📄 ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
পশ্চিমা দেশে সিনেমা, নাটক ও সাংবাদিকতার যুগের সূচনা হয় উনিশ শতকের শেষের দিকে, কিন্তু আরব বিশ্বে সিনেমা ও নাটকের প্রচলন হতে বেশি সময় লাগেনি। কারণ সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিজয় ও মিডিয়া শিল্পের ওপর ইহুদী পুঁজিপতিদের একচেটিয়া কর্তৃত্বের ভিত্তিতে ১৮৭৬ সালে সাংবাদিকতা ও ১৮৯৭ সালে চলচ্চিত্র শিল্প সর্বপ্রথম মিসর ও লেবাননে, এরপর পর্যায়ক্রমে অন্যান্য আরব দেশে স্বীয় থাবা বিস্তার করতে সক্ষম হয়। ১৯১৩ সাল থেকে আরব বিশ্বে নির্বাক চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী শুরু হয়।
১৮৯৭ সালের জানুয়ারীতে যখন কায়রোর প্রসিদ্ধ উজবেক পার্কে সিনেমার প্রথম সুটিং শুরু হয় তখন গোটা দেশে হৈ চৈ পড়ে যায়। চারদিকে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বইতে থাকে। এই সিনেমার মালিক ও পরিচালক একজন ইহুদী পুঁজিপতি মোসিউ ডালাস্টার লোগো। মিসর সরকার এ ইহুদীকে সারা দেশে এ চলচ্চিত্র প্রদর্শনের সাধারণ অনুমতি প্রদান করে।
১৯০০ থেকে ১৯১৭ সাল পর্যন্ত ফ্রান্সের এক ইহুদী চলচ্চিত্র নির্মাণ কোম্পানী অতঃপর ইটালির দ্বিতীয় ইহুদী কোম্পানী 'ব্যাংক দ্বি রোমা'র আর্থিক সহযোগিতায় মিসরে সর্বপ্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে চলচ্চিত্র কোম্পানীর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে।
১৯১৮ সাল থেকে ১৯২৭ সাল পর্যন্ত তুরস্কে ইহুদী পুঁজিপতিরা ইটালির ইহুদী ধনাঢ্য ব্যক্তি স্টিফেনের সহযোগিতায় মিসরের সিনেমা শিল্পে পুঁজি বিনিয়োগ করে।
১৯২৬ সালে দুই মিসরী ইহুদী সহোদর আবরাহাম ও বদরলামা এস্কান্দারিয়াতে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ কোম্পানীর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে। তাদের কোম্পানী প্রথম যে সিনেমাটি নির্মাণ করে তার নাম-'রুডলফ ওয়েনেস্টো। এ সিনেমায় শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ইহুদীদের অত্যাচারিত নিপীড়িত হওয়ার ইতিহাস বর্ণনা করা হয়েছে। এ কোম্পানী 'সালাহুদ্দীন' নামে আরেকটি সিনেমা নির্মাণ করে, যা শৈল্পিক সৌন্দর্য, সততা, বস্তুনিষ্ঠতা ও ঐতিহাসিক বাস্তবতা নির্ভর হওয়ার কারণে একটি শক্তিশালী ও জ্ঞানগর্ভ সিনেমা হিসেবে খ্যাতি লাভ করে। আলোচ্য দু'টি সিনেমা ছাড়াও আলোচ্য ভ্রাতৃদ্বয় ১৯২৬ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত প্রায় সত্তরটি এমন সিনেমা নির্মাণ করে, যাতে অশ্লীলতা ও নগ্নতার পাশাপাশি ইসলামী শিক্ষা ও ইসলামী ব্যক্তিত্বদের বিরুদ্ধে এমন বিষাক্ত উপকরণ ছিল, যা নতুন প্রজন্মের মন-মস্তিস্ককে ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে সীমাহীন বিষাক্ত করে তোলে। এর মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী ইসলাম, ইসলামী শিক্ষা ও ইসলামী ব্যক্তিত্বদের সম্পর্কে ঘৃণা ও অসম্মানবোধের এক বিষাক্ত পরিবেশ তৈরি হয়।
১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত যেসব চলচ্চিত্র সরকারী অর্থায়নে নির্মিত হয়েছে, তার মধ্যে ১৪২টি সম্পূর্ণ হলিউডের অনুকরণে, বাকী ২৭৬টি মিসরীয় সমাজের বিভিন্ন কাহিনী ও ঘটনা নিয়ে নির্মিত হয়েছে। মিশরী সিনেমায় কর্মরত অভিনেতা, অভিনেত্রী ও শিল্পীদের ৮০% আরবী নামে প্রসিদ্ধ ছিল, কিন্তু তাদের সবার জাতীয়তা ইহুদী। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু নাম হলো, আসিয়া দাগের, মাযরাহী, মিশেল সোহায়লোব (আরবী নাম ওমর শরীফ), নাজমা ইবরাহীম, রাকিয়া ইবরাহীম, লায়লা মুরাদ, ক্যামেলিয়া, রাজা আবদুহু, জিবরিল তিলহামী, মারিয়া মনিব, জর্জ আবইয়াজ, দৌলত আবইয়াজ, নজিব আর রায়হানী, ইলিয়াস মোআদ্দাব, ইয়াকুব সানু, আবু নাজ্জারা, নাজওয়া সালেম (আসল নাম নিনাত সালাম) ইত্যাদি।
