📄 নতুন বিশ্বব্যবস্থা : রূপরেখা ও কর্মপদ্ধতি
(পশ্চিমা রাজনীতিক, চিন্তাবিদ ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন দস্তাবেজের উদ্ধৃতিক্রমে)
নতুন বিশ্বব্যবস্থার রূপরেখা ও মানচিত্র এমনি এমনিই অস্তিত্ব লাভ করেনি, আর না কোন চিন্তা-ফিকির ছাড়াই এ পরিকল্পনা ও রূপরেখা উপস্থাপন করা হয়েছে; বরং এই বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পূর্বেই এর জন্য বিরাট পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে। জায়নিষ্ট প্রটোকলে তার রূপরেখা ও রোডম্যাপ তৈরি করা হয়েছে। অতঃপর তা বাস্তবায়নের জন্য উপকরণ, মাধ্যম ও কর্মপদ্ধতি নির্ধারণ করা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত বস্তুগত সম্পদে ভরপুর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে এর পরীক্ষা-নিরীক্ষাস্থল নির্ধারণ করা হয়েছে। সেখানে বসে বিভিন্ন ইহুদী গ্রুপ ঐক্যবদ্ধভাবে এই রূপরেখায় আরো রং প্রলেপ শুরু করে। পরবর্তীতে এর মৌলিক উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন ও চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জনের জন্য যুগের চাহিদা, পরিবর্তিত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা এবং সময়ের বাস্তবতার আলোকে এর উপকরণ, মাধ্যম ও কর্মপদ্ধতির মধ্যে আংশিক পরিবর্তন সাধন করা হয়। নিম্নলিখিত বক্তৃতা-বিবৃতির আলোকে সহজেই অনুমিত হয়, নতুন বিশ্বব্যবস্থার রূপরেখা ও মানচিত্র কেমন হবে? এবং এ বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কি ভূমিকা রয়েছে?
📄 নতুন বিশ্বব্যবস্থার রাজনৈতিক অবকাঠামো
আমরা মানবেতিহাসের এমন এক স্পর্শকাতর ও চূড়ান্ত স্তরে এসে উপনীত হয়েছি, যে স্তরের মূল কথা হলো, এমন একটি নতুন বিশ্বব্যবস্থা গঠন ও বিনির্মাণ করা হবে, যার মধ্যে সকল দেশের কৃত্রিম সীমানা নির্মূল করে দেয়া হবে। সেসব দেশের স্বাতন্ত্র্য, বৈশিষ্ট্য, সভ্যতা-সংস্কৃতি এবং রাজনৈতিক পরিচয় মুছে ফেলা হবে। (মানবাধিকারের দস্তাবেজ থেকে)
০১. ১৯৮৭ সালের ১২ই মে সিনিয়র জর্জ বুশ তার এক ভাষণে বলেন, নিকট ভবিষ্যতে এমন একটি নতুন বিশ্বব্যবস্থা অস্তিত্ব লাভ করবে, যে ব্যবস্থায় সকল জাতি-গোষ্ঠী একে অপরের সাথে একীভূত হয়ে যাবে। অতঃপর উপসাগরীয় যুদ্ধ পরিসমাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে নিয়মতান্ত্রিকভাবে এ নতুন বিশ্বব্যবস্থার অবকাঠামোর ঘোষণা দেয়া হয়।
০২. ১৯৯১ সালে প্রকাশিত এবং রোম ক্লাবের তত্ত্বাবধানে মুদ্রিত প্রথম বিশ্বযুদ্ধ নামক গ্রন্থে উল্লেখ আছে, গোটা বিশ্বের ব্যবস্থাপনা জাতিসংঘের হাতে তুলে দেয়া একান্ত জরুরী।
০৩. ট্রাজেডি ও আকাঙ্খা' নামক গ্রন্থের লেখক রোটিগেল বলেন, অতি সত্বর ব্যক্তিস্বাধীনতা সীমিত হয়ে যাবে। কারণ একক ব্যক্তির কোনো গুরুত্ব নেই।
📄 নতুন বিশ্বব্যবস্থার গোড়াপত্তনে জাতিসংঘের ভূমিকা
