📄 আফগান সমস্যা
১৯৯৬ সালে আফগানিস্তানে তালেবান সরকারের ক্ষমতায় আরোহণ আমেরিকাসহ পাশ্চাত্যের সেক্যুলার শক্তিসমূহকে চিন্তায় ফেলে দেয়। এই যুগান্তকারী ঘটনা তাদের চোখে কাঁটার মতো বিঁধতে থাকে। কারণ তারা আফগানিস্তানে গৃহযুদ্ধ নির্মূল করে শান্তি -নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি ইসলামী আইনও বাস্তবায়ন করে এবং ধর্মহীন শক্তির সামনে নতজানু হতে পরিষ্কার অস্বীকার করে। তালেবান সরকারের এই স্বাধীন পলিসি ধর্মহীন শক্তির ঘুম হারাম করে দেয়। তারা তালেবান সরকারের বিরুদ্ধে ধারাবারিক মিথ্যা প্রচার প্রোপাগান্ডা শুরু করে দেয়, তাদের কঠোরতার সমালোচনা করতে থাকে, তাদের তথাকথিত মানবাধিকার লংঘনের দায়ে অভিযুক্ত আখ্যা দিতে থাকে এবং তাদের সরকারের ইতিবাচক দিকগুলোর আলোচনা থেকে ইচ্ছাকৃতভাবে মুখ ফিরিয়ে নেয়। অন্যান্য মিডিয়ার মতো বিবিসিও সাংবাদিকতার মূল্যবোধকে জলাঞ্জলি দিয়ে পশ্চিমা প্রোপাগান্ডাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে সম্প্রচার করতে থাকে। বর্তমান যুগে তালেবান সরকারের সামাজিক ন্যায়বিচার, ইনসাফ, অভ্যন্তরীণ শান্তি-নিরাপত্তা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, সরকারী আমলাদের সহজ, সরল ও সাদাসিধা জীবন যাপন, বিলাসিতা মুক্ত সমাজ এবং আন্তর্জাতিক চাপ সত্ত্বেও জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব সংরক্ষণের বিষয়টি গোটা বিশ্বের রাষ্ট্র সরকারের জন্য একটি শিক্ষাও বটে এবং চিন্তার বিষয়ও বটে।
সাংবাদিকতার মূল্যবোধের দাবি তো ছিল, বিবিসি যদি তালেবান সরকারের কঠোরতা সম্প্রচার করে, তাহলে তার উল্লিখিত ইতিবাচক দিকগুলোও সম্প্রচার করবে, কিন্তু বিবিসির অস্তিত্ব লাভের উদ্দেশ্যই পশ্চিমা ধ্যান-ধারণা ও চিন্তা-চেতনার সংরক্ষণ। নিম্নে এ সংক্রান্ত কিছু দৃষ্টান্ত পেশ করা হলো-
২০০২ সালের জানুয়ারীর মাঝামাঝি আফগানিস্তানের কয়েকটি প্রদেশে তালেবান কমান্ডোরা সম্মিলিত জোটের স্থলবাহিনীর ওপর প্রচন্ড হামলা চালায়। তখন বিবিসি পেশোয়ারে আফগানিস্তান বিষয়ক বিশেষজ্ঞ রহীমুল্লাহ ইউসূফের সাক্ষাতকার গ্রহণ করে। সাক্ষাতকারের শেষ দিকে রহীমুল্লাহ ইউসূফ যখন তালেবান সরকারের কিছু ইতিবাচক দিক আলোচনা শুরু করেন তখন বিবিসি প্রতিনিধি সঙ্গে সঙ্গে টেপ রেকর্ডার বন্ধ করে দিয়ে শুধু পূর্বের অংশটুকু ধারণ করে সম্প্রচার করে। যাতে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছিল, সাক্ষাতকার এখনো শেষ হয়নি, তার আগেই টেপ রেকর্ডার বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।
