📄 পশ্চিমা মিডিয়ার পলিসি
আলোচ্য ভূমিকার পর উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশসমূহের মাঝে সম্পর্ক সহযোগিতার ক্ষেত্রে পশ্চিমা মিডিয়ার ভূমিকার প্রতি দৃষ্টিপাত করলে জানা যায়, তাদের মৌলিক পলিসি সম্পূর্ণ তাদের জাতীয় স্বার্থের অধীন। যে কোনো সংবাদ, তা যতই নগণ্য কিংবা গুরুত্বপূর্ণ হোক না কেন, এমনকি কোনো ছবি এবং কার্টুন পর্যন্ত পশ্চিমা মিডিয়ার মালিকদের ধর্মীয় ও জাতীয় স্বার্থের প্রতিনিধি হয়।
যখন থেকে ইহুদীরা মিডিয়াকে দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ সাব্যস্ত করেছে এবং তার ওপর একচেটিয়া কর্তৃত্ব ও আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছে, তখন থেকে একতরফা ট্রাফিক নীতির ভিত্তিতে ইহুদী চিন্তাধারা ও আকীদা-বিশ্বাস গোটা বিশ্বে প্রসার করা হচ্ছে। অন্য ভাষায় আমরা নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, বর্তমান বিশ্বে ৯৫% মিডিয়ার ওপর ইহুদীদের কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। এর মাধ্যমে তারা গোটা দুনিয়ার মন মস্তিষ্ক গঠন ও মগজ ধোলাইয়ের কাজ করছে। যে দিকে তাদের ইচ্ছা জনমত সে দিকেই মোড় নেয়। ইহুদীদের পছন্দই গোটা দুনিয়ার পছন্দ, তাদের রুচিই গোটা বিশ্বের রুচি। যাদের তারা অপছন্দ ও ঘৃণা করে এবং টার্গেট বানায়, গোটা দুনিয়া তাদের ঘৃণা ও অপছন্দ করে এবং তাদের অস্তিত্ব নির্মূল করার জন্য সর্বশক্তি ব্যয় করে। ইহুদী মস্তিষ্ক থেকে বের হওয়া ধ্যান-ধারণা চিন্তা-চেতনার সম্পর্ক তাহযীব-তামাদ্দুন ও সভ্যতা-সংস্কৃতির সাথে হোক কিংবা রাজনীতি, অর্থনীতি ও জীবন মানের সাথে হোক কিংবা ফ্যাশন ও লেবাস পোশাকের চাকচিক্যের সাথে হোক, এক কথায় তার সম্পর্ক যে কোনো কিছুর সাথে হোক না কেন, গোটা সভ্য পৃথিবী তার পেছনে উন্মাদের মতো ঝুঁকে পড়ে এবং তার ওপর আমল করা নিজেদের দীন ও ঈমান মনে করে। কেন এই অবস্থা? সহজ কথায় এর উত্তর হলো, মিডিয়া ও অর্থনীতির মতো দু'টি মজবুত শক্তিশালী স্তম্ভের ওপর ইহুদীদের নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্বের সৃদৃঢ় ইমারত প্রতিষ্ঠিত রয়েছে।
📄 পশ্চিমা নিউজ এজেন্সীগুলোর রিপোর্টিং পদ্ধতি
উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশসমূহের মাঝে বোঝাপড়া, যোগাযোগ ও সম্পর্ক সহযোগিতার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মিডিয়ার ভূমিকার প্রতি দৃষ্টিপাত করলে জানা যায়, এ ক্ষেত্রে পশ্চিমা নিউজ এজেন্সীগুলোর দাবী হলো, তাদের সংবাদ ও রিপোটিং সম্পূর্ণ ভারসাম্যপূর্ণ নিরপেক্ষ পলিসির ওপর নির্ভরশীল, ১ কিন্তু এতদসত্ত্বেও পশ্চিমা নিউজ এজেন্সীগুলো সাধারণতঃ অবস্থা, পরিবেশ, পরিস্থিতি, ঘটনা ও বাস্তবতাকে বিকৃত করে উপস্থাপন করে, অথবা সুন্দর, চিত্তাকর্ষক, হৃদয়গ্রাহী ভঙ্গিতে মিথ্যাকে সত্য ও সত্যকে মিথ্যা বানিয়ে উপস্থাপন করে। সাধারণভাবে উন্নয়নশীল দেশের সাথে এবং বিশেষভাবে ইসলামী বিশ্বের সাথে সহযোগিতার পরিবর্তে এমন পরিবেশ সৃষ্টি করে, যার দ্বারা অভ্যন্ত রীণ দ্বন্দ্ব সংঘর্ষ ও অনৈক্য আরো বিস্তার লাভ করে। সেসব দেশের অতি তুচ্ছ দুর্বলতার ছাইচাপা অগ্নিস্ফুলিঙ্গ ও গোপন অনৈক্যগুলো এমন বাড়িয়ে-চাড়িয়ে উপস্থাপন করে, মনে হয় এটাই সে দেশের মৌলিক সমস্যা। জাতীয় ব্যক্তিত্ব, নিষ্কলুষ নেতৃবৃন্দ এবং উন্নত চরিত্রের পথপ্রদর্শকদের চরিত্র হননের কাজও থেমে থেমে চলতে থাকে।
পশ্চিমা দেশের নীতিনির্ধারকরা তাদের ষড়যন্ত্রপূর্ণ পরিকল্পনা সর্বদিক দিয়ে প্রস্তুত করে নিউজ এজেন্সীগুলোর কাছে পেশ করে। অতঃপর এক নির্ধারিত সময় পর্যন্ত এজেন্সীগুলো সেই পরিকল্পনার বিভিন্ন দিক নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করে এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞ, কূটনীতিক ও সাংবাদিকদের দিয়ে সেই পরিকল্পনা বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা করানো হয়। সেই পরিকল্পনার সমর্থনে পতিত কিছু লোককে ফুটপাত থেকে ধরে এনে সমাজ কর্মী এবং ইউনিভার্সিটির প্রফেসরদের চিন্তাবিদ, বুদ্ধিজীবী ও জাতীয় প্রতিনিধি বানিয়ে তাদের সাক্ষাতকার ও বিবৃতি নেয়া হয়। এভাবে ধীরে ধীরে সেই পরিকল্পনার প্রতি এক বিশেষ পর্যায় পর্যন্ত জনমত সৃষ্টি হয়ে যায়, যার প্রতিক্রিয়া সংবাদপত্রের মাধ্যমে জানা যায়। এরপর দ্বিতীয় পর্যায়ে সে পরিকল্পনার পরবর্তী অংশ বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়। এ স্তরকে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে অগ্রসর করানো হয়। এই স্তরে আশংকা, সম্ভাবনা এবং কখনো সুস্পষ্টভাবে বিদ্রোহ, দ্বন্দ্ব, সংঘর্ষ ও সশস্ত্র আন্দোলনের আহবানও জানানো হয়। উদাহরণস্বরূপ, বাহ্যিক দৃষ্টিতে যদিও তার সাথে কারো কোনো বিরোধ নেই, কিন্তু দৃঢ় সম্ভাবনা আছে, অমুক অমুক ব্যক্তি তার বিরোধিতা করতে পারে। কারণ জনসাধারণের মাঝে তার অবস্থান শক্তিশালী। যুদ্ধের সম্ভাবনা তো নেই, কিন্তু গেরিলা যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার সংশয় বেড়ে গেছে। কারণ ভৌগোলিক অবস্থা এ ধরনের যুদ্ধের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। বর্তমানে তার সরকারের কোনো সংকট নেই, কিন্তু পরবর্তীতে মুসলিম ব্রাদারহুডের পক্ষ থেকে সংকট সৃষ্টির আশংকা রয়েছে। এজন্য সরকারের উচিত এখনই ধর্মীয় দলগুলোকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা। এই বিস্ফোরণ কে ঘটিয়েছে? তৎক্ষণাত তো বিষয়টি জানা যায়নি, কিন্তু রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এ বিস্ফোরণের পেছনে কট্টরপন্থীদের হাত থাকতে পারে। কারণ কিছু দিন ধরে এই গোষ্ঠী মসজিদে মসজিদে সরকারের বিরুদ্ধে বক্তব্য রাখছে।
