📘 পশ্চিমা মিডিয়ার স্বরূপ > 📄 সাম্প্রদায়িকতা

📄 সাম্প্রদায়িকতা


সাম্প্রদায়িকতার প্রচার করে পশ্চিমা শক্তি ইসলাম ও ইসলামী সংগঠনগুলোকে দুর্নামগ্রস্ত করা এবং মুসলমানদের মধ্যে অনৈক্য দ্বন্দ্ব ছড়ানোর প্রয়াস চালায়। সাম্প্রদায়িকতার ঘটনাকে খুব অতিরঞ্জিত করে পেশ করে জনগণকে এই প্রতিক্রিয়া দিতে চেষ্টা করে, যদি দীনী সংগঠন ও জিহাদী আন্দোলনগুলো কখনো সফলকাম হয় তাহলে দেশে বিশৃংখলা ও গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে যাবে। এজন্য উত্তম হলো, আগে থেকেই তাদের সফলতার পথ প্রতিরোধ করা এবং লোকদের উচিত এসব সংগঠন থেকে দূরে থাকা।

সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা যদি হিন্দু-মুসলিম, ইহুদী-মুসলিম কিংবা খৃস্টান-মুসলিমের মাঝে হয় আর সেখানে মুসলমান বেশি মারা যায় কিংবা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে সে ঘটনা অত্যন্ত গুরুত্বহীনভাবে প্রচার করা হয় এবং মুসলমানের আলোচনা তখনই হয় যখন কোনো মুসলমান কাউকে মারে। আর যদি কোনো মুসলমান মারা যায় তা হলে সে ঘটনা আলোচিত হয় বটে, তবে তার দীন ধর্মের পরিচয় প্রকাশ করা হয় না। কেননা, এরূপ করা হলে অমুসলিমদের দুর্নাম হয়। ভারতীয় মিডিয়ার পলিসিও এরকমই।

এ ব্যাপারে বিবিসির দৃষ্টিভঙ্গি সাংবাদিক অসততার প্রকাশক। নিম্নের ঘটনাবলী থেকে সেটাই প্রমাণিত হয়। ২০০১ সালের মার্চ মাসে সীমান্ত প্রদেশের হিঙ্গু জেলার দুই গ্রামের অধিবাসীদের মধ্যে লড়াই হয়। ঘটনাক্রমে এক গ্রামের অধিবাসী সুন্নী এবং আরেক গ্রামের অধিবাসীরা ছিল শিয়া। এ লড়াইয়ে কয়েকজন লোক মারা যায়। এ লড়াই হয়েছিল পানি নিয়ে। এর সাথে সাম্প্রদায়িকতার কোনো সম্পর্ক ছিল না। পেশোয়ারে কর্মরত বিবিসির রিপোর্টার সেটা স্পষ্টও করে দিয়েছিল। এরপরও বিবিসি এ ঘটনাকে সম্প্রদায়িকতার প্রলেপ দিয়ে সাম্প্রদায়িক ফাসাদ বিশৃংখলার সাথে এর সম্পর্ক জুড়ে দেয়। বিবিসি এভাবে দুই দলের মধ্যে সম্প্রদায়িকতা উসকে দেয়। অথচ এ বিশৃংখলার মূল কারণ সিকিউরিটি এজেন্সীগুলোর উদাসীনতা, সিকিউরিটি কর্মকর্তাদের অযোগ্যতা, আর প্রচার করা হচ্ছে সাম্প্রদায়িক বিশৃংখলা বলে। অথচ সিকিউরিটি এজেন্সীগুলোর উদাসীনতা এবং এসব এজেন্সীর কর্মকর্তাদের অযোগ্যতা অদক্ষতা দূর করা গেলে আপনা আপনিই এ সমস্যার সমাধান হয়ে যায়।

বিগত বছরের শেষের দিকে করাচীতে পি. এস. ও'র ডিরেক্টর শওকত মির্জার হত্যাকাণ্ডকেও বিবিস সাম্প্রদায়িক হত্যাকাণ্ড বলে আখ্যায়িত করে। অথচ মাসিক আদ দাওয়ার ভাষ্যকারের মতে, শওকত মির্জা অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার অধীনে সন্ত্রাসের বলি হয়েছে। কেননা, শওকত মির্জা পিএসও'র অনেক উন্নতি সাধন করে একে দেশের সবচেয়ে লাভজনক সংস্থা বানিয়েছিলেন। তার হত্যাকারে পর শেল কোম্পানী পিএসও সংস্থাটি কিনতে চাইছে। (মাসিক আদ দাওয়া, মার্চ-২০০২)