০১. জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব ড. বুট্রোস ঘালি ১৯৯৭ সালে তার রচিত 'আন্তর্জাতিক সরকার' নামক গ্রন্থে লেখেন, জাতিসংঘ এক হিসেবে নতুন বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রথম ইট।
০২. রকফেলার ফাউন্ডেশনের তত্ত্বাবধানে ১৯৫৯ সালে প্রকাশিত 'মার্কিন পররাষ্ট্র রাজনীতি' গ্রন্থে উল্লেখ আছে, নিকট ভবিষ্যতে যে নতুন বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে, তার প্রধান স্তম্ভ জাতিসংঘ।
০৩. ১৯৬২ সালের মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের রিপোর্ট ও প্রস্তাবে উল্লেখ আছে, যে সব দেশকে জাতিসংঘ তার শক্তি সামর্থ দিয়ে পদানত করতে সক্ষম, সেসব দেশের শাসন ক্ষমতা পরিচালনার জন্য জাতিসংঘের অধীনে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান স্থাপন এবং জাতিসংঘের অধীনে একটি আন্তর্জাতিক সামরিক বাহিনীও গঠন করা হবে। যাতে এসব অধীনস্থ প্রতিষ্ঠানের সামরিক শক্তিও অর্জিত থাকে এবং সে তার মর্জি অন্য দেশের ওপর চাপিয়ে দিতে পারে। এ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে জাতিসংঘের সংবিধানে সামান্য পরিবর্তন আনতে হবে। এভাবে একটি আন্তর্জাতিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে। এ আন্তর্জাতিক সরকার দ্বারা আমাদের উদ্দেশ্য নতুন বিশ্বব্যবস্থা, যা আমরা গঠন করতে চাই।
০৪. ১৯৯১ সালের জানুয়ারী তারিখে প্রদত্ত ভাষণে সিনিয়ন জর্জ বুশ বলেন, আমাদের সামনে বর্তমানে একটি নতুন বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সুবর্ণ সুযোগ এসেছে-আমাদের জন্য এবং আগামী প্রজন্মের জন্যও। বাস্তবিকই আমাদের একটি নতুন বিশ্বব্যবস্থা বাস্তবে রূপদানের সুবর্ণ সুযোগ অর্জিত হয়েছে। এই ব্যবস্থায় জাতিসংঘ ব্যাপক শক্তির অধিকারী হবে এবং জাতিসংঘ বিশ্বের নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় তার মৌলিক ভূমিকা পালন করতে পারবে।
০৫. 'পাশ্চাত্যের অস্থিরতা' নামক গ্রন্থে লেখক জেমস ওয়ারবার্গ লেখেন, আমরা এমন এক নাযুকতম সময় অতিবাহিত করছি, যে সময়ে আমরা একটি পূর্ণ ক্ষমতাসম্পন্ন রাষ্ট্র থেকে একটি আন্তর্জাতিক সরকারের ক্ষমতার দিকে স্থানান্তরিত হচ্ছি।
০৬. সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট-এর নাতনী এডথ রুজভেল্ট ১৯৯৬ সালের ২৩ ডিসেম্বর প্রদত্ত তার ভাষণে বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট, হেরি ট্রুমেন, জেনারেল আইজেন হাওয়ার এবং জন. এফ কেনেডির যুগ থেকে নিয়ে সকল মার্কিন সরকারের বিশ্বাস ছিল, সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার সাথে লড়াই করার সবচে' উত্তম পন্থা হলো এমন একটি আন্ত র্জাতিক সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা, যার নেতৃত্ব দেবে স্বয়ং সমাজতন্ত্রের নেতৃবর্গ। এর ফল দাঁড়িয়েছে, আন্তর্জাতিক সরকার ব্যবস্থা ধীরে ধীরে বিকশিত ও সম্প্রসারিত হতে থাকে এবং পর্যায়ক্রমে মার্কিন কর্তত্ব জাতিসংঘের কাছে ন্যস্ত করে দেয়া হয়।