বিদেশী পর্যটকদের ওপর যে হামলা হয়েছে যদিও তৎক্ষণাত হামলাকারী শনাক্ত করা যায়নি, কিন্তু আমাদের কূটনৈতিক সংবাদদাতা সরকারী ও স্বাধীন সূত্রে আমাদেরকে এই সংবাদ দিয়েছে, এর পেছনে ইসলামী সংগঠনের হাত রয়েছে। এরাই সেই মৌলবাদী, যাদের নারীরা পর্দা করে। এসব লোক মার্কিন ও ইউরোপিয়ান পর্যটকদের আগমনকে দীনী দিক দিয়ে হারাম মনে করে। ২
পশ্চিমা সংবাদ সংস্থাগুলো সাধারণতঃ স্বীয় দেশ, সমাজ ও জনগণ সম্পর্কে ৯০% ইতিবাচক সংবাদ পরিবেশন করে। সেসব ইতিবাচক সংবাদের বেশির ভাগ তাদের উন্নতি-অগ্রগতি, বস্তুগত ও প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ এবং সামরিক শক্তির সাথে সম্পর্কিত। আর তাদের ক্রাইম অপরাধ, হত্যা, লুণ্ঠন, সন্ত্রাস ইত্যাদি সম্পর্কিত সংবাদগুলো এমনভাবে পরিবেশন করে, যেন এগুলোর কোনো গুরুত্বই নেই। এগুলো একটি সাধারণ বিষয়। যদি বড় ধরনের কোনো বিস্ফোরণোন্মুখ সংবাদও হয়, তাহলেও তাতে ইতিবাচক দিক খুঁজে বের করা হয়। যেমন ১৯৯৩ সালের জানুয়ারীতে মার্কিন সামরিক বাহিনী ডেভিড কোরেশের দলের ওপর হামলা চালায়, তাতে ১৫০ জন মানুষ নিহত হয় কিংবা ২০০ মানুষ সম্মিলিতভাবে আত্মহত্যা করে। পশ্চিমা সংবাদ সংস্থাগুলো এমন একটি বড় ধরনের ঘটনাকে এমনভাবে ব্যাখ্যা দেয় যে, পৃথিবীর প্রতিটি জায়গায় প্রতিটি সমাজে এমন কিছু লোক ও দল পাওয়া যায়, যারা সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে। এ ধরনের লোক মানসিক ও ধর্মীয় রোগের শিকার। তাদের প্রতি বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টি দেয়া উচিত। ইউরোপ-আমেরিকা থেকে প্রতিদিন ধারাবাহিক সংবাদ আসছে, এক ব্যক্তি মেশিনগান দিয়ে পঞ্চাশ জন মানুষকে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে, আরেকজন তিন হাজার নারীর ইজ্জত লুণ্ঠনের পর তাদের নির্মমভাবে হত্যা করেছে। আরেকজন তিনশ' নিষ্পাপ শিশুর সাথে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের পর তাদের হত্যা করেছে। যে ব্যক্তি ওকলাহোমার নয় তলা বিল্ডিং বোমা মেরে উড়িয়ে দিয়েছে, সে ছিল সাদা বর্ণের আমেরিকান। এই বিস্ফোরনে এক হাজারের কাছাকাছি মানুষ নিহত হয়েছে, কিন্তু বিস্ফোরণকারীদের দীন ধর্ম এবং জাতীয় পরিচয়কে আলোচনার লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়নি। এমনিভাবে ইহুদী প্রধানমন্ত্রী আইজাক রবিনের হত্যাকারী একজন সাধারণ ব্যক্তি ছিল। হত্যাকারীর দীন ধর্ম, সভ্যতা, সংস্কৃতি, আকীদা, বিশ্বাস ও তার জাতীয় বৈশিষ্ট্যের কিছুকেই পশ্চিমা সংবাদ মাধ্যম টার্গেট বানায়নি। এমনিভাবে না পুলিশও হত্যাকারীর বংশ, পরিবার, বন্ধু-বান্ধব অথবা যে স্কুলে সে পড়াশোনা করেছে, সে স্কুল বা কলেজের কাউকে গ্রেফতার করেছে। আর না সন্ত্রাসের আখড়া আখ্যায়িত করে সেগুলো বন্ধ করে দিয়েছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রাইভেট ও সরকারী দু'ধরনের রেডিও স্টেশন আছে। এক জরিপ অনুযায়ী একশ' পঞ্চাশ মিলিয়ন মার্কিনী দৈনিক রেডিও শোনে। এমনিভাবে মার্কিন টিভি কোম্পানীগুলো চব্বিশ ঘন্টা অনুষ্ঠান সম্প্রচার করে। এই জরিপ অনুযায়ী মার্কিন মিডিয়ায় সম্প্রচারিত অনুষ্ঠানমালার মধ্যে ৯০% অনুষ্ঠানে ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডা ও মিথ্যা প্রচারণা চালানো হয়। ভয়েস অফ আমেরিকা, বিবিসি, রেডিও ইসরাঈল এবং মস্কো থেকে সম্প্রচারিত প্রোগ্রামসমূহে ফিলিস্তিন, সুদান, সিরিয়া, ইরাক, ইরান, লেবানন ও আরব বিশ্বসহ মুসলিম বিশ্বের সামাজিক ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্বকে প্রতিনিয়ত টার্গেট বানানো হচ্ছে। ধর্মপন্থীদের পশ্চাদপদ, কট্টরপন্থী ও মৌলবাদী বলে গালি দেয়া হচ্ছে এবং তাদের অস্তিত্বকে সভ্যতা-সংস্কৃতি ও উন্নয়ন- উৎসকর্ষের জন্য বিপজ্জনক আখ্যা দেয়া হচ্ছে। প্রোপাগান্ডা চালানো হচ্ছে, আরব জাতির প্রধান ব্যস্ততা বিলাসিতা, অন্ধ চিন্তা-ধারা, মদ-জুয়া ও যৌনতা। পাশ্চাত্যের যদি কারো থেকে কোনো ভয় থাকে, তাহলে তা ধর্মীয় গোঁড়াদের থেকে, যারা বিজ্ঞান প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের শত্রু। তারা ঘড়ির কাঁটা পেছনে নিয়ে যেতে চায়। পক্ষান্তরে ইহুদী ও খৃস্টানরা সভ্য ও উন্নত জাতি। তাদের রাষ্ট্র গণতন্ত্রের সুদৃঢ় স্তম্ভের ওপর প্রতিষ্ঠিত। অথচ আরব বিশ্বের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা ডিক্টেটরশীপ ও একনায়কতন্ত্রের ওপর প্রতিষ্ঠিত। ৩ পশ্চিমা নিউজ এজেন্সীগুলো ইসলামী বিশ্ব সম্পর্কে কি ধরনের রিপোর্টিং করে এবং টিভি কোম্পানীগুলো কিভাবে মস্তিষ্ক ধোলাই ও জনমত গঠন করে, তার একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র নিম্নে পেশ করা হলো।
০১. ১৯৬৩ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির হত্যার পর পশ্চিমা বিশ্বে আরব বিশ্বের বিরুদ্ধে উত্তাল ভূমিকম্প শুরু হয়। এই হত্যাকান্ডে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ইহুদীদের কালো হাত জড়িত ছিল, কিন্তু প্রকৃত হত্যাকারীকে আড়াল করে ইহুদী মিডিয়া এই ঘটনা ভিন্নখাতে প্রবাহিত করে। ইহুদী মিডিয়া বাশারা সারহান নামের এক ব্যক্তিকে হত্যাকারী আখ্যা দিয়ে আরব বিশ্ব ও ইসলামের বিরুদ্ধে তুফান শুরু করে দেয়। সেই নিরপরাধ বাশারা সারহান দীর্ঘ বত্রিশ বছর ধরে হত্যার আসামী হিসেবে জেলের অভ্যন্তরে ফাঁসির অপেক্ষায় রয়েছেন।