পাকিস্তানের বাইরে বিবিসির সাম্প্রদায়িকতা বিষয়ক রিপোর্টিংয়ের সুস্পষ্ট পার্থক্য দৃষ্টিগোচর হয়। যদিও কালেভদ্রে সত্য রিপোর্টও প্রকাশিত হয়, কিন্তু তাও করা হয় একটা সীমা পর্যন্ত শ্রোতাদের বিশ্বাস ধরে রাখার জন্য।

ভারতের গুজরাটে সংঘটিত স্মরণকালের ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় ১৫ হাজার মুসলমান শহীদ হন। শত শত ঘরবাড়ী জ্বালিয়ে দেয়া হয় এবং লক্ষ লক্ষ মুসলমান গৃহহারা হয়। বিবিসি এই ভয়াবহ ঘটনাকে গুরুত্বহীনভাবে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা আখ্যা দিলেও একথা পরিস্কার করেনি, এই দাঙ্গায় সবচে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মুসলমান সম্প্রদায় এবং তারাই সবচে বেশি নিহত হয়েছে। তারা প্রচার করেছে হাজার হাজার লোক নিহত হয়েছে। শত শত ঘরবাড়ী জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে। লক্ষ লক্ষ মানুষ গৃহহারা হয়েছে। কিন্তু ক্ষতিগ্রস্তের সাথে মুসলমান নাম উল্লেখ করেনি। বিবিসি সুপরিকল্পিত এ মুসলিম নিধনযজ্ঞকে নিছক হত্যাকাণ্ড বলে চালিয়ে দিয়েছে। মেসিডোনিয়ায় মুসলিম নিধনযজ্ঞেও বিবিসি একই পন্থা অবলম্বন করেছে। মুসলিম নিধনযজ্ঞ সম্পর্কিত বিবি-ি সর প্রচার নীতির একটি মাত্র উদাহরণ দেখুন-

২০০২ সালের ২২ মার্চ গুজরাটের বড়োদা জেলায় কর্মরত বিবিসির প্রতিনিধি অটল বিভাস রিপোর্ট দিয়েছে, আজকের দাঙ্গায় ছুরিকাঘাতে দু ব্যক্তি নিহত ও একজন আহত হয়েছে। দশটি বাড়ী এবং পাঁচখানা গাড়ী জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে। কিন্তু রিপোর্টার ক্ষতিগ্রস্তদের সাথে মুসলমান নাম উল্লেখ করেনি। এই দাঙ্গা সৃষ্টির মূল পরিকল্পক বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, কিন্তু বিবিসির রিপোর্টার তার রিপোর্টে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের সদস্যদের স্বেচ্ছাসেবক আখ্যা দিয়েছে। অথচ এ একটি কট্টরপন্থী, সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী সংগঠন, যা পারস্পরিক প্রতিবেশীসূলভ অস্তিত্ব ও অবস্থাকে বিশ্বাস করে না। এরাই এই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টির মূল হোতা। অথচ তারাই হয়ে গেল স্বেচ্ছাসেবক।

বিবিসির উল্লিখিত রিপোর্টসমূহের ধরন থেকেই প্রকাশ পাচ্ছে, দীন ধর্মের ব্যবধানের সাথে সাথে বিবিসির রিপোর্টিং পদ্ধতিতে পরিবর্তন ঘটে; বরং বলা যায়, সম্পূর্ণ বিপরীত পন্থা অবলম্বিত হয়।

📘 পশ্চিমা মিডিয়ার স্বরূপ > 📄 গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের শ্লোগান

📄 গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের শ্লোগান


গণতন্ত্রও পাশ্চাত্যের একটি অস্ত্র। এই অস্ত্র তারা অধিকাংশ সময় সামরিক সরকার আবার কখনো রাজা-বাদশাহদের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করে থাকে। এই অস্ত্র তখনই প্রয়োগ করে যখন সরকারগুলো তাদের নির্ধারিত এজেন্ডা পাশ কাটানোর শংকা জাগে। এই অস্ত্রের মাধ্যমে তারা সরকারগুলোকে ব্ল‍্যাকমেইল করে তাদের মাধ্যমে স্বীয় স্বার্থ উদ্ধার করে। যখনই তারা পাশ্চাত্যের তাবেদারী এবং তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে রাজি হয়ে যায় তখন তাদের একনায়কতন্ত্র ও রাজতন্ত্রের ওপর পাশ্চাত্যের কোনো অভিযোগ থাকে না, বরং তখন তারা পশ্চিমের নিকট গণতান্ত্রিক সরকার থেকেও বেশি প্রিয় হয়ে যায়।

