📄 গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের শ্লোগান
গণতন্ত্রও পাশ্চাত্যের একটি অস্ত্র। এই অস্ত্র তারা অধিকাংশ সময় সামরিক সরকার আবার কখনো রাজা-বাদশাহদের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করে থাকে। এই অস্ত্র তখনই প্রয়োগ করে যখন সরকারগুলো তাদের নির্ধারিত এজেন্ডা পাশ কাটানোর শংকা জাগে। এই অস্ত্রের মাধ্যমে তারা সরকারগুলোকে ব্ল্যাকমেইল করে তাদের মাধ্যমে স্বীয় স্বার্থ উদ্ধার করে। যখনই তারা পাশ্চাত্যের তাবেদারী এবং তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে রাজি হয়ে যায় তখন তাদের একনায়কতন্ত্র ও রাজতন্ত্রের ওপর পাশ্চাত্যের কোনো অভিযোগ থাকে না, বরং তখন তারা পশ্চিমের নিকট গণতান্ত্রিক সরকার থেকেও বেশি প্রিয় হয়ে যায়।
রাজতন্ত্রের উদাহরণ আরব বিশ্ব, যারা অগণতান্ত্রিক হওয়া সত্ত্বেও ইউরোপ- আমেরিকার নিকট খুব প্রিয়। কারণ সেখানে তাদের স্বার্থ সংরক্ষিত ও নিরাপদ রয়েছে। আর সামরিক সরকারের উদাহরণ মিসর, সিরিয়া, আলজেরিয়া, তিউনিসিয়া, ইরান, ইন্দোনেশিয়া, তুরস্ক এবং পাকিস্তান। এসব সরকারকে পাশ্চাত্য তার স্বার্থে ব্যবহার করেছে এবং তাদের সাথে সুগভীর সম্পর্ক রেখেছে; বরং একাধিকবার তাদের মাধ্যমে গণতন্ত্রকে দলিত মথিত করেছে। পক্ষান্তরে তুরস্কের এরদোগানের সরকার এবং সুদান ও আফগানিস্তানকে পাশ্চাত্য পছন্দ করেনি। কারণ এরা তাদের স্বার্থের বিরুদ্ধে ছিল। কিউবাতে ফিদেল ক্যাস্ট্রোকে ক্ষমতায় আনতে আমেরিকা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে, কিন্তু কিউবা যখন তার সাথে চলতে অস্বীকার করে, তখন ক্যাস্ট্রোকে সে একজন ঘৃণিত ব্যক্তি আখ্যা দেয়। স্বীয় স্বার্থে পাশ্চাত্য সব সময়ই দু'মুখো নীতি অবলম্বন করে এসেছে।
বিবিসিও সেসব জায়গায়ই গণতন্ত্র এবং মানবাধিকারের বিপর্যয় খুঁজে পায় যেখানে পাশ্চাত্যের অপছন্দীয় সরকার ক্ষমতায় রয়েছে। আর যেখানে পাশ্চাত্যের পছন্দনীয় সরকার ক্ষমতায় রয়েছে সেখানে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের বিপর্যয় তেমন কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। এ ক্ষেত্রেও বিবিসির কতিপয় রিপোর্টের উদ্ধৃতি দেয়া যায়, কিন্তু পাশ্চাত্যবিরোধী সরকার ও রাষ্ট্রসমূহ সম্পর্কিত রিপোর্টের সাথে এ সকল রিপোর্টের সংখ্যা অনুমান করা যায়, তখন উভয়ের মাঝে বিস্ময়কর পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়।
বিবিসির নিকট তালেবানদের পর্দার ওপর কড়াকড়ি আরোপ মানবাধিকারের লংঘন ছিল, কিন্তু তুরস্ক ও উজবেকিস্তানে বোরকা পরে শিক্ষাঙ্গনে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপ মানবাধিকারের লংঘন নয়। উজবেকিস্তানে পঞ্চাশ হাজার মুসলমানকে বন্দী করা এবং তাদের শরয়ী ইবাদত ও শরয়ী পর্দার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ মানবাধিকার লংঘন নয়। বসনিয়া, চেচনিয়া, হার্জেগভিনা, কাশ্মীর, আফগানিস্তান ও আরাকানের মুসলমানদের রক্তে হোলি খেলা মানবাধিকারের লংঘন নয়। ইন্দোনেশিয়ার খৃস্টান সংখ্যাগরিষ্ঠ 'মালাকা' উপদ্বীপে ১৯৯৯ থেকে ২০০০ পর্যন্ত মাত্র দু'বছরে পঞ্চাশ হাজার মুসলমানকে হত্যা করা হয়েছে। রোডে প্রকাশ্যে মুসলিম নারীদের সম্ভ্রম লুণ্ঠন করা হয়েছে। এসব কি মানবাধিকারের সুষ্পষ্ট লংঘন নয়? বিবিসি কি এসব ঘটনা বস্তুনিষ্ঠতার সাথে পরিবেশন করেছে? পাকিস্তানের আইয়ুব খানের সরকারকে আমেরিকা ও পাশ্চাত্য শক্তি ইসলাম এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছে। জেনারেল জিয়াউল হককে আমেরিকা রাশিয়ার বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছে। সে সময় আইয়ূব খান ও জিয়াইল হক দু'জনই পশ্চিমের পছন্দনীয় সরকার ছিল, কিন্তু এখন মিডিয়ায় তাদের ডিক্টেটর-একনায়ক নামে স্মরণ করা হয়। কারণ এখন আর তাদের কাছে কোনো স্বার্থ নেই।