০২. ১৯৭১ সালে মিসর-ইসরাঈল যুদ্ধের পর শাহ ফয়সাল যখন পশ্চিমা জগতকে তেল বন্ধ করে দেয়ার ঘোষণা দেন, তখন পশ্চিমা মিডিয়া তাঁর বিরুদ্ধে মহা অভিযান শুরু করে। তাঁর পরিবারের চরিত্র হননের জন্য একাধিক চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হয়। শেষ পর্যন্ত একটি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে শাহ ফয়সালকে হত্যা করা হয়। শাহ ফয়সালের শাহাদতের সংবাদ সর্বপ্রথম সংবাদ সংস্থা রয়টার বিশ্ববাসীর সামনে পেশ করে। সংবাদের ধরন ছিল এরকম, 'বাদশাহ ফয়সাল 'ঈদে মিলাদুন্নবী' উপলক্ষে দরবারে লোকদের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময়কালে তাঁরই পরিবারের এক যুবকের হাতে শাহাদত বরণ করেন।'৪ এই সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যমে পশ্চিমা মিডিয়া বিশ্বকে এই প্রতিক্রিয়া দিতে চেষ্টা করেছে, যে নবীকে গোটা দুনিয়ার জন্য রহমত বানিয়ে প্রেরণ করা হয়েছে এবং যাঁকে শান্তি সম্প্রীতির পয়গাম দিয়ে পাঠানো হয়েছে, সে নবীর জন্ম দিবস উপলক্ষে এক মুসলমান অপর মুসলমানকে হত্যা করেছে। এটা তাদের জন্য কোনো বিষয়ই নয়। এ ধর্মের অনুসারীদের জন্য এ ধরনের কর্মকান্ড একটি অতি সাধারণ বিষয়। এ মর্মান্তিক ঘটনার পরই পশ্চিমা মিডিয়া ইসলাম ও মুসলমানদের ইতিহাস থেকে কট্টরপন্থা উগ্রতার বিভিন্ন ঘটনাবলী খুঁজে খুঁজে বের করে বিভিন্ন প্রবন্ধ-নিবন্ধ ও সংবাদ প্রকাশের মাধ্যমে মগজ ধোলাইয়ের নাপাক প্রচেষ্টা শুরু করে।
পশ্চিমা মিডিয়ার মৌলিক উদ্দেশ্য হলো, শত্রুকে বিভ্রান্তি কিংবা আত্মতৃপ্তিতে লিপ্ত করে তার ধর্ম ও সভ্যতার ব্যাপারে সন্দেহ-সংশয় সৃষ্টি করা। পরবর্তী ধাপে শক্তিশালী ভঙ্গিতে নতুন হামলা চালানো, যাতে সন্দেহ-সংশয়ের স্তর অতিক্রম করে আপন দীন-ধর্ম, আকীদা-বিশ্বাস, সভ্যতা-সংস্কৃতি, স্বদেশের মানুষ ও ইতিহাস-ঐতিহ্যের বিরুদ্ধে ঘৃণার বীজ রোপণ করে দেয়া যায়। ওরিয়েন্টালিস্টগণও জ্ঞান-গবেষণা বিষয়ে একই পদ্ধতি ও ধরন গ্রহণ করেছেন। ইহুদী মিডিয়া ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে সামান্য বিরতি দিয়ে দিয়ে সংবাদ প্রকাশ করাকে নিজেদের একটি মৌলিক উদ্দেশ্য সাব্যস্ত করে নিয়েছে। এ জন্য তারা অত্যন্ত গভীর দক্ষতা ও সূক্ষ্মতার সাথে এমন সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা তৈরি করে, যাতে লোকেরা এই পরিকল্পনার গভীরে যাওয়া তো দূরে থাক, তার আশেপাশেও যেতে সক্ষম হয় না। তারা ইহুদীদের দক্ষ ও চাতুর্যপূর্ণ পরিকল্পনার আপাতবাহ্যিক চাকচিক্যে মোহিত হয়ে হুবহু সেটাই গ্রহণ করে নেয়।
০৩. ১৯৯৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারী প্রথমবার ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে বোমা বিস্ফোরণ ঘটানো হয়, কিন্তু এই ঘটনাকে ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে কিভাবে ব্যবহার করা যায়, কিভাবে এটাকে বাহানা বানিয়ে ইউরোপ-আমেরিকায় বসবাসরত মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঘৃণা বিদ্বেষ ছড়ানো যায় এবং কিভাবে তাদের এদেশে আসার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা যায়-সেই প্রচেষ্টায় ইহুদী মিডিয়া একযোগে আদাজল খেয়ে ময়দানে আবির্ভূত হয়। শুধু তাই নয়; বরং এ দাবীও উত্থাপন করা হয়, এমন মুসলমানদের অস্তিত্ব ইহুদী, খৃস্টান ও গোটা সভ্য দুনিয়ার জন্য ভয়াবহ বিপজ্জনক।
ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে বিস্ফোরণের পূর্বে ধারাবাহিক দুই বছর ধরে ইউরোপ-আমেরিকায় বসবাসরত মুসলমানদের দীনী ও সামাজিক তৎপরতা, তাদের অর্থনৈতিক অবস্থান, ইউরোপ-আমেরিকার সমাজে তাদের প্রভাব-প্রতিক্রিয়া, মসজিদ, মাদরাসা এবং অন্যান্য ইসলামী দাওয়াতী সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের ওপর অসংখ্য প্রামাণ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হচ্ছিল। ভয়েস অফ আমেরিকা, সিবিএস, আইবিএস, নিউইয়র্ক টাইমস, টাইম নিউজউইক, ওয়াল স্ট্রীট জার্নাল এবং লস এঞ্জেলেস টাইমস তার সাংবাদিকদের তৈরিকৃত ফিচার, প্রবন্ধ-নিবন্ধ ও সাক্ষাতকার প্রকাশের মাধ্যমে সার্বিক দিক দিয়ে ইউরোপ-আমেরিকায় মুসলমানদের উপস্থিতিরি সুদূরপ্রসারী ভয়াবহ প্রভাব-প্রতিক্রিয়া ও ফলাফলের বিচার-বিশ্লেষণ করে আসছিল। মুসলমানদের ব্যাপারে পশ্চিমা মিডিয়ার অসাধারণ আগ্রহ দেখে মার্কিন মুসলমানদের এই ধারণা হয়ে গিয়েছেল, এটি একটি বড় ধরনের ঘটনার পূর্বাভাস ও ভূমিকা। এ জন্য ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার প্রতিটি প্রোগ্রামের পর ইরানে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস দখল, বোমা মেরে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণকারী বিমান উড়িয়ে দেয়া, মিউনিখে এগার জন ইসরাঈলী খেলোয়াড় ফিলিস্তিনীদের হাতে নিহত হওয়া ইত্যাদি ঘটনাগুলো অত্যন্ত ফলাও করে প্রচার করা হতো। এর মাধ্যমে তারা এই প্রতিক্রিয়া দেয়ার চেষ্টা করত, যদি মুসলমানরা ইউরোপ-আমেরিকায় অবস্থান করে এবং তাদের সংখ্যা দিন দিন বাড়তে থাকে, তাহলে তারা এক সময় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো দখল করে নেবে। যেহেতু মুসলমানদের ধর্মে চার বিয়ে করার অনুমতি আছে সেহেতু তাদের সংখ্যাও অসাধারণ দ্রুততার সাথে বৃদ্ধি পাবে। ফলে তারাই এক সময় ব্যবসায় বাণিজ্য ও শিল্পের ওপর আধিপত্য বিস্তার করে ফেলবে। অতএব মুসলমানদের ব্যাপারে সতর্ক দৃষ্টি