📘 পশ্চিমা মিডিয়ার স্বরূপ > 📄 বৃটিশ সংবাদ মাধ্যম

📄 বৃটিশ সংবাদ মাধ্যম


বৃটেনের রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনে ইহুদীদের কর্তৃত্ব ও আধিপত্য অনেক সুপ্রাচীন। এই সাম্রাজ্যবাদী দেশের প্রধানমন্ত্রী বেনজামিন ডিজরেইলী এবং বৃটিশ সেনাবাহিনীর চীফ অফ স্টাফ একই সময়ে একই সাথে ইহুদী ছিলেন। এতেই বৃটেনে ইহুদীদের কর্তৃত্ব এবং অসাধারণ প্রভাব-প্রতিপত্তির কথা সহজেই অনুমান করা যায়। আর সাংবাদিকতা ও সংবাদপত্রের জগতে রাজত্ব তো অনেক দূরের কথা। এ ময়দানে অন্যের অংশীদারিত্ব ছাড়াই দীর্ঘকাল থেকে তাদের একচেটিয়া আধিপত্য রয়েছে। তারা সমগ্র বিশ্বকে যেদিকে ইচ্ছা সেদিকে ঘোরাতে পারে। ধারাবাহিক তিন দশক ধরেই বিবিসি ওয়ার্ল্ডের প্রধান ইহুদী নিয়োগ হয়ে আসছে। স্টার টিভি যখন থেকে পৃথিবীর ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে, তখন থেকে ইহুদীদের প্রোপাগান্ডা আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। লন্ডন টাইমস সেসব আন্তর্জাতিক প্রসিদ্ধ সংবাদ পত্রের একটি, যার সম্পাদকীয়, মন্তব্য, কার্টুন ও সংবাদ যে কোনো বৃটিশ সরকার পরিবর্তনের জন্য যথেষ্ট। এই পত্রিকা ১৭৮০ সাল থেকে প্রকাশিত হয়ে আসছিল। যদিও পত্রিকাটি থমসন ইন্টারন্যাশনালের মালিকানায় প্রকাশিত হচ্ছিল, কিন্তু প্রসিদ্ধ ইহুদী পুঁজিপতি রোডশেন্ড প্রথম পর্যায়ে বিজ্ঞাপন ও পরবর্তী পর্যায়ে পছন্দমতো সম্পাদক ও ইহুদী সাংবাদিকদের মাধ্যমে পত্রিকাটিকে কবজা করে নেয়। থমসন ইন্টারন্যাশনালের মালিকানার যুগে ইহুদী কর্মচারীদের হার বিশ শতাংশ ছিল, কিন্তু আজ থেকে পঁচিশ বছর পূর্বে টাইমসকে কৃত্রিম অর্থনৈতিক সংকটে ফেলে এর বিরুদ্ধে খুব প্রোপাগান্ডা চালানো হয়। টাইমসে ইহুদী কর্মচারীদের বেতন ও সুযোগ-সুবিধা পঁচিশ শতাংশ বৃদ্ধি করার জোর দাবী করা হয়। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দাবীর মুখে থমসন এই বলে পত্রিকাটি বন্ধ করে দেয়ার ঘোষণা দেন যে, পত্রিকাটি এ অর্থনৈতিক বোঝা বহন করতে সক্ষম নয়। এ ঘোষণায় বৃটেনে হৈচৈ শুরু হয়ে যায়। এই সুযোগে অস্ট্রেলিয়ার প্রসিদ্ধ ইহুদী পুঁজিপতি রবার্ট মারদূখ 'মুক্তিদূত' হয়ে আবির্ভূত হন।

