📄 দারুল হেলাল
দৈনিক আল আহরামের পর পশ্চিমাদের সবচে' বড় মুখপত্র মাসিক আল হেলাল। আল হেলালের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন প্রসিদ্ধ খৃস্টান ধর্ম প্রচারক জুরজী যায়দান। এ প্রতিষ্ঠান থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক আল মোসাওয়ের এবং ঐতিহাসিক উপন্যাসসমূহ জুরজী যায়দানের পৃষ্ঠপোষকতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।১ জুরজী যায়দান ১৮৯২ সালে আল হেলাল পাবলিশিং হাউজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। নাম যদিও রাখেন আল হেলাল, কিন্তু এ সংস্থার মৌলিক উদ্দেশ্য আগাগোড়া ক্রুসেডারদের সেবা করা। এ সংস্থা থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক আল মোসাওয়ের ও ঐতিহাসিক উপন্যাসগুলো জুরজী যায়দানের পৃষ্ঠপোষকতা এবং তার অবস্থান শক্তিশালীকরণে বিরাট ভূমিকা পালন করে।
যায়দান ইতিহাস, সাহিত্য, দর্শন, ভাষা, উপন্যাস ইত্যাদি বিষয়ে প্রায় ৫০টি গ্রন্থ রচনা করেছেন, যার মধ্যে শুধু ২২টি ঐতিহাসিক উপন্যাস আর বাকী গ্রন্থগুলো ইসলামী তাহযীব-তামাদ্দুন, ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে আরব, সাধারণ ইতিহাস, আরবী ভাষা- সাহিত্য, দর্শনের ইতিহাস ইত্যাদি বিষয়ে রচিত। যায়দান তার লিখিত গ্রন্থাবলীতে সে পথ ও পদ্ধতিই অবলম্বন করেছেন, যা অবলম্বন করেছেন ওরিয়েন্টালিস্ট ও খৃস্টান মিশ- নারীরা এবং তাদের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য সামনে রেখেই তিনি পথ চলেছেন। জুরজী যায়দানের লিখিত গ্রন্থাবলী অধ্যায়ন করলে যে মৌলিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায় তা হলো, সিরিয়া, মিসর, স্পেন, তুরস্ক থেকে খৃস্টান রাষ্ট্রের পতনে দুঃখ প্রকাশ, খৃস্টানদের পরাজয়ের কারণ ব্যাখ্যা এবং মুসলিম মুজাহিদদের বীরত্ব-বাহাদুরী, আত্মত্যাগ এবং তাদের সামরিক ও ঈমানী শক্তিকে খাটো ও লাঞ্ছিত করা।
'ফাতাতু গাস্সান' ও 'স্পেন বিজয়' গ্রন্থে তিনি খৃস্টানদের প্রশংসা করেছেন, বড় বড় সাহাবাদের চরিত্র হনন করেছেন, ফুকাহা ও ওলামাদের হেয় করেছেন, ইসলামী ফিকাহ ও আইন প্রণয়নের গুরুত্বকে খাটো করেছেন, রোমান ল'র ভূয়সী প্রশংসা করেছেন, কোনো প্রমাণ ছাড়াই ইসলামী ইতিহাসের অবয়বকে বিকৃত করেছেন, ইসলাম ও ইসলামের পয়গম্বরের অবদানকে হেয় করেছেন, কুরআনকে মানব রচিত গ্রন্থ আখ্যা দিয়েছেন, আর এ সম্পর্কে ওরিয়েন্টালিস্টদের মতামত-অভিযোগকে সুন্দর মোড়কে উপস্থাপন করেছেন। তিনি রাসূলুল্লাহ (সা.) সম্পর্কে একথা প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন, তিনি হজ্জের সময় ওলামা-মাশায়েখদের সাথে মতবিনিময় করে জ্ঞান অর্জন করতেন। সিরিয়া সফরে খৃস্টান পাদরীর সাথে তাঁর সাক্ষাত ও তায়েফ সফরে খৃস্টান গোলাম সফরসঙ্গী হওয়া প্রমাণ করে, তিনি যা কিছু অর্জন করেছেন (নাউযু বিল্লাহ) খৃস্টানদের থেকেই অর্জন করেছেন।