রাখা জরুরী। এভাবে মগজ ধোলাই করতে করতে পরবর্তীতে টুইন টাওয়ারে বড় ধরনের আত্মঘাতী হামলা চালানো হয়। এ হামলার পর পরই ইসরাঈলী সরকার কোনো অন্যায় অপরাধ ছাড়াই অধিকৃত অঞ্চল থেকে ফিলিস্তিনী ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার ও বিজ্ঞানীদের বহিষ্কার করে। এই ঘটনায় বড় ধরনের বিশৃংখলা সৃষ্টি হয়, কিন্তু টুইন টাওয়ারের মতো বড় ঘটনার মধ্যে এই বহিষ্কারের ঘটনা ধামাচাপা পড়ে যায়। এই বহিষ্কারের মাধ্যমে ইসরাঈল আমেরিকাকে একথা বলতে চেয়েছে, যেভাবে আমরা দেশদ্রোহী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার কারণে লোকদের বহিষ্কার করেছি, তেমনিভাবে মার্কিন সরকারেরও উচিত মার্কিন মুসলমানদের তাদের দেশ থেকে বের করে দেয়া। টুইন টাওয়ারের এ ঘটনায় ইসরাঈলী গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সি.আই.এ এবং মিসরী গোয়েন্দা সংস্থা যৌথভাবে অংশ নিয়েছিল। আত্মঘাতী হামলার পর ইহুদী মিডিয়া নিয়মতান্ত্রিক মার্কিন সরকারের নিকট এই দাবী করেছিল, তারা মুসলমানদের আমেরিকায় আগমনের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করুক,
অবৈধভাবে বসবাসরত লোকদের এখান থেকে বের করে দেয়া হোক এবং আইন প্রণয়ন করা হোক মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর কোন রকম তদন্ত ছাড়াই বিদেশীদের দেশ থেকে বের করে দিতে পারবে। এ আত্মঘাতী হামলায় স্বয়ং মার্কিন সরকারই বিস্মিত হয়ে যায়। সাধারণভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত মুসলমানদের বিরুদ্ধে কোনো রিপোর্ট ছিল না। এই আত্মঘাতী হামলাকে ইহুদী মিডিয়া কী সুনিপুণভাবে আরবদের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দেয়, মিডিয়াগুলোর সংবাদ শিরোনাম ও সংবাদ পর্যালোচনা থেকে সে কথা সহজেই অনুমান করা যায়। উদারহরণস্বরূপ নিউইয়র্ক টাইমস এই আত্মঘাতী হামলার পর প্রথম শিরোনাম করে-'এক কট্টরপন্থী মুসলমান গ্রেফতার', ইহুদী পুঁজিপতিদের মুখপত্র ওয়াল স্ট্রীট জার্নাল-এর শিরোনাম ছিল 'আমাদের বাগিচায় কট্টরপন্থা ও উগ্রতার বিষধর সর্প বিদ্যমান', অপর একটি মুখপত্র জিউস প্রেস শিরোনাম করে, 'ইসলামী মৌলবাদ সারা দুনিয়ার জন্য বিপজ্জনক'।
ইহুদী বুলেটিন এ.ডি.এল. সম্পাদকীয় শিরোনাম করে 'হামাস ইসলামী জেহাদ ও ব্রাদারহুড আমেরিকার জন্য বিপজ্জনক'। টাইমস পত্রিকা তার প্রথম পৃষ্ঠায় মসজিদের মিনারাকে বন্দুকের নলের আকারে উপস্থাপন করে শিরোনাম করে 'মসজিদের মিনারাও বন্দুকের নলের মতো কট্টর পন্থা, উগ্রতা ও হিংস্রতার নিদর্শন'। নিউজউইক কেন পেছনে থাকবে। তার শিরোনাম ছিল 'হুশিয়ার! খবরদার!! মুসলমান মুজাহিদরা আসছে।' ফরাসী পত্রিকা দি পয়েন্ট তার প্রথম পাতায় একজন বোরকাপরা নারী হাতে রাইফেল উঁচিয়ে আছে দেখিয়ে শিরোনাম করে, 'মুসলিম নারীরাও কট্টরপন্থা ও উগ্রতার পতাকাবাহক'-কমবেশি এ ধরনের শিরোনাম, সংবাদ, বিশ্লেষণ, পর্যালোচনা, ছবি, কার্টুন ও সাক্ষাতকার প্রকাশ করা হয়। এ প্রচারাভিযানের বুনিয়াদী উদ্দেশ্য হলো-৬
০১. মার্কিন সমাজে রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও দীনী পর্যায়ে মুসলমানদের তৎপরতা ও শক্তিকে দুর্বল করা।
০২. যেহেতু চলমান শতাব্দীর শেষ প্রান্ত নাগাদ আমেরিকায় খৃস্টানদের পরে মুসলমানদের অবস্থান হবে দ্বিতীয়। তারা রাজনীতি ও অর্থনীতির ওপর গভীর প্রভাব ফেলবে। এ জন্য আরো অতিরিক্ত মুসলমানদের আমেরিকায় আগমণের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা এবং তাদের নাগরিত্ব দেয়ার ক্ষেত্রে জটিলতা সৃষ্টি করা। কারণ অধিকহারে মুসলমানদের আগমণ ও তাদের পুঁজি বিনিয়োগে ইহুদী স্বার্থে আঘাত লাগবে।
০৩. মার্কিন সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করা, যাতে আরব ও ইসলামী বিশ্বের সক্রিয় শক্তিশালী ইসলামী প্রয়াসগুলো নির্মূল করার জন্য তাদের সরকারগুলোকে বাধ্য করে এবং তাদের প্রদত্ত অর্থনৈতিক ও সামরিক সাহায্যে ইসলামপন্থীদের দমন ও নির্মূলের শর্ত জুড়ে দেয়। ৭
০৪. বিশেষ করে ইসলামী বিশ্বে এবং ইউরোপ-আমেরিকায় সাধারণভাবে ইসলামী জাগরণের বিরুদ্ধে জনমত সৃষ্টি করা, এতদুদ্দেশে ইসরাঈলকে বেশি থেকে বেশি সাহায্য, সহযোগিতা ও সমর্থন করা, বিশেষ করে সামরিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার জন্য আমেরিকাকে উদ্বুদ্ধ করাই ইহুদী নিয়ন্ত্রিত পাশ্চাত্য মিডিয়ার উদ্দেশ্য। ৮
০৫. ১৯৮৭ সালের ২৯ জানুয়ারী পশ্চিমা সংবাদসংস্থাগুলো সমগ্র বিশ্ববাসীর সামনে সংবাদ পরিবেশন করে, দক্ষিণ কোরিয়ার বোয়িং বিমান (এল.এল)-কে বোমা মেরে উড়িয়ে দেয়া হয়েছে। বিস্ফোরণের পূর্বে এই বিমান বাগদাদ ও বাহরাইন এয়ারপোর্টে অবতরণ করে। ধারণা করা হচ্ছে, এই হামলায় কোনো আরব মুসলমান জড়িত রয়েছে। এই সংবাদ পরিবেশনের পর পরই আরব বিশ্ব ও তাদের দীন ধর্ম এবং সভ্যতা সংস্কৃতির বিরুদ্ধে সংবাদ মাধ্যমসমূহে তুফান শুরু হয়ে যায়, কিন্তু হামলার ঠিক এক বছর পর ১৯৮৮ সালের ২৫ এপ্রিল তদন্তের মাধ্যমে জানা গেল, এই হামলা চালিয়েছিল দক্ষিণ কোরিয়ার এক নারী। তার স্বীকারোক্তিমতে, সে উত্তর কোরিয়ার ইশারা ও সাহায্যে এই হামলা চালিয়েছিল। পরে তাকে ফাঁসির নির্দেশ দেয়া হয়, কিন্তু এই সংবাদকে মিডিয়ায় কোনো গুরুত্ব দেয়া হয়নি এবং না জেনে আরব বিশ্বের বিরুদ্ধে যে অভিযান চালানো হয়েছিল, মিডিয়া তার জন্য কোনো দুঃখ প্রকাশেরও প্রয়োজন মনে করেনি।
