📘 পশ্চিমা মিডিয়ার স্বরূপ > 📄 মিসরীয় সমাজে মিডিয়ার প্রভাব-প্রতিক্রিয়া ও পরিণতি

📄 মিসরীয় সমাজে মিডিয়ার প্রভাব-প্রতিক্রিয়া ও পরিণতি


এখানে উল্লিখিত সরেজমিন জরিপে পাওয়া কিছু ঘটনার আলোচনা রয়েছে, তা হলো, শিশুরা সিনেমা দেখে কিভাবে তার প্রভাব-প্রতিক্রিয়া গ্রহণ করে। উদাহরণস্বরূপ 'আল ইখওয়াতুল আ'দা' (দুশমন ভাই) নামক একটি সিনেমা দেখে এক শিশু তার ঘুমন্ত ছোট ভাইকে গলা টিপে হত্যা করে। ষোল বছরের এক ছেলে 'মেছালী হিরো' (আদর্শ নায়ক) নামে একটি টিভি সিনেমা দেখে প্যাট্রোসের মোটরগাড়ী চুরি করে। এক ছাত্রী টিভির পর্দায় 'আর রাকেসা ওয়াস সিয়াসী' (নর্তকী ও রাজনীতিবিদ) নামক সিনেমা দেখে ড্যান্স ক্ল্যাবে চাকরি নেয়। এ সিনেমা দেখে সে মনে করে বসে, নর্তকী তার নৃত্য শিল্পের মাধ্যমে রাজনীতিক ও সম্পদশালীদের সহজেই মাত করতে পারে।

মিসরী সমাজে অপরাধের বিশ্লেষণ করতে গিয়ে প্রসিদ্ধ চলচ্চিত্র নির্মাতা সালাহুদ্দীন আবু ইউসূফ বলেন, প্রতি যুগেই অপরাধ ছিল এবং এমন লোকও বিদ্যমান ছিল, যারা সামাজিক বন্ধন ও নৈতিক-চারিত্রিক সীমা লংঘন করে চলত। পূর্বে নেশা ও প্রতিশোধমূলক অপরাধ সংঘটিত হত, কিন্তু খুবই কম। তবে বিগত শতাব্দীর ষাটের দশকে অর্থনৈতিক অপরাধ বৃদ্ধি পায়, যেমন চুরি, ডাকাতি ও প্রতারণা ইত্যাদি। এর পাশাপাশি রাজনৈতিক অপরাধেরও প্রবৃদ্ধি ঘটে, কিন্তু বর্তমানে পরিস্থিতি এত ভয়ানক আকার ধারণ করেছে যে, এ্যাকশন, মার-দাঙ্গ, সন্ত্রাস, অপহরণ, ধর্ষণের ঘটনা অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পেয়েছে। সালাহুদ্দীন আবু ইউসুফ আরো বলেন, ১৯৭০ সালের পর যেসব সিনেমা নির্মিত হয়েছে তা সব হলিউড ও বলিউডের এ্যাকশন ছবির অবিকল প্রতিচ্ছবি। উদাহরণস্বরূপ এক নাযুক সুন্দরী নারী, আদালত, মৃত্যুর ফাঁদ, তের কাজ, তিন শয়তান, প্রতিশোধের আগুন, মন্দ মানুষ, তিন ঝগড়াটে, প্রতিশোধের চক্কর প্রভৃতি সিনেমাগুলোতে এ্যাকশন, মারদাঙ্গা, যৌনতা ও নগ্নতার ছড়াছড়ি রয়েছে। ভারতীয় নির্মাতা অমিতাভ বচ্চনের সিনেমাগুলোও মিসরে খুব জনপ্রিয়। কারণ তার নির্মিত বেশির ভাগ সিনেমায় শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এ্যাকশন ও যৌন সুড়সুড়ি বিদ্যমান রয়েছে। মিসরী সেন্সর বোর্ডের এক সদস্য হামদী সারওয়ার বলেন, অপরাধ বৃদ্ধিতে শুধু সিনেমাকেই কারণ সাব্যস্ত করা ঠিক নয়; বরং এতে অর্থনৈতিক ও সামাজিক কারণও রয়েছে। এছাড়া দীনী শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের অনুপস্থিতিও একটি মৌলিক কারণ।