মি. রবার্ট লন্ডন টাইমস-এর বার্ষিক লোকসান নয় মিলিয়ন অস্ট্রেলিয়ান পাউন্ড পরিশোধ করে পুরো সংবাদপত্র ক্রয় করার সংকল্প ব্যক্ত করেন। এই ঘোষণার সাথে সাথে চতুর্দিক থেকে এ মুক্তিদূতের প্রশংসা শুরু হয়ে যায়। পরিশেষে এই ইহুদী পুঁজিপতি পঁয়তাল্লিশ মিলিয়ন ডলার দিয়ে এই প্রাচীন পত্রিকাটি ক্রয় করে নেন। সানডে টাইমস ক্রয় করার পর এবার মি. রবার্ট ফিন্ট স্ট্রীট সম্পূর্ণ কবজা করে নেন, যেখান থেকে লন্ডনের সব সংবাদপত্র ও ম্যাগাজিন প্রকাশিত হয়। লন্ডন টাইমস ও সানডে টাইমস ক্রয় করার পর রবার্টের বিজয়ের পরিধি ব্যাপক থেকে ব্যাপকতর হতে লাগল। এর পর তিনি লন্ডনের প্রসিদ্ধ সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন সান, নিউজ অফ দি ওয়ার্ল্ড, সিটি ম্যাগাজিন এবং উইক এন্ড-এর মতো জনপ্রিয় ম্যাগাজিনগুলোর ওপরও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। এসব ম্যাগাজিন অশ্লীলতার মুখপত্র হিসেবে সংখ্যায় চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ লাখ প্রকাশিত হয়। শুধু সান-এর প্রচার সংখ্যাই চল্লিশ লাখ। উপরোল্লিখিত সব সংবাদ মাধ্যম ছাড়াও বৃটেন থেকে প্রকাশিত নিম্নবর্ণিত সংবাদপত্র এবং ম্যাগাজিনেও ইহুদীদের মালিকানা নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। ডেইলী এক্সপ্রেস, নিউজ ব্র্যানিকল, ডেইলী মেইল, ডেইলী হেরাল্ড, মানচস্টার গার্ডিয়ান, ইয়র্ক শায়ার পোস্ট, ইভেনিং স্ট্যান্ডাড, ইভেনিং নিউজ অবজার্ভার, সানডে রিভিউ, সানডে এক্সপ্রেস, সানডে ক্র্যানিকল, জনপল, দি সানডে পিপলস, সানডে ড্যামপাচ, দি স্ক্যাচ, দি এ্যাম্বাস্যাডার, দি জিওগ্রাফিক ইত্যাদি। ১৯৮১ সালে প্রকাশিত পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, বৃটেনের পনেরটি দৈনিকের পরিপূর্ণ মালিকানা ইহুদীদের। এগুলোর দৈনিক প্রচার সংখ্যা তেত্রিশ মিলিয়ন, যেখানে প্রকৃত বৃটিশ নাগরিকের সংখ্যা পঞ্চাশ মিলিয়ন।

টিকাঃ
৫. রবার্ট মারদুখ অস্ট্রেলিয়ার ধনাঢ্য এক ইহুদী পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। রবার্টকে সে সময়কার আন্তর্জাতিক মিডিয়া রাজত্বে 'মহারাজা বা মিডিয়া মোগল' মনে করা হয়। 'আসল, দেখল ও বিজয় করে নিল'-প্রসিদ্ধ এই প্রবাদের প্রতীক ছিলেন তিনি। তিনি আন্তর্জাতিক মিডিয়ার একজন বিশেষজ্ঞ ও নিউজ করপোরেশনের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। ১৯৯৯ সালে তার সমুদয় সম্পদের পরিমাণ দাঁড়ায় ৮২ মিলিয়ন ডলার। বিগত এক বছরের আমদানী ছিল সাড়ে ৬৮ মিলিয়ন ডলার। তার অধীনে পঁয়ত্রিশ হাজার মানুষ কর্মরত রয়েছে। রবার্ট ইউরোপ, আমেরিকা, এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়া-এ চারটি মহাদেশে ১ শ' ২৫টি দৈনিকের মালিক। প্রতি সপ্তাহে যার চারশ' কোটি কপি প্রকাশিত হয়। শুধু লন্ডন টাইমস, সানডে টাইমস ও সানবার্ট-এর পাঠক সংখ্যাই এক কোটি। ১৯৮৯ সালে রবার্ট ফোকাস নেটওয়ার্ক নামক সংস্থাটি কিনে নেন। এ ছাড়াও তিনি স্কাই টেলিভিশন কোম্পানী ও স্টার টিভির সিংহভাগ শেয়ারের মালিক। স্কাইয়ের মূল্য পাঁচশ' মিলিয়ন এবং স্টার টিভির অংশের মূল্য আনুমানিক পাঁচ মিলিয়ন ডলার। অস্ট্রেলিয়া, বৃটেন ও আমেরিকার দৈনিক সংবাদের আশি শতাংশ এবং রোববারে প্রকাশিত ম্যাগাজিন ও বিশেষ ক্রোড়পত্রের ষাট শতাংশের মালিক মি. রবার্ট।

