📄 পররাষ্ট্র সম্পর্ক কমিটি—(C.F.R)
'কাউন্সিল অফ ফরেন রিলেশন্স' (C.F.R) নামের এই প্রতিষ্ঠানটির ভিত্তি রাখা হয় ১৯০৭ সাল থেকে ১৯১৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে। এর প্রতিষ্ঠাতা হলেন রাহুড সেশাল ও তার বন্ধু-বান্ধব। প্রতিষ্ঠার সময় এর লক্ষ্য-উদ্দেশ্য খুব গোপন রাখা হয়। ১৯২১ সালে রোতিশলেড ব্যাংকের মার্কিন প্রতিনিধি মি. জে. আর মর্গান, জন রকফেলার, বার্নার্ড বারূখ (একাধিক মার্কিন প্রেসিডেন্টের ইহুদী উপদেষ্টা), পল ওয়ারবার্গ, জেকবশেপ এবং অটোকাহান প্রমুখ উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিবর্গ এই প্রতিষ্ঠানে বিপুল আর্থিক সহযোগিতা প্রদান করেন। এটা তখনকার কথা যখন লীগ অফ নেশনের প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা ধুলোয় মিশে গিয়েছিল। সি.এফ.আর-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট উইলসন-এর উপদেষ্টা কর্নেল এ্যাডওয়ার্ড মান্ডিল হাউস, মার্কিন সাংবাদিক ওয়াটার ল্যাম্পম্যান, মার্কিন প্রেসিডেন্ট আইজেন হাওয়ার-এর পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন ফাস্টার ডেলিস, সি.আই.এ-এর সাবেক ডাইরেক্টর এলিন ডালস এবং মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিশ্চিয়ান হার্টার বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
সি.এফ.আর-এর তত্ত্বাবধানেই প্রকাশিত হয় বহুল প্রচারিত মার্কিন পত্রিকা ফরেন এ্যাফেয়ার্স। এই পত্রিকার এক সংখ্যায় গবেষণাধর্মী একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। তাতে উল্লেখ আছে, নতুন বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার দিকে আমাদের দৃষ্টি নিবদ্ধ রয়েছে।
সি.এফ.আর-এর উদ্দেশ্যের আরো ব্যাখ্যা দিয়ে মার্কিন এ্যাডমিরাল জাসটিরোর বলেন, সি.এফ.আর-এ কর্মরত এক শক্তিশালী গ্রুপের মৌলিক উদ্দেশ্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব নির্মূল করে এমন একটি বিশ্ব সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা, যার একটি অংশ হবে আমেরিকা। দ্বিতীয় উদ্দেশ্য হলো, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে অস্ত্রমুক্ত একটি বিশ্বব্যবস্থার অধীন করে দেয়া।
মার্কিন প্রশাসনের বিভিন্ন দফতরে কর্মচারী নিয়োগের ব্যাপারে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সহকারী জন মেকলে বলেন, আমাদের যখনই মার্কিন প্রশাসনের জন্য কোন লোকের প্রয়োজন হয় তখনই আমরা সর্বপ্রথম সি.এফ.আর-এর কর্মকর্তাদের তালিকা দেখি এবং সঙ্গে সঙ্গে নিউইয়র্কে অবস্থিত সি.এফ.আর-এর কেন্দ্রীয় দফতরের সাথে যোগাযোগ করি। কারণ তাদের নিকট সব ধরনের বিশেষজ্ঞ রয়েছে। মূলতঃ মার্কিন প্রশাসন পরিচালনা ও তার নিয়ন্ত্রক সকল ব্যক্তিবর্গ সি.এফ.আর-এর সক্রিয় সদস্য, যারা ইহুদী উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে কর্মতৎপর। নিম্নের কিছু উদাহরণ থেকে একথা সহজেই অনুমান করা যায়।