মিসরী মিডিয়ার ওপর ইহুদী খৃস্টান ও নাস্তিক বেদীন গোষ্ঠীর আধিপত্যের কারণে বেশির ভাগ সিনেমা নাটকে ইসলাম, ইসলামী শিক্ষা ও ব্যক্তিত্ব এবং দীনী পরিচায়ক বিষয়াবলীকে অত্যন্ত উপহাস বিদ্রূপের লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়েছে, যাতে ইসলামের আকার আকৃতি বিকৃত করা যায় এবং মন-মস্তিষ্ক থেকে তার প্রাণ ও মূল্যবোধ বের করে দেয়া যায়; বরং অন্তরে ইসলাম সম্পর্কে আরো ঘৃণা সুদৃঢ় হয়। যেমন পশ্চিমা সমাজে তাদের দীন ধর্ম সম্পর্কে করা হয়। তবে পশ্চিমা সিনেমায় এ্যাকশন, যৌনতা, নগ্নতা ও অশ্লীলতা ছাড়া সাধারণতঃ তাদের ধর্মীয় মূল্যবোধে আঘাত হানা হয় না। যদিও ব্যতিক্রম কিছু সিনেমা রয়েছে, যেখানে হযরত ঈসার যৌন জীবনকে পাশ্চাত্য ভঙ্গিতে উপস্থাপন করা হয়েছে। এর বিরুদ্ধে কোথাও কোথাও কিছু প্রতিবাদও হয়েছে, কিন্তু সাধারণত: পশ্চিমা সিনেমায় তাদের ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের মর্যাদাবান আকার আকৃতিতে হাসপাতাল ও জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানসমূহে রোগী, নিঃস্ব দুঃস্থ এবং দুর্বল মানুষের সাহায্য সহায়তাকারীরূপে দেখানো হয়। এসব ক্ষেত্রে ইঞ্জিলের আয়াত এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়, যা দ্বারা খৃস্টীয় শিক্ষা ও নীতিমালা সুস্পষ্ট হয়ে যায় এবং দর্শক-শ্রোতাদের মন-মস্তিষ্কে ভালো প্রভাব পড়ে, কিন্তু পশ্চিমের এই মিডিয়াই যখন ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহ সম্পর্কে কোনো অনুমান উপস্থাপন করে, তখন তাতে ইসলামকে সম্পূর্ণ বিকৃত করে দেখানো হয়। মিসরী সিনেমা যেহেতু পাশ্চাত্যে নির্মিত সিনেমারই চর্বিত চর্বণ, সে জন্য এক শতাব্দী ধরে মিসরী সিনেমায় ইসলাম, মুসলিম উম্মাহ, ইসলামী ইতিহাস, ঐতিহ্য ও ব্যক্তিত্বকে বিকৃত করা, খাটো করা ও হেয় করার ধারাবাহিকতা চলে আসছে। এসব সিনেমায় একাধিক বিবাহ, তালাক, ইবাদত, চরিত্র, লেনদেন ও সামাজিকতা সম্পর্কে ইসলামী শিক্ষা ও অবয়বকে বিশেষভাবে টার্গেট বানানো হয়। পিতা-মাতার যে সম্মান মর্যাদা ইসলামী সমাজে আছে, যুগ যুগ ধরে ইসলামী সমাজে যেভাবে যৌথ পারিবারিক ব্যবস্থা প্রচলন রয়েছে, পর্দাপ্রথার যে ইসলামী ধ্যান-ধারণা, অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্পর্কে ইসলামের যে প্রাকৃতিক কানুন ও ইনসাফপূর্ণ বন্টন পদ্ধতি রয়েছে, সেগুলোর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার জন্য পরোক্ষ প্রত্যক্ষ উসকানি দেয়া হয়। সূক্ষ্মভাবে এই ধারণা দেয়া হয়, এই ধর্ম অনেক কঠিন।

সমস্যা সংকটের কোনো সমাধান এতে নেই। ইসলামে প্রতিটি সমস্যার সমাধান কঠোরতা ও তলোয়ারের মধ্যে খোঁজা হয়। অতএব কট্টরপন্থা থেকে বাঁচার জন্য পশ্চিমা জীবনপদ্ধতি গ্রহণ কর। অন্য ভাষায়, মানব সোসাইটির সকল অনিষ্টের মূল কারণ ইসলাম। এর সমাধান পশ্চিমা জীবনপদ্ধতি গ্রহণ করা। যেমন 'উরীদু হাল্লান' (সংকটের সমাধান কাম্য)-মিসরী সিনেমায় ধারণা দেয়া হয়েছে।

