📄 কায়রো টেলিভিশন
কায়রো টেলিভিশনের প্রথম চ্যানেল সকাল ৭টা থেকে রাত ২টা পর্যন্ত মোট ১৯ ঘন্টা সম্প্রচারিত হয়।
দ্বিতীয় চ্যানেল সকাল ৭টা থেকে রাত ২টা পর্যন্ত মোট ১৯ ঘন্টা সম্প্রচারিত হয়।
তৃতীয় চ্যানেল দুপুর ২টা থেকে রাত ২টা পর্যন্ত মোট ১২ ঘন্টা সম্প্রচারিত হয়।
চতুর্থ চ্যানেল রাত ৪টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত মোট ৯ ঘন্টা সম্প্রচারিত হয়।
পঞ্চম চ্যানেল সকাল ১০টা থেকে রাত ১টা পর্যন্ত ১৫ ঘন্টা সম্প্রচারিত হয়।
ষষ্ট চ্যানেল দুপুর ২টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত ১০ ঘন্টা সম্প্রচারিত হয়।
সপ্তম চ্যানেল দুপুর ১০টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত ১৪ ঘন্টা সম্প্রচারিত হয়।
নীল টিভিতে সকাল ১০টা থেকে রাত সন্ধা ৬টা পর্যন্ত মোট ৮ ঘন্টা সম্প্রচার হয়।
ডিশ এন্টিনার মাধ্যমে বিবিসি, স্টার টিভি ও সিএনএন ২৪ ঘন্টা সম্প্রচার হয়।
এম বি সি মিডলইস্ট ব্রডকাস্টিং সেন্টার লন্ডন থেকে ১২ ঘন্টা সম্প্রচারিত হয়।
📄 কায়রো রেডিও
রেডিও কুরআন সকাল ৭টা ৩৫ মিনিট থেকে রাত ১টা ৫৫ মিনিট পর্যন্ত ১৯ ঘন্টা সম্প্রচারিত হয়।
সাধারণ অনুষ্ঠান সর্বমোট ২২ ঘন্টা সম্প্রচারিত হয়।
সওতুল আরব সকাল ৭টা থেকে রাত ৪টা ১০ মিনিট পর্যন্ত সর্বমোট ২০ ঘন্টা সম্প্রচার চালায়।
মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক অনুষ্ঠান সর্বমোট ১২ ঘন্টা সম্প্রচারিত হয়।
রেডিও কুরআন শুধু তিলাওয়াতের জন্য নির্ধারিত। অন্যান্য রেডিও চ্যানেল থেকে দৈনিক মাত্র ২ ঘন্টা ২০ মিনিট 'দীনী ও নৈতিক অনুষ্ঠান প্রচারিত হয়।
কায়রো শহরে ২২টি সিনেমা হল, ৫টি নাট্যমঞ্চ, ২৫টি নাইট ক্ল্যাব, এবং সমুদ্রের ভেতরে ৮টি নাইট ক্লাব রয়েছে, যা নীল দরিয়ার উপকূলে অবস্থিত। এখানে চলন্ত নৌকার মধ্যে বিদেশী পর্যটকদের জন্য প্রোগ্রাম হয়। কায়রো সিনেমা হলগুলোতে দৈনিক ২৫টি মার্কিনী, ৮টি ফরাসী এবং ৬টি ভারতীয় সিনেমা প্রদর্শন করা হয়। সামগ্রিকভাবে সকাল সাড়ে ৯টা থেকে রাত সাড়ে ১২টা পর্যন্ত মোট ৩৯টি বিদেশী সিনেমা প্রদর্শন করা হয়।
মিসরী টেলিভিশনের সকল চ্যানেল থেকে দৈনিক ৬টি মার্কিনী, ১টি ফরাসী, ২টি ভারতীয়, ৬টি আরবী সিরিজ এবং ২টি আরবী নাটক সম্প্রচার করা হয়। রেডিও কায়রোতেও আরবী সিরিজ, নাটক ও সিনেমা সম্প্রচার করা হয়। এসব তো টিভি রেডিওর কথা। সংবাদপত্র ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার মাধ্যমে যে নগ্নতা, অশ্লীলতা ছড়ানো হচ্ছে তা তো আলাদা কথা।