যায়দান তার উপন্যাসসমূহকে ইসলামী নাম দিয়ে ওরিয়েন্টালিস্টদের মতো কোথাও জেহাদকে টার্গেট বানিয়েছেন, কোথাও সুলতান সালাহুদ্দীন আইয়ূবীর অবদান খাটো ও হেয় করেছেন এবং কোথাও ইসলামী সমাজের অবয়ব ক্ষত বিক্ষত করার অপপ্রয়াস চালিয়েছেন। ২ আল হেলালে ধারাবাহিক ঐতিহাসিক ও সাহিত্যমূলক উপন্যাস প্রকাশ করে নতুন প্রজন্মের মন মস্তিষ্ক বিষিয়ে তোলার নিরন্তর চেষ্টা করেছেন। তার প্রকাশনা সংস্থা থেকে প্রকাশিত অন্যান্য পত্র-পত্রিকা ও ম্যাগাজিনের মাধ্যমে এখনো একই ধারা অব্যাহত রয়েছে। তার মধ্যে সাপ্তাহিক আল মোসাওয়ের, তাবীবুকাল খাস, সাপ্তাহিক আল ইসনাইন, আল কাওয়াকেব ও হাওয়া বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এগুলো মহিলা ম্যাগাজিন। এতে আধুনিক পশ্চিমা ফ্যাশন এবং সেখানকার চলচ্চিত্র তারকাদের খবরাখবর ও উপন্যাস-কাহিনী প্রকাশ করা হয়ে থাকে।
আল হেলাল এবং এ সংস্থার মুদ্রিত গ্রন্থসমূহ আল আহরামের সহায়তায় ও যৌথ অংশীদারিত্বে মিসরে পশ্চিমা মূল্যবোধ ও ধ্যান-ধারণার প্রতিনিধিত্বকারী একটি মজবুত দল তৈরি করে দিয়েছে, যারা অতি বিশ্বস্ত শাগরেদের মতো আরব বিশ্বে পশ্চিমা ধ্যান-ধারণা ছড়ানোর কাজে প্রাণান্তকর প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে। আধুনিক আরব বিশ্বের সকল মিডিয়া আল হেলাল ও আল আহরামের ছায়াতলেই বিকশিত হচ্ছে। সব মিডিয়া এ দুটোকেই অনুসরণ করে চলছে। এক শতাব্দী ধরে এসব মিডিয়া সরকারের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে ইসলামের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী ময়দান তৈরি করেছে।
পশ্চিমা মিডিয়ার এই দুই শক্তিশালী মুখপত্র ইসলাম সম্পর্কে যদি কখনো কোনো আলোচনা করেও, তাহলে তা সরকারী ইসলামের মতো। যেমন সরকার একদিকে দুই ঈদের নামায আদায় করে, ঈদে মিলাদুন্নবীর অনুষ্ঠানে প্রতিনিধি প্রেরণ করে, অপরদিকে নৃত্যশিল্পী, গায়িকা, ফিল্ম স্টার ও ধর্মহীন নাস্তিক সাহিত্যিক বুদ্ধিজীবীদেরও স্বাগত জানায়, তাদের প্রশংসা করে, তাদের বড় বড় পুরস্কারে ভূষিত করে, সমাজে তাদের প্রতিষ্ঠা দান করে। এসব কাজের মাধ্যমে সরকার একথাই বুঝাতে চায়, এসব লোকই প্রকৃত সম্মানের অধিকারী। তারাই আলোকিত ও মুক্তচিন্তার অধিকারী।
পশ্চিমা মিডিয়ার এই দুই মুখপত্র ও তার ভাবশিষ্যরা গোটা আরব বিশ্বে যে দাওয়াত প্রচার-প্রসার করেছে তা হলো, ধর্ম ও রাজনীতির মধে? পার্থক্য, সাধারণ ভাষাকে প্রাধান্য দেওয়া, নাহু-সরফ ও বালাগাত থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকা, কুরআনের পরিবর্তে আধুনিক আরবী সাহিত্যকে নমুনা বানানো, সহশিক্ষা, ধর্মহীন সিলেবাস পাঠ্যসূচী করা, ইসলামী সমাজব্যবস্থার সংরক্ষণের পরিবর্তে আধুনিক চিন্তার পশ্চিমা জীবনপদ্ধতি গ্রহণ করা ও পশ্চিমা সভ্যতা-সংস্কৃতি জীবনের সর্বস্তরে বাস্তবায়নের আহবানকে মনোজ্ঞ ভঙ্গিতে গল্প, উপন্যাস, চলচ্চিত্র ও ইন্টারভিউর মাধ্যমে উপস্থাপন করা উদ্দেশ্য ছিল। উদাহরণস্বরূপ আল হেলাল ধর্ম ও রাজনীতির পার্থক্যের ওপর চারটি শক্তিশালী প্রবন্ধ প্রকাশ করার পর পাঠকের মতামত ও প্রতিক্রিয়া জানার জন্য নিম্নের প্রশ্নগুলো উত্থাপন করে-
০১. আমরা কি দীন ধর্ম বাদ দিয়ে সামগ্রিক উন্নতি সাধন করতে পারব?
০২. আপনি ব্যক্তিগতভাবে রাজনীতি পছন্দ করেন, না দীনকে প্রাধান্য দেন।
০৩. ধর্ম কি প্রগতির পথে অন্তরায়?
০৪. ইউরোপের অর্থনৈতিক ও বৈজ্ঞানিক উন্নতির প্রধান কারণগুলো কি?
০৫. আরব বিশ্ব কি ইউরোপের মতো উন্নতি করতে পারবে?