মিসরী সিনেমায় সাধারণতঃ দীনী ব্যক্তিত্বে অভিনয়কারীদের নাম এমন রাখা হয়, যা দ্বারা কঠোরতা, জুলুম ও ত্রাসের প্রতিচ্ছবি মস্তিষ্কে ভেসে ওঠে। যেমন আবদুল জব্বার, আবদুল কাহহার, আবদুল জালাল ইত্যাদি। অতঃপর সেসব অভিনেতারূপী ব্যক্তিত্বকে সব সময় ক্রোধভরা ভয়ানক চেহারায় দেখানো হয়, যার চোখ লাল, ভ্রু টানা, চেহারা ভাঙ্গা, কথায় কথায় ক্রুদ্ধ কঠোর হয়, নিষ্পাপ শিশু ও স্ত্রীদের সাথে দুর্ব্যবহার করে, কন্যাদের শিক্ষার ওপর নিষেধাজ্ঞা ও খেলাধুলার ওপর অবরোধ আরোপ করে। এক কথায় ঘরকে জেলখানা বানিয়ে দেখানো হয়, আর ঘরের বাইরে উক্ত অভিনেতার জীবন অন্য দেখানো হয়। একদিকে নামাযী অপরদিকে খারাপ ও অনৈতিক কাজে লিপ্ত। হাতে লম্বা তাসবীহও আছে আবার বন্ধুদের সাথে মদের আড্ডায়ও বিভোর।

দীনদার ও ভদ্র মানুষদের জন্য মিডিয়ায় সাধারণতঃ নিম্নের অভিযোগগুলো ব্যবহার করা হয়-সহজ, সরল, সাদাসিধা, বেওকুফ, নির্বোধ, কম জ্ঞানী, নাদান, ত্রুটিপূর্ণ বিবেকসম্পন্ন, স্থবির, অন্ধকারপ্রিয়, গোঁড়া, প্রতিক্রিয়াশীল, পশ্চাদপদ, উজ্জল চিন্তা ও মুক্তবুদ্ধির বিরোধী, উন্নতি ও প্রগতির অন্তরায়, কট্টরপন্থী, প্রাচীনতাপ্রিয়, সাম্রাজ্যবাদের ক্রীড়নক, অসভ্য, অভদ্র, সভ্যতা-সংস্কৃতি থেকে দূরে, যুগের চাহিদা সম্পর্কে বেখবর, ধর্ম ব্যবসায়ী, ইসলামকে অপহরণকারী, মৌলবাদী, মোল্লা ইত্যাদি। এর চেয়ে ভয়ানক হল, দীনী অভিধার সাথে উপহাস বিদ্রূপের বিষয়টা, যার প্রভাব-প্রতিক্রিয়া এর চাইতেও সঙ্গীন ও সুদূরপ্রসারী। যেমন অন্যায়-অপকর্ম এবং দুষ্কৃতির দৃশ্যে অভিনয়কারী অভিনেতা-অভিনেত্রীদের নাম কোনো প্রসিদ্ধ ইসলামী ব্যক্তিত্বের নামে রাখা হয়। এসব নামের বিকৃতি ঘটিয়ে নিন্দনীয় অর্থে ব্যবহার করা হয়। যেমন যয়নব ও ফাতেমাকে যানুবা ও ফাতুমা বলা হয়, আবার বিশেষ হাওয়াই চেলাদেরও যানুবা ফাতুমা নামে ডাকা হয়। নায়ক যখন নায়িকার সাথে অনৈতিক কাজ করে তখন এটাকে চার রাকাত নামায ও যৌন প্রমোদকে জান্নাতে প্রবেশের সাথে তুলনা করা হয়। নায়ক নায়িকা সমুদ্র তীরে আমোদ-প্রমোদ করতে থাকে আর একে অপরকে বলতে থাকে, আমরা সমুদ্রে নামার সময় বিসমিল্লাহ বলে কেন আল্লাহর রাসূলের সুন্নতের ওপর আমল করব না। এভাবেই মিসরী মিডিয়া পশ্চিমা মিডিয়ার অনুকরণে ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে অঘোষিত ক্রুসেড চালিয়ে যাচ্ছে।