পবিত্র রমযান মাসে এমবিসির বিশেষ অনুষ্ঠান দুপুর ১১টা থেকে রাত ২টা পর্যন্ত আরব বিশ্বের সকল দেশের জন্য সম্প্রচার করা হয়। ১৫ ঘন্টার এই অনুষ্ঠানে ১৪১৬ হিজরীতে দৈনিক ৩টি আরবী সিরিজ, ২টি আরবী সিনেমা ও ২টি মার্কিন সিনেমা সম্প্রচার করা হয়েছে। কায়রো টিভির সকল চ্যানেল রোযাকে সার্থক বানানোর জন্য একে অপরে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। সাপ্তাহিক আল মুজতামা আরব বিশ্বে মার্কিন সিনেমার আমদানী সম্পর্কে এক জরিপে লেখেছে, ডিশ এন্টিনার এই যুগে আরবরা সরাসরি ৩৫টি চ্যানেল থেকে তাদের ইচ্ছামতো অনুষ্ঠান উপভোগ করতে পারা সত্ত্বেও অতি চড়া মূল্যের রয়েলিটি দিয়ে সরকারী পর্যায়ে মার্কিন সিনেমা আমদানী করা হয়। জরিপে বলা হয়েছে, মিসরে ৮৫%, জর্ডানে ৬৫%, আরব আমিরাতে ৭৭%, তিউনিসিয়ায় ৭৮%, আলজেরিয়ায় ৭৯%, মরক্কোতে ৮২% এবং কুয়েতে ৭৭% মার্কিন সিনেমা প্রদর্শিত হয়। এসব দেশে প্রতিমাসে চারশ' নিষিদ্ধ ঘোষিত সিনেমার ভিডিও ক্যাসেট অনুপ্রবেশ করে। শিশুদের ৮৯% টিভি অনুষ্ঠানের জন্য অমুসলিম দেশ আমেরিকা জাপান থেকে প্রোগ্রাম আমদানী করা হয়। নতুন প্রজন্মের মন মস্তিষ্কে শেরেকী আকীদা-বিশ্বাস সুদৃঢ় করার জন্য অত্যন্ত শৈল্পিক দক্ষতা ও চতুরতার সাথে বিভিন্ন সিরিজ, নাটক, গেমস এবং কার্টুনও তৈরি করা হয়।
মুসলিম বিশ্বের বিরুদ্ধে পশ্চিমা মিডিয়ার যুদ্ধ কত ভয়াবহ, ব্যাপক, সুগভীর, সুদূরপ্রসারী, শক্তিশালী ও চতুর্মুখী, তার অনুমান এভাবে করা যেতে পারে, ভয়েস অফ আমেরিকা দৈনিক আরবীতে ৪৯ ঘন্টা অনুষ্ঠান সম্প্রচার করে।
ফ্রান্সের রেডিও মোনিয়ে কার্লো ৫২ ঘন্টা, বিবিসি ৮ ঘন্টা আরবী ভাষায় অনুষ্ঠান সম্প্রচার করে। রেডিও ফ্রিতাস, যা ভেটিকন সিটির তত্ত্বাবধানে খৃস্টবাদ প্রচার-প্রসারের জন্য উৎসর্গীকৃত-আরব বিশ্বের শ্রোতাদের জন্য ২৪ ঘন্টা অনুষ্ঠান সম্প্রচারের উদ্দেশ্যে বিশেষ রেডিও স্টেশন স্থাপন করেছে।
পশ্চিমা মিডিয়ার সরাসরি মুসলিম সমাজের ওপর আগ্রাসন এবং বিনা অনুমতিতে মুসলিম পরিবারে অনুপ্রবেশের শক্তিশালী চেষ্টা-প্রচেষ্টা দেখুন, অন্যদিকে সেসব মুসলিম দেশগুলোকেও দেখুন, যারা কোটি কোটি ডলার দিয়ে পশ্চিম থেকে এ বিষ আমদানী করছে এবং স্বদেশের দীনী ভাইদের হলকে জোরপূর্বক ঢেলে দিচ্ছে। ১২টি ইসলামী দেশ ৫০%, দশটি ইসলামী দেশ ৬৫%, নয়টি ইসলামী দেশ ৭২% এবং চারটি ইসলামী দেশ ৮০% টিভি রেডিও প্রোগ্রাম পশ্চিম থেকে আমদানী করে। মুসলিম দেশগুলোতে সরকার নিয়ন্ত্রিত মিডিয়ার মাধ্যমে পশ্চিমা দেশে তৈরি দেড় থেকে দুই লাখ ঘন্টার অনুষ্ঠান দেখানো হয় এবং এর জন্য লাখ লাখ পাউন্ড ও ডলার ব্যয় করা হয়।