যৌথ বাহিনী যখন আফগানিস্তানের নিষ্পাপ নিরপরাধ জনগণের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী হামলা শুরু করে তখন বিবিসি ধারাবাহিকভাবে এই হামলাকে সন্ত্রাস বিরোধী যুদ্ধ আখ্যা দিতে থাকে। উত্তরাঞ্চলীয় জোটকে আফগানিস্তানের বৈধ শাসক এবং তালেবানকে কট্টরপন্থী, গোঁড়া ও সন্ত্রাসী আখ্যা দিতে শুরু করে। অথচ প্রকৃত বিষয়টি ছিল তার উল্টো। কারণ উত্তরাঞ্চলীয় জোটের জুলুম নির্যাতন ছিল নিকট অতীতের বিষয়।
মুজাহিদীনদের মনোবল ও সাহস নষ্ট করা এবং যৌথ বাহিনীর সফলতা বাড়িয়ে পেশ করার জন্য মুজাহিদ শহীদদের সংখ্যা বেশি বলে প্রচার করত। পক্ষান্তরে আমেরিকা ও যৌথ বাহিনীর ধ্বংস গোপন করার চেষ্টা করত। অথচ প্রকৃতপক্ষে শহীদদের লাশ দাবী থেকে অনেক কম এবং মার্কিন বাহিনীর লাশ অনেক বেশি পাওয়া যাচ্ছিল। অদ্যাবধি (মার্চ, ২০০২-এর শেষ পর্যন্ত) আফগান যুদ্ধে নিহত আমেরিকান সৈন্যের সংখ্যা চৌদ্দ পনের বলে প্রচার করা হয়। যখন জেহাদীদের মুখপত্র মাসিক আদ দাওয়ার দাবী মোতাবেক শুধু গার্দিজের লড়াইয়ে আশি থেকে একশ আমেরিকান সৈন্য নিহত এবং দুইশর বেশি আহত হয়েছে। (মাসিক আদ দাওয়া-এপ্রিল, ২০০২)।
ইরাক যুদ্ধে পশ্চিমা মিডিয়া একই নীতি গ্রহণ করে রেখেছিল। এর পূর্বে বিবিসি কারগিল ও কাশ্মীরের চলমান যুদ্ধেও আহত নিহতের সংখ্যা এ ধরনের কমবেশি করে প্রকাশ করেছিল। তবে একথা ঠিক, যুদ্ধের ময়দান থেকে হতাহতের সঠিক সংখ্যা সংগ্রহ করা খুবই কঠিন, কিন্তু এটা কেমন ইনসাফ যে, সংখ্যা শুধু এক পক্ষেরই পেশ করা হবে আর অপর পক্ষকে দেখেও না দেখার ভান করা হবে। বিবিসি অনেক সময় মুজাহিদীনদের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ও কৌশল ব্যর্থ করা এবং হিম্মত মনোবল নষ্ট করার জন্য কৃত্রিম ও কাল্পনিক বোমাবর্ষণের রিপোর্টও দিয়েছে। কান্দাহারের আশেপাশে এবং আস্পাইন বোল্ডাকে সংঘটিত লড়াইয়ে এরকম কৃত্রিম ও কাল্পনিক রিপোর্ট দেয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়। (জেহাদে কাশ্মীর, জানুয়ারী-২০০২)।
এ কথার সুস্পষ্ট সাক্ষ্য প্রদান করেছেন আফগানিস্তানে চিকিৎসা সেবাদানরত ইসলামিক মেডিকেল এসোসিয়েশনের এক চিকিৎসক।
বিবিসি আফগানিস্তানের বর্তমান নেতৃবর্গের মধ্যে হিযবে ইসলামীর আমীর গুলবুদ্দীন হেকমতিয়ারের বিরুদ্ধেও প্রোপাগান্ডা শুরু করে, যাতে তিনি কোনোভাবে আফগানিস্তানে তাঁর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে না পারেন। কারণ তিনি পাশ্চাত্যের সামনে মাথানত করেননি এবং মার্কিন সন্ত্রাস ও আফগানিস্তানের পুতুল সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। বিবিসি তাঁর বিরুদ্ধে অবিরাম প্রোপাগান্ডা শুরু করে দেয়, যাতে তিনি আফগানিস্তানে তাঁর কর্তব্যকর্ম আদায় না করতে পারেন। কেননা তাঁর ভূমিকা পাশ্চাত্যের স্বার্থ পরিপন্থী।