চলচ্চিত্র শিল্পের ওপর ইহুদীদের বিস্তৃত থাবার কারণে ১৯৪০ সাল থেকে ১৯৫১ সালের সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে হলিউড শুধু ইহুদীদের বিষয়ে ৫৩টি চলচ্চিত্র নির্মাণ করে, যার সবগুলোই আরবীতে রূপান্তরিত হয়েছে। মিসরীয় মিডিয়ায় ইহুদীদের কর্তৃত্ব ও আধিপত্য সম্পর্কে উল্লেখ করে প্রসিদ্ধ ইসরাঈলী সাংবাদিক সাহিত্যিক ফোর্স শাম্মাস (জন্ম কায়রোতে)-লেখেন, বিশ শতকে আরব বিশ্বে যেসব চলচ্চিত্র, নাটক ও সংবাদপত্র সামনে এসেছে তার প্রতিষ্ঠা ও তাতে বিনিয়োগ পর্যন্তই ইহুদী পুঁজিপতিরা সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং অভিনয়ের ক্ষেত্রেও ইহুদী শিল্পীরা সবার থেকে এগিয়ে। তারা তাদের প্রকৃত নাম গোপন রেখে আরবী নামে এসব চলচ্চিত্রে কাজ করেছে। ঊনবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় ও চতুর্থ দশকে সিনেমা নির্মাণ, নাটক সৃষ্টিতে, গান রচনা ও লিটারেচার সৃষ্টিতে ইহুদীদের অবদান রয়েছে। প্রসিদ্ধ চলচ্চিত্র নির্মাতা পরিচালক টোগো মাযরাহীই সর্বপ্রথম মিসরে আরবী সিনেমার গোড়াপত্তন করেন। প্রসিদ্ধ গায়িকা লায়লা মুরাদ ইহুদী বংশোদ্ভূত। যদিও তিনি পরবর্তীতে ইসলাম গ্রহণ করেন। এমনিভাবে আসতার শাত্তাহ, দাউদ হাসানী, মুরাদ ফারাহ এবং ডজনের পর ডজন সাংবাদিক, সমালোচক ও সাহিত্যিকদের সবাই ছিল ইহুদী, যারা তাদের জাতীয় স্বার্থে মিসরী মিডিয়ায় সক্রিয় কর্মতৎপর ছিল। এভাবেই ইহুদীরা মিসরী মিডিয়ায় দখলদারিত্ব ও আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে।
১৯২৬ সাল থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত মিসরে মিডিয়ার ভরপুর স্বাধীনতা ছিল। এ সময়ের মধ্যে মিডিয়া চতুর্দিকে তার হাত-পা প্রসারিত করে। ইহুদী নির্মাতারা যেসব চলচ্চিত্র ও নাটক নির্মাণ করে, মিসরী বুদ্ধিজীবীদের রচিত সাহিত্য ইহুদী চলচ্চিত্র নির্মাতাদের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ও চিন্তাধারার সমর্থন করেছে। মিসরী বুদ্ধিজীবীদের ইহুদী চলচ্চিত্র নির্মাতাদের লক্ষ্য উদ্দেশ্য ও চিন্তাধারার সমর্থন নতুন প্রজন্মের মন-মস্তিস্কে ইহুদীদের রোপিত বীজ ও চারায় ধারাবাহিক খোরাক সরবরাহ করতে থাকে। যেহেতু শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে কর্মরত বুদ্ধিজীবীদের মস্তিষ্ক প্যারিস এবং লন্ডনেই গঠিত হয়েছিল, সে জন্য পশ্চিমা চিন্তা-দর্শন ও মূল্যবোধ আরব বিশ্বে স্থান করে নিতে তেমন একটা বেগ পেতে হয়নি এবং কোনো বাধারও সম্মুখিন হয়নি। খুব দ্রুত পশ্চিমা চিন্তা-দর্শন, মূল্যবোধ ও সভ্যতা-সংস্কৃতি আরব বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। ঢুকে পড়ে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। পুরো গোষ্ঠীই সক্ষম হয় স্থায়ী আসন করে নিতে।
📄 মিসরী মিডিয়া : একটি জরিপ ও বিশ্লেষণ
মিসরে ফরাসী আগ্রাসনের পর পরই পশ্চিমা মিডিয়া একটি শক্তিশালী ও মজবুত সেনাবাহিনীর মতো নিজের রণাঙ্গন সামলে নেয়। সেমতে মিসর থেকে সংবাদপত্র ও ম্যাগাজিন প্রকাশের জন্য লেবাননী সাংবাদিকদের ডেকে আনা হয়, যাদের পুরো গোষ্ঠীই ছিল খৃষ্টান। এই গ্রুপ মিসরের রাজধানী কায়রোকে আরব বিশ্বের হৃৎপিন্ডে পশ্চিমা মিডিয়া ও সভ্যতা-সংস্কৃতির একটি শক্তিশালী কেন্দ্ররূপে গড়ে তোলার দৃঢ় সংকল্প ব্যক্ত করে। যা হবে একটি স্বতন্ত্র চিন্তা কেন্দ্র। যেখান থেকে গোটা আরব বিশ্বে চিন্তার খোরাক যোগান দেয়া হবে।
কায়রো থেকে ১৮২৮ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর তারিখে সরকারী গেজেট হিসেবে 'আল ওয়াকায়ে আল মিসরিয়্যাহ'র প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয়। এরপর ১৮৭৬ সালের ১৫ই আগস্ট দ্বিতীয় দৈনিক পত্রিকা আল আহরাম প্রকাশিত হয়, যাকে আরব বিশ্বে পশ্চিমা মিডিয়ার মুখপাত্র ও চিন্তাদর্শনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বলা যায়। আজো এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক সালিম ওয়া বাশার! তুকলার নাম পত্রিকার ললাটে লিপিবদ্ধ আছে।