সে সময় যারা তাদের ইচ্ছা অভিরুচি অনুযায়ী উল্লিখিত প্রশ্নগুলোর সঠিক সুন্দর জবাব দিতে পেরেছে, তাদের মূল্যবান পুরস্কারে ভূষিত করার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। পুরস্কারপ্রাপ্তদের নাম ঠিকানা ও ছবি পত্রিকায় প্রকাশ করা হয়েছে, তাদের পৃষ্ঠপোষকতা দেয়া হয়েছে, ইউরোপের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষা অর্জনের জন্য স্কলারশীপ দেয়া হয়েছে এবং সেখানকার লেখাপড়া শেষ করার পরও তাদের পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান, তাদের গুণকীর্তন ও প্রশংসাবাদ অব্যাহত রাখা হয়েছে। লুতফী সাইয়েদ, সালামা মূসা, ত্বাহা হুসাইন, লুইস এওয়াজ তাওফীকুল হাকীম, নাজীব মাহফুজ, মুহাম্মদ তাবেয়ী, আহমদ যাকী ও আনীস মানসূর প্রমুখ সে যুগের স্মৃতি পাশ্চাত্য মিডিয়ার প্রতিপালিত এবং পৃষ্ঠপোষকতা প্রাপ্তদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য। ৩ আল হেলাল ও আল আহরাম একদিকে যেমন পশ্চিমা চিন্তা-চেতনা, ধ্যান-ধারণা ও মূল্যবোধের শক্তিশালী ভাষ্যকার হিসেবে নিজেকে উৎসর্গ করে দিয়েছে, তেমনি সঠিক চিন্তাধারার ইসলামী দাঈ, দীনী আন্দোলনসমূহ ও তার নেতৃবর্গের চরিত্র হননের অব্যাহত প্রয়াস চালিয়ে আসছে।
পশ্চিমা মিডিয়ার এই দুই বড় মুখপত্র একদিকে যেমন খ্যাতনামা সাংবাদিক সাহিত্যিক সৃষ্টি করেছে, তেমনি আরব নারীদেরও সাহিত্য-সাংবাদিকতার ময়দানে অবতীর্ণ করেছে। সর্বদিক দিয়ে তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করেছে এবং উৎসাহ অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে। এরকম আরব নারীর উদাহরণস্বরূপ ফাতেমা রোজ আল ইউসুফের নাম করা যায়। তিনি একজন প্রসিদ্ধ নৃত্যশিল্পী ছিলেন। তিনি দীর্ঘ দিন আল আহরাম ও আল হেলালের ছায়াতলে প্রতিপালিত হয়েছেন। এরপর সাপ্তাহিক রোজ আল ইউসুফ বের করে সাহিত্য সাংবাদিকতার ময়দানে পা রাখেন এবং এ সাপ্তাহিকীর মাধ্যমে মিসরী নারীদেরকে অশ্লীল লেখার প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। তার মাধ্যমে এমন একটি দল তৈরি হয়, যারা বিশেষভাবে মিসরী নারীদের এবং সাধারণভাবে আরব নারীদের ঘর ও পরিবার থেকে বের করে আনার প্রাণান্তকর প্রয়াস চালিয়েছে। নারীদের এই টিম শুধু সাহিত্য-সাংবাদিকতা নয়; বরং অভিনয়ের ক্ষেত্রেও নগ্নতা, অশ্লীলতা ও বেলেল্লাপনার সকল রেকর্ড ভঙ্গ করেছে।৪
প্রসিদ্ধ সাংবাদিক মোস্তফা আমীনের পালিত শিষ্য প্রখ্যাত নারী সাংবাদিক আমীনা সাঈদ এমন নগ্নতা ও অশ্লীলতার আহবান জানিয়েছেন এবং বিশেষ করে আরব রাজ প্রাসাদসমূহের অভ্যন্তরীণ জীবনের এমন চিত্র অংকন করেছেন, যা শুনলে মানবতার ললাট ঘর্মাক্ত হয়ে যায়। এই নারীর লেখাকে ভারতের নারী ঔপন্যাসিকদের মধ্যে ইসমত চুগতাই ও ওয়াজেদা তাবাসসুম (এবং বাংলাদেশি বিতর্কিত লেখিকা তাসলিমা নাসরিনের) লেখার সাথে তুলনা করা যেতে পারে।
টিকাঃ
১. জুরজী যায়দান লেবাননে জন্ম গ্রহণ করেন। ফ্রান্সের এক মিশনারী তাদের নিজ দায়িত্বে তাকে শিক্ষা-দীক্ষা দিয়ে বিশেষ উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য মিসর প্রেরণ করেন। মিসরে সে খৃস্টান মিশনারীসমূহের উদ্দেশ্য পূরণের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করে দেয়। এও প্রমাণিত হয়েছে, জুরজী যায়দান ফ্রান্স মিশনারীসমূহ থেকে নিয়মতান্ত্রিক বেতন-ভাতা পেত। অপরদিকে তিনি ফ্রান্স পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাও ছিলেন। তার লিখিত প্রসিদ্ধ গ্রন্থাবলীর মধ্যে রয়েছে, ০১. তারিখু আদাবিল লুগাতিল আরাবিয়া (চার খণ্ড), ০২. তারিখুত তামাদ্দুন আল ইসলামী (পাঁচ খ), ০৩. আল আরব কাবলাল ইসলাম, ০৪. তারিখুল লুগাতিল আরাবিয়া প্রভৃতি। এছাড়া তিনি অনেকগুলো সাড়া জাগানো উপন্যাস লেখেছেন। সেগুলো হল-ফাতাতু গামসান, ফাতহুল আন্দালুস, আরমানুসা আল মিসরিয়া, আল আবাসাহ, শাজারাতুত দুরার, আরুস ফারগানা, ফাতাতুল কেরওয়ান, আযরা কুরাইশ, গাদাতু কারবালা প্রভৃতি। তার লিখিত গ্রন্থের সংখ্যা সর্বমোট ৫০টি।