মিসরী সমাজে ইবনূল কালব (কুকুরের বাচ্চা), ইবনুল খিনযীর (শুয়েরের বাচ্চা) ইত্যাদি শব্দের ব্যবহার ব্যাপক। বাপ তার ছেলেদের, বড় ভাই ছোট ভাইকে এসব শব্দে সম্বোধন করে। সাধারণতঃ আদর-ভালবাসা ও ক্রোধ-গোস্মা উভয় অবস্থাতেই একই পরিভাষা ব্যবহার করা হয়, কিন্তু সিনেমার যে নায়ক-নায়িকার নাম কোনো প্রসিদ্ধ ইসলামী ব্যক্তিত্বের নামে রাখা হয়েছে, তার ক্ষেত্রে এই পরিভাষাগুলো বার বার ব্যবহার করা হয়। এতে দর্শকদের ওপর অবশ্যই বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়বে। নাটক, সিনেমা ও উপন্যাসে বিভিন্নভাবে ইসলাম ও তার শিক্ষামালার বিরুদ্ধে বিরূপ প্রচারণা চালানো হয়।


দৈনিক আল আহরাম এবং সাপ্তাহিক রোজ আল ইউসুফসহ সংবাদ পত্রের কার্টুনে বছরের পর বছর শায়খ মাতলূফ (আযহারী শায়খ) এবং মুহাম্মদ আফেন্দিয়া (মোনাফিক আলেমেদীন)-এর নামে দীন সম্পর্কে কৌতুক করেছে।

টিকাঃ
৫. এ অভিধা পদ্ধতি এতটাই ব্যাপক যে, ইসলামপ্রিয় আরবী সাহিত্যিকদের মধ্যে নাজীব কিলানীও তাঁর উপন্যাসসমূহে এ পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন।

📘 পশ্চিমা মিডিয়ার স্বরূপ > 📄 কায়রো টেলিভিশন

📄 কায়রো টেলিভিশন


কায়রো টেলিভিশনের প্রথম চ্যানেল সকাল ৭টা থেকে রাত ২টা পর্যন্ত মোট ১৯ ঘন্টা সম্প্রচারিত হয়।

দ্বিতীয় চ্যানেল সকাল ৭টা থেকে রাত ২টা পর্যন্ত মোট ১৯ ঘন্টা সম্প্রচারিত হয়।

তৃতীয় চ্যানেল দুপুর ২টা থেকে রাত ২টা পর্যন্ত মোট ১২ ঘন্টা সম্প্রচারিত হয়।

চতুর্থ চ্যানেল রাত ৪টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত মোট ৯ ঘন্টা সম্প্রচারিত হয়।

পঞ্চম চ্যানেল সকাল ১০টা থেকে রাত ১টা পর্যন্ত ১৫ ঘন্টা সম্প্রচারিত হয়।

ষষ্ট চ্যানেল দুপুর ২টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত ১০ ঘন্টা সম্প্রচারিত হয়।

সপ্তম চ্যানেল দুপুর ১০টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত ১৪ ঘন্টা সম্প্রচারিত হয়।

নীল টিভিতে সকাল ১০টা থেকে রাত সন্ধা ৬টা পর্যন্ত মোট ৮ ঘন্টা সম্প্রচার হয়।

ডিশ এন্টিনার মাধ্যমে বিবিসি, স্টার টিভি ও সিএনএন ২৪ ঘন্টা সম্প্রচার হয়।

এম বি সি মিডলইস্ট ব্রডকাস্টিং সেন্টার লন্ডন থেকে ১২ ঘন্টা সম্প্রচারিত হয়।

📘 পশ্চিমা মিডিয়ার স্বরূপ > 📄 কায়রো রেডিও

📄 কায়রো রেডিও


রেডিও কুরআন সকাল ৭টা ৩৫ মিনিট থেকে রাত ১টা ৫৫ মিনিট পর্যন্ত ১৯ ঘন্টা সম্প্রচারিত হয়।

সাধারণ অনুষ্ঠান সর্বমোট ২২ ঘন্টা সম্প্রচারিত হয়।

সওতুল আরব সকাল ৭টা থেকে রাত ৪টা ১০ মিনিট পর্যন্ত সর্বমোট ২০ ঘন্টা সম্প্রচার চালায়।

মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক অনুষ্ঠান সর্বমোট ১২ ঘন্টা সম্প্রচারিত হয়।