📘 পশ্চিমা মিডিয়ার স্বরূপ > 📄 মার্কিন মিডিয়া

📄 মার্কিন মিডিয়া


মার্কিন জনমত গঠনে মার্কিন মিডিয়ার গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক ভূমিকার ব্যাপারে কারো দ্বিমত নেই। যে কোনো বিষয়ে অতিদ্রুত জনমত সৃষ্টি হয়ে যায়। এর মৌলিক কারণ হলো, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যে কোনো ব্যক্তির সংবাদপত্র, ম্যাগাজিন, রেডিও স্টেশন ও টিভি চ্যানেল প্রতিষ্ঠা করার পূর্ণ স্বাধীনতা এবং সব ধরনের সুযোগ সুবিধা রয়েছে। মার্কিন আইন অনুযায়ী যে কোনো ব্যক্তি সংবাদপত্র বের করতে এবং জনসাধারণ পর্যন্ত যে কোনোভাবে নিজের বক্তব্য পৌঁছাতে পারে। এই স্বাধীনতার কারণে মিডিয়ার ওপর মার্কিন সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। আলোচ্য কথাগুলো সামনে রেখে যদি মার্কিন মিডিয়া সম্পর্কে বিশ্লেষণ করা হয়, তাহলে নিম্নবর্ণিত বৈশিষ্ট্যসমূহ ফুটে ওঠে।

০১. মার্কিন মিডিয়ার ওপর হয় কোনো প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানের অথবা কোনো শিল্প পরিবারের অথবা কোনো কোম্পানীর কিংবা কোনো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ইজারাদারী প্রতিষ্ঠিত আছে, যার ওপর সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।

০২. মার্কিন মিডিয়ার মৌলিক লক্ষ্য-উদ্দেশ্য হলো, আন্তর্জাতিক কোনো ইস্যু নিয়ে মার্কিন রাজনীতির প্রতিনিধিত্ব করা, যে কোন মূল্যে আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, জাতীয় নিরাপত্তা ও স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়া, খৃস্টবাদ ও ইহুদীবাদের শিক্ষার প্রচার প্রসার ঘটানো, ব্যবসায়-বাণিজ্য ও পুঁজিবাদী অর্থনীতির ওকালতি এবং সহায়তা করা, ক্ষমতার মসনদে রিপাবলিকান পার্টি আসীন হোক আর ডেমোক্রেটিক পার্টিই আসীন হোক, এ অবস্থার কোনো পরিবর্তন ঘটে না।

০৩. মার্কিন মিডিয়ায় সবচে' বেশি প্রাধান্য দেয়া হয় বিজ্ঞাপনকে, যার মাধ্যমে কোটি কোটি ডলার আমদানী হয় এবং অভাবনীয় মুনাফা অর্জিত হয়।

০৪. কিছু কিছু সংবাদপত্র, ম্যাগাজিন ও টিভি স্টেশনের বিশেষ কিছু ইস্যুতে নিজস্ব মতামত থাকে। সেই মতামত মিডিয়ার মাধ্যমে সম্পাদকীয়, মন্তব্য ও বিশ্লেষণ দ্বারা যে কোনো মূল্যে প্রতিষ্ঠিত করা। সে মতামতের ব্যাপারে সরকার, জনগণ ও বেশির ভাগ পাঠকের দ্বিমতই থাকুক না কেন। প্রকাশ থাকে যে, সম্পাদনা পরিষদ ও মালিক পক্ষের মতামত অনুযায়ীই তারা সংবাদ প্রকাশ করে থাকে।

আমরা মার্কিন মিডিয়াকে ছয় ভাগে বিভক্ত করতে পারি।

০১. দৈনিক পত্র-পত্রিকা ও সংবাদ সংস্থা ০২. ম্যাগাজিন, মাসিক, ত্রৈমাসিক ও ষান্মাষিক পত্রিকা ০৩. টেলিভিশন ০৪. রেডিও ০৫. ডাক বিভাগের মাধ্যমে বিতরণকৃত লিটারেচার ০৬. কোম্পানীসমূহের বুলেটিন ও প্রকাশনা