২. আল্লামা শিবলী নোমানী (র.) জুরজী যায়দানের লিখিত তারীখুত তামাদ্দুন আল ইসলামী গ্রন্থের দালীলিক ও দাঁতভাঙ্গা জবাব দিয়েছেন এবং ধোকা প্রবঞ্চনার পর্দা উম্মোচন করেছেন। সর্বোপরি এ গ্রন্থপ্রণেতার ইলমী খেয়ানত ও খবিসীপনার অত্যন্ত বলিষ্ঠ জবাব দিয়েছেন। আল্লামা শিবলীর এ কিতাব 'আল ইনতিকাদু আলা তারীখিত তামাদ্দুনিল ইসলামী' নামে ছাপা হয়েছে।
৩. আলী আমীন, মোস্তফা আমীন, মূসা সাবেরী, আহমদ বাহাউদ্দীন ও মুহাম্মদ তাবেয়ী সেসব সাংবাদিকদের অন্তর্ভূক্ত, যাদেরকে তাদের লেখার জন্য হাজার হাজার পাউন্ডের পুরস্কার ও ইউরোপ সফরের ব্যয়বহুল খরচ দেয়া হয়েছে। মুহাম্মদ আত তাবেয়ীর আত্মজীবনী 'নিসাউন ফী হায়াতী' পড়লে জানা যায়, খোদ এই সাংবাদিক মিসর ও মিসরের বাইরে নৈতিক অপরাধের কর্দমে আকণ্ঠ ডুবে থাকত। মিসর সরকারের পক্ষ থেকে এসব সাংবাদিক ও অশ্লীল লেখকদের এভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করা হতো যে, তাদের লেখার ওপর সরকারের পক্ষ থেকে অনেক মোটা অংকের বি-িনময় দেয়া, অতঃপর তাদের রচিত উপন্যাসগুলোকে সিনেমার রূপ দিয়ে এবং অশ্লীল লেখাগুলো সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত করে অর্থ আহরণ করা হতো এ ধারা এখানো অব্যাহত রয়েছে। কারণ আরব বিশ্বের মিডিয়াগুলো মূলত সরকারই পরিপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করে।
৪. সর্বসাম্প্রতিক তথ্য মোতাবেক যেসব মিসরী, ও আলজেরিয়ান অভিনেত্রী চিত্র জগতে পদার্পণ করেছে এবং অবাধ মেলামেশা ও নগ্নতার প্রতিনিধিত্ব করেছে, তাদের এগার জন এই পেশা থেকে ফিরে এসেছে। তাদের মধ্যে-শামসুল বারুদী, হালা সিদকী এবং মাদীহা ইয়াসমীন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
📄 মিসরী মিডিয়ার দৃষ্টান্ত
নিম্নে মিসরী মিডিয়ার কিছু নমুনা ও দৃষ্টান্ত পেশ করা হলো।
০১. প্রসিদ্ধ সাংবাদিক যাকী আবদুল কাদের, মোস্তফা আমীন, নাজীব মাহফুজ ও ইহসান আবদুল কুদ্দুস প্রমুখ তাদের লেখায় প্রকাশ্য জন্মনিয়ন্ত্রণ, ফ্রি-সেক্স ও অবাধ নারী স্বাধীনতার এবং নৃত্যকার, গীতিকার ও অভিনেতা-অভিনেত্রীদের সম্মান দেয়ার জোরালো আহবান জানিয়েছেন। মোস্তফা আমীন নাচকে ইবাদতের সাথে তুলনা করেছেন। তিনি বলেন, কারখানায় কাজ করা তাদের উঁচু ইবাদতের সমার্থক। (আল আহরাম, ২২ সেপ্টেম্বর, ১৯৬৫)
০২. ইহসান আবদুল কুদ্দুস, ইউসুফ আস সুবায়ী, আহমদ বাহাউদ্দীন, আনিস মানসূর ও মুহাম্মদ আত-তাবেয়ী প্রমুখ তাদের লেখায় পাশ্চাত্য সভ্যতার প্রকাশ্য প্রশংসা করেছেন এবং সরকারের নিকট জোর আবেদন জানিয়েছেন, আধুনিক চিন্তা-ধারার অধিকারী পাশ্চাত্য জাতির মতো আমাদের সরকারেরও পতিতালয়ের লাইসেন্স দেয়া উচিত। আনিস মানসূর লেখেছেন, প্রবৃত্তিকে দাবিয়ে রাখা এবং অস্থির জীবন যাপনের পরিবর্তে সামান্য গুনাহ করায় কোনো ক্ষতি নেই। (আল আহরাম, ২১ মে, ১৯৬৬)
০৩. নারী সাংবাদিক আমীনা সাঈদ ছাত্রীদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে লেখেছেন, মনস্তাত্ত্বিক অস্থিরতা আর টানাপড়েন থেকে রক্ষা পাওয়ার সহজ পদ্ধতি হলো, অনৈতিকতাকে সামান্য সময়ের জন্য গ্রহণ করে নেয়া। (সাবাহুল খায়র, ৩রা এপ্রিল, ১৯৬৬)