দৈনিক আল আহরামের চেহারায় ফেরাউনী ইতিহাস ও সভ্যতা সংস্কৃতির নিদর্শন তিন ইমারতকে মনোগ্রাম হিসাবে রাখা হয়েছে। পত্রিকাটির নাম ও মনোগ্রাম থেকে এ ধারণা দেয়াই উদ্দেশ্য ছিল যে, ইসলাম, ইসলামী বিশ্ব ও মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ মিসরের সাথে এ পত্রিকার কোন সম্পর্ক থাকবে না। অতএব সূচনালগ্ন হতেই পত্রিকাটি তার মৌলিক লক্ষ্য-উদ্দেশ্য, চিন্তা-চেতনা, অভিরুচি ও আকর্ষণ অনুরাগ লুকানোর চেষ্টা করেনি; বরং দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেছে, আল আহরাম শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত খৃস্টানদের মুখপত্র অথবা পশ্চিমা মিডিয়ার নকীব প্রতিনিধি। একথা পত্রিকা প্রকাশের চতুর্থ দিনই দেশবাসী সুস্পষ্টভাবে বুঝতে সক্ষম হয়েছে। যখন তারা আল আহরামের মিসর ও আরব বিশ্বের বড় বড় শহরগুলোর এজেন্ট ও প্রতিনিধিদের নাম ঘোষণা করে। তাদের সবাই ছিল খৃস্টান। একজনও মুসলমান ছিল না। পত্রিকাটির এসব এজেন্ট প্রতিনিধি হলব, দামেশক, বৈরুত, সূর, সায়দা, হাইফা, আক্কা, কুদস, এস্কান্দারিয়া, তানতা এবং অন্যান্য মিসরী শহরের সাথে সম্পর্কিত ছিল।
একথার আরো প্রমাণ হলো, পত্রিকার সূচনালগ্ন থেকেই তার প্রথম পৃষ্ঠাগুলো সেসব সংবাদকেই গুরুত্ব দেয়া হতো, যার সম্পর্ক পশ্চিমা বিশ্ব ও সেখানকার রাজনীতি, অর্থনীতি, সামাজ, সভ্যতা-সংস্কৃতি, শিক্ষা-প্রশিক্ষণ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সাথে সংশ্লিষ্ট। পত্রিকার প্রথম সংখ্যাতেই ছয়টি সংবাদ শিরোনাম ছিল পশ্চিমা শাসকবর্গ, তাদের স্ত্রী এবং তাদের ভ্রমণ পর্যটন ও বক্তৃতা-বিবৃতি সম্পর্কিত। আর দুইটি সংবাদ ছিল লেবানন সম্পর্কে, তাও আবার খৃস্টানদের বাণিজ্য সংক্রান্ত।
আল আহরাম পত্রিকা প্রথম দিন থেকেই লক্ষ্য স্থির করেছে, সে মিসরের অভ্যন্ত রীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করবে না এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির ব্যাপারে যে কোনো উত্তেজনাকর সংবাদ সম্পাদকীয় প্রকাশ থেকে দূরে থাকবে। সেমতে এ পত্রিকা তার শত বছরের ইতিহাসে কোন জুলুম, অতিরঞ্জন, জবরদখল এবং রাজনৈতিক ও সামরিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে কোনো আওয়াজ তোলেনি, কিন্তু মিসরের সামাজিক, ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক বিষয়ে সে সর্বদা সেদিককেই বেশি প্রাধান্য দিয়েছে, যা পশ্চিমা চিন্তা-চেতনা ও মূল্যবোধের নিকটবর্তী। সে তার পৃষ্ঠাগুলোকে অত্যন্ত উদারতার সাথে ইহুদী-খৃস্টান লেখক, নাস্তিক-ধর্মহীন সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও আরব জাতীয়তাবাদের প্রবক্তাদের জন্য উৎসর্গ করে দিয়েছে। যারা পূর্ণ স্বাধীনতার সাথে মিসরের ঐতিহ্যময় ইসলামী ভূমিকা ও তার দীনি স্বাতন্ত্র্যবোধ সম্পূর্ণ বিকৃত করে দিয়েছে; বরং এগুলো সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করার জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে।
দৈনিক আল আহরাম বর্তমানে আরব বিশ্বের সবচে' জনপ্রিয় ও সর্বাধিক প্রচারিত পত্রিকা। আঠাশ পৃষ্ঠা সম্বলিত এ পত্রিকার রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, সামাজিক, ঐতিহাসিক, সাহিত্য ও বুদ্ধিবৃত্তিক পৃষ্ঠাগুলো বিশ্লেষণ করলে জানা যায়, এতে দীন ধর্ম, নৈতিকতা ও চরিত্র সংক্রান্ত কোনো সংবাদ ও প্রবন্ধ-নিবন্ধ নেই বললেই চলে। শুধু জুমাবারে ধর্ম দর্শন পাতায় অর্ধ পৃষ্ঠাব্যাপী একটি মাত্র ধর্মীয় লেখা ছাপা হয়। পত্রিকার বাকী সংবাদের ৯৫% থাকে জনগণের জীবন ঘনিষ্ঠ ও তাদের সমস্যা-সংকট সংশ্লিষ্ট বিষয়ে। ধর্মীয় কোনো সংবাদ থাকলেও তাতে নেতিবাচক ক্ষতিকর দিক থাকে বেশি। যেমন-সভ্যতা, সংস্কৃতি, বুদ্ধিবৃত্তি ও সামাজিক বিষয় সম্পর্কিত লেখাগুলোতে নাস্তিকতা, ধর্মহীনতা ও পশ্চিমা ধ্যান-ধারণা ছড়ানো হয়। ফেরাউনী সভ্যতা-সংস্কৃতি, ইতিহাস-ঐতিহ্য এবং পশ্চিমা চিন্তাদর্শন, তার