১৪১৬ হিজরীর রমাযান মাসে কুয়েতের তথ্য মন্ত্রণালয় লেবানন ও সিরিয়া থেকে একটি নৃত্য ও কণ্ঠশিল্পী দলকে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। এর জন্য ৪৫ লাখ ডলার নগদ, ৩০ লাখ ডলার হোটেল ও ভ্রমণ বিল বাবদ ব্যয় করা হয়েছিল।
📄 কুয়েতী মিডিয়া
জার্মানীর বন থেকে প্রকাশিত মাসিক আর রায়েদ মরক্কোর ওপর পশ্চিমা মিডিয়ার আগ্রাসনের বিশ্লেষণ করে লেখেছে, মরক্কোর যুবক-যুবতীরা চ্যানেল-২ বেশি পছন্দ করে। কারণ এই চ্যানেল শুধু বিদেশী অনুষ্ঠান দেখায়। এই চ্যানেল ১৯৯৪ সালেই ১১২৫টি বিদেশী সিরিজ ও ৮০২টি আরবী সিনেমা প্রদর্শন করে। সামগ্রিকভাবে এই চ্যানেলটি ৩০৫৬টি চরিত্রবিধ্বংসী অনুষ্ঠান প্রচার করে চল্লিশ লাখ ডলার মুনাফা করেছে।
পশ্চিমা মিডিয়া আজ যা করছে একথাই পবিত্র কুরআন আজ থেকে চৌদ্দশ বছর পূর্বে বলে দিয়েছে-'একশ্রেণীর লোক আছে যারা মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে গোমরাহ করার উদ্দেশ্যে অবান্তর কথাবার্তা খরিদ করে অন্ধভাবে এবং তা নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করে, এদের জন্য রয়েছে অবমাননাকর শান্তি।' (সূরা লোকমান-৬)
মিসরের মোকাবেলায় কুয়েতে ১৯৬০ সালের পর পশ্চিমা মিডিয়ার প্রসার ঘটে। ১৯৬১ সাল পর্যন্ত কুয়েতে নৈতিক ও চারিত্রিক অপরাধ ছিল না বললেই চলে, কিন্তু পশ্চিমা মিডিয়ার ঢেউয়ে কুয়েতী সমাজেও নৈতিক ও চারিত্রিক অপরাধ সংঘটিত হতে শুরু করেছে। ইতোমধ্যেই পশ্চিমা সমাজব্যবস্থা কুয়েতী সমাজব্যবস্থাকে তার চাদরে ঢেকে নিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ দৈনিক আল কাবাসের ১৯৯৪ সালের ১০ই আগস্ট সংখ্যার একটি সার্ভে রিপোর্টের সংক্ষিপ্ত বিবরণ নিম্নে পেশ করা হলো।
সার্ভে রিপোর্টে বিভিন্ন অপরাধের সাথে জড়িত যুবক যুবতীদের পর্যালোচনা করতে গিয়ে বলা হয়েছে, ১৯৯২ সালে যে চারিত্রিক অপরাধ সংঘটিত হয়েছে তার সাথে জড়িত ১০ থেকে ১৮ বছর বয়সের নওজোয়ানদের সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৭ শ' ৯৭ জন। ২ হাজার ৮ শ' ২৮টি অপরাধের মধ্যে পুরুষের হার ৯৭% আর নারীদের হার ২.২%। সার্ভে রিপোটের বিস্তারিত বিবরণ নিম্নরূপ-
০১. ট্রাফিক আইন লংঘনকারীদের সংখ্যা ৯ শ' ৯২, এর মধ্যে মেয়েদের হার ৯৯ শতাংশ।
০২. মারদাঙ্গার ঘটনা ৭ শ' ২০, এর মধ্যে পুরুষের সংখ্যা ৭ শ' ৪ আর নারীদের সংখ্যা ৬।
০৩. চুরি ডাকাতির ঘটনা ৩ শ' ৫৪, এতে ৩ শ' ৪২ জন পুরুষ আর ১২ জন নারী গ্রেফতার হয়েছে।
০৪. ধর্ষণের ঘটনা সংখ্যা ৯৩।