০১. জাতিসংঘ গঠনে সহযোগিতার জন্য মার্কিন প্রশাসন ৪৭ সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করে দিয়েছিল। উক্ত কমিটির সদস্যদের মধ্যে জন ফাস্টার ডালস, নেলসন রকফেলার ও এ্যাডলাঈ ষ্টিউনসন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ৪৭ সদস্য বিশিষ্ট এ কমিটির সকলেই ছিলেন সি.এফ.আর-এর সক্রিয় সদস্য।
০২. মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগানের বিভিন্ন দফতরে কর্মরত ৩১৩ কর্মকর্তার সকলেই ছিলেন সি.এফ.আর-এর সক্রিয় সদস্য। একই অবস্থা জর্জ বুশের দফতরেরও। যেখানে ৩৮৭ জন্য কর্মকর্তা এই প্রতিষ্ঠান থেকেই নির্বাচিত হয়ে এসেছিলেন। ১৯৯২ সালে সি.এফ.আর-এর সদস্য সংখ্যা ২৯০-এ উন্নীত হয়। ১৯২১ সাল থেকে এ পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১৮ জন অর্থমন্ত্রীর ১২ জনই ছিলেন সি.এফ.আর-এর সদস্য। এমনিভাবে ১৬ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যে ১২ জনই ছিলেন সি.এফ.আর-এর সদস্য। ১৯৪৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত ১৫ জন প্রতিরক্ষামন্ত্রীর মধ্যে ৯ জনই ছিলেন সি.এফ.আর-এর সদস্য। একই অবস্থা সি.আই.এ'রও। সি.আই.এ'র প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে এ পর্যন্ত ১১ জন ডাইরেক্টরের মধ্যে ৯ জনই ছিলেন সি.এফ.আর-এর সদস্য। এখন পরিস্থিতি এ পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে যে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় এবং নিরাপত্তা বিষয়ক সকল প্রতিষ্ঠান সি.এফ.আর-এর জন্য নির্ধারিত হয়ে গেছে।
১৯৫২ সাল থেকে (১৯৬৪ সাল ছাড়া) এ পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উভয় রাজনৈতিক দলের যত প্রার্থী প্রেসিডেন্ট পদের জন্য প্রতিদ্বন্দিতা করেছেন, সকলেরই সি.এফ.আর-এর সাথে ঘনিষ্ঠ ও নিবিড় সম্পর্ক ছিল।
মার্কিন মিডিয়ার সকল উল্লেখযোগ্য ও কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সি.এফ.আর-এর সদস্য দ্বারা ছেয়ে গেছে। যেমন কলম্বো ব্রডকাস্টিং সিস্টেম (C.B.S), ন্যাশনাল ব্রডকাস্টিং কোম্পানী (N.B.C), কেন্দ্রীয় টিভি স্টেশন ইত্যাদি। এমনিভাবে মার্কিন সংবাদ সংস্থা এসোসিয়েটেড প্রেস, জাতীয় পত্রিকাগুলোর মধ্যে নিউইয়র্ক টাইমস, ওয়াশিংটন পোস্ট, সাপ্তাহিক ম্যাগাজিনের মধ্যে টাইম নিউজউইক ইত্যাদিতে সি.এফ.আর-এর সদস্যদের একচ্ছত্র আধিপত্য রয়েছে, তারাই এসব সংবাদপত্রের নীতিনির্ধারক।
১৯৭২ সালে ডেভিড রকফেলার-এর বাসভবনে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত বৈঠকে গোটা আমেরিকা থেকে নির্বাচিত মাত্র ৮ জন সদস্য অংশ গ্রহণ করেন। যাদের সবারই নিবিড় ও গভীর সম্পর্ক ছিল সি.এফ.আর-এর সাথে, বাকী সদস্যরা ছিলেন ইউরোপ ও জাপানের। সে বৈঠকেই 'ট্রিলিটারা কমিশন' প্রতিষ্ঠা করা হয়। এই সংস্থার প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জেগনো বার্জেনসকিও ছিলেন। উক্ত বৈঠকে মার্কিন প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা আরো বৃদ্ধি ও প্রশস্ত করার, প্রচার মাধ্যমের ক্ষমতা সীমিত করার এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনৈতিক সহযোগিতা হ্রাস করার আহবান জানানো হয়। উক্ত সংস্থার টিসি সদস্যদের মধ্যে Exxon, Mobil standard, Shell, Philips, B.R Bankk, Bank of Amrika, C.N.N, A.B.S, R.C.A, I.T.T, Sony, Goodyear ইত্যাদি কোম্পানীসমূহের সদস্য ও ডাইরেক্টররাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন।
