📄 জাতিসংঘকে আন্তর্জাতিক সরকারের মর্যাদা দান
জাতিসংঘের মহাসচিব ড. বুট্রোস ঘালি তার 'শান্তি প্রস্তাব' রিপোর্টে যথারীতি দাবী করেছেন, জাতিসংঘকে বিশ্বের সকল রাষ্ট্রের কাছ থেকে ট্যাক্স আদায় করার ক্ষমতা প্রদান করা হোক। সর্বপ্রথম বাণিজ্যিক লেনদেন, পেট্রোল উৎপাদন ও অস্ত্রের রেজিস্ট্রেশন ফি ইত্যাদি বাবদ অর্থ উসুল করা হবে, যাতে জাতিসংঘের এত বড় সচিবালয় ও তার ক্রমবর্ধমান খরচের জন্য পর্যাপ্ত অর্থের যোগান দেয়া যায়। কারণ বিভিন্ন সদস্য দেশের কাছ থেকে চাঁদা উসুল করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এখন আমরা এসব চাঁদার ওপর ভরসা করতে পারি না। ধীরে ধীরে ৭ নং ধারার আওতায় জাতিসংঘের স্থায়ী শান্তিবাহিনী গঠন করার প্রয়াস চালানো হোক।
১৯৬১ সালে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর 'যুদ্ধ বিগ্রহ থেকে মুক্তি' শীর্ষক বিশ্লেষণধর্মী এক রিপোর্ট তৈরি করে মার্কিন সরকারের সামনে পেশ করে। উক্ত রিপোর্টকে ভিত্তি করে মার্কিন কংগ্রেস 'আইন ৮৭-২৯৭' সরকারীভাবে পাস করে। যার শিরোনাম ছিল 'অস্ত্র সংকোচন আইন'। এ আইন অনুযায়ী আমেরিকা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল, শান্তিপূর্ণ বিশ্বে মানববিধ্বংসী অস্ত্রগুলো ধীরে ধীরে সুপরিকল্পিতভাবে তিন স্তরে নির্মূল করা হবে।
০১. প্রথম স্তরে অস্ত্রের বিরুদ্ধে বিশ্ব জনমত গড়ে তোলা হবে এবং এ বিষয়ে আন্ত র্জাতিক চুক্তির পরিবেশ তৈরি করা হবে।
০২. দ্বিতীয় স্তরে আন্তর্জাতিক শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে শান্তি বাহিনী গঠন করা হবে।
০৩. তৃতীয় স্তরে অত্যন্ত সুপরিকল্পিত উপায়ে খুব দ্রুত সকল দেশকে বিধ্বংসী অস্ত্র থেকে মুক্ত করা হবে, যাতে কোন দেশ সামরিক দিক দিয়ে জাতিসংঘের সশস্ত্র বাহিনীকে চ্যালেঞ্জ করতে না পারে।
ইরাক ও যুগোশ্লাভিয়া প্রজাতন্ত্রকে যেভাবে সামরিক অস্ত্রশস্ত্র থেকে বঞ্চিত করে হত্যা করা হয়েছে তা এই আইনের বাস্তব পদক্ষেপ। এই আইন অনুযায়ী সকল দেশকে কেবল সেসব অস্ত্রশস্ত্রই রাখার অনুমতি থাকবে যা অভ্যন্তরীণ শান্তি-শৃংখলা ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন। পুলিশ বাহিনীকে অভ্যন্তরীণ বিশৃংখলা ও নৈরাজ্য দমন করার জন্য ভারী অস্ত্রে সজ্জিত করা হবে।
৯০-এর দশকের পর থেকে জাতিসংঘ শান্তিবাহিনীতে সৈন্য সংখ্যা খুব দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে ১ লাখে উন্নীত হয়েছে। ২০শে মার্চ ১৯৬২ সালে মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে প্রতিরক্ষা পর্যালোচনা বিভাগ রিপোর্ট নং ৭ প্রস্তুত করে। মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় উক্ত প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রশ্ন করেছিল, এমন পরিবেশ কিভাবে সৃষ্টি করা যায় যেখানে জাতিসংঘ তার যোগ্যতা ও শক্তির বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে পারবে। এ প্রশ্নের উত্তর প্রতিরক্ষা বিভাগ প্রস্তুত করেছিল। তাতে সরাসরি বলা হয়, যে সকল দেশের ওপর জাতিসংঘ তার আধিপত্য ও দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠা করতে এবং তার অঙ্গ প্রতিষ্ঠানগুলো সেসব দেশের সকল সেক্টরে পূর্ণ জেঁকে বসতে চায়, সেসব দেশকে জাতিসংঘের সকল প্রতিষ্ঠানের সদস্য হওয়া অত্যাবশ্যক করতে হবে এবং জাতিসংঘের সকল প্রতিষ্ঠানের কাছে পূর্ণাঙ্গ সামরিক শক্তি থাকতে হবে। এ উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য আমাদের জাতিসংঘের চার্টারে সামান্য পরিবর্তন আনতে হবে, যাতে এই আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান গোটা বিশ্বে স্বাধীনভাবে তার সকল দায়িত্ব সুচারুরূপে আঞ্জাম দিতে পারে।
জাতিসংঘে যেসব দেশ শক্তিশালী ও সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে, তারাই অস্ত্র সংকোচনের তত্ত্বাবধান, শান্তি নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা, পারস্পরিক অনৈক্য-দ্বন্দ দূরীকরণ ও ট্যাক্স উসুল করার জন্য যথেষ্ট। এসবের জন্য জাতিসংঘের প্রয়োজন নেই। আমরা এমন জাতিসংঘের কথা বলছি, যার নিকট পাঁচ লাখ সৈন্যের এমন বাহিনী থাকবে, যারা অত্যাধুনিক আণবিক সমরাস্ত্রে সজ্জিত হবে। পঞ্চাশ থেকে একশ' পর্যন্ত রাসায়নিক ও আণবিক সমরাস্ত্র থাকবে এবং সকল সরকারের তিনটি কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা তার নিকট থাকবে। আন্তর্জাতিক আদালতের ফয়সালা সে-ই বাস্তবায়ন করবে। নিঃসন্দেহে আমরা সাধারণ রাষ্ট্র সরকারের কথা বলছি। এ প্রস্তাবকে বুনিয়াদ বানিয়ে বৃহৎ শক্তিগুলোর অস্ত্রত্যাগ সংক্রান্ত অসংখ্য চুক্তি হয়েছে। আণবিক অস্ত্রের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়ে আলোচনা পর্যালোচনা হয়েছে। রাশিয়ার সাথে অস্ত্র পরিত্যাগের সবচে' বড় চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে। যে চুক্তির আওতায় রাশিয়াকে অন্ততঃ পক্ষে আণবিক অস্ত্র থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জাতিসংঘের অফিসাররা সামরিক প্রশিক্ষণ দেখাশোনা করে।
বহুকাল ধরে মার্কিন মিডিয়ায় এ ধরনের প্রবন্ধ-নিবন্ধ লেখে মানসিকতা প্রস্তুত করা হচ্ছে যে, আমেরিকা বর্তমানে বিশ্বের সবচে' বৃহৎ দেশ। কেন্দ্রেীয় সরকারের মাধ্যমে এই দেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালন কঠিন হয়ে পড়েছে। এজন্য আমেরিকার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আলোচনা-পর্যালোচনা হওয়া দরকার। এখন কেন্দ্রীয় সরকারের কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা সীমিত করে দেয়ার পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। ফলে মার্কিন সংবিধানে স্বাধীন মত প্রকাশ ও ব্যক্তিগত অস্ত্র রাখার অধিকার দেয়া হয়েছে। এখন সেসব অধিকার নির্মূল করার প্রয়াস চালানো হচ্ছে।