০৬. আবু জেহাদ (খালেদ হাসান)-কে যখন ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ ওঁৎ পেতে হত্যা করতে সক্ষম হলো, তখন পশ্চিমা মিডিয়া ইসরাঈলের মেধা, তীক্ষ্ম বুদ্ধি, মোসাদের দক্ষতা ও পেশাগত প্রশিক্ষণের খুব প্রচার প্রসার করে। এমনিভাবে যখন ইসরাঈল ইরাকের আণবিক স্থাপনার ওপর বোমা নিক্ষেপ করে তা ধ্বংস করতে সক্ষম হয়, তখন তার এয়ারফোর্সের সাহসিকতা, দক্ষতা, বিশেষজ্ঞদের সুনিপুণ পরিকল্পনা এবং ইসরাঈলী বিমান উড্ডয়ন ক্ষমতার খুব প্রসার করে এবং এ ডাকাতি ও সন্ত্রাসী কর্মতৎপরতা বীরত্ব বাহাদুরী আখ্যায় আখ্যায়িত করা হয়।
০৭. উপসাগরীয় যুদ্ধ অস্ত্রের যুদ্ধ ছিল না; বরং স্বয়ং মিডিয়া বিশেষজ্ঞগণ এ যুদ্ধকে মিডিয়ার যুদ্ধ নামে আখ্যায়িত করেছেন। এটি এমন যুদ্ধ, যাতে মিডিয়াই লড়েছিল। এ যুদ্ধকে অস্ত্র বানিয়ে আরবদের থেকে কোটি কোটি ডলার উসুল করা হয়েছে, আবার তাদের ঘাড়ে চেপে বসার মহাসুযোগও লাভ করেছে। এই যুদ্ধে সাদ্দাম হুসাইনকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্বের সবচে বড় শত্রু আখ্যা দেয়া হয়। তার ন্যাশনাল গার্ডকে বিশ্বের সবচে শক্তিশালী ও অত্যুন্নত অভিজ্ঞ সেনাবাহিনী হিসেবে চিত্রিত করা হয়। যারা অসাধারণ শক্তি ও প্রতিভা এবং সর্বোন্নত অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত। তাদের মোকাবেলার জন্য স্থলপথ, নৌপথ ও আকাশ পথে এ পরিমাণ সৈন্য ও অস্ত্রশস্ত্র দরকার, যা আমেরিকার একার পক্ষে সম্ভব নয়; বরং ২১টি রাষ্ট্রের সশস্ত্র বাহিনীই তা আঞ্জাম দিতে পারে। ইরাকের সাদ্দাম হুসাইনের ন্যাশনাল গার্ডের ভয়ানক বিপজ্জনক চিত্র পেশ করে পশ্চিমা মিডিয়া প্রচার করতে লাগল, আমেরিকার এক নম্বর শত্রু সাদ্দাম হুসাইন। অথচ পরবর্তী ঘটনাবলী প্রমাণ করে, আমেরিকার পরিকল্পনা বাস্তবায়নকারী ব্যক্তিই হলো সাদ্দام হুসাইন। তার প্রতি পশ্চিমা বিশ্বের পুরোপুরি পৃষ্ঠপোষকতা ছিল। এক সাদ্দام চলে গেছেন, কিন্তু এমন সাদ্দাম তার আরো প্রয়োজন, যিনি আমেরিকার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবেন। এজন্য আমেরিকা নতুন নতুন সাদ্দام তৈরি করতে থাকে। (নিউজউইক)
টিকাঃ
১. মার্কিন সংবাদ সংস্থা এ.এফ.পি. (এসোসিয়েটেড অব ফ্রান্স প্রেস)-এর গঠনতন্ত্রে উল্লেখ আছে, এজেন্সী সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ পলিসি গ্রহণ করবে। কোনো বিশেষ দল কিংবা সুনির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি ও ধর্মের সাথে তার কোনো সম্পর্ক থাকবে না। অর্থনৈতিক দিক থেকে সে সম্পূর্ণ স্বাধীন হবে এবং খরিদ্দারদের চাঁদার ওপরই তার আমদানী নির্ভর করবে। এটা তো এজেন্সীর গঠনতন্ত্রের কথা, কিন্তু এজেন্সীর মালিক মোখতার ইহুদী পুঁজিপতিদের নিকট নিরপেক্ষতার কি প্রত্যাশা আছে? এটা একটা কল্পনা ও উন্মাদনা ছাড়া আর কিছুই নয়।
২. পশ্চিমা দেশগুলো ইসলামী বিশ্বের ওপর সামরিক হামলার পরিবর্তে মিডিয়াকে অস্ত্রের মর্যাদা দিয়েছে। এই মিডিয়াকে তারা এমন সামরিক দক্ষতার সাথে প্রয়োগ করে যে, ঘরে বসেই বিশেষ করে ইসলামী বিশ্বে এবং সাধারণভাবে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে জনগণ ও সরকারকে প্রতিপক্ষ হিসেবে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ সৃষ্টি করায়। ইসলামী বিশ্বের পঞ্চাশ বছরের ইতিহাসে উল্লিখিত কৌশলের ভূরি ভূরি দৃষ্টান্ত রয়েছে।
উদাহরণস্বরূপ আরব বিশ্বে রাজনৈতিক অস্থিরতা, অনৈক্য, গৃহযুদ্ধ ও ভ্রাতৃ হত্যার জন্য মিসর, সিরিয়া, ইরাক, আলজেরিয়া ও তিউনিসিয়াতে সামরিক বিপ্লব ঘটানো হয়েছে। মিশর, সিরিয়া ও ইরাকে মুসলিম ব্রাদারহুডের সুগভীর প্রভাব নির্মূল করার জন্য ব্রাদারহুডের নামেই রেডিও স্টেশন স্থাপন করা হয়েছে। যেখান থেকে ব্রাদারহুডের দীনী প্রোগ্রামগুলো সম্প্রচার করা হতো, আবার সেই স্টেশন থেকেই আরব সরকারগুলোর বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহে উসকানি দেয়া হতো। পরবর্তীতে জামাল আবদুন নাসেরের সরকার আসইউতে এমন রেডিও স্টেশন আবিস্কার করেছে। জানা গেছে, বহিঃশক্তির সাহায্য এবং আশ্রয়-প্রশ্রয়েই এই স্টেশন পরিচালিত হচ্ছিল, কিন্তু তখনো পর্যন্ত হাজারো ব্রাদারহুড সদস্যকে দুনিয়া থেকে বিদায় করা হয়েছে, নাসেরের পরবর্তী সরকার কর্তৃক গঠিত তদন্ত কমিটি এ কথা স্বীকার করেছে। এভাবে নাসেরকে মিসরীয়দের মাঝে জনপ্রিয় করে তোলার জন্য আমেরিকা একজন বিশেষজ্ঞকে মিসরে প্রেরণ করে, যার পরামর্শে প্রকাশ্য জনসভায় নাসেরের ওপর জীবনঘাতী হামলার নাটক মঞ্চস্ত করা হয়েছিল। পরবর্তীতে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এক রাতেই পুরো দেশ থেকে পঞ্চাশ হাজার ব্রাদার হুড সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়।
দ্বিতীয় দৃষ্টান্ত ইসরাঈলের সাথে নতুনভাবে সম্পর্ক স্থাপনের পরের। কুয়েত থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন আল মুজতামার অনুসন্ধানী রিপোর্ট হচ্ছে, একজন বড় দায়িত্বশীল কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন, মিসরে সংঘটিত ষোলটি বিস্ফোরণের মধ্যে যেসব বিস্ফোরণ বিদেশী পর্যটক ও মিসরী কর্তৃপক্ষের ওপর ঘটানো হয়, তার একটি ভিডিও তৈরি করা হয়। আর এসব বিস্ফোরণ ঘটানো ও ভিডিও তৈরির সাথে ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ ও মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সি.আই.