬৯টি, ১৯৯৫ সালে ২ লাখ ৪৭ হাজার ৯ শ' ৩০ এবং ১৯৯৬ সালে এসে দাঁড়ায় ২ লাখ ৫৩ হাজার ৫৭। দেশের যে চারটি বড় শহরে অপরাধের হার রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে, সেগুলো হলো দিল্লী, মোম্বাই, আহমদাবাদ ও ব্যাঙ্গালোর। দিল্লীতে ৪.২১%, মোম্বাইতে ৮.১২%, আহমাদাবাদে ৬% এবং ব্যাঙ্গালোরে ৪.১১%। এ চারটি বড় শহরে যে পরিমাণ অপরাধ সংঘটিত হয়েছে তা গোটা দেশে সংঘটিত অপরাধের অর্ধেক। শুধু ১৯৯৭ সালে দিল্লীতে সংঘটিত অপরাধের ধরন ও সংখ্যা নিম্নরূপ-
০১. ধর্ষণের ঘটনা-১৪ হাজার ৯ শ' ৯৮টি, অথচ ধর্ষণের ঘটনা সরকারী রেকর্ডে কেবল ১০%ই লেখানো হয়।
০২. মেয়েদের যৌন উত্ত্যক্তকরণ ও ধর্ষণের চেষ্টা সংক্রান্ত অপরাধ ২৭ হাজার ৯ শ'।
০৩. গৃহপরিচারিকা ও নিকটাত্মীয়ের সতীত্ব হানি সংক্রান্ত অপরাধ ৭০ হাজার ৬ শ' ৫২।
০৪. যৌতুকের কারণে মৃত্যুর সংখ্যা ৪ শ' ২০।
দিল্লীতে নারী সংক্রান্ত অপরাধের হার প্রতি লাখে ১.৩২% আর গোটা দেশে প্রতি লাখে ৫.৯% হয়ে গেছে। জাতীয় হারের তুলনায় শুধু দিল্লীতে নারীদের যৌন হয়রানির হার দ্বিগুণ এবং কন্যা শিশুদের চার গুণ বেশি। ১৯৯৬ সালের জরিপ অনুযায়ী যেনা-ব্যভিচার ও ধর্ষণের ঘটনা বেশির ভাগ নিকটাত্মীয়দের সাথে সংঘটিত হয়, এর হার ৮৮%। গোটা দেশে নারী নির্যাতনের যত ঘটনা সংঘটিত হয়, তার মধ্যে ১৮% শুধু দিল্লীতেই সংঘটিত হয়। এছাড়াও মেয়েদের অপহরণ, ধর্ষণ ও উত্ত্যক্ত করার ঘটনা গোটা দেশের তুলনায় দিল্লীতে ছয় গুণ বেশি। ৩ গর্ভপাতের আধিক্যের কারণে দিল্লীতে নারী পুরুষের হারেও পার্থক্য এসে গেছে। নারীর তুলনায় পুরুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে এক হাজার পুরুষের মোকাবেলায় নারীর সংখ্যা ৯ শ' ২৯ জন।৪
অন্য সব নৈতিক চারিত্রিক অপরাধের পাশাপাশি মাদক অপরাধেও লন্ডন এবং ওয়াশিংটনের সাথে দিল্লীর প্রতিযোগিতা রয়েছে। ১৯৯৬ সালের এক সরকারী জরিপে মাদকের ফল পর্যালোচনা করে নিম্নরূপ সংখ্যা উল্লেখ করা হয়েছে। দিল্লীতে ৩৫% থেকে ৭০% বন্দী মদপানের কারণে শাস্তি ভোগ করছে। ৬০% যৌন অপরাধ মদের কারণে সংঘটিত হয়, ৬৯% ধর্ষণের ঘটনা নেশাজাত দ্রব্য ব্যবহারের কারণে ঘটে, ৫০% চুরির ঘটনা মদের কারণে, ৮০% তালাকের ঘটনা মদের কারণে সংঘটিত হয় এবং ৯০% সড়ক দুর্ঘটনা মদ পান করে গাড়ী চালানোর কারণে ঘটে। এগুলো তো সেসব অপরাধ যা সরকারী খাতায় রেকর্ড রয়েছে। তাও আবার কেবল দিল্লীর একটি মাত্র শহরের। এছাড়া সরকারী বেসরকারী হিসাব মতে আরো কত অপরাধ রয়েছে যার কোনো ইয়াত্তা নেই। তার মধ্যে ধোকা প্রতারণা, ঘুষ দেয়া খাওয়া, সরকারী তহবিল লুটপাট, দুর্নীতি, কাজে চুরি, টেলিফোন, বাণিজ্য, কৃষি ও অন্যান্য সরকারী বেসরকারী প্রতিষ্ঠান ও কোম্পানীর কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অর্থ আত্মসাতের কেলেংকারি ফাঁস বা ভারতে লক্ষ্মীপূজার উপকারিতা; বরং তার পবিত্রতার ওপর সত্যায়নের ওপর মহর মেরে দিয়েছে।