মার্কিন লেখক বার্জানসকি স্বীয় গ্রন্থ 'দুই যুগের মাঝে' লেখেন, মার্ক্সিজম মানুষের অভ্যন্তরের ওপর বাহ্যিক দিককে এবং ঈমানের ওপর বিবেককে বিজয় দানের ক্ষেত্রে বিরাট ভূমিকা পালন করেছে। আমাদের সংস্থা টিসি ইউরোপ, জাপান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে একটি নতুন বিশ্বব্যবস্থার ছাঁচে ঢালতে চায়। এই সংস্থার এক তৃতীয়াংশ সদস্য জাপানী, এক তৃতীয়াংশ ইউরোপীয় ও এক তৃতীয়াংশ মার্কিনী। এদের সবার মৌলিক উদ্দেশ্য এক অভিন্ন। কারণ এ সকল সদস্যের সবাই সি.এফ.আর-এর সাথে সংশ্লিষ্ট। উল্লিখিত সংস্থা ছাড়াও এমন দুই ডজনেরও বেশি সংস্থা ইহুদী স্বার্থ রক্ষায় কাজ করে যাচ্ছে। যেমন বেনাই বার্ট, এ্যাপেক, এ.ডি, ইত্যাদি। এরা নির্বাচনের সময় কর্ম কৌশল নির্ধারণ করে থাকে। ১২
টিকাঃ
১২. বিস্তারিত জানতে দেখুন, লি ও ব্রাইন লিখিত 'মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ইহুদী সংগঠন'। এ গ্রন্থে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কর্মতৎপর ইহুদী সংগঠনগুলোর বিস্তারিত পরিচিতি, লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ও কর্মকা উল্লেখ করা হয়েছে। ইহুদীরা মার্কিন প্রশাসনে কিভাবে জেঁকে বসে আছে তা জানতে দেখুন, মার্কিন কংগ্রেসের সাবেক সদস্য পল ফান্ডলের গ্রন্থ-'ইহুদী যাঁতাকল'।
📄 নতুন বিশ্বব্যবস্থা : রূপরেখা ও কর্মপদ্ধতি
(পশ্চিমা রাজনীতিক, চিন্তাবিদ ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন দস্তাবেজের উদ্ধৃতিক্রমে)
নতুন বিশ্বব্যবস্থার রূপরেখা ও মানচিত্র এমনি এমনিই অস্তিত্ব লাভ করেনি, আর না কোন চিন্তা-ফিকির ছাড়াই এ পরিকল্পনা ও রূপরেখা উপস্থাপন করা হয়েছে; বরং এই বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পূর্বেই এর জন্য বিরাট পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে। জায়নিষ্ট প্রটোকলে তার রূপরেখা ও রোডম্যাপ তৈরি করা হয়েছে। অতঃপর তা বাস্তবায়নের জন্য উপকরণ, মাধ্যম ও কর্মপদ্ধতি নির্ধারণ করা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত বস্তুগত সম্পদে ভরপুর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে এর পরীক্ষা-নিরীক্ষাস্থল নির্ধারণ করা হয়েছে। সেখানে বসে বিভিন্ন ইহুদী গ্রুপ ঐক্যবদ্ধভাবে এই রূপরেখায় আরো রং প্রলেপ শুরু করে। পরবর্তীতে এর মৌলিক উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন ও চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জনের জন্য যুগের চাহিদা, পরিবর্তিত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা এবং সময়ের বাস্তবতার আলোকে এর উপকরণ, মাধ্যম ও কর্মপদ্ধতির মধ্যে আংশিক পরিবর্তন সাধন করা হয়। নিম্নলিখিত বক্তৃতা-বিবৃতির আলোকে সহজেই অনুমিত হয়, নতুন বিশ্বব্যবস্থার রূপরেখা ও মানচিত্র কেমন হবে? এবং এ বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কি ভূমিকা রয়েছে?