০৪. সাংবাদিক আনিস মানসূর তার রচিত 'হাওয়া' পুস্তিকায় পাশ্চাত্য ফ্যাশনকে প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং বোরকাকে তাঁবুর সাথে তুলনা করেছেন। প্রসিদ্ধ মহিলা লেখিকা মাদীহা রোজ আল ইফসুফ ম্যাগাজিনে লেখেন, যৌন রোগ ও বিপথগামিতা থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় পতিতালয়ে গিয়ে বাস্তব প্রশিক্ষণ গ্রহণ করা। এর দ্বারা যৌন বিষয়ে অভিজ্ঞতা অর্জিত হওয়ার পাশাপাশি লজ্জা ও লাজুকতা নির্মূল হবে। (সাবাহুল খায়র, ৩রা ডিসেম্বর, ১৯৬৫)
কায়রো, বৈরুত, লন্ডন ও প্যারিস থেকে প্রকাশিত নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনসমূহের মালিক, সম্পাদক ও সাংবাদিক খৃস্টান। এসব ম্যাগাজিনের মধ্যে আশ শুবকা, আস সাইয়াদ, হাওয়া, হুওয়া হিয়া, আল কাওয়াকেব নগ্ন ছবি এবং অশালীন কাহিনীর কারণে লাখ লাখ কপি বিক্রি হয়। এসব ম্যাগাজিনের পদাঙ্ক অনুসরণে আল আখবার ও আল জমহুরিয়ার অধিকাংশ কলাম লেখক খৃস্টান এবং উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সাংবাদিক নাস্তিক বেদীন। ১৯৬৩ সাল থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত মিসরী মিডিয়ার গতিপথ কি ছিল, তা সে সময়কার সংবাদপত্রের বিভিন্ন শিরোনাম দ্বারা সহজেই অনুমিত হয়।
ক. এক নৃত্যশিল্পী তার ছাত্র বন্ধুর ফ্ল্যাটে আত্মহত্যা করেছে। (আল আখবার, ২৯ জুন, ১৯৬২)
খ. ষোল বছর বয়সী এক ছাত্রী একা ইউরোপ সফর করেছে, তোমরাও অভিজ্ঞতা অর্জন কর। (আল আহরাম, ২৯ জুন, ১৯৬৩)
গ. হাঁটুর ওপরে পোশাক পরা একটি নতুন ফ্যাশন। (আশ শুবকা, ৪ঠা আগস্ট, ১৯৬৫)
ঘ. তোমরা নিজের স্ত্রীকে অন্যের স্ত্রীর মতো মনে করে দেখ। (আস সাইয়াদ, জুন ১৯৬৫)
ঙ. এ সপ্তাহের সবচে' সুন্দরী ও হার্টথ্রব নারী। (আল কাওয়াকেব, মে ১৯৫৬)
আশ-শুবকা ম্যাগাজিন আরব বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আধুনিকমনা নারীদের সাক্ষাতকার নিয়ে সহশিক্ষা, নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা ও অফিস-আদালতে নারী-পুরুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এক সাথে কাজ করার উপকারিতার ওপর বিস্তারিত আলোকপাত করেছে। (আশ শুবকা, মার্চ, ১৯৬৪)
মাসিক হাওয়া, হুওয়া হিয়া, আস সাইয়াদ ও সাপ্তাহিক রোজ আল ইউসুফ পত্রিকাগুলো অবাধ যৌন স্বাধীনতা, স্বামীর কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, তালাকের প্রতি উৎসাহ, দাম্পত্য জীবনের ওপর সন্দেহ-সংশয়ের ছায়া ফেলা, জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী ব্যবহার, নারীদের প্যান্ট-শার্ট পরা, নারীদের চুল ছোট করা, পুরুষের চুল লম্বা করা, বিজ্ঞাপনী সংস্থায় নারীদের চাকরি করা ও বিজ্ঞাপনে মডেল গার্ল হওয়া ইত্যাদি বিষয়ের প্রতি অত্যন্ত জোর দিয়ে থাকে।
দৈনিক আল জমহুরিয়া ১৯৬০ সাল থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত তার প্রচার বৃদ্ধি করার জন্য দু'টি পদক্ষেপ গ্রহণ করে। প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে অশ্লীল লেখকদের মোটা-অংকের অর্থ দিয়ে ইউরোপ-আমেরিকায় সংঘটিত বিভিন্ন যৌন ও এ সংক্রান্ত ঘটনাবলী ও কাহিনী ধারাবাহিক প্রচার শুরু করে।
দ্বিতীয় পদক্ষেপ হিসেবে প্রতিদিন পত্রিকার সাথে কুপন ছাপা শুরু করে। এতে পাঠক একদিকে পত্রিকা পড়তে পারত, অপরদিকে কোনো সিনেমা হলে কুপনটি প্রদর্শন করে অর্ধেক মূল্যে সিনেমাও দেখতে পারত।
প্রসিদ্ধ মিসরী খৃষ্টান সাংবাদিক লুইস এওয়াজ ও মূসা সাবরী তাদের লেখায় ফেরাউনী সভ্যতা এবং গ্রীক চিন্তাধারা গ্রহণ করার খোলাখুশি দাওয়াত দিয়েছেন, ইতিহাসের বস্তুতান্ত্রিক ব্যাখ্যা, মার্কসবাদের দাওয়াত এবং পিতা-মাতা ও সমাজের আধিপত্য থেকে মুক্তি পাওয়া, জায়নবাদের সাথে সম্পর্ক সুসংহত ও মজবুত করা এবং আরবদের পরিবর্তে পশ্চিমাদের সাথে জনগণের ভাগ্য সম্পৃক্ত করার প্রাণান্তকর প্রয়াস চালিয়েছেন।