টিকাঃ
২. ১৯৯৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ২৭ হাজার। ইন্ডিয়া টুডে'র ১৯৯৭ সালের ১৬ই জানুয়ারী সংখ্য থেকে জানা যায়, আমেরিকার মতো ভারতেও মিনিট ও ঘন্টার হারে অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ প্রতি ৪৫ মিনিটে একটি ধর্ষণের ঘটনা সংঘটিত হচ্ছে, প্রতি ২৬ মিনিটে একটি যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটছে, প্রতি ১ ঘন্টা ১৫ মিনিটে একজন নারীকে যৌতুকের জন্য আগুনে জ্বালিয়ে দেয়া হচ্ছে এবং প্রতি ৩৩ মিনিটে একটি জুলুমের ঘটনা ঘটছে। সাপ্তাহিক সানডে'র ১৯৯৭ সালের জুন সংখ্যায় 'হেল্প লাইন' নামক একটি সংস্থা পরিচালিত এক জরিপে প্রকাশিত হয়েছে, তাতে দেখানো হয়েছে, কিভাবে পিতা-মেয়ে, মা-ছেলে, ভাই-বোন, মামা-ভাগিনা ও চাচা-ভাতিজীর মাঝে অবৈধ যৌন সম্পর্কের ঘটনা ঘটছে। এ সংখ্যা বিপজ্জনক হারে বাড়ছে।
৩. দিল্লীর ৯০% নারী রিপোর্ট দিয়েছে, আজকাল মিল-কারখানা, অফিস-আদালত, রাস্তাঘাট এবং পরিবহনে যৌন হয়রানি উদ্বেগজনক হারে বেড়ে গেছে। দিল্লীর এক হাজার নারীর ওপর পরিচালিত এক জরিপ দ্বারা জানা গেছে, তাদের মধ্যে ৯২% নারী কোনো না কোনো পুরুষের লোলুপ দৃষ্টির শিকার হয়েছে। জওহর লাল নেহরু ইউনিভার্সিটির একটি জরিপ থেকে জানা গেছে, ৬৭% ছাত্রী কখনো না কখনো অবশ্যই যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে। তাদের মধ্যে ৭.৫৮% ছাত্রী হোস্টেলে অবস্থানকারী। ১৯৯৬ সালে গৃহপরিচারিকা ও নিকটাত্মীয়ের সাথে ব্যভিচারের হার ৬৮% বৃদ্ধি পেয়েছে।
৪. এমন হবেই বা না কেন, যখন টিভি ও সংবাদ পত্রসমূহে বিজ্ঞাপন দেয়া হয়, 'এখন পাঁচ হাজার টাকা খরচ করে ভবিষ্যতের পঞ্চাশ হাজার টাকা বাঁচান'। (অমৃতসরের ড. ভান্ডারির বিজ্ঞাপন) অর্থাৎ যদি পেটে মেয়ে সন্তান থাকে তাহলে পাঁচ হাজার টাকার বিনিময়ে গর্ভপাত ঘটিয়ে ভবিষ্যতে তার বিয়ে-শাদীর খরচ বাবদ পঞ্চাশ হাজার টাকা বাঁচান। অমৃতসরে ৯৫% নারী তাদের গর্ভের কন্যা সন্তান বিনষ্ট করেছে। ১৯৯৫ সালে সরকার অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ত্রিশ লাখ গর্ভ নষ্ট করা হয়েছে। ১৯৯১ সালে সামগ্রিকভাবে কন্যা সন্তান জন্মের হার সাড়ে সাত লাখ হ্রাস পেয়েছে। সরকারী হিসাবমতে শুধু যৌতুকের কারণেই প্রতিবছর গোটা দেশে আট হাজার নয়শ' সাতাশি জন নারীকে আগুনে জ্বালিয়ে হত্যা করা হয়। 'আমরা দুজন আমাদের দুজন' জন্ম নিয়ন্ত্রণ শ্লোগানের চক্করে পড়ে প্রতিবছর যেসব শিশুকে হত্যা করা হয়, তাদের সংখ্যা আলাদা।