০৫. নারীদের উত্ত্যক্তকরণ অশ্লীল কৌতুকের ঘটনা সংখ্যা ৬৩, এতে ৬০ জন পুরুষ ও ৩ জন মহিলা গ্রেফতার হয়েছে।
০৬. অপরহরণ ও ধর্ষণের ঘটনা ৩৭।
উল্লিখিত অপরাধের মধ্যে শুধু কুয়েত সিটিতেই ঘটেছে ২ হাজার ২ শ' ২৩টি। আর বাকী ৬ শ' ৩৬টি ঘটে অন্যান্য শহরে।
অন্যান্য আরব দেশ যেমন মরক্কো ও আলজেরিয়ায়ও অপরাধের হার মিসর এবং কুয়েতের মতো। উদাহরণস্বরূপ আলজেরিয়ায় যুবতী মেয়েদের আত্মহত্যার হার সকল আরব দেশ থেকে বেশি। ১৯৯৫ সালের এক জরিপে জানা যায়, অবৈধ সম্পর্কের ফলে যেসব মেয়ে আত্মহত্যা করেছে তাদের সংখ্যা ২ শ' ৮০। অল্প বয়স্ক যেসব ছেলে নৈতিক ও আর্থিক অপরাধে গ্রেফতার হয়েছে তাদের সংখ্যা শুধু রাজধানীতেই ৯ শ' ৫০।
আরব বিশ্বে ক্রমবর্ধমান সংঘটিত অপরাধও দেখুন এবং মিডিয়ার সরকারী পৃষ্ঠপোষকতাও দেখুন, কিভাবে সেসব সরকার দীন ধর্ম ও চরিত্রের পথে চলাকে শাস্তি যোগ্য অপরাধ সাব্যস্ত করেছে। পক্ষান্তরে পশ্চিমা জীবনপদ্ধতি এবং যৌন বিপথগামিতা ও বিশৃংখলার পথে চলাকে কিভাবে উৎসাহিত অনুপ্রাণিত করা হচ্ছে। এখানে আমরা দৈনিক আল আহরামের ১৯৯৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর সংখ্যা থেকে টিভি, রেডিও, সিনেমা ও নাটকের অনুষ্ঠানমালার একটি সংক্ষিপ্ত জরিপ পেশ করছি। এই জরিপ পেশ করার উদ্দেশ্য একথা বলা, আজ আমরা মুসলমানরাই কিভাবে নিজেরা নিজেদের হাতে কবর খুঁড়ছি।
📄 সৌদি মিডিয়া
পাশ্চাত্য সভ্যতা-সংস্কৃতি যখন আরব বিশ্বের ওপর আগ্রাসনের সূচনা করে তখন মিসর সেই আগ্রাসনকে উঞ্চ অভিনন্দন জানায়। পক্ষান্তরে আরব উপদ্বীপ পাশ্চাত্যের সাথে সংশ্লিষ্ট সব বিষয় সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করে, যা ছিল অপ্রাকৃতিক অযৌক্তিক, কিন্তু আরব উপদ্বীপ বেশিদিন পাশ্চাত্য সভ্যতা-সংস্কৃতির আগ্রাসন মোকাবেলা করতে পারেনি। সে পাশ্চাত্য সভ্যতার আগ্রাসনের সামনে হাতিয়ার ছেড়ে দিয়েছে। আরব উপদ্বীপে সফরকারী প্রত্যেকেই আজ তা প্রত্যক্ষ করছে।
ইসলামের দু'টি পবিত্রতম শহরের দেশ সৌদি আরবে সর্বপ্রথম ১৯৬৫ সালে জিদ্দা ও রিয়াদ থেকে একযোগে টেলিভিশনের যাত্রা শুরু হয়। এই সৌদি চ্যানেল দু'টি স্যাটেলাইটের মাধ্যমে গোটা দেশে আরবী ও ইংরেজি অনুষ্ঠান সম্প্রচার করে। টিভি অনুষ্ঠানমালা মিসর ও লেবাননে প্রস্তুত এবং বিন্যাস করা হয়। ১৯৮০ সালে যখন সরাসরি ইউরোপ-আমেরিকায় টিভি সম্প্রচারের সূচনা হয় তখন ডিশ এন্টিনার মালিক কেবল সৌদি আমীর ওমারা এবং রাজপরিবারই ছিল। সাধারণ জনগণের ডিশ এন্টিনার প্রোগ্রাম দেখার অনুমতি ছিল না। কুয়েতের বিরুদ্ধে ইরাকী বর্বরতা সর্বপ্রথম জনগণকে ডিশ এন্টিনা ও অন্যান্য পশ্চিমা মিডিয়ার মাধ্যমে সংবাদ শোনার অনুমতি প্রদান করে। ইরাক-কুয়েতের এই যুদ্ধ ব্যক্তিগত ও সরকারী উদ্যোগকে আরো তেজ করে দেয়। তারা স্যাটেলাইটের সাহায্যে অন্যান্য আরব দেশেও টেলিভিশন সম্প্রচারে সক্ষম হয়।