📄 নতুন বিশ্বব্যবস্থার রাজনৈতিক অবকাঠামো
আমরা মানবেতিহাসের এমন এক স্পর্শকাতর ও চূড়ান্ত স্তরে এসে উপনীত হয়েছি, যে স্তরের মূল কথা হলো, এমন একটি নতুন বিশ্বব্যবস্থা গঠন ও বিনির্মাণ করা হবে, যার মধ্যে সকল দেশের কৃত্রিম সীমানা নির্মূল করে দেয়া হবে। সেসব দেশের স্বাতন্ত্র্য, বৈশিষ্ট্য, সভ্যতা-সংস্কৃতি এবং রাজনৈতিক পরিচয় মুছে ফেলা হবে। (মানবাধিকারের দস্তাবেজ থেকে)
০১. ১৯৮৭ সালের ১২ই মে সিনিয়র জর্জ বুশ তার এক ভাষণে বলেন, নিকট ভবিষ্যতে এমন একটি নতুন বিশ্বব্যবস্থা অস্তিত্ব লাভ করবে, যে ব্যবস্থায় সকল জাতি-গোষ্ঠী একে অপরের সাথে একীভূত হয়ে যাবে। অতঃপর উপসাগরীয় যুদ্ধ পরিসমাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে নিয়মতান্ত্রিকভাবে এ নতুন বিশ্বব্যবস্থার অবকাঠামোর ঘোষণা দেয়া হয়।
০২. ১৯৯১ সালে প্রকাশিত এবং রোম ক্লাবের তত্ত্বাবধানে মুদ্রিত প্রথম বিশ্বযুদ্ধ নামক গ্রন্থে উল্লেখ আছে, গোটা বিশ্বের ব্যবস্থাপনা জাতিসংঘের হাতে তুলে দেয়া একান্ত জরুরী।
০৩. ট্রাজেডি ও আকাঙ্খা' নামক গ্রন্থের লেখক রোটিগেল বলেন, অতি সত্বর ব্যক্তিস্বাধীনতা সীমিত হয়ে যাবে। কারণ একক ব্যক্তির কোনো গুরুত্ব নেই।
📄 নতুন বিশ্বব্যবস্থার গোড়াপত্তনে জাতিসংঘের ভূমিকা
০১. জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব ড. বুট্রোস ঘালি ১৯৯৭ সালে তার রচিত 'আন্তর্জাতিক সরকার' নামক গ্রন্থে লেখেন, জাতিসংঘ এক হিসেবে নতুন বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রথম ইট।
০২. রকফেলার ফাউন্ডেশনের তত্ত্বাবধানে ১৯৫৯ সালে প্রকাশিত 'মার্কিন পররাষ্ট্র রাজনীতি' গ্রন্থে উল্লেখ আছে, নিকট ভবিষ্যতে যে নতুন বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে, তার প্রধান স্তম্ভ জাতিসংঘ।
০৩. ১৯৬২ সালের মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের রিপোর্ট ও প্রস্তাবে উল্লেখ আছে, যে সব দেশকে জাতিসংঘ তার শক্তি সামর্থ দিয়ে পদানত করতে সক্ষম, সেসব দেশের শাসন ক্ষমতা পরিচালনার জন্য জাতিসংঘের অধীনে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান স্থাপন এবং জাতিসংঘের অধীনে একটি আন্তর্জাতিক সামরিক বাহিনীও গঠন করা হবে। যাতে এসব অধীনস্থ প্রতিষ্ঠানের সামরিক শক্তিও অর্জিত থাকে এবং সে তার মর্জি অন্য দেশের ওপর চাপিয়ে দিতে পারে। এ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে জাতিসংঘের সংবিধানে সামান্য পরিবর্তন আনতে হবে। এভাবে একটি আন্তর্জাতিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে। এ আন্তর্জাতিক সরকার দ্বারা আমাদের উদ্দেশ্য নতুন বিশ্বব্যবস্থা, যা আমরা গঠন করতে চাই।