নিম্নে আমরা মার্কিন মিডিয়ার উল্লিখিত ছয় প্রকারের প্রতিটি সম্পর্কে সংক্ষিপ্তাকারে প্রয়োজনীয় কিছু আলোচনা পেশ করব।

📘 পশ্চিমা মিডিয়ার স্বরূপ > 📄 মার্কিন দৈনিক পত্র-পত্রিকা

📄 মার্কিন দৈনিক পত্র-পত্রিকা


মার্কিন দৈনিক পত্র-পত্রিকা দুই ধরনের।

এক. ওই সব দৈনিক, যেগুলো সেসব শহর ও স্টেটের সমস্যা সংকটের প্রতিনিধিত্ব করে, যেসব শহর ও স্টেট থেকে তা প্রকাশিত হয়।

দুই. ওই সব দৈনিক, যেগুলো জাতীয় সমস্যার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সমস্যা সংকট সম্পর্কেও সংবাদ, নিবন্ধ এবং সম্পাদকীয় লেখে।

সর্বসাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১ হাজার ৬ শ' ৭৬টি দৈনিক পত্রিকা প্রকাশিত হয়। বিশেষ ম্যাগাজিনের কারণে রবিবার দিন বিভিন্ন পত্রিকা ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বেশি বিলি হয়।

আমেরিকার অডিট ব্যুরো অফ সার্কুলেশনের সাম্প্রতিক রিপোর্ট মতে, গোটা আমেরিকায় পঞ্চাশটি সাপ্তাহিক পত্রিকা এমন রয়েছে, যেগুলো বিপুল পরিমাণে বিলি হয়।

যেসব মার্কিন শহর থেকে এসব দৈনিক প্রকাশিত হয়, সেসব শহরের নাম- ডেট্রয়েট, সানফ্রান্সিসকো, মায়ামি, বাল্টিমোর, ফিলাডেলফিয়া, হোস্টন, কিউল্যান্ড, কানসাস সিটি, ডিনফর, মিলওয়াকি, লং আইল্যান্ড, ভিনেকসি নিউ আয়ারল্যান্ড ছাড়াও নিউইয়র্ক, ওয়াশিংটন, লস এঞ্জেলেস, শিকাগো এবং বোস্টন সেসব কেন্দ্রীয় শহর, যেখানে বিপুলসংখ্যক ইহুদী বসবাস করে। এসব শহরেই খৃস্টানদের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, তাবলিগী সংস্থা ও ইহুদীদের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বিদ্যমান রয়েছে। নিউইয়র্ক ও ওয়াশিংটনে রয়েছে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান। এ শহরগুলোতেই সরকারী ভি.আই.পি লোকেরা বসবাস করেন, যার কারণে পত্রিকার সাংবাদিক ও প্রতিনিধিদের পক্ষে সরকারী অফিসার, মার্কিন সিনেটের সদস্য, পররাষ্ট্র, স্বরাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বশীলদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করা খুবই সহজ হয়। খুব সহজেই এখানে বসে আমেরিকার আন্তর্জাতিক রাজনীতির গোপন-প্রকাশ্য সব কিছু জনসম্মুখে তুলে ধরা যায়।

বোস্টন শহর থেকে প্রকাশিত মার্কিন দৈনিক 'ক্রিশ্চিয়ান সায়েন্স মনিটর' এমন এক সংবাদপত্র, যা মার্কিন গির্জার তত্ত্বাবধানে প্রকাশিত হয়। এ দৈনিকটি আরব বিশ্বের বিভিন্ন সমস্যা খুব সুন্দরভাবে উপস্থাপন করে এবং আরব বিশ্ব সম্পর্কে ভারসাম্যপূর্ণ অভিমত পোষণ করে। বেশির ভাগ সময় পত্রিকাটি ইসরাঈলী পলিসির সমলোচনা ও নিন্দা করে।