আমেরিকার বিভিন্ন স্টেটে মার্কিন সংবিধানে সংশোধনী আনার প্রস্তাব পেশ করা হয়েছে, কিন্তু এখনো পর্যন্ত দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জিত হয়নি। যদি দুই তৃতীয়াংশ স্টেট এ উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য ঐক্যবদ্ধ হয়, তাহলে পুরাতন সংবিধানের পরিবর্তে নতুন সংবিধান রচনার সেই পুরাতন দাবী আবার যিন্দা করা সম্ভব। তখন ইউনাইটেড স্টেট অফ আমেরিকার পরিবর্তে নিউ স্টেট অফ আমেরিকা নাম দেয়া হবে। স্টেটের সংখ্যা হ্রাস করে তাকে অর্ধ স্বায়ত্তশাসন দেয়া হবে। আইন প্রণয়নের ক্ষমতা হ্রাস করার পরিবর্তে তার বাস্তবায়ন ক্ষমতা আরো বৃদ্ধি ও বর্তমান সাংবিধানিক অধিকার বিলুপ্ত করা হবে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে একটি সুচিন্তিত পরিকল্পনা মোতাবেক ইহুদী গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে ধারাবাহিক এ ধরনের গ্রন্থ লেখা এবং বক্তৃতা ও বিবৃতি প্রদান করা হচ্ছে। যাতে বলা হচ্ছে, আমেরিকা একটি যুক্তরাষ্ট্র হিসেবে অনৈক্য ও দ্বন্দ্বের শিকার হচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির উপদেষ্টা আর্থার সেলেংগার রচিত গ্রন্থ 'আমেরিকার অনৈক্যে' একথা বলা হয়েছে। এমনিভাবে জন ক্যানন-যিনি অনেক মার্কিন প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা ছিলেন, তিনি স্বীয় গ্রন্থে প্রস্তাব পেশ করেছেন, আমেরিকার ভবিষ্যত সম্পর্কে আলোচনা পর্যালোচনার জন্য একটি স্বতন্ত্র কমিটি গঠন করা উচিত।
📄 নতুন গ্রুপ
প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর রুশ ও যুগোশ্লাভিয়া ঐক্যবদ্ধ দেশরূপে আবির্ভূত হয় পরবর্তীতে ইউরোপীয় দেশগুলোর মাঝে একতা, সহযোগিতা ও ঐক্যের নতুন রূপ সামনে আসে। এই ঐক্য সর্বপ্রথম ইউরোপীয় যৌথ বাজারের রূপ ধারন করে অতঃপর পর্যায়ক্রমে এ ঐক্যই ইউরোপীয় পার্লামেন্টের রূপ ধারণ করে। এরপর কাস্টম ও সীমান্ত আইন বিলুপ্ত হয়। এখন ইউরোপীয় দেশসমূহের মাঝে একব অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ও একক মুদ্রা চালু হয়েছে। একই অবস্থা উত্তর ও দক্ষিণ আমেরি মহাদেশের মাঝে সৃষ্টি হচ্ছে। যে কমিটি উভয় মহাদেশের মাঝে অনুষ্ঠিত চুক্তি বাস্তবায়নের তত্ত্বাবধান করবে, সে কমিটিই পরবর্তীতে পার্লামেন্টের রূপ ধারণ কববে। পর্যায়ক্রমে ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের পদাঙ্ক অনুসরণে ঐক্যবদ্ধ মার্কিন পার্লামেন্ট অস্তিত্ব লাভ হবে।
সম্ভবত একই অবস্থা বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্য ও ভূমধ্য সাগরীয় দেশসমূহে অবলম্বন করা হচ্ছে। জর্ডান ও ইসরাঈলের মাঝে ঢিলেঢালা ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই ঐক্যের উদ্দেশ্য উভয় দেশের মাঝে কাস্টম ও পাসপোর্ট ব্যবস্থা নির্মূল করা ছাড়া আর কিছুই নয়। রাবাত, ওমান ও কায়রোতে 'অর্থনীতি' শিরোনামে যে ষষ্ঠ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে তার মৌলিক উদ্দেশ্য, ইসরাঈলী পণ্যের জন্য সকল আরব দেশের দ্বার উন্মুক্ত করে দেয়া।