০৭. ১৯৬২ সালের ২০ মার্চ প্রকাশিত মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের পর্যবেক্ষণ রিপোর্টে উল্লেখ আছে, বিশ্বের রাষ্ট্রগুলোর যে ক্ষমতা আছে, তা আন্তর্জাতিক সরকারের নিকট ন্যস্ত করে দেয়া উচিত।
০৮. ১৯৪৭ সালের এপ্রিলে ফরেন এ্যাফেয়ার্স পত্রিকায় প্রকাশিত এক নিবন্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট কেনেডি এবং জনসন-এর সহকারী রিচার্ড গার্ডনার লেখেন, আন্তর্জাতিক সরকার প্রতিষ্ঠার সবচে' উত্তম পদ্ধতি হচ্ছে, আমরা উঁচু পর্যায় থেকে কাজ শুরু করার পরিবর্তে একেবারে নীচ থেকে এ সরকার বিনির্মাণের কাজ শুরু করব। তা এভাবে যে, পর্যায়ক্রমে সকল রাষ্ট্রের কাছ থেকে ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে আন্তর্জাতিক সরকারের নিকট সোপর্দ করে দেব। আধিপত্য অর্জন করার জন্য এটি যুদ্ধ-লড়াই থেকেও বেশি প্রভাব-প্রতিক্রিয়া সৃষ্টিকারী এবং দ্রুত ফলপ্রসূ।
০৯. ১৯৯০ সালের জানুয়ারী মাসে মিখাইল গর্বাচেভ তার এক ভাষণে বলেন, বর্তমান যুগের পরিবেশ দূষণ একটি মহা সমস্যা। এ সমস্যা সমাধানের জন্য আমাদের আন্তর্জাতিক সরকার প্রতিষ্ঠা করা অপরিহার্য। এ সরকার প্রতিষ্ঠায় প্রয়োজনে আমাদের কিছু কঠিন ও ধ্বংসাত্মক সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে, কিন্তু তা তো করতেই হবে।
১০. ১৯৯১ সালের ১৪ই আগস্ট নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত হয়েছে, বিশ্বের রাষ্ট্রসমূহের দায়িত্বহীন ক্ষমতা প্রয়োগ ও আচরণের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা প্রয়োজন। আর এটা আন্তর্জাতিক সরকার প্রতিষ্ঠা করা ছাড়া সম্ভব নয়। যেমনিভাবে আন্তর্জাতিক আদালত বিভিন্ন সরকারের হিসাব নিকাশ নেয়, তেমনিভাবে আমরাও সকল দেশকে একই গতিতে নিয়ে আসতে চাই।
১১. ১৯৯৩ সালের ৩১ জানুয়ারী জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে প্রদত্ত ভাষণে সাবেক মহাসচিব ড. বুট্রোস ঘালি বলেন, দেশের ক্ষমতা, দেশপ্রেম এবং আধিপত্য প্রতিষ্ঠার মর্মার্থে পরিবর্তন চলে আসছে। সংকীর্ণ ও সীমিত রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা পারস্পরিক শান্তিপূর্ণ স্থায়ী জীবনের পথে বাধা হতে পারে। এজন্য সকল দেশকে একে অপরের ওপর ভরসা করতে হবে এবং নিজ নিজ সীমান্ত চিহ্ন মুছে ফেলতে হবে।
১২. ১৯৯৩ সালের ১২ এপ্রিল জর্জ বুশের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বিশটি দেশের নেতৃবর্গের এক বৈঠক থেকে জারিকৃত যৌথ ঘোষণায় বলা হয়, জাতিসংঘের সংবিধানে পরিবর্তন আনতে হবে। সেই পরিবর্তন হলো, জাতিসংঘ সদস্য দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ বিষয়েও হস্তক্ষেপ করবে। কারণ বিভিন্ন দেশ প্রকাশ্যে মানবাধিকার লংঘন করছে। আর এটাকে তারা অভ্যন্তরীণ বিষয় বলছে। সভ্য সমাজ এই মানবাধিকার লংঘন বরদাশত করতে পারে না। এ বিবৃতি জাতিসংঘ থেকে জারি করা হয়েছে।