‘হেরাল্ড ট্রিউবন’ তৃতীয় দৈনিক সংবাদপত্র, যা আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সমস্যা সংকট সম্পর্কে অত্যন্ত সুচিন্তিত অভিমত পোষণ করে। পত্রিকাটি মধ্যপন্থা ও ভারসাম্য রক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি বিষয়ের বিশেষজ্ঞগণ এতে অত্যন্ত নিরপেক্ষতার সাথে তাদের মতামত প্রকাশ করতে পারেন। এ বৈশিষ্ট্যের পাশাপাশি পত্রিকাটি মার্কিন প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বশীল, রাষ্ট্রদূত ও বড় বড় শিল্পপতিদের সাথে সরাসরি যোগাযোগ রাখে। এ কারণে হেরাল্ড ট্রিউবনের সংবাদ, সম্পাদকীয়, উপসম্পাদকীয়, মন্তব্য, প্রবন্ধ-নিবন্ধকে অত্যন্ত সম্মান ও গুরুত্বের দৃষ্টিতে দেখা হয়। বিভিন্ন সংবাদ সংস্থার আলোচনা আমরা শুরুতেই করেছি।

📘 পশ্চিমা মিডিয়ার স্বরূপ > 📄 মার্কিন সাপ্তাহিক, মাসিক ও ত্রৈমাসিক পত্র-পত্রিকা

📄 মার্কিন সাপ্তাহিক, মাসিক ও ত্রৈমাসিক পত্র-পত্রিকা


মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রকাশিত ম্যাগাজিন, সাপ্তাহিক, মাসিক, ত্রৈমাসিক ও ষান্মাষিক পত্র-পত্রিকাগুলোকে আমরা চার ভাগে বিভক্ত করতে পারি।

০১. সাধারণ রাজনৈতিক পত্র-পত্রিকা ও বিশ্লেষণমূলক ম্যাগাজিন।

০২. বিশেষ বিষয়ে জ্ঞান-গবেষণামূলক মাসিক, ত্রৈমাসিক ও ষান্মাষিক ম্যাগাজিন।

০৩. সামাজিক ও নারী বিষয়ক ম্যাগাজিন, আর্ট, লিটারেচার, ফিল্ম, যৌন বিষয়ক ম্যাগাজিন।

০৪. কৃষি, বিজ্ঞান, বাণিজ্য, অর্থনীতি, খেলাধুলা ও বিনোদনমূলক পত্র-পত্রিকা।
দৈনিক পত্রিকার তুলনায় সাপ্তাহিক ও মাসিক পত্র-পত্রিকাগুলোর ধরন-আকৃতি, গবেষণা-আলোচনা, ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, প্রবন্ধ-নিবন্ধ এবং সাক্ষাতকার ও রিপোর্ট ইত্যাদি দিক দিয়ে ব্যতিক্রমী হয়ে থাকে। এখানে আমরা সাধারণ পত্র-পত্রিকা ও ম্যাগাজিনগুলোর আলোচনা করব না, যা কমবেশি সবখানেই পাওয়া যায়। এখানে শুধু সেসব পত্র-পত্রিকা ও ম্যাগাজিনেরই আলোচনা করব, যা তুলনামূলক ব্যতিক্রমী এবং যা শুধু মার্কিন জনমতই নয়; বরং আন্তর্জাতিক জনমতের ওপরেও প্রভাব সৃষ্টি করার ক্ষমতা রাখে, সেগুলো হল-

ক. এখানে সেসব পত্র-পত্রিকা ও ম্যাগাজিনের তালিকা পেশ করা হবে, যেগুলো জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অত্যন্ত গুরুত্ব ও তাৎপর্যের অধিকারী এবং বিপুল সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। সেসব পত্রিকা হল-:

০১. ওয়ার্ল্ড প্রেস রিভিউ (মাসিক) : এ পত্রিকাটি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচিত অংশ প্রকাশ করে।

০২. ওয়ার্ল্ড ভিউ (মাসিক): এ পত্রিকাটি প্রতিমাসে বিশেষজ্ঞদের দিয়ে তিন থেকে পাঁচটি জ্ঞান-গবেষণামূলক নিবন্ধ লেখায় এবং গোটা দুনিয়া হতে প্রকাশিত গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থসমূহের তালিকা প্রকাশ করে।