📄 বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মগজ ধোলাইয়ের সূচনা
একবার আমেরিকান ব্রডকাস্টিং কোম্পানী (A B C)-এর এক প্রতিনিধি জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব ড. বুট্রোস ঘালিকে সোমালিয়া সম্পর্কে প্রশ্ন করেন। জবাবে ড. ঘালি বলেন, সোমালিয়ায় মার্কিন সৈন্য প্রেরণ এ কারণেই সম্ভব হয়েছিল যে, এ উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য একাধারে দীর্ঘ দশ মাস মিডিয়া ও গণমাধ্যমকে উৎসর্গ করে দিয়েছিলাম। এর দ্বারা ড. ঘালি বুঝাতে চেয়েছেন, সোমালিয়ায় মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপ বিশ্ববাসীর সামনে গ্রহণীয় বানাবার জন্য সর্বপ্রথম মিডিয়ার মাধ্যমে সোমালিয়ায় ক্ষুধা ও দুর্ভিক্ষের কাহিনী দুনিয়াবাসীর কাছে ভয়াবহ আকার বানিয়ে পেশ করা হয়েছিল। ড. ঘালি বলেন, আমরা মিডিয়ার মাধ্যমে বিশ্ববাসীর সামনে কেবল এ সংবাদ ও চিত্রই পেশ করতে লাগলাম যে, সোমালিয়ার জনগণ ক্ষুধা, দারিদ্র ও রোগ শোকে মৃত্যু বরণ করছে। টেলিভিশন ও সংবাদপত্রগুলো ক্ষুধার্ত ও উলঙ্গ সোমালী জনগণের এমন করুণ ও মজলুম চিত্র দুনিয়াবসীর সামনে পেশ করতে থাকে যাতে বিশ্ববাসী বুঝে, এই মরুভূমিতে না পানি আছে, না খাবার আছে, না মাথা গোঁজার ঠাই আছে, আর না আছে কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। সেখানকার জনগণ সকল মৌলিক প্রয়োজন থেকে বঞ্চিত। যদি কোথাও থেকে কোনো সাহায্য সহযোগিতা আসে তাও আবার অসভ্য ও জংলী মানুষগুলো সেগুলো নিয়ে পরস্পরে লড়াইয়ে লিপ্ত হয়। এভাবে অব্যাহত প্রোপাগান্ডার মাধ্যমে আগ্রাসনের পরিবেশ তৈরি হয়ে গেলে বিশ্ববাসীর বদ্ধমূল ধারণা হয়ে গেল যে, সেখানে বিদেশী হস্তক্ষেপ ছাড়া জনগণকে রক্ষার আর কোন পথ নেই। আর আমেরিকা এ উদ্দেশ্যেই মিডিয়ার মাধ্যমে অব্যাহত প্রোপাগান্ডা চালিয়ে আসছিল। এখন কারো পরামর্শ ছাড়াই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেখানে সামরিক হস্তক্ষেপের একটি সুবর্ণ সুযোগ হাতে আসল। যে সুযোগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সোমালিয়ার ওপর সামরিক আগ্রাসন চালায়। পরিস্থিতির আলোকে এখন আর কারো একথা বলার প্রয়োজন হল না, সেখানে সামরিক আগ্রাসনের আসল কারণ ও সমস্যা কি? আসল উদ্দেশ্য পর্দার অন্তরালেই রয়ে গেল। গোটা বিশ্ব এই চিত্তাকর্ষক মনোরম দৃশ্য দেখতে লাগল, মার্কিন সৈন্য মুক্তিদূত হয়ে নিজেদের জীবনবাজি রেখে স্ত্রী-পুত্র সব ছেড়ে হাজার হাজার মাইল দূর থেকে সোমালী জনগণের জন্য স্কন্ধে ত্রাণের বোঝা বহণ করে এদিক সেদিক দৌড়াচ্ছে। মার্কিন বাহি- নী কর্তৃক বিদেশী সাহায্য ও ত্রাণের সুষম বন্টনের কারণেই ক্ষুধার্ত ও মুমূর্ষু সোমালী জনগণ সুস্থ সবল হয়ে