রেডিও কুরআন শুধু তিলাওয়াতের জন্য নির্ধারিত। অন্যান্য রেডিও চ্যানেল থেকে দৈনিক মাত্র ২ ঘন্টা ২০ মিনিট 'দীনী ও নৈতিক অনুষ্ঠান প্রচারিত হয়।

কায়রো শহরে ২২টি সিনেমা হল, ৫টি নাট্যমঞ্চ, ২৫টি নাইট ক্ল্যাব, এবং সমুদ্রের ভেতরে ৮টি নাইট ক্লাব রয়েছে, যা নীল দরিয়ার উপকূলে অবস্থিত। এখানে চলন্ত নৌকার মধ্যে বিদেশী পর্যটকদের জন্য প্রোগ্রাম হয়। কায়রো সিনেমা হলগুলোতে দৈনিক ২৫টি মার্কিনী, ৮টি ফরাসী এবং ৬টি ভারতীয় সিনেমা প্রদর্শন করা হয়। সামগ্রিকভাবে সকাল সাড়ে ৯টা থেকে রাত সাড়ে ১২টা পর্যন্ত মোট ৩৯টি বিদেশী সিনেমা প্রদর্শন করা হয়।

মিসরী টেলিভিশনের সকল চ্যানেল থেকে দৈনিক ৬টি মার্কিনী, ১টি ফরাসী, ২টি ভারতীয়, ৬টি আরবী সিরিজ এবং ২টি আরবী নাটক সম্প্রচার করা হয়। রেডিও কায়রোতেও আরবী সিরিজ, নাটক ও সিনেমা সম্প্রচার করা হয়। এসব তো টিভি রেডিওর কথা। সংবাদপত্র ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার মাধ্যমে যে নগ্নতা, অশ্লীলতা ছড়ানো হচ্ছে তা তো আলাদা কথা।

পবিত্র রমযান মাসে এমবিসির বিশেষ অনুষ্ঠান দুপুর ১১টা থেকে রাত ২টা পর্যন্ত আরব বিশ্বের সকল দেশের জন্য সম্প্রচার করা হয়। ১৫ ঘন্টার এই অনুষ্ঠানে ১৪১৬ হিজরীতে দৈনিক ৩টি আরবী সিরিজ, ২টি আরবী সিনেমা ও ২টি মার্কিন সিনেমা সম্প্রচার করা হয়েছে। কায়রো টিভির সকল চ্যানেল রোযাকে সার্থক বানানোর জন্য একে অপরে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। সাপ্তাহিক আল মুজতামা আরব বিশ্বে মার্কিন সিনেমার আমদানী সম্পর্কে এক জরিপে লেখেছে, ডিশ এন্টিনার এই যুগে আরবরা সরাসরি ৩৫টি চ্যানেল থেকে তাদের ইচ্ছামতো অনুষ্ঠান উপভোগ করতে পারা সত্ত্বেও অতি চড়া মূল্যের রয়েলিটি দিয়ে সরকারী পর্যায়ে মার্কিন সিনেমা আমদানী করা হয়। জরিপে বলা হয়েছে, মিসরে ৮৫%, জর্ডানে ৬৫%, আরব আমিরাতে ৭৭%, তিউনিসিয়ায় ৭৮%, আলজেরিয়ায় ৭৯%, মরক্কোতে ৮২% এবং কুয়েতে ৭৭% মার্কিন সিনেমা প্রদর্শিত হয়। এসব দেশে প্রতিমাসে চারশ' নিষিদ্ধ ঘোষিত সিনেমার ভিডিও ক্যাসেট অনুপ্রবেশ করে। শিশুদের ৮৯% টিভি অনুষ্ঠানের জন্য অমুসলিম দেশ আমেরিকা জাপান থেকে প্রোগ্রাম আমদানী করা হয়। নতুন প্রজন্মের মন মস্তিষ্কে শেরেকী আকীদা-বিশ্বাস সুদৃঢ় করার জন্য অত্যন্ত শৈল্পিক দক্ষতা ও চতুরতার সাথে বিভিন্ন সিরিজ, নাটক, গেমস এবং কার্টুনও তৈরি করা হয়।

মুসলিম বিশ্বের বিরুদ্ধে পশ্চিমা মিডিয়ার যুদ্ধ কত ভয়াবহ, ব্যাপক, সুগভীর, সুদূরপ্রসারী, শক্তিশালী ও চতুর্মুখী, তার অনুমান এভাবে করা যেতে পারে, ভয়েস অফ আমেরিকা দৈনিক আরবীতে ৪৯ ঘন্টা অনুষ্ঠান সম্প্রচার করে।