০৩. নিউ রিপাবলিক (সাপ্তাহিক) : এ পত্রিকাটি মার্কিন সমাজের বিভিন্ন সমস্যা সংকট নিয়ে লেখে এবং ইহুদীদের দৃষ্টিভঙ্গির ওকালতি করে।

০৪. এক্সিকিউটিভ ইন্টেলিজেন্স ভিউ (সাপ্তাহিক) : এ পত্রিকাটি বামপন্থীদের মুখপাত্র এবং ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর এক নম্বর শত্রু।

০৫. স্ট্র্যাটেজি উইক (সাপ্তাহিক): মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন সমস্যা-সংকট বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের প্রবন্ধ-নিবন্ধ প্রকাশ করে।

০৬. আমেরিকান জায়নিস্ট (দ্বিমাসিক): এ পত্রিকাটি মার্কিন জায়নবাদী সংগঠনের মুখপত্র।

০৭. দ্বি প্যালেন ট্রুথ (মাসিক) : এটি মার্কিন গির্জা সংগঠনের মুখপত্র। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সমস্যা-সংকট, বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বের জনগণের বিভিন্ন সমস্যা সংকট নিয়ে প্রবন্ধ-নিবন্ধ প্রকাশ করে। প্রতিমাসে এ পত্রিকাটির পঞ্চাশ লাখ কপি ফ্রি বিতরণ করা হয়।

০৮. ওয়াশিংটন রিপোর্ট (মাসিক): এ পত্রিকাটি ১৯৮২ সাল থেকে প্রকাশিত হয়ে আসছে। সাধারণভাবে এটি মধ্যপ্রাচ্য ও আমেরিকার পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারসাম্যপূর্ণ মতামত ও গুরুত্বপূর্ণ দলীল-দস্তাবেজ প্রকাশ করে। আরব বিশ্বের বিভিন্ন সমস্যা সংকট নিয়েও পত্রিকাটি সহযোগিতা সহমর্মিতা পোষণ করে। এটি মার্কিন ওয়াকফের পক্ষ হতে প্রকাশিত হয়।

০৯. ওয়ার্ল্ড মনিটর (মাসিক) : এ দৈনিক ক্রিশ্চিয়ান সায়েন্স মনিটর পাবলিকেশন্সের পক্ষ থেকে প্রকাশিত হয়।

১০. মিডলইস্ট ইনসাইট (দ্বিমাসিক) : এ পত্রিকাটি মধ্যপ্রাচ্য, ইসলামী সংগঠন-সংস্থা, ইসলামী দল ও তাদের কর্মতৎপরতা সম্পর্কে মার্কিন দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী প্রবন্ধ-নিবন্ধ প্রকাশ করে। কখনো কখনো এতে আরবদের দৃষ্টিভঙ্গিও স্থান পায়, কিন্তু ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহ সম্পর্কে এ পত্রিকার মতামত ও মন্তব্যকে আমরা নিরপেক্ষ বলতে পারি না।

উল্লিখিত পত্র-পত্রিকা ও ম্যাগাজিন-সাময়িকী ছাড়াও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরো হাজার হাজার পত্র-পত্রিকা বের হয়।

খ. এখানে সেসব গবেষণামূলক পত্র-পত্রিকা ও ম্যাগাজিনের তালিকা পেশ করা হবে, যেগুলো সংখ্যায় মাত্র কয়েকশ' থেকে বেশি প্রকাশিত হয় না, কিন্তু সেগুলো কোন গবেষণামূলক প্রতিষ্ঠান, মন্ত্রণালয়, বুদ্ধিজীবী ফোরাম এবং অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে প্রকাশিত হয়। সেসব সংস্থা সংগঠনের মধ্যে রয়েছে মিডলইস্ট ইনস্টিটিউট, ব্রোকিংস ইনস্টিটিউট, ডেল কার্নেগী ইনস্টিটিউট, হাওয়ার্ড ইনস্টিটিউট, ইউ.এস.পি ফাউন্ডেশন, স্টেনিভ ফোর্ড, জন হকিংস, জর্জ টাউন কলম্বো ইত্যাদি। এ ছাড়া কংগ্রেস, মার্কিন খৃস্টান ও ইহুদী সংগঠন এবং বাণিজ্যিক কেন্দ্রের পক্ষ থেকে এসব পত্র-পত্রিকা ও ম্যাগাজিন প্রকাশিত হয়। তন্মধ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ম্যাগাজিনের নাম নিম্নে প্রদত্ত হলো:

০১. ফরেন ব্রডকাস্টিং ইনফরমেশন সার্ভিস (ত্রৈমাসিক) : এটি দৈনন্দিন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সংঘটিত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলী প্রকাশ করে।

০২. ফরেন পলিসি (ত্রৈমাসিক): ডেল কার্নেগী ইনস্টিটিউটের পক্ষ থেকে এটি প্রকাশিত হয়। এতে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয় ও সমস্যা-সংকট নিয়ে বিশেষজ্ঞদের প্রবন্ধ নিবন্ধ প্রকাশ করা হয়।

০৩. ফরেন এ্যাফেয়ার্স (বছরে পাঁচ বার প্রকাশিত হয়): মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে যোগাযোগ কমিটির পক্ষ থেকে এটি প্রকাশিত হয়। শীর্ষ রাষ্ট্রদূত ও সাবেক রাষ্ট্রদূতরা এতে কলাম লেখেন।

০৪. ডিফেন্স এন্ড ফরেন এ্যাফেয়ার্স (মাসিক): আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা কৌশল বিষয়ক এ পত্রিকাটি কোয়েলী কোম্পানীর পক্ষ থেকে প্রকাশিত হয়।

০৫. মিডলইস্ট জার্নাল (ত্রৈমাসিক): ওয়াশিংটনের মিডলইস্ট ইনস্টিটিউট-এর পক্ষ থেকে এটি প্রকাশিত হয়। ইরানী বিপ্লবের পর ইসলামী আন্দোলন, দীনী সংগঠন, মিসর, পাকিস্তান, ইরান, আফগানিস্তান, সিরিয়া ও তুরস্কে দীনের প্রভাব-প্রতিক্রিয়া ও ফলাফলের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ নিয়ে পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়।

০৬. জার্নাল অফ সাউথ এশিয়া এন্ড মিডলইস্ট স্টাডিজ (ত্রৈমাসিক): মার্কিন- পাকিস্তান যোগাযোগ কমিটির পক্ষ থেকে এটি প্রকাশিত হয়।

০৭. জার্নাল অফ রিলিজন্স (মাসিক): শিকাগো ইউনিভার্সিটির পক্ষ থেকে নিরেট ধর্মীয় বিষয়ে এটি প্রকাশিত হয়। এতে অন্যান্য ধর্মের সাথে খৃস্টবাদের সম্পর্ক ও দৃষ্টিভঙ্গি আলোচিত হয়।

০৮. ক্রিশ্চিয়ান সায়েন্স জার্নাল (মাসিক): আমেরিকার সবচে' বড় খৃস্টান প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে একমাত্র খৃস্টবাদ প্রচার-প্রসারের জন্য এটি প্রকাশিত হয়।

০৯. কমেন্টারী: আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সমস্যা সংকট সম্পর্কে আন্তর্জাতিক নেতৃবর্গ, সম্পাদক ও ভাষ্যকারদের কলাম নিয়ে এটি ইহুদীদের আন্তর্জাতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে প্রকাশিত হয়।

১০. মুসলিম ওয়ার্ল্ড: ১৯১১ সাল থেকে এটি হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির পক্ষ থেকে প্রকাশিত হয়ে আসছে। এতে ইসলামী আন্দোলন, সংগঠন, ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহ এবং অতীত ও বর্তমানে খৃস্টবাদের ভূমিকা ইত্যাদি বিষয়ে প্রবন্ধ-নিবন্ধ প্রকাশিত হয়।

এ ছাড়াও ইহুদী এবং খৃস্ট সংগঠনের পক্ষ থেকে শত শত ম্যাগাজিন ও পত্র- পত্রিকা প্রকাশিত হয়।