ওঠছে। তাদের শরীরে মার্কিন পোশাক দেখা যায়। তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই মূল্যবান সহযোগিতা মনে-প্রাণে গ্রহণ ও মূল্যায়ন করছে। সোমালী জনগণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মানবদরদী পলিসির প্রশংসায় পঞ্চমূখর। প্রতিটি সোমালী জনগণই চাচ্ছিল মার্কিন সৈন্য আমাদের এখানে থেকে যাক। উপসাগরীয় যুদ্ধে ঠিক একই নাটক মঞ্চস্থ করা হয়েছিল। শুধু মার্কিন জনগণই নয়; বরং গোটা বিশ্বাবাসীর সামনে সাদ্দামের জুলুম-অত্যাচারের চিত্র সুবিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছিল, কিন্তু এ নাটক মঞ্চায়নের পূর্বে সাদ্দামের মাধ্যমে তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করানো হয়েছে। তাদের স্বার্থে সাদ্দামকে ব্যবহার করা হয়েছে। সে ছিল তাদের ক্রীড়নক। এ নাটকে কুয়েতকে কুরবানীর বকরী বানানো হয়েছে। সাদ্দাম ও জর্জিয়ার খৃস্টান প্রচারক তারেক আজীজকে তাদের ক্রীড়নক বানানো হয়েছে। এই তারেক আজীজই ইরাকের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও উপপ্রধানমন্ত্রী হয়ে আমেরিকার নাকি ইসরাঈলের প্রতিনিধিত্ব করে যাচ্ছিলেন-তা কারো বোধগোম্য হচ্ছিল না।৭
টিকাঃ
৭. খুব তাড়াতাড়িই উপসাগরীয় যুদ্ধের মুখোশ উন্মোচিত হয়ে যায়। এই যুদ্ধ ছিল সাদ্দাম হুসাইনের আর্থিক প্রয়োজন পূরণ এবং জাতিসংঘের বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার একটি সক্রিয় ও শক্তিশালী হাতিয়ার; বরং ইরাককেই নতুন বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় অভিজ্ঞতার ক্ষেত্র বানানো হয়েছে। যখনই ইরাকের আর্থিক সংকট দেখা দিয়েছে তখনই একে সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে জায়নবাদী গোষ্ঠী আরব বিশ্বের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ইস্যুতে আরবদের বিভ্রান্ত করা ও তাদের দৃষ্টিকে প্রকৃত বিষয় থেকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার এবং তাদের ওপর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের জন্য সাদ্দাম হুসাইনকে উসকে দিয়ে তার মাধ্যমে বিভিন্ন আরব দেশে সামরিক হামলা চালানো হয়েছে, যাতে দূর্বল ও সাদা মনের আরব মানুষগুলো আত্মরক্ষার জন্য নিজেদের মার্কিন জায়নবাদীদের ক্রোড়ে সঁপে দেয়। উপসাগরীয় যুদ্ধ বিষয়ে যত গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে, সেগুলো অধ্যয়ন করলে জানা যায়, জাতিসংঘের যাদুকররা গোটা বিশ্বকে চরম বোকা বানিয়েছে। এই কৃত্রিম যুদ্ধের রিপোর্টকারী হাজার হাজার সাংবাদিক তাদের তীব্র মেধা ও চাতুর্য সত্ত্বেও গোলক ধাঁধায় পড়ে একেবারে বোকা ও নির্বোধ বনে গেছে। দীর্ঘ দিন পর তারা জানতে পারে, শুধু সিএনএনকেই কেন বিপুল পরিমাণ অর্থের বিনিময়ে এই যুদ্ধের রিপোর্ট করার জন্য একচ্ছত্র আধিপত্য দেয়া হয়েছিল। লাগাতার মার্কিন ধ্বংসাত্মক বোমাবর্ষণের