২০০২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারী ইরানে কর্মরত বিবিসির রিপোর্টার এ ভিত্তিহীন অভিযোগ উত্থাপন করে, কাবুলে বেপর্দা মেয়ে লোকদের ওপর তেজাব ছোড়া হয়েছে। অতঃপর এ বছরের ২রা মার্চ তার ওপর কাবুল ধ্বংসের অভিযোগও আরোপ করে তাকে একজন হিংস্র রক্তপিপাসু লীডার রূপে উপস্থাপন করে। অথচ তাকে দেশের প্রধানমন্ত্রী বানানো হয়েছিল, কিন্তু বিদেশী হস্তক্ষেপে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা দায়িত্ব স্থানান্তর করা হয়নি।
📄 জিহাদবিরোধী মানসিকতা প্রস্তুতকরণ
গোটা বিশ্বের যেখানে যেখানে স্বাধীনতার জন্য আন্দোলন চলছে, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী যাদের প্রচেষ্টা বৈধ স্বাধীনতা আন্দোলন, কিন্তু যেসব আন্দোলন পাশ্চাত্য স্বার্থের পরিপন্থী, বিবিসি তাদের সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মনগড়া পরিভাষার যথেষ্ট প্রচলন ও প্রচার ঘটিয়েছে। ফিলিস্তিনী মুজাহিদীন, আফগানিস্তান ও চেচনিয়ার মুজাহিদীন, ফিলিপাইনের মুজাহিদীন, ইন্দোনেশিয়ার জেহাদী সংগঠন এবং আলজেরিয়ার ইসলামপন্থী সকলেই বিবিসির নিকট কট্টরপন্থী, মৌলবাদী, গোঁড়া, বিচ্ছিন্নতাবাদী এবং সন্ত্রাসী। আর সেসব দেশের দখলদার বাহিনী সর্বপ্রকার বর্বরতা প্রদর্শন করেও তারা নিজেদের আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগ করে। ফিলিপাইনের প্রায় এক কোটি মানুষের স্বাধীনতার জন্য আন্দোলনকারী সংগঠন আবু সাইয়াফ গ্রুপের ওপর বিবিসি ধারাবাহিক অপহরণ এবং বিদেশী ও সাধারণ জনগণকে হত্যার মিথ্যা অভিযোগে অভিযুক্ত করে, কিন্তু আবু সাইয়াফ বিবিসির কোনো কভারেজ পায় না।
১৯৯২ সালে আলজেরিয়াতে যখন ইসলামিক ফ্রন্ট পৌরসভা নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে, তখন পশ্চিমা জগত জাতীয় নির্বাচনেও ফ্রন্টের নিরঙ্কুশ বিজয় আঁচ করতে পেরে নির্বাচনের পূর্বে সেনাবাহিনীকে উসকে দিয়ে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটায় এবং ইসলামপন্থীদের কট্টরপন্থী ও মৌলবাদী অভিযোগে অভিযুক্ত করে। বিবিসিও অন্যান্য পশ্চিমা মিডিয়ার মতো এই অভিযোগ খুব ফলাও করে প্রচার করে। এমনিভাবে পাকিস্তানের যেখানেই সন্ত্রাসী কিংবা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ঘটনা ঘটে বিবিসি সেখানেই সেই ঘটনাকে জেহাদী সংগঠনের সাথে জড়ানোর অপচেষ্টা করে, যাতে এর মাধ্যমে জিহাদী সংগঠনগুলোর দুর্নাম করা যায়।