০৪. ১৯৯১ সালের জানুয়ারী তারিখে প্রদত্ত ভাষণে সিনিয়ন জর্জ বুশ বলেন, আমাদের সামনে বর্তমানে একটি নতুন বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সুবর্ণ সুযোগ এসেছে-আমাদের জন্য এবং আগামী প্রজন্মের জন্যও। বাস্তবিকই আমাদের একটি নতুন বিশ্বব্যবস্থা বাস্তবে রূপদানের সুবর্ণ সুযোগ অর্জিত হয়েছে। এই ব্যবস্থায় জাতিসংঘ ব্যাপক শক্তির অধিকারী হবে এবং জাতিসংঘ বিশ্বের নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় তার মৌলিক ভূমিকা পালন করতে পারবে।
০৫. 'পাশ্চাত্যের অস্থিরতা' নামক গ্রন্থে লেখক জেমস ওয়ারবার্গ লেখেন, আমরা এমন এক নাযুকতম সময় অতিবাহিত করছি, যে সময়ে আমরা একটি পূর্ণ ক্ষমতাসম্পন্ন রাষ্ট্র থেকে একটি আন্তর্জাতিক সরকারের ক্ষমতার দিকে স্থানান্তরিত হচ্ছি।
০৬. সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট-এর নাতনী এডথ রুজভেল্ট ১৯৯৬ সালের ২৩ ডিসেম্বর প্রদত্ত তার ভাষণে বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট, হেরি ট্রুমেন, জেনারেল আইজেন হাওয়ার এবং জন. এফ কেনেডির যুগ থেকে নিয়ে সকল মার্কিন সরকারের বিশ্বাস ছিল, সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার সাথে লড়াই করার সবচে' উত্তম পন্থা হলো এমন একটি আন্ত র্জাতিক সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা, যার নেতৃত্ব দেবে স্বয়ং সমাজতন্ত্রের নেতৃবর্গ। এর ফল দাঁড়িয়েছে, আন্তর্জাতিক সরকার ব্যবস্থা ধীরে ধীরে বিকশিত ও সম্প্রসারিত হতে থাকে এবং পর্যায়ক্রমে মার্কিন কর্তত্ব জাতিসংঘের কাছে ন্যস্ত করে দেয়া হয়।
০৭. ১৯৬২ সালের ২০ মার্চ প্রকাশিত মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের পর্যবেক্ষণ রিপোর্টে উল্লেখ আছে, বিশ্বের রাষ্ট্রগুলোর যে ক্ষমতা আছে, তা আন্তর্জাতিক সরকারের নিকট ন্যস্ত করে দেয়া উচিত।
০৮. ১৯৪৭ সালের এপ্রিলে ফরেন এ্যাফেয়ার্স পত্রিকায় প্রকাশিত এক নিবন্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট কেনেডি এবং জনসন-এর সহকারী রিচার্ড গার্ডনার লেখেন, আন্তর্জাতিক সরকার প্রতিষ্ঠার সবচে' উত্তম পদ্ধতি হচ্ছে, আমরা উঁচু পর্যায় থেকে কাজ শুরু করার পরিবর্তে একেবারে নীচ থেকে এ সরকার বিনির্মাণের কাজ শুরু করব। তা এভাবে যে, পর্যায়ক্রমে সকল রাষ্ট্রের কাছ থেকে ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে আন্তর্জাতিক সরকারের নিকট সোপর্দ করে দেব। আধিপত্য অর্জন করার জন্য এটি যুদ্ধ-লড়াই থেকেও বেশি প্রভাব-প্রতিক্রিয়া সৃষ্টিকারী এবং দ্রুত ফলপ্রসূ।