গ. টেলিভিশন: জনমত গঠনে টেলিভিশনের ভূমিকা ও গুরুত্ব সর্বশীর্ষে। গোটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে টেলিভিশনের পাঁচটি বড় বড় কোম্পানী রয়েছে। যারা শত শত টিভি স্টেশন স্থাপন করে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে তাদের অনুষ্ঠানমালা শুধু আমেরিকাতেই নয়; বরং সমগ্র বিশ্বে প্রচার করে। এসব টিভি কোম্পানীর মালিকও ইহুদী পুঁজিপতিরা।

পাঁচটি বড় বড় টেলিভিশন কোম্পানী হচ্ছে-:
০১. আমেরিকান ব্রডকাস্টিং কোম্পানী (এ.বি.সি), মালিক-লেওনার্ড জনসন
০২. ন্যাশনাল ব্রডকাস্টিং কোম্পানী (এনবিসি), মালিক-আলফার্ড স্যালোরম্যান
০৩. ক্যাবল নিউজ নেটওয়ার্ক (সি.এন.এন), মালিক-নিউ হাউজ ফ্যামিলী
০৪. কলম্বো ব্রডকাস্টিং কোম্পানী (সি.বি.সি), মালিক-উইলিয়াম বেইলী
০৫. পাবলিক ব্রডকাস্টিং সার্ভিস (পি.বি.এস) মালিক-এক প্রভাবশালী ইহুদী
শেষোক্ত কোম্পানীটি শিক্ষা ও সভ্যতা-সংস্কৃতির বিকাশের উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। মার্কিন শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলো এটির পৃষ্ঠপোষকতা করে। এসব টেলিভিশন কোম্পানী দিনরাত তাদের অনুষ্ঠান সম্প্রচারের মাধ্যমে যেভাবে জনমতের ওপর প্রভাব সৃষ্টি করে, তার অনুমান এভাবে করা যায়, এ.বি.এস. কোম্পানী দৈনিক ত্রিশ ঘন্টা, সি.বি.এস. কোম্পানী দৈনিক পঁচিশ ঘন্টা, এন.বি.সি. কোম্পানী দৈনিক বিশ ঘন্টা এবং সি.এন.এন. দৈনিক চব্বিশ ঘন্টা অনুষ্ঠান সম্প্রচার করে।

ঘ. রেডিও স্টেশন : টিভি কোম্পানীগুলো যেভাবে নিরবচ্ছিন্নভাবে তাদের অনুষ্ঠানমালা সম্প্রচার করে এবং জনগণের ওপর প্রভাব সৃষ্টি করে, ঠিক সেভাবে না হলেও রেডিও স্টেশনগুলো এসব টিভি কোম্পানীর তত্ত্বাবধানে হাজার হাজার চ্যানেলের মাধ্যমে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তাদের শক্তিশালী হৃদয়গ্রাহী অনুষ্ঠানমালা সম্প্রচার করে।

ঙ. ডাক বিভাগ: মিডিয়ার অন্যান্য বিভাগের মতো ডাক বিভাগও অত্যন্ত সক্রিয়। এর মাধ্যমে ধারাবাহিক প্রচার-প্রোপাগান্ডা চালানো হয়। এ ময়দানে ইহুদী লবি অত্যন্ত সক্রিয় ও কর্মতৎপর। কোনো বিশেষ বিষয় কিংবা বিশেষ শিল্পের বিকাশ ঘটানো, নির্বাচনের সময় জনমত গঠন এবং কোনো বিশেষ ব্যক্তির কাছ থেকে কোনো বিশেষ বিষয় ও দৃষ্টিভঙ্গির সমর্থন আদায়ের জন্য ডাক বিভাগের মাধ্যমে কার্ড ও ফরম ফোল্ডার পাঠানো হয়। এভাবে সরাসরি জীবনের বিভিন্ন ময়দানের সাথে সম্পৃক্তদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে উদ্দেশ্য অর্জনে ডাক বিভাগকে ব্যবহার করা হয়।

ইরানী বিপ্লবের পর থেকে পশ্চিমা মিডিয়া ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহ সম্পর্কে বিশ্ববাসীকে ধারাবাহিক এই ধারণা দিয়ে যাচ্ছে, ইসলাম কট্টর পন্থার প্রসার করে। তারা পশ্চিমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ বিপ্লবের জন্য কঠোরতা এবং শক্তির আশ্রয় নেয়।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00