২০০২ সালের ১৬ই মার্চ বিবিসির সাপ্তাহিক অনুষ্ঠানে পরিচালক রাজা যুলফিকার আলী সাম্প্রদায়িক সমস্যার ওপর শুধু জিহাদ বিরোধীদের সাক্ষাতকার গ্রহণ করেন। সাক্ষাতকারে তারা সাম্প্রদায়িকতার সম্পর্ক সরাসরি জিহাদের সাথে জুড়ে দিয়ে জিহাদী সংগঠনগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের তাকিদ দিয়েছেন এবং এই সংগঠনগুলোর ওপর কঠোরতা অব্যাহত রাখার সুপারিশ করেছেন। সাথে সাথে তারা দারিদ্রতা ও বেকারত্বকে জেহাদের কারণ সাব্যস্ত করেছেন। অথচ একথা সবাই জানে, মুজাহিদীনদের মধ্যে উচ্চ শিক্ষিত, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার ও ব্যবসায়ী সবাই শামিল আছেন। বিবিসি যদি সত্যিই সাম্প্রদায়িক সমস্যার সমাধান চাইত, তাহলে তারা জাতীয় ঐক্য কাউন্সিলের নেতৃবর্গের নিকট থেকেও সাক্ষাতকার গ্রহণ করতে পরত। যারা উপরোক্ত সাক্ষাতকারদাতাদের চেয়ে আরো বেশি যোগ্য ও দক্ষ। অথবা কমপক্ষে উভয় গ্রুপকে শামিল করত এবং জিহাদ বিষয়ে মুজাহিদীনের অবস্থান সম্পর্কে নেতৃবর্গের থেকেও সাক্ষাতকার গ্রহণ করত, কিন্তু আফসোস! বিবিসি পাশ্চাত্যের ক্রীড়নকের ভূমিকা পালন করে প্রমাণ করেছে, এই সংস্থা মুসলিম উম্মাহকে পথভ্রষ্ট বিভ্রান্ত করার জন্যই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
ওসামা বিন লাদেনের বিরুদ্ধেও বিবিসি পশ্চিমা প্রোপাগান্ডার খুব প্রচার প্রসার করেছে। যাদের থেকেই পশ্চিমা স্বার্থের ক্ষতির আশংকা আছে তাদেরই ওসামা বিন লাদেনের সাথে জুড়ে সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়েছে।
📄 সাম্প্রদায়িকতা
সাম্প্রদায়িকতার প্রচার করে পশ্চিমা শক্তি ইসলাম ও ইসলামী সংগঠনগুলোকে দুর্নামগ্রস্ত করা এবং মুসলমানদের মধ্যে অনৈক্য দ্বন্দ্ব ছড়ানোর প্রয়াস চালায়। সাম্প্রদায়িকতার ঘটনাকে খুব অতিরঞ্জিত করে পেশ করে জনগণকে এই প্রতিক্রিয়া দিতে চেষ্টা করে, যদি দীনী সংগঠন ও জিহাদী আন্দোলনগুলো কখনো সফলকাম হয় তাহলে দেশে বিশৃংখলা ও গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে যাবে। এজন্য উত্তম হলো, আগে থেকেই তাদের সফলতার পথ প্রতিরোধ করা এবং লোকদের উচিত এসব সংগঠন থেকে দূরে থাকা।
সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা যদি হিন্দু-মুসলিম, ইহুদী-মুসলিম কিংবা খৃস্টান-মুসলিমের মাঝে হয় আর সেখানে মুসলমান বেশি মারা যায় কিংবা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে সে ঘটনা অত্যন্ত গুরুত্বহীনভাবে প্রচার করা হয় এবং মুসলমানের আলোচনা তখনই হয় যখন কোনো মুসলমান কাউকে মারে। আর যদি কোনো মুসলমান মারা যায় তা হলে সে ঘটনা আলোচিত হয় বটে, তবে তার দীন ধর্মের পরিচয় প্রকাশ করা হয় না। কেননা, এরূপ করা হলে অমুসলিমদের দুর্নাম হয়। ভারতীয় মিডিয়ার পলিসিও এরকমই।