এ সরাসরি জড়িত ছিল। যখন সে কর্মকর্তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, সরকার পুরো বিষয়টি সম্পর্কে জানার পরও কেন তা জনগণের সামনে প্রকাশ করল না। তিনি জবাব দিলেন, দু'টি বাধার কারণে সরকার তা পারেনি। একটি হচ্ছে মার্কিন সরকার নারাজ হবে, অপরটি হচ্ছে জনগণ নারাজ হবে। মার্কিন সরকার নারাজ হওয়ার কারণ, তার সংস্থার জড়িত থাকার কথা জনসাধারণে প্রকাশ হয়ে পড়বে, আর আমাদের জনসাধারণ নারাজ হওয়ার কারণ, আমরা এতদিন পর্যন্ত জনগণকে আশ্বস্ত করে আসছি, ইসরাঈলের সাথে সুসম্পর্ক সৃষ্টি আমাদের স্বার্থের পক্ষে। মিসরী পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিশেষজ্ঞগণ মিসরের বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত বিস্ফোরণ ও জীবনঘাতী হামলায় ব্যবহৃত সরঞ্জামাদি ও গোলাবারুদ সম্পর্কে বিশ্লেষণ করে বলেন, এগুলো বাইরে থেকে আমদানীকৃত এবং সেগুলো এত মূল্যবান, কোনো সরকারই কেবল তা বহন করতে পারে। মিসরী এক কর্মকর্তা ১৯৯৩ সালের একটি গোয়েন্দা মামলার উদ্ধৃতিক্রমে বলেন, যুগপৎ গ্রীক ও মিসরী নাগরিক ইহুদী অভিনেত্রী লুসি মিসরের শীর্ষস্থানীয় সরকারী কর্মকর্তাদের সাথে দৈহিক ও আর্থিক সম্পর্কের বিনিময়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সেসব ফাইল চুরি করে নেয়, যাতে মুসলিম ব্রাদারহুডের সক্রিয় সদস্যদের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ ছিল।
পরে সেই ফাইলগুলো ইহুদী গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের ঘাতক দলের কাছে হস্তান্তর করে। তারপর মোসাদ সদস্যরা ফাইলের বিবরণ অনুযায়ী মিসরী পুলিশের উর্দি পরে শত শত ব্রাদারহুড কর্মীকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়। এ কর্মকর্তা ১৯৯৩ সালে এস্কান্দারিয়া উপকূলে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনার উল্লেখ করে বলেন, বিস্ফোরণের পর ঘটনাস্থলে একটি লিফলেট পাওয়া যায়। উক্ত লিফলেটে লেখা ছিল, বিস্ফোরণ ঘটানোর কারণ হচ্ছে, মিসরী সরকার কাফির ও নির্লজ্জ। এই সরকারের আমলে নারী-পুরুষ উলঙ্গ হয়ে গোসল করে। আমরা এ সরকারকে নির্মূল করব। লিফলেটের নিচে এস্কান্দারিয়া ইউনিভার্সিটির প্রফেসর ও ছাত্রদের নাম লেখা ছিল। এ সরকারী কর্মকর্তা বলেন, সরকার এই ঘটনার পুরো দায়-দায়িত্ব ব্রাদার হুডের ঘাড়ে চাপানোর নির্দেশ দেয়। আলজেরিয়ায় এ ধরনের ঘটনা নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপারা হয়ে দাঁড়িয়েছে। 'এক সাথে ৬০ জন মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়', 'শিশু ও নারীদের পেট চিরে দেয়া হয়', 'পঞ্চাশ জন নারী বাড়ী থেকে উধাও হয়ে যায়', 'ভরা বাজারে গাড়ী বোমা হামলায় ৮০ জন নিহত', এসব ঘটনার ব্যাপারে পশ্চিমা সংবাদ সংস্থাগুলোর ভাষ্য হলো, হত্যাকারীদের কোনো হদিস পাওয়া যায়নি, কিন্তু ধারণা করা হচ্ছে, মৌলবাদীরা এর সাথে জড়িত থাকতে পারে। আরো ধারণা করা হচ্ছে, সরকারকে বদনাম করার জন্য এ ধরনের ঘটনা ঘটানো হচ্ছে।
খোদ আলজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট আবদুল আজীজ বু-তাফলিকার বক্তব্য অনুযায়ী ১৯৯০ থেকে ২০০৪ পর্যন্ত সে দেশে দুই লাখ মানুষ নিহত হয়েছে, ২০ হাজার গুম হয়েছে, ৬ লাখ আহত হয়েছে, ২২ মিলিয়ন জনগণ দারিদ্রসীমার নীচে চলে এসেছে এবং ২০ কোটি ডলার ক্ষতি হয়েছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট বুদিয়াফকে ক্ষমতার মসনদে আসীনকারী আলজেরিয়ার জেনারেল খালেদ নেযার এবং রেজা মালিকের লেখা থেকে জানা যায়, এই হত্যা তাদের ইশারা ও নির্দেশে হয়েছে। সূত্র: ম্যাগাজিন-আল জাসূর, ১৪২৪ হিজরী সংখ্যা-২৬।
৩. পশ্চিমা জগত একদিকে সামরিক জান্তার সমালোচনা করে, অপরদিকে এ ধরনের সরকার প্রধানদের পর্দার অন্তরাল থেকে সমর্থন, সাহায্য-সহযোগিতা ও পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করে।
৪. অথচ গোটা বিশ্ব জানে, সৌদি আরবে ঈদে মিলাদুন্নবী নামে কোন অনুষ্ঠান হয় না। এ থেকেই এ সংবাদের নেতিবাচক ব্যাপকতা অনুমান করা যায়।
৫. উদাহরণস্বরূপ ওরিয়েন্টালিস্টরা তাদের গবেষণামূলক প্রবন্ধ-নিবন্ধ ও বই-পুস্তকে রাসূলুল্লাহ (সা.) এর দাওয়াতকে আরব বিশ্বের ভৌগোলিক, পারিপার্শ্বিক ও ঐতিহ্যগত অবস্থার একটি স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া বলে আখ্যা দিয়েছেন। তারা এই প্রতিক্রিয়া দেয়ার চেষ্টা করেছেন, তৎকালীন আরব পরিস্থিতিই এই দাওয়াত গ্রহণ করার জন্য এক পায়ে দাঁড়িয়ে ছিল। অপর এক ওরিয়েন্টালিস্ট-এর উল্টো লেখেন, আরব বিশ্বের অবস্থায় এ ধরনের কোন নিদর্শন প্রকাশিত হয়নি। ওরিয়েন্টালিস্টরা তাদের গবেষণামূলক প্রবন্ধ-নিবন্ধে এমন সুন্দর সুন্দর ভাব ভঙ্গি ও পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন, যেটাকে বর্তমান যুগের মিডিয়া সাংবাদিকতা ও সাহিত্যের মোড়কে উপস্থাপন করছে।
৬. ২০০৬ সালের এক রিপোর্টে দেখা যায়, ১১ই সেপ্টেম্বরের পর 'দ্য সিজ, শেখ, দ্য জুয়েল অব দ্য লাইন' ইত্যাদি নামে হলিউডে অন্তত ১২টি চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হয়েছে, যেগুলোতে মুসলমানদের নিকৃষ্ট হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে।-অনুবাদক