সমাজব্যবস্থা, রাজনীতি ও অর্থনৈতিক উৎকর্ষ ইত্যাদি বিষয়ে অত্যন্ত বিস্তারিতভাবে লেখা হয়। ইসলামের বিরোধিতা ও ইসলামবিরোধী রাষ্ট্র প্রধানদের জন্য পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা ব্যয় করা হয়। যেমন-সাইপ্রাসের পাদরী ম্যাকারিউস, ইথিওপিয়ান মুসলমান হত্যাকারী হাইলে সেলাসী, তানজানিয়ার মুসলমানদের শত্রু জুলিয়স লয়ারে, সোমালিয়ার লিওপোল্ড সেঞ্জার, ফিলিপাইনের মুসলমানদের হত্যাকারী মারকোস প্রমুখের প্রশংসায় মিসরী মিডিয়ার এই মুখপত্র পঞ্চমুখর। পক্ষান্তরে এ পত্রিকা ওসমানী সালতানাত তথা তুর্কী খেলাফতকে সাম্রাজ্যবাদ আখ্যায়িত করে। মুসলিম বাদশাহদের মধ্যে শাহ সউদ ও শাহ ফয়সালের চরিত্র হননের ধারা বছরের পর বছর ধরে অব্যাহত রয়েছে। এখন পর্যন্ত ইসলাম ও ইসলামের সাথে সম্পৃক্ত যে কোনো বিষয়ের বিরুদ্ধে ঘৃণা বিদ্বেষ ছড়ানো হচ্ছে। আল আহরাম পশ্চিমা জীবনঘনিষ্ঠ সকল বিষয়ের প্রশংসা, তার পৃষ্ঠপোষকতা, পশ্চিমা সিনেমা, নির্মাতা, অভিনেতা-অভিনেত্রী, অভিনয়শিল্পী, পশ্চিমা নাটক ও তার ভূমিকা, উপন্যাস, কাহিনী, ধর্মহীন ধ্যান-ধারণা ও সভ্যতা-সংস্কৃতির প্রচার-প্রসারকে উন্নতির শেষ স্তর মনে করে। খৃস্টান মিশনারী ও তার আধ্যাত্মিক ব্যক্তিদের পবিত্রতা বর্ণনা, তাদের ত্যাগ তিতিক্ষার আলোচনা এবং তাদের জীবনকে আদর্শ হিসেবে পেশ করাই আল আহরাম পত্রিকা নিজের মৌলিক দায়িত্ব মনে করে। পক্ষান্তরে মুসলমান ও মুসলমান ওলামাদের বিরুদ্ধে বিষোদগার, ঠাট্টা-বিদ্রুপ, উপহাস, কার্টুন ও ফটোর মাধ্যমে তাদের সমাজে হেয় ও খাটো করাই মূলত তাদের প্রধান কাজ।
📄 দারুল হেলাল
দৈনিক আল আহরামের পর পশ্চিমাদের সবচে' বড় মুখপত্র মাসিক আল হেলাল। আল হেলালের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন প্রসিদ্ধ খৃস্টান ধর্ম প্রচারক জুরজী যায়দান। এ প্রতিষ্ঠান থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক আল মোসাওয়ের এবং ঐতিহাসিক উপন্যাসসমূহ জুরজী যায়দানের পৃষ্ঠপোষকতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।১ জুরজী যায়দান ১৮৯২ সালে আল হেলাল পাবলিশিং হাউজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। নাম যদিও রাখেন আল হেলাল, কিন্তু এ সংস্থার মৌলিক উদ্দেশ্য আগাগোড়া ক্রুসেডারদের সেবা করা। এ সংস্থা থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক আল মোসাওয়ের ও ঐতিহাসিক উপন্যাসগুলো জুরজী যায়দানের পৃষ্ঠপোষকতা এবং তার অবস্থান শক্তিশালীকরণে বিরাট ভূমিকা পালন করে।
যায়দান ইতিহাস, সাহিত্য, দর্শন, ভাষা, উপন্যাস ইত্যাদি বিষয়ে প্রায় ৫০টি গ্রন্থ রচনা করেছেন, যার মধ্যে শুধু ২২টি ঐতিহাসিক উপন্যাস আর বাকী গ্রন্থগুলো ইসলামী তাহযীব-তামাদ্দুন, ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে আরব, সাধারণ ইতিহাস, আরবী ভাষা- সাহিত্য, দর্শনের ইতিহাস ইত্যাদি বিষয়ে রচিত। যায়দান তার লিখিত গ্রন্থাবলীতে সে পথ ও পদ্ধতিই অবলম্বন করেছেন, যা অবলম্বন করেছেন ওরিয়েন্টালিস্ট ও খৃস্টান মিশ- নারীরা এবং তাদের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য সামনে রেখেই তিনি পথ চলেছেন। জুরজী যায়দানের লিখিত গ্রন্থাবলী অধ্যায়ন করলে যে মৌলিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায় তা হলো, সিরিয়া, মিসর, স্পেন, তুরস্ক থেকে খৃস্টান রাষ্ট্রের পতনে দুঃখ প্রকাশ, খৃস্টানদের পরাজয়ের কারণ ব্যাখ্যা এবং মুসলিম মুজাহিদদের বীরত্ব-বাহাদুরী, আত্মত্যাগ এবং তাদের সামরিক ও ঈমানী শক্তিকে খাটো ও লাঞ্ছিত করা।