গীতিকারদের মধ্যে আবদুল ওয়াহাব, উম্মে কুলসুম, আবদুল হালীম হাফিজ, ফরীদুল আতরাশ ও ফিরোজ প্রমুখ উপাস্যের মর্যাদা লাভ করে। এমনকি এক গায়িকার ইন্তেকালে কয়েকজন নওজোয়ান ছেলে-মেয়ে আত্মহত্যা করে।
📄 মিসরী টেলিভিশন
আরব বিশ্বের দেশসমূহে মিডিয়ার ওপর সেখানকার সরকারগুলোর পরিপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। মিডিয়ার চারপাশে সেসব লোকেরই আধিপত্য, যারা পরিপূর্ণভাবে পাশ্চাত্যের ছাঁচে ঢেলে সাজানো। এর পাশাপাশি যদি মিডিয়ার জন্য সরকারের আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা, শক্তি, সমর্থন এবং সরকারের পক্ষ থেকে পরিপূর্ণ স্বাধীনতা থাকে তাহলে মিডিয়ার অসাধারণ শক্তি ও প্রভাব-প্রতিক্রিয়া সহজেই অনুমান করা যায়। জনমত গঠন এবং মেধা মনন প্রস্তুতের সকল উপায়-উপকরণের ওপর যখন কোন গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হয় এবং তার সীমাহীন শক্তির পাশাপাশি যদি আর্থিক যোগানও থাকে তাহলে তার শক্তির কল্পনা করাও কঠিন ব্যাপার। স্যাটেলাইট ও ডিশ এন্টিনার এই যুগে টিভির সর্বগ্রাসী সুদূরপ্রসারী প্রভাব-প্রতিক্রিয়ার অনুমানও করা যায় না।
পশ্চিমা মিডিয়া বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য হচ্ছে, আমাদের কাজ শুধু প্রশিক্ষণ ও পথ প্রদর্শন পর্যন্তই সীমাবদ্ধ নয়; বরং আমাদের মৌলিক দায়িত্ব হলো, সমাজজীবনে যা কিছু ঘটে যাচ্ছে তার ঝলক জনগণকে সরাসরি দেখিয়ে দেয়া এবং দ্বিতীয় মৌলিক দায়িত্ব হলো, প্রত্যেক নাগরিকের ইচ্ছা অভিরুচির প্রশান্তির উপায়-উপকরণ সরবরাহ করা, যাতে প্রত্যেকে তার ইচ্ছা অভিরুচি অনুযায়ী প্রোগ্রাম অনুষ্ঠান দেখতে পারে।
শুধু মিসরী টিভিই নয়; বরং গোটা আরব বিশ্বের টিভি প্রোগ্রামগুলো এই পাশ্চাত্য দর্শনের আলোকে পরিচালিত হচ্ছে। যদি পাশ্চাত্যের ধ্বংসাত্মক দর্শন মেনে নেয়া হয় তাহলে এর অর্থ হবে, কল্যাণ, অকল্যাণ ও পবিত্রতার সাথে অপবিত্রতা, কলুষতা, নিরর্থক কাজকর্ম এবং সৌন্দর্য রূপ-লাবণ্যের সাথে কুৎসিত কদাকার চেহারাকেও এমন ভঙ্গিতে উপস্থাপন করা, যাতে মন্দ থেকে ভাল, অকল্যাণ থেকে কল্যাণ ও অপবিত্রতা থেকে পবিত্রতা কোনো পথ খুঁজে না পায়। কার্যতঃ মন্দকে এমন সুন্দর চিত্তাকর্ষক মোড়কে উপস্থাপন করা, যাতে এটাই সবার প্রিয় পছন্দনীয় বিষয়ে পরিণত হয়। অথচ আয়না দেখার উপকারিতাই হচ্ছে, তাতে দেখে চেহারার ময়লা ও দাগ দূর করা।
পক্ষান্তরে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মিডিয়ার মৌলিক দায়িত্ব, জাতিকে শিক্ষা-দীক্ষা ও পথ প্রদর্শনের গঠনমূলক মৌলিক দায়িত্ব সঠিকভাবে আঞ্জাম দেয়া, হিদায়াত ও সত্যের আলো ছড়িয়ে দেওয়া এবং কল্যাণ মঙ্গলের প্রতিচ্ছবি চিত্তাকর্ষক ভঙ্গিতে উপস্থাপন করা, কিন্তু সমস্যা হলো, মিডিয়াকে যেসব লোক নিয়ন্ত্রণ করে তারা এই মৌলিক নীতিমালার স্বীকৃতি দেয় না। আবার বেশির ভাগ লোকের পছন্দ অভিরুচি মোতাবেক অনুষ্ঠান উপস্থাপন করার বিষয়টিও তাদের নিকট গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ কিছু লোক আছে যারা অশ্লীল গান-বাজনা, আনন্দ-বিনোদন, অবাধ যৌন মেলামেশা এবং অনৈতিক সিনেমার পাগল ও প্রেমিক। আর কিছু লোক আছে যারা দীনী দাওয়াত, উন্নত চারিত্রিক মূল্যবোধ, জেহাদের প্রাণ ও আল্লাহর যমীনে আল্লাহর দীন বিজয়ী করার চেতনায় সিক্ত পবিত্র, সংযমী, আল্লাহভীতির জীবন যাপনে অভ্যস্ত এবং তার আহবানকারী। এখন এ দুই বিপরীতমূখী রুচি ও পছন্দের লোককে একই সাথে একই সময়ে সন্তুষ্ট রাখা সম্ভব নয়। এজন্য পশ্চিমা ফর্মুলা অনুযায়ী তারা প্রথম পথই বেছে নিয়েছে। যদি সাধারণ লোকের পছন্দ অভিরুচি অনুযায়ী অনুষ্ঠানমালা উপস্থাপনের দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা হয়, তাহলে-মিসরী জনগণের সংখ্যাগরিষ্ঠ ইসলামকে পছন্দ করে এবং ইসলামের শিক্ষামালার আলোকে জীবন পরিচালনা করতে প্রত্যাশী-এই বাস্তবতা কেন পশ্চাতে নিক্ষেপ করা হয়।