৭. উল্লিখিত প্রচারাভিযানের ফলস্বরূপ মার্কিন সরকার চাপ প্রয়োগ করে আরব বিশ্বের যাকাত, সদকা, দান অনুদান সংগ্রহ ও বিতরণকারী সংস্থাগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। অনেক ইসলামী দেশের রাষ্ট্রপ্রধান তারই ধর্মের অনুসারীদের কট্টরপন্থী মৌলবাদী আখ্যা দিচ্ছে। যেসব সাহায্য সংস্থা ইয়াতিম, দুঃস্থ ও বিধবাদের আর্থিক সহযোগিতা করত কিংবা ছাত্রদের বৃত্তি প্রদান করত কিংবা ধর্মীয় গ্রন্থ প্রকাশ করে ফ্রি বিতরণ করত, সেসব সংস্থাগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। তারা মিডিয়ার মাধ্যমে শীর্ষ ইসলামী ব্যক্তিত্বদের কথা জনগণ পর্যন্ত পৌছানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ইসলামী বিশ্বের প্রভাবশালী সংগঠনগুলোর সক্রিয়, শক্তিশালী ও কর্মতৎপর ব্যক্তিত্বদের গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে সরিয়ে তদস্থলে অখ্যাত ব্যক্তিদের বসানো হয়, যাতে প্রভাবশালী সংগঠনগুলো- যারা বিশ্বের মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ রাখছিল এবং দীনী তৎপরতায় সাহায্য সহযোগিতা ও পথ প্রদর্শন করে আসছিল, তাদের যুগ খতম করে দেয়া যায়। এক কথায়, পাশ্চাত্য মিডিয়া ইসলামী দল, সংগঠন ও সংস্থাগুলোকে নির্মূল করার জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করে।
৮. মার্কিন ইহুদীরা এ উদ্দেশ্যও অর্জন করে ফেলেছে, মার্কিন চাপে ইসরাঈল ও ফিলিস্তিনীদের মধ্যে এমন সমঝোতা চুক্তি করানো হয়েছে, যে চুক্তিতে ইহুদীরাই ১০০%, বরং কল্পনাতীত লভবান হয়েছে। এ ঘটনায় ইহুদীরা এত বেশি খুশি হয়েছে যে, আইজাক রবিনের মত কট্টর ও গোঁড়া ইহুদী ইয়াসির আরাফাতের ইহুদী হওয়ার ওপর সীলমহর লাগিয়ে ঐতিহাসিক সাক্ষ্য দিয়েছেন, 'শুরুতে আমার ধারণা ছিল আপনি একজন ইহুদী, কিন্তু এই সমঝোতার পর মনে হচ্ছে বাস্তবিকই আপনি একজন নিষ্ঠাবান পাক্কা ইহুদী।' এই সমঝোতার পর মার্কিন সরকার আল কুদসে মার্কিন দূতাবাস পুনঃস্থাপনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। খৃস্টানদের নিকট অতি পবিত্র শহর বায়তুল লাহাম (বেথেলহাম) ফিলিস্তিনীদের দিয়ে দেয়। যে শহরের শাসকের স্ত্রী সোহা একজন কট্টর খৃস্টান প্রচারকের মেয়ে এবং তাদের গোটা পরিবার খৃস্টান রীতি নীতি অনুসরণ করে চলে। ইহুদীরা মার্কিন ভূ-খন্ডে দ্বিতীয় উদ্দেশ্য এভাবে অর্জন করল যে, প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিন্টনের নির্দেশে তার শাসনামলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ফিলিস্তিনীদের যত সংগঠন কর্মতৎপর ছিল, সবগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয় এবং মুসলমানদের দীনী ও দাওয়াতী তৎপরতা সীমিত করে দেয়া হয়। এফ. বি. আই. ফ্লোরিডায় অবস্থিত ওয়ার্ল্ড ইসলামিক স্টাডিজ সেন্টারের দফতরে অভিযান চালিয়ে সংগঠনের সকল রেকর্ড ও ফাইলপত্র জব্দ করে নেয়। সেন্টারের প্রেসিডেন্ট ড. সামী আল উরইয়ানী একজন ফিলিস্তিনী এবং দক্ষিণ ফ্লোরিডা ইউনিভার্সিটির ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রফেসর। তার বাড়ী ও ইউনিভার্সিটির দফতরে অভিযান চালিয়ে সকল রেকর্ড ও ফাইলপত্র জব্দ করে নেয়া হয়। কয়েক বছর হল তিনি মার্কিন নাগরিত্বও অর্জন করেন, কিন্তু আইনগতভাবে তাকে এখনো নাগরিকত্ব দেয়া হয়নি। ধারণা করা হচ্ছে, তাঁর ও তাঁর সেন্টারের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযান চালানোর উদ্দেশ্য তাঁর নাগরিকত্ব অর্জনের পথে অন্তরায় সৃষ্টি করা। এ সম্পর্কে এফ.বি.আই সূত্রসমূহের কথা হচ্ছে, ড. সামীর বিরুদ্ধে প্রমাণাদি তালাশ করা হচ্ছে। ইহুদী মিডিয়া লেখেছে, ড. সামীর বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ আনা হতে পারে। ফ্লোরিডার এই সেন্টার কয়েক বছর ধরে কাজ করছে। অসংখ্য সেমিনার- সিম্পোজিয়ামও করেছে। ইলমী ও রাজনৈতিক বিষয়ের ওপর গবেষণাকর্মও প্রকাশ করেছে। যদিও ড. সামীকে আটক করা হয়নি, কিন্তু তার সহকর্মী ড. মূসা আবু মারযুককে মোসাদের রিপোর্টের ভিত্তিতে এফ.বি.আই নিউইয়র্ক এয়ারপোর্ট থেকে গ্রেফতার করে, যখন তিনি ফিলিস্তীন থেকে আমেরিকায় আসছিলেন। অবশ্য পরবর্তীতে তাঁকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে।
📄 বিবিসি সম্প্রচার সংস্থা : একটি পর্যালোচনা
বৃটিশ সম্প্রচার সংস্থা বিবিসি (বৃটিশ ব্রডকাস্টিং করপোরেশন) বিগত ৬২ বছর যাবত চল্লিশটি ভাষায় সম্প্রচার চালিয়ে আসছে। এটিই বিশ্বের সম্প্রচার সংস্থাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত ও প্রসিদ্ধ। এ সংস্থার সম্প্রচারকৃত সংবাদ সমগ্র বিশ্বেই শোনা হয়। পেশাগত মান ও দক্ষতার দিক দিয়ে সমকালীন অন্যান্য সম্প্রচার সংস্থার মধ্যে উন্নত ও উত্তম হওয়ার কারণে জনগণ তার সম্প্রচারিত রিপোর্টের ওপর আস্থা রাখে, কিন্তু এর পাশাপাশি জনগণ এ সংশয়ও প্রকাশ করে থাকে, বিভিন্ন বিষয়ে বিবিসির রিপোর্টের মান বিভিন্ন ধরনের। সামগ্রিকভাবে সে নিরপেক্ষ নয়।
বিবিসি যখন পাশ্চাত্যের বিপক্ষ শক্তি বিশেষ করে ইসলামী পুনর্জাগরণ আন্দোলনসমূহ সম্পর্কে কোনো রিপোর্ট ও প্রোগ্রাম পেশ করে তখন সে যে নিরপেক্ষ নয়, তা আরো সুস্পষ্ট হয়ে সামনে আসে। বিবিসির রিপোর্ট ও সম্প্রচারের ধরন দেখে শংকা জাগে, সে জেহাদ ও পাশ্চাত্যবিরোধী আন্দোলনসমূহের বিরুদ্ধে পশ্চিমা চিন্তাধারার আলোকে মেধা মনন প্রস্তুত করছে না তো? নিম্নে আমরা বিবিসি সম্প্রচারের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করব। আলোচনার সাথে সাথে ঐতিহাসিক প্রমাণ পেশ করারও চেষ্টা করা হবে।
📄 আফগান সমস্যা