১৩. ১৯৯৩ সালের ৩রা মে দৈনিক লস এঞ্জেলেস টাইমস পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে, খুব ধীরে ধীরে সুদূরপ্রসারী পরিবর্তন সাধিত হচ্ছে। বিভিন্ন দেশের সর্বোচ্চ ক্ষমতা আস্তে আস্তে তাদের হাত থেকে বের হয়ে জাতিসংঘের হাতে চলে যাচ্ছে। যুগোশ্লাভিয়ার গৃহযুদ্ধ আমাদের এই সুযোগ সরবরাহ করেছে।
📄 জাতিসংঘের সামরিক শক্তি
০১. ১৯৯১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বুলেটিনে প্রকাশিত হয়েছে, দ্বিতীয় পর্যায়ে ধীরে ধীরে জাতিসংঘের অধীনে আন্তর্জাতিক সেনাবাহিনী গঠন করা হবে। তৃতীয় পর্যায়ে অত্যন্ত সুসংগঠিত ও পরিকল্পিত উপায়ে অতি দ্রুত সকল দেশকে রাসায়নিক সমরাস্ত্র থেকে বঞ্চিত করা হবে। তখন আর কোনো দেশের পক্ষে জাতিসংঘের শাক্তিশালী সেনাবাহিনীকে চ্যালেঞ্জ করা সম্ভব হবে না।
০২. ১৯৯৫ সালের ৫ই জানুয়ারী দৈনিক লস এঞ্জেলেস টাইমসে প্রকাশিত এক প্রবন্ধে প্রবন্ধকার ব্রেড এবং জি. বিরোয়েটজ লেখেন, সকল দেশকে শক্তিশালী সমরাস্ত্র থেকে বঞ্চিত করার স্বপ্ন একদিন বাস্তবে রূপ লাভ করবে।
০৩. ১৯৯২ সালের ২রা ফেব্রুয়ারী দৈনিক লস এঞ্জেলেস টাইমস পত্রিকায় প্রকাশিত এক নিবন্ধে নিবন্ধকার নর মানকিমেস্টার লেখেন, নিরাপত্তা পরিষদের অধীনে একটি স্থায়ী আন্তর্জাতিক সেনাবাহিনী গঠন করা প্রয়োজন। এতে জাতিসংঘের শক্তি ও প্রভাব-প্রতিপত্তি বহু গুণে বৃদ্ধি পাবে। এ সেনাবাহিনীকে আন্তর্জাতিক পুলিশের মর্যাদা দান করা হবে, যার মাধ্যমে জাতিসংঘ তার ইচ্ছা, সংকল্প ও কার্যক্রম সহজেই অন্যের ওপর চাপিয়ে দিতে সক্ষম হবে।
০৪. মার্কিন এক সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সহকারী জোশেফনায়ে ১৯৯২ সালের ২ রা ফেব্রুয়ারী নিউইয়র্ক টাইমসের এক নিবন্ধে লেখেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবশ্য কর্তব্য হচ্ছে, সে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে এমন একটি সেনাবাহিনী গঠন করবে, যার মাধ্যমে জাতিসংঘ তার কার্যক্রম খুব সহজেই বাস্তবায়ন করতে পারবে। এই বাহিনীর সংখ্যা প্রথম স্তরে ৬০ হাজার এবং তা বারটি দেশের সমন্বয়ে গঠিত হবে।
০৫. ১৯৯২ সালের ১১ মে নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে, যদি বাস্ত বিকই বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হয়, তাহলে এর জন্য না লাল বাহিনীর, আর না মার্কিন বাহিনীর প্রয়োজন আছে; বরং এর জন্য প্রয়োজন বিভিন্ন দেশের সমন্বয়ে গঠিত নীল হ্যাট লাগানো আন্তর্জাতিক শান্তিবাহিনী। এ শান্তিবাহিনীই বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম। (সূত্র: সি.এফ.আর-এর মুখপত্র ফরেন এ্যাফেয়ার্স-১৯৯২)