পরও কিভাবে ইরাক পূর্বে যে অবস্থায় ছিল সে অবস্থায় এবং সাদ্দাম হুসাইনের মতো ভয়ানক শত্রু জীবিত থেকে যায়? পাকিস্তানের লাহোর থেকে প্রকাশিত তরজুমানুল কুরআনের সম্পাদক প্রফেসর খোরশিদ আহমদ তার এক সম্পাদকীয়তে মধ্যপ্রাচ্যে সক্রিয় সাম্রাজ্যবাদী শক্তির দানবীয়তা ও তার ষড়যন্ত্র বিশ্লেষণ করতে গিয়ে লেখেন, মধ্যপ্রাচ্য একটি দর্পণ, যার মধ্যে গোটা মুসলিম উম্মাহর ট্রাজেডির দেখা যেতে পারে। আমেরিকা, পশ্চিমা জাতি-গোষ্ঠী, জাতিসংঘ, ইসরাঈল, আরব বিশ্বের শাসকবর্গ, তুরস্কের বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকার, ইরাকের শাসকগোষ্ঠী ও সাদ্দام হুসাইন-এগুলো সব একই নাটকের বিভিন্ন চরিত্র।
📄 নতুন বিশ্বব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য
জাতিসংঘ যদি নতুন বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রধান কেন্দ্র হয়ে থাকে, প্রয়োজন পড়লেই যে তার সংবিধান ও চার্টার পরিবর্তন করতে দ্বিধা করে না, তাহলে এর উদ্দেশ্য এ ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না যে, প্রত্যাশিত আন্তর্জাতিক সরকার ব্যবস্থা কোনো নিয়ম- নীতির অধীন হবে না এবং তার প্রধান বা সুপ্রিমো সীমাহীন ক্ষমতা ও প্রভাব-প্রতিপত্তির মালিক ডিক্টেটর হিসেবে আবির্ভূত হবে। যেমন জাতিসংঘের ভূমিকা দ্বারা একথা সুস্পষ্ট বুঝে আসে। এর ভূরি ভূরি দৃষ্টান্ত রয়েছে।
০১. চীন যখন কোরিয়ার বিরুদ্ধে আগ্রাসন চালায়, তখন জাতিসংঘ সঙ্গে সঙ্গে চীনের বিরুদ্ধে পাল্টা পদক্ষেপ গ্রহণ করে এবং চীনকে 'শান্তির জন্য হুমকি' আখ্যায়িত করে, কিন্তু দু-মুখো জাতিসংঘ পরক্ষণেই আবার চীনা বর্বরতার পুরস্কার এভাবে দিল যে, চীনকে জাতিসংঘের শুধু সদস্যই করে নেয়নি, বরং নিরাপত্তা পরিষদে ভেটো ক্ষমতাও প্রদান করে। অথচ জাতিসংঘ চার্টারে সুস্পষ্টভাবে একথা উল্লেখ আছে, শান্তির জন্য হুমকি কোনো দেশ জাতিসংঘের সদস্য হতে পারবে না।
০২. নিরাপত্তা পরিষদের কাজ প্রস্তাব পাস করা। সেমতে সে অসংখ্য অগণিত প্রস্তাব পাশ করে থাকে, কিন্তু বাস্তবায়ন করে কেবল সেগুলোই, যেগুলো তার পছন্দনীয় ও স্বার্থের পক্ষে হয়। ইসরাঈলের বিরুদ্ধে অসংখ্য অগণিত প্রস্তাব পাশ করা হয়েছে, কিন্তু এই সন্ত্রাসী ও বর্বর দেশটির বিরুদ্ধে জাতিসংঘ এ পর্যন্ত কোনো পদক্ষেপই গ্রহণ করেনি; বরং ইসরাঈলের দাবীর ওপর জাতিসংঘ বেশ কিছু প্রস্তাব প্রত্যাহার করে নিয়েছে। সন্ত্রাসী ইসরাঈল ফিলিস্তিন ও লেবাননের ওপর সর্বদা বোমা বর্ষণ করে আসছে। ইরাকের আণবিক স্থাপনার ওপর বোমাবর্ষণ করেছে। এরপরও তার বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি, কিন্তু লিবিয়া ও সুদানের বিরুদ্ধে জাতিসংঘে যখন প্রস্তাব ওঠে, তখন লকার-বি বিমান ধ্বংসে লিবিয়ার জড়িত থাকার কোনো সুস্পষ্ট প্রমাণ না থাকা সত্ত্বেও জাতিসংঘ গায়ের জোরে লিবিয়ার বিরুদ্ধে অবরোধ প্রস্তাব পাস করে। এমনকি তার বিরুদ্ধে আকাশ নিষেধাজ্ঞার সিদ্ধান্তও জারি করা হয়। ইরাকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রস্তাব পাস করে তা খুব ত্বড়িৎ বাস্তবায়ন করা হয়েছে। সুদান এবং আফগানিস্তানের সাথেও একই আচরণ করা হচ্ছে।