০১. কয়েকটি স্যাটেলইট চ্যানেল সৌদি নাগরিকের মালিকানায় রয়েছে। দেশের পূর্বাংশে হংকং-এর স্টার টিভির পাঁচটি চ্যানেল রয়েছে। তন্মধ্যে একটি মিউজিক চ্যানেল আর অন্যান্য চ্যানেলে বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস নিউজ দেখা যায়। অন্যান্য টিভি সার্ভিসের মধ্যে সিএনএন ইন্টারন্যাশনাল এবং আরব সরকারের বিভিন্ন প্রোগ্রাম মিসর, কুয়েত, লেবানন ও দুবাই স্টেশন থেকে দেখা যায়। ভারতে জি টিভি সৌদি আরবের সকল শহরেই দেখা যায়।
০২. ১৯৯০ সালে বিজ্ঞাপন ও চাঁদার সাহায্যে মিডলইস্ট ব্রডকাস্টিং-এমবিসি এর সরাসরি সম্প্রচার শুরু হয়। এ টিভি স্টেশনটি সৌদি রাজপরিবারের মালিকানাধীন। এর হেড অফিস লন্ডনে। এ টিভি ১৯৯১ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর সর্বপ্রথম সম্প্রচার শুরু করে। রাতদিন ১২ ঘন্টা বিরতিহীন অনুষ্ঠান প্রচারিত হয়। কায়রো ও জিদ্দা থেকে প্রচারিত আরব রেডিও টেলিভিশন কোম্পানী এআরটি সৌদি পুঁজিপতি সালেহ কামেলের মালিকানাধীন। তার চারটি চ্যানেল থেকে সিনেমা, মিউজিক, স্পোর্টস ও শিশুদের অনুষ্ঠান সম্প্রচার করা হয়।
০৩. ব্রডকাস্টিং স্যাটেলাইট ১৯৯১ সালে তার সার্ভিস শুরু করে। এর সদর দফতর রোমে। আরবী ও ইংরেজি সতেরটি চ্যানেল এমন ব্যক্তিদের জন্য সরবরাহ করে থাকে, যারা আড়াইশ ডলারের ডিশ কিনতে এবং নিয়মিত মাসিক বিল পরিশোধ করতে পারে।
০৪. সরাসরি টিভি প্রোগ্রামের ব্যাপারে সৌদি আরবের তিনটি দৃষ্টিভঙ্গি পাওয়া যায়। প্রথম শ্রেণীর বক্তব্য হলো, সরাসরি ডিশ এন্টিনার প্রোগ্রাম দ্বারা সৌদি অর্থনীতি বিশেষ করে সৌদি ব্রডকাস্টিং কোম্পানীর বিপুল আর্থিক ক্ষতির আশংকা রয়েছে। দ্বিতীয় শ্রেণীর বক্তব্য হলো, সরাসরি ডিশ এন্টিনার সম্প্রচার ইসলামী সভ্যতা-সংস্কৃতির জন্য বিপজ্জনক ও ক্ষতিকর। ৬ তৃতীয় শ্রেণীর বক্তব্য হলো, এ ধরনের প্রোগ্রাম দ্বারা সৌদি আরবের কোনো বড় ধরনের ক্ষতির আশংকা নেই; বরং এর মাধ্যমে আমরা পুরো বিশ্ব থেকে উপকৃত হতে পারি এবং আমাদের দ্বীপ থেকে বের হতে পারি। ৭ সৌদি সংবাদপত্রের অবস্থাও সৌদি টিভির মতোই। গোটা দেশ থেকে সর্বমোট আটটি দৈনিক বের হয়, যেগুলোর মালিক, সম্পাদক, প্রকাশক ও নীতিনির্ধারক সবাই ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদে বিশ্বাসী। এই আটটি দৈনিকের প্রত্যহ সর্বমোট এক লাখ প্রচার হয়। এছাড়াও অন্যান্য ভাষায় প্রায় ৮০টি সংবাদপত্র, দেড়শ ম্যাগাজিন, মাসিক, সাপ্তাহিক পত্র পত্রিকা ও বইপত্র এবং প্রায় এক কোটির কাছাকাছি বিদেশী প্রকাশনা প্রচার হয়। প্রতিমাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের প্রস্তুতকৃত সত্তর থেকে আশি হাজারের কাছাকাছি ভিডিও ও এক লক্ষ অডিও ক্যাসেট বিক্রি হয়। যদিও মোকাবেলায় প্রিন্ট মিডিয়ার প্রভাব প্রতিক্রিয়ার ক্ষমতার হার ত্রিশ শতাংশ, কিন্তু এরপরও আরব উপদ্বীপের সমাজব্যবস্থার ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব-প্রতিক্রিয়া পড়ছে।
সৌদি সমাজব্যবস্থার ওপর পরিচালিত এক জরিপ থেকে জানা যায়, সৌদি আরবের একজন ছাত্র যখন মাধ্যমিক স্কুল পাস করে তখন এ সময়ের মাঝে টিভির সামনে তার পনের হাজার ঘণ্টা, আর সময় ক্ল্যাস ও পড়ালেখায় ব্যয় হয়েছে দশ হাজার ঘন্টা।
আরব সংবাদ সংস্থাগুলো সর্বমোট একলাখ পঞ্চাশ হাজার শব্দ সম্বলিত সংবাদ পত্রিকাগুলোকে সরবরাহ করে। আবার সংবাদপত্রের নব্বই শতাংশ আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলো থেকে সংগ্রহ করা হয়।
ইউনেস্কোর এক জরিপ অনুযায়ী গোটা বিশ্বের মিডিয়া থেকে দৈনিক একশ' বিশ চ্যানেলে সতের হাজার ঘন্টার প্রোগ্রাম পুরো দুনিয়ায় সম্প্রচার করা হয়। এর মধ্যে নয় হাজার ঘন্টার প্রোগ্রাম আরব বিশ্বের জন্য বিশেষভাবে প্রস্তুত করা হয়। ইসরাঈল স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সতেরটি চ্যানেল থেকে আরব বিশ্বের ওপর অবিরাম আগ্রাসন চালিয়ে যাচ্ছে। এর প্রভাব-প্রতিক্রিয়া জরিপ করে ইউনেস্কো বলেছে, পুরো বিশ্বের পঁচাশি শতাংশ মানুষ টিভির কারণে তাদের খাওয়া-দাওয়া, শোয়া-ঘুমানো, লেখাপড়া ও কাজকর্মের নির্ধারিত সময় পরিবর্তন করেছে। টিভি তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ক্ষমতার ওপর প্রভাব বিস্তার করেছে। এখন তারা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। ইচ্ছা-অনিচ্ছা ও চেতন-অবচেতন সর্বাবস্থায় তারা টিভি ও অন্যান্য মিডিয়া দ্বারা প্রভাবিত।
ইউনেস্কো আরব বিশ্বের ওপর এক পর্যালোচনায় বলেছে, অধিকাংশ মুসলমানের মৌলিক আকীদা-বিশ্বাস দুর্বল হয়ে পড়েছে। নব প্রজন্মের দশ থেকে পঁচিশ বছর বয়স্কদের আশি শতাংশ টিভির শেরেকী প্রোগ্রাম দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে। ইহুদী-খৃস্টানদের ধ্যান-ধারণা, চিন্তা-চেতনা, ধর্মীয় পরিচায়ক বিষয়াবলী, তাহযীব-তামাদ্দুন, সভ্যতা-সংস্কৃতি