ফ্রান্সের রেডিও মোনিয়ে কার্লো ৫২ ঘন্টা, বিবিসি ৮ ঘন্টা আরবী ভাষায় অনুষ্ঠান সম্প্রচার করে। রেডিও ফ্রিতাস, যা ভেটিকন সিটির তত্ত্বাবধানে খৃস্টবাদ প্রচার-প্রসারের জন্য উৎসর্গীকৃত-আরব বিশ্বের শ্রোতাদের জন্য ২৪ ঘন্টা অনুষ্ঠান সম্প্রচারের উদ্দেশ্যে বিশেষ রেডিও স্টেশন স্থাপন করেছে।

পশ্চিমা মিডিয়ার সরাসরি মুসলিম সমাজের ওপর আগ্রাসন এবং বিনা অনুমতিতে মুসলিম পরিবারে অনুপ্রবেশের শক্তিশালী চেষ্টা-প্রচেষ্টা দেখুন, অন্যদিকে সেসব মুসলিম দেশগুলোকেও দেখুন, যারা কোটি কোটি ডলার দিয়ে পশ্চিম থেকে এ বিষ আমদানী করছে এবং স্বদেশের দীনী ভাইদের হলকে জোরপূর্বক ঢেলে দিচ্ছে। ১২টি ইসলামী দেশ ৫০%, দশটি ইসলামী দেশ ৬৫%, নয়টি ইসলামী দেশ ৭২% এবং চারটি ইসলামী দেশ ৮০% টিভি রেডিও প্রোগ্রাম পশ্চিম থেকে আমদানী করে। মুসলিম দেশগুলোতে সরকার নিয়ন্ত্রিত মিডিয়ার মাধ্যমে পশ্চিমা দেশে তৈরি দেড় থেকে দুই লাখ ঘন্টার অনুষ্ঠান দেখানো হয় এবং এর জন্য লাখ লাখ পাউন্ড ও ডলার ব্যয় করা হয়।

১৪১৬ হিজরীর রমাযান মাসে কুয়েতের তথ্য মন্ত্রণালয় লেবানন ও সিরিয়া থেকে একটি নৃত্য ও কণ্ঠশিল্পী দলকে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। এর জন্য ৪৫ লাখ ডলার নগদ, ৩০ লাখ ডলার হোটেল ও ভ্রমণ বিল বাবদ ব্যয় করা হয়েছিল।

📘 পশ্চিমা মিডিয়ার স্বরূপ > 📄 কুয়েতী মিডিয়া

📄 কুয়েতী মিডিয়া


জার্মানীর বন থেকে প্রকাশিত মাসিক আর রায়েদ মরক্কোর ওপর পশ্চিমা মিডিয়ার আগ্রাসনের বিশ্লেষণ করে লেখেছে, মরক্কোর যুবক-যুবতীরা চ্যানেল-২ বেশি পছন্দ করে। কারণ এই চ্যানেল শুধু বিদেশী অনুষ্ঠান দেখায়। এই চ্যানেল ১৯৯৪ সালেই ১১২৫টি বিদেশী সিরিজ ও ৮০২টি আরবী সিনেমা প্রদর্শন করে। সামগ্রিকভাবে এই চ্যানেলটি ৩০৫৬টি চরিত্রবিধ্বংসী অনুষ্ঠান প্রচার করে চল্লিশ লাখ ডলার মুনাফা করেছে।

পশ্চিমা মিডিয়া আজ যা করছে একথাই পবিত্র কুরআন আজ থেকে চৌদ্দশ বছর পূর্বে বলে দিয়েছে-'একশ্রেণীর লোক আছে যারা মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে গোমরাহ করার উদ্দেশ্যে অবান্তর কথাবার্তা খরিদ করে অন্ধভাবে এবং তা নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করে, এদের জন্য রয়েছে অবমাননাকর শান্তি।' (সূরা লোকমান-৬)