'ফাতাতু গাস্সান' ও 'স্পেন বিজয়' গ্রন্থে তিনি খৃস্টানদের প্রশংসা করেছেন, বড় বড় সাহাবাদের চরিত্র হনন করেছেন, ফুকাহা ও ওলামাদের হেয় করেছেন, ইসলামী ফিকাহ ও আইন প্রণয়নের গুরুত্বকে খাটো করেছেন, রোমান ল'র ভূয়সী প্রশংসা করেছেন, কোনো প্রমাণ ছাড়াই ইসলামী ইতিহাসের অবয়বকে বিকৃত করেছেন, ইসলাম ও ইসলামের পয়গম্বরের অবদানকে হেয় করেছেন, কুরআনকে মানব রচিত গ্রন্থ আখ্যা দিয়েছেন, আর এ সম্পর্কে ওরিয়েন্টালিস্টদের মতামত-অভিযোগকে সুন্দর মোড়কে উপস্থাপন করেছেন। তিনি রাসূলুল্লাহ (সা.) সম্পর্কে একথা প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন, তিনি হজ্জের সময় ওলামা-মাশায়েখদের সাথে মতবিনিময় করে জ্ঞান অর্জন করতেন। সিরিয়া সফরে খৃস্টান পাদরীর সাথে তাঁর সাক্ষাত ও তায়েফ সফরে খৃস্টান গোলাম সফরসঙ্গী হওয়া প্রমাণ করে, তিনি যা কিছু অর্জন করেছেন (নাউযু বিল্লাহ) খৃস্টানদের থেকেই অর্জন করেছেন।
যায়দান তার উপন্যাসসমূহকে ইসলামী নাম দিয়ে ওরিয়েন্টালিস্টদের মতো কোথাও জেহাদকে টার্গেট বানিয়েছেন, কোথাও সুলতান সালাহুদ্দীন আইয়ূবীর অবদান খাটো ও হেয় করেছেন এবং কোথাও ইসলামী সমাজের অবয়ব ক্ষত বিক্ষত করার অপপ্রয়াস চালিয়েছেন। ২ আল হেলালে ধারাবাহিক ঐতিহাসিক ও সাহিত্যমূলক উপন্যাস প্রকাশ করে নতুন প্রজন্মের মন মস্তিষ্ক বিষিয়ে তোলার নিরন্তর চেষ্টা করেছেন। তার প্রকাশনা সংস্থা থেকে প্রকাশিত অন্যান্য পত্র-পত্রিকা ও ম্যাগাজিনের মাধ্যমে এখনো একই ধারা অব্যাহত রয়েছে। তার মধ্যে সাপ্তাহিক আল মোসাওয়ের, তাবীবুকাল খাস, সাপ্তাহিক আল ইসনাইন, আল কাওয়াকেব ও হাওয়া বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এগুলো মহিলা ম্যাগাজিন। এতে আধুনিক পশ্চিমা ফ্যাশন এবং সেখানকার চলচ্চিত্র তারকাদের খবরাখবর ও উপন্যাস-কাহিনী প্রকাশ করা হয়ে থাকে।
আল হেলাল এবং এ সংস্থার মুদ্রিত গ্রন্থসমূহ আল আহরামের সহায়তায় ও যৌথ অংশীদারিত্বে মিসরে পশ্চিমা মূল্যবোধ ও ধ্যান-ধারণার প্রতিনিধিত্বকারী একটি মজবুত দল তৈরি করে দিয়েছে, যারা অতি বিশ্বস্ত শাগরেদের মতো আরব বিশ্বে পশ্চিমা ধ্যান-ধারণা ছড়ানোর কাজে প্রাণান্তকর প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে। আধুনিক আরব বিশ্বের সকল মিডিয়া আল হেলাল ও আল আহরামের ছায়াতলেই বিকশিত হচ্ছে। সব মিডিয়া এ দুটোকেই অনুসরণ করে চলছে। এক শতাব্দী ধরে এসব মিডিয়া সরকারের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে ইসলামের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী ময়দান তৈরি করেছে।
পশ্চিমা মিডিয়ার এই দুই শক্তিশালী মুখপত্র ইসলাম সম্পর্কে যদি কখনো কোনো আলোচনা করেও, তাহলে তা সরকারী ইসলামের মতো। যেমন সরকার একদিকে দুই ঈদের নামায আদায় করে, ঈদে মিলাদুন্নবীর অনুষ্ঠানে প্রতিনিধি প্রেরণ করে, অপরদিকে নৃত্যশিল্পী, গায়িকা, ফিল্ম স্টার ও ধর্মহীন নাস্তিক সাহিত্যিক বুদ্ধিজীবীদেরও স্বাগত জানায়, তাদের প্রশংসা করে, তাদের বড় বড় পুরস্কারে ভূষিত করে, সমাজে তাদের প্রতিষ্ঠা দান করে। এসব কাজের মাধ্যমে সরকার একথাই বুঝাতে চায়, এসব লোকই প্রকৃত সম্মানের অধিকারী। তারাই আলোকিত ও মুক্তচিন্তার অধিকারী।
পশ্চিমা মিডিয়ার এই দুই মুখপত্র ও তার ভাবশিষ্যরা গোটা আরব বিশ্বে যে দাওয়াত প্রচার-প্রসার করেছে তা হলো, ধর্ম ও রাজনীতির মধে? পার্থক্য, সাধারণ ভাষাকে প্রাধান্য দেওয়া, নাহু-সরফ ও বালাগাত থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকা, কুরআনের পরিবর্তে আধুনিক আরবী সাহিত্যকে নমুনা বানানো, সহশিক্ষা, ধর্মহীন সিলেবাস পাঠ্যসূচী করা, ইসলামী সমাজব্যবস্থার সংরক্ষণের পরিবর্তে আধুনিক চিন্তার পশ্চিমা জীবনপদ্ধতি গ্রহণ করা ও পশ্চিমা সভ্যতা-সংস্কৃতি জীবনের সর্বস্তরে বাস্তবায়নের আহবানকে মনোজ্ঞ ভঙ্গিতে গল্প, উপন্যাস, চলচ্চিত্র ও ইন্টারভিউর মাধ্যমে উপস্থাপন করা উদ্দেশ্য ছিল। উদাহরণস্বরূপ আল হেলাল ধর্ম ও রাজনীতির পার্থক্যের ওপর চারটি শক্তিশালী প্রবন্ধ প্রকাশ করার পর পাঠকের মতামত ও প্রতিক্রিয়া জানার জন্য নিম্নের প্রশ্নগুলো উত্থাপন করে-
০১. আমরা কি দীন ধর্ম বাদ দিয়ে সামগ্রিক উন্নতি সাধন করতে পারব?
০২. আপনি ব্যক্তিগতভাবে রাজনীতি পছন্দ করেন, না দীনকে প্রাধান্য দেন।
০৩. ধর্ম কি প্রগতির পথে অন্তরায়?