০৯. ১৯৯০ সালের জানুয়ারী মাসে মিখাইল গর্বাচেভ তার এক ভাষণে বলেন, বর্তমান যুগের পরিবেশ দূষণ একটি মহা সমস্যা। এ সমস্যা সমাধানের জন্য আমাদের আন্তর্জাতিক সরকার প্রতিষ্ঠা করা অপরিহার্য। এ সরকার প্রতিষ্ঠায় প্রয়োজনে আমাদের কিছু কঠিন ও ধ্বংসাত্মক সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে, কিন্তু তা তো করতেই হবে।
১০. ১৯৯১ সালের ১৪ই আগস্ট নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত হয়েছে, বিশ্বের রাষ্ট্রসমূহের দায়িত্বহীন ক্ষমতা প্রয়োগ ও আচরণের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা প্রয়োজন। আর এটা আন্তর্জাতিক সরকার প্রতিষ্ঠা করা ছাড়া সম্ভব নয়। যেমনিভাবে আন্তর্জাতিক আদালত বিভিন্ন সরকারের হিসাব নিকাশ নেয়, তেমনিভাবে আমরাও সকল দেশকে একই গতিতে নিয়ে আসতে চাই।
১১. ১৯৯৩ সালের ৩১ জানুয়ারী জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে প্রদত্ত ভাষণে সাবেক মহাসচিব ড. বুট্রোস ঘালি বলেন, দেশের ক্ষমতা, দেশপ্রেম এবং আধিপত্য প্রতিষ্ঠার মর্মার্থে পরিবর্তন চলে আসছে। সংকীর্ণ ও সীমিত রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা পারস্পরিক শান্তিপূর্ণ স্থায়ী জীবনের পথে বাধা হতে পারে। এজন্য সকল দেশকে একে অপরের ওপর ভরসা করতে হবে এবং নিজ নিজ সীমান্ত চিহ্ন মুছে ফেলতে হবে।
১২. ১৯৯৩ সালের ১২ এপ্রিল জর্জ বুশের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বিশটি দেশের নেতৃবর্গের এক বৈঠক থেকে জারিকৃত যৌথ ঘোষণায় বলা হয়, জাতিসংঘের সংবিধানে পরিবর্তন আনতে হবে। সেই পরিবর্তন হলো, জাতিসংঘ সদস্য দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ বিষয়েও হস্তক্ষেপ করবে। কারণ বিভিন্ন দেশ প্রকাশ্যে মানবাধিকার লংঘন করছে। আর এটাকে তারা অভ্যন্তরীণ বিষয় বলছে। সভ্য সমাজ এই মানবাধিকার লংঘন বরদাশত করতে পারে না। এ বিবৃতি জাতিসংঘ থেকে জারি করা হয়েছে।
১৩. ১৯৯৩ সালের ৩রা মে দৈনিক লস এঞ্জেলেস টাইমস পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে, খুব ধীরে ধীরে সুদূরপ্রসারী পরিবর্তন সাধিত হচ্ছে। বিভিন্ন দেশের সর্বোচ্চ ক্ষমতা আস্তে আস্তে তাদের হাত থেকে বের হয়ে জাতিসংঘের হাতে চলে যাচ্ছে। যুগোশ্লাভিয়ার গৃহযুদ্ধ আমাদের এই সুযোগ সরবরাহ করেছে।