এ ব্যাপারে বিবিসির দৃষ্টিভঙ্গি সাংবাদিক অসততার প্রকাশক। নিম্নের ঘটনাবলী থেকে সেটাই প্রমাণিত হয়। ২০০১ সালের মার্চ মাসে সীমান্ত প্রদেশের হিঙ্গু জেলার দুই গ্রামের অধিবাসীদের মধ্যে লড়াই হয়। ঘটনাক্রমে এক গ্রামের অধিবাসী সুন্নী এবং আরেক গ্রামের অধিবাসীরা ছিল শিয়া। এ লড়াইয়ে কয়েকজন লোক মারা যায়। এ লড়াই হয়েছিল পানি নিয়ে। এর সাথে সাম্প্রদায়িকতার কোনো সম্পর্ক ছিল না। পেশোয়ারে কর্মরত বিবিসির রিপোর্টার সেটা স্পষ্টও করে দিয়েছিল। এরপরও বিবিসি এ ঘটনাকে সম্প্রদায়িকতার প্রলেপ দিয়ে সাম্প্রদায়িক ফাসাদ বিশৃংখলার সাথে এর সম্পর্ক জুড়ে দেয়। বিবিসি এভাবে দুই দলের মধ্যে সম্প্রদায়িকতা উসকে দেয়। অথচ এ বিশৃংখলার মূল কারণ সিকিউরিটি এজেন্সীগুলোর উদাসীনতা, সিকিউরিটি কর্মকর্তাদের অযোগ্যতা, আর প্রচার করা হচ্ছে সাম্প্রদায়িক বিশৃংখলা বলে। অথচ সিকিউরিটি এজেন্সীগুলোর উদাসীনতা এবং এসব এজেন্সীর কর্মকর্তাদের অযোগ্যতা অদক্ষতা দূর করা গেলে আপনা আপনিই এ সমস্যার সমাধান হয়ে যায়।
বিগত বছরের শেষের দিকে করাচীতে পি. এস. ও'র ডিরেক্টর শওকত মির্জার হত্যাকাণ্ডকেও বিবিস সাম্প্রদায়িক হত্যাকাণ্ড বলে আখ্যায়িত করে। অথচ মাসিক আদ দাওয়ার ভাষ্যকারের মতে, শওকত মির্জা অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার অধীনে সন্ত্রাসের বলি হয়েছে। কেননা, শওকত মির্জা পিএসও'র অনেক উন্নতি সাধন করে একে দেশের সবচেয়ে লাভজনক সংস্থা বানিয়েছিলেন। তার হত্যাকারে পর শেল কোম্পানী পিএসও সংস্থাটি কিনতে চাইছে। (মাসিক আদ দাওয়া, মার্চ-২০০২)
পাকিস্তানের বাইরে বিবিসির সাম্প্রদায়িকতা বিষয়ক রিপোর্টিংয়ের সুস্পষ্ট পার্থক্য দৃষ্টিগোচর হয়। যদিও কালেভদ্রে সত্য রিপোর্টও প্রকাশিত হয়, কিন্তু তাও করা হয় একটা সীমা পর্যন্ত শ্রোতাদের বিশ্বাস ধরে রাখার জন্য।
ভারতের গুজরাটে সংঘটিত স্মরণকালের ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় ১৫ হাজার মুসলমান শহীদ হন। শত শত ঘরবাড়ী জ্বালিয়ে দেয়া হয় এবং লক্ষ লক্ষ মুসলমান গৃহহারা হয়। বিবিসি এই ভয়াবহ ঘটনাকে গুরুত্বহীনভাবে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা আখ্যা দিলেও একথা পরিস্কার করেনি, এই দাঙ্গায় সবচে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মুসলমান সম্প্রদায় এবং তারাই সবচে বেশি নিহত হয়েছে। তারা প্রচার করেছে হাজার হাজার লোক নিহত হয়েছে। শত শত ঘরবাড়ী জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে। লক্ষ লক্ষ মানুষ গৃহহারা হয়েছে। কিন্তু ক্ষতিগ্রস্তের সাথে মুসলমান নাম উল্লেখ করেনি। বিবিসি সুপরিকল্পিত এ মুসলিম নিধনযজ্ঞকে নিছক হত্যাকাণ্ড বলে চালিয়ে দিয়েছে। মেসিডোনিয়ায় মুসলিম নিধনযজ্ঞেও বিবিসি একই পন্থা অবলম্বন করেছে। মুসলিম নিধনযজ্ঞ সম্পর্কিত বিবি-ি সর প্রচার নীতির একটি মাত্র উদাহরণ দেখুন-