৮
গোটা বিশ্বের প্রায় সকল দেশই জাতিসংঘের জেনারেল এ্যাসেম্বলী-সাধারণ পরিষদের সদস্য, কিন্তু তার পাসকৃত প্রস্তাবের তেমন কোনো গুরুত্ব নেই। অথচ নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য মাত্র ১৫টি দেশ, কিন্তু তার পাসকৃত প্রস্তাবে পুরো বিশ্বে ভূমিকম্প শুরু হয়ে যায়। কারণ নিরাপত্তা পরিষদের পাসকৃত প্রস্তাব বাস্তবায়ন খুবই জরুরী। আবার নিরাপত্তা পরিষদের অভ্যন্তরীণ অবস্থা হচ্ছে, সকল প্রস্তাব পরিষদের চার স্থায়ী সদস্যের পক্ষ থেকেই কেবল পাস করা হয়। আর বাকী সদস্যরা তাদের কথামতো কাজ করবে।
০৩. উপসাগরীয় যুদ্ধে যেসব দেশ অংশ নিয়েছিল, সকলেই জাতিসংঘের পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধভাবে ইরাকের বিরুদ্ধে ময়দানে আবির্ভূত হয়েছিল। জাতিসংঘ সনদ ও তার সাথে যুদ্ধে অংশীদার দেশগুলোর সংবিধানে একথা লিপিবদ্ধ আছে, যুদ্ধের সময় বিদ্যুৎ, পানি, হাসপাতাল ইত্যাদিকে টার্গেট বানানো যাবে না, কিন্তু জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে সকল দেশ এসব মৌলিক স্থাপনাকে টার্গেট বানিয়েছে। বৃটেন, ফ্রান্স ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গায়ের জোরে ইরাকের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক আবরোধ আরোপ করেছিল। এমনকি খাদ্য-শস্য ও ওষুধ পর্যন্ত ক্রয়-বিক্রয়ের ওপর এবং উত্তর ও দক্ষিণ ইরাকের ওপর সামরিক বিমান উড্ডয়নের আকাশে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।
এসব থেকে সুস্পষ্ট অনুমিত হয়, জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে যে আন্তর্জাতিক সরকার প্রতিষ্ঠা লাভ করতে যাচ্ছে, তা কোনো নিয়ম-কানুন ও তত্ত্বাবধায়কের অনুগত হবে না। এমনিভাবে না কোনো রাষ্ট্রেরও এই সাহস বা অধিকার থাকবে যে, সে এই আন্তর্জাতিক সরকার বা জাতিসংঘকে তার কোনো অন্যায় অপরাধ ও আইন লংঘনের কারণে সতর্ক করবে বা শাসাবে। একথার সমর্থন জাতিসংঘের নীতিনির্ধারকদের বক্তৃতা-বিবৃতি থেকেই পাওয়া যায়, যা তারা বিভিন্ন সময় দিয়ে থাকেন।
ইহুদী পুঁজিপতি ডেভিড রকফেলার ১৯৭৩ সালে একবার চীন সফরে গিয়েছিলেন। সেখানে সাংস্কৃতিক বিপ্লবে লাখো মানুষ মুত্যুমুখে পতিত হয়েছিল, কিন্তু রকফেলার এসব কিছু পেছনে ঠেলে চীনের খুব প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, চীনের সাংস্কৃতিক বিপ্লবে যত ক্ষতিই হোক না কেন এবং তাতে তাদের যত মূল্যই দিতে হোক না কেন, এতে কোনো সন্দেহ নেই, এ বিপ্লব চাইনিজদের ভেতর উচ্চতর মানবিক যোগ্যতা ও প্রতিভার জন্ম দিয়েছে। এখন তারা পূর্বের তুলনায় আরো ভালভাবে শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালনা করতে সক্ষমতা রাখে; বরং এই সাংস্কৃতিক বিপ্লব গোটা সমাজব্যবস্থায় অভ্যন্তরীণ প্রাণ চাঞ্চল্য সৃষ্টিতে নজীরবিহীন সফলতা অর্জন করেছে। মাও-এর নেতৃত্বে যে বিপ্লব এসেছে তা মানবেতিহাসের সবচে' সফলতম বিপ্লব।