১৯৯৬ সালে আফগানিস্তানে তালেবান সরকারের ক্ষমতায় আরোহণ আমেরিকাসহ পাশ্চাত্যের সেক্যুলার শক্তিসমূহকে চিন্তায় ফেলে দেয়। এই যুগান্তকারী ঘটনা তাদের চোখে কাঁটার মতো বিঁধতে থাকে। কারণ তারা আফগানিস্তানে গৃহযুদ্ধ নির্মূল করে শান্তি -নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি ইসলামী আইনও বাস্তবায়ন করে এবং ধর্মহীন শক্তির সামনে নতজানু হতে পরিষ্কার অস্বীকার করে। তালেবান সরকারের এই স্বাধীন পলিসি ধর্মহীন শক্তির ঘুম হারাম করে দেয়। তারা তালেবান সরকারের বিরুদ্ধে ধারাবারিক মিথ্যা প্রচার প্রোপাগান্ডা শুরু করে দেয়, তাদের কঠোরতার সমালোচনা করতে থাকে, তাদের তথাকথিত মানবাধিকার লংঘনের দায়ে অভিযুক্ত আখ্যা দিতে থাকে এবং তাদের সরকারের ইতিবাচক দিকগুলোর আলোচনা থেকে ইচ্ছাকৃতভাবে মুখ ফিরিয়ে নেয়। অন্যান্য মিডিয়ার মতো বিবিসিও সাংবাদিকতার মূল্যবোধকে জলাঞ্জলি দিয়ে পশ্চিমা প্রোপাগান্ডাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে সম্প্রচার করতে থাকে। বর্তমান যুগে তালেবান সরকারের সামাজিক ন্যায়বিচার, ইনসাফ, অভ্যন্তরীণ শান্তি-নিরাপত্তা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, সরকারী আমলাদের সহজ, সরল ও সাদাসিধা জীবন যাপন, বিলাসিতা মুক্ত সমাজ এবং আন্তর্জাতিক চাপ সত্ত্বেও জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব সংরক্ষণের বিষয়টি গোটা বিশ্বের রাষ্ট্র সরকারের জন্য একটি শিক্ষাও বটে এবং চিন্তার বিষয়ও বটে।
সাংবাদিকতার মূল্যবোধের দাবি তো ছিল, বিবিসি যদি তালেবান সরকারের কঠোরতা সম্প্রচার করে, তাহলে তার উল্লিখিত ইতিবাচক দিকগুলোও সম্প্রচার করবে, কিন্তু বিবিসির অস্তিত্ব লাভের উদ্দেশ্যই পশ্চিমা ধ্যান-ধারণা ও চিন্তা-চেতনার সংরক্ষণ। নিম্নে এ সংক্রান্ত কিছু দৃষ্টান্ত পেশ করা হলো-
২০০২ সালের জানুয়ারীর মাঝামাঝি আফগানিস্তানের কয়েকটি প্রদেশে তালেবান কমান্ডোরা সম্মিলিত জোটের স্থলবাহিনীর ওপর প্রচন্ড হামলা চালায়। তখন বিবিসি পেশোয়ারে আফগানিস্তান বিষয়ক বিশেষজ্ঞ রহীমুল্লাহ ইউসূফের সাক্ষাতকার গ্রহণ করে। সাক্ষাতকারের শেষ দিকে রহীমুল্লাহ ইউসূফ যখন তালেবান সরকারের কিছু ইতিবাচক দিক আলোচনা শুরু করেন তখন বিবিসি প্রতিনিধি সঙ্গে সঙ্গে টেপ রেকর্ডার বন্ধ করে দিয়ে শুধু পূর্বের অংশটুকু ধারণ করে সম্প্রচার করে। যাতে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছিল, সাক্ষাতকার এখনো শেষ হয়নি, তার আগেই টেপ রেকর্ডার বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।
যৌথ বাহিনী যখন আফগানিস্তানের নিষ্পাপ নিরপরাধ জনগণের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী হামলা শুরু করে তখন বিবিসি ধারাবাহিকভাবে এই হামলাকে সন্ত্রাস বিরোধী যুদ্ধ আখ্যা দিতে থাকে। উত্তরাঞ্চলীয় জোটকে আফগানিস্তানের বৈধ শাসক এবং তালেবানকে কট্টরপন্থী, গোঁড়া ও সন্ত্রাসী আখ্যা দিতে শুরু করে। অথচ প্রকৃত বিষয়টি ছিল তার উল্টো। কারণ উত্তরাঞ্চলীয় জোটের জুলুম নির্যাতন ছিল নিকট অতীতের বিষয়।
মুজাহিদীনদের মনোবল ও সাহস নষ্ট করা এবং যৌথ বাহিনীর সফলতা বাড়িয়ে পেশ করার জন্য মুজাহিদ শহীদদের সংখ্যা বেশি বলে প্রচার করত। পক্ষান্তরে আমেরিকা ও যৌথ বাহিনীর ধ্বংস গোপন করার চেষ্টা করত। অথচ প্রকৃতপক্ষে শহীদদের লাশ দাবী থেকে অনেক কম এবং মার্কিন বাহিনীর লাশ অনেক বেশি পাওয়া যাচ্ছিল। অদ্যাবধি (মার্চ, ২০০২-এর শেষ পর্যন্ত) আফগান যুদ্ধে নিহত আমেরিকান সৈন্যের সংখ্যা চৌদ্দ পনের বলে প্রচার করা হয়। যখন জেহাদীদের মুখপত্র মাসিক আদ দাওয়ার দাবী মোতাবেক শুধু গার্দিজের লড়াইয়ে আশি থেকে একশ আমেরিকান সৈন্য নিহত এবং দুইশর বেশি আহত হয়েছে। (মাসিক আদ দাওয়া-এপ্রিল, ২০০২)।
ইরাক যুদ্ধে পশ্চিমা মিডিয়া একই নীতি গ্রহণ করে রেখেছিল। এর পূর্বে বিবিসি কারগিল ও কাশ্মীরের চলমান যুদ্ধেও আহত নিহতের সংখ্যা এ ধরনের কমবেশি করে প্রকাশ করেছিল। তবে একথা ঠিক, যুদ্ধের ময়দান থেকে হতাহতের সঠিক সংখ্যা সংগ্রহ করা খুবই কঠিন, কিন্তু এটা কেমন ইনসাফ যে, সংখ্যা শুধু এক পক্ষেরই পেশ করা হবে আর অপর পক্ষকে দেখেও না দেখার ভান করা হবে। বিবিসি অনেক সময় মুজাহিদীনদের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ও কৌশল ব্যর্থ করা এবং হিম্মত মনোবল নষ্ট করার জন্য কৃত্রিম ও কাল্পনিক বোমাবর্ষণের রিপোর্টও দিয়েছে। কান্দাহারের আশেপাশে এবং আস্পাইন বোল্ডাকে সংঘটিত লড়াইয়ে এরকম কৃত্রিম ও কাল্পনিক রিপোর্ট দেয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়। (জেহাদে কাশ্মীর, জানুয়ারী-২০০২)।
এ কথার সুস্পষ্ট সাক্ষ্য প্রদান করেছেন আফগানিস্তানে চিকিৎসা সেবাদানরত ইসলামিক মেডিকেল এসোসিয়েশনের এক চিকিৎসক।
বিবিসি আফগানিস্তানের বর্তমান নেতৃবর্গের মধ্যে হিযবে ইসলামীর আমীর গুলবুদ্দীন হেকমতিয়ারের বিরুদ্ধেও প্রোপাগান্ডা শুরু করে, যাতে তিনি কোনোভাবে আফগানিস্তানে তাঁর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে না পারেন। কারণ তিনি পাশ্চাত্যের সামনে মাথানত করেননি এবং মার্কিন সন্ত্রাস ও আফগানিস্তানের পুতুল সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। বিবিসি তাঁর বিরুদ্ধে অবিরাম প্রোপাগান্ডা শুরু করে দেয়, যাতে তিনি আফগানিস্তানে তাঁর কর্তব্যকর্ম আদায় না করতে পারেন। কেননা তাঁর ভূমিকা পাশ্চাত্যের স্বার্থ পরিপন্থী।
২০০২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারী ইরানে কর্মরত বিবিসির রিপোর্টার এ ভিত্তিহীন অভিযোগ উত্থাপন করে, কাবুলে বেপর্দা মেয়ে লোকদের ওপর তেজাব ছোড়া হয়েছে। অতঃপর এ বছরের ২রা মার্চ তার ওপর কাবুল ধ্বংসের অভিযোগও আরোপ করে তাকে একজন হিংস্র রক্তপিপাসু লীডার রূপে উপস্থাপন করে। অথচ তাকে দেশের প্রধানমন্ত্রী বানানো হয়েছিল, কিন্তু বিদেশী হস্তক্ষেপে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা দায়িত্ব স্থানান্তর করা হয়নি।