রাজতন্ত্রের উদাহরণ আরব বিশ্ব, যারা অগণতান্ত্রিক হওয়া সত্ত্বেও ইউরোপ- আমেরিকার নিকট খুব প্রিয়। কারণ সেখানে তাদের স্বার্থ সংরক্ষিত ও নিরাপদ রয়েছে। আর সামরিক সরকারের উদাহরণ মিসর, সিরিয়া, আলজেরিয়া, তিউনিসিয়া, ইরান, ইন্দোনেশিয়া, তুরস্ক এবং পাকিস্তান। এসব সরকারকে পাশ্চাত্য তার স্বার্থে ব্যবহার করেছে এবং তাদের সাথে সুগভীর সম্পর্ক রেখেছে; বরং একাধিকবার তাদের মাধ্যমে গণতন্ত্রকে দলিত মথিত করেছে। পক্ষান্তরে তুরস্কের এরদোগানের সরকার এবং সুদান ও আফগানিস্তানকে পাশ্চাত্য পছন্দ করেনি। কারণ এরা তাদের স্বার্থের বিরুদ্ধে ছিল। কিউবাতে ফিদেল ক্যাস্ট্রোকে ক্ষমতায় আনতে আমেরিকা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে, কিন্তু কিউবা যখন তার সাথে চলতে অস্বীকার করে, তখন ক্যাস্ট্রোকে সে একজন ঘৃণিত ব্যক্তি আখ্যা দেয়। স্বীয় স্বার্থে পাশ্চাত্য সব সময়ই দু'মুখো নীতি অবলম্বন করে এসেছে।

বিবিসিও সেসব জায়গায়ই গণতন্ত্র এবং মানবাধিকারের বিপর্যয় খুঁজে পায় যেখানে পাশ্চাত্যের অপছন্দীয় সরকার ক্ষমতায় রয়েছে। আর যেখানে পাশ্চাত্যের পছন্দনীয় সরকার ক্ষমতায় রয়েছে সেখানে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের বিপর্যয় তেমন কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। এ ক্ষেত্রেও বিবিসির কতিপয় রিপোর্টের উদ্ধৃতি দেয়া যায়, কিন্তু পাশ্চাত্যবিরোধী সরকার ও রাষ্ট্রসমূহ সম্পর্কিত রিপোর্টের সাথে এ সকল রিপোর্টের সংখ্যা অনুমান করা যায়, তখন উভয়ের মাঝে বিস্ময়কর পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়।

বিবিসির নিকট তালেবানদের পর্দার ওপর কড়াকড়ি আরোপ মানবাধিকারের লংঘন ছিল, কিন্তু তুরস্ক ও উজবেকিস্তানে বোরকা পরে শিক্ষাঙ্গনে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপ মানবাধিকারের লংঘন নয়। উজবেকিস্তানে পঞ্চাশ হাজার মুসলমানকে বন্দী করা এবং তাদের শরয়ী ইবাদত ও শরয়ী পর্দার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ মানবাধিকার লংঘন নয়। বসনিয়া, চেচনিয়া, হার্জেগভিনা, কাশ্মীর, আফগানিস্তান ও আরাকানের মুসলমানদের রক্তে হোলি খেলা মানবাধিকারের লংঘন নয়। ইন্দোনেশিয়ার খৃস্টান সংখ্যাগরিষ্ঠ 'মালাকা' উপদ্বীপে ১৯৯৯ থেকে ২০০০ পর্যন্ত মাত্র দু'বছরে পঞ্চাশ হাজার মুসলমানকে হত্যা করা হয়েছে। রোডে প্রকাশ্যে মুসলিম নারীদের সম্ভ্রম লুণ্ঠন করা হয়েছে। এসব কি মানবাধিকারের সুষ্পষ্ট লংঘন নয়? বিবিসি কি এসব ঘটনা বস্তুনিষ্ঠতার সাথে পরিবেশন করেছে? পাকিস্তানের আইয়ুব খানের সরকারকে আমেরিকা ও পাশ্চাত্য শক্তি ইসলাম এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছে। জেনারেল জিয়াউল হককে আমেরিকা রাশিয়ার বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছে। সে সময় আইয়ূব খান ও জিয়াইল হক দু'জনই পশ্চিমের পছন্দনীয় সরকার ছিল, কিন্তু এখন মিডিয়ায় তাদের ডিক্টেটর-একনায়ক নামে স্মরণ করা হয়। কারণ এখন আর তাদের কাছে কোনো স্বার্থ নেই।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00