২০০২ সালের ২২ মার্চ গুজরাটের বড়োদা জেলায় কর্মরত বিবিসির প্রতিনিধি অটল বিভাস রিপোর্ট দিয়েছে, আজকের দাঙ্গায় ছুরিকাঘাতে দু ব্যক্তি নিহত ও একজন আহত হয়েছে। দশটি বাড়ী এবং পাঁচখানা গাড়ী জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে। কিন্তু রিপোর্টার ক্ষতিগ্রস্তদের সাথে মুসলমান নাম উল্লেখ করেনি। এই দাঙ্গা সৃষ্টির মূল পরিকল্পক বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, কিন্তু বিবিসির রিপোর্টার তার রিপোর্টে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের সদস্যদের স্বেচ্ছাসেবক আখ্যা দিয়েছে। অথচ এ একটি কট্টরপন্থী, সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী সংগঠন, যা পারস্পরিক প্রতিবেশীসূলভ অস্তিত্ব ও অবস্থাকে বিশ্বাস করে না। এরাই এই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টির মূল হোতা। অথচ তারাই হয়ে গেল স্বেচ্ছাসেবক।
বিবিসির উল্লিখিত রিপোর্টসমূহের ধরন থেকেই প্রকাশ পাচ্ছে, দীন ধর্মের ব্যবধানের সাথে সাথে বিবিসির রিপোর্টিং পদ্ধতিতে পরিবর্তন ঘটে; বরং বলা যায়, সম্পূর্ণ বিপরীত পন্থা অবলম্বিত হয়।
📄 গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের শ্লোগান
গণতন্ত্রও পাশ্চাত্যের একটি অস্ত্র। এই অস্ত্র তারা অধিকাংশ সময় সামরিক সরকার আবার কখনো রাজা-বাদশাহদের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করে থাকে। এই অস্ত্র তখনই প্রয়োগ করে যখন সরকারগুলো তাদের নির্ধারিত এজেন্ডা পাশ কাটানোর শংকা জাগে। এই অস্ত্রের মাধ্যমে তারা সরকারগুলোকে ব্ল্যাকমেইল করে তাদের মাধ্যমে স্বীয় স্বার্থ উদ্ধার করে। যখনই তারা পাশ্চাত্যের তাবেদারী এবং তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে রাজি হয়ে যায় তখন তাদের একনায়কতন্ত্র ও রাজতন্ত্রের ওপর পাশ্চাত্যের কোনো অভিযোগ থাকে না, বরং তখন তারা পশ্চিমের নিকট গণতান্ত্রিক সরকার থেকেও বেশি প্রিয় হয়ে যায়।