১৯৯৫ সালের জুলাই মাসে মিসরী টেলিভিশনের ৩৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে তথ্য মন্ত্রণালয় এক আনন্দ সভার আয়োজন করে। সে সময় টিভি অনুষ্ঠানমালার ওপর একটি পর্যালোচনাও করা হয়। তাতে সরকারের পক্ষ থেকে স্বীকার করা হয়েছে, নাচ, গান, ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দর্শক-শ্রোতাদের চেতনা জাগ্রত করার প্রচেষ্টা অত্যন্ত প্রশংসাযোগ্য, কিন্তু সে পর্যালোচনায় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হিসেবে কোথাও দীনী ও চারিত্রিক প্রোগ্রামের কথা উল্লেখ করা হয়নি। প্রসিদ্ধ মিসরী রিসার্চ স্কলার ইবরাহীম গানেম 'মিসরী টেলিভিশন ও ইসলামী সংস্কৃতি' শিরোনামে একটি গ্রন্থ প্রকাশ করেন, তাতে ১৯৮৮ সাল থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত মিসরী টেলিভিশনের মাঠ পর্যায়ের জরিপ বিদ্যমান রয়েছে। সেই জরিপে মিসরী টেলিভিশনের যে ত্রুটি ও দুর্বলতা সামনে আসে তা শুধু মিশরী টেলিভিশনের ক্ষেত্রেই নয়; বরং গোটা আরব বিশ্বের টেলিভিশনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কারণ আরব বিশ্বের মিডিয়া মিসরী মিডিয়ার ধাঁচেই পরিচালিত হয়। কেননা, আরব বিশ্বের মিডিয়াগুলো মিসরী মিডিয়ার ভাবশিষ্যরাই পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ করে।
📄 মিসরীয় মিডিয়া সম্পর্কে অভিজ্ঞতার ফল
মিসরী সংখ্যাগরিষ্ঠ লোকদের মন-মস্তিষ্ক ও চেতনায় দীনের যে মর্যাদাবোধ রয়েছে এবং যেভাবে সকল সমস্যা সংকটের সমাধান তারা দীন ইসলামকেই মনে করে, মিসরী ইলেকট্রনিক মিডিয়াগুলো সে অনুযায়ী প্রোগ্রাম উপস্থাপন করে না। তাদের সম্প্রচারিত অনুষ্ঠানমালা দেখে মনে হয় দীন দুনিয়া আলাদা আলাদা ঘরে বিভক্ত এবং দৈনন্দিন জীবনের সমস্যা সংকটের সাথে ইসলামের কোনো সম্পর্ক নেই। নিম্নে মিসরী মিডিয়া সম্পর্কে অভিজ্ঞতার ফল তুলে ধরা হল-
০১. মিসরী মিডিয়ায় দীনী অনুষ্ঠানমালা সম্প্রচার করার ধরন অতি নিম্ন মানের। তার মধ্যে কোনো আকর্ষণ ও নতুনত্ব নেই। আর না শৈল্পিক চাহিদার প্রতি লক্ষ্য রাখা হয়।
০২. মিসরী নয়টি টিভি চ্যানেল দৈনিক ১৬৬ ঘন্টা অনুষ্ঠানমালা সম্প্রচার করে। এর মধ্যে দীনী প্রোগ্রাম সম্প্রচারের হার মাত্র ৩%। তন্মধ্যে সূচনা অনুষ্ঠান, সমাপনী অনুষ্ঠান, কুরআন তিলাওয়াত এবং হামদ-না'ত ইত্যাদিও অন্তর্ভুক্ত।
০৩. ৯০ শতাংশ দীনী অনুষ্ঠানমালা তখন সম্প্রচার করা হয় যখন টিভির সামনে দর্শক-শ্রোতার সংখ্যা খুবই নগণ্য থাকে। এসব প্রোগ্রাম ৫ থেকে ১৫ মিনিটের বেশি দীর্ঘ হয় না, তাও আবার বেশির ভাগ সময় 'দুর্বল শরীরে সর্দি' প্রবাদের মতো কোনো ম্যাচ কিংবা কোনো রাষ্ট্রপ্রধানের আগমন কিংবা পুলিশ অথবা এমনি কোনো আনন্দানুষ্ঠান উপলক্ষে দীনী প্রোগ্রামের সম্প্রচার মুলতবি করে দেয়া হয়।
০৪. ফিলিস্তীন সংক্রান্ত স্পর্শকাতর রাজনৈতিক সমস্যা, বিশেষ করে ফিলিস্তিনী ইন্তেফাদা ও হামাস আন্দোলন এবং ইসরাঈলের সাথে মিসরের সম্পর্ক, কূটনৈতিক যোগাযোগ ইত্যাদি বিষয়ের দিকে মিসরী টিভি কোনো দৃষ্টি দেয় না। অথচ ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ইসরাঈলের সাথে মিসরের সুসম্পর্ক ক্ষতিকর প্রমাণিত হবে কিনা, এমনিভাবে শিক্ষা-দীক্ষা, মাদকদ্রব্য, নারীদের চাকরি এবং মিসরী সমাজ দেহের অনিষ্ট অকল্যাণ নির্মূল করার জন্য দীন ও শরীয়তের ভূমিকা এমন কিছু বিষয়, যা মিসরী জনগণের সাথে সুগভীরভাবে জড়িয়ে আছে, কিন্তু মিডিয়া এর প্রতি কোনো গুরুত্বই দেয় না। অতি সুকৌশলে এ গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক বিষয়গুলো এড়িয়ে যায়। যদি ইসলামী শরীয়া