০৪. ইউরোপের অর্থনৈতিক ও বৈজ্ঞানিক উন্নতির প্রধান কারণগুলো কি?
০৫. আরব বিশ্ব কি ইউরোপের মতো উন্নতি করতে পারবে?
সে সময় যারা তাদের ইচ্ছা অভিরুচি অনুযায়ী উল্লিখিত প্রশ্নগুলোর সঠিক সুন্দর জবাব দিতে পেরেছে, তাদের মূল্যবান পুরস্কারে ভূষিত করার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। পুরস্কারপ্রাপ্তদের নাম ঠিকানা ও ছবি পত্রিকায় প্রকাশ করা হয়েছে, তাদের পৃষ্ঠপোষকতা দেয়া হয়েছে, ইউরোপের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষা অর্জনের জন্য স্কলারশীপ দেয়া হয়েছে এবং সেখানকার লেখাপড়া শেষ করার পরও তাদের পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান, তাদের গুণকীর্তন ও প্রশংসাবাদ অব্যাহত রাখা হয়েছে। লুতফী সাইয়েদ, সালামা মূসা, ত্বাহা হুসাইন, লুইস এওয়াজ তাওফীকুল হাকীম, নাজীব মাহফুজ, মুহাম্মদ তাবেয়ী, আহমদ যাকী ও আনীস মানসূর প্রমুখ সে যুগের স্মৃতি পাশ্চাত্য মিডিয়ার প্রতিপালিত এবং পৃষ্ঠপোষকতা প্রাপ্তদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য। ৩ আল হেলাল ও আল আহরাম একদিকে যেমন পশ্চিমা চিন্তা-চেতনা, ধ্যান-ধারণা ও মূল্যবোধের শক্তিশালী ভাষ্যকার হিসেবে নিজেকে উৎসর্গ করে দিয়েছে, তেমনি সঠিক চিন্তাধারার ইসলামী দাঈ, দীনী আন্দোলনসমূহ ও তার নেতৃবর্গের চরিত্র হননের অব্যাহত প্রয়াস চালিয়ে আসছে।
পশ্চিমা মিডিয়ার এই দুই বড় মুখপত্র একদিকে যেমন খ্যাতনামা সাংবাদিক সাহিত্যিক সৃষ্টি করেছে, তেমনি আরব নারীদেরও সাহিত্য-সাংবাদিকতার ময়দানে অবতীর্ণ করেছে। সর্বদিক দিয়ে তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করেছে এবং উৎসাহ অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে। এরকম আরব নারীর উদাহরণস্বরূপ ফাতেমা রোজ আল ইউসুফের নাম করা যায়। তিনি একজন প্রসিদ্ধ নৃত্যশিল্পী ছিলেন। তিনি দীর্ঘ দিন আল আহরাম ও আল হেলালের ছায়াতলে প্রতিপালিত হয়েছেন। এরপর সাপ্তাহিক রোজ আল ইউসুফ বের করে সাহিত্য সাংবাদিকতার ময়দানে পা রাখেন এবং এ সাপ্তাহিকীর মাধ্যমে মিসরী নারীদেরকে অশ্লীল লেখার প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। তার মাধ্যমে এমন একটি দল তৈরি হয়, যারা বিশেষভাবে মিসরী নারীদের এবং সাধারণভাবে আরব নারীদের ঘর ও পরিবার থেকে বের করে আনার প্রাণান্তকর প্রয়াস চালিয়েছে। নারীদের এই টিম শুধু সাহিত্য-সাংবাদিকতা নয়; বরং অভিনয়ের ক্ষেত্রেও নগ্নতা, অশ্লীলতা ও বেলেল্লাপনার সকল রেকর্ড ভঙ্গ করেছে।৪
প্রসিদ্ধ সাংবাদিক মোস্তফা আমীনের পালিত শিষ্য প্রখ্যাত নারী সাংবাদিক আমীনা সাঈদ এমন নগ্নতা ও অশ্লীলতার আহবান জানিয়েছেন এবং বিশেষ করে আরব রাজ প্রাসাদসমূহের অভ্যন্তরীণ জীবনের এমন চিত্র অংকন করেছেন, যা শুনলে মানবতার ললাট ঘর্মাক্ত হয়ে যায়। এই নারীর লেখাকে ভারতের নারী ঔপন্যাসিকদের মধ্যে ইসমত চুগতাই ও ওয়াজেদা তাবাসসুম (এবং বাংলাদেশি বিতর্কিত লেখিকা তাসলিমা নাসরিনের) লেখার সাথে তুলনা করা যেতে পারে।
টিকাঃ
১. জুরজী যায়দান লেবাননে জন্ম গ্রহণ করেন। ফ্রান্সের এক মিশনারী তাদের নিজ দায়িত্বে তাকে শিক্ষা-দীক্ষা দিয়ে বিশেষ উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য মিসর প্রেরণ করেন। মিসরে সে খৃস্টান মিশনারীসমূহের উদ্দেশ্য পূরণের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করে দেয়। এও প্রমাণিত হয়েছে, জুরজী যায়দান ফ্রান্স মিশনারীসমূহ থেকে নিয়মতান্ত্রিক বেতন-ভাতা পেত। অপরদিকে তিনি ফ্রান্স পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাও ছিলেন। তার লিখিত প্রসিদ্ধ গ্রন্থাবলীর মধ্যে রয়েছে, ০১. তারিখু আদাবিল লুগাতিল আরাবিয়া (চার খণ্ড), ০২. তারিখুত তামাদ্দুন আল ইসলামী (পাঁচ খ), ০৩. আল আরব কাবলাল ইসলাম, ০৪. তারিখুল লুগাতিল আরাবিয়া প্রভৃতি। এছাড়া তিনি অনেকগুলো সাড়া জাগানো উপন্যাস লেখেছেন। সেগুলো হল-ফাতাতু গামসান, ফাতহুল আন্দালুস, আরমানুসা আল মিসরিয়া, আল আবাসাহ, শাজারাতুত দুরার, আরুস ফারগানা, ফাতাতুল কেরওয়ান, আযরা কুরাইশ, গাদাতু কারবালা প্রভৃতি। তার লিখিত গ্রন্থের সংখ্যা সর্বমোট ৫০টি।