এবং তাদের উদ্ভাবিত ফ্যাশনকে অত্যন্ত ভক্তি-শ্রদ্ধা ও সম্মানের দৃষ্টিতে দেখে। পনের বছর সময়সীমা ধরে মিসর, সৌদি আরব ও কুয়েতকে টার্গেট বানিয়ে ৮ মাদক ও নেশাজাত দ্রব্যের বিস্তার ঘটানো হয়েছে। ফলে অবৈধভাবে যৌনক্ষুধা নিবারণের ঘটনা, জুলুম, জবরদখল, ধর্ষণ, আর্থিক দুর্নীতি, নৈতিক অপরাধ ইত্যাদি বেড়ে গেছে। নারী ও শিশুদের মাধ্যমে ছাত্র ছাত্রীদের মাঝে নেশাজাত দ্রব্য এবং ক্যাসেট, টিভি গেমস ও এ্যালবামের মাধ্যমে অশ্লীলতার প্রসার ঘটানো হচ্ছে।
টিকাঃ
৬. সুচিন্তিত পরিকল্পনা মোতাবেক মিডিয়ার মাধ্যমে হেজাযের সমাজকে যে দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, তা পাশ্চাত্য সংস্কৃতির কেবলা। চিন্তশীল ব্যক্তিবর্গ ১৯৬২ সালে হেজাযে টিভি আগমনের এক বছর পরই শেখ সাদী সিরাজী কবিতার ভাষায় সে দিকে সকলের মনোযোগ আকর্ষণ করেছিলেন। শেখ সাদীর কবিতার মর্ম হচ্ছে-'ওহে বেদুঈন তুমি কখনোই কাবায় পৌঁছতে পারবে না, তুমি তো তুর্কিস্তানের পথ ধরেছ।' কিন্তু চিন্তাশীল মনীষীদের এ আহবান মরুভূমির চিৎকার প্রমাণিত হয়েছে। আরব উপদ্বীপের সমাজের দৃষ্টিতে স্বাধীন বাধা বন্ধনহীন পাশ্চাত্য জীবনের প্রদর্শনীতে ধাঁধা লেগে গেছে। দেখুন, সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী র. প্রণীত-'হিজাযে মুকাদ্দাস উমেদ্ আওর আন্দেওঁ কে দরমিয়ান', 'মুসলিম মোমালেক মে ইসলামিয়াত আওর মাগরিবিয়াত কী কাশমাকাশ', 'আলমে আরবী কা আলমিয়া')
৭. সৌদি প্রতিরক্ষা দফতরের মাসিক মুখপত্র 'আল হিরসুল ওয়াতানী'র এক সাংবাদিক সাবেক এক মার্কিন জেনারেল ব্রন্ট ইসকো ক্রফটকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, আমেরিকা ডিশ এন্টিনার মাধ্যমে গোটা বিশ্বের সভ্যতা-সংস্কৃতির ওপর প্রভাব-প্রতিক্রিয়া ফেলছে। জেনারেল এর জবাবে সুস্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন, আমেরিকার মৌলিক উদ্দেশ্য, সকল আঞ্চলিক সভ্যতা-সংস্কৃতি নির্মূল করে গোটা বিশ্বকে মার্কিনী রঙে রঙিন করা।
৮. মিসরী দৈনিক আল আহরাম ১৩-৭-১৯৮৪ সংখ্যায় আরব বিশ্ব ও ফ্রান্সে টেলিভিশন এবং ভিডিও ক্যাসেটের ওপর একটি জরিপ প্রকাশিত হয়, যা উপদেশমূলক। ফ্রান্সে প্রতি হাজার লোকের মধ্যে, দশটি ভিসিআর সেট রয়েছে। পক্ষান্তরে কুয়েতে প্রতি হাজারে চারশ নব্বই এবং সৌদি আরবে প্রতি হাজারে সাতশ' পঞ্চাশটি ভিসিআর সেট রয়েছে। ১৯৯৫ সালে এই হার শতকরা ১০০% হয়ে গেছে। মিসরে বার্ষিক এক কোটি মিসরী পাউন্ডের টিভি কেনাবেচা হয়। অথচ এ দেশের বৈদেশিক ঋণ রয়েছে পঞ্চাশ কোটি মিসরী পাউন্ড।