বিষয়ে কোনো আলোচনা-পর্যালোচনা হয়ও, তবে তা হয় ইসলামী আইন প্রণয়নের দর্শন নিয়ে। ইসলামী সভ্যতা-সংস্কৃতি বিষয়ে মিসরী টিভি যেসব প্রোগ্রাম উপস্থাপন করে তা পর্যালোচনা করলে জানা যায়, মিসরী মিডিয়া ইসলামী সভ্যতা-সংস্কৃতির মাত্র দু'টি দিক নিয়ে আলোচনা করে। এক. ইসলামী দাওয়াত ও তার চাহিদা। দুই. আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি ও অবস্থান, কিন্তু ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলো নিয়ে মোটেও আলোচনা করে না। যেমন- অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও শিক্ষা-প্রশিক্ষণ বিষয়ক সমস্যা সংকট সমাধানে ইসলাম কি সমাধান পেশ করেছে এবং মুসলমানদের দীনী, আধ্যাত্মিক ও সামাজিক জীবন কিভাবে সঠিক সুন্দর হতে পারে প্রভৃতি। যারা মিসরী মিডিয়ার জন্য দীনী প্রোগ্রাম তৈরি করেন তারা অত্যন্ত সংকীর্ণ চিন্তা-ভাবনা করেন এবং নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রাধান্য দেন, সাধারণ জনগণের চাহিদা, অভিরুচি, মনোভাব ও দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি কোনো ভ্রুক্ষেপ করেন না। তারা গোটা মিডিয়ার ওপর একতরফা ট্রাফিকের মতো থাবা বিস্তার করে আছে।
মিসরী তথ্য মন্ত্রণালয়ের দাবী অনুযায়ী পবিত্র রমযান মাসে অন্যান্য মাসের তুলনায় দীনী অনুষ্ঠামালা পঞ্চাশ শতাংশ বৃদ্ধি করে দেয়া হয়, কিন্তু এই দীনী অনুষ্ঠানমালার আসল বাস্তবতা কি? এ বিষয়ে একটি বিশ্লেষণমূলক পর্যালোচনা দৈনিক আশ-শারকুল আওসাত প্রকাশ করেছে, যার সার-সংক্ষেপ নিম্নরূপ-
০১. একেবারে ইফতারের সময় লক্ষ লক্ষ পাউন্ডের পুরস্কার সম্বলিত বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক অনুষ্ঠান প্রচার করা হয়, যা মিসরের সুন্দরী তারকাদের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয়। প্রত্যেক দিন নতুন নতুন নৃত্য ও গানের মাধ্যমে এ অনুষ্ঠান সম্প্রচার করা হয়। আধ ঘণ্টার এই অনুষ্ঠানের পর পরই হাসি-কৌতুক, নাটক কিংবা যৌন সুড়সুড়িমূলক সিরিজ প্রচার করা হয়।
০২. মিসরী টিভির ৯৭% অনুষ্ঠান সুন্দরী নারীরা উপস্থাপন করে।
০৩. ৯৮% বিজ্ঞাপন উপস্থাপন করে নারীরা। ২৫% বিজ্ঞাপনে যৌন সুড়সুড়ি ও উসকানি থাকে।
০৪. ৯০% সিনেমায় নগ্নতা, ইজ্জত লুণ্ঠন, প্রেম-ভালবাসা, যৌন অপরাধ ও নৈতিক অবক্ষয়ের ঘটনা বিদ্যমান থাকে।
০৫. মিসরের সিনেমা হলগুলোতে ৮০% মার্কিন চলচ্চিত্র ও ১৭% ভারতীয় চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হয়। এসব চলচ্চিত্রে কট্টরপন্থা ও যৌন মিলনের উন্মুক্ত দৃশ্য প্রদর্শিত হয়।
০৬. মিসরী সেন্সর বোর্ড বিশটি সিনেমাকে অশ্লীল সাব্যস্ত করে তার প্রদর্শন নিষিদ্ধ ঘোষণা করে, কিন্তু মিসরী টেলিভিশন পবিত্র রমযান মাসে সেগুলো প্রদর্শন করে।
আইনে শামস ইউনিভার্সিটির উচ্চতর গবেষণা ও প্রশিক্ষণ বিভাগ মিসরে বিদেশী সিনেমার প্রভাব-প্রতিক্রিয়ার ওপর একটি জরিপ পরিচালনা করে। উক্ত জরিপ থেকে জানা যায়, বিদেশী সিনেমায় মার-দাঙ্গা ও যৌন উগ্রতার আধিক্যের কারণে মিসরীয় নির্মাতারাও সেই পথ অবলম্বন করতে বাধ্য হয়েছে এবং পশ্চিমা ও ভারতীয় সিনেমাকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেছে। তাদের নির্মিত বেশির ভাগ সিনেমা এ্যাকশন ও যৌন সুড়সুড়িমূলক। সেসব সিনেমার নায়ক বাহ্যিকভাবে সাদা পোশাকধারী হলেও কিন্তু আন্তর্জাতিক মাফিয়া ডন। যাদের প্রধান বৈশিষ্ট্য হত্যা, লুণ্ঠন ও রক্তপাত। তারা সামান্য কথাতেই রিভলবার ও মেশিনগান দিয়ে ডজনে ডজনে মানুষকে ভূনা করে রেখে দেয়। সশস্ত্র ডাকাতি করে, নারীদের অপহরণ ও ধর্ষণ করে। এসব করেও তারা বেঁচে যায় এবং মন ভরে যাবতীয় আরাম বিলাস ভোগ করে। এমনকি তার বাস্তবতা প্রকাশ হয়ে পড়ে।