২. আল্লামা শিবলী নোমানী (র.) জুরজী যায়দানের লিখিত তারীখুত তামাদ্দুন আল ইসলামী গ্রন্থের দালীলিক ও দাঁতভাঙ্গা জবাব দিয়েছেন এবং ধোকা প্রবঞ্চনার পর্দা উম্মোচন করেছেন। সর্বোপরি এ গ্রন্থপ্রণেতার ইলমী খেয়ানত ও খবিসীপনার অত্যন্ত বলিষ্ঠ জবাব দিয়েছেন। আল্লামা শিবলীর এ কিতাব 'আল ইনতিকাদু আলা তারীখিত তামাদ্দুনিল ইসলামী' নামে ছাপা হয়েছে।
৩. আলী আমীন, মোস্তফা আমীন, মূসা সাবেরী, আহমদ বাহাউদ্দীন ও মুহাম্মদ তাবেয়ী সেসব সাংবাদিকদের অন্তর্ভূক্ত, যাদেরকে তাদের লেখার জন্য হাজার হাজার পাউন্ডের পুরস্কার ও ইউরোপ সফরের ব্যয়বহুল খরচ দেয়া হয়েছে। মুহাম্মদ আত তাবেয়ীর আত্মজীবনী 'নিসাউন ফী হায়াতী' পড়লে জানা যায়, খোদ এই সাংবাদিক মিসর ও মিসরের বাইরে নৈতিক অপরাধের কর্দমে আকণ্ঠ ডুবে থাকত। মিসর সরকারের পক্ষ থেকে এসব সাংবাদিক ও অশ্লীল লেখকদের এভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করা হতো যে, তাদের লেখার ওপর সরকারের পক্ষ থেকে অনেক মোটা অংকের বি-িনময় দেয়া, অতঃপর তাদের রচিত উপন্যাসগুলোকে সিনেমার রূপ দিয়ে এবং অশ্লীল লেখাগুলো সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত করে অর্থ আহরণ করা হতো এ ধারা এখানো অব্যাহত রয়েছে। কারণ আরব বিশ্বের মিডিয়াগুলো মূলত সরকারই পরিপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করে।
৪. সর্বসাম্প্রতিক তথ্য মোতাবেক যেসব মিসরী, ও আলজেরিয়ান অভিনেত্রী চিত্র জগতে পদার্পণ করেছে এবং অবাধ মেলামেশা ও নগ্নতার প্রতিনিধিত্ব করেছে, তাদের এগার জন এই পেশা থেকে ফিরে এসেছে। তাদের মধ্যে-শামসুল বারুদী, হালা সিদকী এবং মাদীহা ইয়াসমীন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
📄 মিসরী মিডিয়ার দৃষ্টান্ত
নিম্নে মিসরী মিডিয়ার কিছু নমুনা ও দৃষ্টান্ত পেশ করা হলো।
০১. প্রসিদ্ধ সাংবাদিক যাকী আবদুল কাদের, মোস্তফা আমীন, নাজীব মাহফুজ ও ইহসান আবদুল কুদ্দুস প্রমুখ তাদের লেখায় প্রকাশ্য জন্মনিয়ন্ত্রণ, ফ্রি-সেক্স ও অবাধ নারী স্বাধীনতার এবং নৃত্যকার, গীতিকার ও অভিনেতা-অভিনেত্রীদের সম্মান দেয়ার জোরালো আহবান জানিয়েছেন। মোস্তফা আমীন নাচকে ইবাদতের সাথে তুলনা করেছেন। তিনি বলেন, কারখানায় কাজ করা তাদের উঁচু ইবাদতের সমার্থক। (আল আহরাম, ২২ সেপ্টেম্বর, ১৯৬৫)
০২. ইহসান আবদুল কুদ্দুস, ইউসুফ আস সুবায়ী, আহমদ বাহাউদ্দীন, আনিস মানসূর ও মুহাম্মদ আত-তাবেয়ী প্রমুখ তাদের লেখায় পাশ্চাত্য সভ্যতার প্রকাশ্য প্রশংসা করেছেন এবং সরকারের নিকট জোর আবেদন জানিয়েছেন, আধুনিক চিন্তা-ধারার অধিকারী পাশ্চাত্য জাতির মতো আমাদের সরকারেরও পতিতালয়ের লাইসেন্স দেয়া উচিত। আনিস মানসূর লেখেছেন, প্রবৃত্তিকে দাবিয়ে রাখা এবং অস্থির জীবন যাপনের পরিবর্তে সামান্য গুনাহ করায় কোনো ক্ষতি নেই। (আল আহরাম, ২১ মে, ১৯৬৬)
০৩. নারী সাংবাদিক আমীনা সাঈদ ছাত্রীদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে লেখেছেন, মনস্তাত্ত্বিক অস্থিরতা আর টানাপড়েন থেকে রক্ষা পাওয়ার সহজ পদ্ধতি হলো, অনৈতিকতাকে সামান্য সময়ের জন্য গ্রহণ করে নেয়া। (সাবাহুল খায়র, ৩রা এপ্রিল, ১৯৬৬)
০৪. সাংবাদিক আনিস মানসূর তার রচিত 'হাওয়া' পুস্তিকায় পাশ্চাত্য ফ্যাশনকে প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং বোরকাকে তাঁবুর সাথে তুলনা করেছেন। প্রসিদ্ধ মহিলা লেখিকা মাদীহা রোজ আল ইফসুফ ম্যাগাজিনে লেখেন, যৌন রোগ ও বিপথগামিতা থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় পতিতালয়ে গিয়ে বাস্তব প্রশিক্ষণ গ্রহণ করা। এর দ্বারা যৌন বিষয়ে অভিজ্ঞতা অর্জিত হওয়ার পাশাপাশি লজ্জা ও লাজুকতা নির্মূল হবে। (সাবাহুল খায়র, ৩রা ডিসেম্বর, ১৯৬৫)