রাজতন্ত্রের উদাহরণ আরব বিশ্ব, যারা অগণতান্ত্রিক হওয়া সত্ত্বেও ইউরোপ- আমেরিকার নিকট খুব প্রিয়। কারণ সেখানে তাদের স্বার্থ সংরক্ষিত ও নিরাপদ রয়েছে। আর সামরিক সরকারের উদাহরণ মিসর, সিরিয়া, আলজেরিয়া, তিউনিসিয়া, ইরান, ইন্দোনেশিয়া, তুরস্ক এবং পাকিস্তান। এসব সরকারকে পাশ্চাত্য তার স্বার্থে ব্যবহার করেছে এবং তাদের সাথে সুগভীর সম্পর্ক রেখেছে; বরং একাধিকবার তাদের মাধ্যমে গণতন্ত্রকে দলিত মথিত করেছে। পক্ষান্তরে তুরস্কের এরদোগানের সরকার এবং সুদান ও আফগানিস্তানকে পাশ্চাত্য পছন্দ করেনি। কারণ এরা তাদের স্বার্থের বিরুদ্ধে ছিল। কিউবাতে ফিদেল ক্যাস্ট্রোকে ক্ষমতায় আনতে আমেরিকা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে, কিন্তু কিউবা যখন তার সাথে চলতে অস্বীকার করে, তখন ক্যাস্ট্রোকে সে একজন ঘৃণিত ব্যক্তি আখ্যা দেয়। স্বীয় স্বার্থে পাশ্চাত্য সব সময়ই দু'মুখো নীতি অবলম্বন করে এসেছে।
বিবিসিও সেসব জায়গায়ই গণতন্ত্র এবং মানবাধিকারের বিপর্যয় খুঁজে পায় যেখানে পাশ্চাত্যের অপছন্দীয় সরকার ক্ষমতায় রয়েছে। আর যেখানে পাশ্চাত্যের পছন্দনীয় সরকার ক্ষমতায় রয়েছে সেখানে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের বিপর্যয় তেমন কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। এ ক্ষেত্রেও বিবিসির কতিপয় রিপোর্টের উদ্ধৃতি দেয়া যায়, কিন্তু পাশ্চাত্যবিরোধী সরকার ও রাষ্ট্রসমূহ সম্পর্কিত রিপোর্টের সাথে এ সকল রিপোর্টের সংখ্যা অনুমান করা যায়, তখন উভয়ের মাঝে বিস্ময়কর পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়।
বিবিসির নিকট তালেবানদের পর্দার ওপর কড়াকড়ি আরোপ মানবাধিকারের লংঘন ছিল, কিন্তু তুরস্ক ও উজবেকিস্তানে বোরকা পরে শিক্ষাঙ্গনে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপ মানবাধিকারের লংঘন নয়। উজবেকিস্তানে পঞ্চাশ হাজার মুসলমানকে বন্দী করা এবং তাদের শরয়ী ইবাদত ও শরয়ী পর্দার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ মানবাধিকার লংঘন নয়। বসনিয়া, চেচনিয়া, হার্জেগভিনা, কাশ্মীর, আফগানিস্তান ও আরাকানের মুসলমানদের রক্তে হোলি খেলা মানবাধিকারের লংঘন নয়। ইন্দোনেশিয়ার খৃস্টান সংখ্যাগরিষ্ঠ 'মালাকা' উপদ্বীপে ১৯৯৯ থেকে ২০০০ পর্যন্ত মাত্র দু'বছরে পঞ্চাশ হাজার মুসলমানকে হত্যা করা হয়েছে। রোডে প্রকাশ্যে মুসলিম নারীদের সম্ভ্রম লুণ্ঠন করা হয়েছে। এসব কি মানবাধিকারের সুষ্পষ্ট লংঘন নয়? বিবিসি কি এসব ঘটনা বস্তুনিষ্ঠতার সাথে পরিবেশন করেছে? পাকিস্তানের আইয়ুব খানের সরকারকে আমেরিকা ও পাশ্চাত্য শক্তি ইসলাম এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছে। জেনারেল জিয়াউল হককে আমেরিকা রাশিয়ার বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছে। সে সময় আইয়ূব খান ও জিয়াইল হক দু'জনই পশ্চিমের পছন্দনীয় সরকার ছিল, কিন্তু এখন মিডিয়ায় তাদের ডিক্টেটর-একনায়ক নামে স্মরণ করা হয়। কারণ এখন আর তাদের কাছে কোনো স্বার্থ নেই।