মিসরের মোকাবেলায় কুয়েতে ১৯৬০ সালের পর পশ্চিমা মিডিয়ার প্রসার ঘটে। ১৯৬১ সাল পর্যন্ত কুয়েতে নৈতিক ও চারিত্রিক অপরাধ ছিল না বললেই চলে, কিন্তু পশ্চিমা মিডিয়ার ঢেউয়ে কুয়েতী সমাজেও নৈতিক ও চারিত্রিক অপরাধ সংঘটিত হতে শুরু করেছে। ইতোমধ্যেই পশ্চিমা সমাজব্যবস্থা কুয়েতী সমাজব্যবস্থাকে তার চাদরে ঢেকে নিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ দৈনিক আল কাবাসের ১৯৯৪ সালের ১০ই আগস্ট সংখ্যার একটি সার্ভে রিপোর্টের সংক্ষিপ্ত বিবরণ নিম্নে পেশ করা হলো।

সার্ভে রিপোর্টে বিভিন্ন অপরাধের সাথে জড়িত যুবক যুবতীদের পর্যালোচনা করতে গিয়ে বলা হয়েছে, ১৯৯২ সালে যে চারিত্রিক অপরাধ সংঘটিত হয়েছে তার সাথে জড়িত ১০ থেকে ১৮ বছর বয়সের নওজোয়ানদের সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৭ শ' ৯৭ জন। ২ হাজার ৮ শ' ২৮টি অপরাধের মধ্যে পুরুষের হার ৯৭% আর নারীদের হার ২.২%। সার্ভে রিপোটের বিস্তারিত বিবরণ নিম্নরূপ-

০১. ট্রাফিক আইন লংঘনকারীদের সংখ্যা ৯ শ' ৯২, এর মধ্যে মেয়েদের হার ৯৯ শতাংশ।

০২. মারদাঙ্গার ঘটনা ৭ শ' ২০, এর মধ্যে পুরুষের সংখ্যা ৭ শ' ৪ আর নারীদের সংখ্যা ৬।

০৩. চুরি ডাকাতির ঘটনা ৩ শ' ৫৪, এতে ৩ শ' ৪২ জন পুরুষ আর ১২ জন নারী গ্রেফতার হয়েছে।

০৪. ধর্ষণের ঘটনা সংখ্যা ৯৩।

০৫. নারীদের উত্ত্যক্তকরণ অশ্লীল কৌতুকের ঘটনা সংখ্যা ৬৩, এতে ৬০ জন পুরুষ ও ৩ জন মহিলা গ্রেফতার হয়েছে।

০৬. অপরহরণ ও ধর্ষণের ঘটনা ৩৭।

উল্লিখিত অপরাধের মধ্যে শুধু কুয়েত সিটিতেই ঘটেছে ২ হাজার ২ শ' ২৩টি। আর বাকী ৬ শ' ৩৬টি ঘটে অন্যান্য শহরে।

অন্যান্য আরব দেশ যেমন মরক্কো ও আলজেরিয়ায়ও অপরাধের হার মিসর এবং কুয়েতের মতো। উদাহরণস্বরূপ আলজেরিয়ায় যুবতী মেয়েদের আত্মহত্যার হার সকল আরব দেশ থেকে বেশি। ১৯৯৫ সালের এক জরিপে জানা যায়, অবৈধ সম্পর্কের ফলে যেসব মেয়ে আত্মহত্যা করেছে তাদের সংখ্যা ২ শ' ৮০। অল্প বয়স্ক যেসব ছেলে নৈতিক ও আর্থিক অপরাধে গ্রেফতার হয়েছে তাদের সংখ্যা শুধু রাজধানীতেই ৯ শ' ৫০।

আরব বিশ্বে ক্রমবর্ধমান সংঘটিত অপরাধও দেখুন এবং মিডিয়ার সরকারী পৃষ্ঠপোষকতাও দেখুন, কিভাবে সেসব সরকার দীন ধর্ম ও চরিত্রের পথে চলাকে শাস্তি যোগ্য অপরাধ সাব্যস্ত করেছে। পক্ষান্তরে পশ্চিমা জীবনপদ্ধতি এবং যৌন বিপথগামিতা ও বিশৃংখলার পথে চলাকে কিভাবে উৎসাহিত অনুপ্রাণিত করা হচ্ছে। এখানে আমরা দৈনিক আল আহরামের ১৯৯৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর সংখ্যা থেকে টিভি, রেডিও, সিনেমা ও নাটকের অনুষ্ঠানমালার একটি সংক্ষিপ্ত জরিপ পেশ করছি। এই জরিপ পেশ করার উদ্দেশ্য একথা বলা, আজ আমরা মুসলমানরাই কিভাবে নিজেরা নিজেদের হাতে কবর খুঁড়ছি।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00