কায়রো, বৈরুত, লন্ডন ও প্যারিস থেকে প্রকাশিত নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনসমূহের মালিক, সম্পাদক ও সাংবাদিক খৃস্টান। এসব ম্যাগাজিনের মধ্যে আশ শুবকা, আস সাইয়াদ, হাওয়া, হুওয়া হিয়া, আল কাওয়াকেব নগ্ন ছবি এবং অশালীন কাহিনীর কারণে লাখ লাখ কপি বিক্রি হয়। এসব ম্যাগাজিনের পদাঙ্ক অনুসরণে আল আখবার ও আল জমহুরিয়ার অধিকাংশ কলাম লেখক খৃস্টান এবং উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সাংবাদিক নাস্তিক বেদীন। ১৯৬৩ সাল থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত মিসরী মিডিয়ার গতিপথ কি ছিল, তা সে সময়কার সংবাদপত্রের বিভিন্ন শিরোনাম দ্বারা সহজেই অনুমিত হয়।
ক. এক নৃত্যশিল্পী তার ছাত্র বন্ধুর ফ্ল্যাটে আত্মহত্যা করেছে। (আল আখবার, ২৯ জুন, ১৯৬২)
খ. ষোল বছর বয়সী এক ছাত্রী একা ইউরোপ সফর করেছে, তোমরাও অভিজ্ঞতা অর্জন কর। (আল আহরাম, ২৯ জুন, ১৯৬৩)
গ. হাঁটুর ওপরে পোশাক পরা একটি নতুন ফ্যাশন। (আশ শুবকা, ৪ঠা আগস্ট, ১৯৬৫)
ঘ. তোমরা নিজের স্ত্রীকে অন্যের স্ত্রীর মতো মনে করে দেখ। (আস সাইয়াদ, জুন ১৯৬৫)
ঙ. এ সপ্তাহের সবচে' সুন্দরী ও হার্টথ্রব নারী। (আল কাওয়াকেব, মে ১৯৫৬)
আশ-শুবকা ম্যাগাজিন আরব বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আধুনিকমনা নারীদের সাক্ষাতকার নিয়ে সহশিক্ষা, নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা ও অফিস-আদালতে নারী-পুরুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এক সাথে কাজ করার উপকারিতার ওপর বিস্তারিত আলোকপাত করেছে। (আশ শুবকা, মার্চ, ১৯৬৪)
মাসিক হাওয়া, হুওয়া হিয়া, আস সাইয়াদ ও সাপ্তাহিক রোজ আল ইউসুফ পত্রিকাগুলো অবাধ যৌন স্বাধীনতা, স্বামীর কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, তালাকের প্রতি উৎসাহ, দাম্পত্য জীবনের ওপর সন্দেহ-সংশয়ের ছায়া ফেলা, জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী ব্যবহার, নারীদের প্যান্ট-শার্ট পরা, নারীদের চুল ছোট করা, পুরুষের চুল লম্বা করা, বিজ্ঞাপনী সংস্থায় নারীদের চাকরি করা ও বিজ্ঞাপনে মডেল গার্ল হওয়া ইত্যাদি বিষয়ের প্রতি অত্যন্ত জোর দিয়ে থাকে।
দৈনিক আল জমহুরিয়া ১৯৬০ সাল থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত তার প্রচার বৃদ্ধি করার জন্য দু'টি পদক্ষেপ গ্রহণ করে। প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে অশ্লীল লেখকদের মোটা-অংকের অর্থ দিয়ে ইউরোপ-আমেরিকায় সংঘটিত বিভিন্ন যৌন ও এ সংক্রান্ত ঘটনাবলী ও কাহিনী ধারাবাহিক প্রচার শুরু করে।
দ্বিতীয় পদক্ষেপ হিসেবে প্রতিদিন পত্রিকার সাথে কুপন ছাপা শুরু করে। এতে পাঠক একদিকে পত্রিকা পড়তে পারত, অপরদিকে কোনো সিনেমা হলে কুপনটি প্রদর্শন করে অর্ধেক মূল্যে সিনেমাও দেখতে পারত।
প্রসিদ্ধ মিসরী খৃষ্টান সাংবাদিক লুইস এওয়াজ ও মূসা সাবরী তাদের লেখায় ফেরাউনী সভ্যতা এবং গ্রীক চিন্তাধারা গ্রহণ করার খোলাখুশি দাওয়াত দিয়েছেন, ইতিহাসের বস্তুতান্ত্রিক ব্যাখ্যা, মার্কসবাদের দাওয়াত এবং পিতা-মাতা ও সমাজের আধিপত্য থেকে মুক্তি পাওয়া, জায়নবাদের সাথে সম্পর্ক সুসংহত ও মজবুত করা এবং আরবদের পরিবর্তে পশ্চিমাদের সাথে জনগণের ভাগ্য সম্পৃক্ত করার প্রাণান্তকর প্রয়াস চালিয়েছেন।
গীতিকারদের মধ্যে আবদুল ওয়াহাব, উম্মে কুলসুম, আবদুল হালীম হাফিজ, ফরীদুল আতরাশ ও ফিরোজ প্রমুখ উপাস্যের মর্যাদা লাভ করে। এমনকি এক গায়িকার ইন্তেকালে কয়েকজন নওজোয়ান ছেলে-মেয়ে আত্মহত্যা করে।