নিউইয়র্ক টাইমস চীনের উন্নতি অগ্রগতির ওপর সমীক্ষা মন্তব্য করতে গিয়ে ১৯৬১ সালের ১৯ই আগস্টের এক নিবন্ধে লেখেছে, কমিউনিস্ট বিপ্লবের বিরুদ্ধে যে কোনো বিদ্রোহ নির্মূল করা আমাদের মৌলিক কর্তব্য। কারণ কমিউনিজমের বিরুদ্ধে যদি কোন পাল্টা বিপ্লব আসে তাহলে এর অর্থ ধ্বংস ও বরবাদী ছাড়া আর কিছু নয়। কমিউনিজমকে শক্তিশালী ও সুসংহত করা আমাদের উপকারে আসবে। কমিউনিজম
ব্যবস্থার সাথে জাতিসংঘের কোন কোন স্বার্থ ও ফায়দা সংশ্লিষ্ট রয়েছে, তার বিররণ দিতে গিয়ে জাতিসংঘের নিরস্ত্রীকরণ কমিটি 'শান্তির অন্বেষা' নামক এক রিপোর্টে লেখেছে, আমরা রাশিয়ার গোপন পুলিশকে ধন্যবাদ জানাই, যার এক ইশারাতেই দুইশ' মিলিয়ন লোককে গ্রেফতার করা সম্ভব। অতএব কমিউনিজম ব্যবস্থাকে পতনের হাত থেকে রক্ষার জন্য প্রয়োজন এই ব্যবস্থার প্রতি আমাদের অব্যাহত সমর্থন জানানো। কারণ কমিউনিজম দ্বারা আমাদের পরিকল্পিত আন্তর্জাতিক সরকার প্রতিষ্ঠায় সাহায্য- সহযোগিতা পাওয়া যাবে।
৭ই এপ্রিল ১৯৭০ সালে জাতিসংঘের মহাসচিব লজ এঞ্জেলেস টাইমস পত্রিকার এক নিবন্ধে রাশিয়ান নেতা লেলিনের খুব প্রশংসা করে বলেন, মি. লেলিন রাশিয়ায় যেভাবে শাসনক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করেছেন, তা জাতিসংঘের জন্য এক আদর্শ নমুনা।
টিকাঃ
৮. যুদ্ধের ভাঙ্গা-গড়ার চিত্র তার একটি অংশ। শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ ও তাতে শিথিলতা আনা, দাবী ও দলীল-প্রমাণ, প্রকৃত সংকল্প ও ষড়যন্ত্র, হুমকি-ধমকি, প্রতারণা ধোকাবাজি, ওয়াদা খেলাফী-সবই নাটকের বিভিন্ন চরিত্রের ডায়ালগ মাত্র। আরেকটু অগ্রসর হয়ে মধ্যপ্রাচ্যে সাম্রাজ্যবাদের পটভূমি ও তার আগ্রাসী থাবার বিস্তারিত বর্ণনা দেবার পর বর্তমান ট্রাজেডি থেকে প্রফেসর খোরশিদ আহমদ এই ফল বের করেছেন, মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার বিস্তৃত ইসলামী অঞ্চল জুড়ে বিরাজিত চলমান দ্বন্দ্ব সংঘাত, উত্তেজনা অস্থিতিশীলতা কখনো প্রশমিত হবে না। ক্রমশঃ তা বৃদ্ধি পাবে।' সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক উপদেষ্টা বার্জেনেস্কী ও মার্কিন জাতীয় দৈনিক নিউজউইকের বরাতে প্রফেসর খোরশিদের সমর্থনে দলীল- প্রমাণও পেশ করা হয়েছে। নিউজউইক লেখেছে, 'যদি সাদ্দাম হুসাইন না থাকত তাহলে আমাদেরকে আরেকজন সাদ্দام হুসাইন আবিষ্কার করতে হত।' নিউজউইকের এ উদ্ধৃতিই মুসলিম উম্মাহর দৃষ্টি খুলে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। মধ্যপ্রাচ্য সম্পর্কে আমেরিকার পলিসি নিউজউইকের এ উদ্ধৃতি দ্বারাই সুস্পষ্ট হয়ে যায়। (সূত্রঃ নিউজউইক-১৬ই সেপ্টেম্বর, ১৯৯৬)